Buy Now

Search

সোহাগি সাঁঝমল্লার [পর্ব-১৬]

সোহাগি সাঁঝমল্লার [পর্ব-১৬]

নক শুনে কেবিনের দরজায় তাকালো মাশফিক। হাতেপায়ে ছোটছোট ব্যান্ডেজ আর গলায় সারভাইকাল কলার নিয়ে, বেডে হেলান দিয়ে আধশোয়া হয়ে বসা ছিল ও। কষ্ট হলেও ও কিছুটা উচু আওয়াজে “আসুন” বলল। ওর সাড়া শুনে দুজন কেবিনে ঢোকে। শুরুতে সায়াহ্ন, তারপর তোফায়েল। ওদের দুজনকে দেখে মাশফিক অবাক হলো না। জ্ঞান ফেরার পর পরিবারের কাছে শুনেছে ও, ওকে কে হাসপাতালে এনেছে৷ সায়াহ্ন ভেতরে ঢুকে আগে মাশফিককে আপাদমস্তক দেখে নিলো। তারপর বলল,
– এখন কেমন আছো?
– হ্যাঁ ঠিক আছি৷ ওই ব্যস বাহ্যিক কাটাছেড়ার ব্যথা।
সায়াহ্ন এবার তোফায়েলের দিকে তাকায়। বলাচলে ওকে অফিস থেকে টেনে এনেছে ও। মাশফিকের সাথে যাই কিছু হয়েছে, তাতে দায় আছে ওর। সায়াহ্নর চাওনি দেখেই তোফায়েল থতমত খেয়ে গেল। বাংলা সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তরের মতো সহজ ভাষায় মাশফিককে বলতে লাগলো,
– ইয়ে, সরি ভাই। গতরাতে আমার আপনার বাইক নিয়ে ওভাবে বলা উচিত হয়নি। সরি। অনেক সরি!
– সরি আমিও। বেশি রিয়্যাক্ট করে ফেলেছিলাম। অবশ্য তার ফলও পেয়ে গেছি৷
মাথা একচুল নড়চড় না করিয়ে বলল মাশফিক। ওর জবাবে তোফায়েল সন্তুষ্ট হয়ে পাশে দাড়ানো সায়াহ্নর দিকে তাকালো। সে তখনো চুপচাপ মাশফিকের দিকে তাকিয়ে আছে। ওকে ওভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে মাশফিক কিঞ্চিৎ হাসলো। বলল,
– ব্যপার কি সায়াহ্ন হামিদ? তুমিও কি সরি বলতে চাইছো?
– হুম।
– কেন?
– গতদিন তোমার চ্যালেঞ্জ এক্সেপ্ট করা উচিত হয়নি।
মাশফিক হাসতে যাচ্ছিল। কিন্তু ঘাড়ে টান লাগায় আস্তেকরে ‘আউচ’ আওয়াজ তুলে, ব্যথায় চোখ বন্ধ করে নিলো ও। ‘আরে!’ বলে তোফায়েল এগোতে গিয়েও থেমে গেল। কেননা মাশফিক নিজেই নিজেকে সামলেছে। সায়াহ্ন কিছু বলতে যাবে, তখনই মিসেস মোশাররফ কেবিনে ঢুকলেন। সায়াহ্ন, তোফায়েলকে দেখে কিছু বললেন না তিনি। চুপচাপ হাতের ফোনটা বেডে রেখে, চেয়ারে বসে মাশফিককে বললেন,
– আসিফ আসছে সাঁঝকে নিয়ে।
সায়াহ্ন সুক্ষ্ম চোখে ভদ্রমহিলাকে পর্যবেক্ষণ করলো। কাল রাতে উনি প্রথমবার যখন হাসপাতালে এসেছিলেন, তখন তার চোখে ও নিজের জন্য কৃতজ্ঞতাবোধ দেখেছিল। একই চাওনি ছিল অভ্র, আসিফ আর মোশাররফ তালুকদারেরও। কিন্তু আজ আর সেটা নেই। কেন নেই? গতরাতে মাশফিকের রিপোর্ট ভালো জানার পরই বাসায় ফিরে গিয়েছিল ও। তারপর এখানে কি হয়েছে? মিসেস মোশাররফের ওরদিক না তাকানোর কি এমন কারণ হতে পারে? জবাব হিসেবে একটাই কথা মাথায় আসলো সায়াহ্নর। জ্ঞান ফেরার পর মাশফিক নির্ঘাত এই এক্সিডেন্টটার জন্য নিজের পরিবারের কাছে ওকেই দায়ী করেছে!
– সরি বলতে হবে না সায়াহ্ন। তোমার দোষ ছিল না। রাগের বশে আমিই চ্যালেঞ্জ করেছিলাম তোমাকে। সাথে লুজার বলে অহেতুক বাড়াবাড়িও করেছি। I am sorry!
সায়াহ্নর ভাবনায় ছেদ ঘটালো মাশফিক। কয়েকহাত দূরে দাঁড়ানো সায়াহ্নর চেহারায় একের পর এক প্রতিক্রিয়া নামতে দেখলো ও। প্রথমে বিস্ময়, তারপর অবিশ্বাস, তারপর নমনীয়তা। অবশ্য এমনটাই তো হবার ছিল। ওর স্বীকারোক্তি তো কেবল সায়াহ্ন হামিদের ভাবনায় ছেদ ঘটানোর মতো ছিল না। মিসেস মোশাররফ কিছু বললেন না। ব্যস দুহাতে ছেলের ডানহাত নিয়ে বসে রইলেন। সায়াহ্ন গলা ঝেরে বলল,
– আব্. . .It's, It's okay! তোমারও দোষ ছিলনা! Get well soon. আসি আমরা।
স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করেছিলো সায়াহ্ন। তবুও ওর কন্ঠে যেন কিছুটা অপ্রস্তুত ভাব রয়েই গেল। মাশফিক চোখের ইশারায় অনুমতি বুঝালে ও আর তোফায়েল বেরিয়ে যায়। নিশব্দে হাসলো মাশফিক।
করিডোরে সায়াহ্নকে দেখে গতি কমে আসে সাঁঝের। মাশফিকের জ্ঞান ফেরার পরপরই আসিফ তালুকদার অভ্র আর ওকে নিয়ে তালুকদার নিবাসে ফিরেছিল। মোশাররফ তালুকদার তার স্ত্রীকে নিয়ে হাসপাতালে ছিলেন। সকালে তিনি বাসা থেকে অফিসে গেছেন, আর সাঁঝ এখন মা ভাইয়ের জন্য জন্য খাবার নিয়ে এসেছে। গতরাতে জ্ঞান ফেরার পর কেউ কিছু বলেনি ওকে। কিন্তু সবার সামনে সায়াহ্নর বাহুডোরে জ্ঞান হারানোর ঘটনাটা যে তালুকদার পরিবারের জন্য প্রীতিকর ছিল না, তা ও ঠিকি টের পেয়েছিল। মাশফিকের রিপোর্ট আসা অবদি সায়াহ্ন হাসপাতালেই ছিল। আর পুরোটা সময় এককোণে গুটিশুটি মেরে বসে ছিল সাঁঝ। ও যদি কোনোভাবে জানতো, সায়াহ্ন হামিদ ওর পরিবারের সামনে ওকে কোলে তুলেছিল, তাহলে ও কি করতো সেটা ওর গতরাতের নুইয়ে থাকা অবস্থা দেখেই অনুমান করা যেত।
সায়াহ্ন বেখেয়ালে হাটছিল। চোখ তোলার পর সামনে সাঁঝকে দেখে ওউ থেমে যায়। তোফায়েলকে বাইক পার্কিং এরিয়া থেকে বের করতে বলে, দুইপা এগিয়ে সাঁঝের সামনে এসে দাড়ালো ও। সাঁঝ পুরোদমে অস্বস্তিতে পরে যায়। দ্রুতহাতে ও ব্যাগ থেকে ফোন বের করতে যাবে, তার আগেই সায়াহ্ন বলল,
– তোমার থ্যাংকিউ তুমিই রাখো। লাগবে না আমার!
সাঁঝ প্রসারিত চাইলো। আজ আবারো একই প্রশ্ন অবাক করলো ওকে। এই লোকটা কি করে বুঝে যায় সব? আসলেই সায়াহ্নকে থ্যাংকিউ বলবে বলে মোবাইল বের করতে যাচ্ছিল ও। আর ফোন বের করা হলো না সাঁঝের। সায়াহ্ন বলল,
– খেয়াল রেখো ভাইয়ের। আর হ্যাঁ! নিজেরও যত্ন নিও। জ্ঞান হারিয়ে যেই হার্ট এ্যাটাকটা দিয়েছো, তোমার ভাই এক্সিডেন্ট করেও এমন টেনশন দেয়নি!
থমকে দাড়িয়ে রইল সাঁঝ। সায়াহ্ন ওরদিক চেয়েই ওকে পাশ কাটালো। চলে গেল নিজের চিরাচরিত গা ছাড়া ভঙিতে।

টিফিন পিরিয়ড চলছে। দোতালায় ক্লাসের সামনের বারান্দায় গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছে দিবা। সাথের বান্ধবী অনর্গল কিছু বলে চললেও একদৃষ্টিতে নিচে তাকিয়ে আছে ও। ওর দৃষ্টি কলেজের গেইটে। সেখান থেকে অভ্র ওর দুটো বন্ধুর সাথে একাডেমিক ভবনের দিকে আসছে। ওদের সাথে অভ্র কথা বলছে, হাসছে, মাথায় চাটি লাগাচ্ছে। কিছুটা এগোনোর পর হাসতে হাসতে চোখ তুলে ওপরে তাকালো অভ্র। দিবার সাথে তৎক্ষনাৎ চোখাচোখি হয় ওর। অভ্রর হাসি কমে আসে। আর ওকে চুপ হতে দেখে দিবার গ্রিল মুঠো করা হাত আরো শক্ত হয়ে আসে। অভ্র নিচতলায় ঢুকে চোখের আড়াল হতেই সাথের মেয়েটার কথা কানে আসে ওর।
– দিবা? তুই শুনছিস আমি কি বলছি? এই দিবা? কিরে?
– না শুনছি না! এতো কথা বলিস কেন তুই? একটু চুপ থাকতে পারিস না? একটাসেকেন্ড না বলে থাকতে পারিস না?
খারাপ মেজাজের সবটুকো কন্ঠে উগড়ে দিয়ে ধমক লাগালো দিবা। মেয়েটা হতচকিত হয়ে চেয়ে রইল ওরদিকে। ওর চাওনি দেখে দিবার হুঁশ হয়, কোথাকার রাগ কোথায় দেখাচ্ছে ও। থতমত খেয়ে বলল,
– স্ সরি। আ'ম সরি রে! আসলে. . .
– কিছু বলার ছিল তোমাকে।
অভ্রর গলা শুনে দুজনেই পাশে তাকাল। দিবা আটকে রইল। আজ কতোদিন পর এই ছেলেটা ওরসাথে কথা বলছে! ওর সাথের মেয়েটা একপলক দুজনকে দেখে নিয়ে চলে গেল ক্লাসে। অভ্র দুপাশে তাকিয়ে দেখে নিলো শোনার দুরত্বে কেউ আছে কিনা। ছিল না কেউ। দিবাকে কিছু বলতে যাবে, তার আগেই ও বলল,
– বাবাহ্! এতো জলদি আমাকে কিছু বলার প্রয়োজনবোধ হলো তোমার?
– ক্রেডিট তোমার ভাইয়ের। এমন পরিস্থিতি সেই করেছে।
দিবা হাসলো। কিছুটা ঔদ্ধত্যের সাথে বলল,
– I knew! He's the best brother in the world!
– তার কথা জানি না। তবে আমিও পৃথিবীর বেস্ট ভাই হতে চাইছি দিবা। এজন্য একটা রিকুয়েস্ট করতে এসেছি তোমাকে।
দিবার হাসি কমে আসে। অভ্র এরআগে কখনো ওরসাথে এমন গুরুতর আওয়াজে কথা বলে নি। আজকে ওর স্বরে যে শীতলতা, সেটা দিবার জন্য পুরোপুরিভাবে নতুন। ও আশা করেছিল অভ্র ওদের কথা না বলার বিষয়টা মেটাবে। কিন্তু সে যা বলল, আপাতত ওর ভাবনা প্রশ্নবিদ্ধ। আর ওর এমন প্রতিক্রিয়ায় অভ্রর হেলদোল নেই। ও একই ভঙিতে স্পষ্ট ভাষায় বলে উঠল,
– সায়াহ্ন ভাইয়াকে বলো, সে যেন আমার বোনের থেকে দূরে থাকে।
বজ্রাহতর মতো থমকে রইল দিবা। নিজের কানদুটোকে ঝালাপালা লাগছিল ওর। ওর বুঝে আসলো না, ঠিক কি শুনলো ও। ‘ আমার বোনের থেকে দূরে থাকো’– লাইনটা তো সায়াহ্নর। তার বোনটা তো ও। তাহলে অভ্র এই লাইন কেন বলছে? ওকে কেন বলতে বলছে? তাও আবার কাকে বলতে বলছে? সায়াহ্নকে? এতোএতো প্রশ্নবোধক চিহ্নের চাপে উক্ত সরল বাক্যটাও জটিল হয়ে গেল দিবার জন্য। ওর মনমস্তিস্কে চলা ‘ What the hell?’ লাইনটা বুঝতে অভ্রর অসুবিধা হলো না। কিছু বলল না ও। কাধের ব্যাগের ফিতা ধরে উদ্যত হলো ক্লাসে ঢুকবে বলে। পেছন থেকে দিবা ডাক লাগালো,
– ওয়েট অভ্র! কি বলতে কি চাইছো তুমি? Make it clear!
অভ্র থামে। আবারো দিবার দিকে ফিরে দাঁড়ালো ও। সোজাশব্দে বলল,
– সায়াহ্ন ভাইয়া কারণে অকারণে আপুইয়ের কাছে আসে দিবা।
– Mind your language Avro!
গলা উচিয়ে বলল দিবা। অভ্র পেছনে তাকালো। কিছুটা দূরে থাকা ছেলেমেয়েগুলো ওদের দেখে হাসছিল। কিন্তু ওদের দেখেও দিবা নিজেকে সামলালো না। পরোয়া না করা আসলে সরোয়ার হামিদের দুই ছেলেমেয়ের স্বভাব। আর তার সাথে পরিচিত অভ্র। তাই অবাক হলো না ও। দিবা তেমন জোর গলাতেই বলল,
– মানছি আমার ভাইয়া তোমার সাথে একটু রুড। কিন্তু তারমানে এই না যে তুমি ওকে নিয়ে যা তা বলবে! ও একটা পাবলিক ফিগার। এতোএতো ফ্যান-ফলোয়ার থাকা সত্ত্বেও কেউ কখনো ওর কোনো বাজে রেকর্ড ছিলনা। ওর এগেইনিস্টে কেউ বাজেকিছু বলতে পারবে না। তুমিও জানো সেটা। আর আজ তুমিই. . .
– বললাম তো, ভাইয়াই এমন পরিস্থিতি তৈরী করেছে।
– অভ্র প্লিজ! কাকে নিয়ে কি বলছো তুমি জানো? ভুলে যেও না ওর জন্যই দুদিন আগে তোমার ভাই প্রাণে বেঁচে গেছে!
– আমি কিছুই ভুলিনি দিবা। মাশফিক ভাইয়ার জন্য আমিও তারকাছে থ্যাংকফুল। কিন্তু তারমানে এও না যে আমি আমার বোনের কথা ভুলে যাব।
– মাথা খারাপ হয়ে গেছে তোমার! যা তা বকছো তুমি!
– আমি যা তা বকছি না। এ এলাকায় আসার পরদিনই সায়াহ্ন ভাইয়া ঘরভরা মানুষের সামনে আপুইকে অপমান করে গিয়েছিল। সেটা আপুই মনে রাখেনি বলে আমিও মনে রাখিনি। কিন্তু এরপর যা হচ্ছে, সেগুলো হওয়ার কথা না। লাইব্রেরীর ঘটনা আশাকরি ভোলো নি তুমি। এরপর কফিশপে আর সে রাতে হসপিটালে. . .
– মাশফিক ভাইয়া আগে লাগতে না আসলে আমার ভাইয়াও তালুকদার নিবাস অবদি যেত না! ওই ঘটনায় আমার ভাইয়ার চেয়ে তোমার ভাইয়ের ভূমিকা বেশি ! সো এটা নিয়ে কথা না বাড়াও তো বেটার। তারপরও আমার জীবনেও সরি না বলা ভাই সরি বলেছিল তো সাঁঝ আপুকে। সেদিন লাইব্রেরীর ঘটনাও স্পষ্ট মনে আছে আমার! সাঁঝ আপুকে পরে যাওয়া থেকে বাঁচিয়েছিল ভাইয়া। আর কফিশপে ভাইয়া যে আপুকে ডিফেন্ড করেছিল, এটা তো তুমিই আমাকে বলেছিলে! তাহলে এখন হসপিটালের কোন ঘটনার কথা বলছো তুমি? কি হয়েছিল কি হসপিটালে? Tell me!
– আপুই সেন্সলেস হয়ে গিয়েছিল। আর ভাইয়া আপুইকে কোলে তুলে কেবিনে নিয়ে গিয়েছিল। ওখানে আমি, বাবা থাকা সত্ত্বেও!
দিবা আটকায়। পরিচয় হবার পর প্রথমবার অভ্রর সামনে দমে যাচ্ছিল ও। এই দমে যাওয়ার পরিস্থিতিটা যদি ওদের দুজনের বিষয় নিয়ে হতো, তবে আজ কোনো সমস্যা ছিল না ওর। আজ ও প্রস্তুত ছিল অভ্রর সামনে নত হবার জন। কিন্তু বিষয়টা ছিল সায়াহ্ন। ওর ভাই! আর সত্যি তো এটাই, সাঁঝের সাথে সায়াহ্নর ক্রমশ জড়িয়ে যাওয়া মানহার সাথের ভাইয়ের এতদিনের ওঠবসার চেয়েও বেশি মনে হচ্ছিল দিবার। তবুও সেকেন্ডের ব্যবধানে নিজেকে স্বাভাবিক করলো ও। ওর মনে হলো, এখন ও দমে গেলে ওর ভাইকে নিয়ে অভ্রর ঋণাত্নক ধারণা গাঢ় হবে। তাই আগের স্বভাবেই ফেরত আসলো ও। অভ্রর চোখে চোখ রেখে বলল,
– সিরিয়াসলি অভ্র? তোমার বোন সেন্সলেস হয়ে গেছে, আমার ভাইয়া তখন ওখানে কে আছে না আছে সে চিন্তা না করে তাকে কোলে তুলেছে, কেবিনে নিয়ে গেছে, আর তুমি থ্যাংকফুল না হয়ে উল্টো তাকে দোষারোপ করছো? Are you out of you mind or what?
অভ্র এতক্ষণে ইতস্তত করলো। বুঝে উঠল না, দিবাকে ঠিক কিকরে বুঝায়, যে ঘটনাগুলো দিবা যুক্তি দিয়ে বলল, সে যুক্তি ওউ জানে। কিন্তু তবুও সায়াহ্নর সাঁঝের কাছে আসাটাকে ও বা ওর পরিবার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে নেবে না। তালুকদার পারিবারিক শিক্ষা এতোও উদারনৈতিক না। আর সেটা হয়তো দিবার বুঝে আসবে না। তাই কথা শেষ করতে বলল,
– Whatever. তুমি ভাইয়াকে বলবে আমরা আপুইয়ের জন্য এনাফ। সে যেন আর. . .
– All the best! তোমার সেরা ভাই হওয়ার যাত্রা সফল হোক!
দিবা অভ্রকে কথা শেষ করতে দিলো না। লম্বালম্বা পা ফেলে ক্লাসে চলে গেল। থম মেরে ওর চলে যাওয়া দেখল অভ্র। তারপর ছোট্টকরে দম ফেলল একটা। যা হলো, এটা চায়নি ও। দিবার সাথে ঝামেলা ও কখনোই চায়নি। কিন্তু ওর অন্য চাওয়াটা আজকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বোনের আশপাশে সায়াহ্ন হামিদকে চায় না অভ্র। আর কারণও আছে এর। সবকিছু ভুললেও, মানহা-সায়াহ্নর বিষয়টাকে কখনোই নজরান্দাজ করতে পারবে না ও। প্রাক্তনের প্রতি সায়াহ্ন হামিদ কেমন গুরুত্বহীন ছিল, তা জানার পরও ও কিকরে চাইবে একই মানুষটা ওর বোনের ধারেকাছে থাকুক? প্রেম ভালোবাসাকে নেহাত সময়কাটানো বলে মনে করে, জেনেবুঝে এমন মানুষটার সাথে বোনের জড়িয়ে যাওয়া কিকরে মানবে ও? কোনো ভাই মানবে তা?
পরের ক্লাসগুলোতে আর একচুলও মনোযোগ দিতে পারলো না দিবা। শক্ত হয়ে বসে রইল ব্যস। কলেজ থেকে ফিরেও ও নিজের রুমে ছিল পুরোটা সময়। আর সায়াহ্ন অফিসে ছিল। রাতে ডাইনিং টেবিলে খেতে বসে ভাইয়ের সাক্ষাৎ মেলে ওর। সায়াহ্ন চুপচাপ খাওয়ায় মনোযোগী ছিল। দিবা থেমে থেমে ভাত মাখাতে মাখাতে একসময় বলেই ফেলল,
– একটা কথা বলার ছিল তোকে।
– শুনছি বল।
– হসপিটালে সেন্সলেস হয়ে যাওয়ায় তুই সাঁঝ আপুকে কোলে নিয়েছিলি?
সরোয়ার হামিদ খাওয়া থামিয়ে মেয়ের দিকে তাকালেন। মিসেস সরোয়ারও মেয়ের প্রশ্ন শুনে নিজের প্লেটে ডাল তুলতে গিয়ে থেমে গেলেন। তবে সায়াহ্নর ভাবান্তর হলো না। ব্যস একপলক বোনকে দেখে পুনরায় খাওয়ায় মনোযোগী হলো ও। ভাতের লোকমা মুখে পুরে গুরুত্বহীনভাবে বলল,
– হু। তোকে কে বলল?
– বাবা।
প্লেট থেকে চোখ তুলে সায়াহ্ন বাবার দিক তাকালো। তখনতখন হেসে ফেলল ও। যেন বেশ মজা পেয়েছে। অবশ্য সত্যিই মজা পেয়েছে ও। কেননা দিবার দিকে তাকানো সরোয়ার হামিদের চেহারায় একটা প্রশ্ন স্পষ্ট, ‘ আমি তোকে এটা কখন বললাম?’
চোখ বন্ধ করে দম নিলো দিবা। ও জানতো কথাটা ওকে কে বলেছে তা সায়াহ্ন বেশ ভালোমতোই জানে। সাথে এটাও আন্দাজ করেছিল, উত্তরটা জানা সত্ত্বেও সায়াহ্ন ওকে প্রশ্নটা করবে। আর ঠিক একারনেই একান্তে না বলে সবার সামনে কথা তুলেছিল ও। সায়াহ্ন হেসে, মাথা দুলিয়ে, খাওয়ায় ব্যস্ত হলো। সরোয়ার হামিদ আর তার মিসেস দুজনেই মেয়ের সাথে আলাদাকরে কথা বলবেন ভেবে খেতে লাগলেন। কিন্তু দিবার খাওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ভাত আঙুলে নাড়তে নাড়তে ও সায়াহ্নকে দেখছিল। কি হলো ওর, আঙুল থামিয়ে ও হুট করেই ভাইকে বলে উঠল,
– তুই সাঁঝ আপুর থেকে দূরে থাকতে পারবি ভাইয়া?
মুখে লোকমা তুলতে গিয়ে আটকে গেল সায়াহ্ন। আরো একবার চোখ তুলে বোনের দিকে তাকালো ও। দিবা নিস্প্রভ। কিন্তু ও অনুভব করতে পারলো, ওর বাবা মা দুজনেই ওরদিকে বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে আছে। কেউ কিছু বলার আগেই আবারো মুখ খুলল দিবা। ভাষাহীন, নিস্পলক ভাইয়ের চোখে চোখ রেখে দৃঢ় আওয়াজে বলল,
– কিছু জিজ্ঞেস করেছি তোকে।
সায়াহ্নর চোখের পলক পরে। বোনের থেকে দৃষ্টি সরালো ও। তারপর হাতে থাকা লোকমা প্লেটে রেখে, চেয়ার ঠেলে উঠে চলে গেল ডাইনিং থেকে। সরোয়ার হামিদ আর তার মিসেস প্রথমবারের মতো ছেলের খাবার ছেড়ে চলে যাওয়া দেখলেন। অবুঝের মতো দেখলেন। সায়াহ্ন নিজের ঘরে ঢুকে যেতেই মেয়েকে ধমক লাগালেন মিসেস সরোয়ার। বললেন,
– পাগল হয়ে গেছিস তুই দিবা? কিসব বলছিস?
– আমি ঠিকি আছে। তুমি বরং তোমার ছেলের খবর নাও মা। ও বোধহয় ঠিক নেই।
দিবা একদৃষ্টিতে সায়াহ্নর ঘরের দরজার দিক চেয়ে জবাব দিলো। তারপর মুচকি হেসে খেতে লাগলো নিজের মতো। সরোয়ার হামিদও নির্বিঘ্নে খাচ্ছেন। মিসেস সরোয়ার আগে স্বামী-সন্তানের দিকে প্রসারিত চাইলেন, তারপর চাইলেন সায়াহ্নর ঘরের খোলা দরজার দিকে। খাওয়ার রুচি চলে গেছে তার।
দরজায় দুবার টোকা পরার শব্দে সায়াহ্ন আগে দেয়ালঘড়ির দিকে চাইলো। ঘড়ির কাটা তখন বারোটা পার করে গেছে। আঙুলের ডগায় থাকা জলন্ত সিগারেটটা মুখের সামনে তুলে ধরে, সেটা দেখতে দেখতে গলা উঁচিয়ে বলল,
– এসো।
মিসেস সরোয়ার ছেলের ঘরে ঢুকলেন। সায়াহ্ন ঘরে ছিলো না। ব্যালকনিতে রেলিংয়ের ওপর পা তুলে দিয়ে চেয়ারে আধশোয়া হয়ে বসে ছিল ও। মাকে ভেতরে ঢুকতে দেখে উঠে দাড়ালো সায়াহ্ন। সিগারেটটা নিভিয়ে, নিচে ফেলে, পরে থাকা আরো সাতটা সিগারেটের অবশিষ্টসমেত এটাকেও পায়ে ঠেলল। তারপর দুহাত রেলিংয়ে রেখে, কিছুটা ঝুকে দাড়িয়ে বরাবর সামনে তাকিয়ে রইল। মিসেস সরোয়ার নিরবে ছেলের পাশে এসে দাড়ালেন। একটু সময় নিয়ে বললেন,
– ভাত যা কম খেয়েছিস সেটা দুটো সিগারেট বেশি খেলে উশুল হবে না সায়াহ্ন।
– এই প্রথমবার আমি দিবাকে কোনো জবাব দিতে পারলাম না মা।
মায়ের দিক না তাকিয়েই কথাটা বলেছিল সায়াহ্ন। মিসেস সরোয়ার শব্দহীন হেসে ফেললেন। উনি ঠিক কেন এসময় এ ঘরে এসেছেন, তা সায়াহ্ন জানে। তাই একেবারে সোজা কথাটাই পেরেছিল ও। ঘাড় ঘুরিয়ে সায়াহ্ন পাশে দাড়ানো মায়ের দিক তাকালো। মিসেস সরোয়ার তখনো নিশব্দে হাসছিলেন। দুদন্ড পর হাসি কমালেন তিনি। জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বললেন,
– জবাব আছে তোর কাছে?
– উত্তর থাকলে কোনো প্রশ্ন পাশ কাটানোর ছেলে তোমার না। এটুকো তো চেনো আমাকে।
– হুম! তারমানে ছেলে আমার সিগারেট খেয়ে খেয়ে প্রশ্নের জবাব খুঁজছিল!
সায়াহ্ন আবারো সামনে তাকালো। পাশ থেকে মিসেস সরোয়ার এবার নরম আওয়াজে বললেন,
– ‘কিছুকিছু প্রশ্নের মাঝেই তার উত্তর থাকে।’ এ ঘরে আসার সময় তোর বাবা আমাকে এটা বলে পাঠালো। সিগারেট তো ট্রাই করে ফেলেছিস। এবার দেখ এসিপি বাবার নির্দেশনা কোনো কাজে লাগে কিনা। All the best.
সায়াহ্ন নিশ্চুপ রইল। পাশে না তাকিয়েও বুঝলো, ওর মা মিষ্টি হাসির সাথে চলে গেল। চারপাশ পুনরায় একলা হয়ে পরে ওর। ব্যস থাকার মধ্যে রয়ে যায় সায়াহ্ন, আর দিবার করা প্রশ্নটা। ও সাঁঝের থেকে দূরে থাকতে পারবে? কি না?
চলবে...

Olindo Rahman

Olindo Rahman

A good book is worth a hundred good friends. 
But a good friend is equal to a library.!! 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Your experience on this site will be improved by allowing cookies Cookie Policy