Buy Now

Search

অবরুদ্ধ নিশীথ [পর্ব-০৪]

অবরুদ্ধ নিশীথ [পর্ব-০৪]

ঢাকাতে আঁখির লাশ পাঠানো হলো ফরেন্সিক টেস্টের জন্য। তা মুস্তাকিন চেয়েছিল না। সে দিনাজপুরের এম আব্দুর রহিম মেডিকেলে পাঠাতে চাইছিল। ব্যবস্থাও করেছিল। সিনিয়র ইনচার্জ রাজী হননি।

আঁখির মা হাত মুস্তাকিনের হাত ধরে কান্নাকাটি করেছিলেন, “আমার মেয়েটার শরীলটারে আর কোনো শুয়োরের হাতে দিসনা, বাপ! আমারে মা মনে কইরা, আমার কথা রাখ! আমার বিচার লাগবো না। আমার আঁখির দেহডারে দে, বাড়ি নিয়া যাই!ʼʼ
এ কথা ফেলার মতো নয়। অথচ উপরমহল হুট করে সিদ্ধান্ত বদলেছে। এসব নতুন নয় এই লাইনে, তবে এর শেষ অবধি যেতে হলে তাকে সজাগ থাকতে হবে প্রতি পদে।

রাত আটটায় ডিআইজি স্যারের সাথে কথা বলে কার্যালয় থেকে বের হলো। টিমের সকলেরই খুব খাটুনি হবে এই মামলায়। এখানে কোথাও না কোথাও অতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে রাজনৈতিক বিষয়াদী আর সমাজের উচু পর্যায়ের পদ্ধতিগত বলপ্রয়োগ! যার ঘাপলা খুলতে বেশ বেগ পেতে হবে তাদের।

রাস্তা পার হবার জন্য দাঁড়াল। ফোন বাজছে। ফোন জিনিসটা নেহাত বিরক্তিকর, বিশেষ করে যখন রিং হয়।
মায়ের কল! এখন পুরো দিনের ফিরিস্তি চাইবে। খাওয়া, গোসল, শরীরের যত্ন, বাড়ি ফেরার তারিখ! কল রিসিভ করল না। ক্লান্ত শরীর, ফ্লাটে ফিরে গোসল দিয়ে এরপর নিজেই একবার কল করে নেবে।
বিকেলে থানায় কাউন্সিলর হুমায়ুন পাটোয়ারী এসেছিলেন। মুস্তাকিন গিয়েছিল সেখানে। সে প্রশ্ন করল হুমায়ুন সাহেবকে, “আপনি ভিক্টিমের পরিবারকে জায়গা থেকে উচ্ছেদ করতে চাইলেন, এরপর তারা গেল না, তার মেয়ের সঙ্গে এমন কিছু ঘটল। সন্দেহ যদি আপনার ওপর যায়, তা নিয়ে বক্তব্য কী আপনার?ʼʼ

হুমায়ুন পাটোয়ারী হাস্যজ্জল কণ্ঠে জবাব দিয়েছেন, “উচ্ছেদ করা কোনো কঠিন কাজ না, মুস্তাকিন। আর এমনও নয় তা আমি পারতাম না। তাই এরকম একটা সহজ ব্যাপারে তার সঙ্গে এমন খারাপ কিছু করার প্রশ্নও ওঠে না। তারা সময় চাইছে, আমি দিছি। না উঠলে উঠায়ে দিতাম, যেহেতু এইটা আমার কাজ। কিন্তু তাই বলে এমন কিছু..ʼʼ

মুস্তাকিন ঠোঁট উল্টে ধীরে ঘাঁড় ঝাঁকাল, “আপনার প্রতিপক্ষ দল কে?ʼʼ

হুমায়ুন পাটোয়ারী পান খাওয়া দাঁত বের করে চমৎকার হাসলেন, “সহজ হিসাব। আগের বার যে মেম্বার ছিল এই এলাকার সে, আর এইবার যেহেতু আমি বা হামজা মেয়র পদপ্রার্থী হয়ে নির্বাচনে দাঁড়াব, তাইলে বর্তমান মেয়র সাহেবও বলা চলে আমার বিরোধী। সে কিন্তু আবার আমার বেয়াইয়ের ভাই লাগে!ʼʼ

মুস্তাকিন আসলে বুঝতে পারছে না, এই কথার ওপর ভিত্তি করে তার এই দুটো লোককে সন্দেহের তালিকায় রাখা উচিত কি-না! হুমায়ুন পাটোয়ারী যা বোঝাতে চেয়েছে তা হলো, তারা হুমায়ুন পাটোয়ারীকে বদনাম করার জন্য আঁখির সাথে এই বিভৎস খেলায় মত্ত হতে পারে। আর কি কোনো সাসপেক্ট থাকতে পারেনা এই খু নের দায়ে! আঁখির পরিবারের সাথে একটা বিশদ আলোচনা দরকার। হতে পারে আরও কেউ কোনো সাহায্য করতে পারবে। কোমড় বেঁধে নামতে হবে। তার আগে ল্যাবটেস্টের রিপোর্ট চাই।

আরও জিজ্ঞাসাবাদ করতে তথ্য প্রয়োজন, যেটা ফরেন্সিক টেস্টের পর আসবে। দু'বার দুপাশে মাথাটা ঝাঁকি দিলো। গাড়ি চালাচ্ছে সহকারী মাহমুদ। হোটেল দেখে তাকে বলল, “গাড়ি থামান।ʼʼ

মাহমুদ গাড়ি থামাল। মুস্তাকিন নেমে গিয়ে হালকা পাতলা কিছু খাবার কিনে নিলো। ফ্লাটে রান্না করার চাচিটা দু'দিন হলো আসে না। এখন মুস্তাকিনের রান্না করার এনার্জি নেই।
এপার্টমেন্টের গেইটে দেলোয়ার বলল, “স্যার, তোমার তো চিঠি আইছে গো।ʼʼ
দেলোয়ারের দুষ্টু হাসছে। মুস্তাকিনও হেসে ফেলল, “চিঠি শুধু প্রেমিকার কাছ থেকে আসে না। আজকাল আর প্রেম চিঠিতে হয় না। উন্নত দুনিয়ার প্রেম হয় উন্নত উপায়ে, উন্নত ডিভাইসের মাধ্যমে হয়। হতে পারে দেখ, এটা আমার মৃত্যুর পরওয়ানা পাঠিয়েছে কোনো এক শুভাকাঙ্ক্ষী ভালোবেসে!ʼʼ

দেলোয়ার দাঁত বের করে হাসল, “তোমারে আর কেডা মারার সাহস করবো? যত বড়ো একখান পিস্তল প্যান্টের ভিত্রে নিয়া ঘোরো!ʼʼ
-“প্যান্টের ভেতরে পিস্তল? তাও আবার ওত বড়ো? তুই রাইফেল আর পিস্তলকে গুলিয়ে ফেলছিস মনে হচ্ছে! আর প্যান্টের ভেতরে পিস্তল রাখে কেমনে? কোথায় রাখে?ʼʼ
মুস্তাকিনের বলার ভঙ্গি দেখে হো হো করে হেসে উঠল এবার দেলোয়ার।

মুস্তাকিন ঢুকে গেল ফ্লাটে। দরজা লাগিয়ে খাবার টেবিলের ওপর রেখে, চিঠি নিয়ে বসল। চিঠিটা রেখে দিলো পরিত্যক্ত হালে। বিশেষ আগ্রহ আসছে না তা নিয়ে। সে জানে কার চিঠি। ফ্রেস হয়ে এসে খোলার কথা ভেবে আবার কী মনে করে দায়সারা হাতে চিঠিটা খুলল। বেনামী চিঠি —

'কী জানি পরিচয় দাও তুমি নিজের? ও হ্যাঁ!
সৈয়দ মুস্তাকিন মহান, ইনভেস্টিগেটর অব পিবিআই ডিপার্টমেন্ট, না ?

কেইস থেকে সরে যাও, অফিসার! তুমিও ভালো থাকো, আর আমরাও! নয়ত তোমার এক পিস্তল কতক্ষণ কতভাবে রক্ষা করতে পারবে তোমার জান? যা করতেছ, তা জানের সওদা। হাতে তো পড়বাই। আর যদি সেরকম ইচ্ছা থাকে, তাইলে তোমার রুহুর জন্য মঙ্গল আর মরার পরে বেহশত কামনা করি।ʼ

মুস্তাকিন চিরকুটটা হাতে মুড়ে ময়লার ঝুড়িতে ফেলল। শার্ট খুলে সোফাতে ছুঁড়ল। আরও মাথায় চেপে বসাচ্ছে এরা কেইসটা। এতক্ষণ তাও ঘুম ঘুম পাচ্ছিল একটু ক্লান্তিতে।

মোড়ের ওপর রিক্সা থামিয়ে দিলো রিক্সাওয়ালা। অন্তূ বলল, “আর একটু এগিয়ে যাবেন না?ʼʼ
-“না, আপা। রাস্তা খারাপ। চাকা আইঁটকে যায়। এইটুকুন পায়ে যান।ʼʼ

রাস্তাটা ভাঙা। ক'দিন আগের বৃষ্টিতে পিচ ক্ষয়ে নিচু হয়ে যাওয়া স্থানগুলোতে পানি জমেছে। সামনেই ক্লাব ঘর। বাইরের দেয়ালে সেঁটে রাখা বিভিন্ন রাজনৈতিক পোস্টার, রঙ-বেরঙের কালিতে রাজনৈতিক সংগঠনের নাম-ধাম লেখা সব। সামনে রাস্তার ওপারে চায়ের দোকান-পাট। ক্লাব ঘরের সামনে লাল চেয়ার পাতা অনেকগুলো। বাঁশের স্ট্যান্ডের ওপর ক্যারাম বোর্ড রাখা। চেয়ারে দুয়েকজন বসে পা দোলাচ্ছে, সিগারেট টানছে, কেউ চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছে।

রাস্তার করুণ দশা। কাউন্সিলরের ক্লাবঘরের সামনের রাস্তার এই হাল! অথচ সেই কাউন্সিলর আগামীতে মেয়র পদের প্রার্থী হয়ে বিভিন্ন সম্মেলনে কত কী করে দেবার অঙ্গীকার দিচ্ছেন জনতাদের! আজকালের মাঝে একটা বিশাল সম্মেলন আছে প্রাইমারী স্কুলের মাঠে। সেখানে নিশ্চয়ই হামজা, জয় জম্পেশ একটা করে বক্তব্য রাখবে! এদের জিহ্বা কয়টা? আর বিবেক এবং লজ্জাই বা কোন ফেরিওয়ালার কাছে বিক্রি করে বাদাম কিনে খেয়েছে! ভাবতে ভাবতে কাঁদায় এক পা গেড়ে গেল অন্তূর।

ক্লাবঘরের দিকে তাকাল না। থুতনি বুকে ঠেকিয়ে হেঁটে পার হলো। কালো বোরকা ও কালো ওড়নার নেকাবে মুখ ঢাকা তার। ক্লাবঘরের পাশেই সালমা খালার ছোটো বাড়িটা।
টিনের গেইটে আঙুলের টোকায় দু-তিনবার শব্দ করল। কিছুটা দেরি করে চাঁদনী গেইট খুলে দিলো। অন্তূ বলল, “ভয় পাবেন না, ভাবী। আমি খালার ভার্সিটির এক ছাত্রী।ʼʼ

চাঁদনী নির্লিপ্ত মুখে একপাশে সরে দাঁড়িয়ে ভেতরে আসার ইশারা করল। টিনের চাল, টিনের বেড়া। তার সামনে একটা ইটের গাথুনিতে তোলা ঘর। মেঝে হয়নি, উপরে শুধু টিনের ছাঁদ লাগানো হয়েছে, নিচের মেঝে কাঁচা, জানালা-দরজাও লাগানো হয়নি।
চাঁদনী অন্তূকে নিয়ে গিয়ে ঘরে বসাল। পাশের ঘরে সালমা খালা নামাজে বসে কাঁদছেন। করুণ কান্না। অন্তূর বুক ভার হয়ে এলো। চাঁদনী নাস্তা আনতে উদ্যত হলে অন্তূ চাঁদনীর হাতটা চেপে ধরে বলল, “ভাবী প্লিজ! কোনো আনুষ্ঠানিকতা দেখিয়ে আমায় ছোটো করবেন না। আপনি বসুন, দু মিনিটি কথা বলি! সব মিটলে একদিন এসে নাস্তা করে যাব।ʼʼ
চাঁদনী মানতে চায়না, অন্তূ জোর করে বসাল। জীর্ণ একটা সেলোয়ার-কামিজ পরনে চাঁদনীর। চুলের বেণী উলকো-খুশকো। মুখে মলিনতার ছাপ! দেখতে চরম সুন্দরী চাঁদনী। কালি পড়া ডাগর ডাগর চোখ, আর তা যেন রহস্যময়।

-“নাম কী তোমার?ʼʼ
-“অন্তূ বলে ডাকে সকলে।ʼʼ
-“আমিও তাহলে তাই বলে ডাকব!ʼʼ একটু হাসল চাঁদনী। হাসিটা অদ্ভুত, আর সুন্দর।
‌-“যদি আগেই চলে যেতেন এখান থেকে, তাহলে হয়ত আঁখির এই হাল হতো না বোধহয়।ʼʼ
মলিন হাসল চাঁদনী প্রত্যুত্তরে, “বহুতদিন থেকেই ক্লাবের ছেলেদের নজরে পড়ছিল আঁখি, আঁখিরে খুব জ্বালাতো ওরা। যাওয়া, আসার সময় আজেবাজে কথা বলতো। একবার ক্লাবের একজন বাড়িতে আসছিল তার কোনো বড়ো ভাইয়ের সাথে আঁখির কুপ্রস্তাব নিয়ে। আম্মা তারে একটা খাপ্পড়ও দিছিল।ʼʼ

অন্তূর জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করল, সেই বড়ো ভাইটা কি জয় আমির? আপনার কি সন্দেহ হয়না জয়ের ওপর? করল না প্রশ্নটা।
-“আপনি যে টাকা ফেরত দিতে গেছিলেন মেম্বার সাহেবকে, তা দিয়ে অন্য কোথাও তো জায়গা কিনে চলে যেতে পারতেন!ʼʼ
চাঁদনী হাসল আবার, কেমন যেন দেখাচ্ছিল চাঁদনীর হাসি, “তুমি ঘটনা লোকমুখে শুনছো তাই না?ʼʼ
অন্তূ জবাব দিলো না। চাঁদনী বলল, “পুরাটা আর আসলটা শোনো নাই।ʼʼ
-“এখন শুনি, আপনি বলুন।ʼʼ
চাঁদনী তাকায় অন্তূর দিকে, “হু? আমি বলব?ʼʼ
অন্তূর চাঁদনীকে ভীষণ অন্যরকম লাগছিল।

চাঁদনী বিছানার ওপরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কাপড়গুলো ভাজ করতে করতে বলল, “আমি বাপের বাড়ির পাওনা জায়গা আর বিয়ের গয়না বেঁচে আমার ভাইরে সাথে নিয়ে মেম্বারের কাছে গেছিলাম টাকা ফেরত দিতে।

-“তারা নিলো না?ʼʼ

-“টাকাগুলা দেখল আর মেম্বার সাহেব বলল, 'আচ্ছা! টাকা যখন যোগাড় করছো, নেয়া যাবে। আমি ওই হিন্দু লোকটার সাথে কথা বলে দেখি।ʼ
-“এরপর?ʼʼ
অন্যমনস্ক হলো চাঁদনী, “যেভাবে বলছিল, আমরা নিশ্চিত ছিলাম, টাকা নিবে, জায়গা ফেরত পাব।ʼʼ
-“নিলো কি সেই টাকা?ʼʼ

চাঁদনী খুব মনোযোগ দিয়ে কাপড় ভাঁজ করতে করতে বলল, “সেই রাতে বাড়িতে লুট হলো।ʼʼ বলেই হাসল। কী যে অদ্ভুত নির্লিপ্ত শুনতে লাগল চাঁদনীর কথাটা!
কপাল জড়িয়ে ফেলল অন্তূ, “চেনেননি তাদের?ʼʼ
চাঁদনী হাসিমুখে কাপড়গুলো একপাশে রেখে বলল, “তুমি কখনও ডাকাতি দেখোনি, না?ʼʼ
-“না, দেখিনি।ʼʼ

-“ওরা মুখোশ পরে ছিল। আর চিনলেই বা কী? যাবার সময় অস্ত্র দেখায়ে খুব ভালো করে সাবধান করে গেল। আর আমরা সাবধান হয়ে গেলাম। একবার সাবধান না হয়ে হারাই গেছে একটা।ʼʼ

অন্তূর বুঝল না শেষ কথাটা। চাঁদনী কি আঁখির মেজো ভাইয়ের কথা বলছে? যে ক্যান্সারে মারা গেছে? এখানেও এক রহস্য রইল। চেয়ে রইল ক্ষণকাল চাঁদনীর নির্বিকার মুখটার দিকে। অসীম ধৈর্য্য আর বুঝ মেয়েটির। এমন নিম্নবিত্ত পরিবারে এতো শীতল মস্তিষ্কের একটা বউ! তার চোখের চাহনি, কথা বলার ধরণ, মুখের ভঙ্গিমা –সবই যেন অ-সাধারণ, একটুও সাধারণ নয়! সেদিন শাশুরিকে যেভাবে বুকে জড়িয়ে থামাচ্ছিল, সে এক বিরল দৃশ্য! আজও কেমন অনড় শক্তিময়ী লাগছে এই মেয়েটাকে! প্রথম সাক্ষাতে কেমন নির্দিধায় কথা বলছে ওর সঙ্গে! একটুও ইতস্তত বা অপ্রস্তুত নয় যেন! মার্জিয়া কি এমন হতে পারতো না? অন্তূ জিজ্ঞেস করল, “আপনি পড়ালেখা জানেন!ʼʼ

চোখ তুলে তাকায় চাঁদনী, “এসএসসি পাশ করছিলাম। মুখ খুললে না তুমি? দেখলাম না তো তোমায়!ʼʼ

অন্তূ নেকাবটা খুলল অল্প একটু। বেজায় মায়াবতী দেখতে অন্তূ! সবচেয়ে বেশি মায়া লেপ্টে আছে ঘন পাপড়িওয়ালা চোখে, চোখের মণি কুচকুচে কালো, তাতে মুক্ত দানার ন্যায় ভাসছে আলোর প্রতিসরিত বিন্দুরেখা। এক দেখায় আটকে যাবার মতো, সুন্দর মেয়েটা। কালো নেকাবের প্রান্ত এসে ঠেকেছে ফর্সা কপালটার ওপর, থুতনিটুকুও বের হয়নি। কালো পর্দার আবরণের ভেদে ঝিরঝিরে মোহময়ী চেহারা! চাঁদনী কিছুক্ষণ অন্তূর নত মুখের দিকে চেয়ে থেকে বলল, “খুব সুন্দর তুমি।ʼʼ

-“আপনার কাছে হেরে যাব!ʼʼ
দুজনেই হাসল।

গেইটে শব্দ হলো। অন্তূ দ্রুত মুখে নেকাব পরে নিলো। সোহেল ঘরের দরজায় এসে থেমে গেল, তার চোখে-মুখে কৌতূহল। অন্তূ সোহেলের অপ্রস্তুত অবস্থা দেখে নিজেই বলল, “ভাই, আমি অন্তূ! ভার্সিটিতে পড়ি। ভাবীর সঙ্গে এমনিই দেখা করতে এসেছিলাম। আপনি ভেতরে আসুন।ʼʼ

সোহেল ঢুকল না, দু কদম পিছিয়ে হাত দিয়ে বাঁধা দেবার মতো করে বলল, “বসো তুমি। কথা কও, আমি পরে আসব। বসো, বসো!ʼʼ
অন্তূর ভালো লাগছিল এই বাড়িতে! সে বলল, “আপনি আসুন, আমি বেরিয়েই যাচ্ছিলাম।ʼʼ
অন্তূ গিয়ে কান্নারত অভাগী মায়ের পাশে মেঝেতে বসে পড়ল। হাতটা চেপে ধরে বলল, “চেনেন আমায়?ʼʼ
চিনলেন সালমা অন্তূকে। ভার্সিটিতে কমনরুমে দেখেছেন বহুবার।

“আপনি এভাবে কাঁদছেন কেন? ক্লাবঘরেও পৌঁছাচ্ছে নিশ্চয়ই আপনার কান্নার স্বর! পৈশাচিক আনন্দ দিচ্ছে ওদের আপনার এই আর্তনাদ! নিজের দূর্বলতা অন্তত শত্রুর কাছে প্রকাশ করতে নেই।ʼʼ
মুখে হাত চেপে কেঁদে উঠলেন সালমা।

অন্তূ বলল, “যখন কেউ কষ্ট দেবার লক্ষ্যে কষ্ট দেয়, তখন একদম উচিত নয়, কষ্ট পাওয়াটা তাদের দেখানো। হয় সেই পরিমাণ সেইভাবে ফিরিয়ে দিতে হয়, অথবা চুপ থাকতে হয়। অন্তত তাদের সামনে।ʼʼ
সালমা খালা অন্তূর এই ভারী কথা বুঝলেন কিনা কে জানে! বললেন, “কিন্তু ওরা তো করে নাই কিছু!ʼʼ
অন্তূ জানালার দিকে তাকিয়ে বলল, “নিজেকে সান্ত্বণা দিচ্ছেন?ʼʼ

সালমা কান্না সামলালেন, এরপর বললেন, “ওরা কিচ্ছু করে নাই, অন্তূ! কেডা করছে, আল্লাহ মাবুদ জানে! ওই পুলিশরা আমার বেটির লাশ দিতেছে না ক্যান! আবার কই নিয়া গেছে আমার বেটিরে! আমার বিচার লাগবো না। ওরা রাজনীতি করে, শক্তিশালী সব। আমার বিচার লাগবো না, কিচ্ছু লাগব না আমার। আমি চলে যাব এইখান থেইকা, বহুত দূরে যাব। আমার মেয়েটারে ওই পুলিশ আবার জানি কই নিয়া গেছে!ʼʼ
কথা ধরল অন্তূ, “কারা রাজনীতি করে? এই তো বললেন, ওরা কিছু করেনি!ʼʼ

তার মনে হলো, সে বোধহয় টেনে হিঁচড়েই জয়কে এসবের পেছনে দাঁড় করাতে চাইছে! তার সঙ্গে সেদিন খারাপ আচরণ করেছিল বলে জয় বারবার অপরাধীর জায়গায় নজর আসছে। কিন্তু এটা ঠিক না। ভেতরের উকিল মস্তিষ্কটা ধমকালো অন্তূকে।

ক্লাবঘর পার হওয়ার সময় আড়চোখে তাকাল সেদিকে। বুকে একটা চাপা উত্তেজনা কাজ করছে। তাকে চিনে ফেলার মতো কেউ যদি এখন ক্লাবে থাকে, কোনো তামাশা না হয়ে যায় এখন। যদি জয়ই দেখে ফেলে! ক্লাবঘরের সামনে বড়ো পোস্টারে কাউন্সিলর হুমায়ুন পাটোয়ারীর ছবি টাঙানো। পাশেই আরেক পোস্টারে তার ছেলে হামজার ছবি। এবার ক্যারাম বোর্ডের সামনে ছেলেরা দাঁড়িয়ে আছে, এটা আড়চোখে নজরে এলো। আর ভুলেও তাকালো না সেদিকে।

সন্ধ্যার বেশি বাকি নেই। দুনিয়াতে সর্বোচ্চ জঘন্য শব্দের মধ্যে সেরা জঘন্য শব্দ হলো, এলার্মের শব্দ। ঘুম ভাঙল জয়ের। ফোনের এলার্ম তখনও বাজছে। উপুড় হয়ে ছিল। চিৎ হয়ে বকলো, “স্যাঁটাভাঙা এলার্মঘড়ি। বালডা বাজতেই আছে। সম্বন্ধির ছেলে ঘড়ি আমার, আমি উঠছি হে। এইবার অফ যা।ʼʼ

ঘড়িটাকে ভাঙতে পারলে ভালো লাগতো। ভাঙল না। টাকার ঘা কলিজায়।

মুখে-চোখে পানি দিয়ে আসার পরেও ঝিমুনিটা ছাড়ছিল না। প্রথমে ঝুড়িতে, পরে একে একে সম্ভাব্য সকল আসবাবে কাঙ্ক্ষিত শার্টটা খুঁজল, পেল না। চিৎকার করতে করতে বেরিয়ে এলো ঘর থেকে, “মামি! ওও সতালো নানির মেয়ে...ʼʼ কাজের মহিলাকে জিজ্ঞেস করল, “সেই শালির চেংরি কই?ʼʼ

বেরিয়ে এসে দাঁড়ালেন শাহানা, “কী সমস্যা? ষাঁড়ের মতো গলা ফাঁড়তেছিস ক্যান? এই বাড়ির ব্যাটাছেলেদের জন্মগত বদরোগ এই!ʼʼ
জয় দাঁত খিঁচে উঠল, “আমার শার্ট ধোয়া হয়নি কোন সুখে? কার বালডা পরব আমি এখন?ʼʼ

-“তোর শার্টের খুব আকাল হয়েছে? আলমারী খুললে ছোটোখাটো একটা শার্টের গোডাউনের খোঁজ পাওয়া যাবে, বাদর! সবসময় তোমার শার্টের পেছনেই তো দৌড়াই আমি, আর কোনো কাজ নেই বাড়িতে। অন্যটা পরে বের হওয়া যেত না?ʼʼ

জয় মুখ খুলতে গিয়েও নিয়ন্ত্রণ করল নিজেকে। তার মুখ খুললে বকা ছাড়া কিছু আসার সম্ভাবনা নেই। মামিকে সামনাসামনি বকা ঠিক না। এরপর কথা বলতে গিয়ে ওই ক্ষ্যাপা স্বরই এলো, “তো একটা বের করে দাও সেই গোডাউন থেকে, পরে বের হই। তোমাদের মতো তো হুদাই ঘরে বসে থাকি না আমি। কাজ আছে, উঠতেই দেরি হয়ে গেছে, আবার শার্টের বাঁড়া নিয়ে রঙ্গ করতেছি আর আধঘন্টা!ʼʼ

তরু বেরিয়ে এসে দাঁড়াল সেন্টার রুমের একপাশে। জয় ওর দিকে ফিরল, কঠিন স্বরে আদেশ করল, “তরু! আরেহ সিস্টার, ইউ আর স্টিল জীবিত নাও? ভালোই হলো। আমার একটা শার্ট বের করে দে। যা! কুইক!ʼʼ

জয়ের ঘরে ঢুকলেই পুরুষালি একটা গন্ধ পাওয়া যায়। মাতাল মাতাল লাগে তরুর! ঘরে বাস করা পুরুষটাই যখন সর্বক্ষণ ওর মাতাল হয়ে থাকার কারণ, এই ঘরটাও ওর কাছে বড়ো কাঙ্ক্ষিত। প্রতিদিন জয় উঠে বেরিয়ে যাবার পর সে পুরো ঘরটাকে পারলে নতুন করে উলোট-পালোট করে, আবার শুরু থেকে গোছায়, বেশিক্ষণ এই ঘরে অবস্থান করার লোভে। যতক্ষণ এখানে থাকবে, বুকের ভেতর কী যে এক শিরশিরানি নেচে বেড়ায়।

আলমারিটা খুলে খুঁজে খুঁজে একটা কালো-লালচে রঙা শার্ট বের করল। আবার দ্রুত ঢুকিয়ে হ্যাঙ্গারে বাঁধিয়ে রাখল। এই ঘরের প্রতিটা বিন্দু তার গোছানো।
অবশেষে একটা চেক শার্ট বের করল । সেটাতেও মন লাগল না। ভুলভাল শার্ট নিয়ে গেলে, পছন্দ না হলে নিশ্চিত একটা জঘন্য ভাষায় গালি দিয়ে ছুঁড়ে ফেলবে শার্টটা জানালা দিয়ে।
একবার শার্ট ধোয়া হয়েছিল না, সবগুলো শার্ট বাথরুমে চুবিয়েছিল। পরে ক্লিনার এনে সেসব তুলে বাথরুম বাঁচানো হয়েছে। আবার নতুন শার্ট কিনতে হয়েছিল। না কেনা অবধি হামজার শার্ট পরতো।

একটা মিশ্র ছাই রঙা শার্ট দিলো জয়কে। জয়ের সব শার্ট বেনামী রঙের। নাম না জানা সব কালারের শার্ট বেছে বেছে কিনে আনে। এমনকি শার্ট যেটা কেনে সেটা দোকানে দাঁড়িয়েই গায়ে চড়িয়ে পরনেরটা ব্যাগে করে বাড়ি ফেরা লোক সে। পরেরদিন নতুন সেই শার্ট ধুয়ে, আয়রন করে আলমারিতে তোলা হয়। এরকম হাজারো পাগলাটে স্বভাবসমপন্ন, বদরাগী পুরুষটিকে কেন যে এতো ভালো লাগে মনে মনে তরুর? লোকে শুনলে নিশ্চয়ই বলবের রুচির দোষ আছে তরুর, নয়ত জয়ের মতো নোংরা স্বভাবের ছেলের প্রমে পড়া যায়না।

জয় কিছু বলল না, চুপচাপ শার্টটা পরল গায়ে। তরুকে দিয়েই পারফিউম আনিয়ে নিলো। এই ব্যাপারটা তরু কতটা উপভোগ করে, তা জানে না জয়! তার মন নেচে ওঠে যখন জয় ধমক দিয়ে এটা ওটা ঘর থেকে আনতে বলে তাকে। মনে হয় যেন সে ঘরনী জয়ের!

আজ পৌরসভা অফিসে বৈঠক ছিল। নির্বাচন কাছে। হামজা বলেছিল, ঠিক দুপুরের পর পৌরসভায় পৌঁছে যেতে। আগামী সপ্তাহের শুরুতেই বিশাল এক সম্মেলন নির্বাচন নিয়ে। সেই বিষয় নিয়ে আলোচনা চলবে। জয় পৌরসভায় না গিয়ে গিয়েছিল পলাশের গাঙের পাড়ের বাড়িতে। সেখানে কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে, ক্লাবে গিয়ে ক্যারাম খেলেছে আধঘন্টার মতো, এরপর বাড়ি ফিরে ঘুম দিয়েছে সন্ধ্যা অবধি।

কবীর ড্রাইভিং করতে করতে জিজ্ঞেস করল, “ভাই, আমরা যাচ্ছি কই এখন?ʼʼ
-“চেয়ারম্যান কাকা ডেকেছে।ʼʼ
কবীর দ্রুত ঘাঁড় ঘুরাল, “চেয়ারম্যান কাকা, আপনাকে ডাকছে? ক্যান?ʼʼ
-“সম্পত্তির ভাগ লিখে দেবে। তোর কিছু চাই সেখান থেকে?ʼʼ
বোকা হাসল কবীর, “না মানে! আপনারে ক্যান ডাকছে? উল্টাপাল্টা কিছু করবে না তো?ʼʼ

-“উল্টাপাল্টা কিছু? বউ নাই নাকি চেয়ারম্যানের? আমায় কেন টার্গেট করবে?ʼʼ
হাসল কবীর। জয় বলল, “আয় তোর এই গেছো বাদরের মতো হাসির একটা ছবি তুলি। বাই এনি চান্স অকালে টপকে গেলে ছবিতে মালা চড়াবো।ʼʼ

ব্যাক ক্যামেরা অন করে কবীরের দিকে ধরল। হঠাৎ-ই একটা বোঝাই ট্রাক সামনে এসে পড়ল ওদের গাড়ির! গাড়ি চালানোর সময় এই মজা বোধহয় কাল হয়ে উঠল ওদের। কবীর প্রথমত নিয়ন্ত্রণ হারাল, দ্রুত স্টিটিয়ারিং ঘুরাল গাড়ি এক সাইডে নেবার জন্য। ততক্ষণে ডান পাশে আরেকটা গাড়ি এসে পড়েছে। ওদিকে সরার জায়গা নেই। ওদের গাড়ি যে পজিশনে রয়েছে তাতে ট্রাক ওদের গাড়িকে পিষে সামনে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। ওপাশে চাপার জায়গা নেই। কয়েক সেকেণ্ড পাশের গাড়িটা আরও স্লো হয়ে ওদের পাশ আটকে চলল মনে হলো। জয় সবসময় খারাপ কিছুর জন্য প্রস্তুত। কবীরও হলো।

কিচ্ছু করার নেই আর, ট্রাক ওদের সামনে খুব কাছে প্রায়। আচমকা পাশের গাড়িটা পাশ থেকে দ্রুত এগিয়ে গেল ওদের গাড়ি পার করে। সেদিক দিয়ে ট্রাকটা চলে গেল ওদের বাঁচিয়ে। ট্রাক চলে গেল নাকি কবীর নিপুন হাতে নিয়ন্ত্রণ করে নিলো, বলা যায়না! সেকেণ্ড বিশেকের মধ্যে ঘটে গেছে পুরো ঘটনাটা।
জয় গাড়ির জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখল ট্রাকটাকে একবার। এখনও হৃদপিণ্ড ধরাস ধরাস করছে। জয় তাকে বকলো, “শালা, এত লাফাও ক্যান?ʼʼ
বেশ কিছুক্ষণ পর পেছন থেকে সমনে ঘাঁড় ফেরালো। কবীরকে প্রশ্ন করল, “ট্রাকটা কার জানিস, কবীর?ʼʼ

চলবে… 
written by: তেজস্মিতা মুর্তজা

Tamzidur Rahman

Tamzidur Rahman

A good book is worth a hundred good friends.
But a good friend is equal to a library.!!

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Your experience on this site will be improved by allowing cookies Cookie Policy