Buy Now

Search

আবহমান

আবহমান
ঋভুর মনে হলো সে ভাসমান কোথাও। জমিনে নয়, জলে নয়, হাওয়ায় নয়। ঝুলন্ত নয়, দুলন্ত নয়। শুধু ভাসছে সমান্তরাল। দুই হাত মেলে। ডানার মতোন। যেন কোনো ফিনিক্স পাখি। আশপাশ দূর দূর অবধি কিছু নেই, কেউ নেই। অন্ধকার। ঋভুর এও মনে হলো, তার চারপাশ খামচে ধরে থাকা অন্ধকার পুরোপুরি অন্ধকার নয়। নিভু নিভু আলো জ্বলছে দূরে কোথাও। অনেকদূর। কোনো লণ্ঠনের আলো। কাছ থেকে ওই কমলা রঙা আলো কিছুটা লম্বাটে দেখায়, দূর থেকে গোল। দূরত্ব বাড়লে আলো গোল হয়ে যায়। ঋভুর চারপাশ অজস্র গোল আলোয় ভর্তি। টিপ টিপ করে ওই আলো জ্বলছে, নিভছে।
ঋভু জানে ওই আলো কোনো লণ্ঠনের আলো নয়। ওইসব গ্রহ-নক্ষত্র। ঋভু ভাসছে আসমানে। পৃথিবী হতে অনেক দূর, কোথাও। শূন্য গ্র্যাভিটি। অথচ আশ্চর্যজনক ভাবে ওখানে অক্সিজেন বিদ্যমান। শ্বাস নেওয়া যাচ্ছে। ঋভু উপরে তাকালো। দৃষ্টি অন্ধকার ফুঁড়ে যত উপরে উঠা যায়, উঠল। কোথাও হোঁচট খেল না। খাওয়ার কথাও না। বিস্তৃত অসীম মহাকাশে দৃষ্টির সীমা ফুরিয়ে যায়, আকাশ ফুরায় না। ঋভুর দমবন্ধ হয়ে আসলো। এত নিশ্চুপ চারপাশ, এত লৌহকঠিন নির্জনতা। নিজের হৃদস্পন্দনের শব্দ শোনা যাচ্ছে স্পষ্ট। শ্বাস প্রশ্বাসের শব্দ অমন ভারী, চোখের পলক ফেলার মৃদু ক্যাচ আওয়াজ, জিহ্বা নাড়ানোর ভেজা মচমচ শব্দ এমনকি প্রতিটা শিরা উপশিরায় রক্তের চলন অনুভব করা যাচ্ছে, থরথরে কাঁপুনি মাখা আওয়াজ, শিরশির শিরশির।
পৃথিবীর সবচেয়ে নির্জনতম স্থানের নাম মিনিসোটার অরফিল্ড ল্যাবরোটরি। দুই হাজার একুশ সালের উনিশ নভেম্বর এই জায়গার সাউন্ড লেভেল ছিল মাইনাস টুয়েন্টি ফোর পয়েন্ট নাইন। নিশ্ছিদ্র অন্ধকার ভর্তি ওই জায়গায় কোনো ব্যক্তি পনের মিনিট থাকলেই অবস্থা দফারফা। ক্লস্ট্রোফোবিয়া থাকলে নির্ঘাত মৃত্যুর কাছাকাছি পর্যায়ের অভিজ্ঞতা। দুই হাজার একুশ সাল কিংবা মিনিসোটা, দু’টোর কোথাও যাওয়ার ক্ষমতা ঋভুর নেই। ঋভুর ক্লস্ট্রোফোবিয়াও নেই। তারপরও তার মনে হলো, আর অল্প মুহূর্ত এমন ভাসমান থাকলে সে মারা যাবে। মৃত্যু নিশ্চিত।
‘মৃত্যু? ওটা কী?’
ঋভু হকচকিয়ে উঠল। চারপাশ ফকফকা আলো। জানালা গলিয়ে নরম আলোখানা বিছানার একাংশে পড়ে চকচক করছে। ঋভুর সারা গায়ে ঘাম। কপাল কুঁচকানো। কানে বাজছে ওই আওয়াজ। শেষ প্রশ্ন। প্রশ্নটা কোনো কণ্ঠস্বরের নয়। পুরুষ নয়, নারী নয়। ওটা শুধু্ই প্রশ্ন। স্বপ্নটা অসংখ্যবার দেখা হয়েছে ঋভুর। প্রশ্নটাও শোনা হয়েছে একাধিকবার। প্রশ্ন যে বা যিনি করছেন, তাকে দেখা হয়নি শুধু। ও কী? কে? কেন করে একই প্রশ্ন বারবার?
ঋভু বিছানার পাশে টেবিলে রাখা দশ মিমি ভর্তি লেপট্রোনিল ইনজেকশনটা পুশ করে নিলো হাতের শিরায়। সারাদিনের ক্ষুধা নিরাময়ে দশ মিমি যথেষ্ট। নয় হাজার নয়শো নিরানব্বই সাল চলছে। সূর্য লাল হয়ে উঠেছে ধীরে। আকার বড়ো হয়েছে তার। গত বৎসরই সবচেয়ে নিকটবর্তী গ্রহ বুধের একাংশ গিলে ফেলেছে সুর্য। রোদ ঠিক সোনা রঙা নেই আর। লাল। প্রতি বৎসর তার রঙ ঘন হচ্ছে ক্রমশ। টকটকে লাল হতে এখনও বাকি ঢের সময়। কড়া তাপ। একফোঁটা রোদ গা স্পর্শ করলেই ক্ষত হয়ে যাচ্ছে নিমিষেই। ওই ক্ষতে বাসা বাঁধছে কুচকুচে কালো রঙা ক্ষুদ্র কিছু পোকা। ওরা ক্ষতের আশপাশ খেয়ে ফেলছে। রক্ত। মাংস। সবশেষে হাড়। কোনো ঔষধেই নিরাময়যোগ্য নয় ওই ক্ষত। একমাত্র উপায়, ওই অঙ্গ কেটে ফেলা। একবার রোদ গা ছুঁলেই ওই মনুষ্যের অবস্থা কাহিল। অমন অস্বস্তিকর সময়, যখন প্রতিটা মুহূর্ত মূল্যবান, তুচ্ছ খাদ্য উৎপাদন, ভক্ষণ কিংবা নির্গমন কাজে ওই সময় নষ্ট করা সদিচিৎ নয় একদম।
ঋভু জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো। বাইরে উপরে ঝুলন্ত আসমান। নীল রঙা। যদিও ঠিক আসমান নয় তা, প্রকৃত অর্থে একিলিক্সাইল কাঁচ। পুরো কাঁচ দিয়ে ঢাকা আস্ত শহর। মৃত্তিকার তলায়। খুঁড়ে খুঁড়ে মৃত্তিকার বহু নিম্নে পৌঁছুনো হয়েছে তাদের। যতদূর পৌঁছালে অসুস্থ রোদের উত্তাপ হতে গা বাঁচানোর জন্য ঠিকঠাক উচ্চতা নিয়ে লাগানো যায় একিলিক্সাইল কাঁচ। প্রতিটা শহর এখন তাই মৃত্তিকার তলায় খাড়া। প্রতিটা দেশ। গাঢ় ও প্রচণ্ড শক্তিশালী ওই কাঁচ পর্যাপ্ত খুঁটি নিয়ে ওদের মাথার উপর দাঁড়িয়ে ঠায়। বৎসরের পর বৎসর। উপরের কড়া রোদ ওই কাঁচে ঝাপসা হয়ে আসে, ফের নিচে নামে। ওই আলোয় মনুষ্য ও বৃক্ষরাজির বেঁচে থাকা।
খোলা জানালায় একটা স্কুইব উড়ে এসে বসলো। ক্ষুদ্র একটা আদুরে যন্ত্র। চৌকাঠ আঁকড়ে ধরল আট পা তার। পিঠের গোল ডিভাইসটা ক্লিক শব্দ করে খুলল। ভেতর থেকে একটা চিকন সূক্ষ্ণ সূঁচ বের হলো। সূঁচের মাথা হতে একটা তীক্ষ্ণ নীল আলো গিয়ে পড়ল ওপাশের দেয়ালে। একজন যুবতী। গোল মুখ, চুলগুলো খোঁপা করা। আজকাল কেউ খোঁপা করে না। চুল নিয়ে অত আদিখ্যেতা করার সময় কার আছে? কেউ করে না। যুবতী করে। ঋভুর বড়ই ভালো লাগে। কতদিন পর! ওই আলো সদৃশ্য খোঁপা মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা যুবতীর ভ্রুঁ কুঁচকানো। চোখে রাগ।
‘ওদের আবার দেখা গিয়েছে ঋভু।’
ঋভু জানে যুবতী কাদের কথা বলছে। একদল ওরা। ওরা কারা জানে না যুবতী। ছোটো ছোটো প্রাণী। দু’টো পা। একিলিক্সাইল কাঁচের স্ক্রিন দিবস ও রাত্তির ভাগ ভাগ। দিবসে ওই স্ক্রিন ধারণ করে নীল। রাত্তিরে জ্বলজ্বলে নক্ষত্রভরা অন্ধকার আসমান। যাতে মানুষ উপরে তাকিয়ে দমবন্ধ অনুভব না করে। যেন মানুষ মৃত্তিকার বহু তলায় থেকেও নিজেকে অনুভব করতে পারে পৃথিবীপৃষ্টের উপর।
তথ্যপ্রযুক্তিগত জ্ঞান যুবতীর মাথায় ঠাসা। 'স্ক্রীন ম্যানেজমেন্ট' নিয়ন্ত্রণ করে শহরের মাথার উপর টাঙানো আস্ত একিলিক্সাইল কাঁচ। পুরোপুরি হাইটেক প্রযুক্তি নির্ভর। প্রতিটা স্ক্রিন ছোট্ট ছোট্ট ইনভিজিবল অংশে ভাগ করে নিয়ন্ত্রণ করা এই কাঁচের কোনো এক টুকরোর মনিটরিং ও ম্যানেজমেন্ট ডিভাইস হ্যাক করেছ যুবতী। হাই রিস্কের কাজ। স্ক্রিন ম্যানেজমেন্ট টের পেলেই শাস্তি নিশ্চিত।
কোনো একসময় হয়তো ফাঁসি, ফায়ারিং স্কয়াড কিংবা তলোয়ার ব্যবহার করা হতো মৃত্যুদন্ড হিসেবে। এখন নয়। এখন ব্যবহার করা হয় সানডোর। শহরের সবচেয়ে পূর্ব প্রান্তের নিষিদ্ধ অঞ্চল-এ থাকা একটা দুয়ার। যেটি খুললেই পৃথিবীপৃষ্ঠ হতে আসা কড়া রোদের উত্তাপ কিংবা হাওয়ায় গা পুড়ে যায়। ওই দুয়ার খুলে বাইরে ছেড়ে দেয়া হবে যুবতীকে। পৃথিবী পৃষ্ঠে পা রেখেই যুবতী দেখবে আশপাশ খাঁ খাঁ। কোথাও বৃক্ষ নেই, জল নেই, প্রাণী নেই, জনমানবহীন অচেনা কোনো গ্রহ। রাত্তির হলে হয়ত টিকে থাকবে। উপরে তাকিয়ে দেখবে খালি চোখে দেখতে পাওয়া এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি। যেটি পৃথিবীর নিকটে আসার কথা প্রায় তিনশো কিংবা পাঁচশো কোটি বৎসর পর। অথচ কোনো এক ভয়াবহ টানে ওই গ্যালাক্সি হাজার বৎসরেই ঘাড়ে চেপে বসেছে মিল্কিওয়ের। যুবতী হয়তো এক রাত্তির বেঁচে থাকবে ওই অপার্থিব ভয়ংকর সুন্দর আসমানে চোখ রেখে, কিন্তু সকালের প্রথম রোদ- যখন সূর্য দিক পাল্টে উত্তর হতে উঁকি দেবে, একটা বিশাল ভয়ংকর লাল জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড, যেটি থরথর করে কাঁপছে অনর্গল, যার চারপাশ ঘিরে তৈরী হয়েছে অদ্ভুত এক বলয়, যার কড়া রোদ পড়ে ঝিকমিক করছে পুড়ে কালো হয়ে আসা মৃত্তিকা, যুবতীর শরীরের মাংস ঝলসে যেতে শুরু করবে তখন। এক প্রহরেই যুবতীর কংকাল পড়ে থাকবে জমিনে। হাড় চকচক করবে তীব্র রোদের ছটায়।
এমন ভয়ংকর একটা আশংকা মাথায় নিয়ে যুবতী হ্যাক করেছিল কাঁচের একাংশ । তখন রাত্তির। অনন্ত নক্ষত্ররাজির চিরাচরিত ওই ছবি মুছে যেতেই যুবতী চমকালো তাকিয়ে। উপরের কাঁচ। স্বচ্ছ। ওইটুকুন স্বচ্ছ কাঁচে উপরের প্রকৃত আসমান স্পষ্ট। এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি ঠিক অতটাও বড়ো নয়, যতটা বড়ো জানানো হয়েছে তাদের। দেখানো হয়েছে। এখনও বহু দূর। কি চমৎকার আসমান। আচমকা যুবতী চমকালো। উপরে কাঁচের উপর চার পায়ে হাঁটছে ক্ষুদ্র একটা পোকা। পোকা নাকি প্রাণী? চারটে পা তার। আচমকা স্ক্রিন অন্ধকার হয়ে এলো। হ্যাকিং টাইম ফুরিয়েছে। চিরাচরিত স্ক্রিনের রঙে ফিরে গেছে কাঁচ। যুবতীও বাসায় ফিরে গেল তারপর। তখনও তার মাথায় ঘুরছে একটা পোকা। চারটে পা। দু'টো ঠিক পা নয়।
ঋভু প্রথমদিন শুনেই হতবাক হয়েছিল। ধমকিয়েছিলও।
‘তুই জানিস এই কাজ করার শাস্তি কী?’
‘জানি, সানডোর।’
‘জেনেশুনেও?’
যুবতী হতাশ স্বরে বলল, তুই কানে নিচ্ছিস আমি কী বলছি?
‘না।’
‘আমি সত্যি দেখেছি। একটা পোকা। দু’টো পা।'
'একটু আগে বললি, চারটে পা।'
'চারটেই। দু'টো পা, দুটো হাত। হামাগুড়ি দিয়ে দেখছিল কাঁচ। পৃথিবীপৃষ্ঠে একটাও বৃক্ষ নেই, জল নেই, রোদের উত্তাপে নাকি মাংস ঝলসে যায়, তবে আমায় বল, ওখানে ওই ক্ষুদ্র পোকা টিকে আছে কী করে?’
‘ও তোর দেখার ভুল।’
‘একদম না। ভুল একবার হয়। বারবার না।’
ঋভুর গলার স্বর কাঁপলো। অজানা ভয়ে। আশংকায়। নগরপিতা আঁচ পেলে কি সর্বনাশ হবে যুবতীর- ভেবে। জিজ্ঞেস করল, তুই মোট কয়বার কাঁচের ওপাশ দেখতে গিয়েছিস?
যুবতী খানিক চুপ থেকে বলল, সাত বার। চারবার দেখতে পারিনি। তিনবার দেখেছি স্পষ্ট।
‘ওরা কী করে?’
‘প্রথম প্রথম মনে হয়েছিল হাঁটে। কিন্তু স্বাভাবিক না। ওরা উল্টো হাঁটে।’
‘মানে কী?’
যুবতী তখন উল্টোদিকে হেঁটে দেখিয়েছিল কেমন করে ওরা হাঁটে। নিচ থেকে কাঁচের উপর ওই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পোকার পায়ের তালু ছাড়া কিছু দেখা যায় না আর। ওই পায়ের তালুর সাথে মানুষের দারুণ মিল।
‘হতে পারে ক্ষুদ্র শিম্পাঞ্জি?’
‘না, শিম্পাঞ্জির পায়ের পাতা অমন নয়।’
‘মানুষ কী করে নিশ্চিত?’
‘এখনও নিশ্চিত না। অনুমান।’
‘ভুল অনুমান। পৃথিবীপৃষ্টে একটাও প্রাণীর প্রাণ থাকার সম্ভাবনা শূন্য।’
যুবতী ওইদিন হতাশ মুখে ফিরে গিয়েছিল। তারপর আর দেখা হয়নি বহুদিন। যতবার যতগুলো স্কুইব পাঠিয়েছে ঋভু সংবাদ পাওয়ার জন্য, কোনো স্কুইব-ই ফেরত আসেনি। যুবতীর প্রচুর রাগ। আজ বহুদিন পর সম্মুখে উপস্থিত যুবতী। আরও একবার। এইবার পাকা সংবাদ।
ঋভু চৌকাঠ আঁকড়ে ধরা অষ্টপদী স্কুইবটা হাতে নিয়ে হাত বুলালো মসৃণ পিঠে তার। গমগমে স্বরে বলল, নগরপিতা নতুন করে খনন শুরু করেছেন। আমাদের মৃত্তিকার তলায় আরও একখানা স্তরে শহর নির্মাণ-এর সব পরিকল্পনা চূড়ান্ত। এই শহরটা জল ও রোদের সমন্বয়ে নির্মাণ হবে। মৃত্তিকার এই স্তর অফুরন্ত জলে ভর্তি। নির্মাণকাজে সর্বোচ্চ কৌশল অবলম্বন করা হবে। সব ঠিকঠাক থাকলে আগামী পঞ্চাশ বৎসরেই খনন সম্পন্ন হবে। আমরা পৌঁছুবে পৃথিবী পৃষ্ঠের আরও এক স্তর তলায়। ওখানে ঠাণ্ডা আর উষ্ণতা ভারসাম্যপূর্ণ। কি চমৎকার! আর তুই এখনও পড়ে আছিস ওদের নিয়ে?
‘মাটি খননের প্রয়োজন নেই ঋভু। অ্যাড্রোমিডা দূরে সরে যাচ্ছে।’
‘হোয়াট?’
‘গত এক বৎসরের প্রতিটা রাত্তির আমি স্ক্রিনের ওই এক অংশ কয়েক মূহূর্তের জন্য হ্যাক করেছি। প্রতিটা মুহূর্ত জড়ো করেছি, ডকু ফাইল বানিয়ে প্লে করে দেখেছি। আমি মিথ্যা বলছি না। তুই না খুব প্রমাণ চাইতি? প্রমাণ নিয়েই হাজির হয়েছি। এইবার অন্তত চোখ খুল।’
স্কুইব ক্লিক শব্দ করে সূক্ষ্ণ সূঁচটা গুটিয়ে নিলো। যুবতী উধাও হলো। ফের একটা সূঁচ বের হয়ে তীক্ষ্ণ আলো ফেলল দেয়ালে। ঋভু জানালার কাঁচের কোণায় আঁকা কালো সুতোটা স্পর্শ করার সঙ্গে সঙ্গে জানালায় কালো পর্দা নেমে এলো। পুরোপুরি অন্ধকার একটা রুম। স্কুইবের মাথা হতে আসা তীক্ষ্ণ নীল আলো দেয়ালে সাঁটা। ওখানে একটা ফ্রেম। ফ্রেমের ভেতর চলমান তিনশো পঁয়ষট্টি’টা স্থিরচিত্র। ঋভু ওইদিকে তাকিয়েই পানির তৃষ্ণা টের পেল। শরীরে লেপট্রোনিল দশ মিমি থাকার পরও পানির তৃষ্ণা পাওয়া স্বাভাবিক কিছুর ইঙ্গিত নয়।
দেয়ালে একটা অন্ধকার আসমানের ছবি। সঙ্গে জ্বলতে থাকা নক্ষত্র আর বিশালাকার এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির ঝাপসা ধোঁয়ার মেঘ। ভিডিয়ো চালু হলো। ঋভু তাকিয়ে রইল অপলক। এন্ড্রোমিডা দূরে সরে যাচ্ছে। ধীরে। ভিডিয়ো অফ। তিনশো পঁয়ষট্টিটা স্থিরচিত্র জুড়ে দেয়া ক্ষণিক সময়। বাস্তবিকই দূরে সরে যাচ্ছে। নাকি রিভার্স করে বোকা বানাচ্ছে যুবতী তাকে? ঋভু ফিসফিস করল, অসম্ভব।
অন্ধকারের ভেতর নীল আলোয় মাখো মাখো এক যুবতী ফিসফিস করল ঋভুর কানে।
‘ঋভু, ওদের পরিচয় জানা গেছে। ফের হামাগুড়ি দিয়েছিল ও। একটা ছোট্ট মুখ, চুল, আর শরীর। ওরা আমরা। মানুষ। তবে আমাদের মতোন না। আমরা যেদিকে যাচ্ছি, ওরা সেদিকে যাচ্ছে না। ওরা উল্টোদিকে যাচ্ছে। ভবিষ্যত থেকে অতীত। এনট্রপি উল্টো।’
ঋভু চুপচাপ।
‘কিংবা এও হতে পারে, ওরা ঠিকই যাচ্ছে। যাচ্ছিল সবসময়। আমরা বরং উল্টো। অবশ্যই ওদের নিকট আমরা উল্টো।’
ঋভু যুবতীর চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, তুই যে স্ক্রিনে তাকিয়ে কাঁচের ওপাশ দেখছিস বলে মনে হচ্ছে তোর, কী করে নিশ্চিত হলি ওটাই সত্যিকারের ওপাশ? হতে পারে ওটাও কোনো প্রজেকশন। আমরা তো দিন রাতের প্রজেকশন দেখেই কাটাচ্ছি জীবন।
যুবতী মৃদু হাসলো। জিজ্ঞেস করল, তুই এই প্রশ্নটা করবি আমি জানি। অনুমান কর আমি আজ কেন তোর সামনে আসিনি?
ঋভুর বুকটা ধুকপুক ধুকপুক করল। যুবতীর হাসি তখনও ঠোঁটে টাঙানো। নরম স্বরে বলল, যখন তুই আমায় দেখছিস, আমি তখন সানডোর পার হয়ে গেছি। নগরপিতা যদি বলে, পৃথিবীপৃষ্ঠে কেউ নেই, আমরা কেন বিশ্বাস করব তা? ও তো আমার চোখ নয়, নগরপিতার চোখ। ও তো আমার ধারণা নয়, নগরপিতার ধারণা। ও তো আমার বিশ্বাস নয়, নগরপিতার বিশ্বাস। আমি সানডোর খুলব, ওপাশে পা রাখব। আমি জানি তুই কোথায় ছুটে যাবি। এসে লাভ নেই। আমি হয়তোবা তখন পৃথিবীপৃষ্ঠের উপর। কড়া রোদে ঝলসে যাচ্ছে গা। অথবা আমি তখন একটা অদ্ভুত জগতের অংশ। ওরা সবাই উল্টোদিকে চলে যাচ্ছে। সিগারট পুড়ে উড়ে যাচ্ছে না, বরং আশপাশ হতে ধোঁয়ার কুণ্ডলি এসে ছাই হয়ে যাচ্ছে, ছাই থেকে হয়ে যাচ্ছে আস্ত সিগারেট। পানি পুড়ে বাষ্প হয়ে যাচ্ছে না। বরং বাষ্প জমাট বেঁধে হয়ে পানি, পানি থেকে পাথর। কাঁচের গেলাস ভেঙে চূর্ণ হচ্ছে না। চূর্ণ হওয়া কাঁচের গেলাস জুড়ে যাচ্ছে আবসেরাফ। আমি ওদের অংশ হবো। আর আমাদের হাজার বৎসর আগেকার প্রাচীন এক কবির কবিতার লাইন আওড়াবো। চমৎকার! ধরা যাক দুয়েকটা ইঁদুর এবার।
স্কুইব ক্লিক আওয়াজ করল। আলো নিভে গেল। সূক্ষ্ণ সুঁচটা পিঠের অন্দর গুঁজে গেল। ঋভু দরজা খুলে ছুটল। গন্তব্য শহরের পূর্ব দিককার একটা স্থান। ওই কোণায়, পুরনো একটা দালানের পাশে, কোথাও, উপরের একিলিক্সাইল কাঁচের একাংশ তখন স্বচ্ছ। দেখা যাচ্ছে কাঁচের ওপাশের আসমান। এখন দিবস। ঋভু ওখানে চোখ রাখবে। যুবতী কোথায়? তার ফেরত আসা দরকার।
.
যখন আমার বয়স পনের বৎসর, স্কুল থেকে ফেরার পথে আমি একটা কুয়ায় পড়ে গিয়েছিলাম। ঠিক পড়ে নয়, আমায় ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিল ঋভু। কুয়াটা খুব একটা গভীর ছিল না। পুরনো পরিত্যক্ত কুয়া। জঙ্গলের পাশ ঘেঁষে থাকা এই কুয়ার উপর ভারী একটা কাঠ বিছিয়ে দিয়েছিল কর্তৃপক্ষ। যাতে কোনো দুর্ঘটনা না হয়। রাস্তা থেকে একটু ডানে গেলে যে জঙ্গল, ওই জঙ্গলের খুব কাছেই একটা কুয়া- আমার জানার কথা নয়। যদিও আর দশটা মেয়ের মতোন নরম সরম ছিলাম না আমি। যখন আমার বয়সী মেয়েদের জগত হাতের নেইলপলিশ ও পায়ের আলতা, আমি তখন পড়ছিলাম মহাকাশ। তার বিস্তৃতি। গ্রহ নক্ষত্রের উৎস, কাজকর্ম, ভারী ভারী অংক আর বিজ্ঞান।
ঋভু প্রথম এসে আমায় জানালো কুয়ার কথা। ওই কুয়ার উপর থেকে ডাকলে ভেতর থেকে নাকি কে যেন জবাব দেয়। আমি কস্মিনকালেও ওসব কুসংস্কার পাত্তা দিইনি। যুক্তি ছাড়া কোনোকিছু মাথায় খাটতো না। কুয়া থেকে জবাব আসে অর্থাৎ কুয়ায় নির্ঘাত কেউ পড়ে আছে। কি সর্বনাশ। অবশ্য ঋভুর যা স্বভাব, সে যে বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলছে না, তা নিশ্চিত নই আমি। এক দুপুরবেলা স্কুল থেকে ফেরার পথে দুইজন কুয়ার সামনে গেলাম। টেনে ভারী কাঠ সরালাম দুইজন। পাড়ে দাঁড়িয়ে চিৎকার করলাম, কেউ আছেন?
পিঠে জোরধার ধাক্কা খেলাম। ভয়ে তারস্বরে চিৎকার করে পড়লাম সোজা নিচে। যত গভীর ভেবেছিলাম, তত গভীর নয়। ময়লা ভেজা মাটি, স্যাঁতসেঁতে জায়গা, ইঁদুরপঁচা গন্ধে পেট উলটে বমি আসলো। ঋভু উপর থেকে চিৎকার করল, কে রে ভেতরে?
আমি কান্নাভেজা স্বরে চিৎকার করলাম, আমি। আমায় তুল ঋভু।
ঋভু খিকখিক করে হেসে বলল, এখন প্রমাণ পেলি? কূয়ায় কাউকে ডাকলে সে জবাব দেয়। পেলি প্রমাণ?
আমি ফোঁপাতে ফোঁপাতে বললাম, হ্যাঁ।
ঋভু ব্যাগে আগ থেকেই ভর্তি করে আনা দড়ি ঝুলিয়ে আমায় টেনে তুলল। তুলেই ভৌ দৌড়। আমি আর টিকিটিও দেখতে পেলাম না তার। তখন আমার অন্দর দারুণ পরিবর্তন। ও জানলো না, টের পেল না, আমার পরিবর্তন। ভুত আমি বিশ্বাস করি না, অন্ধকার ভয় পাই না, একলা থাকাটাও না। এই বয়সেই বাবার কাছে আবদার করে শশ্মান দেখে এসেছি, কবর দেখে এসেছি, কাটিয়ে এসেছি সময়। কুয়ার ভেতর আমার ভয় পাওয়ার কারণ ছিল না। ব্যথাও পাইনি। অত গভীর ছিল না কুয়া। তবে আমার স্বর কান্নাভেজা কেন ছিল?
ঋভু বুঝেনি। তার বোঝা উচিৎ ছিল। আমার মতো মেয়ে কাঁদে না। ভয় পায় না। তুচ্ছ কুয়ার ভেতর থেকে ওই কান্নাভেজা স্বরে জবাব দেওয়ার প্রশ্নই আসে না তার। জবাব আমি দিইনি। জবাব কে দিয়েছিল জানি না। আমি খোদ শুনেছি ওই জবাব। তবে ও আমি না। আমি আমার চারপাশে অন্ধকারে খুঁজেছি হাতড়ে তাকে। কেউ নেই। কুয়ার উপর উঠে তাকিয়েছি ফের নিচে একবার। শূন্য।
ওই রাত্তির আমার জন্য ছিল জীবন্ত নরক যাপন। পুরো রাত্তির আমি নিজেকে নিজে বোঝালাম, নিশ্চয় অবচেতন মনে ভয় পেয়েছিলাম। ভয় পেয়ে নিজেই উত্তর দিয়েছিলাম। কিন্তু যেহেতু আমি নিজেই কঠিন যুক্তির উপর দাঁড়িয়ে থাকি সবসময়, ফলে আমার চেতন অংশ অবচেতন অংশটাকে আলাদা করে শোনালো, আলাদা করে জানালো। অতএব, আমি শুনলাম আমার নিজের কান্নাভেজা কণ্ঠস্বর।
ঋভুকে অনেকবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, ওই দিন কুয়া থেকে কি আমি চিৎকার করে তুলতে বলেছিলাম?
ঋভু হেসেছিল প্রতিবার। ওর ধারণা হয়েছিল, আমি নিজের যুক্তির পরাজয় মেনে নিতে পারছি না। ও আমার কঠিন জেদ। গর্দভটাকে কে বোঝাবে, ওই দিন কুয়ায় আমি টু শব্দটিও করিনি। ঋভুর থেকে দাঁত কেলিয়ে বিশ্রী খিকখিক ছাড়া যথোপযুক্ত উত্তর পাওয়া অসম্ভব। আমি তাই নিজেই আরেকবার গিয়েছিলাম কুয়ায়। উপর হতে চিৎকার করেছি, কেউ কি আছেন?
কোনোবারই উত্তর পাইনি। প্রতিবারই চিৎকারের পর বোকা বোকা লাগছিল নিজেকে। কয়েকদিন টানা উত্তর না পাওয়ার পর এক রাত্তিরে বাবার কেনা টেলিস্কোপে চন্দ্রপৃষ্টের আশপাশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার সময় মাথায় এলো, কুয়ার উপর থেকে সেদিনও কোনো উত্তর পাইনি। উপর থেকে উত্তর পাওয়া যাবে না। কুয়ায় নামা দরকার।
পরদিন দড়ি হাতে পৌঁছুলাম জঙ্গলে। দড়ি বাঁধলাম গাছের সঙ্গে। তরতর করে নেমে গেলাম কুয়ায়। চারপাশ অন্ধকার। সঙ্গে করে আনা টর্চ জ্বালালাম। পারফিউম স্প্রে করে আশপাশ চোখ রাখলাম। টর্চের আলো পড়ে চিকচিক করল মাটি। যেন কোনো তরল রুপা রাখা ওখানে। পা দিয়ে সরালাম ময়লা। তাকিয়ে দেখি একটা কাঁচ। ময়লা আরেকটু সরিয়ে পা দু’টো থরথর করে কাঁপতে লাগল আমার। ভয়ে। কুয়ার নিচে শক্ত একটা মসৃণ কাঁচ বিছানো। পুরো কুয়াজুড়ে। আমি ভয় পেলাম, ওইদিন অত উপর হতে পড়ে যদি কাঁচ ভাঙতো, তবে মৃত্যু নিশ্চিত ছিল। কি ভয়ংকর। কিন্তু পুরো কুয়া কাঁচ দিয়ে ঢেকে দেওয়া হলো কেন?
টর্চ জ্বালিয়ে কাঁচের ওপাশ দেখার চেষ্টা করলাম। ঝাপসা ওপাশ। মেটো রঙ। যেন মাটির উপর বিছানো কাঁচ। পা দিয়ে আওয়াজ করলাম।
ঠক ঠক।
আচমকা মেটো রঙ সরে গেল। আমি উপুড় হয়ে আলো ফেললাম। স্বচ্ছ কাঁচের ওপাশ। রঙিন। কী ঘটছে মাথায় ঢুকছে না। প্রায় হতভম্ব আমি। হঠাৎ কাঁচের তলায় ইয়া বড়ো একটা চোখ উঁকি দিলো ওই ফাঁকা জায়গায়। প্রায় দানবাকৃতির চোখ। চোখের মণির ভেতর শুয়ে থাকতে পারবে গোটা দশেক মানুষ। মনির আশপাশ অসংখ্য লালচে রগ, চোখের পাতা, কি ভয়ংকর! কি ভয়ংকর!
আমি হুমড়ি খেয়ে পড়লাম কাঁচের উপর। যুক্তি, তর্ক, বোধ- সব মাথার উপর চড়ে বসে তখন। মাথার ভেতর একটাই চিন্তা, কুয়া থেকে বের হওয়া দরকার। ফেলে রাখা দড়ি বেয়ে তরতর করে উপরে উঠলাম। দৌড়ালাম তারপর। এক দৌড়েই বাসায়। টানা এক সপ্তাহ প্রবল জ্বরে ভুগে মৃতপ্রায় অবস্থা।
জ্বরের সময় ঋভু দেখতে এসেছিল প্রতিদিন। পরবর্তীতে বলেছিল, জ্বরের ঘোরে আমি একটা চোখের কথা বলতাম। বিশালাকার চোখ। কালচে মনি, ধবধবে সাদার ভেতর ইয়া বড়ো বড়ো লালচে দাগ, অসংখ্য। জ্বর থেকে সেরে উঠার পর আমি স্বাভাবিক হয়েছি, বোর্ড পরীক্ষা দিয়েছি, টপ করেছি, বিজ্ঞান পড়েছি দেদারসে, ঋভুর সঙ্গে চমৎকার একটা সম্পর্ক পাতিয়েছি, কিন্তু কখনই আর ওই কুয়ার সামনে যাইনি। ওই কুয়া একটা গোপন ভয় আমার, গোপন পরাজয়। আমি কস্মিনকালেও সাহস পাইনি ওই কুয়ার সামনে যাওয়ার। তবে মাঝে মাঝে স্বপ্ন দেখতাম। বড্ড অস্বস্তিকর ওই স্বপ্ন।
স্বপ্নটা শুর হতো ভাসন্ত অবস্থায়। আমি ভাসছি। চারপাশ অন্ধকার। হাওয়া নেই, গ্র্যাভিটি নেই। ভাসমান আমার দুই হাত দুই দিকে ছড়ানো। নিশ্ছিদ্র নির্জনতায় ভারী হয়ে আছে কান। বুকের ভেতর ধুকপুক ধুকপুক আওয়াজ। শরীরে অস্থির রক্তের নাচন, হাড়গোড় নাড়ানোর অন্দরকার কট কট শব্দ। স্পষ্ট সব। আমার ভয়ানক দমবন্ধ লাগে তখন। আমি হা করে চিৎকার করি। চিৎকার করতে করতে আমার ঘুম ভেঙে যায়। চিৎকারে বাবা মায়ের ঘুমও ভাঙে। তারা বরাবরের মতোন এসে গায়ে হাত বুলিয়ে দিয়ে যান। মাথায় বিলি কেটে দেন। সান্ত্বনা দেন, দুঃস্বপ্ন!
ঋভুর সাথে আমার বিয়ে হয় দুই হাজার বাইশ সালের পঁচিশে জুন। বিয়ের রাত্তিরে আমি প্রথমবার ঋভুকে জানালাম, আমার গোপন ভীতি। ঋভু কখনই সিরিয়াস ছিল না। ওই রাত্তিরে চোখমুখ কঠিন করে আমার গল্প শুনল। কুয়ার গল্প, ধাক্কার গল্প, আওয়াজের গল্প, কুয়ার প্রতি আমার অবসেশনের গল্প আর সর্বশেষ ওই চোখের গল্প। দানবাকৃতির চোখ।
গল্প শোনার পর ঋভুর চোখে জমলো জল। আমার হাত ধরে কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল বাচ্চাদের মতোন। ফিসফিস করে বলল, সব দোষ আমার। আমি তোকে ধাক্কা না দিলে ভয় পেতি না তুই।
‘পাগল! আমি ওইদিন ভয় পাইনি।’
‘পেয়েছিলি। তোর চোখে জল ছিল। তুই কান্না করছিলি।’
আমি হতাশ স্বরে বললাম, এটাই তো সমস্যা ঋভু। ওইদিন আমি টু শব্দটিও করিনি। ওইসব কুয়া, অন্ধকার আমি ভয় পাবো? রাত্তিরে শশ্মানে একলা গিয়েছি, ফেরত এসেছি কতবার। ওইদিন আওয়াজটা আমার ছিল না। তুই কাকে দড়ি বেয়ে টেনে তুলেছিলি?’
ঋভু কোল থেকে মাথা তুলে চোখ সরু করে জিজ্ঞেস করল, কাকে মানে?
‘কাকে তুলেছিল ওইদিন কুয়া থেকে? যার চোখে জল ছিল। যে কাঁদছিল। সে কে?’
ঋভু কাঁপা কাঁপা স্বরে বলল, তুই মজা করছিস না তো আমার সাথে?
আমি ঋভুর হাতখানা শক্ত করে ধরলাম। চোখে চোখ রাখলাম। মজা নয়। আমি আমার আস্ত কৈশোর বিসর্জন দিয়ে এসেছি একটা কুয়ায়। একটা তীব্র পরাজয় আমার। ওটা মজা নয়। ঋভু আমার দিকে তাকিয়ে বলল, কাকে আবার? তোকে?
আমি কান্নাভেজা স্বরে বললাম, ও আমি নয় ঋভু।
ঋভু চুপচাপ। আমি ক্ষীণ স্বরে বললাম, আমার কী মনে হয় জানিস? আমি কুয়ায় দাঁড়িয়ে আছি। এখনও।
'কুয়ায়?'
'হ্যাঁ। কখনই উঠিনি আর। তুই দড়ি ফেলে যাকে তুলেছিলি, ও আমি নই। প্রজেকশন। আমি যা বানিয়ে নিয়েছি, তা। তুই তা বিশ্বাস করেছিস, কারণ তোর নিজেরও অস্তিত্ব নেই কোথাও।'
ঋভু হা করে তাকিয়ে। আমি থমথমে স্বরে বললাম, কখনও কখনও মনে হয়, এই যে একটা আস্ত জীবন যাপন করে ফেললাম, ও জীবনটা বাস্তবিক তো? তুই একবার ভাব, এটা শুধু কুয়া, এর বাইরে জঙ্গল, গ্রাম, শহর, দেশ, মহাদেশ, পৃথিবী আর পুরো একটা ইউনিভার্স, কী করে তুই নিশ্চিত হলি তোর চারপাশে যতগুলো মানুষ, ওদের নিয়ে যা ঘটছে, যা হচ্ছে, সব বাস্তব? হতে পারে সবটাই তোর সাজানো। আমাদের মস্তিষ্ক তো এমনই। উপযুক্ত কিছু না পেলেই নিজ থেকে বিভ্রম সাজাতে শুরু করে। হতে কি পারে না, পুরো ইউনিভার্সে তুই একলা একটা প্রাণী বেঁচে আছিস। বাকি সবটাই তোর নিজের বানানো প্রজেকশন। মানুষ একলা লাগলে ফুটবলের গায়ে ছবি এঁকে কথা বলতে শুরু করে। সঙ্গী ছাড়া বাঁচা সম্ভব নয়। তাই না? তার আশ্রয় দরকার, সঙ্গী দরকার। সে নিজের মতো করে সাজালো গুছালো সব।
ঋভু থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে বলল, তোর কি মাথা খারাপ হয়েছে?
‘না ঋভু। আমি সম্ভাবনার কথা বলছি।’
‘মোটেও না। তুই একটু আগে বলেছিস, তুই এখনও কুয়ায় দাঁড়িয়ে।'
'হতে পারে দাঁড়িয়ে।'
'তবে মৃত্যু কী? মানুষ মরে যায় কেন?'
'ওটা খুবই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। কেউ কখনো জানাতে পেরেছে? মৃত্যু কী? মৃত্যুর পর সে কোথায় যায়? পেরেছে?'
ঋভু কিছুক্ষণ চুপ থেকে হতাশ স্বরে বলল, তোর অনেক বড়ো অসুখ হয়েছে। আগে কেন এইসব জানালি না আমায়?
আমি মৃদু হাসলাম।
‘আগে জানালে বিয়ে করতি না আমায়?’
ঋভু ধরা গলায় বলল, তোকে সুস্থ করে তুলতাম।
‘আমি সুস্থ ঋভু। সমস্যা একটাই। আমি জেনে ফেলেছি। দেখে ফেলেছি সব।’
‘কী?’
‘অনন্ত অসীম মহাকাশ। হোল ইউনিভার্স। তোরা কেউ-ই নেই আসলে। আমার চারপাশে কেউ নেই। কিছু নেই। আমি ভাসছি কোথাও। পৃথিবী নামক চিরপরিচিত এই গ্রহ থেকে অনেক দূর। ওখানে গ্র্যাভিটি নেই, হাওয়া নেই, রোদ নেই, চারপাশ অন্ধকার, দূরে জ্বলজ্বলে নক্ষত্র, আর আমার ভেসে থাকা। আমি জানিও না, পৃথিবী নামক কোনো গ্রহের আদৌ অস্তিত্ব আছে। আমি আমার চারপাশে একটা প্রজেকশন দাঁড় করিয়েছি শুধু। একটা পৃথিবী। তার হাজার বৎসরকার অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যত। ওটাকে স্তরে স্তরে ভাগ করেছি। একদম ঠিক উপরের পৃষ্ঠে রেখেছি বিলিয়ন বিলিয়ন বৎসর, পৃথিবীপৃষ্ঠ, এইটা- আর তার ঠিক নিচের স্তরে, মৃত্তিকার তলায় বিলিয়ন বিলিয়ন বৎসর। তারও নিচে, আরও বৎসর, তারও নিচে আরও। আর একদম কেন্দ্রে, শূন্যতা, ভাসমান একটা জায়গা, অন্ধকার, ওখানেই আমি ভেসে আছি ঋভু। প্রতিটা স্তরের কোথাও না কোথাও আমি নিজেকে রেখেছি। প্রতিটা স্তরই বিলিয়ন বিলিয়ন বৎসরের চক্র সম্পন্ন করছে। ঘুরছে। একবার চক্র সম্পন্ন করেই ফের উল্টোদিকে চলে যাচ্ছে চক্র। এনট্রপি আর রিভার্স এনট্রপি। প্রতিটা স্তরই একে অপরের বিপরীত দিকে অগ্রসরমান। তারপরও আস্তে আস্তে প্রতিটা স্তরের আমিই টের পাচ্ছে, চারপাশে বাস্তবিক কিছুই নেই। সব প্রজেকশন। পুরো একটা আস্ত ইউনিভার্স, আমি একলা একটা প্রাণী, ভেসে আছি, কোথাও। কিংবা দাঁড়িয়ে, অন্ধকারে। আমার কুয়ার ভেতর যাওয়া দরকার।’
.
ঋভু আমায় ঘুম পাড়িয়েছিল ওই রাত্তিরে। কখনই ওই গল্প দ্বিতীয়বার আবদার করেনি শোনার। আমার দিকে তার ছিল সতর্ক দৃষ্টি। সাইক্রিয়াটিস্ট, ঔষধপত্র ঢের গিলেছি, লাভ হয়নি। কারণ, আমার অন্দর জানে, আমি সত্য। কুয়া সত্য। কুয়ার অন্দরকার ওই দানবাকৃতির চোখ সত্য। ওই চোখ কিছু বলতে চায় আমায়। আমার যাওয়া দরকার। কুয়ার নিকট যাওয়ার জন্য আমায় অপেক্ষা করতে হয়েছে এক বৎসর। আজ দুই হাজার তেইশ সাল। আগস্ট মাসের তেইশ তারিখ। ঋভুর চোখ এড়িয়ে অবশেষে আমি কুয়ার সামনে দাঁড়িয়ে। হাতে দড়ি। ওটা গাছের সঙ্গে বাঁধা। তরতর করে বেয়ে পা রাখলাম কুয়ার অন্দর। আজ আলো নেই সঙ্গে। পা দিয়ে নাড়ালাম ময়লা। পরিষ্কার চকচকে কাঁচ দিনের আলোয় স্পষ্ট কিছুটা। উপুড় হয়ে আওয়াজ করলাম।
ঠক ঠক।
মেটো রঙা কাঁচ আচমকা হয়ে এলো স্বচ্ছ। অন্দর রঙিন। রঙিন ওই কাঁচের ওপাশ থেকে উঁকি দিলো একটা বিশাল চোখ। জলে টলটল একটা চোখ। একসমুদ্র কাতরতা ও জলে মিশে। আমি হাত বুলিয়ে দিলাম চোখের উপর। বিশালাকার পাপড়ি নেমে এলো, পলক ফেলার পর অন্ধকার। আমি চোখ বুজে শুয়ে পড়লাম চিৎ হয়ে ওখানে। দুই হাত দুই দিকে ছড়িয়ে। ডানা মেলে। যেন একটা পৌরাণিক ফিনিক্স পাখি। শরীর হালকা হয়ে এলো। যখন চোখ খুললাম, চারপাশে অন্ধকার। ভাসমান। অন্ধকারের ফাঁকফোকর গলে উঁকি দিচ্ছে একলক্ষ গোল লণ্ঠনের আলো, নিভু নিভু নক্ষত্র সব। আর নিশ্ছিদ্র নির্জনতা ছেয়ে আছে শরীরজুড়ে। অসহ্য। কান্না পেল আমার। আমি ফিসফিস করলাম, ঋভু!
.
written by: Shakhawat Hossen 
Alamgir Hossain

Alamgir Hossain

Hi, I’m Annalise Quitzon, Your Blogging Journey Guide 🖋️. Writing, one blog post at a time, to inspire, inform, and ignite your curiosity. Join me as we explore the world through words and embark on a limitless adventure of knowledge and creativity. Let’s bring your thoughts to life on these digital pages. 🌟 #BloggingAdventures

Your experience on this site will be improved by allowing cookies Cookie Policy