Buy Now

Search

সোহাগি সাঁঝমল্লার [পর্ব-০৩]

সোহাগি সাঁঝমল্লার [পর্ব-০৩]
বাপটা পুলিশ, তুমি কি এখন এটারও সুযোগ নিতে শুরু করলে সায়াহ্ন?
মিসেস সরোয়ার খাবার টেবিল থেকে সরতেই কথা তুললেন সরোয়ার হামিদ৷ গতরাতে সায়াহ্নর সাথে দেখা হয়নি তার। যারফলে কথা খরচ করার সুযোগ হয়নি তার। কিন্তু কথা তো বলতেই হবে। সকালে ডাইনিংয়ে বসে ছেলেকে দেখেছেন তিনি। হাতে ঘড়ি, সাদা চেক শার্ট, কালো প্যান্ট পরে একেবারে অফিসের জন্য তৈরী হয়ে বেরিয়েছে সে। সরোয়ার হামিদ নিজেও অফিসের জন্য রেডি হয়ে বেরিয়েছেন। এখন না বললে বলার সুযোগ নেই, তাই মেয়ের সামনেই কথা পারলেন তিনি। তবে যাকে বললেন, তার কানে যেন কথাটা গেলই না। ছেলের পাশ থেকে মেয়ে দিবা চোখ তুলে তাকাল তার দিকে। একপলক ভাইকে দেখে নিয়ে, পুনরায় স্বাভাবিক ভঙিতে খেতে লাগল। সরোয়ার হামিদ আবারো ছেলেকে প্রশ্নতাক করলেন,
– কিছু জিজ্ঞেস করেছি তোমাকে।
সায়াহ্ন তখনো জবাব না দিয়ে খাওয়ায় ব্যস্ত। দিবা ব্রেডের টুকরো মুখে পুরতে পুরতে ভাইকে দেখল। ও জানে, ডাইনিং টেবিলে একটা ছোটখাটো ঝড় বইবে। সাথে এটাও জানে, দুই হামিদের সে ঝড়ে, ছয় মেরে জয় হাসিল করবে ছোট হামিদ, সায়াহ্ন হামিদ। সরোয়ার হামিদের ধৈর্যের বাধ ভেঙে গেল যেন। তিনি এবার ক্লান্ত স্বরে বললেন,
– তোর জন্য কি আমি একটু মানসম্মান নিয়ে বাঁচতেও পারব না সায়াহ্ন? যা করেছিস তা নিয়ে কি একটুও অনুশোচনাবোধ নেই তোর?
– সিচুয়েশন আমার কন্ট্রোলে ছিল না।
সায়াহ্নর মুখ দিয়ে কথা বেরোয়। মূলত বেরোতে চাইছিল, “ হ্যাঁ! হচ্ছে অনুশোচনা।” কিন্তু ত্যাড়া সায়াহ্ন ওর সোজা জবাবকে আটকে দেয়। সরোয়ার হামিদ বললেন,
– সিচুয়েশন তোর কন্ট্রোলে থাকে না? নাকি তুইই নিজের কন্ট্রোলে থাকিস না?
. . .
– হোয়াটএভার। তুই এই মুহুর্তে আমাকে এনশিওর করবি সায়াহ্ন! এরপর তুই আর তালুকদার পরিবারে আশপাশে যাবি না। আর কোনো অঘটন ঘটাবি না।
সায়াহ্ন চোখ তুলে বাবার দিকে তাকাল। এই লোকটা ওকে চেনে, এজন্য সে জানে, এরপর আরোকিছু ঘটবে। মাশফিকের বোনকে অপবাদ দেওয়ার অনুশোচনা সায়াহ্নর আছে৷ সাথে এটাও মনে আছে, মাশফিক ওকে ঘুষি মেরেছে, ওর কলারে হাত দিয়েছে। যারফলে পরবর্তীতে ও কি করবে, কি করবে না, সে বিষয়ে ওর নিজেরও ধারণা নেই। পুনরায় খাওয়ায় মনোযোগী হয়ে বলল,
– ঘটাব না তার নিশ্চয়তা দিতে পারছি না। তবে কিছু ঘটলে তোমার নাম আসবে না, এটার নিশ্চয়তা দিচ্ছি।
– বাপির নাম আসবে না মানে? কার নাম আসবে তাহলে ভাইয়া? তুই নিজের বাপেরও প্রক্সি রেখেছিস?
দিবা মুখ খুলল। মহাকাশের বিস্ময় নিয়ে কথাটা বলল ও। সরোয়ার হামিদ চোখ কপালে তুলে আগুনে ঘি ঢালা মেয়েকে দেখলেন। বাবার সাথে ভাইয়ের চেয়ে বেশি ভালো সম্পর্ক রাখার চেষ্টা এই মেয়েকে কেমন খলনায়িকার মতো বানাচ্ছে না? সায়াহ্ন নির্বিকারচিত্তে ব্রেডের শেষ টুকরো মুখে পুরল। উঠে দাড়াতে দাড়াতে বলল,
– শুকর কর শুধু প্রক্সি রেখেছি। একেবারে নতুন বাপ চাইনি। যা বাপ তোর!
ছেলের কথা শুনে সরোয়ার হামিদ কথা বলা ভুলে গেলেন। সায়াহ্ন বেসিনে হাত ধুয়ে সোফায় রাখা ব্যাগ কাধে নিলো। তারপর কিচেনের দরজায় দাড়িয়ে, টিফিনবক্স ভরতে থাকা মাকে ডাকল। মিসেস সরোয়ার পেছন ফিরে ছেলেকে দেখে হাসিমুখে এগিয়ে আসলেন। দুহাতে মায়ের গাল ধরে, সায়াহৃন তার কপালে চুমু দিলো একটা। মিসেস সরোয়ার ছেলের শার্ট ঠিকঠাক করে দিয়ে সাবধানে যেতে বললেন ওকে। ডাইনিংয়ে বসা বাবা-মেয়ে সবই দেখল। দিবা গলা উচিয়ে বলল,
– এই চুমু দিয়ে তোমার বউয়ের ব্রেইনিয়াশ করে দিয়ে গেল। বুঝলে বাপি?
– তেলা মাথায় তেল দেওয়া শুনেছিলাম। টাক মাথায় তেল দেওয়া তোমার মেয়েকে দেখলাম। বুঝলে মা?
সরোয়ার হামিদের বা হাত আপনাআপনি নিজের কপাল অবদি চলে যায়। দিবাকে ঘাড় ঘোরাতে দেখে হন্তদন্ত হয়ে হাত নামিয়ে নিলেন তিনি। দিবা কপাল কুঁচকে ভাইয়ের দিক তাকিয়ে রইল। সায়াহ্ন বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ করলো না সেদিকে। মার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাসার বাইরে বেরিয়ে আসলো। অফিসের গাড়ির জন্য মুলসড়কে অপেক্ষা করতে গিয়ে কিছু একটা মনে পরল ওর। প্যান্টের পকেট থেকে মোবাইল বের করলো সায়াহ্ন। তাতে বাংলিশে ম্যাসেজ টাইপ করলো, “ আমার শো আটটায় শেষ। সাড়ে আটটায় দেখা করা যাবে তোমার সাথে?”
অভ্র আলমারির আয়নার সামনে দাড়িয়ে হাতে-চিরুনিতে চুল উল্টাচ্ছে আর শীষ বাজাচ্ছে। “উ লা লা! আই লাভ ইউ মাই সোনিয়া!” এমনিতেও কলেজ যাওয়ার আগমুহুর্তে অভ্র একজন প্রচন্ডরকমের ব্যস্ত মানুষ। নেভি ব্লু শার্ট আর কালো প্যান্টের কলেজ ড্রেসেও নিজেকে হলিউডের নায়ক হিসেবে পেশ করার চেষ্টা থাকে ওর। তারওপর আজকে আরেকটা বিশেষ কারণ আছে। চুল আঁচড়ে নিজের থুতনি ধরে আয়নায় চেহারার দুপাশ দেখল অভ্র। অতঃপর খুশি হয়ে শার্টের বড়হাতার ভাজটা ঠিক করতে লাগল। তখনো শীষ বাজিয়ে ও সুর তুলেছে, “ চাইনা মেয়ে তুমি অন্য কারো হও।” আর সে সুরের মাঝে হঠাৎ কাচভাঙা আওয়াজ। অভ্র থেমে যায়। রোবোটের মতো ঘাড় ঘুরিয়ে পাশের সেন্টার টেবিলের দিকে তাকায় ও। কাঙ্ক্ষিত জিনিসটা সেখানে না দেখে কাঁদোকাঁদোভাবে তাকায় মেঝের দিকে। কয়েক টুকরো হয়ে পরে থাকা পারফিউমের কাঁচের বোতলটা দেখে ওর কাঁদোকাঁদো ভাব কান্নায় পরিণত হতে চায়। হুড়মুড়িয়ে মেঝেতে বসে পরে অভ্র। ওর কানে আসে এক সুমিষ্ট, মাসুম আওয়াজ,
– মিয়াও. . .
– সুজির বাচ্চা!
আর্তনাদ করে ভাঙা পারফিউমের বোতল হাতে তুলল অভ্র। পারফিউমটা ওর না। মাশফিকের। প্রতিবার মাশফিক নতুন একটা পারফিউম আনবে, আর অভ্রর সেটাই পছন্দ হবে। মাশফিক নিজের জিনিস শেয়ার করাটা খুবএকটা পছন্দ করে না। এজন্য ও সবসময় দুটো করে পারফিউম কেনে। একটা ওর, আরেকটা অভ্রর। কিন্তু সমস্যা হয় অন্যত্র। মাশফিকের পারফিউমটা শেষ হওয়ার বহু আগেই অভ্র নিজেরটা শেষ করে ফেলে। এত আগে পারফিউম কিকরে শেষ হয়, এ নিয়ে মাশফিক কয়েকবার ঝেরেছে ওকে। তারপর থেকে অভ্র আর পারফিউম শেষ হয়ে গেলে ভাইকে জানায় না। লুকিয়ে চুরিয়ে ভাইয়েরটাই ব্যবহার করে। আজকেও মাশফিক অফিসের জন্য বেরিয়ে যাওয়ার পর ওর ঘর থেকে পারফিউম নিয়ে এসেছে অভ্র। আর সেটাই এখন সাঁঝের মহামান্য বিড়াল ভেঙে ফেলেছে। ভাইয়ের রাগ কল্পনা করে অভ্র সুজির দিকে ক্ষেপে তাকাল৷ চেচিয়ে বলল,
– আমার বোন তোকে এইজন্য খাওয়ায়-পরায়? যাতে তুই আমার এমন সর্বনাশ করতে পারিস?
বড়বড় চোখের সুজি চুপচাপ বসে অভ্রর মুখের দিক তাকিয়ে রইল। সে ছেলে তার সেট করা চুল আঙুলে উল্টে ধরে, ঠোঁট কামড়ে মেঝে বসে আছে। সাঁঝ তখনই ভাইকে খেতে ডাকার জন্য ঘরে ঢুকল। আর ভেতরে আসতেই বুঝল, এখানে কি ঘটেছে৷ হতাশ হয়ে কপাল চাপড়াল সাঁঝ। তারপর এগিয়ে এসে, দু হাটুতে মেঝেতে বসে ভাইয়ের চেহারার দিকে উঁকি দিলো। অভ্র মাথা তুলল। বাচ্চাদের মতো কান্নার ভাব করে বলল,
– দেখ আপুই! তোর বিড়ালের কাজ দেখ!
সাঁঝ নড়েচড়ে নিজেকে প্রস্তুত করলো। সুজির দিকে আঙুল তুলে ধমক বোঝাল। তারপর ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে নিজেও গাল ফুলিয়ে, হাতের ইশারায় বলল,
– বকে দিয়েছি সুজিকে। ও আর এমনটা করবে না৷
– ও আর এমন করবে না ঠিকাছে। কিন্তু ভাইয়াকে কি বলব আমি? আজকে ভাইয়া এসে আমাকে বাসা থেকেই বের করে দেবে দেখিস।
– ইশ! কে বাসা থেকে বের করে দেবে? আমার ভাইকে বাসা থেকে বের করে দেবে এমন সাধ্যি আছে নাকি কারো? আমি বকে দেবো না তাকে?
অভ্রর থুতনি ধরে, আত্মবিশ্বাসের সাথে বুঝাল সাঁঝ। অভ্র কিছুটা আশ্বস্ত হয়৷ মাশফিককে সামলাতে মোশাররফ তালুকদার, তার মিসেস, আসিফ তালুকদার সবাই মোটামুটি হিমশিম খায়। ব্যস সাঁঝ কখনো হার মানেনা। হয় যুক্তিতে, নাহয় আবেগ দিয়ে, সাঁঝ ওকে থামিয়েই দেয়। স্বাভাবিক হয়ে উঠে দাড়াল অভ্র। ভাব নিয়ে বলল,
– ওকে। মনে থাকে যেন। ভাইয়াকে বলবি, সুজি এটা ওর রুমের ড্রেসিংটেবিলের ওপর থেকে ফেলে দিয়ে ভেঙেছে৷ আমি এসবের কিছু জানি না।
ঠোঁট টিপে হেসে, সুজিকে কোলে নিয়ে উঠে দাঁড়াল সাঁঝ। তারপর কপাল কুঁচকে, কিচ্ছু না বোঝার মতোকরে বুঝাল,
– কেন? মিথ্যে কেন বলব? এটা তো তোর ঘরে ভেঙেছে।
– ব্ বলবি একটু! এ্ এটা বললে কি সমস্যা?
বলার কিছু ছিল না অভ্রর। উল্টো প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে আর একসেকেন্ডও দাড়াল না ও। “আসছি মা!” বলে বাইরে ছুট লাগাল। অথচ ওকে কেউ ডাকেই নি। মিসেস মোশাররফ সাঁঝকেই পাঠিয়েছিল ডাকার জন্য। ও রুমের বাইরে পা ফেলতেই হেসে ফেলল সাঁঝ। মাথা দুলিয়ে, সুজির গায়ে হাত বুলাতে বুলাতে বেরিয়ে আসলো অভ্র রুম থেকে। নিজের রুমে এসে সুজিকে নামিয়ে দিয়ে সাঁঝ ইয়া বড় বুকশেলফটার দিকে এগোল। বাদামীরঙা পার্সিয়ান বিড়ালটা ছাড় পেলে সামনের দুই পা টান করে আগে শরীরের সবটুকো আড় ছাড়ল। তারপর হেলেদুলে এগোলো ব্যালকনির দিকে। সাঁঝের ঘরে সকালের সবটুকো রোদ আসে। পূবের আকাশের ঝলমলে আলো, ব্যালকনি পেরিয়ে এ ঘরের মেঝে জুড়ে থাকে। সুজি গিয়ে ব্যালকনির সামনে রাখা ম্যাট্রেসের ওপর শুয়ে, জিহবা দিয়ে শরীর পরিস্কার করলো। তারপর দরজায় টানানো মানিপ্লান্টের গাছগুলোর হেলদোলের সাথে খেলতে লাগল। বুকশেলফ থেকে বই খুঁজে টেবিলে রাখতে রাখতে সুজিকে দেখছিল সাঁঝ। চার-পাঁচটা বেশ মোটামোটা বই টেবিলে রেখে হাতের আঙুলে তুড়ি বাজাল ও। সুজি তৎক্ষনাৎ ওরদিক চায়। সাঁঝ বই দুহাতে তুলতে তুলতে মাথার ইশারায় বুঝাল, “ চল বের হই।”
তালুকদার নিবাসের বাকিসব সদস্যদের মতো সুজিও সাঁঝের ভাষা ধরে ফেলে। লেজ নাড়তে নাড়তে ও সাঁঝের পেছনপেছন রওনা হয়। ডাইনিংয়ে এসে বাবা, ছোটভাই, চাচাকে খেতে দেখল সাঁঝ। ওকে বই হাতে দেখে আসিফ তালুকদার বিস্ময়ে বলল,
– এগুলোও পড়া শেষ?
হাসিমুখে এসে বইগুলো টেবিলে রাখল সাঁঝ। হাত ঝাঁকিয়ে বুঝাল,
– অনেক আগেই!
– লাইব্রেরিতে দিতে যাচ্ছ?
বাবার প্রশ্নে সাঁঝ মাথা ওপরনিচ করে খেতে বসে গেল। মোশাররফ তালুকদার মৃদ্যু হাসলেন। সাঁঝের বইপড়ার স্বভাবটা তার মতো। ছোটবেলায় তিনিও বই পড়তে অনেক ভালোবাসতেন। তার দাদার নিজস্ব বইয়ের দোকান ছিল। ক্লাস টেন অবদি দাদার দোকানে বসে কতকত বই পড়েছেন তিনি, সে হিসেব তার নিজের কাছেও নেই। দাদার স্মৃতি হিসেবে তার দোকানটাকে বর্তমানে গণগ্রন্থাগার বানিয়ে দিয়েছেন মোশাররফ তালুকদার। বাবার মতো সাঁঝেরও ছোট থেকেই বইয়ের প্রতি ঝোঁক। বই কেনার জন্য আসিফ তালুকদারের দোকান, আর পড়া শেষে এলাকার গণগ্রন্থাগার, এই ক্রমেই চলছে ওর বইপড়া। গতদিনের ঘটনার রেশ সাঁঝের মাঝে নেই দেখে খুশি হলো তালুকদার পরিবার। কিচেন থেকে মিসেস মোশাররফ স্বস্তির শ্বাস ফেলে কল লাগালেন মাশফিককে। এই ছেলে সকালে সাঁঝের সাথে দেখা করেই গেছে, তবুও অফিস গিয়ে বোনের খবর জানতে চাইছিল। সাঁঝ খেতে খেতে পাশের অভ্রর দিকে তাকাল। সে খাওয়া বাদ দিয়ে সুজির দিকে তাকিয়ে। কনুই দিয়ে ভাইকে গুতা দিলো সাঁঝ। ইশারায় শুধাল,
– কি হয়েছে?
– আমি যেটা বলেছি, তুই ভাইয়াকে সেটাই বলবি তো আপুই?
ভাইয়ের দিকে নিরস দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সাঁঝ। মাশফিকের ভয়ে অভ্র ওর ওপরও সন্দিহান। ছোট্ট একটা দম ফেলে বুঝাল,
– যদি তুই কলেজ যাওয়ার সময় আমাকে লাইব্রেরিতে দিয়ে যাস, তো।
– তোর বড়ভাই না বাইক নিয়ে ওড়ে? তুই ওর বাইকে যাওয়ার বায়না করতে পারিস না? আমার বেচারা সাইকেলটার ওপর অত্যাচার করতে চাস কেন?
চোখ ছোটছোট করে তাকাল সাঁঝ। অভ্র আটকায়। আমতাআমতা করে বলল,
– ত্ তুই আমার বোন, হাড্ডিসার মানুষ, ত্ তোকে তাও মানা যায়। কিন্তু তোর এই কয়েকটনের ভুটকি বিড়াল! এটাকে কেন? এটাকে নিলে আমার সাইকেল ভেঙে যাবে না?
বোনের চোখকে প্রসারিত হতে দেখল অভ্র। সাঁঝ বেশ বুঝল এবার, সমস্যাটা কোথায়। পারফিউমের বোতল ভেঙে বিপদে ফেলে দেওয়ায় সুজিকে আর দেখতে পারছে না এই ছেলে। অভ্র উল্টোদিক ঘাড় ঘুরিয়ে সুজির দিকে তাকালো এবার। সুজি এতক্ষণ চারপা ওপর দিক দিয়ে শুয়ে বেশ আয়েশে দুইপায়ে মুখ ঘষছিল। কিন্তু অভ্রর কথায় ওভাবেই আটকে আছে ও। যেন ওর মাথায় আকাশ ভেঙে পরেছে। অভ্র বিরবিরিয়ে বলল,
– দেখ দেখ! কি নাটক করছে দেখ! যেন আমি ওকে বাংলা সিনেমার মতো এককাপড়ে তালুকদার নিবাস থেকে বেরিয়ে যেতে বলেছি।
– খাওয়া শেষ কর অভ্র! দেরি হচ্ছে তোর! সাঁঝ? তুইও খা। অভ্র নিয়ে যাবে তোকে।
আসিফ খাওয়া শেষ করে উঠে গেল। মিসেস মোশাররফ কিছু খাবার পাঠিয়ে দিলেন ওর হাতে। আসিফ স্ত্রী শাহানাকে নিয়ে ওপরতলায় থাকে। অন্তঃসত্ত্বা হওয়ায় ডাক্তারের কথামতো শাহানা নিচতলায় যাতায়াত কমিয়ে দিয়েছে। অভ্র খাওয়া শেষে রুম থেকে ব্যাগ নিয়ে বেরোল। ডাইনিংটেবিল থেকে বোনের বই হাতে নিতেই দেখে সাঁঝ সুজিকে কোলে নিয়ে দাড়ানো। অভ্র অনুরোধের স্বরে বলল,
– এটাকে না নিলে হয়না আপুই?
মাথা ডানবাম করে জোরালো “না!” বোঝাল সাঁঝ। উপায় ছিল না অভ্রর। বাসার বাইরে বেরিয়ে, সাইকেলে ব্যাগ রেখে বোনের বইগুলো ঢুকাতে যাচ্ছিল ও। সাঁঝ থামিয়ে দিলো ওকে। অভ্র ভ্রু কুচকায়। অতঃপর বোন ওকে যা করতে বলল, তা শুনে ওর মনেহলো ওর জীবনের সবটুকো সুখ হারিয়ে গেছে। কিসের বিশেষ দিন? এরচেয়ে আজ ওর কলেজ না যাওয়াই বোধহয় ভালো ছিল!
তালুকদার নিবাস থেকে একটা সাদা-গাঢ় নীলের মিশেলের সাইকেল বের হয়। পেছনেরসিটে সাঁঝ একদিকে দুইপা ঝুলিয়ে বসা। ওর কোলে মোটামোটা বইগুলো, হাসিখুশি মুখ। সামনে সাইকেলচালক অভ্র। ওর বুকের দিকে কলেজব্যাগ, আর সে ব্যাগের খোলা চেইনের ভেতরে বসা সুজি। ব্যাগের চেইন দুহাতে ধরে বসা সুজির ভাবসাব বোঝা যাচ্ছে না। তবে অভ্রের মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। ভেতরের চাপা কষ্ট ওর চেহারাতেই স্পষ্ট। আরসে কষ্টের নাম, প্রেমিকার বদলে বিড়াল বুকে জড়িয়ে সাইকেল চালানো।
চলবে...

written by: মিথিলা মাশরেকা

Tamzidur Rahman

Tamzidur Rahman

A good book is worth a hundred good friends.
But a good friend is equal to a library.!!

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Your experience on this site will be improved by allowing cookies Cookie Policy