আপনি হয়তো ভাবছেন পৃথিবী চালায় আমেরিকা, ইউরোপ বা রাশিয়ার প্রেসিডেন্টরা। অথবা ভাবছেন যে ইলন মাস্ক, ট্রাম্প বা Xi Jinping বা পুতিন-ই বুঝি সব।
ভুল।
পর্দার আড়ালে এমন কিছু খেলা চলে, যা আপনার কল্পনারও বাইরে। আর এই খেলার মূল অস্ত্র হলো—টাকা এবং সুদ।
আজ আপনাকে এমন এক পরিবারের গল্প বলব, যারা দেখিয়েছে কীভাবে 'সুদ' নামক অস্ত্র দিয়ে রাজা, প্রধানমন্ত্রী, প্রেসিডেন্ট বা পুরো একটা দেশ বা মহাদেশকেও গোলাম বানিয়ে রাখা যায়।
পরিবারটির নাম, রথচাইল্ড (Rothschild)।
গল্পটা ১৮শ শতকের।
শুরু হয়েছিল জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টের এক নোংরা বস্তিতে।
মায়ার আমশেল রথচাইল্ড নামের এক লোক। ইহুদিদের জন্য নির্দিষ্ট একটা ছোট্ট এলাকায় গাদাগাদি করে থাকতেন। পেশা ছিল পুরোনো কয়েন কেনাবেচা করা। অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে, মানুষ ভাবত এই লোকটা কোনোমতে খেয়েপরে বাঁচলেই অনেক। কিন্তু মায়ারের মাথায় ছিল অন্য প্ল্যান। তিনি শুধু বড়লোক হতে চাননি, তিনি চেয়েছিলেন এমন এক রাজত্ব বানাতে, যেখানে সূর্য কখনো ডুববে না।
এখানেই গল্পের প্রথম টুইস্ট। মায়ার আমশেল তার পাঁচ ছেলেকে কাছে ডাকলেন। আমরা হলে কী করতাম? বলতাম, "বাবা, তোমরা সবাই মিলেমিশে একসাথেই থাকো।" কিন্তু মায়ার করলেন উল্টোটা। তিনি তার পাঁচ ছেলেকে ইউরোপের প্রধান পাঁচটি শহরে পাঠিয়ে দিলেন। নাথান গেল লন্ডনে, জেমস গেল প্যারিসে, সলোমন ভিয়েনায়, কার্ল নেপলসে আর আমশেল থাকলেন ফ্রাঙ্কফুর্টে।
সবাই ভাবল, পরিবারটা বুঝি ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। কিন্তু মায়ার আসলে তৈরি করেছিলেন পৃথিবীর প্রথম "হিউম্যান ইন্টারনেট"। সেই যুগে যখন ফোন বা টেলিগ্রাম ছিল না, তখন এই পাঁচ ভাই পাঁচ দেশ থেকে নিজস্ব ঘোড়সওয়ার আর কবুতর দিয়ে খবরাখবর আদান-প্রদান করত। ফলে প্যারিসে কী ঘটছে, তা সবার আগে জানত লন্ডনে বসে থাকা ভাই। আর ভিয়েনার খবর জানত প্যারিসের ভাই।
সবচেয়ে বড় খেলাটা তারা খেলল ১৮১৫ সালে। নেপোলিয়ন বোনাপার্ট তখন ইউরোপ কাঁপাচ্ছেন। ওয়াটারলু-তে চূড়ান্ত যুদ্ধ হবে। পুরো ব্রিটেন টেনশনে, নেপোলিয়ন জিতলে ব্রিটেনের অর্থনীতি শেষ, আর হারলে ব্রিটেন সুপারপাওয়ার। লন্ডনের স্টক মার্কেটে সবাই ভয়ে শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছে।
ঠিক এই সময়ে লন্ডনে বসে থাকা ভাই, নাথান রথচাইল্ড, একটা খবর পেলেন। তার নিজস্ব গুপ্তচর ঝড়ের বেগে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে খবর এনেছে যে নেপোলিয়ন হেরে গেছে। তখনো ব্রিটিশ সরকারও এই খবর জানে না! সাধারণ মানুষ হলে কী করত? খুশিতে নাচত। কিন্তু নাথান করলেন এক অদ্ভুত কাজ। তিনি গোমড়া মুখে স্টক মার্কেটে গিয়ে নিজের শেয়ার বিক্রি করতে শুরু করলেন।
তাকে দেখে বাকিরা ভাবল, "সর্বনাশ! নাথান বিক্রি করছে মানে নিশ্চয়ই নেপোলিয়ন জিতে গেছে!" হুজুগে পড়ে সবাই তাদের সব শেয়ার পানির দরে বিক্রি করে দিল।
মার্কেট ক্রাশ করল।
আর ঠিক তখন, একদম শেষ মুহূর্তে, নাথান চোখের পলকে সেই পানির দরের সব শেয়ার একাই কিনে নিলেন।
পরদিন যখন সরকারিভাবে খবর এল যে নেপোলিয়ন আসলে হেরে গেছে, তখন শেয়ারের দাম রকেটের গতিতে বাড়ল। মাত্র একদিনে রথচাইল্ড পরিবার এতটাই ধনী হয়ে গেল যে, তারা চাইলেই পুরো ব্রিটেন-সহ এমন আরও কয়েকটা দেশ কিনে ফেলতে পারত।
তারা শুধু টাকাই কামায়নি, তারা রাজাদের ব্যাংক হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
সুয়েজ খাল খনন হবে? রথচাইল্ডদের টাকা লাগবে।
রেললাইন বসবে? রথচাইল্ডদের লোন লাগবে।
এমনকি ব্রাজিল যখন পর্তুগাল থেকে স্বাধীনতা চাইল, সেই স্বাধীনতার ফি-টাও রথচাইল্ডরা দিয়ে দিয়েছিল!
কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়টা এখনো শুনেন নাই...
গল্পের আসল টুইস্টটা হলো তাদের সিকিউরিটিতে।
মায়ার আমশেল মৃত্যুর আগে একটা উইল করে গিয়েছিলেন। তিনি বলে গিয়েছিলেন, এই ব্যবসার যাবতীয় হিসাব শুধু পরিবারের ভেতরেই থাকবে।
বাইরের কেউ - এমনকি মেয়েদের জামাইরাও; ব্যবসার মেইন খবর জানতে পারবে না। তারা নিজেদের মধ্যে এক অদ্ভুত কোড ল্যাঙ্গুয়েজে চিঠি লিখত, যা সিআইএ বা এফবিআই-এর বাপেরও সাধ্য ছিল না ডিকোড করার।
আজ ২০০ বছর পর, আপনি হয়তো ফোর্বস ম্যাগাজিনে তাদের নাম দেখবেন না। কারণ তারা এখন আর ফ্রন্টলাইনে খেলে না। তারা আছে ব্যাংকের পেছনে, ওয়াইন ব্যবসায়, রিয়েল এস্টেটে, পলিটিক্যাল ডিলিংস আর বড় বড় সব ইনভেস্টমেন্টে।
ভেবে দেখুন, একটা মিথ্যে খবর আর সুদের টাকা দিয়ে কীভাবে একটা সুপারপাওয়ার দেশকে পকেটে পোরা যায়!
ইসলাম ১৪০০ বছর আগেই বলেছিল - "আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন আর সুদকে করেছেন হারাম।"
কারণ ব্যবসা মানে পরিশ্রম, ঝুঁকি আর বরকত।
আর সুদ মানে হলো অন্যের বিপদের সুযোগ নিয়ে বিনা পরিশ্রমে টাকা কামানো।
রথচাইল্ডরা ঠিক এই সিস্টেমটাই দাঁড় করিয়েছে। তারা নিজেরা কোনো পণ্য বানায়নি, কোনো ফ্যাক্টরি দেয়নি। তারা শুধু টাকার ব্যবসা করেছে। টাকা দিয়ে টাকা বানিয়েছে।
আজকের মডার্ন ব্যাংকিং সিস্টেম, যেখানে গরিব মানুষ লোন নিয়ে সারা জীবন কিস্তি টানতে টানতে মরে যায়, আর ব্যাংকের মালিকরা এসি রুমে বসে থাকে - এই সিস্টেমের গডফাদার কিন্তু ওরাই।
সুয়েজ খাল খনন থেকে শুরু করে বড় বড় দেশের রেললাইন—সব তাদের ঋণের টাকায়।
এমনকি শোনা যায়, ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পেছনেও তাদের ফিন্যান্সিয়াল হাত ছিল অনেক বড়।
রাজনীতিবিদরা ভাষণ দেয় স্টেজে, কিন্তু স্ক্রিপ্ট লেখা হয় ব্যাংকের বোর্ডরুমে।
আপনি হয়তো ভাবছেন, "আমি তো ছোট মানুষ, এসব জেনে কী করব?"
জানতে হবে। কারণ আপনি যদি সিস্টেমটা না বোঝেন, তবে আপনিও এই সিস্টেমের দাবার গুটি হয়েই থাকবেন।
কোরআনে সুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, কারণ সুদ একটা জাতিকে পঙ্গু করে দেয়। রথচাইল্ডদের ইতিহাস তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
টাকা কামানো খারাপ না। ইসলামে ধনী হওয়া দোষের কিছু না। হযরত উসমান (রা.) বা আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) অনেক ধনী ছিলেন। কিন্তু তারা ধনী হয়েছিলেন হালাল ব্যবসায়, মানুষের উপকার করে। মানুষকে ঋণের ফাঁদে ফেলে নয়।
নোটঃ এই গল্পটার সাথে টাকা কিভাবে তৈরি হয়, সেটার একটা কানেকশন আছে - সেই গল্পটা না হয় আরেকদিন করবো, আপাতত পেইজটা ফলো + শেয়ার দিয়ে রাখুন যাতে করে ওই গল্পটাও আপনার ফিডে আসে
Leave a comment
Your email address will not be published. Required fields are marked *