Buy Now

Search

সোহাগি সাঁঝমল্লার [পর্ব-০৫]

সোহাগি সাঁঝমল্লার [পর্ব-০৫]

অফডে থাকায় বেলা দুইটায় বিছানা ছাড়ল সায়াহ্ন। মোবাইলে ঘড়ি দেখার পর ওর মনে পরল, মা আজ বাসায় নেই। কেননা এভাবে ঘুমানোর সুযোগ সব অফডে তে থাকে না ওর। বাসায় থাকলে মিসেস সরোয়ার সকালবেলা ওকে খাওয়াতে ডেকে তুলবেনই। সরোয়ার হামিদ আজ স্ত্রীকে নিয়ে পুরোনো এক প্রতিবেশীর দাওয়াতে গেছেন। দাওয়াত ছিল ওদের চারজনেরই। কিন্তু সায়াহ্ন বাসায় পরেপরে আরাম করার চেয়ে দাওয়াতে যাওয়াকে কখনোই মানতো না। ছুটির দিনটায় পছন্দের মুভি দেখবে বলে দিবাও যায়নি। কাধের পেছনদিক টিপতে টিপতে ঘুমুঘুমু অবস্থায় ড্রয়িংরুমে আসলো সায়াহ্ন। টিভি অন করে, সোফায় বসেবসে দিবা মোবাইল ঘাটছিল। একপলক ভাইয়ের দিকে চেয়ে মুখ ভেঙচিয়ে বলল,
– এসেছেন নবাব? এতক্ষণে ঘুম ভাঙল আপনার?
– হুম। একটু দেরিই হয়ে গেছে। কি করব বল? বাপের মন জুগিয়ে চলার চিন্তা মাথায় নিয়ে ঘুমাতে যাইনা তো।
রেগে ফোন রেখে মুভি চালু করল দিবা। জবাব দিয়ে সায়াহ্ন কিচেনে এগোলো। ফ্রিজ থেকে একবোতল জুস আর ব্রেডের প্যাকেট নিয়ে বসে গেল সোফায়। সেন্টার টেবিলে পায়ের ওপর পা তুলে ব্রেড মুখে পুরল। দিবা বলল,
– শুধুমাত্র বেড়ে খাওয়ার আলসেমোতে এসব গিলছিস! মাকে আর কত জ্বালাবি বলতো?
– মা জ্বলে না। তুই জ্বলিস।
– আমার এত সময় নেই যে তোকে নিয়ে জেলাস হব। তুই কাজের কথায় আয়। নিষ্কর্মা যখন হয়েছিসই, বিয়েটাও কর। যাতে তোর সব কাজ তোর বউ করে দেয়।
– আমার কাজ যাতে আরেকজন এসে করে দেয়, এজন্য আমার বিয়ে করা লাগবে?
– করবি না বিয়ে? তাহলে কি মানহা আপুকে এমনিএমনিই বাসায় নিয়ে আসবি?
– বিয়ে করব কি করব না সেটা পরে দেখছি। তুই আপাতত তোর এই ফালতু কথাবার্তার মাঝে মানহাকে আর টানা বন্ধ কর। She is totally out of it now. We broke up yesterday.
– কিহ?
. . .
– মানহা আপুও টিকল না? ও না একদম তোরমতো মেন্টালিটির ছিল? ছয় ছয়টা বছর বেছেবেছে একজনকে ধরেছিলি! সেটাও চলে গেল? এখন তাহলে তোর কি হবে ভাইয়া? মেয়ে কোথায় পাবি তুই? বিয়ে করবি কাকে?
চরম বিস্ময় নিয়ে বলল দিবা। ওর নাটকীয় ভাবকে পাত্তা দিলো না সায়াহ্ন। নিরস কন্ঠে বলল,
– রিমোট দে।
– দেখছিস না মুভি দেখছি?
– মোবাইলে দেখ যা! আমাকে রিমোট দে!
– না। আমি টিভিতেই দেখব!
এবারে সায়াহ্নর রাগ হয়। অপরপাশ থেকে রিমোট নেবে বলে হাত বাড়ালো ও। দিবা খপ করে নিয়ে নেয় রিমোটটা। কেননা ও ভালোমতোই জানে, এখন সায়াহ্নর হাতে রিমোট যাওয়া মানে সারাদিনে আর রিমোট হাতে না পাওয়া। সায়াহ্নর ধৈর্য ওই অবদিই ছিল। উঠে দাড়িয়ে সোজা দিবার ঘরে গেল ও। ড্রেসিংটেবিলের সামনে যেকয়টা প্রসাধনী পেল, সব নিয়ে এসে ড্রয়িংরুমের জানালার ঘেষে দাড়িয়ে বলল,
– রিমোট দিবি? নাকি এগুলো নিচে ফেলব?
হতবাক হয়ে বসে রইল দিবা। ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছেড়ে রিমোট সোফায় ছুড়ে মারল ও। হনহনিয়ে এসে ভাইয়ের কাছ থেকে জিনিসপত্র নিয়ে চলে গেল নিজের ঘরে। সায়াহ্ন জয়ের ভঙিতে হেলেদুলে সোফায় গিয়ে বসল। রিমোট হাতে নিয়ে পছন্দসই মুভি খুজতে লাগল। ঠিক সেসময়ই পাশে থাকা দিবার ফোনে আলো জ্বলে ওঠে। অনিচ্ছাকৃতভাবে সেদিকে তাকিয়ে টিভিরদিক ফিরেছিল সায়াহ্ন। কিন্তু সেকেন্ডের ব্যবধানে ওর মস্তিষ্ক ওকে মনে করিয়ে দিলো এইমাত্র দিবার ফোনের স্ক্রিনে কি দেখল ও। সায়াহ্ন তৎক্ষনাৎ ফোনের দিকে তাকায়। লক স্ক্রিনে একটা হোয়াটসঅ্যাপ নোটিফিকেশন। সেখানকার ম্যাসেজে বাংলিশে লেখা, “ তাহলে পাঁচটার দিকে পাড়ার পাবলিক লাইব্রেরীটায় চলে এসো।” আর ম্যাসেজদাতার নাম, Janu❤️
স্ক্রিনলাইট বন্ধ না হওয়া অবদি সায়াহ্ন একদৃষ্টিতে দিবার ফোনের দিকে চেয়ে ছিল। তারপর টিভি বন্ধ করে রুমে চলে আসলো ও। তারপর গোসল সেরে, ব্যালকনিতে গিয়ে সিগারেট ধরালো একটা। সাড়ে চারটার দিকে সায়াহ্ন যখন রুম থেকে বেরোল, দিবা তখন নিজের ঘরে ড্রেসিংটেবিলের সামনে। খোলা দরজা দিয়ে সায়াহ্ন বোনকে লিপস্টিক পরতে দেখল। অতঃপর টিভি অন করে সোফায় বসে গেল। দিবা একদম রেডি হয়ে গুনগুন করতে করতে রুম থেকে বেরোলো। ভাইয়ের সামনে এসে বলল,
– এখানে একটা পাবলিক লাইব্রেরী আছে, ওখানে যাচ্ছি। মাগরিবের আগেই চলে আসব। বাবা-মার আসতে তো দেরি হবে। তুই কি বাসায় থাকবি নাকি বেরোবি? আমি কি চাবি নিয়ে যাব?
– বেরোব। কিন্তু তোর চাবি নেওয়া লাগবে না।
– বাব্বাহ! আমার পরে বেরিয়ে তুই আমার আগেই বাসায় ফিরবি? ব্রেকআপ করে এত উন্নতি হয়ে গেল তোর?
সায়াহ্ন জবাব দিলো না। ওর চোখ টিভিতেই। দিবা উত্তরের অপেক্ষা করলো না। বেসিনের আয়নায় চেহারা দেখে, গলারদিকের চুল ঠিকঠাক করে বেরিয়ে গেল। ও চলে গেলে সায়াহ্ন তৎক্ষনাৎ টিভি বন্ধ করে ফেলল। নিচের ঠোট কামড়ে ধরে, কিছুটা সময় সোফায় চুপচাপ বসে রইল। তারপর চলে গেল নিজের ঘরে। কাবার্ড থেকে শার্ট বের করে গায়ে পরতে পরতে বেরিয়ে আসলো বাসা থেকে।
সায়াহ্নদের বাসা থেকে পাঁচমিনিট হাটলেই স্থানীয় গণগ্রন্থাগার। গুগল ম্যাপ দেখে দেখে লাইব্রেরীটার সামনে এসে দাঁড়াল সায়াহ্ন। লাল ইটের পুরোনো দেওয়ালের একতল বিল্ডিং এটা। দরজার দু পাশের দেয়ালের খোপে ছোটছোট ইনডোর প্লান্ট রাখা। সামনেই একটা নেমপ্লেটে খোদাই করা, “বইঘর। Founded by, Tarek Talukder” দরজার বাইরের দুই পাশেও বইয়ের স্তূপ। নাম না জানা লতানো গাছের সবুজ পাতা তাদের ওপর ঝুলছে। ভেতরে ঢুকলে কাগজের গন্ধ ধপ করে নাকে লাগে। সায়াহ্ন চারপাশ দেখল। ছোট্ট ঘর। মাথার ওপরে ধীরেধীরে ধুলোমাখা ফ্যান ঘুরছে। বইয়ের পাতা উল্টানোর শব্দ কানে আসছে। পায়ের নিচের শানবাধানো মেঝে। দেয়ালে বহু পুরোনো প্রচারপত্র, ছাপা পত্রিকাগুলো, হাতে লেখা নোটিস, পোস্টার আর পত্রিকা টাঙানো। কাঠের পুরোনো তাকে গাদাগাদি করে রাখা বই। সামনের তাকের সাথে দুটো সাইননোট। বই বা দিকে, পড়ার জায়গা ডান দিকে।
সায়াহ্ন বা দিকে এগিয়ে দিবাকে খুঁজতে লাগল। প দুটো বুকশেলফের মাঝের গলি দিয়ে এগোচ্ছিল। হঠাৎই চুড়ির আওয়াজ। পেছন ফিরল সায়াহ্ন। সেখানে টুলের ওপরে দাড়ানো মানবীকে দেখে ও একপ্রকার আটকে গেল। সালোয়ার কামিজ পরিহিত কোনো এক মেয়ে যে টুলের ওপর দাঁড়িয়ে শেলফে কিছু একটা করছিল, সেটা চোখে পরেছিল ওর। গুরুত্ব না দিয়ে তাকে পাশ কাটিয়ে চলে এসেছিল ও। কিন্তু সে মেয়েটা যে সাঁঝ হবে, তা কল্পনাও করেনি। হালকা গোলাপীরঙা থ্রিপিস, ওড়না গলার দুপাশ দিয়ে সামনে দেওয়া, কোমড় অবদি লম্বা চুল চুল কিছুটা উচুতে ঝুটি করা সাঁঝকে সায়াহ্ন সেদিন শাড়িতে কান্নারত অবস্থায় দেখেছিল। যারফলে আজকে চিনতে কিছু সময় লেগেছে ওর। ডানহাতে ওপরের তাক ঝারতে ঝারতে বাহাতে শেলফে দুবার বারি লাগাল সাঁঝ। ওর হাতের স্টিলের সরু চুড়িগুলো ঝুমঝুমিয়ে ওঠে। একবারের জন্যও নিচে না তাকিয়ে ও ডানহাতের পিঠে গলারদিক ডলা মারল। আবারো ঝাড়ায় ব্যস্ত হয়ে, বাহাতের আঙুলে ইশারা করল মেঝেতে জড়ো করে রাখা বইয়ের দিকে।
সায়াহ্ন টের পেল, বইগুলো সাজাবে বলে ওগুলো হাতে এগিয়ে দিতে বলছে সাঁঝ। কিছু একটা হয় সায়াহ্নর। আর সে কিছু একটা ছিল, সাঁঝের কাজে লাগার ইচ্ছা। টু শব্দটাও না করে বই হাতে তুলে নিলো ও। একটা একটা করে সাঁঝের হাতে দিতে থাকল। সাঁঝও কোনোদিক না তাকিয়ে সেগুলো শেলফে সাজাতে লাগল। যতটা মনোযোগ দিয়ে ও বই সাজাচ্ছিল, সায়াহ্ন ততটাই নিভৃতে ওকে দেখছিল। সাঁঝের হাতের চুড়ির রিমঝিম আওয়াজ ওকে যেন অন্য কোনোদিকে তাকাতেই দিলো না। সাঁঝের দিক চেয়েই বই তোলা, এগিয়ে দেওয়ার কাজ করছিল ও। কিছুসময়ের মধ্যেই মেঝেতে রাখা বই ফুরিয়ে যায়। হাত খালি হওয়ার সাথে হুঁশে ফেরে সায়াহ্ন। এখন কি করবে তা ভেবে পাচ্ছিল না। সাঁঝ গোড়ালি উচিয়ে তখনো শেলফের ফাঁকা জায়গা দেখছে আর বা হাত বাড়িয়ে বই চাইছে। দুবার চাওয়ার পরও যখন ওর হাতে কোনো বই আসলো না, বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে নিচে তাকালো ও।
নিচে দাড়ানো মানবকে দেখে সাঁঝের দৃষ্টি অনিয়মিতভাবে প্রসারিত হয়। আগেরদিনের পরিকল্পনামতো অভ্রকে নিয়ে লাইব্রেরী গুছাতে এসেছিল ও। এখানে তো এমুহূর্তে অভ্রর থাকার কথা। কিন্তু পরপরই মনে পরল, ক্লাসমেট দিবার আসার পর ওকে বই দেখাতে নিয়ে গেছে সে। আর সেখানে এখন খয়েরী শার্ট আর কালো ট্রাউজার পরিহিত সায়াহ্ন হামিদ দাড়ানো। ঘাড় উচিয়ে ওরদিকেই চেয়ে সে। আকস্মিকতায় পায়ের তলার মাটি সরে যাওয়া এরআগে কখনো এমন কিছু অনুভব করেনি সাঁঝ। কিন্তু দুদিন আগে অপবাদ দিয়ে ওর বিয়ে ভেঙে দেওয়া মানুষটাকে দেখে আজ ওর পায়ের তলার টুলটা ঢেউয়ের মতো দুলে উঠল যেন। সাঁঝ টালমাটাল হয়ে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারায়। অবলম্বন হিসেবে মাঝ বরাবর শেলফের বইও আঁকড়ে ধরেছিল ও। কিন্তু লাভ হয় না। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘটে অঘটন।
ধপাধপ বই পরার আওয়াজ শুনে চমকে ওঠে দিবা-অভ্র। দুজনেই এতক্ষণ একই টেবিলের উল্টোপাশে বসে বই পড়ার ভান করছিল আর মাঝেমাঝে দুজনের চোখাচোখি হয়ে গেলে লাজুক হাসছিল। অভ্রকে সাঁঝ কি কারণে লাইব্রেরীতে নিয়ে এসেছিল, সেকথা ভুলেই গিয়েছিল ও। কিন্তু ওকে ওর কাজ মনে করিয়ে দেয় লাইব্রেরীর শোরগোল। টেবিলে বসা বাকি তিনজনও মাথা তুলে তাকাল। অভ্র সামনে থাকা বইটা বুকে তুলে তৎক্ষনাৎ এলোমেলো পায়ে দৌড় লাগালো। অপ্রস্তুত হয়ে উঠে দাঁড়ায় দিবাও। দুজনেই দ্রুততার সাথে ওউ এগিয়ে আসে আওয়াজের উৎসের দিকে। কিন্তু আসার পর ওরা যা দেখল, নিজের চোখকে বিশ্বাসই হলো না ওদের।
সায়াহ্ন-সাঁঝ মুখোমুখি। টুলের ওপর দাড়ানো সাঁঝ সামনেরদিক হেলে আছে। দুহাতে ও সায়াহ্নর কাঁধের শার্ট খাঁমচে ধরা। আর সায়াহ্নর দুহাত ওর কোমড়ে। দুজনেই পাথরের মূর্তির মতো আটকে আছে। বড় হতে হতে দুজনের চোখই প্রায় বেরিয়ে আসার উপক্রম। ঠিক নিচেই সুজি ঘাড় উচিয়ে ওপরে তাকানো। থেমে আছে একইরকমভাবে। অভ্র স্বাভাবিক থাকলে হয়তো বলে ফেলত, “বরাবরের মতোই এই নাটকবাজ বিড়ালের নাটক থেমে নেই।” কিন্তু অভ্র স্বাভাবিক ছিল না। এতটুকু আওয়াজ বেরোলো না ওর মুখ দিয়ে। এরআগে বোনকে কখনো কোনো ছেলের সাথে কল্পনাও করেনি ও৷ অথচ সেই আপুই এ মুহুর্তে কারো এতটা কাছে, গা ছুঁয়ে দাড়ানো! আর সে মানুষটা আবার কে? সায়াহ্ন হামিদ! যে কিনা দুটোদিন আগে ভয়ংকরতম অপবাদ দিয়েছিল সাঁঝকে। অভ্রর মাথা ঘুরায়। চোখ ঝাপসা হয়। ওরসাথে দাড়ানো দিবার অবস্থাও সুবিধার না। ও জানে গতকালই মানহার সাথে ব্রেকআপ হয়েছে সায়াহ্নর। এরমধ্যে আজই সে আরেকজনের সাথে রোমান্স করতে আসবে না! তারওপর সে যখন হয় মাশফিক তালুকদারের বোন, তখন তো আরো না! তালুকদার নিবাসে হওয়া ঘটনা অভ্র ওকে বলেছিল। যেহেতু দিবা ভাইয়ের স্বভাবের সাথে পরিচিত, তালুকদার নিবাসে হওয়া তান্ডবের কারণটা ও বাবার থেকে জেনেছিল। দিবা সবে জমে থাকা সায়াহ্নকে ডাক দিতে যাবে, ওদের চারজনের কানে আসে,
– সাঁঝ!
মাশফিকের কন্ঠ শুনে চমকে ওঠে সবগুলো। একসাথে দরজায় তাকায় ওরা। মাশফিকের শক্ত চোখমুখ দেখে অভ্র ঢোক গিলল একটা। উপস্থিত চারজনের কোনোকিছু মনে না থাকলেও, সাঁঝের নিজের অবস্থান মনে পরে। হুড়মুড়িয়ে সরতে যাচ্ছিল ও। কিন্তু তাতে ঘটে উল্টোটাই। পায়ের তলার টুলটা পিছলে গিয়ে আবারো পরে যাওয়ার দশা হয় ওর। সায়াহ্ন মাশফিকের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সাঁঝকে সামলালো। তবে এবার ওদের পরিস্থিতি ছিল আরো অনাকাঙ্ক্ষিত। সাঁঝের কোমড় দুহাতে জড়িয়ে, ওকে শূণ্যে তুলে, ঘুরিয়ে সায়াহ্ন ওকে নিচে নামিয়েছে। সাঁঝ কিংকর্তব্যবিমুঢ়। এটুক সময়ে ঘটে যাওয়া এতসবের জন্য প্রস্তুত ছিল না ও। পায়ের তলায় মাটি ফেরত পেয়ে, একদন্ডের জন্য সায়াহ্নর দিকে চেয়ে ও ভাইয়ের দিকে ছুট লাগালো। কিন্তু মাশফিক ওরদিক তাকায়ই নি। পরিস্থিতি সামলাতে সাঁঝ হাত নাড়িয়ে ভাইকে কিছু বুঝাতে যাবে, তার আগেই পেছন থেকে কানে আসে,
– Sorry.
যতদূর অবাক হওয়া যায়, অবাক হয়েছিল দিবা। ওর মনেহলো ওর নিজের চোখকান ভুল দেখছে; ভুল শুনছে। এদেরকে খুলে, পরিস্কার করে পুনরায় জায়গামতো বসিয়ে দেওয়া উচিত। হাজারো বেপরোয়া কাজ করার পরও ভাইয়ের মুখে এই সরি শব্দটা দিবা কখনো শোনেনি। স্বয়ং সরোয়ার হামিদও ছেলের মাঝে কখনো অনুশোচনাবোধ জাগাতে পারেন নি। অথচ সেই সায়াহ্নই আজ সরি বলল। ওকে ঘুষি লাগানো, ওর কলার ধরা, মাশফিক তালুকদারের বোনকে সরি বলল! বিমূঢ় হয়ে পেছন ফিরল সাঁঝ। সায়াহ্নরের বরাবরের মতো সেই নির্বিকারচিত্ব। চারপাশ স্তব্ধ রইলেও মাশফিক তেতে উঠল। বোনকে পাশ কাটিয়ে সায়াহ্নর দিকে লম্বালম্বা পা ফেলে এগিয়ে যায় ও। কাধের ব্যাগটা পাশের টেবিলে রেখে, সায়াহ্নর দিকে হাতও বাড়াল। কিন্তু সায়াহ্ন ওর মারমুখো হাতটা ধরে ফেলে। মাশফিকের হাতকে নামিয়ে ধরে, পেছনে দাড়ানো সাঁঝের দিকে উঁকি দিলো ও। বলল,
– আজকের জন্য না। সেদিন সবার সামনে ওভাবে ওকথা বলার জন্য সরি।
শ্বাস আটকে সাঁঝ শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সেকেন্ডদুই সময় নিয়ে ওর বড়বড় চোখের বিস্ময়ের ভাষা বুঝল সায়াহ্ন। তারপর মাশফিকের দিকে চাইল। হাত ছাড়ানোর জন্য বেশ ভালোমতো জোর খাটাচ্ছে সে। কিন্ত পারছে না। সায়াহ্ন শান্তভাবে বলল,
– And you! Mr. Mashfique Talukder! সেদিন তোমার বোনকে সবার সামনে অপমান করেছিলাম বলে মেরেছিলে। কিছু বলিনি। আজকে তোমার বোনকে পরে যাওয়া থেকে বাঁচিয়েছি। আপ্যায়নের পরিবর্তে আজও যদি হাত তুলতে আসো, এই হাত কিন্তু ঠিক থাকবে না। And I mean it!
সায়াহ্নর মুঠোতে থাকা হাতখানা দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে, এমনটাই অনুভব হলো মাশফিকের। ওর চেহারায়ও ব্যথা ফুটে ওঠে। সায়াহ্ন ব্যপারটাকে আর বাড়ালো না। ছেড়ে দিলো মাশফিককে। তারপর ওর কিঞ্চিৎ এলোমেলো হয়ে থাকা কলারটা দুহাতের মুঠো করে, পরমুহূর্তেই সেটাকে ঠিক করার মতোকরে হাত বুলাল। আরকেউ না বুঝলেও মাশফিক বুঝল, ওরজন্য নিরব সতর্কবার্তা ছিল এটা। সেদিন ও যে সায়াহ্নর কলার ধরেছিল, সেটাও ভোলে নি সায়াহ্ন হামিদ। বাহাতে শার্টের ডানহাতা আরেকটু গুটিয়ে সায়াহ্ন দিবার দিকে তাকাল। একপলক ওর পাশের অভ্রকে দেখে নিয়ে, পুনরায় বোনের দিক তাকিয়ে বলল,
– তুই কি এখন ফিরবি? নাকি দেরি হবে?
কেয়ামত দেখতে চাইছিল না দিবা। আলামত অবদি ঠিক আছে। কিচ্ছুটি না বলে গুটিগুটি পায়ে ভাইয়ের কাছে চলে আসলো ও। ডানহাতের বৃদ্ধাঙৃগুল প্যান্টের পকেটে বাঝিয়ে বাইরের দিকে হাটা লাগাল সায়াহ্ন। মাশফিককে পাশ কাটিয়ে গেল একেবারেই গা ছাড়া ভঙ্গিতে। কিন্তু সাঁঝকে পাশ কাটানোর সময় কি ভেবে যেন দাঁড়িয়ে গেল। সাঁঝ নড়েচড়ে দাড়ায়৷ সায়াহ্ন নমনীয় আওয়াজে বলল,
– সেদিন জেদের বশে তোমার নামে অনেকবেশি বাজে শব্দের ব্যবহার করে ফেলেছি। তোমার বিয়ে ভাঙার ইন্টেনশনও আমার ছিল না। পারলে ঘটনাটা ভুলে যেও। Sorry again.
দিবা এবারেও বড়বড় চোখে বিস্ময় এঁটে ভাইকে দেখল। যে ছেলে জীবনে একবারও সরি বলেছে কিনা সন্দেহ, সে ছেলে আজ একাধারে তিনবার সরি বলে ফেলল। কয়েকসেকেন্ড সাঁঝের চোখে চেয়ে জবাবের অপেক্ষা করেছিল সায়াহ্ন। কিন্তু সে জবাব দিলো না। নির্বোধের মতো চেয়ে ছিল শুধু। সায়াহ্ন আর দেরি না করে লাইব্রেরী থেকে বেরিয়ে গেল। পেছনপেছন চলে গেল দিবাও। ওরা গেলে সাঁঝ সামনে দাঁড়ানো মাশফিকের পিঠের দিকে তাকিয়ে রইল। তার দুহাত শক্তমুঠো। আর সামনে দাড়ানো অভ্র শুকনো ঢোক গিলছে। মেঝেতে হাটাহাটি করে এতক্ষণের কাহিনী দেখা সুজি এবার লাফিয়ে টুলটার ওপরে উঠে বসল। মায়াভরা চাওনিতে দেখতে লাগলো মাশফিককে। বেচারা তার আদরের বোনকে আজ শত্রুর বাহুডোরে দেখেছে। শত্রুর সাথে পেরে উঠল না, সাঁঝকে কিছু বলতেও পারবে না। আর সবচেয়ে কষ্টের যেটা, যাকে বলতে পারবে, যারসাথে দুনিয়ার রাগ খাটাতে পারবে, সে অভ্রর কাহিনীটাই মাশফিক মিস করে গেছে। ও জানলোও না, ওর ছোট ভাই, ওরই শত্রুর বোনের প্রেমে মজেছে। আহারে মাশফিক তালুকদার! আহারে!

চলবে…
written by: মিথিলা মাশরেকা

Olindo Rahman

Olindo Rahman

A good book is worth a hundred good friends. 
But a good friend is equal to a library.!! 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Your experience on this site will be improved by allowing cookies Cookie Policy