Buy Now

Search

শুক্লপক্ষের পরিশেষে [পর্ব-২৫]

শুক্লপক্ষের পরিশেষে [পর্ব-২৫]

ভাবের দেশে থাকো কন্যা গো, কন্যা,
ভাবের দেশেই থাকো...!”
শান্তিকুঞ্জের সম্মুখাংশে বেজে চলছে বিভিন্ন গ্রাম্য সংগীত, তারই একপাশে রিধিমাকে ঘিরে বসে আছেন এলাকার প্রবীণ রমনীরা। বিভিন্ন গান গাইছেন সবাই মিলে। হাসি-ঠাট্টার সাথে বিভিন্ন মশকরাও করছেন তাঁরা। রিধিমা ক্ষণে ক্ষণে লাজে মরছে। বোনেরা তা দেখে মজা নিতে ভুলছে না। প্রবীণদের আরও সুযোগ তুলে দিচ্ছে লজ্জা দেওয়ার। রিধিমার কঠোর দৃষ্টি তাদের দিকে পড়তে এলেই মিইয়ে যাচ্ছে লজ্জায়।
বাড়ির বউয়েরা বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতায় দম ফেলার সুযোগ পাচ্ছে না, কর্তারা ব্যস্ত অতিথিদের আতিথিয়েতায়। বাড়ির সর্বকনিষ্ঠ সদস্য শুভ্র এসব কিছুতে একবার নজর বুলিয়ে দৌড় লাগাল সিঁড়িঘর বরাবর। পরনে তার সফেদ রঙা কটনের পাজামা-পাঞ্জাবি। শরতের রুমের সামনে এসে সে থামে। শরৎ চুল সেট করার জেলটা খুঁজছিল। ওমনিই শুভ্র ডেকে ওঠে,
-“ব্রোওওও! কী করছ?”
শরৎ পিছে ঘুরে শুভ্রর দিকে তাকায়, তারপর আবার আয়নায় নিজেকে দেখে। বাহ! ম্যাচিং ম্যাচিং! আবারও শুভ্রর দিকে তাকিয়ে বলে,
-“কপিক্যাট কোথাকার!”
শুভ্র খিলখিল করে হেসে ওঠে,
-“এট্টু!”
শরৎ হেসে শুভ্রকে কোলে উঠিয়ে নিয়ে পিঠে ক'টা চাপড় মেরে বলে,
-“নট ব্যাড।”
-“এহে ব্রো, ছাড়ো ছাড়ো। কোলের বয়স নেই আমার। আ'ম নাইন নাও।”
-“তাই না?”
-“ইয়েস!”
শরৎ এবার ওকে পাজাকোলের ভঙ্গিমায় এনে বলল,
-“ফেলে দিই!”
-“এএএ না!”
শরৎ ওকে নামিয়ে দেয়। শুভ্র শরতের গা ঘেঁষে দাঁড়ায়। আহ্লাদ করে বলে ওঠে,
-“ব্রো, নিড ভাবি।”
-“জয়া আর শুভ্রা ভাবি আছে না? চলছে না ওতে?”
-“খেলব না। প্রতিবার কথা কাটিয়ে নাও। আই হেটিউ।”
-“লাভ ইউ ঠু।”
চোখ ঘুরিয়ে শুভ্র বলে,
-“হেট ইউ বলেছি।”
-“আমি তো লাভ ইউ শুনেছি।”
-“ব্রোওওওও!”
-“কীইইইই?”
-“প্লিজ একটা ভাবি এনে দাও না। প্রমিস তোমার সব কথা শুনব। তোমার শার্টগুলো নিয়ে আর ঢং করব না। সারাক্ষণ বিরক্ত করব না। তোমাকে জ্বালানোটা ওদিকে ট্রান্সফার করব।”
শরৎ শুভ্রর কাঁধে হাত রেখে দরজার দিকে এগোতে এগোতে বলে,
-“সময়মতো সব পেয়ে যাবি। এর আগে এত চাস না। আমার ভালো লাগে না।”
গাল ফোলাল শুভ্র,
-“আচ্ছা, বলব না আর।”
কথাটি বলে শরতের দিকে তাকাল সে। দেখতে পেল আচমকা শরতের অধর প্রসারিত হলো। এদিক-ওদিক ক্রমান্বয়ে ঘূর্ণায়মান দৃষ্টিটি একটি নির্দিষ্ট দিকে এসে স্থির হয়েছে। বাতাসের ঝাপটা এসে শান্তিকুঞ্জের দোতলার করিডোরে তান্ডব মাতানো শুরু করল। পূর্বে মুখ করা সাউন্ড বক্সে বাচ্চারা গান বাজাচ্ছে। একটা হিন্দি গান। গানটির প্রতিটি বিট এই হৃদ-তান্ডবে এসে যোগদান করল।
ᴅᴇᴋʜᴀ ᴛᴇɴᴜ ᴘᴇʜʟɪ ᴘᴇʜʟɪ ʙᴀᴀʀ ᴠᴇ
ʜᴏɴᴇ ʟᴀɢᴀ ᴅɪʟ ʙᴇᴋᴀʀᴀʀ ᴠᴇ
ʜᴀᴀʏᴇ ᴍᴀɪɴᴜ ᴋɪ ʜᴏ ɢᴀʏᴀ
ᴅɪʟ ᴊᴀɴɪʏᴇ ʜᴀᴀʏᴇ ᴍᴀɪɴᴜ ᴋɪ ʜᴏ ɢᴀʏᴀ...
ꜱᴜɴ ᴋᴇ ᴛᴇʀɪ ʙᴀᴛᴇɪɴ ꜱᴏɴᴇ ʏᴀᴀʀ ᴠᴇ
ᴍᴀʜɪ ᴍᴀɪɴᴜ ᴛᴇʀᴇ ɴᴀᴀʟ ᴘʏᴀʀ ᴠᴇ
ʜᴀᴀʏᴇ ᴍᴀɪɴ ᴍᴀʀ ᴊᴀᴠᴀ
ᴅɪʟ ᴊᴀɴɪʏᴇ ʜᴀᴀʏᴇ ᴍᴀɪɴ ᴍᴀʀ ᴊᴀᴠᴀ...
শরতের ওমন প্রজ্জ্বলিত মুখের জ্বলজ্বলে দৃষ্টি দেখে শুভ্র শুধাল,
-“হোয়াট হ্যাপেন, ব্রো?”
-“ডোন্ট নো!”
-“আর ইউ লস্ট?”
-“মে-বি ইয়েস।”
শুভ্র অবাক হয়,
-“কোথায়?”
চোখের ইশারায় শরৎ জানায়,
-“ওখানে।”
শুভ্র শরতের দৃষ্টি অনুসরণ করে পিছে তাকায়। দেখতে পায় এক সুশ্রী রমনীকে। পরনে তার ল্যাভেন্ডার জামদানী আটপৌরে করা, লম্বা চুলগুলো মাঝসিঁথি করে পিঠ ছাড়ানো। সেই চুলে একটা গাঁদাফুলের মালা সজ্জিত। দুটো মালা দু-হাতের কব্জিতেও জায়গা করে নিয়েছে। সম্পূর্ণ প্রিয়শ্রীকেই যেন সদ্য প্রস্ফুটিত একটি ফুল লাগছে। অনেক খুঁজেও গায়ে আর কোনো অলংকার খুঁজে পাওয়া গেল না।
শরৎ মিনমিনে স্বরে শুধাল শুভ্রকে,
-“ভালো?”
বিমুগ্ধ শুভ্র হা হয়ে ছিল, সেভাবেই বলল,
-“খু–ব!”
শুভ্রর কোঁকড়াচুলগুলো হাতের আঙ্গুলের সাহায্যে এলোমেলো করে দিলো শরৎ। এগিয়ে গেল প্রিয়শ্রীর দিকে। পথরোধ করে দাঁড়াল। আঁড়চোখে প্রিয় শরতের দিকে এক নজর তাকাল। সদ্য শাওয়ার নেওয়া ভেজা চুলগুলো শরতের কপালে এলোমেলোভাবে পড়ে রয়েছে, সাদা পাঞ্জাবিটাও সুঠাম দেহের সাথে আঁটসাঁট বাঁধা আছে। ভ্রু কুঁচকে প্রিয় শুধাল,
-“কী হচ্ছে?”
শরৎ পাঞ্জাবির হাতা গোটাতে গোটাতে বলল,
-“কী হবে?”
প্রিয় বড়ো ভাব নিল,
-“মানলাম আমি সুন্দরী, আজ একটু বেশিই সুন্দর দেখাচ্ছে। এর মানে এই না যে আপনি টিপিকাল রোড সাইড রোমিও সেজে টিজ করা শুরু করবেন?”
শরৎ অবাক হওয়ার ঢং করে বলল,
-“আপনার সেন্স অব্ হিউমার এত্ত ফালতু, প্রিয়? ওয়াও! জোস! ফ্যাবিউলাস! দ্যি গ্রেট নীরজ শিকদার কি না টিজ করবে? আপনাকে? ফর ইউর কাইন্ড ইনফরমেশন, নীরজ শিকদার ভীষণ রকমের রুচিশীল মানুষ। এ জীবনে সে রুচির অধঃপতন হবে না। আপনাকে টিজও করা হবে না।”
এক নাগাড়ে বিরতিহীনভাবে এতগুলো কথা বলে শরৎ থামল। প্রিয় বড়ো বড়ো চোখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে,
-“আঙুর ফল টক।”
শরৎ হাসে, ভেজা চুলগুলোয় ব্যাকব্রাশ করতে করতে বলে,
-“বেশি বোঝেন।”
প্রিয় নিজের চুলগুলো পিছে উড়িয়ে বলল,
-“নীরজ ভাই, আপনি বহুত ঢং জানেন।”
-“আপনার চেয়ে কম।”
প্রিয়র হাতের ফুলমালাটা খুলে গেল। ‘ইশশশ্’ ধরনের শব্দ উচ্চারণ করে সে তা ঠিক করতে লাগল, কিন্তু বাঁধতে পারছিল না। শরৎ বলল,
-“এদিকে দিন, দেখি।”
প্রিয় হাত বাড়িয়ে দিলো। শরৎ সুতোয় সাবধানে গিট দিতে লাগল। সেই ক্ষণে আরও একবার নজর গেল প্রিয়র হাতের এই কাঁটাছেড়ার দাগগুলোতে। গা শিরশির করে উঠল তার। চোখ বুঁজে এলো ত্বরিতে। পরপর তাকাল প্রিয়র চোখের দিকে। প্রিয় ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। শরৎ চোখে চোখ রেখে শুধাল,
-“নিজেকে এত আঘাত কেন, প্রিয়?”
প্রিয়র চোখ পড়ল নিজের হাতের দাগগুলোতে। অপ্রস্তুত হলো সে। কথা কাটানোর শব্দ পেল না। চোখ দুটো জ্বলজ্বল করতে লাগল। তবে উত্তর দিলো সামান্য হেসে,
-“সহ্যশক্তি প্রচণ্ড আমার। কিন্তু যন্ত্রণারা ছিল সীমাহীন। যেমনটা আমার ভালোবাসা সীমা ছাড়িয়ে সর্বোচ্চতে পৌঁছে গিয়েছিল। এইটুকু চিহ্ন থাকা আবশ্যক ব্যাপার।”
শরৎ প্রলম্বিত শ্বাস ফেলে বলল,
-“নিজেকে কষ্ট দেওয়ার পেছনের যুক্তি?”
-“শরীরের এই যন্ত্রণা ক্ষণিকের জন্য হলেও আমাকে মরণযন্ত্রণা থেকে রক্ষা করেছিল।”
শরৎ হাতটা উলটে-পালটে প্রগাঢ় দৃষ্টিতে দেখল। দেখতে দেখতে বলল,
-“দাগগুলো কীসের?”
শরৎ আরও খানিকটা এগোল, পেছাল প্রিয়। পিলারের সাথে প্রিয়র পিঠ ঠেকে গেল। বাম হাতটা শরতের হাতে। ডান হাতটা রেলিংয়ের ওপর রাখল। ডানের ঘন জঙ্গলের দিকটায় তাকাল। শুষ্ক গলায় রসিকতার সুরে বলল,
-“ও কিছু না। কান্না আটকাতে হাত কামড়ে ধরতাম, রাগ দমাতে খামচে ধরতাম। এসবেরই দাগ।”
চোয়াল শক্ত হলো শরতের। চাহনি হলো দৃঢ়, গলার স্বর তারও অধিক কঠোর,
-“বাড়িতে জানে এসব?”
-“ভাই জানে, মা আংশিক জানে। বাবা কিছু জানে না।”
প্রিয় তাকায় ওর দিকে। আবারও বলে,
-“আপনি কতটা জানেন?”
-“যতটা বুবুজানকে আপনি বলেছেন।”
-“ওহ! তার মানে সবটাই জানেন। কবে জেনেছেন?”
-“প্রথমদিনই।”
প্রিয় হাসে,
-“সহানুভূতি দেখাতে এসেছেন তবে?”
প্রশ্নটা সম্পূর্ণ এড়িয়ে গেল শরৎ নিজের প্রশ্নের দ্বারা,
-“নতুন সম্পর্কে যাননি, প্রিয়?”
-“যাইনি।”
স্বকীয় ধারণাকে ১৮০° এঙ্গেলে উলটে যেতে দেখে শরতের জ্বলজ্বলে দৃষ্টি শীতল হয়ে এলো। জিজ্ঞেস করল,
-“কেন?”
-“কেন আবার?”
-“আমার ধারণা ছিল আপনি আরেকবার আরেকটি সম্পর্কে জড়াবেন, জাস্ট নিজেকে সামলানোর জন্য। প্রেমেও পড়ে যাবেন আস্তে-ধীরে। অনেক মানুষ দেখেছি এমন। প্রথম সম্পর্কে গভীর থেকে গভীরভাবে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে সে একা হয়ে যায়। একাকিত্ব অভিশাপ! সে তাই আরেকজন পুরুষের ধারে যায়। বন্ধুত্বের দোহায় দিয়েই হোক কিংবা টেম্পারারি রিলেশনে গিয়ে। আপনার থেকেও এমনটাই আশা করেছিলাম, প্রিয়।”
প্রিয়র গায়ে কথাটা সূচের মতো লেগে, অপমানে মুখ হয় থমথমে। তীক্ষ্ণ নজরে তাকিয়ে বলে,
-“দেবদাস হওয়া কেবল পুরুষদেরই সাজে।
পার্বতীকে ভুলতে গিয়ে রোজ রাতে চন্দ্রমূখীতে মজে।
আর আমরা নারী,
আমরা মানতেও পারি, মানাতেও পারি।”
শরৎ হাসে,
-“এজন্য মেয়েরা মায়ের জাত। ছোট থেকেই তাদেরকে সম্মান করি।”
কথাটা প্রিয়র ভালো লাগল। এরই মধ্যে শরৎ আরেকবার বলে উঠল,
-“প্রিয়, আরেকবার প্রেমে পড়ার সাহস দেখাবেন?”
-“আপনি আমাকে আরেকবার প্রেম শেখাতে চাইছেন, নীরজ ভাই?”
-“চাইছি।”
-“আপনি কি আরও একবার আমাকে দুঃখ চেনাতে চাইছেন?”
-“কিঞ্চিৎ চাইছি।”
-“ইতোমধ্যে আমি সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত, আর কত অসুখ আসবে?”
-“এবার সুখ পাবেন।”
-“ট্রাস্ট ইস্যু আছে আমার।”
প্রিয় হাসতে লাগে পাগলের মতো। শরতের হাতের গ্রিপ শক্ত হয়, কব্জিতে চাপ লাগে প্রিয়র। হাসি থেমে যায় তৎক্ষণাৎ। তাকায় শরতের চোখের দিকে। শরতের সেই অনমনীয় নজরে তাকাতেই সহসা সে থমকে যায়। ভারিক্কি গলায় শরৎ আবারও জানায়,
-“ট্রাস্ট করুন এবার।”
প্রিয় চোখে হেসে বলে,
-“যার কাছে নিজেকে ভেঙেচুরে উপস্থাপন করলাম, সে-ই ভেঙে ফেলে চলে গেল। আর বিশ্বাস করি কাকে?”
চলবে..

Olindo Rahman

Olindo Rahman

A good book is worth a hundred good friends. 
But a good friend is equal to a library.!! 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Your experience on this site will be improved by allowing cookies Cookie Policy