Buy Now

Search

সোহাগি সাঁঝমল্লার [পর্ব-০১]

সোহাগি সাঁঝমল্লার [পর্ব-০১]

কেমন মেয়েকে বিয়ে করতে এসেছ ব্রো? এ মেয়ে তো লেসবিয়ান! কলেজে ওর একটা দুইটা না, তিন তিনটা গার্লফ্রেন্ড আছে! একে নিয়ে তো তুমি জীবনেও দাম্পত্যজীবনে সুখী হবে না! গ্যারেন্টি!
চমকে উঠল সাঁঝ। কথাগুলো কর্ণগোচর হওয়ার সাথেসাথে ঘোমটার নিচ থেকে চোখ তুলে সামনে তাকাল ও। বুঝল, প্যান্টের পকেটে দুহাত গুজে দরজায় আরামে দাড়ানো যুবকই বক্তা। যুবকের পরনে বটল গ্রিন চেক শার্ট, ধূসর প্যান্ট, কেডস। শার্ট পরার স্টাইল– হাতা এলোমেলোভাবে কনুইয়ে ঠেলে তোলা; সর্বওপরের তিনটে বোতাম খোলা রেখে, বামদিকের গলার সামনের অনেকখানি অংশ পেছনে ছুড়ে মারা। যারফলে গলার ফাঁকা অংশের বেশিরভাগ কাধে গিয়ে পরেছে। তবুও সামনে যতটুকু খালি তাতে তার ফর্সা বুকের অল্পবিস্তর অংশ দেখা যাচ্ছে। মানুষটার চেহারায় হাসি। অবশ্য কেবল হাসি না ওটা। ঠিকঠাক সময়ে বোমা ব্লাস্ট করার তৃপ্তি। আর এ তৃপ্তির কারণ সোফায় বসা ছেলেপক্ষের আট-দশজন মানুষের হতবাক-বিস্মিত দশা। পুরুষ মানুষগুলো তবুও যতটুক সম্ভব রয়েসয়ে বিস্ময় প্রকাশ করছে, কিন্তু সাথের চারজন মহিলার চেহারার হাবভাব দেখার মতো! তাদের প্রত্যেকের চোখ বেরিয়ে আসার আর চোয়াল খসে পরার উপক্রম। পরিস্থিতি এতটাই ভয়ংকর হয়েছে যে কারো ব্যাকগ্রাউন্ডে হিন্দি সিরিয়ালের ধুমতানার অভাববোধটুকো হবে না।
প্রসারিত হাসির মানুষটাকে দেখে নিয়ে চোখ নামিয়ে নিলো সাঁঝ। বিস্ময় কাটিয়ে এবার নীল দুঃখে বুক ভারী হয়ে ওঠে ওর। ঝিলের মতো চোখজোড়া ভরে ওঠে। কিন্তু ওর চোখের জল বেরোনোর আগমুহুর্তেই হুলস্থুল পরে গেল গোটা ড্রয়িংরুমটায়। কান্নার আগেই সাঁঝ দ্বিতীয়দফায় চমকে উঠে সামনে তাকাল। সবার আগে আবারো ওর চোখ গেল সে দরজায় দাড়ানো মানুষটার দিকেই। তার ঠোঁটের বা কোনায় রক্ত। কিন্তু সে ব্যক্তি অতি স্বাভাবিক চিত্ত্বে দাড়ানো। জিভ দিয়ে বা গালের ভেতর খোঁচাচ্ছে আর বা হাতের তালুতে থুতনির বা দিক ডলছে। শুরুতে তার দুই পা পরস্পর থেকে যতটুকো দুরুত্বে ছিল, এখনো তারা একই দুরুত্বে। অর্থাৎ, নিজের জায়গা থেকে একচুলও নড়েনি সে।
চোখ ঘুরিয়ে সাঁঝ ভাইকে দেখল। সর্বশক্তিতে ঘুষি মেরেও মাশফিক ক্ষান্ত হয়নি। ও ডানহাত ঝাকাচ্ছে। ব্যথায় চেহারাও লাল হয়ে গেছে ওর। তবুও দমে নি। গায়ের জোরে আবারো এগোতেও চাইছে। কিন্তু বাবা আর ছোটচাচা মিলে আটকে রেখেছে ওকে। জলভরা চোখ নিয়ে স্তব্ধ হয়ে বসে রয় সাঁঝ। যে ঘুষিতে মাশফিকের হাত ব্যথা শুরু হয়ে গেছে, সে ঘুষিতে কোনো স্বাভাবিক মানুষের দাড়িয়ে থাকার কথা না। দাড়িয়ে থাকলেও, এমন গা ছাড়াভাবে থুতনি ডলার কথা না। অথচ এই ছেলে? ছেলেটা মুখের ভেতর নোনতা স্বাদ অনুভব করলো হয়তো। ঠোঁটের কোনের সাথে গালের ভেতরদিকেও যে দাঁত লেগে কেটে গেছে, সে আঘাতের অনুধাবন হলো ওর। বেশ সাবলীলভাবে বেসিনে গিয়ে কল ছেড়ে থুথু ফেলল ও। তারপর কল বন্ধ করে, থুতনি ডলতে ডলতে আবারো এগিয়ে পাত্রপক্ষ হয়ে আসা দুটো অল্পবয়সী মেয়েদুটোর দিকে তাকাল। এমন পরিস্থিতিতেও মেয়েদুটো ঝলমলিয়ে উঠল। যুবক এবার তাকাল ভয়ংকর ক্ষেপে থাকা মাশফিকের দিকে। ভ্রু বাকিয়ে বলল,
– ঘরে দুটো সুন্দরী মেয়ে দেখে মুঠোতে খুব জোর চলে এসেছে মনেহচ্ছে। আমার সামনে কিন্তু তিনজন! আমার মুঠোর জোর দেখাব?
– সায়াহ্ন!
সায়াহ্ন হামিদের হাসি কমার বদলে আরেকটু বাড়ল। মোশাররফ তালুকদার হুংকারে দ্বিতল বাসা কেঁপে উঠলেও কেবল বুক কাঁপলো না সায়াহ্নর। তিনজনের একজন যে সাঁঝ, সেটা মাশফিকেরও গায়ে আগুন ধরিয়েছে। আরো বেশি শক্তি খাটিয়ে তেড়ে আসার চেষ্টা করছে ও। চিৎকার করছে ওকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু চাচার জন্য তা পারে না। ওদিকে সাঁঝের দৃষ্টি প্রসারিত৷ ওর মাথায় আবারো এসে বারি মারে, কয়েকমিনিট আগে ওকে কি শুনতে হয়েছে, সর্বসম্মুখে ওকে কি অপবাদ দেওয়া হয়েছে, আবার এখন এই মুহুর্তে ওকে কি শুনতে হলো। অথচ তালুকদার নিবাসে, ঘরভরা মানুষের সামনে, সে বাড়িরই একমাত্র মেয়েকে নিয়ে এমন কেয়ামত তুলে দেওয়ার মতো কথা বলে, মার খেয়েও সে ছেলে হাসিমুখে-নিশ্চিন্তে দাড়িয়ে মাশফিককে খোঁচাচ্ছে। কিসের তৈরী এই মানুষটা? ভয় বলে কিছু নেই কেন এর?
আশপাশের পরোয়া না করে সায়াহ্ন এগোল। সেন্টার টেবিল থেকে টিস্যু নিয়ে, ঠোঁট মুছতে লাগল। মোশাররফ তালুকদার শরীরে রাগের জোয়ালামুখী নিয়ে বললেন,
– এই মুহুর্তে এই বাসা থেকে বেরিয়ে যাবে তুমি! নাহলে আমি ভুলে যাব তোমার বাবা কে!
– প্যারা নেই আঙ্কেল। ভুলে যান। আমি নিজেও দরকার ছাড়া আমার বাপের নাম মনে রাখি না।
জবাব তৎক্ষনাৎ আসলো। যেন আগেথেকেই প্রস্তুত ছিল। অবশ্য সত্যিই তাই। প্রস্তুতি তো আগেথেকেই ছিল। বিনে প্রস্তুতিতে সায়াহ্ন হামিদ এ বাসায় আসে নি। আসবে না! বিদ্যুৎ ঝলকানির মতো আগেরদিনের ঘটনা মাশফিকের চোখের সামনে দিয়ে চলে গেল। সায়াহ্ন ঘাড় একটুখানি বাকিয়ে ওর দিকেই তাকানো। পাত্রের মা মুখ খুলল এবারে। মোশাররফ তালুকদার আর তার পরিবারকে উদ্দেশ্য করে, যথেষ্ট উচু গলায় বলল,
– ও! তাইতো বলি, এদের আংটিবদলের এত তাড়া কিসের? সবটা এত দ্রুত কেন চাইছে এরা? আসল ঘটনা তো এখানে! আপনারা তো এই কীর্তি ধামাচাপা দিতে চাচ্ছিলেন, নিজেদের সমকামী মেয়েকে আমার ছেলের ঘাড়ে চাপাতে চাচ্ছিলেন! তাইনা?
তালুকদার পরিবারের শিরায় শিরায় যতটুক রাগ ছিল, সবটা এক সেকেন্ডের জন্য স্তিমিত হয় যেন। সেকেন্ড দুই আগেও ওদের প্রত্যেকের উদ্দেশ্য ছিল সায়াহ্ন। পাত্রপক্ষের কেউ যে ওর কথা বিশ্বাস করবে না, এমন ধারণা পুষে তাদের নিয়ে ভাবেনই নি মোশাররফ তালুকদার। একই অবস্থা মাশফিকেরও। নির্বাক পুতুলের মতো বসে থাকা সাঁঝের চোখ বেয়ে টপটপ করে জল গরায়। পুরো পরিবারের অনেক অনুনয়ের পর আজ বহুদিন পর পাত্রপক্ষের সামনে এসেছিল ও। কিছুক্ষণ আগে ওরও ধারণা ছিল মোশাররফ তালুকদারের মতো।  পরিস্থিতি বিবেচনায় ওনারা অবশ্যই এমন পরিবারকে ওরজন্য ঠিক করবে না, যারা বাইরের মানুষের কথায় প্রভাবিত হয়। কিন্তু ঘটল সেটাই। আসিফ তালুকদার এবার আর ভাতিজাকে ধরে রাখলেন না। বাধনছাড়া পাগলা ঘোড়ার মতো তেড়ে এগোলো মাশফিক। আঙুল উঁচিয়ে সায়াহ্নকে দেখিয়ে, খিঁচানো আওয়াজে বলল,
– আপনি এই ছেলের কথা বিশ্বাস করে নিয়েছেন আন্টি? ওকে? আপনার সত্যিই মনে হয় যে আমার বোন. . . 
– বেরিয়ে যান!
ছেলেকে শেষ করতে না দিয়ে মোশাররফ তালুকদার নিজেই দুইশব্দে গোটা লন্ডভন্ড পরিবেশকে আটকে দিলেন। পাত্রপক্ষের সবার অস্বাভাবিক বড়বড় চাওনি। সায়াহ্ন বিশ্বজয়ের হাসি দিলো একটা। সামনের টেবিলে থাকা টুথপিকে এক আঙুর তুলে মুখে পুরে, খুশিমনে পাত্রের কাধে হাত রাখল। মৃদ্যু চাপড়ে, বেশ আদুরে তবে আস্তে করে বলল,
– অল্পের জন্য বেঁচে গেছ বুঝলে? আজকে আমার আসার আরেকটু দেরি হলে জীবনটা নষ্ট হতো তোমার। যাও ভাই, বাসায় যাও। স্তু স্তু! বাসায় যাও।
শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে সায়াহ্নকে হয়ত লোকের পছন্দ হলো না। সে একবার সাঁঝের দিকে চাইছে, তো একবার মায়ের দিকে। বাবা মৃত তার। অভিভাবক বলতে মা-ই সব। তাই বুঝটা আগেপরে মায়ের দরকার। কিন্তু তারআগে নিজেরও সত্যি জানা দরকার। কাধ উচিয়ে সায়াহ্নর হাত সরিয়ে দিলো সে। মোশাররফ তালুকদারকে কিছুটা ব্যস্তভাবে বলল,
– আঙ্কেল, আপনি এমন উত্তেজিত হচ্ছেন। আমরা আলাদাকরে কথা. . .
– যা বলার তা তোমার মা বলে দিয়েছেন। আলাদা করে আর কোনো কথা বলার বা শোনার নেই আমাদের। তোমরা এসো।
মোশাররফ তালুকদারের আগের চেয়েও অধিক গমগমে স্বর শুনে পাত্র কিছুটা দমে গেল। সুস্বাস্থ্যের অধিকারী মানুষটাকে দেখে শুরু থেকেই ভয়ভয় করছিল তার। এজন্য আসার পর কথাবার্তাও বলে নি সেভাবে। তবে একেবারে হারও মানলো না লোক৷ মাথা নিচু করে নিরবে অশ্রুবিসর্জন দিতে থাকা সাঁঝকে বলল,
– সাঁঝ? আমাকে. . .
– বাবা চলে যেতে বলল না আপনাদের! কানে যায়নি কথা?
লোকের কথা শেষ হয়না। তারআগেই সাঁঝ আর তার দৃষ্টিসীমার মাঝে অবস্থান নেয় মাশফিক। পাত্র ছোটকরে একটা ঢোক গিলল। তার গলা দিয়ে আর কথাই বেরোল না। ঠিক সেসময়েই তালুকদার নিবাসের মুলদরজা দিতে পুলিশি পোষাকের তিনজন ভেতরে ঢোকে। পাত্রপক্ষে আসা মানুষজন একে ওপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছিল। সায়াহ্ন পাত্রের মাকে বলল,
– পুলিশ আমার জন্য এসেছে। আপনারা নির্ভয়ে দফা হতে পারেন।
– এইতো! ওর জন্যই আপনাদের কল করা হয়েছে! ওকে এক্ষণ নিয়ে যান অফিসার! ভয়ংকরতম কেসে নাম লেখাবেন ওর! যেন এ জীবনে আর বেরোতে না পারে! এই সায়াহ্ন হামিদ!
আঙুল উচিয়ে সায়াহ্নকে দেখিয়ে অফিসারকে বলল মাশফিক। সায়াহ্ন বিরক্তিতে চোখ বন্ধ করে নেয়। চোখ খুলে দেখে কনস্টেবল দুজন ওরদিকে পা বাড়িয়েছে। একেবারে নিরস কন্ঠে বলল,
– হ্যাঁ। আমিই সায়াহ্ন হামিদ। Son of ACP Sarwar Hamid.
দু দন্ডের নিরবতা। সাঁঝ বাদে সেখানকার প্রতিটা চোখ ছিল তখন সায়াহ্নর দিকে। কেননা সায়াহ্ন হামিদ, সবার কাছেই পরিচিত নাম। নিজের হাতে থাকা মোবাইলটা ঘুরাল সায়াহ্ন। তারপর ওটা বাড়িয়ে দিলো মাঝের সিনিয়র ইন্সপেক্টরের দিকে। সে লোক একপলক মোশাররফ তালুকদারের দিক তাকিয়ে হাতে নিলো ফোনটা। চোখ ঘুরিয়ে আবার পুরো পরিবারের প্রতিক্রিয়া দেখল সাঁঝ৷ মোশাররফ তালুকদারকে তার মিসেস ধরে রেখেছেন। মাশফিক হাত মুঠো করে কটমটে চোখে সায়াহ্নর দিকে তাকানো। ছোটচাচা আসিফ তালুকদারও কি করে যেন নিজেকে সংবরণ রেখেছে। ইন্টার পড়ুয়া ছোটভাই অভ্র মায়ের সাথে দাঁড়ানো। ফোন কানে ধরার কয়েকমুহুর্তের মাঝে ইন্সপেক্টর মাঝে বাইরে চলে গেলেন। মাশফিকের আর নিজেকে সংবরণ করা হয়ে উঠল না৷ ঝড়ের গতিতে এগিয়ে এসে সায়াহ্নর কলার চেপে ধরল ও। এবার সায়াহ্নর ধৈর্যের বাধ ভেঙে যায়। ও একবার মাশফিককে দেখে, তো একবার ওর মুঠোতে থাকা নিজের শার্টের কলার। কনস্টেবল দুজনে তখনতখন ছুটে এসে দুজনকে ধরেছিল। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়না। ঝারা মেরে কনস্টেবল আর কলার, দুটোই ছাড়িয়ে নিলো সায়াহ্ন। উল্টো ওই এবার মাশফিকের কলার দুহাতে চেপে ধরল। সবে মার লাগাতে যাবে, অফিসার ভেতরে ঢোকেন। ছুটে গিয়ে অতিকষ্টে মাশফিককে ছাড়িয়ে নিয়ে সরিয়ে দিলেন তিনি। তারপর সায়াহ্নকে জড়িয়ে কিছুটা পিছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে করতে বললেন,
– তোমার একটা ইমেজ আছে সায়াহ্ন। শান্ত হও! শান্ত হও!
– আমার কলারে হাত দিয়েছে ও! আগে তার হিসেব, তারপর ইমেজ দেখছি!
সায়াহ্ন থামে না। দুই কনস্টেবলকে নিয়েও অফিসারের কুলোনো দায় হয়। গায়ের জোরে সায়াহ্নকে আটকাতে গিয়ে অস্থির হয়ে পরেছেন তিনি। হাপাতে হাপাতে বললেন,
– তোমার বাবা আসছে তোমাকে নিতে। উনি এ বাসায় আসলে আমার জন্য দুদিক সামলানো কঠিন হবে সায়াহ্ন। বোঝার চেষ্টা করো প্লিজ। চলো এখান থেকে। আমার ওপর এটুক রহম করো।
একপলক অফিসারকে দেখে সায়াহ্ন থামল। ও কিছুটা শান্ত হলে অফিসার নিজে ওর শার্টের কলার ঠিকঠাক করে দিলো। গলারদিকে ডানহাত বুলাতে বুলাতে মাশফিককে দেখছিল সায়াহ্ন। মাশফিক তখন আসিফ তালুকদারের কাছে বেধে রাখা ঝড়। সায়াহ্ন কি বুঝল, ইচ্ছা করেই এগিয়ে গেল সে ঝড়ের দিকে। গলা থেকে হাত থুতনিতে আনলো। ঘুষিতে ব্যথা হয়ে হয়ে জায়গায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল,
– অপমানটা উশুল। বাদবাকিটার জন্য রেডি থেকো মাশফিক তালুকদার।
মাশফিকের চোখে চোখ রেখে কথাগুলো বলল সায়াহ্ন। আর মাশফিক কপালে চারপাঁচটা ভাঁজে চার-পাঁচ মহাকাশের রাগ জমিয়ে ওকে দেখল। ঘরের বাকিসব দেখল দুই বলিষ্ঠ মানবের মুখোমুখি হওয়া, দৃষ্টির সংঘর্ষ। উচ্চতায় মাশফিক সায়াহ্নর চেয়ে ইঞ্চিদুয়েক কম হবে। সায়াহ্ন সহজেই ওরদিকে তাকানো। কিন্তু মাশফিকের চোখ তুলে, ক্ষীপ্ত চাওনি। সায়াহ্ন আর সময় নিলো না। বা হাতের ওপরপিঠে ঠোঁটের রক্তজমা কোনা ডলা মেরে, কলারের পেছনে বাঝিয়ে রাখা সানগ্লাসটা চোখে পরল। শার্টের গলা পুনরায় পিঠের দিকে ঠেলে, চোখ ঘুরিয়ে আরেকবার দেখে নিলো রাগে ফুঁসতে থাকা তিন তালুকদারকে। তালুকদার নিবাস থেকে বেরিয়েই যাচ্ছিল ও। বেরিয়ে আসছিল পাত্রপক্ষও। কিন্তু বেরোতে গিয়ে পাত্রের মা সায়াহ্নকে বলে উঠল,
– ঠিক সময়ে এসে সত্যিটা বলার জন্য থ্যাংকিউ বাবা। তা না হলে আমার ছেলের জীবনটা সত্যিই শেষ হয়ে যেত। একেতো বোবা মেয়ে, তারওপর. . .
সায়াহ্নর আটকায়। পায়ের সাথে সাথে হয়তো শ্বাসটাও থামে ওর। এতোটা সময়ে এই প্রথমবারের মতো ও থমকালো। সীমাহীন অবিশ্বাসে মহিলার দিকে চেয়ে রইল। মহিলা তখনো কিছু বলে চলেছেন। অথচ তারদিক তাকিয়ে থেকেও সায়াহ্নর আর কিছুই কানে যাচ্ছে না। ওর কানে ব্যস দুটো শব্দই বাজছে। “বোবা-মেয়ে!”
কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার পর রোবোটের মতো পেছন ফিরল সায়াহ্ন। ওর চোখ পরে দরজা বরাবর সোফায় বসে থাকা মেরুন রঙের শাড়ি পরিহিত রমনীর দিকে। শাড়ির আঁচলে মাথায় ঘোমটা দেওয়া ফরসা গরনের মেয়েটা। দু হাত কচলাতে কচলাতে, মাথা নিচু করে নিশব্দে চোখের জল ফেলছে সে। আর পাশ থেকে মিসেস মোশাররফ তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে আর কিছু একটা বুঝাচ্ছে।
সায়াহ্ন দু হাত মুঠো করে শক্ত হয়ে দাড়িয়ে রয়। ওর শ্বাস ক্রমশ রুদ্ধ হয়ে আসছে। জীবনে প্রথমবার ওর নিজের জেদের ওপর রাগ হচ্ছে। গ্লানি, অপরাধবোধ মস্তিষ্ককে ঠোকড়াতে শুরু করেছে। রাগের বশে এ কি করে বসল ও? এই নির্দোষ মেয়েটার সাথে অন্যায় করল? এরআগে ও তো কখনো কারো ক্ষতি করেনি! তবে আজ কেন এমন হলো? আজ কেন ওর ক্ষোভ কারো ক্ষতির কারণ হলো? সায়াহ্ন হামিদের দ্বারা, এতবড় অন্যায়টা, হলো কি করে?
চলবে...

written by: মিথিলা মাশরেকা"  

Tags:
Alamgir Hossain

Alamgir Hossain

Hi, I’m Annalise Quitzon, Your Blogging Journey Guide 🖋️. Writing, one blog post at a time, to inspire, inform, and ignite your curiosity. Join me as we explore the world through words and embark on a limitless adventure of knowledge and creativity. Let’s bring your thoughts to life on these digital pages. 🌟 #BloggingAdventures

Your experience on this site will be improved by allowing cookies Cookie Policy