শাড়ীর আঁচলে হাত মুছতে মুছতে মিসেস মোশাররফ দরজার দিকে এগোলেন। বিকেলের এ সময়টায় কলিংবেল বাজায় কিছুটা অবাকই হয়েছেন তিনি। তালুকদার নিবাসের বড় তিন পুরুষ যে যার কর্মক্ষেত্রে। আর অভ্র খেলার মাঠে। এসময় কারো ফেরার কথা না। দরজায় খুলতেই বাইরে দাড়ানো অল্পবয়সী মেয়েটাকে দেখে মিসেস মোশাররফ আরেকটু বিস্মিত হলেন। পরনে টপস আর ঢোলা জিনস, গলায় স্কার্ফ ঝুলানো, কাধ অবদি চুল আর হাতে বই ধরে রাখা অচেনা মেয়েটা তাকে দেখে জোরালো হাসি দিলো একটা। বলল,
– স্ স্লামালাইকুম আন্টি। কেমন আছেন?
– ওয়াআলাইকুমুসসালাম. . .হ্যাঁ আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। তুমি ভালো আছো?
সৌজন্যে হেসে প্রশ্ন করলেন মিসেস মোশাররফ। মেয়েটা কিছুটা নিভুনিভু আওয়াজে প্রতিত্তোর করলো,
– জ্বি। আন্টি ওই. . .আমি. . .আসলে. . .
– হ্যাঁ মা বলো? কাউকে খুঁজছ?
– হ্যাঁ আন্টি। আসলে আমি সাঁঝ আপুর একটা বই নিয়েছিলাম। পড়া শেষ, ওটা ফেরত দেওয়ার ছিল। তাই. . .
– ও আচ্ছা! সাঁঝের বই ফেরত দিতে এসেছ তুমি? এসো এসো! ভেতরে এসে বসো।
পরিচয় জিজ্ঞেস না করেই ভদ্রমহিলা ভেতরে যেতে বলছেন দেখে দিবা অবাক হয়। অভ্র ওকে নিজের পুরো পরিবারের ছবি দিয়েছিল। যারফলে মিসেস মোশাররফের সাথে তালুকদার পরিবারের বাকি সবাইকেই চেনে ও। মিসেস মোশাররফ হাসিমুখে ওকে ড্রইংরুমে নিয়ে আসলেন। গুটিগুটি পায়ে তালুকদার নিবাসে ঢুকল দিবা। চোখ ঘুরিয়ে ও ছিমছাম সাজিয়ে রাখা বাসাটার প্রতিটা কোনা কোনা দেখে নিলো। মিসেস মোশাররফ হাতের ইশারায় বসতে বললে বসে গেল দিবা। ভদ্রমহিলা কিচেনের দিকে এগোতে এগোতে বললেন,
– তুমি একটু বসো। সাঁঝ ওপরতলায় ওর বৌমার কাছে। আমি কল করে দিচ্ছি ওকে।
দিবা হ্যাঁ সুচক মাথা দুলালো। মিসেস মোশাররফ নম্বর ডায়াল করে ফোন একপাশে রেখে আম কাটতে লাগলেন। সোফায় বসে দিবা দেখল সবই। মিসেস মোশাররফের ফোন লাউডস্পিকারে ছিল। কল রিসিভ করে ওপাশ থেকে কেউ বলল,
– হ্যাঁ আপা বলো।
– রুবি? সাঁঝকে একটু নিচে পাঠা তো। বল ওরসাথে. . .
বলতে গিয়ে মিসেস মোশাররফ থামলেন। দিবার দিক ফিরে গলা উচিয়ে শুধালেন,
– নাম কি তোমার মা?
– দিবা।
– হ্যাঁ রুবি? সাঁঝকে বল দিবা এসেছে।
মুচকি হেসে কল কাটলেন মিসেস মোশাররফ। তারপর এসে দিবার সামনে একবাটি কাটা আম রাখলেন তিনি। দিবা ব্যস্তভাবে বলল,
– আরে আন্টি! এসবের প্রয়োজন নেই।
– তোমার হয়তো প্রয়োজন নেই। কিন্তু তুমি খেলে আমি খুশি হব।
দিবা বাটিটা হাতে নিলো। ইতিমধ্যে সাঁঝ চলে আসে সেখানটায়। দিবাকে দেকে সাঁঝ চকিত হয়ে মায়ের দিকে তাকাল। মিসেস মোশাররফ হেসে মেয়েকে বললেন,
– দিবা তোমার বই ফেরত দিতে এসেছে সাঁঝ। যাও ওকে নিয়ে রুমে যাও, কথা বলো। আমি চা নিয়ে আসছি।
মাথা দ্রুত ওপরনিচ করলো সাঁঝ। হাত দিয়ে দিবাকে ইশারা করলো আগানোর জন্য। দিবা দেরি করলো না। একহাতে বই, আরেকহাতে আমের বাটি নিয়ে উঠে দাড়ালো ও। তারপর পা বাড়ালো সাঁঝের সাথে। ওর ঘরে ঢুকতেই চোখ আটকে যায় দিবার। এগিয়ে গিয়ে, ৩৬০° ঘুরে, বিস্ময়ে ও ঘরের চতুর্পাশ দেখল। ফুল আর গাছে ভরা ব্যালকনি, বইয়ে ভরা টেবিল আর শেলফ, হাটু অবদি বিরাট জানালার সামনের ফুল, মানিপ্লান্ট, উড়তে থাকা পর্দা, কাঠের বসার জায়গাটায় আয়েশে শুয়ে থাকা তুলতুলে শরীরের পার্সিয়ান বিড়াল, এ ঘরের একটার পর একটা সৌন্দর্য থেকে দিবার যেন চোখ সরতেই চাইছিল না। এরমাঝেই চুড়ির আওয়াজ কানে আসে ওর। পেছন ফিরলে সাঁঝ হাসিমুখে ফোন বাড়িয়ে দিলো ওরদিকে। অবুঝের মতো ফোন হাতে নেয় দিবা। সেখানে লেখা,
– কেমন আছো?
– হ্ হ্যাঁ আপু। ভালো আছি।
সাঁঝ ফোন চাইল। দিবা ফোন ফেরত দিলো ওকে। দ্রুতহাতে টাইপ করলো সাঁঝ। কিন্তু এবার আড়ষ্টতা নিয়ে ফোন দেখালো দিবাকে। কাচুমাচু করতে থাকা সাঁঝকে দেখে নিয়ে দিবা ফোনের লেখাটা পরলো। তাতে লেখা,
– অভ্র বাসায় নেই। পাড়ার মোড়ে খেলতে গেছে।
– ও যে এসময় বাসায় থাকে না, তা আমি জানি আপু। এজন্যই এখন এসেছি। আমি তোমার সাথে দেখা করতে এসেছি।
দিবার সুস্পষ্ট জবাব। সাঁঝ প্রসারিত চায়। রুবি আর মায়ের কথপোকথন শুনেই চমকেছিল ও। ওর বুঝে আসে নি, দিবা কেন তালুকদার নিবাসে এসেছে? নিচতলায় নামার সময়টুকেতে নিজেকে জোর করায় এ প্রশ্নের দুটো ভয়ংকর জবাব পেয়েছিল ও। এক, অভ্রর সাথে দেখা করতে। দুই, ওদের কথাবলা বন্ধ হওয়ার কারণ হিসেবে ওকে দোষারোপ করতে। এখন দিবা যেহেতু বলছে কারণ প্রথমটা না, অন্তরাত্মা পুনরায় দমে গেল সাঁঝের। ও তো কখনো চায়নি ওর জন্য অভ্র-দিবার সম্পর্কে ফাটল আসুক। এজন্যই তো সেদিন সায়াহ্ন হামিদকে সন্তুষ্ট করতে অভ্রর হয়ে সেদিন ওই ম্যাসেজটা পাঠিয়েছিল ও। এমনকি এখনো অবদি অভ্রকে বোঝাচ্ছে সবটা ঠিক করে নেওয়ার জন্য। কিন্তু সে তো ওর কথা শুনছে না। এটাও বলছে, দিবাও ওরসাথে যোগাযোগের চেষ্টা করছে না। ভাইকে অনুনয় করার পরও এখন সাঁঝের আর কি করার থাকে? সাঁঝকে অমন চুপ দেখে মুখ খুলল দিবা। হাতের বাটি, বই পাশের পড়ার টেবিলে রেখে ব্যস্তভাবে বলল,
– তুমি তো সবই জানো আপু! কি বলব আর তোমাকে? তারচে তুমিই বলো, এভাবে আর কতোদিন?
– আ'ম সরি দিবা। সব আমার জন্য হয়েছে। আমার জন্যই তোমার ভাই অভ্রকে দায়িত্বজ্ঞানহীন মনে করছে। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি কখনোই চাইনা তোমাদের সম্পর্কটা নষ্ট হোক!
ফোনে লেখা কথাগুলো আর সাঁঝের চেহারার অপরাধবোধ, দুটোই পড়লো দিবা। মাথা না সূচক দুলিয়ে বলল,
– না না! ঘটনা এমনটা না। তুমি শুধুশুধু সবটা নিজের ঘাড়ে নিচ্ছ। আসলে তুমি আমার ভাইকে চেনো না। কিন্তু আমি চিনি ওকে। ও ব্যস অভ্রকে হুমকিধমকির ওপর রাখার জন্য এসব করেছে। সাথে দোষটা তোমার ভাইয়েরও আছে। সে যে দায়িত্বজ্ঞানহীন, সেটা সায়াহ্ন হামিদের সামনে প্রমাণ না করলে তো তার চলছিল না। গর্দভ একটা!
সাঁঝ আবারো প্রসারিত চায়। দিবা একেবারে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
– যাইহোক। তুমি কোনো গিল্টিফিল রেখো না। তোমার গিল্টিফিল করার প্রশ্নই ওঠে না এখানে।
. . .
– কিন্তু তুমি আমাকে হেল্প করতে পারো সাঁঝ আপু! আর আমি তোমার কাছে হেল্প চাইতেই এ বাসায় এসেছি।
অপরাধবোধ কেন করবে না, সেটা বুঝে আসলো সাঁঝের। কিন্তু কিকরে দিবার উপকারে আসতে পারে, সেটা ওর বুঝে আসলো না। তাই হতচকিত হয়ে দাড়িয়ে রইল ও। মাথা আর হাতের ইশায়ায় বুঝাল “কিভাবে?” একপা এগিয়ে আসে দিবা। বাচ্চাদের মতে গাল ফুলিয়ে, আবদারের মতোকরে বলল,
– তুমি একবার আমার ভাইয়ার সাথে কথা বলো প্লিজ?
সাঁঝ পাথর হয়ে যায়। যেন দিবা কি বলেছে, তার একহরফও ওর বুঝে আসেনি। অথচ ও তো বুঝেছে সবটাই। এজন্যই তো ওর এ দশা! সাঁঝকে এমন মুর্তির মতো আটকে থাকতে দেখে দিবা বলতে শুরু করলো,
– তুমি ভাইয়ার সাথে কথা বলো প্লিজ! অমত করো না আপু! দেখো এছাড়া আর কোনো উপায় নেই! আমাকে যদ্দিন না ভাইয়া অনুমতি দিচ্ছে, তদ্দিন আমি অভ্রর সাথে যোগাযোগ করতে পারব না। আর ভাইয়া অনুমতি দিয়েছে, অভ্রকে এটা না বলা অবদি ওউ আমার সাথে কথা বলবে না। হোক সেটা ভয়ে, হোক সেটা অপরাধবোধে। এখন শুধু তুমিই পারো সবটা ঠিক করতে!
একটানা বলে দিলো দিবা। সাঁঝ জবাব দেবার অবস্থায় ছিল না। ওর মস্তিষ্কে প্রশ্নই ছিল, ও প্রশ্নই করে বসল দিবাকে। হাত চলছিল না ওর। তবুও কোনোমতে টাইপ করে ও দিবার সামনে ফোন তুলে ধরল। দিবা দেখল তাতে লেখা,
– আমি কি বলব ওনাকে?
– তুমি ব্যস ভাইয়াকে বুঝিয়ে বলবে যে অভ্র যথেষ্ট কেয়ারিং, আর যেটুকো বাদ আছে তাও আস্তেধীরে শিখে যাবে। একমাত্র এটা হলেই হয়তো ভাইয়া একটু গলতে পারে। এ ছাড়া আমি আরকোনো উপায় দেখছি না। আপু তুমি পরিস্থিতিটা প্লিজ বোঝার চেষ্টা করো! প্লিজ এটুক উপকার করো আমার!
দিবার উত্তর তৈরী ছিল। আর সাঁঝ হতভম্ব ছিল। একে তো দিবা এই বয়সে এমন চঞ্চল মেয়ে, তারওপর সে ওকে বলছে সায়াহ্ন হামিদকে বোঝানোর দায়িত্ব নিতে! সাঁঝের আটকে থাকার জন্য আরকোনো কারণের প্রয়োজনই ছিল না। দিবা আরো কিছু বলতে যাবে, তখনই নক পরে দরজায়। সাঁঝ-দিবা দুজনেই তাকাল সেদিকে। মিসেস মোশাররফ ট্রে হাতে ঘরে ঢুকলেন। আড়চোখে দিবার দিকে চেয়ে, মুচকি হাসির সাথে বললেন,
– বই ফেরত দেওয়া শেষ হয়েছে তোমার দিবা? নাকি আমি বিরক্ত করলাম?
– ন্ না না আন্টি! কি বলছেন! আমরা তো এমনি কথা বলছিলাম। আপুর তো অনেকবড় কালেকশন! নেক্সট কোন বইটা পড়ব, ওই বিষয়ে আরকি. . .
দিবার জবাব শুনে মিসেস মোশাররফ শব্দ করে হেসে ফেললেন। সাঁঝ কানের পেছনে চুল গুজে মাথা দুলাল। তারপর চায়ের কাপ হাতে তুলে দিলো দিবাকে। ওরা তিনজনে বিছানায় বসে যায়। সাঁঝকে বসতে দেখেই সুজি ছুটে ওর কোলে এসে গা এলিয়ে দিলো। দিবা কয়েকবার হাত বুলালো ওর গায়ে। তারপর মিসেস মোশাররফকে ওর বাসা আর লাইব্রেরীতে সাঁঝের সাথে কিকরে পরিচয়, এইগুলো বলতে লাগলো। সাঁঝ চুপ থেকে কেবল দেখছিল ওদের। চা শেষ করে বিছানা থেকে নামলো দিবা৷ সৌজন্যের সাথে বলল,
– আ্ আজ আসি আন্টি। আপনার সাথে কথা বলে খুব ভালো লাগল।
– যেহেতু আসি বললে, পরেরবার সময় করে এসো। তখন আরোবেশি আড্ডা দেবো আমরা।
মাথা দুলালো দিবা। সাঁঝের ঘর থেকে বেরিয়ে আসলো তিনজনই। মিসেস মোশাররফ আবারো কিচেনে চলে গেলেন। সুজিকে কোলে করে দিবার সাথে দরজা অবদি আসলো সাঁঝ। বাইরে বেরিয়েও দিবা আরো একবার ইশারায় অনুনয় বুঝাল সাঁঝকে। ঢোক গিলল সাঁঝ। অতঃপর হাতের ফোনটা বাড়িয়ে দিলো দিবাকে। দিবা হাতে নিলো ফোনটা। স্ক্রিনে লেখা,
– কাউকে বই দিলে আমি সাধারণত সেটা ফেরত নেই না দিবা। সেটা হয় তৃতীয় কারো হাতে যায়, নাহয় লাইব্রেরিতে। আর আমার পরিবারের সবাইই জানে এটা। তো পরেরবার এ বাসায় এলে বই ফেরত দেবার অযুহাত না বানিয়ে অন্যকোনো অযুহাত বানিও, কেমন?
দিবা বিস্ফোরিত চোখে সামনে চায়। সুজিকে কোলে নিয়ে দাড়ানো সাঁঝ কাচুমাচু চোখে ওর দিকে তাকানো। চোখ ঘুরিয়ে কিচেনের দিক উঁকি দিতেই দিবার কান গরম হয়ে উঠল। পুরোটা সময় মিসেস মোশাররফের এই মুচকি হাসাটার মানে এতক্ষণে বোধগম্য হলো ওর। ফোন সাঁঝের হাতে গুঁজে দিয়ে ছুট লাগালো দিবা। মাঝের রাস্তাটুকো আসতে গিয়ে হয়তো শতসহস্র গাকি দিলো অভ্রকে। কিছু না বলেও তালুকদার নিবাসের ওই দুই রমণী ওকে যেই লজ্জাটায় ফেলেছে! অভ্রর মতো গাধার বাসায় এমন সুচতুর রমণীদের বসবাস, তা তো কল্পনাতেও ছিল না দিবার! থাকলে কি আর এই তালুকদার নিবাসে আসতো ও? এমন মা-বোন থাকতেও ওই ছেলে এতো গাধা হলো কিকরে? সব দোষ ওই ছোট তালুকদারের! সব দোষ, অভ্রর!
দিবা চোখের আড়াল হলে দরজা লাগিয়ে গুটিগুটি পায়ে কিচেনে আসলো সাঁঝ। সুজিকে কোল থেকে নামিয়ে, কাপ ধুতে থাকা মায়ের পেছনে গিয়ে দাড়ালো ও। মিসেস মোশাররফ টের পেলেন, মেয়ে তার কাধে নাক ঠেকিয়ে দাড়ানো। নিজেরমতো কাজে ব্যস্ত থেকে বললেন,
– মেয়েটা অনেক চঞ্চল!
সাঁঝ মায়ের দৃষ্টিসীমায় আসলো। ইশারায় জিজ্ঞেস করলো,
– কিছু জিজ্ঞেস করার নেই তোমার?
– আমার আবার কি জিজ্ঞেস করার থাকবে?
– এই! ও মিথ্যে বলে আমার সাথে দেখা করলো কেন, কিই বা বলে গেল আমাকে!
– ছি সাঁঝ! বড় হয়েছ তোমরা! এইসব এক্সপেক্ট করো আমাদের থেকে?
মৃদ্যু হেসে মাকে জড়িয়ে ধরলো সাঁঝ। গালে চুমু দিয়ে বুঝাল, “তুমি এই পৃথিবীর বেস্ট মা!” মেয়ের পাগলামো দেখে হেসে ফেললেন মিসেস মোশাররফ। মাকে ছেড়ে সাঁঝ নিজের ঘরে চলে আসলো। ওর পেছনপেছন সুজিও আসলো। সাঁঝের চেহারায় এখন চিন্তা। দিবার বলে যাওয়া কথাগুলোই ভাবতে লাগলো ও। বুকে একহাত গুজে, আরেকহাতের নখ কামড়াতে কামড়াতে পাইচারি করতে থাকে সমানে। দিবা ভুল বলেনি। সব ঠিক হওয়ার ওই এক উপায়ই আছে। ওর সায়াহ্ন হামিদের সাথে ও কথা বলা। যদিও ওর কোনো ইচ্ছা নেই ওই বেপরোয়া মানুষটার মুখোমুখি হওয়ার। কিন্তু উপায়ও তো নেই! অভ্রর জন্য এটুক করতেই হবে ওকে। কিন্তু কিভাবে? সায়াহ্ন হামিদের সামনাসামনি হওয়ার সুযোগটা কোথায়? আগে মনে হলো দিবার কাছ থেকে সায়াহ্নর নম্বর রাখতে পারতো ও। এখন তো আরকোনো উপায় নেই। কুলকিনারা না পেয়ে পায়চারী করতে করতে ফোন বিছানায় ছুড়ল সাঁঝ। সুজিও লাফিয়ে বিছানায় উঠল। আর ঠিক তখনই শনশন আওয়াজ। সাঁঝ চমকে উঠে সেদিকে তাকালো। তখনতখন গলা শুকিয়ে আসে ওর। অজানা কারণে হাতও ক্রমশ ঘেমে উঠতে থাকে। সুজির পায়ের ছোঁয়ায় ফোনে চালু হয়ে থাকা রেডিও অ্যাপটা, মুহুর্তেই সাঁঝের ঘরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিলো কিনা, কে জানে!
“ ভালো বাসবো, বাসবো রে, বন্ধু তোমায় যতনে. . .”
“ The Shayanno Show”র সন্ধ্যা এটা। গানটা অন এয়ারে চলছিল। মুঠো করা হাতে থুতনি ঠেকিয়ে, সায়াহ্ন স্ক্রিনের সামনে বসে ছিল। মূলত রেডিও মস্তির ফেসবুক পেইজে আসা লাইভ কমেন্ট পড়ছিল ও। বিনা আগ্রহে! কিন্তু হুট করে ওর চোখ আটকায় স্ক্রল হতে থাকা সর্বশেষ কমেন্টকারীর আইডির নামটায়। সেইসাথে তার কমেন্ট “ আপনার সাথে দেখা করতে চাই।” সায়াহ্ন তৎক্ষণাৎ সোজা হয়ে বসে গেল। মাউসের সাহায্যে ওই কমেন্টটাকে থামিয়ে দিলো ও। কমেন্টকারীর আইডিতে প্রোফাইল পিকচার হিসেবে কবিগুরুর “সুভা” বইয়ের আড়ালে থাকা কারো ছবি। দেখার মধ্যে দেখা যায় তার কানের পিঠে গোঁজা চুল, সে কানে থাকা রুপালীরঙা ঝুমকো আর টানাটানা দু চোখের আড় চাওনি। সায়াহ্ন হেসে ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে বসে গেল। ঠোঁটের ওপর হাত রেখে, ওভাবেই নিশব্দে কয়েকদন্ড হাসল ও। কাচের দেয়ালের উল্টোপাশে বসে তোফায়েল ভ্রু কুঁচকে দেখল সায়াহ্নকে। আরজে হিসেবে সে যতো ভালোই হোক না কেন, পেশার বাইরে শো নিয়ে আহামরি আগ্রহ দেখানোর মানুষ সে না। তবুও আজ সায়াহ্ন হামিদের কিছুতে চোখ আটকেছে, সে কিছুএকটা নিয়ে হাসছে, ব্যপারটা তোফায়েলের ভ্রু কুচকানোর মতোই। হাসি কমিয়ে সোজা হয়ে বসলো সায়াহ্ন। গলা ঝেরে, স্পিকারের সামনে মুখ এগিয়ে, আজ্ঞাবহের স্বরে বলল,
– It would be my honor to show up for you সাঁঝ। কখন, কোথায় দেখা করতে চাও বলো? Shayanno Hamid will be there. Anytime and anywhere you want!
চলবে...
Leave a comment
Your email address will not be published. Required fields are marked *