বাসায় ফিরে, কপাল চেপে ধরে ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে গেল সায়াহ্ন। কোনো কথা বলল না। কিন্তু দিবার চুপ থাকা কষ্টকর ছিল। নিজের ঘরে না গিয়ে ভাইয়ের সামনে দাড়াল ও। মাশফিক তালুকদারের সাথে সায়াহ্নর রেষারেষি ইতিমধ্যে ওর আর অভ্রের জন্য সুখবর না। প্রথমদিনে বাইক পোড়ানো নিয়ে ঝামেলা, আর এরপর সাঁঝের সমন্ধের দিনের মারামারি, দুই নিয়ে দুজনে বেশ ভালোই চিন্তায় ছিল। এরমাঝে আজকে আবার সাঁঝকে কোলে তোলার কাহিনী, আবারো মাশফিকের মারমুখী আচরণ, আর সায়াহ্নর ওর কলার ধরে ধমকি দিয়ে আসা! কোনোকিছুই দিবার অনুকুলে ঠেকছিল না। যদি না সায়াহ্ন আজ লাইব্রেরীতে যেত, এসবের কিছুই ঘটত না ওখানে। তাই পুরো দোষটা ভাইয়ের কাধে চাপাল দিবা। ঈষৎ রাগ নিয়ে বলল,
– ঘোরার জায়গা পাচ্ছিলি না? জীবনেও লাইব্রেরীতে পা না দেওয়া জীব, তুই আজ লাইব্রেরীতে গিয়েছিলি কেন?
কপাল থেকে হাত নামিয়ে সায়াহ্ন বোনের দিকে তাকালো৷ দিবা আদতেও বুঝে ওঠেনি, ওর ভাই কেন গণগ্রন্থাগারমুখী হয়েছিল। দাঁতে দাঁত চেপে, অতিকষ্টে সায়াহ্ন সংবরণ করল নিজেকে। চিবিয়ে চিবিয়ে জবাব দিলো,
– তোর জানুকে দেখতে!
– মানে?
গুনে গুনে চারটে ভাজ পরে দিবার কপালে। সায়াহ্ন কোলের কুশন পাশে সোফায় ছুড়ে মেরে উঠে দাঁড়াল। খেঁচানো আওয়াজে বলল,
– প্রেম করার জন্য আর ছেলে পেলি না? শেষমেশ ওই মাশফিক তালুকদারের ভাই?
দিবা ঢোক গিলল একটা। বুঝে উঠল, সব শেষ। কিছু করার নেই আর। আগ্নেয়গিরিতে ভুমিকম্পটা ওই তুলেছে। এখন অগ্নুৎপাত তো হবেই। কিন্তু দিবা তখনো বুঝে উঠল না ওর আর অভ্রর বিষয়ে সায়াহ্ন টের পেল কিকরে। সামাল দেওয়ার শেষ চেষ্টাটা করতে, আরো একটা ঢোকে গলা ভিজিয়ে বলল,
– ক্ কিসব বলছিস? প্রেম কিসের? অভ্র আমার ক্লাসমেট!
– কি ধরনের ক্লাসমেটের নাম হোয়াটসঅ্যাপ কন্টাক্টে জানু আর লাভ ইমুজি দিয়ে সেইভ করা থাকে, তা আমার বেশ ভালেমতোই জানা আছে। তোকে বলতে হবেনা!
ধরাটা ঠিক কিভাবে খেয়েছে, তা দিবার বুঝতে বাকি রইল না আর। কথা বলাই এবার ভুলে গেল ও। সায়াহ্ন একহাত কোমড়ে, আরেকহাতে চুল উল্টে অস্থিরভাবে এদিক ওদিক দেখল। ফের বোনের দিকে চেয়ে অবিশ্বাসী কন্ঠে বলল,
– একটা কথা বলতো দিবা? তোর ক্লাসে বা আশেপাশে কি আরকোনো ছেলে ছিল না? আর কোনো যুতসই. . .আচ্ছা যুতসইও লাগবে না! কোনো লেংড়া, খোঁড়া, টোকাইও কি এসে প্রপোজ করেনি তোকে? এতবড় হয়েছিস, কখনো কোনো সেলিব্রিটি ক্রাশও কি ছিল না তোর? যেখানে, যারসাথে প্রেম করতে হতো, আমাকে বলতি! আমি হ্যান্ডেল করতাম সবটা! এই শালা অভ্র তালুকদারই কেন?
“প্রেম শুরুর ছ মাসের মধ্যে যে ওর ভাই আর আমার ভাইয়ের মধ্যে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাধবে, তা কি আমি জানতাম?”
মনের কথাটা মনেই মাটিচাপা দিলো দিবা। মুখে আর আনলো না। কথা বলার মুখই তো ওর নেই। বোনকে চুপ দেখে সায়াহ্ন দম নিলো। গলা ঝেরে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল। এদিকওদিক দুবার পাইচারী করে, পুনরায় বোনের সামনে দাড়িয়ে গিয়ে বলল,
– আচ্ছা! যা হওয়ার, হয়েছে। তুই আমাকে ব্যস এটা বল, এসবের শেষ কোথায়? আইমিন তোদের এই ছেলেখেলা প্রেমের ভ্যালিডিটি আর কতোদিনের?
প্রসারিত চোখে দিবা ভাইয়ের দিকে চায়। সায়াহ্ন এমনভাবে চেয়ে আছে ওর দিকে, সে ধরেই নিয়েছে অভ্র আর ওর প্রেমটা নেহাতই সময় কাটানো, আবেগ। কোনোরকমের ভবিষ্যৎ নেই এর। কিন্তু বিষয়টা তো এমন না। আর মিথ্যা বলার উপায়ও ওর নেই। তাই ভাইয়ের থেকে দৃষ্টি সরাল দিবা। থতমত কন্ঠে বলল,
– F. . .for eternity.
সায়াহ্ন পুনরায় প্রসারিত চাইল। ওর ষোলো বছরের বোন, ওর সামনে বসে ওকে জানাচ্ছে, তার আর অভ্র তালুকদারের প্রেমের সম্পর্কের স্থায়ীত্ব নাকি চিরন্তনের জন্য। ‘সায়াহ্ন হামিদ হাসিমুখে মাশফিক তালুকদারকে ট্রে ভরা মিষ্টি এগিয়ে দিচ্ছে’ চোখের সামনে এ হেন দৃশ্য ভেসে উঠতেই তৎক্ষনাৎ চেচিয়ে উঠল সায়াহ্ন। বলল,
– এখন ওই মাশফিক তালুকদারকে আমার বেয়াইসাহেবের ট্রিট দেওয়া লাগবে?
আঁতকে উঠে মাথা সর্বোচ্চ নিচু করে নিলো দিবা। সমানে হাত কচলাতে লাগল। বোনকে ভয়ার্ত দেখে সায়াহ্ন চোখ বন্ধ করে নিলো। একটা দম ফেলে শান্ত করলো নিজেকে। তারপর চোখ মেলে, দিবার হাত ধরে ওকে সোফায় এনে বসালো। কিচেন গিয়ে জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢেলে, নিজেও বোনের পাশে বসে গেল। সায়াহ্ন পানির গ্লাস এগিয়ে দিলো দিবাকে। দিবা কাচুমাচু হয়ে বসে ছিল। কিন্তু এবার অবাক হয়। এই ভাইকে তো ও নিজেও কোনোদিন পানি ঢেলে খাওয়ায় নি। আজ সেই সায়াহ্নই ওকে এভাবে পানি এগিয়ে দিচ্ছে? পানির গ্লাসটা হাতে নিচে দুইঢোক খেয়ে ওটা সামনের টেবিলে রেখে দিলো দিবা। সায়াহ্ন এবার ওকে বেশ নমনীয়তার সাথে বলল,
– দেখ দিবা, তোর প্রেম করা নিয়ে আমার কোনো সমস্যা নেই। কখনো ছিল না বা থাকবেও না। এই বয়সে একজনের প্রতি ভালো লাগা কাজ করবে, আবেগ আসবে, এমনটাই হয়। এটাই স্বাভাবিক। তাই মায়ের হাজারবার বলা সত্ত্বেও আমি কখনো তোকে স্টক করিনি। উল্টো মাকে বলেছি তোর সাথে ফ্রেন্ডলি ব্যবহার করতে। আমি নিজেও মানহার বিষয়টা একারণেই তোদের জানিয়েছিলাম যাতে তুই বুঝতে পারিস, আমাদের নিজেদের লাইফ নিয়ে সবধরণের ভালো ডিসিশন নেওয়ার স্বাধীনতা আমাদের আছে। বাবা মা সেখানে কোনো আপত্তি করবে না।
আর বাবা তো অলরেডি তোর বেস্টফ্রেন্ড।
তাই আমার ধারণা ছিল তুই কোনো ভুলপথে যাবি না। তোর লাইফে কেউ চলে আসলে তুই নিজেথেকেই আমাদের জানাবি। এজন্য কাল তোর ফোনে অভ্রর টেক্সট নোটিফিকেশন দেখে আমি অবাক হয়েছিলাম। ভাবছিলাম আমরা বন্ডিংয়ে ঠিক কোথায় কমতি রেখেছি যে তোর মনে হলো আমরা কখনো তোকে সাপোর্ট করব না। এতোএতো স্বাধীনতার দেবার পরও তোর কেন মনে হলো তুই কাউকে পছন্দ করছিস সেটা আমাদের জানানো যাবে না। আমাদের ভুলটা কোথায়?
ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে গিয়ে চোখ ভরে উঠেছিল দিবার। সায়াহ্নর বলা শেষ হলে পুনরায় মাথা নিচু করে নিলো ও। একসেকেন্ড চুপ থেকে, হুট করেই শব্দ করে কেঁদে ফেলল। সায়াহ্নর কথায় কোনোদিন ওর অপরাধবোধ হবে, আর সেটাও এতোবেশি, দিবা তো তা কোনোদিন কল্পনাও করে নি। ওদিকে সায়াহ্ন বিমূঢ়। যখন ধমক দিলো, তখন কাদলো না। এখন এত সুন্দর করে বুঝিয়ে বলার পর এভাবে কাদছে, নারীজাতির এই হিসেবই মিলল না ওর। বোনকে টিস্যুবক্স এগিয়ে দিলো সায়াহ্ন। দিবা টিস্যুতে নাক মুছতে মুছতে অস্ফুটস্বরে বলল,
– I'm sorry. Sorry!
– কেন?
– মাথামোটা তোর বোঝা লাগবে না!
সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে বসল সায়াহ্ন। গমগমে আওয়াজে বলল,
– লাইব্রেরিতে গিয়েছিলাম তোর চয়েজ দেখতে। তোকে স্টক করতে না বা তোর জানুকে পেটাতে না। তুই যদি এসব ভেবে কাঁদতে থাকিস তো থাক! I'm not going to say sorry.
– হ্যাঁ। আমাকে কেন সরি বলবি তুই। তুই তো সরি বলবি সাঁঝ আপুকে।
সায়াহ্ন আটকায়। ঘাড় কাৎ কারে তাকিয়ে রইল বোনের দিকে। দিবা মাথা তুলল। লাল করা নাকচোখ আর ফোলানো গাল নিয়ে বলল,
– তাও একবার, দুইবার না। তিন তিনবার!
বোনের থেকে দৃষ্টি সরায় সায়াহ্ন। লাইব্রেরীর পুরো ঘটনা মনে পরে যায় ওর। পরে যেতে উদ্যত সাঁঝের কোমড় ধরা, বড়বড় চাওনি, কাঁধে সাঁঝের হাত, ওকে শূণ্যে তুলে টুল থেকে নিচে নামানো। দিবা দেখল ভাই ঢোক গিলছে। ও নিজেই এবার সায়াহ্নর দিকে পানির গ্লাস বাড়িয়ে দিলো। সায়াহ্ন কিছুটা হতচকিতভাবে পানির গ্লাস হাতে নিলো। দুইঢোকে পুরো গ্লাস শেষ করে বলল,
– বাবা-মাকে অভ্রর বিষয়ে এখনই কিছু বলিস না। যখন বলার হয় আমি বলে দেবো।
মাথা ওপরনিচ করলো দিবা। সায়াহ্ন শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে একদৃষ্টিতে পানির গ্লাসের দিকে চেয়ে রইল। তবে ওর ভাবনায় পরার কারণ দিবা-অভ্র না। নাইবা মাশফিক। ওর ভাবনার কারণ সেই ভাসাভাসা চোখের অধিকারিনী। অভ্র তালুকদার আর মাশফিক তালুকদারের বোন, সাঁঝ!
•
রাত এগারোটা। ডিনার শেষে তালুকদার নিবাসের সবাই এখন যে যার ঘরে। মাশফিক নিজের ঘরে পাইচারি করতে করতে ফাইল দেখছিল। এরমাঝে দরজায় চুড়ি ঠুকরানোর আওয়াজ কানে আসে ওর। হাতের ফাইল আর চোখ বন্ধ করে ফেলল মাশফিক। একটা বড় দম নিয়ে চোখ মেলল ও। পেছন না ফিরে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
– কিছু বলবি?
গুটিগুটি পায়ে ঘরে ঢোকে সাঁঝ। সোজা এসে মাশফিকের সামনে দাড়াল ও। বোনকে বরাবরের মতো স্থির দেখল মাশফিক। সাঁঝ সময় অপচয় করলো না। দুহাতের ইশারায় বুঝাল,
– রাগ করেছিস?
– রাগ কেন করব?
জবাবের পরিবর্তে উল্টো প্রশ্ন করে ফাইলসহ দুহাত পেছনে বাধল মাশফিক। সাঁঝ আড়চোখে ভাইয়ের পেছনে তাকাল। পুনরায় ভাইয়ের দিক তাকিয়ে বুঝাল,
– তাহলে বাসায় ফেরার পর ঠিকমতো কথা বলছিস না কেন?
– ব্যস্ত আমি। অফিস থেকে কাজ. . .
হাত দিয়ে ভাইকে থামিয়ে দিলো সাঁঝ। বোনের প্রতিক্রিয়া দেখে মাশফিক হার মানল। চুপচাপ ফাইলটা বিছানায় ছুড়ল ও। নিরস দৃষ্টিতে চেয়ে রইল সাঁঝের দিকে। সাঁঝ বুঝল ভাইয়ের ভাব। ও যে আবারো ঝামেলা না করতে মাশফিককে বোঝাতে এসেছে, সেটা মাশফিক পছন্দ করবে না, তারই অগ্রিম প্রতিক্রিয়া দিচ্ছে সে। তবে দমতে প্রস্তুত ছিল না সাঁঝ। হাত নেড়ে বোঝাল,
– এইযে আমি হাত পা না ভেঙে ঠিকঠাক তোর সামনে দাড়িয়ে আছি, এটা কি কি তোর পছন্দ হচ্ছে না? তুই চাচ্ছিলি আমি টুল থেকে পরে যাই?
– তোর এটা মনে হয়?
– না। এজন্যই বুঝছি না তুই রাগ কেন করছিস।
– তুই দেখলি না? ও আমার হাত ধরেছিল!
– কারণ তুই ওনাকে মারতে গিয়েছিলি।
কলার ধরার কথাটা আর তোলাই হলো না মাশফিকের। দ্বিতীয়বার হার মানল ও। অবশ্য এটা নতুন না। প্রতিবার মাশফিক রেগে গেলে এভাবেই সাঁঝ ওকে থামিয়ে দিয়ে যাবে। গোটা ঘটনাটাই এমনভাবে ওর সামনে তুলে ধরবে যে মাশফিকের মনে হবে, এখানেই থেমে যাওয়া উচিত। সাঁঝ ভাইয়ের চেহারা পরখ করলো। অতপর বুঝাল,
– গোটা ঘটনাটাই একটা দূর্ঘটনা ছিল। এ নিয়ে তুই ওই লোকের সাথে কোনোরকমের ঝামেলা করবি না। মনে থাকবে?
বাধ্যানুগতর মতো মাথা ওপরনিচ করল মাশফিক। সাঁঝ আশ্বস্ত হলো। মিষ্টি হাসির সাথে ভাইকে ‘গুডনাইট’ বুঝিয়ে নিজের ঘরে চলে আসলো ও। সুজি তখন বিছানার ঠিক মাঝখানে চারপা চারদিক ছড়িয়ে ঘুমোচ্ছিল। দরজায় দাড়ানো সাঁঝ কোমড়ে হাত দিয়ে হতাশায় মাথা ডানেবামে দুলাল। তারপর এগিয়ে গিয়ে আলতোহাতে তুলল সুজিকে। নিজে ঠিকঠাকমতো বসে ওকে শুইয়ে দিলো পাশে। কিন্তু সাঁঝ পড়ার জন্য কোলের ওপর বইটা রাখতেই সুজি এসে অতি আয়েশে বইয়ের ওপর বসে গেল। সাঁঝ বুঝল, রাত বেড়েছে। সুজি এখন ওকে আর পড়তে দেবে না। নিচ থেকে বইটা সরিয়ে বেডসাইড টেবিলে রাখল ও। ঘড়ি দেখার জন্য মোবাইলটা হাতে নিয়েছে, ঠিক তখনই ওর হোয়াটসঅ্যাপে ম্যাসেজ আসে একটা। সাঁঝের চাওনি প্রসারিত হয়। যথেষ্ট এডিট করে প্রোফাইলে ছবি যোগ করা ম্যাসেজকারীকে চিনে ফেলল ও। কেননা ছবিটা সেই ভদ্রলোকের, যার সাথে দুদিন আগে ওর সমন্ধ ভেঙেছে। সাঁঝ দুদন্ড সময় নিলো। কিছু একটা ভেবে, ওপেন করলো ম্যাসেজটা। তাতে লেখা,
‘ সাঁঝ, সেদিন তোমাদের বাসায় মায়ের কথার ওপর কিছু বলতে পারিনি। তোমার ভাই-বাবাও আমাকে কিছু বলার সুযোগ দেননি। নিজের কাছে নিজেকে প্রচন্ড ছোট লাগছে সাঁঝ। আমি তোমার সাথে একবার দেখা করতে চাই। প্লিজ মানা করো না! প্লিজ!’
চলবে…
written by: মিথিলা মাশরেকা
Leave a comment
Your email address will not be published. Required fields are marked *