“অনুভূতির সাথে খেলতে যেয়ো না, প্রিয়৷ তুমি হেরে যাবে। অনুভূতিরা জ্বাল বুনতে জানে, অনুভূতিরা মানুষটাকে আঁটকে ফেলতে জানে।”
প্রিয় তাকায় শরতের দিকে। শরৎ দুম করে পাশে বসে পড়ে, দৃষ্টি তাক করে বিলের জলে। ওষ্ঠে তার অতি সূক্ষ্ম হাসি, যা ক্ষণেই বিলীন হয়ে এলো। মলিন গলায় বলল,
-“আমার সিক্রেট প্লেস এটা। এখানে কী করছ, প্রিয়?”
প্রিয় ফিসফিসিয়ে বলল,
-“সিক্রেটলি অনুভূতিতে সুখ নিচ্ছি, নীরজ ভাই।”
-“কীভাবে নেয়?”
-“বলব না।”
শরৎ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
-“এখানে কী করছ, বললে না?”
প্রিয় একবার বাঁকাচোখে শরৎকে দেখে নিল, দৃষ্টি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আবার বলল,
-“তোমার পছন্দ সুন্দর, এই জায়গাটাও সুন্দর। আমার ভালো লেগেছে, তাই রোজ রাতে আসি।”
-“এত রাতে ভয় করে না?”
-“কীসের ভয়?”
-“অন্ধকার?”
-“অন্ধকার প্রিয় চাঁদকে নজরকাঁড়া করে, তাকে ভয় কীসের?”
-“একাকিত্ব”
-“একা কই? কল্পপুরুষ আছে।”
-“জন্তু-জানোয়ার?”
-“খুব বেশি হলে ছিঁড়ে খাবে, সর্বোচ্চ মৃত্যু হবে। মানুষের তুলনায় ধরতে গেলে, ওদেরকে ভয় পাওয়ার কারণ নেই।”
বুক চিঁরে দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে এলো শরতের। সে আওয়াজ বোধহয় প্রিয় শুনতে পেল। সামান্য হেসে বলল,
-“আসো, তোমাকে শেখাই কীভাবে অনুভূতিতে সুখ নেওয়া যায়।”
কৌতুহলী শরৎ বলল,
-“হুম, শেখাও।”
প্রিয় প্রলম্বিত শ্বাস টেনে বলল,
-“চোখ বন্ধ করো, নীরজ ভাই।”
-“করলাম।”
-“উম..পাহাড়ি অঞ্চল। চারপাশে অসংখ্য পাহাড়, মেঘেরা এদিক-ওদিক খেলে বেড়াচ্ছে। বাতাসে বুনো ঘ্রাণ! ঠিক এমন এক ভোরে গায়ে একটা ছাই-রঙা চাদর পেঁচিয়ে নিলে। লম্বা শ্বাস টেনে জায়গাটা কল্পনা করো।”
শরৎ শ্বাস টানল, চোখের পাতায় ঠিক এমনই এক দৃশ্য ফুটে উঠল। প্রিয় বলল,
-“এত এত পাহাড়ের মধ্যে সবচেয়ে উঁচু পাহাড়ের শৃঙ্গে একটা কটেজ। সেই কটেজের বারান্দার ফ্লোরে তুমি আর আমি বসে আছি। নীরজ ভাই, কোথায় আছ?”
-“বারান্দায়।”
-“কী দেখতে পাচ্ছ?”
-“আমার পৃথিবী কতটা সুন্দর তা দেখছি, আর দেখছি...
-“আর কী দেখছ, নীরজ ভাই?”
-“একজন পাহাড়কন্যাকে।”
প্রিয় লাজুক হেসে বলল,
-“কল্পনায় কথোপকথন চালাও তোমার পাহাড়কন্যার সাথে।”
-“তুমি প্রচণ্ড রকমের বিলাসী..”
-“আমি বিনাশীও অবশ্য।”
-“তুমি পূর্ণচাঁদের ন্যায় স্নিগ্ধ।”
-“আমি অমানিশার মতো ভয়ঙ্করও।”
-“তুমি সমুদ্রের জলতরঙ্গের ন্যায় অশান্ত।”
-“আমি আগুনের প্রলুব্ধ শিখায় ন্যায় শান্তও।”
-“তুমি বড়ো মায়াবী।”
-“মাঝে সাঝে নিষ্ঠুরও।”
-“তুমি এক কোমলপ্রাণ।”
-“অথচ আমি অত্যাধিক উগ্রও।”
-“তুমি ভীষণ আদুরে।”
-“প্রয়োজনে সবচেয়ে বেয়াদবও।”
-“তুমি সঁজীবনী সুধা।”
-“আর স্বয়ং অসুখও।”
-“এত বিচিত্রতা কেন তোমার মাঝে?”
-“ভিন্নতা মানুষকে আকর্ষণীয় বানায়। নিজের বলতে আমি ছাড়া কেউ নেই।”
-“মেয়ে, তোমাকে চাঁদ ভেবে আকাশ হয়ে যেতে ইচ্ছে করে।”
প্রিয় কথাটির মর্মার্থ ধরতে পারে। আর ঠিক এখানটাতে গিয়েই ভড়কে যায়। এলোমেলো নজরে এদিক-ওদিক তাকাতে থাকে ক্রমশ। শরৎ বন্ধ দু'চোখে বলতে থাকে,
-“প্রিয়, তোমাকে পৃথিবী চেনাতে ইচ্ছে করে।”
দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রিয় বলে,
-“চিনেছি।”
-“জানো, মেয়ে? পৃথিবীর দুটো দিক রয়েছে, একটা যা শ্রেয়ান তোমায় দেখিয়েছে। অন্যটা আমি দেখাতে চাই।”
প্রিয় নতমুখী হয়ে ছিল, শরতের কথা শুনে ওর পানে তাকায়। একটু এগিয়ে গিয়ে লাগোয়া হয়ে বসে। তারপর হুট করেই শরতের কাঁধে মাথা রাখে। বিদ্যুৎ স্পর্শের মতো চমকে ওঠে শরৎ। তাকায় প্রিয়র দিকে। প্রিয় মিনমিনে স্বরে বলে,
-“অথচ, তা সম্ভব নয়।”
-“কেন নয়?”
-“কারণ আমি চাই না।”
শরৎ প্রিয়র চোখে চোখ স্থির রেখে বলে উঠল,
-“কী চাও, প্রিয়?”
-“আপাতত দূরত্ব চাই। তুমি ভীষণ ভালো, নীরজ ভাই। ভীষণ রকমের মনের মতো। তাই মন তোমাকে চেয়ে বসছে, আমার অবাধ্য হচ্ছে। ব্যাপারটা আমার কাছে ভালো লাগছে না। আমি দূর্বল হয়ে যাচ্ছি। নীরজ ভাই, তোমাকে আমি খুব পছন্দ করি। এই পছন্দটা হুট করে যদি ভালোবাসায় রূপ নিয়ে ফেলে, ভয় হচ্ছে।”
-“ক্ষতি কী?”
-“একই ভুল দ্বিতীয়বার কী করে করি?”
-“ভুল সববারই হবে, এর কোনো মানে আছে?”
-“সম্ভব নয়, নীরজ ভাই।”
প্রিয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিয়ে মাথা তুলে শরতের দিকে তাকায়। ঠিক সেই মুহূর্তে গিয়ে প্রিয় উপলব্ধি করে, সে শরতের এতটাই কাছে যে নিঃশ্বাসের শব্দগুলোও মিলে-মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। প্রিয় অপ্রস্তুত হয়। এক রাজ্য ঔদাস্য নিয়ে তাকিয়ে থাকে। শরৎ প্রিয়র ডান হাতটা নিজের মুঠোয় নিল। হাতটার পিঠে বৃদ্ধাঙ্গুল বোলাতে বোলাতে বলল,
-“তোমার চাওয়াকে সম্মান করি।”
প্রিয় অসীম মুগ্ধতা নিয়ে শরতের দিকে তাকাল। সেই চোখে মুগ্ধতার সাথে ছিল মলিনতাও। প্রিয়র এক মন চায় শরতের দিকে এক পা এগোতে, ঠিক সেই ক্ষণে অপর মন তাকে চার কদম পিছিয়ে ফেলে। শেষমেষ প্রিয় সবটা ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিয়ে পিছিয়ে গেল।
শরৎ ধরে রাখা ডান হাতের পিঠে হুট করেই ঠোঁট ছোঁয়াল। সময় নিয়ে চুমু খেয়ে বলল,
-“তোমার সব মলিনতা আকাশে মিশে যাক, মেঘ জমুক, বৃষ্টি হোক। তুমি হয়ে ওঠো আগের মতোই প্রাণোচ্ছল। প্রিয়, তুমি কি জানো—তোমায় কেউ একজন আচমকাই চেয়ে বসেছে?”
______
আজ শ্রেয়ান পাগল হতে বসেছে। কুহককে তার চাই-ই চাই। এই মেয়েটা যেন রীতিমতো তাকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাচ্ছে। কুহকের সাথে তার প্রথম দেখা হয়, প্রিয়র সাথে ঝামেলা হওয়ার কিছুমাস আগে, ধানমন্ডি লেকে। মেয়েটার মাঝে কী যেন ছিল, শ্রেয়ান তাকে অবজার্ভ করতে বাধ্য হয়। বেশ অনেকটা সময় পর শ্রেয়ান যখন ফেরার উদ্দেশ্যে গাড়িতে গিয়ে বসে, কুহক এসে লিফট চায়। তখনকার টুকিটাকি কথা, নাম্বার বিনিময়। এ-ই তো! এসবই হলো।
এরপর হোয়াটসঅ্যাপে চ্যাট হতে লাগে। শ্রেয়ান অবাক হয় কুহকের প্রতিটি কাজে। যেখানে অন্য মেয়েরা তার পাত্তা পাওয়ার জন্য পাগল, সেখানে কুহক বরাবরই তাকে ইগনোর করে এসেছে। এরপর কথা হতে থাকে, বার বার দেখা হতে থাকে। শ্রেয়ান খেয়াল করে, মেয়েটার টেস্ট ভিন্ন। সে স্মোক করে, ড্রিংক করে। রাত-বিরেতে ঘোরাফেরা করে। ড্রেসাপ সেন্সও আর বাকিদের চেয়ে অন্যরকম। সেই সঙ্গে সে ভীষণ রকমের বোল্ড। আর এইখানে গিয়েই তো সে দূর্বল হয়। শ্রেয়ানের ধারণা ছিল, এসব মেয়েরা খুব জলদিই বেডে চলে আসে। কিন্তু সেই ধারণায় এক বালতি জল ঢেলে দিয়ে আজ প্রায় ১ বছর হলো, মেয়েটা হাতে আসছে না।
শ্রেয়ান দেখা করতে ডেকেছে। ইদানিং যেন দেখাও করছে না। তার ভালো লাগছে না কিছু। মেয়েটাকে চাই তার। কিন্তু এসব কী? তার চাওয়াকে প্রাধান্য দিচ্ছে না? তার চাওয়াকে? শ্রেয়ান কল দিলেই কুহক রিসিভ করল, বলল,
-“কী?”
-“কী মানে? কল পিক করছ না কেন?”
-“এমনি।”
-“এমনি না, দেখা করো।”
-“তোমার ইচ্ছেতে?”
-“হ্যাঁ।”
-“সরি, বাট আমার ইচ্ছে করছে না।”
-“কুহকিনী, আসতে বলেছি এসো।”
-“আমাকে হুকুম দিতে এসো না, আমি কারো হুকুমের দাস না। তোমাকে পায়ে মাড়াতেও আমার সময় লাগবে না।”
-“অহংকার করছ? কীসের এত অহংকার? কী আছে?”
কুহক হাসে,
-“অসম্ভব সুন্দরী আমি।”
-“আমি কোনো অংশে কম?”
-“ভীষণ বুদ্ধিমতী আমি।”
-“আমার ঘটে বুদ্ধি কম?”
-“টাকা-পয়সার অভাব নেই।”
-“আমার বাপের কম?”
শ্রেয়ানের চিবিয়ে চিবিয়ে বলা কথাগুলোকে হেসে ওড়াল কুহক,
-“আমি তোমার মতো বাপের টাকা ওড়াই না। দেশের টপ ফ্যাশন ডিজাইনারদের মধ্যে একজন আমি। নিজের যা টাকা আছে, তাতে তোমার মতো দশ শ্রেয়ানকে কিনে ফেলতে পারব।”
ভড়কালো শ্রেয়ান, রাগে গা থরথর করে কাঁপতে লাগল। এ কোন ভাষায় কথা বলছে কুহক? চিল্লিয়ে উঠল,
-“মুখকে আটকাও, কুহকিনী! আমি সেকেন্ড টাইম সহ্য করব না।”
খুবই ধীর ও অবিচলিত আওয়াজে কুহক বলল,
-“আ-আ! আমার সামনে আওয়াজ উঁচু করার সাহস কোরো না, শ্রেয়ান। আমি পছন্দ করি না।”
শ্রেয়ান রাগে কাঁপছে। সামনে থাকা গ্লাসটা ছুঁড়ে মারল সেন্টার টেবিলের ওপর, টেবিলের কাঁচসহ ভেঙে গেল। ভাঙচুরের আওয়াজ পেয়ে কুহক বলল,
-“বাপের টাকা নষ্ট করছ।”
-“কুহকিনী, চুপ! থামতে বলেছি না?”
-“নিজের খাই, নিজের পড়ি। তোমার কথায় আমার কিচ্ছু ছেঁড়া যাবে না।”
শ্রেয়ান নিজের চুল মুঠো করে রাগ দমনের চেষ্টা করল। জোরপূর্বক হেসে বলল,
-“প্লিজ, কুহকিনী। ডোন্ট ইউ লাভ মি?”
কুহক হাতের নেইলসগুলো দেখতে দেখতে বলল,
-“ফার্স্ট অব্ অল আই লাভ মাই সেলফ্।”
-“দেন মি, রাইট?”
-“নোহ...”
কুহক শব্দ করে হেসে ওঠে। তারপর বলতে লাগে,
-“আমি নিজেকে এত বেশি ভালোবেসে ফেলেছি যে, অন্য কোনো কিছুর প্রতি আর সামান্য ভালোবাসাও আসে না।”
শ্রেয়ান আর রাগ দমাতে পারল না,
-“ইউ চিটেড অন মি?”
ফিক করে হেসে ফেলল কুহক,
-“রিয়েলি, বেইবি? আর তুমি দুধে ধোয়া করলাপাতা, তাই নাহ?”
-“আমার পুরো একটা বছ নষ্ট করলে।”
-“যেভাবে তুমি করেছিলে..”
-“আমি কী করলাম?”
-“যেটা আমি করলাম।”
শ্রেয়ান ভড়কায়,
-“কী?”
-“ফিলিংস নিয়ে খেলা! ওহ বেইবি, তোমার থেকেই তো শিখেছি।”
শ্রেয়ান বলার মতো কিছু পেল না। সপ্তাহ খানেক আগে কেনা নতুন ফোনটা ছুঁড়ে মারল ভাঙা কাঁচের ওপর। কুহক হাসতে হাসতে চেয়ারে গা এলিয়ে দিলো। যা করার সে করেছে, বাকিটা শ্রেয়ানের হেরে যাওয়া মস্তিষ্ক আপনা থেকেই করবে। কারো দীর্ঘশ্বাসের কারণ হয় ক'টা দিনই বা ভালো থাকা যায়? শ্রেয়ান টের পাবে তা।
চলবে…
Leave a comment
Your email address will not be published. Required fields are marked *