Buy Now

Search

সোহাগি সাঁঝমল্লার [পর্ব-১০]

সোহাগি সাঁঝমল্লার [পর্ব-১০]

 কপালের ভাজ আর ক্ষিপ্ত চোখমুখে সায়াহ্ন হামিদের রাগ স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছিল। নিসন্দেহে, ওর রাগ হবার কারণ ছিল। সকালের শো শেষ করে ব্রেকে কফিশপে এসেছিল সায়াহ্ন। সেখানে এসে প্রথমে কামরুল, এরপর সাঁঝকে চোখে পরবে, সেটা ও ভাবেও নি। শুরুতে সাঁঝকে দেখে ধরে নিয়েছিল সে হয়তো কামরুলের সাথেই দেখা করতে এসেছে। ওদের মাঝে সবটা ঠিক হয়ে গেছে হয়তো। সাঁঝের বিয়ে ভাঙার অনুশোচনাটা কমে আসবে এই ভেবে সায়াহ্ন বেশকিছুটা খুশিই হয়েছিল। কিন্তু ওর খুশি দীর্ঘস্থায়ী হয়না। কয়েকটেবিল পিছনে বসা ও কিছুক্ষণের মধ্যেই টের পায়, সাঁঝ কামরুলের সাথে দেখা করতে আসেনি। বরং ও কামরুলকে উপেক্ষা করতে চাইছে। আর কামরুল ওকে ছাড়ছে না। সাঁঝ যখন অস্বস্তি নিয়ে বারবার দরজায় উঁকিঝুঁকি দিচ্ছিলো, তখন সেখানে অভ্রকে দেখেছিল সায়াহ্ন। বোনকে একা ছেড়ে বাইরে দাড়িয়ে ফোনে কথা বলছিল সে। সায়াহ্নর মেজাজ খারাপ হতে সময় নেয়নি। ও এগোচ্ছিল অভ্রকে ডাকবে বলে। কিন্তু তার আগেই এই তিন ছেলের কথাবার্তা ওর কানে আসে। সায়াহ্নর বুঝতে সময় লাগেনি, সেসব কথাবার্তার উদ্দেশ্য ছিল, সাঁঝ!
সায়াহ্নর এমনিতেও নিজেকে সামলানোর স্বভাব নেই। যারফলে আজও ওর নিজেকে সামলানো হলো না। সবটুকো ক্ষোভ নিয়ে চড় মেরেছে ও সুজিকে কোলে নেওয়া ছেলেটাকে। তবে সেকেন্ড দশেক পার হবার পর বোঝা গেল, কেবল চড় দিয়েও সায়াহ্ন থেমে থাকতে পারছে না। মাঝের দাড়ানো ছেলেটার গেঞ্জির বুকের দিকটা খপ করে মুঠো করে নিলো ও। টেনে একেবারে কাছাকাছি দাড় করালো নিজের। যদিও ছেলেটার সাথের দুজন ওকে পেছনদিক টেনে ধরেছিল, তবে তা কাজে দেয়নি। সায়াহ্ন ছেলেটার চেহারার একদম সামনে মুখ এনে, দাঁতে দাঁত চেপে রইল। অভ্রর বুক ধুকপুকায়। এখানে কি হবে তার আন্দাজ করতে পারছিল না ও। তবে ভালো কিছু হবে না, এটা আন্দাজ করতে পারছিল। সায়াহ্ন ছেলেটাকে কিছু বলতে যাবে, তখনই পেছন থেকে সুজি আওয়াজ করে ওঠে। চোখ বন্ধ করে বড় একটা দম নিলো সায়াহ্ন। ঝারা মেরে ছেলেটাকে ছেড়ে দিলো ও। বাহাতে বুকে ধাক্কাও লাগিয়েছে ওর। ছেলেটা টালমাটাল হয়ে তিনচারপা পিছিয়ে যায়। সাথের ছেলেদুজন ওকে ধরে বেরিয়ে যেতে বলে। গালে হাত বুলাতে বুলাতে, আশপাশ দেখে চলে যায় ছেলেটা। সায়াহ্ন পেছন ফিরল। ওর চোখমুখ দেখে সাঁঝ আরেকটু গুটিয়ে দাড়াল। এবার একপলক আশপাশ দেখল সায়াহ্ন। সবাই যেন জোরপূর্বক দৃষ্টি সরালো ওর থেকে। শক্ত চোখমুখ নিয়ে এগিয়ে এসে কামরুলের মুখোমুখি দাঁড়াল ও। ঘাড় নাড়িয়ে পাশের সাঁঝকে বুঝিয়ে বলল,
– ও যে এতক্ষণ হলো তোমার থেকে ছাড় চাইছে, বোঝো নি তুমি?
কামরুল থতমত খেয়ে যায়। উত্তর না দিয়ে সাঁঝের দিকে চেয়ে রয় ও। যেন কি জবাব দেবে, সে পরামর্শ চাইছে। সায়াহ্ন আবারো বলল,
– What? তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি! ওরদিকে কি দেখছ?
– আমি. . .আমি আপনাকে চিনি না। আপনার সাথে কথাও বাড়াতে চাইছি না। সাঁঝ?
কামরুল এগোতে যাচ্ছিল। সুজিকে কোলে ধরে একপা পিছিয়ে গেল সাঁঝ। আর বাধা পেয়ে থেমে যায় কামরুলও। নিচে তাকিয়ে দেখল, ওর বুকে হাত ঠেকিয়ে সায়াহ্ন হামিদ ওকে থামিয়ে দিয়েছে। ওর আর সাঁঝের মাঝখানটায় এসে দাড়িয়েছে সে। কামরুল দুবার করে সায়াহ্নর হাত দেখল, তারপর ওর চেহারা। কিন্তু তাতে সামনেরজনের কিছু আসলো গেল না। সে একেবারেই শান্ত ভঙ্গিতে বলল,
– ওউ তোমার সাথে কথা বাড়াতে চাইছে না। I think you better leave.
পরিস্থিতি খুব একটা ভালোর দিকে যাচ্ছিল না। অভ্রর দম গলায় আটকে রইল। ছুটে এসে সায়াহ্নকে ডাক লাগাল ও। সায়াহ্ন কামরুলের বুক থেকে হাত নামিয়ে মাথা নাড়িয়ে ওকে ইশারা করলো চলে যাওয়ার জন্য। কামরুল বুকের দিকের জামায় হাত বুলাল। অতঃপর সাঁঝকে দেখে নিয়ে বেরিয়ে গেল কফিশপ থেকে। ওর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে ছিল অভ্র৷ কিন্তু কামরুল চোখের আড়াল হওয়ার পরও ও আর পাশে তাকালো না। মুলত ওর তাকানোর সাহস হচ্ছিল না। কেননা ও জানে, পাশে দাড়িয়ে থাকা সায়াহ্ন হামিদ ওরদিকেই তাকানো। আর হোক না হোক, তার সবটুকো রাগ এখন ওরই ওপর। সায়াহ্ন অভ্রর তাকানোর জন্য অপেক্ষা না করে বলল,
– নিজের বোনকে তুমি দেখে রাখতে পারো না অভ্র। আমার বোনের সম্মান তুমি কিকরে রাখবে?
অভ্র বিস্ফোরিত চোখে তাকাল সায়াহ্নর দিকে। একই অবস্থা সাঁঝেরও। দু ভাইবোনের প্রতিক্রিয়া বিন্দুমাত্র গায়ে না মেখে সায়াহ্ন স্পষ্ট গলায় অভ্রকে বলল,
– দিবাকে ভুলে যাও।
অভ্র বজ্রাহতের মতো দাড়িয়ে রয়। সাঁঝের দিক তাকিয়ে সায়াহ্ন প্যান্টের পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করলো। কাউন্টারে গিয়ে বিল দিয়ে, কোনোদিক না তাকিয়ে বেরিয়ে গেল কফিশপ থেকে। অভ্র-সাঁঝ দুজন যে যেখানে ছিল, মূর্তির মতো দাড়িয়ে রইল সেখানেই। সায়াহ্ন দৃষ্টিসীমার বাইরে গেলে সাঁঝ তারপর ভাইয়ের দিকে তাকাল। এটুক সময়ে কি থেকে কি হয়ে গেল? এখানে যতো অস্বস্তিতে পরতে হয়েছে, সেটা তো ওকে পরতে হয়েছে। অপমান যা ফেইস করার, ও করেছে। এসবের মাঝে দিবা কোথা থেকে আসলো? সায়াহ্ন হামিদই এমন কথা কেন বলে গেল? এখন অভ্রকে কিকরে সামলাবে সাঁঝ? কি বুঝ দেবে ওর এই আবেগী ভাইকে?

– আমি না বলা অবদি তুই অভ্রর সাথে কোনোরকম কন্টাক্ট করবি না।
দিবা চমকে ভাইয়ের দিকে তাকায়। মনোযোগ দিয়ে পড়ছিল ও। এরমাঝেই হুট করে এমন কথা কানে আসলে, কে না চমকাবে? সায়াহ্ন দিবার রুমের খোলা দরজার বাইরে দাড়িয়ে ছিল। বোনকে তাকাতে দেখে ভেতরে ঢুকল ও। আস্তেধীরে এসে দিবার টেবিলের ওপর বসল। দিবা বুঝল, ও ভুল দেখছে বা শুনছে না। সায়াহ্ন ওর ঘরে। আর ওকে বলছে অভ্রর সাথে যোগাযোগ না করতে। তবে এহেন কথা বলে সায়াহ্নর কোনো বাড়তি হেলদোল নেই। সে বোনের দিক চেয়ে হাতঘড়ি খুলতে খুলতে বেশ স্বাভাবিক ভঙিতে বলল,
– তুই শুনেছিস আমি কি বলেছি?
– কেন বললি?
– তুই প্রেম করছিস জেনে আমি কিন্তু তোকে জিজ্ঞেস করিনি, কেন করলি।
ভাইয়ের দিক তাকিয়েই দিবা ধপ করে বইটা বন্ধ করে ফেলল। বিকেলে ম্যাসেজ করেছিল ও অভ্রকে৷ সে রিপ্লাই দেয়নি। আর এখন ভাইয়ের এমন কথা! দুম করে সিদ্ধান্ত ঘুরিয়ে ফেলার লোক সায়াহ্ন হামিদ না। ভাইকে এটুক চেনে বিধায় দিবার কোনো হিসেবই মিলল না৷ ও ভাবতে লাগল অভ্রর দিক থেকে কি হতে পারে। সায়াহ্ন একপলক বইটা দেখল, আরেকপলক সামনে চেয়ারে বসা দিবাকে। বলল,
– Decision is your's. আমার কথা মানার জন্য আমি অভিয়াসলি তোকে জোর করব না।
– আমার তোকে বুঝে আসে না ভাইয়া!
– আপাতত ফটোসিন্থেসিস বোঝ। ভাইয়া-এনালাইসিস তোর সিলেবাসে নেই বোধহয়৷
দিবার মাথার ঠিক মধ্যিখানে আঙুল দিয়ে আলতোকরে চুলকিয়ে, মুচকি হেসে বেরিয়ে গেল সায়াহ্ন৷ ভাই চলে গেলে বিমূঢ় দিবা টেবিলে কনুই ঠেকিয়ে কপাল চেপে ধরলো। সায়াহ্নের কথাটা বলার কারণ বুঝে না আসলেও আন্দাজ লাগালো ও। আজকে অভ্র কলেজ যায়নি। প্রথম সেমিস্টারের রেজাল্ট দিয়েছে ওদের। বরাবরের মতো দিবার রেজাল্ট ভালোই এসেছে। কিন্তু কাহিনী করেছে অভ্র। তার দুই বিষয়ে টেনেটুনে পাশ এসেছে। এভাবে চলতে থাকলে সে কি করে উচ্চমাধ্যমিকে ভালো করবে? কি করে ভালো ভার্সিটিতে ভর্তি হবে? আর পড়াশোনায় ডাব্বা মারা এই ছেলের সাথে ওর ভাই ওকে মানবেই বা কেন?
সায়াহ্ন একহাতে শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে নিজের ঘরে আসলো। মোবাইল, মানিব্যাগটা বিছানায় ছুড়ে সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। শাওয়ার শেষে মাথার ভেজা তোয়ালেটা ছুড়ে মারলো বিছানাতেই। কাধ ঘুরিয়ে আড়মোড়া ছাড়তে ছাড়তে সায়াহ্ন সবে ব্যালকনির দিকে পা বাড়িয়েছে, তখনই কানে আসে,
– তাইতো বলি! সামনের বিল্ডিংয়ের দোতলার মেয়েদুইটা দুইদিন হলো এটাওটা চাইতে আমাদের বাসায় কেন আসছে!
সায়াহ্ন বিস্ময়ে পেছন ফেরে। মিসেস সরোয়ার ট্রে তে দুইকাপ চা সমেত রুমে ঢুকলেন। হেসে মাথা দুলালো সায়াহ্ন। এগিয়ে গিয়ে একহাতে একটা কাপ, আরেকহাতে ফোল্ডিং চেয়ার টেনে ব্যালকনিতে চলে আসলো। মিসেস সরোয়ারও আসলেন চায়ের কাপ হাতে। সায়াহ্ন রেলিংয়ে কাপ রেখে, চেয়ার খুলে মাকে বসার জন্য নতমস্তকে হাতের ইশারা করলে প্রসারিত হাসির সাথে বসে গেলেন তিনি। সায়াহ্ন চায়ের কাপ হাতে বিনব্যাগে বসতে বসতে বলল,
– তো কি আবিষ্কার করলে? কেন আসে মেয়েদুটো?
– এইযে! আমার হ্যান্ডসাম ছেলেটা অফিস থেকে এসে খালিগায়ে বারান্দাবিলাস করে যে! এরই একঝলক ওরা দেখে ফেলেছে হয়তো!
সায়াহ্ন হেসে ফেলল। চায়ে চুমুক দেওয়া শেষে মিসেস সরোয়ার হঠাৎ রুষ্ট হলেন। শাসনের ভঙ্গিতে বললেন,
– আমি সিরিয়াস সায়াহ্ন! ওরা সত্যিই দুদিনে পাঁচবার এসেছে এ বাসায়!
– ভালো তো! পুরোনো বাসাটার মতো এখানেও তোমার ছেলের ওপর মেয়েরা ফল করছে! এমন ডিমান্ডিং ছেলেকে নিয়ে তোমার গর্ব করা উচিত মা!
– তোর ডিমান্ডিং হয়ে লাভ আছে কোনো? মেয়েরা তোকে চাইলে হবে? তোকেও তো কাউকে চাইতে হবে নাকি?
– মানহাকে চেয়েছিলাম তো।
– ওটাকে চাওয়া বলে না। ইন নিড, গিভ এন্ড টেকের মিউচুয়াল এগ্রিমেন্ট বলে!
সায়াহ্ন আটকালো। ওর-মানহার ছাড়াছাড়ির বিষয়টা দিবা যখন জেনেছে, সেটা ওর-বাবা মায়ের কান অবদি যাবে, এবিষয়ে ও নিশ্চিত ছিল। কিন্তু এরপর তাদের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে তা ধারণা করার সুযোগ পায়নি। তাইবলে মিসেস সরোয়ার যে প্রতিক্রিয়া দিচ্ছেন, এটা কখনোই ধারণা করতো না ও। চা শেষ করে কাপ রেলিংয়ে রাখল সায়াহ্ন। দু হাতের কনুই দু হাটুতে ঠেকিয়ে, মায়ের দিকে ঝুঁকে বসে বেশ আগ্রহে বলল,
– তাহলে চাওয়া কাকে বলে?
মিসেস সরোয়ার একটা ছোট দম ফেললেন। পায়ের ওপর তুলে রাখা পায়ে কাপ-পিরিচ ঠেকালেন। নরম হাসিসমেত বললেন,
– চাওয়া হলো পাগলামির নাম। সব করতে পারার নাম, সব ছাড়তে পারার নাম।
– কিন্তু একটা মানুষ আরেকটা মানুষের জন্য কিকরে কিছু ছাড়ে? নিজের ছাড়া আরেকজনের জন্য কিকরে পাগলামি করে? কেউ কাউকে কেন চায় মা?
– ভালোবাসে বলে।
মায়ের দেওয়া দুইশব্দের জবাব শুনে কিছু তো হয় সায়াহ্নর। ওর হাসিটা কমে আসে ক্রমশ। ঝুঁকে বসা থেকে আস্তেধীরে সোজা হয়ে বসে গেল ও। এই এক ভালোবাসা শব্দে সায়াহ্ন হামিদ যে সায়াহৃন শো'র কতোকতো পর্ব পার করে দিয়েছে, তার হিসেব নেই। এমনকি ও নিজেও তো মানতো, প্রেম করছি মানহার সাথে, ওকেই ভালোবাসি। সায়াহ্ন জানতো চাওয়া হলো আকর্ষন, আর আকর্ষণ হলো জৈবিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু আজ মায়ের কথায় ওর থিওরির সম্পূর্ণ বিপরীত কিছু ছিল। চাওয়া মানে পাগলামো, আর মানুষ মানুষকে চায় ভালোবেসে! ভালোবাসা এতোটাও সহজ নয়, যতোটা সহজ করে ও বলেছে, ধারণ করেছে। শব্দটার ব্যাখা কঠিন! সায়াহ্ন হামিদের বুঝের বাইরে হবার মতো কঠিন!

চলবে…
written by: মিথিলা মাশরেকা

Olindo Rahman

Olindo Rahman

A good book is worth a hundred good friends. 
But a good friend is equal to a library.!! 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Your experience on this site will be improved by allowing cookies Cookie Policy