Buy Now

Search

ফাগুন চেয়েছে মন [পর্ব-০৬]

ফাগুন চেয়েছে মন [পর্ব-০৬]

ফাগুনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলো আসাদ। গেটের কাছে এসে পুনরায় সৃজনের সঙ্গে দেখা হয়ে গেলো। ভুল করে ডেস্কের চাবি বাসায় রেখে গেছে সৃজন। সেটা ফেরত নিয়ে মাঝরাস্তা থেকে ফিরে এসেছে।
দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে রাস্তার দিকেই তাকিয়ে ছিলো ফাগুন। গেটের সামনে সৃজন এবং আসাদকে একসঙ্গে দাঁড়ানো দেখে থমকে গেলো। কি যেন বলছে আসাদ। সৃজন চুপচাপ দাড়িয়ে শুনছে।
একসঙ্গে দুজনকে দাঁড়ানো দেখে হঠাৎ মাথার ভেতর এক অন্যরকম চিন্তা উঁকি দিলো ফাগুনের। অনেক ভেবেও ও কিছুতেই আবিষ্কার করতে পারলো না তেত্রিশ বছর ঐ পুরুষটার মাঝে কি এমন আছে যার জন্য আজ আসাদের কাছাকাছি যেতে পারি না ও!
আটাশ বছরের সুন্দর,সুদর্শন যুবক আসাদ। ফাগুনকে নিজের চাইতে বেশি ভালোবাসে। ভালোবাসাকে ফিরে পাওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা করছে।
অন্যদিকে সৃজন তেত্রিশ বছরের পরিপূর্ণ পুরুষ। স্বভাব, চরিত্র, ভালোবাসা কোনো দিক দিয়েই আসাদের সঙ্গে ওর মিল নেই। ফাগুনের পছন্দ আসাদের মত ভালোবাসায় উন্মত্ত,খ্যাপাটে পুরুষ। অন্যদিকে সৃজন শান্ত, ধীমান!
ফাগুনের কোনোকিছু নিয়ে ওর কোনো মাথাব্যথা নেই।
তবুও কেন ঐ লোকটার কাছে স্বচ্ছ থাকার এত দায় ফাগুনের? কেন সৃজনের অনুপস্থিতিতে সে আসাদের কাছাকাছি যেতে পারলো না? শুধুমাত্র সৃজনের সঙ্গে ওর বিয়ে হয়েছে বলে?
বিয়ে! এই শব্দটার এত জোর! ভালোবাসার চাইতেও বেশি? দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো ফাগুন। মাথাব্যথা কেমন ঝিমঝিম করছে। প্রতিবারই এমন হয়! সৃজনকে নিয়ে কোনকিছু ভাবতে গেলে একমুহূর্তেই সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়।
আসাদের সঙ্গে কথা শেষ করে ভেতরে ঢুকলো সৃজন। ডেস্কের চাবি নিয়ে আবার বেরিয়েও গেলো। ফাগুন একদৃষ্টিতে ওর চলে যাওয়ার দিকে চেয়ে রইলো! কিন্তু কিছুতেই নিজের করা প্রশ্নগুলোর সমাধান খুঁজে পেলো না।

রাতের বেলা বসে বসে ফের দুপুরের কথাগুলো ভাবছিলো ফাগুন। ভাবতে ভাবতেই অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছিলো। বিছানার ওপর ওর ফোন বাজছে খেয়াল করে নি। তাহেরা সৃজনের জন্য ফ্লাস্কে করে গরম পানি নিয়ে যাচ্ছিলো। যাত্রাপথে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বললো,
‘আপনার ফোন বাজে ভাবী।’
তাহেরা গলার আওয়াজ পেয়ে ধ্যান ভঙ্গ হলো ফাগুনের। মোবাইল ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলো আসাদ ফোন করেছে। রিসিভ করলো না। কল কেটে গেলো।
ত্রিশ সেকেন্ড বাদে ফের ফোন করলো আসাদ। প্রথমে বিরক্ত হলেও শেষমেশ ফোনটা রিসিভ করলো ফাগুন। নিজের মনকে বোঝালো, তার চিন্তাভাবনার সঙ্গে আসাদের কোনো সম্পর্ক নেই। শুধু শুধু ওকে কষ্ট দেওয়ার কোনো মানে হয় না।
কিন্তু এতকিছুর পরেও কথা বলার বিশেষ আগ্রহ বোধ করলো না ফাগুন। মাথার ভেতর ঐ একই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। টুকটাক কথাবার্তার পর আসাদ জানালো উকিলের সঙ্গে কথা বলে ফেলেছে সে। খুব শীঘ্রই ডিভোর্সের কার্যক্রম শুরু হবে।
ফাগুন ‘আচ্ছা’ বলে ফোন কেটে দিলো। ফোন বন্ধ করে চুপচাপ বিছানায় শুয়ে রইলো। বুকের ভেতর হঠাৎ করেই অস্থিরতা শুরু হয়ে গেছে!

রাতে দেরীতে ঘুমানোর পর ফলে সকাল বেলা ফাগুনের ঘুম ভাঙলো দেরীতে। সৃজন অনেক আগেই কারখানায় চলে গিয়েছে। নাশতা সেরে বারান্দায় বসে চুলে তেল দিচ্ছিলো ফাগুন। এমন সময় গেটের কাছে একটা রিক্সা এসে থামলো। রিক্সা থেকে নেমে এলো আনুমানিক পঁচিশ ছাব্বিশ বছরের এক তরুণী। গায়ের রঙ উজ্জ্বল শ্যামলা! গেটের বাইরে দাড়িয়ে সামাদের নাম ধরে ডাক দিলো গেট খুলে দেওয়ার জন্য।
সামাদ গেট খুলে দিতেই সোজা হেটে ঘরের ভেতরে ঢুকে যাচ্ছিলো। ফাগুন বাধা দিলো। কাছে এগিয়ে গিয়ে জানতে চাইলো,
‘কাকে চাই?’
মেয়েটা ফাগুনের পা থেকে মাথা পর্যন্ত একবার ভালো করে লক্ষ্য করে মিহি, সুললিত কন্ঠে সালাম দিয়ে বললো,
‘আপনি নিশ্চয়ই ভাবী? আমি সুধা। সৃজন আহমেদ আমার মামাতো ভাই।’
বিয়ের পর তাহেরার মুখে বেশ কয়েকবার সুধার নাম শুনেছে ফাগুন। তখন অবশ্য পরিচয় জানার বিশেষ আগ্রহ বোধ করে নি। কিন্তু আজ হঠাৎ সামনাসামনি দেখে মনে পড়ে গেলো খাবার টেবিলে প্রায়ই সৃজনকে সুধা আপার কাছে বলে দেওয়ার ভয় দেখাতো তাহেরা। বিশেষ করে সৃজন যখন খাবার দাবার নিয়ে বেশি অনিয়ম করতো তখন। ফাগুন মনে মনে ধারণা করে নিলো এই মেয়েটি সঙ্গে সৃজনের বিশেষ ঘনিষ্ট সম্পর্ক আছে।
সুধার কথার জবাবে ভদ্রতাসূচক হাসলো সে। সুধা নিজে থেকেই ঘরের ভেতর ঢুকলো। ভেতরে ঢুকে তাহেরার নাম ধরে ডাক দিতেই রান্নাঘর থেকে ‘সুধা আপা’ বলে চিৎকার দিয়ে ছুটে এলো তাহেরা। দুহাতে সুধাকে জড়িয়ে ধরে বললো,
‘এতদিন পর আপনার এই বাড়িতে আসার কথা মনে পড়লো আপা। আমি ভাইজানরে রোজ জিগাই আপনি কবে আসবেন। ভাইজান খালি বলে পরীক্ষা। আচ্ছা এই পরীক্ষা বুঝি ছয়মাস ধইরা ছিলো?’
সুধা হাসলো। হাতের ব্যাগ মেঝেতে রেখে তাহেরাকে জড়িয়ে ধরে বললো,
‘এইবার একসাথে চলে এসেছি। আর যাবো না। দেখি তোরা আমাকে কতদিন সহ্য করতে পারিস।’
সুধার একনিষ্ঠ ভক্ত তাহেরা। ছোট শিশুরা যেমন মাকে পেলে দুহাতে জড়িয়ে ধরে আবদার করে তেমনি সুধাকে জড়িয়ে ধরে আবদার জানালো তাহেরা। অনুযোগ করে বললো,
‘এইটা আপনে কেমন কথা বললেন আপা? আপনারে সহ্য হবে না কেনো? আপনার যতদিন খুশি থাকবেন। আপনি না থাকলে এই বাড়িটা ফাঁকা ফাঁকা লাগে। মনে হয় বুঝি মানুষ, গরু নাই। আমার তো খালি কান্দন আসে।’
দারোয়ান সামাদও ইতোমধ্যে গেটে তালা লাগিয়ে ছুটে এসেছে। তাহেরার মত সেও সুধার আরেক ভক্ত। সুধা এলে এই বাড়িটা প্রাণবন্ত, হাসিখুশি হয়ে উঠে। তাই সুধার সঙ্গে ওদের ভাব বেশি। অত্যন্ত আন্তরিক গলায় অভিযোগ জানিয়ে বললো,
‘আপনি একটা ফোন করলেন না কেন আপামনি? আমি গিয়া আপনারে নিয়া আসতাম।’
সুধা ফের হাসলো। এদের অভিযোগ শুনতে শুনতেই মনে হচ্ছে বেলা কেটে যাবে। মুখের হাসি বজায় রেখেই বললো,
‘আমার একা একা চলাফেরার অভ্যেস আছে সামাদ ভাই। আপনার এত চিন্তা করতে হবে না।’
সুধার পেছন পেছন ফাগুনও ঘরে ভেতরে ঢুকেছিলো। এতক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সবার কর্মকান্ড দেখছিলো। সুধাকে পেয়ে তাহেরা যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছে। সামাদও খুব খুশি। ওদের এত হাসিখুশি কারণ না জানলেও এটুকু বুঝতে পারলো কেবলের সৃজনের সঙ্গে নয় এই বাড়ির প্রত্যেকের সঙ্গেই আলাদা একটা সম্পর্ক সুধার। নইলে সুধা আসাতে ওরা এত খুশি হবে কেন? সামাদের কথার মাঝে সুধাকে উদ্দেশ্য করে বললো,
‘কথাবার্তা পরে হবে। আগে আপনি ফ্রেশ হয়ে নিন।’
সুধা ওর কথা মতো ব্যাগ নিয়ে ভেতরে ঢুকে গেলো ফ্রেশ হওয়ার জন্য। কাপড় ছেড়ে সোজা রান্নাঘরে ঢুকে গেলো তাহেরাকে সাহায্য করার জন্য। ফাগুন কেবল অবাক হয়ে দেখলো!

সৃজনকে ফোন করে অনেক আগেই সুধার আসার খবরটা জানিয়েছে তাহেরা। তথাপি সৃজনের বাসায় ফিরতে ফিরতে তিনটা বেজে গেলো। গেটের কাছে ওকে দেখে দোতলা থেকে নিচে নেমে এলো সুধা। কোনো রকম প্রাথমিক আলাপ চারিতা ছাড়াই কণ্ঠস্বরে একরাশ অভিযোগ ফুটে উঠলো সুধার। ভারী অপ্রসন্ন কন্ঠে বললো,
‘রোজই বুঝি এমন দেরী করে খেতে আসো?’
সুধাকে দেখে মুখে হাসি ফুটে উঠলো সৃজনের। হাতের ব্যাগটা মাটিতে নামিয়ে রেখে একহাতে সুধাকে জড়িয়ে ধরলো। ওর মাথায় হাত রেখে স্নেহের সুরে বললো,
‘একা কেন এসেছিস? স্টেশনে নেমে আমাকে ফোন করলেই তো হতো।’
‘আমার একা চলাফেরার অভ্যেস আছে।’
‘ফুপু কেমন আছে?’
‘মা ভালো আছে। কিন্তু তুমি আগে বলো দুপুরবেলা এত দেরী করে বাসায় ফিরলে কেন? তোমাকে আমি কতবার বলেছি সময় মত খাওয়াদাওয়া করবে!’
সৃজন হাতঘড়িতে সময় চেক করে বললো,
‘বেশি দেরী তো হয় নি। মাত্র তিনটা পাঁচ বাজে।’
‘তিনটা পাঁচ তোমার কাছে মাত্র মনে হচ্ছে?’
সৃজন হাসলো। ফের সুধার মাথায় হাত রেখে বললো,
‘তুই এসে গেছিস না? আর অনিয়ম হবে না। এবার ঘরে চল। ভীষণ খিদে পেয়েছে।’
‘এত দেরী করে বাসায় ফিরলে খিদে তো পাবেই। বেলা তো আর কম হয় নি। একটু বাদে বিকেল হবে।’
সৃজন হাঁটতে হাঁটতেই জবাদ দিয়ে বললো,
‘রোজ এত দেরী হয় না। আজকে নতুন করে একটা পার্টি এসেছে। প্রায় দুইলাখ মাল অর্ডার দিয়ে গেছে। ওদের সঙ্গে কথা বলতে বলতেই দেরী হয়ে গেছে।’
সুধা আর কথা বাড়ালো না। সৃজনের হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে বললো,
‘ঠিক আছে ভেতরে চলো। হাতমুখ ধুয়ে আগে খাবার খাবে।’
খাবার টেবিলে ফাগুন অনুপস্থিত। ভেতরে ভেতরে বেশ অবাক হলো সুধা। যদিও ফোনে তাহেরার কাছে কিছু কিছু শুনেছে সে কিন্তু এতটা গুরুতর অবস্থা বুঝতে পারে নি। রাতে বেলাও একই ঘটনা ঘটলো। সুধার খাবারের সময় উপস্থিত থাকলেও সৃজনের খাবার সময় টেবিলে এলো না ফাগুন। চুপি চুপি তাহেরাকে ডেকে ঘটনার বর্ণনা জানতে চাইলো সে। তাহেরা এতদিনের জমানো ক্ষোভ রাগ সব একসঙ্গে ঢেলে দিয়ে বললো,
‘দুইদিন থাকলে আপনি নিজেই বুঝতে পারবেন আপা। এই সংসারে কি চলে! এইখানে মানুষ বাস করে না! ভাইজান ভালো মানুষ তাই কিছু কয় না। আমার তো মন চায় সবাইরে ডাইকা আইনা দেখাই। এমন বউ আমি বাপের জন্মেও দেখি নি। স্বামীর কোনকিছুর প্রতিই কোনো খেয়াল নেই।’
সুধা চুপচাপ সব শুনলো। একটা কথাও বললো না। এমনকি ফাগুনকে কোনকিছু জিজ্ঞেস করারও প্রয়োজন বোধ করলো না। কিন্তু পরের দিন থেকে আর সৃজনের কোনো কাজের জন্য তাহেরাকে আর বলার প্রয়োজন হলো না। সৃজনের দায়িত্ব, গোটা সংসারের দায়িত্ব একা নিজের কাধে তুলে নিলো সুধা। ঠিক যেমন সৃজনের বিয়ের আগে নিয়েছিলো! তেমনি করে!
এতদিন কেবল ফাগুনের কাছের মানুষগুলো সম্পর্কেই জেনে এসেছে সৃজন। কিন্তু সৃজনের কাছের মানুষদের সম্পর্কে জানার কোনো সুযোগ হয় নি ফাগুনের। সেইজন্যই বোধহয় হঠাৎ করে আবির্ভাব ঘটেছে সুধার। এসেই পুরো সংসারের দায়িত্ব নিজের কাধে তুলে নিয়েছে। ফাগুন প্রথম প্রথম বিশেষ পাত্তা না দিলেও ধীরে ধীরে অস্থিরতা শুরু হলো।
চলবে…

Olindo Rahman

Olindo Rahman

A good book is worth a hundred good friends. 
But a good friend is equal to a library.!! 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Your experience on this site will be improved by allowing cookies Cookie Policy