Buy Now

Search

অবরুদ্ধ নিশীথ [পর্ব-১০]

অবরুদ্ধ নিশীথ [পর্ব-১০]

সকাল নয়টায় হামজার ঘুম ভাঙল জয়ের গলাভাঙা গানে। হিরিক বেঁধে গেছে যেন গানের। সে কোনোসময় বিষণ্ন থাকেনা। সিচুয়েশন যেমনই হোক, অল টাইম চিল! এটা তার স্লোগান! ভেসে আসছে টুংটাং গিটারের সুর আর আধভাঙা গলায় তোলা সুর, 
~মনে পড়ে বারবার, সময়ের কারবার, রাস্তারা ফেরোয়ার হারিয়েছে আজ.. 
চাওয়াদের শেষ নেই, জানি তবু পারি কই, চড়ে বসি বারবার স্বপ্ন জাহাজ.. 
চাইলে চলে যা যদি, না থাকে উপায়, 
সুঁতোয় বাঁধা জীবন ছেড়ে পালাবি কোথায়….. 
হাতের ব্যান্ডেজ নিয়েই শুরু করে দিয়েছে টুংটাং গিটার বাজানো! 
নড়তে চড়তেই হামজার মুখচোখ কুঁচকে উঠল গায়ের ব্যথায়! রিমি নেই। রাত থেকে মেয়েটা কথা বলছে না। গলা বাড়িয়ে ডাকল, “জয়..জয়! এদিকে আয়। জয়..ʼʼ 
জয় আওয়াজ দিলো, “জি সাহেব।ʼʼ 
রুমে ঢুকে বলল, “চালু হয়ে গেছে তোমার ভাঙা রেডিও! ওটা থামাও তো, ঘ্যারঘ্যার করছে।ʼʼ 
ধপ করে শুয়ে পড়ল বিছানার ওপর হামজার পাশে। হামজা জিজ্ঞেস করল, “আমার ডাক শুনতে ভাঙা রেডিওর মতো ঘ্যারঘ্যারে লাগছে?ʼʼ 
-“এত ভালোও লাগেনা শুনতে। ওই ধরো..ʼʼ 
কুশন তুলে মুখের ওপর ছুঁড়ল হামজা, “কীসের মতো লাগে তাইলে?ʼʼ 
সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল জয়, “বললে চাকরি থাকবে না।ʼʼ 
-“চাকরি তোর এমনিতেও থাকবে না। আমি যদি তোর গানের গুণগান করি, তুই তো মেয়েলোকের মতো হাত-পা আঁছড়ে কাঁদতে লেগে যাবি! সেই হিসেবে আর হারুণফাটা মার্কা গলায় গান গাইবি না, বাড়ি থেকে পাছায় লাত্থি মেরে বের করব তোকে।ʼʼ 
জয় ভাব নিয়ে থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্টের পকেটে একহাত রেখে দাঁড়াল, “তোমার বাপের এই ঘুনপোকা ধরা ভেঙরি বাড়িতে আমি আছি, শুকরিয়া আদায় করো!ʼʼ 
-“বিশাল কামাই করছিস থেকে! যা ভাগ!ʼʼ 
-“ও তুমি বুঝবা না, ব্রোহ! মামির কাছে জিজ্ঞেস কোরো, সে বুঝিয়ে দেবে, আমি হলাম সোনার ডিম দেয়া রাজহাঁস!ʼʼ অকপটে খোঁচা মারা কথা বলে দাঁড়িয়ে রইল জয়। 
হামজা হাই তুলে বলল, “যা, গিয়ে পড়তে বস। তার আগে ওখান থেকে আমার তোয়ালেটা দে।ʼʼ 
জয় চোখ ছোট করে তাকায়, “ক্যান, তুমি উঠতে পারতেছ না? পরনে কোনো জাঙ্গিয়া-টাঙ্গিয়াও নাই নাকি?ʼʼ 
একলাফে বিছানা থেকে নামল হামজা, দাঁত খিঁচল, “এদিকে আয় শুয়োর, তোর জাঙ্গিয়া খুলে তোকে শহর ঘুরিয়ে আনবো আজ আমি!ʼʼ 
দৌঁড়ে ঘর ছাড়তে ছাড়তে জয় চেঁচায়, “ছিহ ভাই! ছোট ভাইয়ের ইজ্জত মানে জাঙ্গিয়া নিয়ে টান পাড়াপাড়ি করতে বাঁধলো না তোমার? আমি ভার্জিন একটা, সরল-সহজ নিরীহ ছেলে, ভাই! সব রেখে সোজা জাঙ্গিয়াতে হামলা? নাউযুবিল্লাহ! এই মুখ আর সমাজে দেখানোর যোগ্য রাখলে না আমার!ʼʼ 
হেসে ফেলল হামজা। হাতের কুশনটা সজোরে ছুঁড়ে মারল। গোসলে যাবার জন্য তোয়ালে ঘাঁড়ে করে রিমিকে ডাকল কয়েকবার। জবাব এলো না। খানিক বাদে তরু এলো, “কী হয়েছে, বড় ভাইয়া? কিছু দরকার?ʼʼ 
গম্ভীর চেহারায় মাথা দুলালো হামজা, “তোর ভাবীকে দরকার!ʼʼ 
মুখ লুকিয়ে ফিক করে ঠোঁট চেপে হেসে ফেলল তরু। রিমি এলো। মুখ ভার। এসেই বিছানা গোটাতে শুরু করে রিমি। হামজা এগিয়ে গিয়ে পেছন থেকে জাপটে ধরল রিমিকে, কাধের ওপর থুতনি ঘঁষে বলল, “কী হয়েছে ম্যাডামের? কথা না বলার ব্রত রেখেছেন নাকি?ʼʼ 
রিমি ছাড়ানোর চেষ্টা করল হামজাকে, হামজা আরও শক্ত করে পেট চেপে ধরল। তার লোমশ বুকটা ঠেকল রিমির পিঠে। দমল না রিমি, মুচরামুচরি করছে খুব। হামজা এবার রিমির হাত দুটো মুঠো করে চেপে ধরে নিজের দিকে ঘোরালো। হামজার বিশালদহী শরীরের তুলনায় নেহাত ছোটোখাটো অভিমানিনী মেয়েটা। হামজা কপট চিবিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে, এমন করছ কেন? আমার দিকে তাকাও, রিমি!ʼʼ 
তীক্ষ্ণ চোখে তাকায় রিমি, জবাবদিহি চাওয়ার মতো শক্ত মুখে বলে, “মাজহার ভাইকে মেরেছেন আপনি? কেন?ʼʼ 
হামজা নরম হলো, ব্যান্ডেজ করা হাতটা শিথিল করে রিমির থুতনিতে বুলাতে বুলাতে বলল, “তোমাকে বলেছি না! আমার কাজ এবং পার্টির ব্যাপারে না ভাবতে। এসব বিষয় তোমার মাথায় রাখতে হবে না, এই নিয়ে রাগ করে আছ? চ্যাহ! আমার দিকে তাকাও, এদিকে দেখো!ʼʼ থুতনি উচিয়ে ধরল হামজা। 
-“আপনার পার্টির ব্যাপার? এটা আপনার পার্টির ব্যাপার বলে মনে হয়? মাজহার আমার চাচাতো ভাই!ʼʼ 
হুট করে হামজা শক্ত হলো যেন, ঘাঁড় কাত করল, “আর আমি?ʼʼ 
-“আর আপনি কী? অমানুষ স্বামী আমার! তাই তো? মাজহার ভাইকে ওভাবে কেন মেরেছেন জানোয়ারের মতো?ʼʼ 
-“আমার ক্ষতগুলো নজরে আসছে না, তোমার?ʼʼ 
-“আপনার ক্ষত? সেটা মাজহারকে মারতে না গেলে তো হতো না! ওকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কতটা মারলে তা করতে হয়? কী মার মেরেছেন ওকে? মেরে ফেলতে চেয়েছিলেন? ও আপনাকে আগেই মেরেছে? নাকি আপনার জানোয়ার মার্কা হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে আপনাকে আঘাত করেছে?ʼʼ 
হামজা শাসিয়ে উঠল, চোখ লাল হয়ে উঠেছে তার, ওভাবেই চিবিয়ে বলল, “মাজহার জয়কে মেরেছে। তুমি বেশি কথা বলছো, রিমি!ʼʼ 
-“একদম ঠিক বলেছেন, নেতাবাবু! আজ একটুও কম কথা বলার ইচ্ছে নেই আমার। জয়কে মেরেছে বলে আপনি ওকে মেরে ফেলার মতো করে মারবেন?ʼʼ 
-“জীবিত কবর খুঁড়ে মাটি দিয়ে দেব। বুঝেছ তুমি! কেউ জয়ের গায়ে হাত লাগালে, তার হাতটা গুঁড়ো করে ফেলব ভেঙে।ʼʼ চিবিয়ে উঠল হামজা। 
-“বাহ বা! নেতাবাবু! জয়ের সামনে সবাই পর, আর আপনি আপনার শীতল স্বভাবের বিপরীতে এক পশুর সমান? কেউ আপনার কেউ না? আমাকেও চিনতে পারছেন না? জয় এতই আপন আপনার?ʼʼ 
-“তুমি তোমার নিজের কথা বলোনি, রিমি! মাজহারের হয়ে উকালতি করছো, দরদ দেখাচ্ছ। কেন? সে তোমার চাচাতো ভাই বলে? ওয়েল! তাহলে, জয় আমার জান। এবার বোঝো, ওর শরীর থেকে র ক্ত ঝরলে আমার কোথায় ব্যথা লাগে! তোমার চাচাতো ভাইকে বলে দিও, দরকার পড়লে আমাকে যেন কুপিয়ে চারভাগ করে ফেলে আমার ওপর রাগ থাকলে, কিন্তু জয়ের গায়ে আঁচ লাগলে, জীবন্ত পুড়িয়ে ফেলব!ʼʼ 
রিমি অবাক হবার সাথে সাথে কেঁদে ফেলল, গলা ও থুতনি ভেঙে এলো তার, “তার মানে আপনার কাছে নিজের অথবা আমার কোনো মূল্য নেই?ʼʼ এগিয়ে এসে হামজার ব্যান্ডেজ করা কব্জিতে হাত রাখল আলতো করে, “আপনার কিছু হলেও সমস্যা নেই? আমি তারপর ভেসে বেড়াব আপনাকে ছাড়া, তাতেও সমস্যা নেই আপনার? শুধু জয়ের কিছু হলে ব্যথা লাগে আপনার বুকে?ʼʼ 
-“অবুঝের মতো কথা বলো না!ʼʼ হামজা নরম হলো একটু। 
-“অবুঝের মতো তো এতদিন ছিলাম! আজ প্রথমবার বুঝলাম, আমার জায়গাটা কোথায় আপনার জীবনে! আমি শুধুই একটা অপশন অথবা উদ্বাস্তু হয়ে রয়ে গেছি আপনার কাছে! সামান্য এক জয়ের জায়গা নিতে পারিনি আপনার ভেতরে..ʼʼ 
-“আমায় রাগিও না, রিমি! চেনোনি আমায়। একটা মানুষের ভেতরে সবার জন্য আলাদা আলাদা স্থান থাকে। জয়ের জন্যও তেমনই আলাদা একটা বিশেষ স্থান আছে আমার ভেতরে! তার মানে এই নয়, তোমাকে আমি ভালোবাসি না। ভালোবেসেই বিয়ে করে এনেছিলাম, ভুলে বসেছ সব? এক চাচাতো ভাইয়ের খাতিরে তুমি আমার অবস্থান ভুলে যাচ্ছ মনেহয়!ʼʼ 
-“আপনিও তো জয়ের সামনে আমার অবস্থান ভুলে বসেছেন।ʼʼ 
-“শুরুটা কাল রাত থেকে তুমি করেছ। আমি যখন জখম হয়ে রুমে এলাম, তোমাকে ডেকেও বারান্দা থেকে রুমে আনতে পারিনি, শরীরের ব্যথা নিয়ে ওভাবেই কাতরাতে কাতরাতে শুয়ে পড়েছি। তারপর টের পেয়েছিলে জয় উঠে এসে কম্বল টেনে দিয়ে, ব্যথার ওষুধ খাইয়ে, আবার একচোট ঝগড়া করে গিয়েছে রুম থেকে? জয় আমার জীবনে বিশেষ কিছু, এটা অনস্বীকার্য সত্য!ʼʼ 
-“বিশেষ নয়, গোটাটাই ওর আপনি!ʼʼ 
-“না বুঝে কথা বোলো না। জয় পুরো দুনিয়ার জন্য জঘন্য এক ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠলেও, সেদিনও আমার কাছে, এবং চিরদিন ও আদরের। লোকের সাপেক্ষে না, আমার সাপেক্ষে বিচার করলে ওকে ভালোবাসা আমার জন্য জায়েজ। 
-“কেন? সে কী এমন মহান লোক?ʼʼ 
-“কোনোদিন ওর শার্টটা খুলে পিঠের দিকে নজর দিও। এখনও দগদগে একটা ঘায়ের দাগ বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে পিঠে। যখন তুমি এসেছিলে না আমার জীবনে যখন নেতা হয়ে উঠিনি আমি, সেকালেও জয় নিজের শরীরে গুলি খেতে আমার সামনে এসে পিঠ পেতে দিয়েছিল। তখন আমি ছাত্রনেতা হয়ে উঠিনি। ওর সেই পিঠ পেতে খাওয়া গুলি আজ আমায় বাঁচিয়ে না রাখলে তোমার ভালোবাসা অবধি পৌঁছাতাম না আমি। তার আগেই আমার কিচ্ছা ফুরিয়ে যেত। আমার বুকের গুলি পিঠে খাওয়া ওই নষ্ট ছেলেটাকে এই হামজা পাটোয়ারী খুব ভালোবাসে। ও আমার ফুপাতো ভাই না, আমার জান! পর্ববর্তীতে তুমি ওর বিপক্ষে কোনোদিন কথা বলতে এসো না। আমি চাই না এ নিয়ে কোনো ভাগাভাগি হোক! আমার জীবনে জয়ের তুলনা শুধু জয়, ও আমার বিজয়-জয়।ʼʼ 
রিমি কেন জানি ফুঁপিয়ে উঠল। হামজা দুটো শ্বাস নিয়ে রিমির একদম কাছে গিয়ে দাঁড়াল, “রাজনীতিবিদের বউ হতে গেলে বহু পারিপার্শ্বিক বুঝ আর ধৈর্য্য থাকতে হয়। আমি ভাবতাম, তোমার তা আছে। আজ তা ভুল লাগছে। মাজহার তোমার চাচাতো ভাই হওয়ার আগে, আমার প্রতিপক্ষ। তার সঙ্গে ঝামেলা হলে তুমি তোমার স্বামী অথবা ভাই, কার পক্ষে থাকবে সেটা তোমার বিষয়। কিন্তু আমি আমার গতিবিধি থেকে পিছপা হতে পারি না। রাজনীতিতে চলতে গেলে, বহু সম্পর্কে জবাই করে সামনে এগোতে হয় এক পা এক পা করে। তাই করে এগিয়েছি! তুমি জানোনা সেসব।ʼʼ 
-“তাহলে জয়কে জবাই করেননি কেন আজও? ওর সাথেকার সম্পর্ককে জবাই করবেন কবে?ʼʼ 
কপাল জড়িয়ে ফেলল হামজা, খানিক পরে ধাতস্থ হয়ে জবাব দিলো, “ও কখনও আমার পথে বাঁধা হয়ে আসেনি।ʼʼ 
-“আর যদি আসে?ʼʼ 
কিছুক্ষণ রিমির জেদি মুখের দিকে চেয়ে থেকে হেসে ফেলল হামজা, “তুমি দেখছি জয়কে নিজের সতিনের মতো হিংসা করো!ʼʼ 
একরোখা কণ্ঠে বলল রিমি, “তার চেয়েও খারাপভাবে। আমার ওকে সহ্য হচ্ছে না, একটুও না।ʼʼ 
-“কেন?ʼʼ 
-“ওর কাছে গিয়ে আপনি ভাগ হয়ে গিয়েছেন আমার থেকে। আজ আমার সাথে চোখ রাঙিয়ে, আমাকে শাসিয়ে কথা বলতে দ্বিধা করেননি। আর কিছু বললে গায়ে হাতও তুলতেন!ʼʼ 
এবার হামজা একটু সপ্রতিভ হলো। কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়িয়ে নরম সুরে নিজেকে উপস্থাপন করার সুরে বলল, “এতটা নিচু আর কাপুরুষ আমি কখনোই হতে পারব না যে, কোনো নারী, বিশেষ করে তোমার গায়ে হাত উঠবে। আর সবটাই ভুল ধারণা তোমার!ʼʼ 
অভিমানে জড়ানো কণ্ঠে বলল রিমি, “তাই হোক, তবে এই ভুল নিয়েই বাঁচতে চাই।ʼʼ 
-“এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তুমি।ʼʼ 
হামজা আজ বের হলো না। জয়কে কঠোর নিষেধাজ্ঞা দিলো। সকাল দশটা অবধি ঘরে বসে থেকে দম আটকে গেল জয়ের। তরু এসে দুবার দেখে গেছে। ওষুধ দিয়ে গেছে সকালে। 
ছাদে গিয়ে বসল। ছাদে দুটো বিভাজন। ছোট্ট এক টুকরো তরু চেয়ে নিয়ে ফুল গাছ লাগিয়েছে। বাকিটা ছাদটা জয়ের চিলেকোঠা, ছোটো আমগাছ, কবুতরের খাঁচা। 
তরু এসেছিল কয়েকবার দেখতে। শরীর ভাঙা। রোদে বসে আছে। 
তরু বলল “গোসল করবেন না? পানি ভরেছি।ʼʼ 
-“পরে করব। থাক।ʼʼ 
পা মেলে বসে বইয়ে চোখ বুলালো। গিটারটা তুলে নিয়ে গান গাইল, তো কখনও ঠান্ডা হয়ে পড়ে থাকা চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছে। 
তরু এসে জিজ্ঞেস করল, “শরীর খারাপ লাগছে?ʼʼ 
-“না। ঊনিশ শতকের মেয়েলোকের মতো ঘরবন্দি জীবন কাটাচ্ছি, তো শরীর আর মন আবার লুঙ্গিডান্স দেবে নাকি এই অবস্থায়! যা তো তুই! কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করিস না, মা! মেজাজ চটে যাচ্ছে যেকোনো কিছুতেই! যাহ!ʼʼ 
দুপুর দেড়টার দিকে এই শরীরেই বেরিয়ে পড়ল বাড়ি থেকে। সম্ভব নয় এভাবে ঘরে পড়ে থাকা। হামজা তখন ব্যথার ওষুধ খেয়ে ঘুমাচ্ছে নিজের রুমে। 
 
বেশ ভালো রোদ বেরিয়েছে দু'দিন বাদে। আগের দু'দিন সূর্যের তেজ কম ছিল। ক্লাস শেষে বিল্ডিং থেকে বের হয়ে শহীদ মিনারের সম্মুখে এসে দাঁড়াল অন্তূ। 
-“অন্তূ!ʼʼ 
পেছন ফিরে তাকাল অন্তূ। প্যান্ট-শার্টের ওপর সাদা রঙা বিশাল একটা শাল জড়ানো জয়ের শরীরে। উদ্ভট ব্যাপার। সাধারণত পরে লুঙ্গি। তাছাড়া কড়া রোদ বেরিয়েছে, তাতে চাদরের প্রয়োজন নেই। ঘৃণায় চোখ নত করল অন্তূ। 
জয় সামনে এসে দাঁড়াল, “তোমার নাম কে রেখেছিল?ʼʼ 
-“আপনার কাছে প্রয়োজনীয় কোনো টপিক থাকে না, তাই না? অবশ্য যুক্তিযুক্ত বিষয় আপনার সাথে যায়ও না!ʼʼ 
-“তুমি শালী চটকানা খাবা। থাপড়ে তোমার মুখের নকশা বদলে দিই, তার আগে প্রশ্নের উত্তর দাও!ʼʼ 
অন্তূ বিরক্তি গিলে চোখ বুজে বলল, “আব্বু রেখেছ। এখন আমি যাই?ʼʼ 
জয় যেন শুনতে পেল না শেষের কথাটা, “তোমার বাপ এই ভেটকি মার্কা নাম ছাড়া মুল্লুক ঘুরে আর কোনো নাম পায় নাই? অন্তূ, আরমিণ! কীসব বেওড়া নামের বাহার!ʼʼ 
অন্তূ নাক কুঁচকে তাকাল, বেওড়া কী? 
-“তখন গিয়ে শুধরে দিয়ে আসতেন, তা তো আর দেননি। এখন সেই পুরনো পুঁথি গাওয়ার মানে হয়না। কোনো প্রয়োজন আছে আমার সঙ্গে?ʼʼ 
চমৎকার ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল, “হু! আছে তো, সুইটহার্ট! তোমার সাথে বহুত প্রয়োজন আছে আমার। তবে আপাতত কথা আছে তোমার সঙ্গে।ʼʼ 
-“আমার সঙ্গে কী কথা আছে, আপনার?ʼʼ 
জয় পিছনের দলের উদ্দেশ্যে মুখ বেঁকিয়ে অসহায়ত্বের ভান করে বলল, “উফফ! কেউ বোঝা একে, আমার সাথে তেজ না দেখাতে। আমি ডিস্টার্বড হই খুব।ʼʼ 
অন্তূ তাড়া দিলো, “জলদি বলুন। আমার কাজ আছে।ʼʼ 
জয় নাক টানলো আবারও, গলার স্বর বসে গেছে, শুনতে আতিফ আসলামের মতো লাগছে কণ্ঠস্বর, “উহহু রে! এত হুটোপাটা করলে তোমাকে দেখতে আরও বেশি গরম লাগছে, সুইটহার্ট!ʼʼ 
-“সুইটহার্ট!ʼʼ 
কাধ ঝাঁকালো জয়, “ইয়াপ! সুইট-হার্ট! আমার সাপেক্ষে তুমি একখান সুইটহার্ট। আমি তো ভালো না। মাগায তোমার কাছে একটা সুন্দর, মিষ্টি হৃদয় আছে, সুতরাং তুমি সুইট-হার্ট অথবা মিষ্টি-হৃদয়!ʼʼ 
অন্তূ তাচ্ছিল্য হাসল, “সেই সূত্র অনুসারে তো আমি সকলেরই সুইট-হার্ট!ʼʼ 
জয় হুট করে দাঁতে দাঁত পিষলো, “জানে মেরে ফেলব, খালাস হয়ে যাবে একদম দুনিয়া থেকে, আমি বাদে তুমি আর যার যার সুইটহার্ট! আমি ডেকেছি এই নামে, সুতরাং শুধুই আমি ডাকব।ʼʼ 
নিজস্বতা দেখানোর এই ভঙ্গিমাটাও কেবলমাত্র জয়ের রসিকতারই অংশ, বুঝে অন্তূ চুপ রইল। 
-“চলো! কোথাও বসি!ʼʼ 
অন্তূ হাসল, “আপনার মাথা নষ্ট, সিনিয়র।ʼʼ 
ঘাঁড় নেড়ে সম্মতি জানায় জয়, “ঠুকছো সিস্টার! তা একটু আধটু অবশ্যই! তাই বলে তুমি খোঁটা দিতে পারো না 
আমায়!ʼʼ 
অন্তূ সুন্দর করে হাসল, “নাটক শেষ হয়েছে আপনার? শো শেষ হলে এবার আমি যাই?ʼʼ 
জয় মাড়ির দাঁতে জিহ্বা ঠেকিয়ে হাসল, “নাটক ভালো লেগেছে তোমার? ভালো লাগলে আর একটু করি!ʼʼ 
-“খুব বাজে ছিল!ʼʼ 
জয় ঘাঁড় চুলকালো, “হু! শুনেছিলাম, প্রেমে পড়লে মানুষের মেধা হারিয়ে যায়। আমারও নাটক কথার গুণ হারিয়ে গেছে, তোমার প্রেমে পড়ে। উফফ! কী যে প্রেম প্রেম পাচ্ছে তোমায় দেখে! ইচ্ছে করতেছে, দাঁত চোপড়ার স্ট্রাকচার বদলে দিই। এত প্রেম কেন তোমার মধ্যে? প্রেমের গোডাউন যেন!ʼʼ 
জয়ের নাটক দেখে অন্তূর ঘৃণার উদ্রেক হওয়ার সাথে সাথে হাসিও পেল। একটা মানুষ কতটা খারাপ মানসিকতার হলে কাউকে জ্বালাতন করতে এমন বাজে পন্থা অবলম্বন করতে পারে? 
শহীদ মিনারের সিঁড়ির ওপর বসল জয়। বসার সময় চাদর উঠে যাওয়ায় ক্ষত দেখা গেল। পৈশাচিক এক আনন্দ হলো অন্তূর। 
-“আরমিণ!ʼʼ 
-“হু!ʼʼ 
-“চলো বিয়েশাদী করে ফেলি! কত বয়স হয়ে গেল আমার, কতকাল একা ঘুমাব অত বড় বিছানায়?ʼʼ 
অন্তূ অতি ধৈর্য্যের সাথে হাসল, “ভাবনাটা ভালো। তবে সব ভাবনা বাস্তবায়িত করতে হবে কেন?ʼʼ 
-“ভাবনা বাস্তবায়িত না করলে চলে। কিন্তু, চাহিদা! সেটা পূরণ না করলে কী করে চলবে?ʼʼ 
ঠোঁট উল্টে সায় দিলো অন্তূ, “যুক্তি আছে যুক্তিতে! এই সৌভাগ্য আমার কোনো নেকির ফল, যে আমি আপনার চাহিদা হয়ে উঠেছি!ʼʼ 
জয় বেশ উৎসাহিত কণ্ঠে বলল, “এক্সাক্টলি! কোনো না কোনো নেকির কাজ তো করেছিলেই জীবনে, এজন্যই তো আমি তোমার প্রেমে মজে যাচ্ছি দিন দিন। কী জাদুটাই করলে, শালী তুমি! মেরে ফেলো আমায়!ʼʼ 
কবীর একটু নড়েচড়ে উঠল এবার, কাশল গলা খাঁকারি দিয়ে। জয় দ্রুত পিছে ফিরল, “কী রে! তুই আবার অস্ত্র বের করছিস নাকি? আরে শালা, প্রেমিকার প্রেমে মরা আর তোর মতো ব্রয়লারের অস্ত্রের আঘাতে মরা এক না রে পাগলা! তার ওপর প্রেমিকার সামনে তোর হাতে জখম হয়ে মরলে মান-ইজ্জত কিছু থাকবে?ʼʼ 
অন্তূ জিজ্ঞেস করল, “আপনার জরুরি কথাটা বললেন না এখনও!ʼʼ 
-“আ'লাভিউ! প্রেমে পড়ে যাও আমার!ʼʼ 
অন্তূ হাসল, “এই জনমে তো না!ʼʼ 
-“পরের জনম অবধি অপেক্ষা করতে বলছো?ʼʼ 
-“জি, একদম! যেটার কোনো অস্তিত্ব নেই।ʼʼ 
-“তাহলে তো যা হওয়ার আর করার, এই জনমেই করতে হবে।ʼʼ 
-“এত খারাপ দিন আমার জীবনে কোনোদিন আসবে না।ʼʼ অন্তূর শীতলভাবটা কেমন ন্যাপথলিনের টুকরোর মতো বাষ্প হয়ে যাচ্ছে যেন, কড়া হয়ে উঠছে কণ্ঠস্বর। 
জয় উঠে দাঁড়াল, “তোমার জীবনে এত ভালো দিন আমি রাখব না যে, তুমি আমায় ভালো না বেসে পার পাবে! চ্যালেঞ্জ কোরো না আমায়। আমি সিরিয়াস হয়ে গেলে খুব বাজেভাবে ফেঁসে যাবে!ʼʼ 
কথাটা দারুণ প্রভাবিত করল অন্তূকে। কর্কশ গলায় বলে উঠল, “ধরুন, চ্যালেঞ্জ করলাম! এতটুকু দৃঢ়তা তো আমার এই আমি'র ওপর রাখি আমি যে, এমন কোনো দূর্বলতার অস্তিত্ব নেই এই জগতে, যেটা আপনার মতো সভ্যতাহীন, আদিম পশুকে ভালোবাসতে বাধ্য করতে পারে আমায়! যেখানে স্বয়ং মৃত্যুকে আমি চ্যালেঞ্জ করছি এর পেক্ষিতে। মরণ স্বীকার করলাম আপনার কথার বিপরীতে।ʼʼ 
সতর্ক করার মতো করে করে শান্ত স্বরে বলল জয়, “আরমিণ, তোমার এসব কনফিডেন্স আমায় আবার সিরিয়াস না কোরে তোলে, দেখো!ʼʼ 
অটল হলো অন্তূর কণ্ঠস্বর, “আপনার এই কথাটাই আমার জিদের আগুনে কেরোসিনের দ্রবণ ঢালছে।ʼʼ 
-“খুব খারাপভাবে হারবে, তুমি!ʼʼ 
-“খুব ভালোভাবে পিছু হটবেন আপনি। আমার মান-মর্যাদা ও সম্মান ছাড়া আমার এই গোটা জীবনে দ্বিতীয় কোনো পিছুটান বা দূর্বলতা রাখিনি আমি।ʼʼ 
জয় আর কথা বলল না। চমৎকার মুচকি হাসল। 

চলবে... 
written by: তেজস্মিতা মুর্তজা 
 

Olindo Rahman

Olindo Rahman

A good book is worth a hundred good friends. 
But a good friend is equal to a library.!! 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Your experience on this site will be improved by allowing cookies Cookie Policy