Buy Now

Search

নবোঢ়া: আগুনফুলের আত্মনিবেদন [পর্ব-০৪]

নবোঢ়া: আগুনফুলের আত্মনিবেদন [পর্ব-০৪]

জমিদার বাড়িতে আত্মীয় পদচারণের পূর্বে কন্যা-বধূদের সাজগোজ করার নিয়ম৷ এতে জমিদারের বাড়ির প্রাধিকার এবং শ্রীমতির অভিন্ন অংশ প্রকাশ পায়। জুলফা পরেছে একটি খয়েরি জমিনে সোনালি পাড়ের পাথরের কাজ করা সিল্কের শাড়ি। ব্লাউজ হাফ হাতা, পিঠে সোনালি জরির ময়ূরের আকৃতি। গলায় স্বর্ণের হার, খোঁপায় স্বর্ণের কাঁটা। হাতে পরেছে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া স্বর্ণের বালা।

এই মুহূর্তে সে নিজের দুটি পটলচেরা চোখে কাজল আঁকছে। সামনে দামি মেহগনি কাঠের কারুকাজ খচিত আয়না। লম্বায় তার থেকে এক ফুট বেশি।

‘তোমাকে গ্রীক দেবী আফ্রোদিতির মতো লাগছে।’

জুলফা বিচিত্র হাসি হেসে বলল, ‘আফ্রোদিতি কী আপনার কোনো প্রেমিকা?’

শব্দর গুরুতর ভঙ্গিতে জানাল, ‘আফ্রোদিতি সবসময় আমার কল্পনায় ছিল। বলতে পারো, কাল্পনিক প্রাক্তন প্রেমিকা।’

জুলফা আগ্রহভরে প্রশ্ন করল, ‘প্রথম দেখা কোথায় হয়েছিল?’

‘ইতিহাসে।’

জুলফা ঘাড় উঁচু করে চেয়ে আছে শব্দরের মুখের পানে। তার সরল চাহনি দেখে শব্দর হো হো করে হেসে উঠল। সহাস্যমুখে বলল, ‘আফ্রোদিতি হচ্ছে একজন পুরাণ গ্রীক দেবী। তাকে সৌন্দর্য ও ভালোবাসার দেবী বলা হয়। কৈশোরে ওস্তাদজীর কাছে তার অনেক গল্প শুনেছি। ওস্তাদজী ইতিহাস খুব পছন্দ করতেন। ভাইজান যখন বাড়িতে থাকতেন না ওস্তাদজী রূপকথার গল্প শোনাতেন। দেবী আফ্রোদিতির কথা এতো শুনেছি যে কল্পনায় নিজের মতো একটা অবয়ব ভেবে নিয়ে তাকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে একসময় প্রেমে পড়ে যাই। তার ছবিও এঁকেছিলাম। সেসব অল্প বয়সের কথা৷ তখন ভেতরে ছেলেমানুষি আবেগ অনুভূতির প্রাবল্য একটু বেশি ছিল।’

শব্দরের লম্বাটে মুখজুড়ে প্রাণোচ্ছলতা। জুলফা তাৎক্ষণিক কিছু বলল না। তাকে চুপ থাকতে দেখে শব্দর রসিকতা করে বলল, ‘অন্য নারীর কথা শুনে কি হিংসে হচ্ছে?’

জুলফা মুখ ঘুরিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। যেখানে সে কাজ করতো সেখানে একজন সনাতন ধর্মের বাউন্ডুলে বৃদ্ধ ছিল৷ অবসর পেলেই মানুষকে গল্প শোনাত। সবসময় দেবতাদের নিয়ে গল্প করতো। অনেক দেব-দেবীর নাম শুনলেও আফ্রোদিতির নাম কখনো সে শুনেনি বা হয়তো মনে নেই৷

আজ বসন্তের দশম দিন। বাতাস বইছে। খাসমহল সংলগ্ন বাগানে চোখধাঁধানো ফুলের সমাহার, আম বাগানে আমের মঞ্জরিত মুকুলে মৌমাছির গুঞ্জরণ। প্রেমের দেবতা কিউপিডের পাঁচ শরের অন্যতম হচ্ছে আমের মঞ্জরি। তিনি সকল প্রেমের তীরের অগ্রভাগে মঞ্জরি দিয়েই মানব হৃদয়ে প্রেমের মধুময়তা বিঁধে দিতেন।

আচ্ছা, একবার হৃদয়ে প্রেমের তীর বিঁধে গেলে পুনরায় সেখানে অন্য কারো নামে প্রেমের তীর বিঁধে? শব্দরকে ভালোবাসার যে প্রচেষ্টা সেটা কী কখনো সফল হবে?

পাহাড় কেটে নামা ঝর্ণার পথ যতই এবড়োখেবড়ো হোক, জল সেই পথেই বহমান থাকে। তার জীবনটা এখন ঝর্ণারই অনুরূপ। পরিবার নেই, এই পৃথিবীর বিশালতা সম্পর্কে ধারণা নেই, পথঘাট সম্পর্কে অবগত নয়। জমিদার বাড়ি ডিঙ্গিয়ে তার যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। এই মহল তার শেষ আশ্রয়স্থল।

এখানেই মানিয়ে নিয়ে জীবন কাটাতে হবে৷

সেদিন রাতের অপ্রত্যাশিত ঘটনার পর জুলফা সারাদিন আহত পাখির মতো পড়ে ছিল মারবেল পাথরখচিত চকচকে মেঝেতে৷

শব্দর বিকালে মহলে ফিরে তাকে তুলতে এলেই কর্কশ কণ্ঠে অনেকটা চেঁচিয়ে উঠে জুলফা বলে, ‘খবরদার! আমার থেকে দূরে থাকুন।’ 

শব্দর পরিস্থিতি বুঝে উঠতে পারে না। কোনো নারীর রাগ সামলানোর পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই তার৷ কী উপায়ে তাদের রাগ ভাঙাতে হয়, শান্ত করতে হয় সেই বিষয়ে একেবারে অজ্ঞই বলা চলে। তবুও সে পুনরায় নিকটে গিয়ে জুলফাকে তোলার চেষ্টা করল।

জুলফার ক্ষোভ তখন আকাশচুম্বী। সে হুঙ্কার ছেড়ে বলল, ‘সরে যেতে বলেছি, সরে যান।’

কথা শেষ করেই সামনে রাখা রূপার গ্লাসটি ছুঁড়ে মারল শব্দরের দিকে। শব্দর দ্রুত সেখান থেকে সরে গিয়ে নিজেকে রক্ষা করে।

মানুষ যখন সবকিছু হারিয়ে ফেলে তখন পাগলের মতো হয়ে যায়। সেই পাগলামি একসময় মনুষ্যত্বকে হারিয়ে ফেলে। তখন সেই মানুষটির আশেপাশে থাকা সবার জীবনে নেমে আসে ভয়াবহ বিপর্যয়। এই বিপর্যয় একসময় পরিবার থেকে সমাজ, সমাজ থেকে ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে।

জুলফাকে এখন না ঘাঁটানোই ভালো। যত ঘাঁটানো হবে তত পাগলামি করবে। পাগলামির তীব্রতা বাড়তে থাকলে মনুষ্যত্বই হারিয়ে বসবে। শব্দর কক্ষ ছেড়ে বের হয়েই দুজন দাসীকে দ্রুত অন্যদিকে চলে যেতে দেখে। নিশ্চয়ই ললিতার চর। এতকাল এরা নিষ্ক্রিয় ছিল। জুলফা আসার পর থেকে এদের তৎপরতা বেড়ে গেছে।

সর্বক্ষণ এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ায়।

জুলফার বুকে-পিঠে একটা চাপ অনুভব হচ্ছে। বুক থেকে কিছু একটা উগরে আসতে চাচ্ছে৷ সে দৌড়ে জানালার কাছে যেতে যেতে গলগল করে উগড়ে দিল পানি।

শব্দর চলেই যাচ্ছিল বমির আওয়াজ শুনে দৌড়ে এলো কক্ষে। ক্ষুধার্ত থাকার কারণে শরীর খারাপ হয়েছে ভেবে জুলফাকে জোর করে খাবার খাওয়ানো হয়, তাতেও লাভ হয় না। আবারও একই ঘটনা ঘটে৷ অল্প-স্বল্প যা গলাধঃকরণ করল তাই উগরে ফেলে দিল। শব্দর ডাক্তারকে খবর দেয়। ডাক্তার এসে জানায়, মানসিক চাপে অযাচিতভাবে বমি হচ্ছে৷ কিছুক্ষণ নিশ্চিন্তে ঘুমালেই ঠিক হয়ে যাবে।

দুজন দাসী জুলফার সেবায় নিয়োজিত হয়। সে নিথর হয়ে পড়ে থাকে বিছানায়৷ চোখ বোজা থাকলেও তার মস্তিষ্ক নানা চিন্তায় বিভোর।

পৃথিবীর সব মানুষের মতোই সে সুখী হতে চায়। কিন্তু সুখের প্রকৃত সংজ্ঞা কী? কীসে তার সুখ? জীবনের পুরোটা সময় অভাব-অনটনে কাটিয়েছে৷ তখন প্রতি মুহূর্তে মনে হতো, নিজেদের একটা নিজস্ব বাড়ি আর তিনবেলা খাবার জুটলেই আর কোনো দুঃখ থাকবে না। এখানে তো অভাব নেই, বিলাসবহুল বাড়ি আছে তাও সে চরম অসুখী। পরিবার আর সেই নাম না জানা প্রেমিক পুরুষকে পেলে কী সে সুখী হয়ে যাবে? মানুষ কী এক জীবনে সব পায়!

জুলফা সারারাত শুয়ে থেকে নীরবে ভাবল। নিজেকে মানসিকভাবে তৈরি করে নিল নতুন জীবনের জন্য। স্ত্রীর দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে সতর্ক হয়ে ওঠল।

তার আমূল পরিবর্তন দেখে শব্দর জমিদার বাড়ির সবচেয়ে সুন্দর কক্ষটি তাকে উপহার দিল। এই কক্ষটি তার মায়ের ছিল। দুই সিঁড়ির ধাপওয়ালা উঁচু খাট। খাটের পাশে রাখা কাশ্মীরি কম্বল। এতেই শেষ নয়। স্ত্রীর খেদমতে তিনজন দাসী হাজির করে। একজন হয় ব্যক্তিগত দাসী৷

দাসীটির নাম জুলফার পছন্দ হয়নি। সে নতুন নাম রেখেছে শঙ্খিনী।

কল্পনা থেকে বেরিয়ে জুলফা শব্দরকে বলল, ‘রূপকথার দেবীকে হিংসে করার কী আছে!’

‘তাই তো! বরং সে তোমার সৌন্দর্য দেখে হিংসে করবে।’

জুলফা হেসে শুধায়, ‘তোমার আফ্রোদিতি আমাকে হিংসে না করলেও ভাবি নিশ্চয়ই করবে।’

জুলফার খোঁচা বুঝতে পেরে শব্দরের মুখের প্রদীপ যেন হঠাৎ করেই নিভে গেল। আয়নায় তার প্রতিবিম্ব ফুটে ওঠেছে৷ লোকটা ভাই-ভাবীর খুব ভক্ত।

জুলফার পুরনো সব কথা মনে পড়ছে। এইতো প্রথম দিনের কথা।

নতুন যুগলকে নিয়ে যখন ঘোড়া গাড়ি এসে থামে খাসমহলের সামনে তখন খবর পেয়ে ললিতা ছুটে আসে বারান্দায়।

জানালা দিয়ে উঁকি দেয় দাসীরা। জুলফা ঘাড় উঁচু করে দেখে লাল ইটের প্রাসাদের মতো দোতলা বাড়িটিকে; বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা ললিতাকে।

জুলফার চোখে তখন নতুনত্বের উন্মাদনা ছিল না। যা ছিল তা শুধু বিমর্ষতা, নির্ঝর বেদনা। শব্দর গদগদ হয়ে হাত বাড়িয়ে বলে, ‘চলো।’

জুলফা না চাইতেও হাত ধরে প্রবেশ করে খাসমহলে। ললিতা বিস্মিত নয়নে এসে সামনে দাঁড়ায়।

চাপা রাগ নিয়ে শুধু শব্দরকে বলে, ‘সমস্ত জীবনীশক্তি তোমাদের দুই ভাইয়ের সেবা করে নিঃশেষ করে দিলাম। আর এত বড় কাজ করলে আমাকে একটু জানাতে পারলে না!’

শব্দরকে কিছু বলতে না দিয়ে ললিতা নিজের কক্ষে চলে যায়। জুলফাকে চোখের দেখাও দেখল না।

শব্দর জোরপূর্বক হেসে জুলফাকে বলে, ‘কিছু মনে করো না। হঠাৎ করে বিয়ে করেছি তো তাই রাগ করেছে।’

 পরদিন সকালে জুলফা ঘুরে ঘুরে খাসমহল দেখছিল। ললিতার কক্ষের সামনে গিয়ে ভেতরে উঁকি দেয়। এমন সময় পেছন থেকে ভেসে এলো একটা কণ্ঠস্বর, ‘কী চাই?’

জুলফা চমকে ঘুরে তাকায়। ললিতা দারোগার মতো তাকিয়ে আছে। চোখে জিজ্ঞাসা চিহ্ন। জুলফা মিষ্টি করে হেসে বলল, ‘ঘুরে দেখছিলাম।’

ললিতা ভ্রুকুটি করে বলল, ‘তা আমার কক্ষে কী?’

খটোমটো প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে জুলফা অপ্রস্তুত বোধ করে। মহিলা এভাবে কঠিন সুরে কেন কথা বলছে তার বোধগম্য হচ্ছে না।

জুলফাকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকতে দেখে ললিতার বিরক্তি বেড়ে গেল, ‘এভাবে তাকিয়ে আছো কেন? এদিক-ওদিক না ঘুরে নিজের কক্ষে যাও। ‘

এহেন ব্যবহারের পরও জুলফা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি যতক্ষণ না আড়াল থেকে শব্দর ও ললিতার কথা শুনল।

শব্দর যখন ললিতাকে জানাল, জুলফার বাবা দিনমজুর, মা নেই।

ললিতার ঠোঁটে তাচ্ছিল্য এসে ভিড় করে, ‘দিনমজুরের মেয়ে! তোমার মাথাটা একদম গেছে। সম্মান বলে একটা ব্যাপার আছে জানো তো?’

‘বাবা-মার পেশায় কী যায় আসে? মেয়ে কেমন সেটা হচ্ছে কথা। তাছাড়া আমার কোনো সমস্যা নেই।’

‘গেঁয়ো অশিক্ষিত পরিবারের মেয়ে আর কেমন হবে? তোমার নজর এতো নীচু এতকাল বুঝিনি।’

শব্দর নিশ্চুপে শুধু শুনে গেল, কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। ললিতার চোখেমুখে সুগভীর ঈর্ষার ছাপ পরিলক্ষিত।

‘শেষ পর্যন্ত পঁচা শামুকে পা কাটলে। হাসালে আমাকে সত্যি।’

এতকিছু বলেও ক্লান্ত হলো না ললিতা। জুলফা যতই শব্দরকে অপছন্দ করুক ললিতার সঙ্গে শুরুতেই সে কোনো ঝামেলা বাঁধায়নি। শব্দর বাড়ি না থাকলে ললিতা জুলফার সাথে এমন ব্যবহার করে যেন সে কোনো দুর্গন্ধযুক্ত ময়লা। তাকে সবার থেকে আলাদা খাবার দেয়া হয়। কখনো বাসি, কখনো লবণ বেশি, কখনো বা মরিচ বেশি। ইচ্ছে করে বৈষম্য তৈরি করে। এরপর থেকে যতবারই সে ললিতার থেকে নেতিবাচক আচরণ পেয়েছে যথাযথ অসম্মানসহ ফেরত দিয়েছে।

আজ সকালেও একটা ছোট বিষয় নিয়ে দুজনের মধ্যে ঝগড়া তৈরি হয়।

বাড়িতে গুরুত্বপূর্ণ অতিথি আসবে। বেশ কয়েকজন দাস-দাসী কোমর বেঁধে যোগ দিয়েছে বাড়ি পরিচর্যায়। প্রতিটি বারান্দা সাজানো হয়েছে, রান্নাবান্না করছে অভিজ্ঞ দুজন নারী বাবুর্চি। বাবুর্চিরা ঠিকঠাক কাজ করছে কি না তা নজরে রাখার দায়িত্ব বাড়ির বধূদের। সেই দায়িত্ববোধ থেকে জুলফা একবার হেঁশেলে উঁকি দেয়। গৌতমের মা মাছের টুকরো খুব ছোট করে কাটছিল।

জুলফা বলে, ‘বড় করে কাটুন।’

ললিতা তখন হেঁশেলের দিকে আসছিল।

জুলফার কথা শুনে প্রতিদ্বন্দ্বী সুরে গৌতমের মাকে বলে, ‘যেভাবে কাটছিলে সেভাবেই কাটো। অন্যের কথায় কান দিও না।’

জুলফা ঘাড় ঘুরিয়ে বলল, ‘আমার সঙ্গে আপনার রাগ অতিথির সঙ্গে তো না। এতো ছোট করে কেটে….’

‘তুমি কী আমার থেকে বেশি জানো? বা গৌতমের মা থেকে? কতদিন হয়েছে সংসারে এসেছো? আমি পয়ঁত্রিশ বছর ধরে এই মহলে আছি৷ আমি জানি কোনটা কতটুকু কাটতে হবে।’

‘আপনি সবসময় গায়ে পড়ে ঝগড়া করেন কেন? এ কেমন ব্যবহার?’

‘তুমি কোথাকার কে যে আমাকে ব্যবহার শিখাচ্ছো?’

‘আপনাকে আপনার বাবা-মা শেখাতে পারেনি আর আমি শিখিয়ে ফেলব? ও কাজ আমি করব না।’ দুর্বোধ্য হাসল জুলফা।

ললিতা জ্বলে উঠল, ‘বাপ-মা তুলে কথা বলছো! এতো বড় স্পর্ধা তোমার!’

‘হাঁটু বয়সী মেয়ের সঙ্গে আর কত ঝগড়া করবেন?’

‘হাঁটু বয়সী মেয়ে হাঁটুতে থাকো। মাথায় চড়তে এসেছো কেন?’

জুলফা অধৈর্য্য হয়ে জানতে চায়, ‘কখন চড়লাম? আমার সাথে আপনার শত্রুতাটা কী?’

হেঁশেলের বাবুর্চি ও দাসীরা সরাসরি তাকানোর সাহস পাচ্ছে না। তারা আড়চোখে দুই জমিদার বধূর তর্ক দেখছে আর মিটমিট করে হাসছে। প্রতিদিনই এই কাহিনি ঘটে। কেউ কাউকে ছাড়ে না। সুফিয়ান বা শব্দর খাসমহলে না থাকায় ঝগড়ার আঁচ তারা পায় না। শেষ অবধি দুই বধূর পছন্দে দুটো মাছকে দুইভাবে কাটা হয়।

‘কী ভাবছো?’ শব্দের কথায় জুলফা অস্তিত্বে ফিরল। সে ব্যস্ত হয়ে বলল, ‘কিছু না।’ তারপর বলল, ‘তারা আসবে কখন?’

জমিদার বাড়িতে একটি ঘোড়ার গাড়ি রয়েছে। অতিথিদের জমিদার বাড়িতে ঘোড়ার গাড়ি দিয়ে নিয়ে আসা হয়।

ঘোড়ার হাঁকডাক শোনা যাচ্ছে, অতিথিরা চলে এসেছে৷ শব্দর তাড়া দেয়, ‘চলে এসেছে, দ্রুত চলো।’

প্রধান দরজায় বিশেষ বস্ত্র ধারণ করে সকলে এক হয়। ললিতা এবং জুলফা তাদের ব্যক্তিগত বিরক্তিকে ভুলে পাশাপাশি দাঁড়ায়। জুলফা বাড়ির নতুন লাবণ্য, তার চোখে নতুনত্বের আলো এবং সম্মোহন দেখা যাচ্ছে। সমস্ত দাস-দাসীরা দাঁড়িয়ে আছে তাদের চারপাশে ঘিরে। সুফিয়ান লাঠি ধরে শান্তিপূর্ণভাবে দাঁড়িয়ে আছেন অন্য পাশে। তাদের মধ্যে অতিথিদের স্বাগত করার জন্য একটি পথ নির্মিত করা হয়েছে।

জুলফা রাজকীয় অভ্যর্থনা ভীষণ উপভোগ করছে, তার পটলচেরা দুটি চোখ আগ্রহ এবং অপেক্ষায় ঝিলমিল করছে। অতিথিগণের পদ শব্দ শোনা যাচ্ছে।

নিকটে এসেই শব্দর আরাধ্য কণ্ঠে বলে, ‘এইযে আমার প্রিয় ভাই সুফিয়ান ভুঁইয়া। আর ডান পাশে আমার প্রিয় ভাবি, বাম পাশে আমার স্ত্রী জুলফা খাতুন।’

 জুলফা মাথা উঁচু করে তাকায়।

আশিক জামান পাটুওয়ারী সুফিয়ানের সঙ্গে করমর্দন করে বলেন, ‘দেখা হয়ে ভালো লাগল। ও আমার ছেলে নাভেদ পাটুওয়ারী।’

জুলফার মস্তিষ্কে কথাগুলো প্রবল ঝক্কিতে ভেঙে ভেঙে পৌঁছায়।

সে স্থির চোখে চেয়ে আছে বাবরি চুলের সুদর্শন পুরুষটির দিকে।

তার চোখে জ্বলছে একটি নতুন আলো। মনে অসংলগ্ন কম্পন, বুকে চলছে অজানা উদ্দীপনা।

written by: ইলমা বেহরোজ

Tamzidur Rahman

Tamzidur Rahman

A good book is worth a hundred good friends.
But a good friend is equal to a library.!!

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Your experience on this site will be improved by allowing cookies Cookie Policy