Buy Now

Search

রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি [পর্ব-০১]

রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি [পর্ব-০১]

|চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়,অডিটোরিয়াম কক্ষ, বেলা:১১টা|
"রাজনীতিতে আমার গভীর এলার্জি। রাজনীতি যারা করে তাদের উপর আরো বেশি এলার্জি। একদম ইলিশ মাছ খেলে যেমন গায়ে লাল লাল কুঁড়ি দেখা দেয় ঠিক সেরকম। এই যে দেখো, আমার হাতে অলরেডি লাল লাল ভাব ফুটে উঠেছে।"
"কিন্তু মিস সাবরিনা শেহরিন অনিভা এখনো তো উনারা কেউ এসে পৌঁছাইনি। এর মধ্যেই তোমার হাতে লাল লাল আভা দেখা দিলো কেন ?"
"আসেনি তো কি? আসছে তো। আমি স্মেল অনুভব করতে পারছি দূর থেকেই। আমার ঘ্রাণশক্তি প্রখর ঋতমা।"
"কি রকম স্মেল অনুভব করছো তুমি?"
শেহরিন ক্লান্ত ভঙ্গিতে চেয়ারে গা এলিয়ে দেয়। মুখের উপর ছড়ানো চুলগুলো বাম হাত দিয়ে সরিয়ে বলে,"একটা পঁচা স্মেল অনুভব করছি। কিউরিং প্রক্রিয়ায় যখন ছাদের কলামে বিমে কচুরিপানা দেওয়া হয় এবং সেটা একসময় রোদে শুকিয়ে গেলে কেমন একটা স্মেল বের হয় ঠিক সেরকম।"
"ইয়ে..ওয়াক কি বলছো তুমি? "
শেহরিন চোখ খুলে ঋতমার নাক সিটকানো দেখে। আড়চোখে তাকিয়ে বলে, "পঁচা স্মেল হলেও এভাবে নাক সিটকানো উচিত নয় ঋতমা। উড বি ইঞ্জিনিয়ার আমরা। আর কিউরিং একটা পরিবেশ বান্ধব পদ্ধতি।"
"তাই বলে একজন স্বনামধন্য এমপির গায়ের স্মেলের সাথে এটা তুলনা করবে?"
"স্বনামধন্য? ভেরি ফানি! তুমি কি ভাবছো? যে এমপি আসছে সে সিনেমার পর্দার মতো হ্যান্ডস্যাম, স্মার্ট,গুড লুকিং হবে? যাকে দেখলেই মেয়েরা ক্রাশ খাবে। পিছু পিছু ছুটবে। মোটেও নয়। এই এমপি হবে কালা মানিক। ইয়ে বড় ভুঁড়ি, রঙিন কটকটে পাঞ্জাবি পড়ে আসবে। হলুদ দাঁত বের করে মঞ্চে উঠে হাত নাড়বে। ঘন্টা ধরে কবিতা আবৃত্তি করবে।"
ঋতমা অবাক চোখে তাকায় শেহরিনের দিকে। গোল গোল চোখ করে তাকিয়ে বলে, "তুমি দেখেছো এই এমপিকে?"
"না দেখলে এতোটা শিউর হয়ে বলতাম? "
"হুহ। আগে বলবা না? চলো উঠে যাই তাহলে। ভুঁড়িওয়ালার বক্তব্য শুনে আমাদের কি কাজ? "
শেহরিন ঠোঁট কামড়ে মুচকি হাসে। উদ্দেশ্য হাসিল। চেয়ারের সাথে ঝুলানো হ্যান্ডব্যাগটা কাঁধে তুলতে তুলতে বলে,"এতোক্ষণে তোমার মস্তিষ্ক সজাগ হলো।"
"চলো ক্যান্টিনে যাই।"
"যাওয়া যাক।"
শেহরিন ঋতমা অডিটোরিয়াম কক্ষ হতে বের হয়ে আসে। চুয়েটের গোটা সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সামনে আজ অন্যরকম সাজ সাজ রব। লাল গালিচা বিছানো। ফটকে ফুল দিয়ে সাজানো তোরণ। বিভাগের শিক্ষক শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে প্রশাসনিক কর্মকর্তা, সকলের চোখে মুখে এক দারুণ উচ্ছ্বাস।
"কালা মানিকের জন্য এতো আয়োজন? "
"একেই বলে রাজনীতি। শোনো ঋতমা, লাইফে কখনোই এসব নেতা পেতাদের চুজ করবে না। এদের মাথায় প্রকৃত পক্ষে থাকে গোবর। টাকা আর ক্ষমতা দিয়ে সেই গোবরকে সবার সামনে বুদ্ধি হিসেবে শো করে। "
"ঠিক বলেছো।বাট...
ঋতমার কথা শেষ হয় না তার আগেই তিনটে সাদা কালো রঙের গাড়ি ধূলো উড়িয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে। সরাসরি এসে থামে সিভিল ইন্জিনিয়ারিং বিভাগের সামনে। ক্যান্টিনে যাওয়া পথ থেমে যায় দুজনের।
"ওয়েট কালা মানিক কে একটু দেখে যাই।"
শেহরিন কপাল কুঁচকায়। চোখ সরু করে তাকিয়ে বলে,"আমাকে যে পিক করতে আসে ড্রাইভার মোজাম্মেল আংকেল তাকে দেখেছো?"
"হু দেখেছি। কিন্তু কেন?"
"এটা মোজাম্মেল আংকেলের কার্বন কপি। মোজাম্মেল আংকেলের আর কি ভুঁড়ি? তার চাইতে এই লোকের আরো বেশি।"
"সত্যি বলছো?"
"আমি কি মিথ্যা বলি?"
সামনের গাড়ি হতে দু'জন সিকিউরিটি গার্ড নেমে এসে কালো রঙের গাড়িটার নিকটে। দক্ষীয় কায়দায় গাড়ির দরজা খুলতেই ভিতর হতে বেরিয়ে আসে সাদা পাঞ্জাবি পরিহিত এক মধ্যে বয়স্ক পুরুষ। যার মাথার টাকে সরাসরি দুপুরের রোদ্দুর এসে ঝিলিক দিয়ে যায়। বেশ ওজনের ভুঁড়ি সামলে হাসিমুখে কুশল বিনিময় করে সবার সাথে।
"মিলেছে আমার কথা?"
ঋতমা হতাশার নিঃশ্বাস ছাড়তেই শেহরিন হাত চেপে ধরে। ক্যান্টিনে যাওয়ার জন্য অগ্রসর হতে হতে বলে,"ক্ষুধায় আমার পেটে ইঁদুর লাফাচ্ছে। আর এক মুহুর্ত দেরি নয়। রান ফাস্ট্।"
"শেহরিন !! "
"নো।"
"শেহরিন ওয়েট ওয়েট। লুক। "
ঋতমা উল্টো শেহরিনের হাত টেনে ধরতেই শেহরিন পিছু ঘুরে তাকায়।রাজ্যের বিরক্তি মুখে জুড়ে এনে বলে,"কি?"
"দেখো।"
শেহরিন ঋতমার চোখের দিকে দৃষ্টি মেলে ফটকের দিকে তাকায়। গাড়ি হতে বের হয়ে আসা এক মানবকে দেখে সে সেদিক পানে চক্ষুস্থির করে।
"এতো সাদা মানিক। মেদহীন চিবুক। ভুঁড়ির কোনো দেখা নেই। সাদা চকচকে দাঁত সাথে সাদা পাঞ্জাবি। বলিষ্ঠ, সুঠাম দেহ। হ্যান্ডস্যাম,স্মার্ট, গুড লুকিং ওয়াও..।"
"এ..এটা মনে হচ্ছে কম্পাউন্ডার।"
ঋতমা ছোট ছোট করে তাকায় শেহরিনের দিকে। দু'হাত কোমড়ে চেপে চিকন কন্ঠে বলে,"মোটেও নয়। এটাই হচ্ছে সেই এমপি মহোদয়। দেখতে পাচ্ছো না ডিনস্যার, ডিপার্টমেন্ট হেড স্যারের সঙ্গে কিভাবে কুশলাদি করছে? তাকে কিভাবে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাচ্ছে। যা তোমার বর্ননার সঙ্গে সম্পূর্ণ অমিল এবং বৈসাদৃশ্য।"
"আমার মনে হচ্ছে..
" তোমার কিচ্ছু মনে হচ্ছে না শেহরিন। ক্যান্টিন পরে। আগে এই সুর্দশন এমপির কবিতা আবৃত্তি শুনবো চলো..."
------------------------------------------------------------
চট্টগ্রাম -২ আসনের সংসদ সদস্য সান্নিধ্য শাহজাদ খান। ছোটোবেলা হতেই রাজনৈতিক পরিবারেই যার বেড়ে উঠা। বাবা শাহজাহান খান ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র। বর্তমানে তিনি অবসরে থাকলেও দুই ছেলের মধ্যে ছোট ছেলে নেমেছেন রাজনৈতিক মাঠে। দাপিয়ে করছেন রাজনীতি। শান্ত,বুদ্ধিদীপ্ত চোখ তার আত্নবিশ্বাসের কথা বলে। পরনে মিনিমালিস্টিক সাদা পাঞ্জাবি, মুখোরেখায় হালকা গোঁফ, খোঁচা খোঁচা দাঁড়িতে সুর্দশন পুরুষের তালিকায় নাম লিখিয়েছেন অনায়াসে।
মূলত আজ তিনি চুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের নবনির্মিত "আধুনিক ভূমিকম্প প্রতিরোধক গবেষণা ল্যাবরেটরি" পরিদর্শনে এসেছেন। যার ভিত্তিপ্রস্তর তিনি গত বছর স্থাপন করেছিলেন। সুদক্ষ পর্যবেক্ষণ ও প্রাথমিক আলাপচারিতা শেষে তাকে সাদরে আমন্ত্রণ জানানো হয় অডিটোরিয়াম কক্ষে।
ঘড়ির কাঁটায় যখন সাড়ে এগারোটা পেরিয়ে বারোটা ছুঁই ছুঁই ঠিক তখন শুরু হয় সেই বহু প্রতীক্ষিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। অথচ পিছন ব্যানারে এই অনুষ্ঠানের সময়সীমা দেওয়া আছে সকাল দশটা।
"আমার এখানে ফায়ারিং ক্যাম্প করতে ইচ্ছে করছে। সব জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দিতে ইচ্ছে করে। অসহ্য।"
"সব জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিলে তো তুমিও ছাই হয়ে যাবে।"
"বোকা মেয়ে। আমি আগে আগে বের হয়ে দরজা লাগিয়ে দিয়ে চলে যাবো।"
"ক্ষুধায় তোমার মাথা নষ্ট হয়ে গিয়েছে শেহরিন। উল্টো পাল্টা বকছো।"
শেহরিন ব্যাগ হতে মাথা তোলে। গালের নিচে দু'হাত ঠেকিয়ে আঁড়চোখে তাকিয়ে বলে, "সেটা যখন বুঝতেই পেরেছো তাহলে কেন নিয়ে এলে আমাকে আবার এখানে? জানো ছিয়াত্তরের মন্বন্তর এর মতো আমার পেটে দূর্ভিক্ষ চলছে।"
"কাম অন মেরি বাচ্চা। এমপি সাহেবের দিকে তাকাও একবার, ক্ষুধা ভ্যানিশ হয়ে যাবে।"
শেহরিন নিস্তেজ চোখজোড়া তুলে নজর দেয় সামনে। কিয়ৎসেকেন্ড তাকিয়ে থেকে হাই তুলে বলে,"ক্ষুধার কারণে দূর হতে অস্পষ্ট দেখছি। হবে হয়তো ফার্মের মুরগি। বাই দ্যা ওয়ে,এমপি সাহেবের কবিতা আবৃত্তি শেষ হলে ডাক দিয়ো কেমন। গুড নাইট।"
ঋতমা হতাশা চোখে তাকায় শেহরিনের পানে। এ মেয়ের সত্যি ক্ষুধায় পাগল হয়ে গিয়েছে। যাই বলবে উল্টো ধরে বসবে। তার চেয়ে থাকুক সে তার মতো।
পিনপতন নিরবতা। ডিন স্যারের সংক্ষিপ্ত বক্তব্য শেষে ডাক আসে এমপি মহোদয়ের বক্তব্য প্রদানের জন্য। পাঞ্জাবি ঠিক করে টান টান হয়ে সুস্থির ভঙ্গিতে লেকটার্নে আসে এমপি সাহেব। গম্ভীর মুখে হালকা হাসির রেশ টেনে সুস্পষ্ট স্বরে বলে,
"বিভাগীয় প্রধান, শিক্ষক মণ্ডলী, শিক্ষার্থীরা এবং উপস্থিত সুধীবৃন্দ,"আসসালামু আলাইকুম, শুভ দুপুর।"
"আজ চুয়েটের এই সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে এসে আমি সত্যিই অভিভূত। গত বছর এই অত্যাধুনিক ভূমিকম্প প্রতিরোধক গবেষণা ল্যাবরেটরির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করার সময় যে স্বপ্ন দেখেছিলাম, আজ তা বাস্তবে রূপ নিতে দেখে আমার অনেক ভালো লাগছে। আমরা জানি, বাংলাদেশ একটি ভূমিকম্প প্রবণ অঞ্চল। আমাদের অবকাঠামোকে ভবিষ্যতের যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত রাখা অত্যন্ত জরুরি। আর এই প্রস্তুতিতে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারদের ভূমিকা অপরিসীম।
আমি বিশ্বাস করি, এই ল্যাবরেটরি শুধু গবেষণার একটি কেন্দ্রবিন্দু হবে না।এটি হবে আমাদের তরুণ প্রকৌশলীদের স্বপ্ন বোনার এক উর্বর ভূমি। এখান থেকে অর্জিত জ্ঞান এবং উদ্ভাবন আমাদের দেশের প্রতিটি ইঞ্চি মাটিকে আরও নিরাপদ, আরও মজবুত করে তুলবে। আপনারা যারা আজ এখানে আছেন আপনারাই আমাদের ভবিষ্যৎ। আপনারা মেধা, শ্রম আর সৃজনশীলতা দিয়ে গড়ে তুলবেন আগামীর বাংলাদেশ।
সান্নিধ্য থামে। কিছু সেকেন্ডের বিরতি নিয়ে ফের ভারী কন্ঠে বলে,
"প্রিয় শিক্ষার্থীরা, মনে রাখবেন, একজন প্রকৌশলী শুধু ইটপাথরের কাঠামো তৈরি করেন না। তিনি দেশের অর্থনীতি এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সরাসরি অবদান রাখেন। আপনাদের তৈরি করা প্রতিটি সেতু, প্রতিটি ভবন, প্রতিটি রাস্তা শুধু যোগাযোগ বা বাসস্থানের মাধ্যম নয়, সেগুলো আমাদের জাতীয় অগ্রগতির একেকটি স্তম্ভ।
সরকার শিক্ষাক্ষেত্রে, বিশেষ করে প্রকৌশল শিক্ষায় বিনিয়োগে বদ্ধপরিকর। আমরা চাই, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা আন্তর্জাতিক মানের হোক।আমাদের শিক্ষার্থীরা যেন বিশ্বমানের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারে। আমি আপনাদের আশ্বস্ত করতে চাই, এই ধরনের উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে আমাদের সহযোগিতা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
আজকের এই ল্যাবরেটরি উদ্বোধন আমাদের যাত্রার একটি মাইলফলক।আপনাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করে আমি আমার বক্তব্য শেষ করছি।লম্বা সময় নেওয়ার জন্য দুঃখিত।
সবাইকে দেখে মনে হচ্ছে ভীষণ ক্লান্ত, অনেকে ঘুমিয়ে পড়েছে।
এনিওয়ে,ধন্যবাদ সবাইকে।"
শেষ বাক্য কর্ণকুহরে যেতেই শেহরিন তড়াক করে ব্যাগ হতে মাথা তোলে।ঋতমার দিকে গোল গোল চোখ করে তাকিয়ে বলে, "আমাকে বললো?"
"তুমি ছাড়া এমন মুচড়া মুচড়ি করে কে ঘুমাচ্ছে বলো?"
"ব্যাটা দেখলো কিভাবে?"
"ব্যাটার সামনে লাগানো দুটো চোখ দিয়ে। আর হ্যাঁ,তুমি বললে কবিতা আবৃত্তি। এটা কবিতা আবৃত্তি??"
"তোমার ভালো লেগেছে?"
"শুধু ভালো?আমি তো স্পিচলেস। এতো সুন্দর করে গুছিয়ে কথাগুলো বললো। উফ্ মনে হচ্ছে আরো শুনি।"
"এগুলো তার মুখস্থ বিদ্যা। শুধু জায়গা আর স্থানের নাম পরিবর্তন করে।স্ক্রিপ্টেড! হু।"
"তুমি ভালো হবা না শেহরিন। চলো এবার যাই।"
_______________________________________
রাউজান উপজেলার পাহাড়তলি ইউনিয়ন। চুয়েটের অবস্থান। বলা হয় একে গ্রিন হ্যাভেন। চারপাশে সবুজ অভয়ারণ্যে আর ছোট ছোট পাহাড়ি টিলা।যতদূর চোখ যায় শুধু সবুজে ঘেরা। এক অপূর্ব সৌন্দর্যতায় মোড়ানো চট্টগ্রামের এই উপশহরটি। নির্মলতার আবেশে পরিপূর্ণ।
কর্ণফুলী নদী ঘেঁষে মহাসড়কে যেতে যেতে গাড়ি থেমে যায়। বের হয়ে আসে মোজাম্মেল আংকেল সাথে শেহরিন। বাসায় ফেরা পথে আবারো দূর্ভোগ।কাল রাতে ঝড়ে একটা বড় শালগাছের ডাল রাস্তার মাঝপথে পরেছে।সকালে ভার্সিটিতে যাওয়ার সময় এজন্য উল্টো পথে ঘুরে গিয়েছিলো।ভেবেছিলো এতোক্ষণে হয়তো সরিয়ে নিয়েছে। তা যেই লাউ সেই কদু।সরিয়েছে আর কোথায়?
"ঐ রাস্তার দিকে যাইতে কইলাম তোমারে। অহন দেখছো তো, বড়গের কতা না শুনলে কি অয়।"
শেহরিন চারপাশে তাকিয়ে আরো কয়েকটা গাড়ি দেখে বলে,"শুধু আমি একা না আংকেল আরো অনেকেই আমার মতো কথা শোনেনি হয়তো।"
"অহন কি করবা?"
"কি করবো?এই হলো আমাদের দেশের রাজনীতির খেল। মুখেই শুধু বড় বড় বুলি কাজের কাজ কিছুই নেই। আরে বাবা,শুধু স্ক্রিপ্টেড বুলি আওড়ালেই কি নেতা হওয়া যায়?এগুলো কাজ করবে কে? এমপি সাহেবের কি এগুলো চোখে পড়ে না?"
"কিয়া অইয়ে?মাথা গরম কিয়ারে মা?"
"মাথা গরম হবে না? নয়টা হতে একটা পর্যন্ত আজকে ভার্সিটিতে বসিয়ে রেখেছে আংকেল এই এমপি মহোদয়ের জন্য। চিন্তা করতে পেরেছেন কতটা সময়। ক্ষুধায় আমায় জান শেষ। এদিকে এমপি সাহেব লাপাত্তা। এলো সেই বারোটায়। কি একটু কবিতা আবৃত্তি করেই শেষ। নিজেরা তো ঠিকই নাস্তা করে বের হলো। আমাদের কি কাঁচকলা দিলো?"
"ভেরি অন্যায়।"
শেহরিনের হতে মাত্র কয়েকহাত দূরত্বে দাঁড়ানো গাড়ির আধখোলা উইন্ডো ধীরে ধীরে পুরোটা নেমে যায়। চোখে কালো সানগ্লাস পরিহিত মানবটি ফোন হতে দৃষ্টি তুলে বাইরে নজর দেয়। কপালে তার মৃদু ভাঁজরেখা। মুখে একগাদা গম্ভীরতার রেশ। রমণী কন্ঠে বলা মাত্র কথাগুলো তার শ্রবণে নির্বিঘ্নে দিয়ে ফেলেছে হানা।
কিন্তু সেই দূর্দান্ত রমণীর মুখখানা দেখার আগেই সে আড়াল হয়ে যায় অপর পাশে। কারণ ইতিমধ্যে সামনে হতে গাছের ডাল তুলে ফেলা হয়েছে।
"আসিফ।"
"জ্বি ভাই।"
"নাস্তা নিয়ে এসেছো সাথে?"
"রিমন এনেছে ভাই।"
"রিমনকে বলো সামনে চলা গাড়িটাকে থামিয়ে যতগুলো নাস্তার প্যাকেট আছে দিয়ে আসতে।"
"ভাই.."
" কল হিম কুইক।"
আসিফ ঠোঁটে ঠোঁট চেপে নিজেকে সন্তপর্ণে নিয়ন্ত্রণ করে। মেয়েটার কথাগুলো তারও শ্রবণে পৌঁছেছে। তবে ভেবেছিলো এমপি সাহেব অন্যরকমভাবে অ্যাকশন নিবে। এভাবে উদারতা দেখিয়ে যে নাস্তা বিলি করবে সেটা বোধগম্য হয়ে উঠেনি।
চলন্ত পথে আবারো ব্রেক কষতে হয় মোজাম্মেলকে। এবার সামনে মগডালের বদলে এসে পড়েছে চার চাকার গাড়ি। পিছনে সিটে বসা শেহরিন হুট করে ব্রেক কষাতে সামনের সিটের সঙ্গে বেখেয়ালিভাবে খায় ধাক্কা। ঠোঁট মুখ কুঁচকে ফেলে সে সঙ্গে সঙ্গে।
"এক্সকিউজ ম্যাম।"
মাঝরাস্তায় উইন্ডোর পাশে এসে দাঁড়ানো পুরুষ মানুষকে দেখে শেহরিন স্তিমিতনেত্রে তাকায়। মনের মধ্যে সামান্য ভয়ের রেশ জেঁকে ধরে। হয়তো চাঁদাবাজ কিংবা সন্ত্রাসী হবে। এক্ষুণি বলবে যা কিছু আছে দিয়ে দে নয়তো চাকু চালিয়ে দিবো সরাসরি।
ক্রমাগত নকে শেহরিন ভয়ে ভয়ে উইন্ডো নামায়। নির্লিপ্ত চাহনিতে তাকিয়ে বলে, "ভাইয়া আমার কাছে কিছু নেই। পাঁচশো টাকার একটা নোট আছে নিবেন?"
রিমন শুরুতেই ভ্যাবাচ্যাকা খায় শেহরিনের কথায়। গলার স্বর পরিষ্কার করে বলে,"ভুল বুঝছেন ম্যাম ।আমি সন্ত্রাস সম্প্রদয়ের কেউ নই। স্যার আপনার জন্য নাস্তা পাঠিয়েছেন। পিক করুন।"
"স্যার??খাবার??"
"জ্বি।"
"কোন স্যার? গাজী আহসানুল কবির স্যার?"
"মানে?"
"মানে বেসিক ইলেকট্রিক্যাল ইন্জিনিয়ারিং ক্লাস নেয় যে আমাদের।"
রিমন দীর্ঘ শ্বাস ফেলে। কন্ঠস্থির করে বলে,"আপনার তো দেখছি সত্যি ক্ষুধায় মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে। এটা সান্নিধ্য স্যার মানে এমপি স্যার আপনাকে পাঠিয়েছে ম্যাম।"
শেহরিনের চোখজোড়া বিস্ময়ে ঢেকে যায়। অবাক কন্ঠে শুধায়,"আমাকে? কেন? কি কারণে?"
"কারণ আজকের সেমিনারে আপনি ছিলেন সবচেয়ে মনোযোগী শ্রোতা।স্যারের কবিতা আবৃত্তি এতো আগ্রহ নিয়ে শুনেছেন দেখে স্যার খুশি হয়ে আপনাকে এই সামান্য নাস্তা উপহার হিসেবে পাঠিয়েছেন।"
"সত্যি বলছেন???"
"ম্যাম মিথ্যা বলবো কেন? প্লিজ একটু তাড়াতাড়ি করুন। রাস্তার মাঝে গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখা।"
শেহরিন দেনামোনা করতে থাকে। বুঝতে পারে না নেওয়া উচিত কি না। তার হাবভাব দেখে রিমন পকেট হতে একটা কার্ড বের করে দেখিয়ে বলে,"সান্নিধ্য স্যারের অ্যাসিস্টেন্ট।"
কার্ড খানা দেখামাত্র মনের মধ্যে কিছুটা শক্তি ফিরে পায় শেহরিন। নিশ্চিত হয় সামনে দাঁড়ানো ব্যক্তিটি ফাঁদে ফেলানো কোনো হাইজ্যাক গোষ্ঠী নয়। মুখে জোরপূর্বক হাসি টেনে সে নাস্তার প্যাকেটটা রিসিভ করে।
"থ্যা..থ্যাংকস। আমি আসলে খাবার জিনিসটাকে অবমূল্যায়ন করি না।বাবা শিখিয়েছে। তাই নিলাম।"
"অশেষ ধন্যবাদ ম্যাম।"
"আচ্ছা শুনুন ভাইয়া একটা কথা,আমি বুঝতে পেরেছি আমার অমনোযোগী ভাবটা এমপি সাহেব ধরতে পেরেছেন জন্য আলাদাভাবে অ্যাপায়ন করার ব্যবস্থা করেছেন। সেটা কোনো ব্যাপার নয়। বাট কবিতা আবৃত্তি একদম স্ক্রিপ্টেড ছিলো। এইভাবে কি রাজনীতি হয় বলুন?"
"রাজনীতি আপনার পছন্দ নয়? "
"আই হেইট রাজনীতি লাইক আ কাঁঠাল।"
"বুঝতে পেরেছি।"
"ওকে থ্যাংকস এগেইন। আসি।"
মোজাম্মেল আংকেল গাড়ি স্টার্ট করে। গাড়ি চলে যেতেই
রিমন দু'হাত কোমড়ে চেপে উজবুকের ন্যায় দাঁড়িয়ে থাকে কতক্ষন। অতঃপর উদ্দাম নিঃশ্বাস ফেলে বলে, "তাই বলে কাঁঠালের মতো? স্যারকে বলবো? না থাক,স্যার শুনে ডিপ্রেশনে চলে যাবেন তাহলে।"
_________________________________________
|হালিশহর,চট্টগ্রাম,বিকাল চারটে |
সুখনিবাস। সাদাপাথরে ঘেরা ডুপ্লেক্স বাড়ি। বিশাল এরিয়া নিয়ে সজ্জিত পরিপাটি বাসভবনের সামনে সারি সারি ঝাউ আর রঙ্গন ফুলে ঘেরা।মনোরম, স্নিগ্ধ পরিবেশ।
"স্যার রাত আটটায় কার্যালয়ে মিটিং টা কি কনফার্ম করবো?"
"হ্যাঁ।"
" আজকে তো অনেক চাপ হয়ে যাচ্ছে আপনার ।"
" সমস্যা নেই কাজগুলো কম্পিলিট করতে হবে সময়ের মধ্যেই। নেক্সট যে পরিকল্পনাটা হাতে আছে সেটার মূল ডকুমেন্টস সহ সব কাগজপত্রগুলো জমা করবে।"
"জ্বি স্যার।"
সান্নিধ্যর গাড়ি অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। আজকের মতো মোটামুটি সকল সেমিনার মিটিং সম্পাদন শেষে তার এই বেলাটুকু অবসর মিলেছে। পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে ক্লান্তি মাখা মুখ নিয়ে বাসায় ঢোকে সে। উপরতলার সিঁড়িতে পা রাখা মুহুর্তে ড্রয়িংরুমের কোনো এক পাশ হতে বাচ্চাসুলভ কন্ঠে ভেসে আসে,
"ইয়ো সানি নাকি?"
সান্নিধ্যর পদযাত্রা থামে। ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক সেদিক তাকাতেই দেখতে পায় হ্যাংলা পাতলা ফর্সা এক হাঁটুর বয়সী বালককে। যে কিনা বর্তমানে ড্রয়িংরুমের সোফার তলে অবস্থান করছে। ক্লাস থ্রি তে অধ্যায়ন করা এই বালককে বলা হয় দুষ্টের শিরোমণি। দুষ্টামির দিক থেকে সে এতোটাই বিখ্যাত যে বাড়ির সবাই চিন্তায় আছে গিনেস বুকে নাম উঠতে হয়তো তার সময়ের ব্যাপার। সান্নিধ্যের সম্পর্কে সে অতি নিকটাত্মীয়। একমাত্র ভাতিজা।বড় ভাইয়ের পুত্র।
"সান্নিধ্য কখন এলি বাবা?"
"আম্মা ওইটা ওখানে কি করছে?"
নাজনীন বেগম সান্নিধ্যর চোখের দিকে দৃষ্টিপাত রেখে অতঃপর তাকায় সোফার নিচের দিকে। অবাক কন্ঠে বলে,
"একি দাদুভাই। ওখানে কেন?"
পোকা সমৃদ্ধ দাঁত বের করে তাসিন হাসে। চিকন সুরে বলে,"ইয়ো সানি পানিকে দেখতে এসেছি।"
সান্নিধ্য মায়ের দিকে তাকায়। থমথমে গলায় বলে,"আম্মা... "
"শান্ত হও শান্ত হও।আমি বকে দিচ্ছি।"
"আমি কি ছোটো ? "
"ছোট কেন হবে? বিয়ের বয়স পার দিচ্ছো তুমি বাবা।"
"আম্মা আমি সেটা বলছি না। এই বেবি মানকিটা আমার মান সম্মান কিছু রাখবে না। সে আমার দলীয় নেতা-কর্মীদের সামনে এসব নামে ডাকে।"
"দাদুভাই চাচ্চুকে এসব নামে ডাকতে হয় না।"
"চাচ্চুর নাম তো সানি।"
"সানি নয় সান্নিধ্য।"
"কঠিন নাম।আমি পারি না বলতে।"
সান্নিধ্য কনুই অব্দি পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে এগিয়ে যায় সোফার কাছে। হাঁটু ভেঙে বসে বেবি মানকিটাকে টেনে বের করে বলে,"আমার নাম ধরে তোকে ডাকতে বলেছে কে?"
"দাদিমা..."
"আর ডাকবি? "
"সা..সানি বললে সমস্যা কি তোমার চাচ্চু?"
"ভাইয়া এটাকে ধরে বাঁধ তো। মিস্ এসে একঘন্টা হলো বসে আছে। আমি আর ভাবি সারা বাড়ি খুঁজে হয়রান। লাপাত্তা। বেশি দুষ্টু হয়েছো না?"
"ফুমণি মিস্ এখনো যায়নি কেন? ধুরু।"
"লাঠি এনে তোমার পিঠ লাল করবো তাসিন।"
" কিছু নিয়ে আয়। এটাকে বাঁধতে হবে।"
"কি করছো তোমরা?"
সানজি এদিক ওদিক তাকিয়ে বাঁধার জিনিস খুঁজতে খুঁজতে বলে, "আম্মা তুমি কিছু বলবে না। বেবি মানকির সাহস হয়েছে বেশি। ভাবি লাঠি নিয়ে ছাদে গিয়েছে খুঁজতে।"
সোফার উপর হতে সানজি একখানা ওড়না এনে সান্নিধ্যের হাতে দেয়।সান্নিধ্য পাঁজাকোল করে তাসিনকে তুলে সিঁড়ির হাতলের সাথে রাখে বেঁধে।
"একঘন্টার আগে খোলা নিষেধ।"
"দাদিমা একটা ড্রিংকস্ এনে দাও তো।"
সানজি দু'হাত কোমড়ে রেখে চোখ পাকিয়ে তাকায় বেবি মানকির আবদার শুনে। শক্ত গলায় বলে,"তোর কি ভয় হয় না? বেঁধে রেখেছে তাও ড্রিংকস চাস? "
"আমার তো ভালো লাগছে। মিস্ এখন এমনি চলে যাবে।"
সান্নিধ্য হাতের ঘড়ি খুলতে খুলতে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে যায়। গলার স্বর চড়িয়ে বলে,"ওর ড্রিংকসও বন্ধ।"
"একদম।"
"সানজি উপরে আয়।"
সানজি তাসিনকে মুখ বাঁকিয়ে উপরে উঠে যায়। দৌড়ে এসে ভাইয়ের পিছু নিয়ে বলে,"কি হয়েছে?"
সান্নিধ্য নিজের কামরায় ঢুকে পাঞ্জাবির পকেট হতে ফোন ওয়ালেট বের করে রাখে। কাবার্ড হতে টি শার্ট ট্রাউজার নামিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে, "আমি বিভিন্ন সেমিনারে যেসব স্পিচ দেই সেগুলো কখনো শুনেছিস?"
"পুরোপুরি শুনিনি কখনো। ওই শুরুতে একটু।"
"আজকেরটা?"
"হু ভাবি ফোনে দেখালো। কেন কি হয়েছে? "
সান্নিধ্য ভিতর হতে দীর্ঘ শ্বাস টেনে শান্ত কন্ঠে বলে,"আমার স্পিচ কি কবিতা আবৃত্তির মতো শুনতে লাগে?"
সানজি ফিক করে হেসে উঠে। মুখে হাত দিয়ে বলে,"কবিতা আবৃত্তি?"
"আই'ম নট জোকিং। সত্যি করে বল।"
"ধুর। কবিতা আবৃত্তি কেন লাগবে? ভালোই তো বলিস।"
"ঠিক আছে যা।"
"কেন কেউ কি কিছু বলেছে?"
"না।"
"মনে হচ্ছে বলেছে। তা না হলে তো তুই আমাকে জিজ্ঞেস করতি না।"
সান্নিধ্য ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে বলে,"এমনি জিজ্ঞেস করেছি।"
সানজি আর পাল্টা প্রশ্ন করে না। ঠোঁট কামড়ে কাঁধ নাচিয়ে চলে যায় কক্ষ হতে। সান্নিধ্য ওয়াশরুম হতে ফের ফিরে আয়নার সামনে এসে দাঁড়ায়। স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
"কবিতা আবৃত্তি করি আমি?"
চলবে,..

written by: মাহরিণ তৃণ

Olindo Rahman

Olindo Rahman

A good book is worth a hundred good friends. 
But a good friend is equal to a library.!! 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Your experience on this site will be improved by allowing cookies Cookie Policy