Buy Now

Search

সোহাগি সাঁঝমল্লার [পর্ব-০৮]

সোহাগি সাঁঝমল্লার [পর্ব-০৮]

সাঁঝের ঘরের বড় জানালাটার সাথে ঠেকিয়ে কাঠের বেঞ্চসদৃশ একটা বসার জায়গা করা। এ জায়গাটা মাশফিক আলাদা করে বানিয়েছে। জানালার ধারে বোনের বই পড়ার জায়গা হিসেবে। আপতত ওখানেই দুইপা তুলে বসে আছে সাঁঝ। বাহাতে পা জড়িয়ে, ডানহাতের কনুই হাটুতে ঠেকিয়ে, কপাল চেপে ধরে চেয়ে আছে অভ্রর দিকে। সাঁঝের পাশে সুজিও আছে। তার চাওনিও অভ্রর দিকে। আর অভ্র কিছুটা সামনে পড়ার টেবিলের সামনের চেয়ারে বসা। টেবিলে থাকা ছোট্ট উপন্যাসের বইটা নাড়াচাড়া করছে আর একটু পর পর আড়চোখে বোনকে দেখছে ও। পরিবেশটা দেখে যে কারো শুরুতে এটাই মনে হবে, এ ঘরে অভ্র আসামী, যে কিনা পুকুর চুরি করতে গিয়ে ধরা পরেছে; সাঁঝ বিরোধীপক্ষের উকিল, যে এখনি অভ্রকে প্রশ্ন দিয়ে পাকড়াও করবে; আর সুজি মহামান্য বিচারপতি। ও ব্যস বসেবসে সব শুনবে, দেখবে। বেশকিছুটা সময় পর পা নামিয়ে সোজা হয়ে বসল সাঁঝ। নুপুরের আওয়াজ কানে আসে অভ্রর। চোখ তুলে সেদিকে তাকাল ও। সাঁঝ ইশারায় বুঝাল,
– তুই ওই লোকের সাথে দেখা করে আসছিস?
বোনের সোজা প্রশ্নে অভ্র অবাক হলো না। আস্তেকরে মাথা ওপরনিচে ঝাঁকিয়ে হ্যাঁ বুঝাল। সাঁঝ ছোট্ট একটা শ্বাস ছাড়ল। মাগরিবের আজানের সে সেসময়টায় সায়াহ্ন হামিদ কেবল ওর হাত না, শ্বাসও আটকে দিয়েছিল। নির্বিকার ভঙিতে বলেছিল,
– গার্ডিয়ান সাজছো? Ussss! এজন্যই তোমার ভাইয়ের সাথে কথা বলতে চাইছি। মাগরিব পর ওকে মোড়ের দোকানে পাঠিয়ে দিও। নাহলে আমিই তালুকদার নিবাসে আসব৷ তবে আমার মনে হয়না তখন ব্যপারটা খুবএকটা ভালো হবে।
বলাশেষে সাঁঝের হাত ছেড়ে দিয়েছিল সায়াহ্ন। চলে গিয়েছিল ওখান থেকে। সাঁঝের মনেহলো ওসময় শুধু ওর হাত না, দম ছাড়া পেয়েছে। সুজিকে নিয়ে তৎক্ষণাৎ তালুকদার নিবাসে ফিরেছিল ও। কিন্তু অভ্র নামাজের বেশঅনেকটা সময় পর ফিরেছে। অতএব এটা স্বাভাবিক যে সাঁঝ বুঝে যাবে, ওর ভাই এটুকো সময় কোথায় ছিল। ড্রয়িংয়ে সবার সন্ধ্যের চা নাশতা শেষে ও তাই রুমে ডেকে নিয়ে এসেছে অভ্রকে। সে সত্যিই সায়াহ্ন হামিদের সাথে দেখা করে এসেছে শুনে সাঁঝ শুধালো,
– কেন?
– উপায় ছিল না।
– কেন??? কি এমন করেছিস যে তোর ওনার সাথে কথা বলা ছাড়া উপায় থাকবে না?
নামিয়ে রাখা দৃষ্টি অভ্র আবারো বোনের দিকে তুলল। বল মারার বিষয়টা সাঁঝ আসার পথে শুনেছে হয়তো। তাই অবুঝের মতো ওটাকেই কারণ ধরে জবাবের আশায় বসে আছে সে। কিন্তু ওর কেন'র জবাব তো ওটা না। আর ওকে সত্যিটাই বলতে হবে। ইতস্তত করতে করতে গলার পেছনদিকে হাত বুলাল অভ্র। একটা ঢোক গিলে বলে ফেলল,
– ত্ তেমন কিছুনা। সায়াহ্ন হামিদের বোনের সাথে প্রেম করছি।
তুতলিয়ে, অতিকষ্টে ‘তেমন কিছুনা’ শব্দদুটো যোগ করেছিল অভ্র৷ তবুও ও যে কথাটার আগে তেমন কিছুনা যোগ করলো, সে কথাটা শুনে সাঁঝ পাথর হয়ে যায়। ভাইয়ের দিকে অবিশ্বাসী চেয়ে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল ও। দিবা যে সায়াহ্নর বোন, এটা লাইব্রেরি থেকে আসার দিন ওকে অভ্র বলেছিল। এরবাইরে আর কথা হয়নি ওদের। ছোটভাই যে সেই ক্লাসমেটের সাথেই প্রেম করছে, এমনধারার কিছু তো সাঁঝ ভাবনাতেও আনেনি। সময় নিলো সাঁঝ। তারপর ধীরেধীরে হাত নেড়ে বুঝাল,
– তুই দিবাকে. . .?
পুনরায় চোখ নামিয়ে নিয়ে অভ্র মাথা ওপরনিচ করে। ভাগ্যিস এই প্রশ্নটার জবাব এভাবে দেওয়া যায়। নাহলে এটা তো ও মুখ দিয়ে কোনোমতেই বের করতে পারত না। এই প্রশ্নে সাঁঝের সামনে ও নিজেই বোবা। বেশ কিছুটা সময় পর উঠে দাঁড়ালো সাঁঝ। অভ্র চোখ তুলে বোনকে দেখল, অতঃপর আবারো চোখ নামিয়ে নিলো। সাঁঝ এসে ভাইকে ধরে দাঁড় করালো। এতক্ষণ চুপচাপ বসে থাকলেও সুজি যেন এবার মজা পায়। লাফিয়ে জানালার ওখান থেকে নেমে, পড়ার টেবিলে এসে চড়ে বসলো ও। এখান থেকে সাঁঝ-অভ্র দুজনকেই কাছাকাছি, মুখোমুখি দেখা যাবে। সাঁঝ অভ্রকে চড় থাপ্পড় দিলে, সেটা 4K রেজুলেশনে দেখার তৃপ্তিও পাওয়া যাবে। কিন্তু সুজির মনোবাসনা পুরণ হলো না। অভ্রর গালে কোনো চড় পরলো না। সাঁঝ বিস্ময় বজায় রেখে ভাইকে বুঝাল,
– কবে থেকে চলছে এসব?
– এ্ এসএসসির পরীক্ষার হলে পরিচয়। একসাথে সিট পরেছিল। এরপর কথাবার্তা বাড়ে, দুইজনে একই কলেজে ফার্স্ট চয়েজ দেই। ওর অবশ্য রেজাল্ট ভালো, চাইলেই শহরের বেস্ট কলেজটায় ভর্তি হতে পারত। কিন্তু আমার জন্যই. . .
চাওনি প্রসারিত হয় সাঁঝের। ও জানতো ওর ছোটভাই ছোটবেলা থেকেই প্রচুর দুষ্টু। কিন্তু তাইবলে মাধ্যমিকের পরীক্ষা দিতে গিয়ে যে সে প্রেমের সূচনা করে আসবে, তা ওর কল্পনাতেও ছিল না৷ আবারো প্রশ্ন করলো,
– এটা তোর প্রেম করার বয়স?
– প্রেম করতে বয়স লাগে না আপুই।
‘ হ্যাহ্?’ ভঙিতে কপালে ভাঁজ পরে যায় সাঁঝের। আপনমনে দিনকালের হিসেব করতে লাগল ও। এইতো সেদিন, মায়ের কোলে তোয়ালে পেঁচানো একটা বাচ্চা ছেলেকে দেখেছিল ও। হুল্লোড় করতে করতে তালুকদার নিবাসের সবাইকে নিজের রাখা নাম বুঝিয়েছিল। বাচ্চাটাকে ওর দেওয়া নামেই ডাকা হয়। অভ্র। আধহাত অভ্রকে বড় হতে হতে সাঁঝ এই এতবড় হতে দেখল। সেই অভ্রই আজ নাকি ওর সামনে বসে ওকে প্রেমের ইশতিহার দিচ্ছে, প্রেম করতে বয়স লাগে না। অভ্র আর চোখ তুলে তাকাচ্ছে না। সাঁঝ দ্রুত পলক ফেলে নিজেকে সামলালো। পুনরায় ভাইয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। বুঝাল,
– তুই জানিস তোর এই প্রেমের ফিলোসোফি ভাইয়া, বাবা বা চাচ্চু জানলে কি হবে?
ঢোক গিলল অভ্র। এই ঘটনা তিন তালুকদার জানলে কি হবে, সেটা ওর চেয়ে ভালো আর কে জানে? কোনোমতে বলল,
– এজন্যই তো তোকে বললাম। ত্ তুই সামলে নিবি। তুই না আমার ভালো আপুই?
সাঁঝ অসহায়ের চোখে ভাইকে দেখল। এতবছর তো ও সামলেই নিয়েছে। তবুও আজ বলার কিছুই পেলো না। বা হয়তো বলল না, ‘ সামলে নেওয়ার মতো কাজ করে সামলে নিতে বলতি?’ ছোট্ট একটা দম ফেলে হতাশা দুর করার চেষ্টা করলো সাঁঝ। বুঝাল,
– আর ওদিকে দিবার পরিবার?
– ওর ফ্যামিলি অনেক স্বাধীনচেতা মনোভাবের। এসিপি বাপকে দিবা সবসময় বাপি বাপি করে তুলে রাখে। ওনাকে নিয়ে সমস্যা নেই। সমস্যা যা ছিল, তা ছিল সায়াহ্ন ভাইয়াকে নিয়ে। কিন্তু. . .
সায়াহ্নর সাথে সমস্যা শব্দটাই সাঁঝ আশা করছিল। অভ্রর কথা শেষ করার আগেই ওর মনে পরে যায়, অভ্র সায়াহ্নর সাথেই দেখা করে আসছে। অস্থিরভাবে ভাইয়ের থুতনি ধরলো সাঁঝ। অভ্রর মুখচেহারা ডানেবামে ঘুরিয়ে পর্যবেক্ষণ করে, হাত ধরে এপিঠ দেখতে লাগল। অভ্র বুঝল, সাঁঝ দেখতে চাইছে সায়াহ্ন ওকে কোথাও মেরেছে কিনা। বোনকে স্থির করতে তাই নরম আওয়াজে বলল,
– মারেনি। মেনেছে।
সাঁঝ চমকে উঠে থেমে যায়। ওর মনে হলো, অভ্র ভুল বলেছে। সায়াহ্ন হামিদের সম্পর্কে ওর বলার কথা, ‘ মানেনি। মেরেছে।’ কিন্তু ও বলেছে উল্টোটা। সাঁঝ ভাইয়ের চেহারা মনোযোগ দিয়ে দেখল। অভ্রর প্রতিক্রিয়া উল্টো বলার মতো ছিল না। এবার সাঁঝের মনে হলো, ওই তাহলে ভুল শুনেছে। জীবনে প্রথমবারের মতো ভয় হলো ওর। তবে কি বলার সাথেসাথে ওর শোনাতেও সমস্যা হচ্ছে? অভ্র জোর করে একটুখানি হাসি ফুটালো চেহারায়। বলল,
– অবাক হয়েছিস না আপুই? আমিও হয়েছিলাম। ভাইয়াকে যেটুকো চিনেছিলাম, আমি তো ভেবেই নিয়েছিলাম দেখা করতে গেলে ক্যালাবে ধরে। কিন্তু মারেটারে নি বুঝলি? উল্টো বুঝিয়েছে।
ভাইয়ের কথা সাঁঝের এখনও বিশ্বাস হলো না। বলার ক্ষমতা না থাকায় বোঝার ক্ষমতাটা ওর বেশ সুক্ষ্ম। যারফলে কোন কথার কতোটুকো গভীরতা, সেটা ধরে ফেলে ও। ইশারায় শুধাল,
– বুঝিয়েছে? কি বুঝিয়েছে?
– ওই! আমাদের বয়স কম।
– ব্যস? আরকিছু বলেনি?
মুখে হাসি বুকে ব্যথা, প্রচলিত লাইনটা মনে পরে গেল অভ্রর। ওউ জানে, সাঁঝের বিশ্বাস করার মতো কথা ও বলে নি। অল্পবয়সী বোন কারো সাথে প্রেম করছে, এটা জানার পর কোনো ভাই তো ওই প্রেমিকের সাথে মধু মেশানো বাক্য ব্যবহার করবে না। সায়াহ্নও করে নি। অথচ আজকের মাগরিবের নামাজশেষে মুনাজাতে এর বিপরীতটাই চেয়েছিল অভ্র। মসজিদ থেকে বেরিয়ে ও যখন গুটিগুটি পায়ে মোড়ের চায়ের দোকানে গিয়েছিল, সায়াহ্ন তখন উল্টোপাশ হয়ে ফোনে কথা বলতে ব্যস্ত। বামহাতে তার ফোন কানে ধরা, ডানহাতে জ্বলন্ত সিগারেট। ঢোক গিলল অভ্র। এগিয়ে গিয়ে বলল,
– ভ্ ভাইয়া?
সায়াহ্ন পেছন ফিরল। অভ্রকে দেখে ‘ পরে কথা বলছি’ বলে ফোন কাটল। হাতের অর্ধেক জ্বলা সিগারেটটায় আরো দুটো টান দিয়ে, সেটার ধোঁয়া কাধের পাশে উড়িয়ে দিলো। তারপর সিগারেটটা নিচে ফেলে, সেটা পায়ে পিষে ডানহাত প্যান্টের পকেটে গুজে দাড়াল। সামনেরজনের নড়চড় দেখে অভ্রর শরীরে কাঁপন ধরে যায়। সায়াহ্ন ঘাড় কিঞ্চিৎ বাকিয়ে, বেশ স্বাভাবিক ভঙিতে ওকে জিজ্ঞেস করলো,
– বয়স কতো তোমার?
মাথা খালি হয়ে গিয়েছিল অভ্রর। সায়াহ্নর সামনে দাড়িয়ে ও নিজের জন্মতারিখ মনে করতে পারলো না কোনোমতেই। যারফলে বয়সও হিসাব করে উঠতে পারল না। সায়াহ্ন দিবার ভাই, ব্যস ওটুকোই মাথায় ছিল অভ্রর। তাই মস্তিষ্ককে ৩৬০° কোনে ঘুরিয়ে নিজের বয়স হিসাব করতে লাগল ও। এদেশে ছেলেদের বিয়ের বয়স একুশ, যেটা ওর হবে ভার্সিটিতে যাওয়ার পর। আপাতত ও পড়ে ইন্টারে। তাহলে এখন ওর বয়স উনিশ বছর। অভ্র ঠাস করে জবাব দিয়ে বসলো,
– জ্ জ্বী, উনিশ বছর ভাইয়া! উনিশ বছর!
– কানের নিচে একটা পরলে জন্মের সাল, মাস, তারিখ, বার, সময় সব মনে পরে যাবে। দেবো?
তৎক্ষণাৎ বা হাতে নিজের বাম গাল চেপে ধরলো অভ্র। জন্মতারিখটা ঠিক সেসময়ই ওর মস্তিষ্ক অতিক্রম করে। আট সালের পাঁচ মার্চ। দ্রুততার সাথে ডানহাত তুলে আঙুলের দাগ গুনতে গুনতে বয়স হিসেব করতে লাগল অভ্র। এক, দুই. . .সতেরো। সতেরো! ওর বয়স সতেরো! কেবিসির এককোটির প্রশ্নটার জবাব খুঁজে পাওয়ার মতো খুশি হয়ে, গাল থেকে হাত নামিয়ে সামনে তাকলো অভ্র। কিন্তু সায়াহ্নর চোখে চোখ পরতেই খুশি গায়েব হয়ে যায় ওর। সায়াহ্ন বেশ আগ্রহের সাথে বলল,
– তো সতেরো বছরের ট্যাবলেট, তুমি ঠিক কোন উদ্দেশ্যে আমার বোনকে প্রোপোজ করেছিলে বলোতো? শুনি একটু?
অভ্রর চারপাশ ধাধিয়ে যায়। ওর মনে হলো, ওর আত্মা ওর দুই কান দিয়ে বের হয়ে গেছে। নিজেকে রক্তশূণ্য অনুভব করতে পারছিল অভ্র। সায়াহ্নর সামনে বোবা হয়ে গিয়ে, দিবার জন্য মনেমনে দুটো লাইন পেশ করলো ও। ‘ এ কার সামনে দাড় করালি বইন? এই তোর ভাই সব মেনে নিয়েছে?’
সায়াহ্ন একপলক হাতের ঘড়িটা দেখে পুনরায় অভ্রর দিকে তাকাল। বলল,
– আচ্ছা নার্ভাস হবার প্রয়োজন নেই। নার্ভাস হলে মানুষকে আরোবেশি কালো দেখায়৷
অভ্র কিছুক্ষণ অবুঝের মতো সায়াহ্নর দিক চেয়ে থেকে নিজেরদিকে তাকাল। ওদের তিন ভাইবোনের মধ্যে সাঁঝ তুলনামুলক উজ্জ্বল গরনের। তারপর ও, তারপর মাশফিক। মধ্যম হওয়া সত্ত্বেও ওকে কেউ কোনোদিন কালো বলেনি! এমনকি ধবধবে ফর্সা দিবাও না! তাহলে? নিচদিকে তাকিয়ে নিজের হাত আর সায়াহ্নর হাত পর্যবেক্ষণ করল অভ্র। দোকানের সাদা এনার্জি বাল্বের আলোতে যেটুক বুঝল, সায়াহ্ন আর ওর গায়ের রঙ একই। তবুও কালো বলতে ঠিক কি বুঝালো এই মানুষটা? অভ্র আবারো সায়াহ্নকে বলতে শুনল,
– এভাবে ঝুঁকে দাঁড়ালে মেরুদন্ড ক্ষয়ে হাইট আরো কমে যাবে।
এটাও খোঁটা ছিল। পাঁচফুট ছয়ের অভ্রর এবার মাটিতে লুটিয়ে পরতে মনে চাচ্ছিল। ইচ্ছা করছিল সায়াহ্ন হামিদের পা জড়িয়ে হাউমাউ করে কান্না করার। নাকের পানি, চোখের পানি এক করে বলার, ‘ ছেড়ে দিন ভাইয়া। এ মুহুর্ত থেকে আপনার বোনকে আমি চিনি না।’ অভ্র বুঝে গেল, সায়াহ্ন হামিদ ওদের প্রেম কোনো মানেটানে নি। এই প্রেমের আর কোনো ভবিষ্যৎ নেই। দিবা ওর দিবাস্বপ্ন হয়েই রয়ে যাবে। অতএব সায়াহ্নর সাথে এখানেই কথা শেষ করা জায়েজ হবে। কিছু বলতে যাবে, তারআগেই সায়াহ্ন বলল,
– আচ্ছা? এইযে তোমার কলিজাটা যে বুক পেরিয়ে সারাদেহের কোনায় কোনায় পৌছে গেছে, এটা তোমার ফ্যামিলির কেউ জানে?
অভ্রর দম আটকে আসছিল। মনে হচ্ছিল সায়াহ্ন কথা দিয়েই ওর গলা চেপে ধরেছে। আস্তেধীরে মাথা ডানেবামে দুলালো অভ্র। সায়াহ্ন এবার মৃদ্যু হেসে অভ্রর কাধে হাত রাখল। ওকে সাথে করে হাটা লাগিয়ে বলতে লাগল,
– গুড! এবার আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনো অভ্র। আমি যতদুর ধারণা করছি, বাসায় গেলে তোমার বোন তোমাকে জিজ্ঞেস করবে, তুমি আমার সাথে দেখা করেছ কিনা। তুমি সুন্দরমতো তাকে জবাব দেবে, হ্যাঁ। করেছ! এরপর সে তোমাকে জিজ্ঞেস করবে, কেন? তুমি এবারেও তাকে সত্যিটাই বলবে। বলবে আমার সাথে দেখা করার কারণ, তুমি দিবাকে পছন্দ করো। বুঝেছ?
– কিন্তু আপুইকে কেন. . .
– আমি বলেছি তাই।
প্রশ্ন শেষ করার আগেই জবাব পেয়েছিল অভ্র। সাথে পেয়েছিল ওর দিকে তাকিয়ে, ওর কাধ ধরে হাটতে থাকা সায়াহ্ন হামিদের বড়সড় একটা মাসুম হাসি। যেটা একবিন্দুও ওর মাসুমতাকে প্রকাশ করছিল না। অভ্র জিহ্বায় তালা ঝুলাল। আর একটাকথাও বলবে না ও এখানে। সায়াহ্ন পুনরায় সামনে তাকিয়ে হাটতে হাটতে বলল,
– And now, the most important thing! আমি দিবাকে আজঅবদি কখনো স্টক করিনি। ভবিষ্যতেও করব না। কিন্তু এখন যখন জেনে গেছি দিবা তোমাকে পছন্দ করে, তুমি আমার স্টকে থাকছো। And it’s your responsibility to make sure that, আমি তোমার ভালো দিকগুলোই দেখছি। তুমি দিবার পড়াশোনা, সুখ, সম্মান; কোনোটার জন্য ক্ষতিকর নও।
বলতে বলতে সায়াহ্ন থামল। পাশ থেকে ঘুরিয়ে, অভ্রকে সামনাসামনি দাড় করাল। এককাধে তো ইতিমধ্যে হাত ছিল ওর। এবার অভ্রর আরেককাধও হাত রেখে, কাধ ঝুঁকিয়ে ওরসাথে উচ্চতা বরাবর করলো সায়াহ্ন। কিছুটা জোরে চেপে ধরে, ওর হাত-কাধ দেখতে দেখতে হাসিমুখে বলল,
– কেননা তুমি যদি দিবার জন্য ক্ষতিকর হওয়াটা তোমার জন্য ক্ষতিকারক। এমন হলে তোমার এই সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে যাওয়া কলিজাটা আমার হাতে, আর তোমার শরীরের সবকটা হাড় তোমার কোলে থাকবে অভ্র তালুকদার। I, myself will make sure of that. তালুকদার নিবাসে পঙ্গু হয়ে বসেবসে “The Shayanno Show” শোনা ছাড়া তোমার জন্য আরকিছু অবশিষ্ট রাখব না আমি। তুমি বুঝেছ অভ্র, আমি ঠিক কি মিন করেছি?
জমাট বেধে থাকা অভ্রর শরীরে এবার যেন বাড়তি গতিতে রক্তসঞ্চালন শুরু হয়। ওর প্রাথমিক ধারণা ভুল ছিল না। সায়াহ্ন হামিদের নজর সত্যিই ওর শরীরের হাড়গোড়ের দিকে। সাথে যোগ হয়েছে ওর কলিজাটাও। আর ঠিক সে মানুষটারই হাতের তলায় থেকে জবাব হিসেবে ও না সূচক কিছু কল্পনা করবে কিকরে? মাথা দুলিয়ে হ্যাঁ বোঝানোটাই একমাত্র অপশন ছিল অভ্রর। আর ও সেটাই করেছিল। অভ্র তালুকদারের হ্যাঁসুচক জবাবে খুশি হয়েছিল সায়াহ্ন হামিদ। অভ্রর কাঁধ ছেড়ে দিলো ও। দুহাতের থাবা থেকে ছাড়া পেতেই অভ্র আশপাশে তাকাল। ততক্ষণে ওরা সেই মোড়টায়, যেখান থেকে দুজনের বাসার পথ দুদিকে যায়। “Bye” বলে নিজের বাসার দিকে চলে যায় সায়াহ্ন। আর অভ্র রওনা হয় তালুকদার নিবাসের দিকে।
সায়াহ্ন হামিদের সাথের এই দুঃস্বপ্নের মতো সাক্ষাৎটাকে ভুলতে মাথা ঝারা মারল অভ্র। বাইরে যাই কিছু ঘটে যাক না কেন, আপাতত বোনের কাছে সায়াহ্নর বলা কথাগুলোকে মাত্রাধিক সহজভাবে প্রকাশ করতে হবে ওকে। বলল,
– ও্ ওইতো, বয়স কমের কথাই বলেছে।
– এখন তুই কি করবি?
‘ কিছু করলে সায়াহ্ন হামিদ আমার হাড়গোড় ভেঙ্গে দেবে, কিছু না করলে সে আমার ফুরিয়ে আসা কলিজাটা বের করে ফেলবে। এবার তুইই বল আপুই, আমি এখন কি করব?’
অভ্র মনের কথাটা মুখে আনলো না। সাঁঝ আবারো ওকে নিজের প্রশ্ন স্মরণ করালে ক্লান্তস্বরে বলল,
– পড়াশোনা।
ভাইকে আরোকিছু বলতে যাচ্ছিল সাঁঝ। ঠিক তখনই একটা বিকট আওয়াজ কানে আসে ওর৷ চমকে উঠে একবার দরজায়, আরেকবার একে অপরের দিকে তাকাল দুই ভাইবোন। অভ্র নিজের করণীয় বুঝে ওঠার আগেই সাঁঝ হরিণীর মতো ছুট লাগালো। দরজার বাইরে ওর উড়তে থাকা ওড়নাটা চোখের আড়াল হলে অভ্র হুঁশে ফিরে। ‘বৌমা!’ বলে চেচিয়ে উঠে, ছুট লাগালো ওউ!

চলবে…
written by: মিথিলা মাশরেকা

Olindo Rahman

Olindo Rahman

A good book is worth a hundred good friends. 
But a good friend is equal to a library.!! 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Your experience on this site will be improved by allowing cookies Cookie Policy