প্রিয় চোখে হেসে বলে,
-“যার কাছে নিজেকে ভেঙেচুরে উপস্থাপন করলাম, সে-ই ভেঙে ফেলে চলে গেল। আর বিশ্বাস করি কাকে?”
শরৎ কদম দুয়েক এগিয়ে আসে। মুঠো করে নেয় প্রিয়র হাতটা, তাকিয়ে থাকে প্রিয়র কাজল দৃষ্টির অতলে। প্রিয় পলক ঝাপটিয়ে তার দিকে তাকায়। শরৎ বলে,
-“আপনার একটা মানুষ আসুক, একটা নিজের মানুষ।”
-“চাই না।”
শরৎ চোখে হাসে,
-“আচ্ছা প্রিয়, বিষণ্ণ সন্ধ্যেতে কারো বুকে মুখ লুকোনোর ইচ্ছে জাগে না? রাত্রিপ্রিয়া, এত নির্ঘুম রাত কি আপনায় আফসোস উপহার দেয় না একটা নিজস্ব পুরুষালি কাঁধের? একাকী রাস্তাগুলো কারো হাতের আঙ্গুলের ভাঁজে নিজের আঙ্গুল গুঁজে দেওয়ার খোয়াইশ জাগায় না? প্রিয়, হুটহাট কারো জন্য সাজতে ইচ্ছে করে না? কারো থেকে প্রশংসাবাক্য শুনে লজ্জায় লাল হতে ইচ্ছে করে না? প্রকৃতি আপনায় একটা মানুষ দিক। একাকিত্ব দূর হোক, আপনি আমার শখের কামিনীফুল হয়ে ফুটে উঠুন।”
প্রিয়র চোখ তখন জ্বলছে, লাল রক্ত জমাট বেঁধেছে সাদা অংশে। ভয়ানক সে দৃষ্টিতে প্রিয় শরতের দিকে তাকায়। নিখুঁত আকৃতির ঠোঁটদুটো বিরবির করে উঠল, অথচ শব্দ হলো না। ঠোঁটের নড়চড়ে ভাব দেখে শরৎ উচ্চারণকৃত শব্দ টের পেল,
-“কিচ্ছু চাই না।”
শরৎ বুঝে উঠতেই বলে ফেলে,
-“তবে প্রকৃতি আপনায় এমন সব চাওয়াগুলোই দিক।”
প্রিয় তাকিয়ে থাকে শরতের দিকে অনেকটা সময় নিয়ে। সে লক্ষ্য করে শরতের চোখের মণিটা কালো নয়, কিঞ্চিৎ ঘোলাটে। প্রিয় বেশ সময় নিয়ে পর্যবেক্ষণ করে আচমকা অবাক হয়ে যায়, শরতের চোখ অসম্ভব সুন্দর লাগতে লাগে তার কাছে। দৃষ্টি সরায়। ওষ্ঠে আনে হাসির রেখা। প্রসঙ্গক্রমে বলে ওঠে,
-“তা আপনার গার্লফ্রেন্ডের ব্যাপারে কিছু বলুন, শুনি।”
-“আমার গার্লফ্রেন্ড?”
শরতের কণ্ঠে প্রশ্ন। মাথা নাড়ায় প্রিয়। হুট করে সেদিনের ট্রুথের কথা মনে করে শরৎ বলে ওঠে,
-“আমার গার্লফ্রেন্ডের ব্যাপারে শুনবেন?”
-“জি।”
শরৎ হাত ছাড়ে প্রিয়র। বিপরীতের পিলারে নিজে হেলান দেয়। বুকে হাত বেঁধে টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে বলে,
-“কল্পনায় সুখ কুড়িয়েছেন, প্রিয়?”
প্রিয়র মনে পড়ে তার প্রাণের কথা। চোখ দুটো বুঁজে আসে। কল্পপুরুষ তার কানের নিকট অতি যত্নে যেন ফু দিলো, প্রিয় শিউরে উঠল ভেতর ভেতর। একই সাথে আবারও প্রিয় তার কল্পপুরুষের দ্বারা শুনতে পেল, ‘ফুল, আমার রাজকন্যা! তুমি এক ভীষণ সুন্দর সুখপাখি।’
প্রিয় চোখ খুলে ফেলল ত্বরিতে। প্রতিমুখে শরৎকে মিটমিটিয়ে হাসতে দেখে প্রিয় আঁড়চোখে তাকিয়ে বলল,
-“আপনার চেয়ে বেশি অভিজ্ঞ আমি এদিকে।”
শরৎ শুধায়,
-“কল্পপুরুষ আছে, প্রিয়?”
-“আছে।”
-“কেমন সে?”
-“আব্..”
-“দেখেননি?”
-“দেখেছি।”
-“তবে?”
-“তার মুখের অবয়ব আমার কাছে কখনও পরিষ্কার হয়নি। সে দেখতে ভীষণ সুদর্শন। আমি যতবার তাকে দেখি, ততবারই মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকি। এতটা মনের মতন কেউ কীভাবে হয়? তবে আকৃতিগত বৈশিষ্ট্য আমার জানা নেই। আমি বলতে পারি না।”
-“এক বাক্যে বলুন।”
-“আমার মনের মতো।”
-“বাহ্যিকতায়?”
-“সবরূপে, সবভাবে সে আমার মনের মতোই।”
-“কল্পপুরুষকে তবে প্রেমিক বলতে পারছেন না কেন, প্রিয়?”
-“লোকে আমায় পাগল বলবে..”
-“প্রেমের সর্বোচ্চটা হচ্ছে পাগলামি। প্রেম করবেন আর পাগল হবেন না, তা হয়?”
প্রিয় অদ্ভুতভাবে তাকায়,
-“তো বলছেন, সবাইকে বলে বেড়াতে যে আমার একটা কাল্পনিক প্রেমিক-পুরুষ আছে?”
শরৎ হাসে,
-“না থাক, বলা লাগবে না।”
প্রিয় শুধায়,
-“জিজ্ঞেস করেছিলাম আপনার গার্লফ্রেন্ডের ব্যাপারে। এড়িয়ে গেলেন?”
-“মানুষের সামনে পাগল সাজতে চাই না..”
প্রিয় বড়ো বড়ো চোখে তাকায়,
-“সিরিয়াসলি? আপনারও কাল্পনিক প্রেমিকা আছে?”
-“আজ্ঞে না। আমার মনে মনে সংসার আছে।”
-“মনে মনে সংসার?”
-“মানে একটা মেয়েকে পছন্দ করি। তারপর তাকে নিয়ে মনে মনে সংসার করি। মনে মনে জড়িয়ে ধরি, মনে মনে টপাটপ পাঁচ-দশটা চুমু খেয়ে ফেলি।”
-“ছি! অশ্লীল!”
-“এখানে অশ্লীলতার কী আছে? গোপনে প্রিয়, তুমিও খুব একটা সাধু নও। ভেতরের কথা বের করতে গেলে জানতে পারব, কাল্পনিক পুরুষের সাথে তুমি বাচ্চা-টাচ্চা জন্ম দিয়ে ফেলেছ।”
-“ইছছিইইহ! আপনি তো দেখছি অশ্লীলতার চূড়ান্তে চলে গেছেন, নীরজ ভাই।”
প্রিয় নাক সিটকাচ্ছে। শরৎ বাচ্চাদের মতো অভিমানে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে খানিকটা ফুলকো গালে বলে উঠল,
-“হ্যাঁ, সেটাই। তোমরা করলে দোষ নেই, আমি বললেই দোষ।”
আচমকা প্রিয় হাসতে লাগে। হাসতে হাসতে বলে,
-“গাল ফোলালে আপনাকে যা লাগে না, নীরজ ভাই! কাছে আসেন। একটু টেনে দিই।”
-“ছি প্রিয়, দিন দিন চরম ফাজিল হয়ে যাচ্ছ তুমি। এভাবে একা পেয়ে একটা ছেলেকে টিজ করতে তোমার বাঁধছে না? ঘরে বাপ-ভাই নাই?”
প্রিয় হেসে সত্যি সত্যি শরতের ডান গালটা টেনে বলে,
-“বাপ-ভাই আছে, তোমার মতো একটা টসটসে মাল নেই কেবল।”
-“নাউজুবিল্লাহ, আস্তাগফিরুল্লাহ! মুখের ভাষার কী শ্রী!”
প্রিয় চোখ মেরে বলে,
-“এটা প্রাইমারি লেভেলের, আপনি চাইলে খাঁটি বাংলাতেও কিছু শুনিয়ে দিতে পারি। ওয়ানা হিয়ার?”
-“নোপ প্রিয়, তুমি সাংঘাতিক মেয়ে।”
প্রিয় হাসি চেপে অন্যদিকে তাকায়। ডান গালের গর্তটা কী গভীর দেখাচ্ছে! শরৎ ডিম্পলটির দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে বলল,
-“তোমাকে দেখলে এখন আর ঝগড়া পায় না। অন্য কিছু পায়। আশ্চর্যজনক কিছু পায়।”
প্রিয় শুধায়,
-“কী পায়?”
তা আর শরতের বলা হয় না। হলুদের আনুষ্ঠানিকতায় রাত অবধি ব্যস্ত থাকে।
____
রাতের ১১টা। ধানমণ্ডির এক সরু রাস্তা হয়ে অসম্ভব আকর্ষণীয় এক তরুণী খটখটে শব্দ তুলে হেঁটে চলেছে। পরনে ঢোলাঢোলা এক টপ্স আর ব্যাগি জিন্স। চোখে বরাবরের মতো লেন্স নেই, আছে মাইনাস পাওয়ারের গ্লাস। খড়খড়ে ফেঁটে যাওয়া ঠোঁটে দৃষ্টিধাঁধানো রঙ নেই। কেমন যেন নিজস্ব রূপ এটা! কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ। আর গলায় স্কার্ফ।
চাঁদের আলো অপরিচ্ছন্ন, মৃদু স্ট্রিটলাইটই রাস্তাটিকে দৃশ্যমান করতে সহায়তা করছে। আপাতদৃষ্টিতে দেখা গেলে, রাস্তাটিতে জনমানবশূন্য মনে হবে। কিন্তু মেয়েটি দেখতে পাচ্ছে ভিন্ন কিছু। একাকী রাস্তাটিতে চাঁদ তার সঙ্গে সঙ্গে হাঁটছে, তবে নিজেকে নিঃসঙ্গ সে ভাবে কী করে?
কুহক হাসে সামান্য। ব্যাগ থেকে চিপ্সের প্যাকেট বের করে খেতে থাকে। এলোমেলো উদ্দেশ্যহীন এক পথ হাঁটতে থাকে। শহরের রাস্তায় মেয়ে মানুষের একা বের হওয়াটা বেশ নির্বোধ একটা কাজ। যে-কোনো সময়, যে-কোনো কিছু হতেই পারে। এদিকে কুহক কিছুটা ভিন্ন। সে নিজেকে প্রতিটি সিচুয়েশনের জন্য প্রস্তুত রাখে। সেল্ফডিফেন্সটা তার জানা আছে।
কল আসে তার ফোনে। পকেট হাঁতড়ে ফোনটা বের করে কলার আইডি দেখে। স্ক্রিণে জ্বলজ্বল করছে কিছু লেটার, 'LOVE'
কল রিসিভ করে সে। মৃদু হেসে শুধায়,
-“আমাকেও আপনার মনে পড়ে তবে?”
ওপাশের লোকটার গলা মারাত্মক গম্ভীর,
-“বাজে কথা ছাড়ো।”
-“আচ্ছা, ছাড়লাম। বলুন।”
-“কাজ কদ্দূর হলো?”
-“আর কাজ! এরকম মানুষ কাউকে ভালোবাসতে পারে না।”
-“আমি জানতে চেয়েছি কতদূর অবধি কাজ হয়েছে।”
ওপাশের কণ্ঠ শুনে কুহক মলিন হাসল। বলল,
-“সামান্য। পুরুষ মানুষ দুই জায়গায় আটকায়। মায়ায় আর আকর্ষণে। এর বাইরে তারা অতি গোপনে কৌতুহলী কদম এগিয়ে জানতে এসে আরও বাজেভাবে আটকে যায়। আপাতত শ্রেয়ান আমার ব্যাপারে ভীষণ কৌতুহলী।”
-“ওয়েলডান।”
কুহক হুট করেই শব্দ করে হেসে ওঠে, এ-পাশের লোকের ভ্রু কুঁচকে যায়। শুধায়,
-“হাসছ কেন পাগলের মতো?”
মেয়েটা হাসি থামায় না। রোড সাইডে বসে পড়ে। গভীর এক শ্বাস ফেলে বলে,
-“যাকে ভালোবাসলাম, তাকে পেলাম না। অথচ আরেকজনকে ভালোবাসার জালে আটকাতে এলাম। বিনিময়ে কি আমি নিজের ভালোবাসা পেতে পারি?”
কণ্ঠ খানিকটা কাঁপছিল কুহকের। ওপাশের লোকটি তাতে বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। পার্ফেক্ট এক্সেন্টে বলে উঠল,
-“তুমি নিজ থেকেই করতে চেয়েছ, কুহক। আই ডিডেন্ট আস্ক ইউ টু ডু দিজ।”
-“হুম। আই ওয়োন্ট এক্সপেক্ট আ লি'ল থিং ফ্রম ইউ, লাভ। ভালোবাসা ততক্ষণই সুন্দর, যতক্ষণ না সেখানে এক্সপেক্টেশন নামে কোনো শব্দ চলে আসে।”
কুহক হেসে হেসে আবার বলে,
-“আমি আপনায় ভালোবাসি নিঃসঙ্গ প্রতিটি রাতের মতো। ক্ষত দেবেন? তবে দিন। আমরা তো ভালোবাসিই যন্ত্রণা পাওয়ার জন্য। কুহকের ভালোবাসা আপনি পরিমাপ করতে পারবেন না, যন্ত্রণা তবে ছোট্ট আকাশের সমানই দিন।”
পুরুষালি কণ্ঠটা সময় নিয়ে বলে উঠল,
-“প্রচুর রিস্ক এখানে। তুমি প্লিজ সরে যাও, আমি অন্য উপায়ে ম্যানেজ করে নেব।”
কুহক হাত-পা ছড়িয়ে ধুলো মাখানো রাস্তায় চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল। গুনগুনিয়ে গান ধরল,
-একটা ছেলে মনের আঙিনাতে
ধীর পায়েতে এক্কা দোক্কা খেলে
বন পাহাড়ি ঝর্ণা খুঁজে
বৃষ্টি জলে একলা ভিজে
সেই ছেলেটা আমায় ছুঁয়ে ফেলে
সেই ছেলেটা আমায় ছুঁয়ে ফেলে
আমি তো বেশ ছিলাম চুপিসারে
ছোট্ট মেয়ে সেজে একটা কোণে
সবুজ বনে নীলচে আলো জ্বেলে
স্বপ্ন ভেজা মাটিতে পা ফেলে
সেই ছেলেটা হঠাৎ এলো মনে
সেই ছেলেটা হঠাৎ এলো মনে...
গান শেষে কুহক ওই চাঁদের দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে। রিনরিনে স্বরে বলে ওঠে কিছু ভারি বাক্য,
-“খেলোয়াড়ের হেরে যাওয়া অবধি খেলাটা চলবে। শুরুটা আপনার কথামতো হলেও, শেষটা আমি ভিন্নভাবে সাজিয়েছি। আপনাকে চাওয়া বাদে আমার মনের প্রতিটি চাওয়া আমি পূরণ করেছি, করে যাচ্ছি। কুহকিনী বড়ো অদ্ভুত, মিস্টার! আপনি হারালেন চমৎকার কিছু। আই ওয়োন্ট মাইন্ড! আমার ভাগ্যে অবশ্যই আপনার চেয়েও বেটার কিছু আছে।”
এই পর্যায়ে গম্ভীর লোকটার আওয়াজ কোমল হয়,
-“পৃথিবীর সবচেয়ে উপযুক্ত পুরুষটি তোমার হোক।”
_____
মেহেদী লাগিয়ে প্রিয় ছাদে উঠে এলো। অদূরে শরৎ আর প্রহরকে দেখতে পেল কিছু একটা নিয়ে বেশ কঠিন মুখে আলোচনা করতে। প্রিয় দাঁড়িয়ে পড়ে। না চাইতেও কিছু বাক্য তার কানে চলে আসে।
শরৎ বলছে,
-“আবার যোগাযোগের চেষ্টা করবে ও।”
-“সাধ্যে থাকলে একটা খুন করতাম।”
-“ইচ্ছে তো তাই করে রে, প্রহর।”
-“তাহলে দেরি কীসের, ভাইয়া? একটা খুনই তো। চলো করি।”
শরৎ প্রহরের পিঠ চাপড়ে বলে,
-“এভাবে না! মৃত্যু সর্বোচ্চ শাস্তি হতে পারে না।”
-“হুম..”
-“মন খারাপ করিস না। আর কয়েকটা মাস অপেক্ষা কর। আমাদের কলিজার টুকরোকে কষ্ট দেওয়ার জন্য আমি ওর রুহ কাঁপানো শাস্তির ব্যবস্থা করে রেখেছি।”
প্রিয় এগিয়ে গিয়ে শুধায়,
-“কী নিয়ে কথা বলছ?”
দুটো পুরুষই অপ্রস্তুত হয়ে উঠল একই সঙ্গে।
চলবে...
Leave a comment
Your email address will not be published. Required fields are marked *