[প্রাপ্তমনস্কদের জন্য উন্মুক্ত]
আমার আড়াই মাসের বাচ্চা মেয়েকে আমার শাশুড়ি একবারের জন্যও কোলে নেননি, কেবল মাত্র মেয়ের গায়ের রঙ কালো হয়েছে বলে। এই রঙের জন্য আমি দায়ী নই। আবার প্রশ্নটা রঙেরও নয়। সব রঙের মানুষের সৃষ্টিকর্তা একজনই। বাচ্চা সুস্থ আছে, ওজন স্বাভাবিক আছে, ঠিকমতো শ্বাস নিতে পারছে, এ-ই কি যথেষ্ট নয়?
প্রচণ্ড মন খারাপ হয়ে এলো আমার। সোনাইকে খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে নিলাম। গোসল করতে যাওয়া প্রয়োজন এখন। কিন্তু একা রেখে যেতে ইচ্ছে করছে না।
বাড়িতে মানুষ বলতে আমার শ্বাশুড়ি আর স্কুল পড়ুয়া ননদ আছে। আমার বর ও শশুরআব্বু কাজে গেছে।
আমি কাপড় ঠিক করে উঠে দাঁড়ালাম। সোনাইয়ের দু-পাশে ছোটো কোলবালিশ রেখে কপালে ছোট্ট করে চুমু খেলাম৷ এরপর রুম থেকে বেরিয়ে রাহার রুমে গেলাম। দরজা নক করে বললাম,
-“রাহা, ফ্রি আছ?”
রাহা বসে বসে ফোন টিপছিল। আমাকে দেখে বলল,
-“হ্যাঁ, ভাবি। বলো।”
মিহি হেসে বললাম,
-“বোন, একটু আমার রুমে এসে বোসো না। আমি গোসল সেড়ে আসি।”
রাহা বলল,
-“হ্যাঁ, ভাবি। যাচ্ছি।”
রুম থেকে বেরোতেই সরাসরি শাশুড়ির সামনা-সামনি পড়লাম। আমার দিকে কীভাবে যেন তাকিয়ে আছেন। আমি চুপ করে চলে আসতে চাইলাম। সেই মুহূর্তে তিনি বলে উঠলেন,
-“কী গো, বউ? আমার মাইয়াডারে নিজের কামের বেডি পাইছোনি? যখন মর্জি ফরমাইশ খাটাইবা? কী?”
আমি সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যুত্তর করলাম,
-“না মা, ওরকম কিছু না। আমি শুধু এসে একটু বসতে বলেছি। আপনি ভুল বুঝছেন।”
-“যা বুঝার ঠিকই বুঝছি, তুমি বুঝাইতে আইসো না। নিজের ঘরে যাও।”
রাহা তখন আমার দিকে করুণ চোখে তাকাল। আমি কিছু বললাম না। নিজের রুমে চলে আসতে নিলাম। তখন আমার কানে তাদের কথা এলো।
রাহা বলছে,
-“মা, তুমি ভাবির সাথে এমনে কথা বলো কেন?”
-“তোর এত সমস্যা কী? যার সাথে যেমনে কথা কওন লাগে, ওমনেই কই আমি। শখ কইরা পোলারে বিয়া করাইছিলাম। চাইছিলাম একটা বাধ্য বউ আনমু। আমার সব কথা শুনব, এমন। অথচ কপালে জুটছেও এমন, প্রত্যেকটা কথায় তর্ক করোন লাগে ওর। আল্লাহয় বাঁচাইয়া রাখলে আমার পোলারে আমি আবারও বিয়া করামু।”
আমি চলে এলাম ওখান থেকে। কী যে কান্না পাচ্ছে। খুব ইচ্ছে করছে কেঁদে বুক ভাসাতে। কিন্তু এখন বয়স হয়েছে। কান্না করে বায়না ধরে খেলনা-গাড়ি পাওয়ার বয়সটা আমার আর নেই। লম্বা একটা শ্বাস টেনে সোনাইকে আরেকবার ঠিকমতো গুছিয়ে শুইয়ে দিয়ে কাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেলাম।
আমার বিয়ে হয়েছে সাড়ে তিনবছর। তখন আমি অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে। একদিন কলেজ থেকে বাসায় ফিরে বসার ঘরে অনেক মানুষ দেখতে পেলাম। আম্মা আমাকে বলল,
-“অঙ্গজা শোন মা, তোকে দেখতে আসছে এরা। ভীষণ ভালো ঘর থেকে সম্বন্ধ আসছে। তৈরি হ।”
তারপর আমাকে রেডি করিয়ে নিয়ে এলো ওখানে। পরে বুঝলাম তারা মেয়ে দেখতে এসেছে। বরাবরের মতোই আনুষ্ঠানিকতার সাথে মেয়ে দেখাটা হয়েছিল। মেয়ে দেখার রীতিনীতি আমার জানা। তাই চুপ করে মেনে নিয়েছিলাম সব। আঁড়চোখে ক'বার আমার যার সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছিল, তাকে দেখে গেছি। লোকটা ভীষণ শান্ত। একবারও আমার দিকে তাকায়নি।
আমার শাশুড়ি এবং কাকিশাশুড়ির আমাকে পছন্দ হয়ে গেল সেদিন। তারপর আমাকে আংটি পরিয়ে রেখে গেল এবং মাসখানেকের মধ্যেই বিয়ে। বরের নাম জানতে পারি বিয়ের দিন। মাহতাব সিদ্দিকী। বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে। ভীষণ দায়িত্বশীল ও মা-ভক্ত। প্রথমে প্রচুর ভয় থাকলেও, বিয়ের পর যখন শুনতে পারি, আমার শশুরবাড়িতে আমার পড়াশোনার ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি চাপিয়ে দেওয়া মত নেই, প্রচণ্ড খুশি হয়ে পড়ি আমি।
কিন্তু সংসার আর পড়াশোনা, দুটো একত্রে সামলাতে পারিনি। আমার শাশুড়ি কখনও আমাকে রান্না-বান্না করতে বলেননি। তবে তাঁকে একা সব রান্না করতে দেখতে আমার বিবেকে বাঁধত। আমার শাশুড়ি আমাকে কখনও বলেননি বাড়ির কাজ করতে। তবে চুপচাপ বসে আয়েশ করতে আমার বিবেকে বাঁধত। আমার শাশুড়ি আমাকে কখনও মাছের মাথাটা খেতে বারণ করেননি। কিন্তু ননদ ভারি পছন্দ করে। ওকে ফেলে নিজের পাতে মাছের মাথাটা তুলে নিতে আমার বিবেকে বাঁধত। আমার শাশুড়ি আমাকে কখনও পড়াশোনা ছাড়তে বলেনি। কিন্তু কাকিশাশুড়িরা যখন পরনিন্দা ও পরচর্চা করতে রোজ রোজ এ-বাড়িতে এসে গরম খবর হিসেবে বাড়ির বউয়ের বাড়ির সব কাজ-টাজ শাশুড়ির ওপর ছেড়ে দেওয়া নিয়ে কথা বলত, দিনের নামে কলেজে গিয়ে হিল্লিপনা করার ওপর লাগাম টানার উপদেশ আমার শাশুড়িকে দিত, আড়ালে তা শুনতে আমার বড়ো বিবেকে বেঁধেছিল।
পরদিন শাশুড়িমাকে গিয়ে বলি,
-“মা, আমার না আর কলেজে যেতে ভালো লাগছে না। আমি বরঞ্চ শুধু এক্সামগুলোই দিই।”
মা সায় দিয়েছিলেন। আমি পুরোপুরি সংসারে মন দিই। আর তারপর হুট করেই মনে হয়, পড়াশোনা করে আর কী হবে? আমার পুরো জীবনটা তো আপাতত আমার স্বামী আর সংসার। আমি সংসারী হয়ে উঠি, আমি পড়াশোনাকে জলাঞ্জলি দিই। অথচ একসময় ডিপার্টমেন্টের টপার ছিলাম।
ভাবতেই দীর্ঘশ্বাস আসে আমার। গোসল দিয়ে রুমে এসে দেখি সোনাই জেগে আছে। আমি শাড়ির আঁচল গোছাতে গোছাতে ওর কাছে চলে এলাম। আমার দিকে কেমন বড়ো বড়ো করে তাকিয়ে আছে। আমি দু'হাত এগিয়ে দিয়ে বললাম,
-“আম্মুর কাছে আসবে, সোনা?”
সোনাই হাত-পা তুলে হাসতে লাগে। দন্তবিহীন মাড়িগুলো দেখা যায়। আমি ওকে কোলে তুলে নিয়ে বুকে জড়িয়ে বলি,
-“ওরে আমার লক্ষ্মী সোনাটারে! খিদে পাচ্ছে? তখন তো খেলেই না। বাবাকে মিসসু মিসসু করছ?”
সোনাই আবার খানিকটা ঘুমোলেই আমি ওকে ঠিকমতো শুইয়ে রান্নাঘরের দিকে গেলাম। রাতের রান্নাটা করতে হবে। মা আমাকে রান্নাঘরে আসতে দেখেই অন্যদিকে তাকিয়ে চলে গেলেন। আমি নীরবে শ্বাস ফেলে মুরগীটা কাটতে লাগলাম।
কিছুক্ষণ বাদে মেয়ের কান্নার আওয়াজ এলো। আওয়াজ পেয়েই আমার বুকটা কেঁপে উঠল। হাতের মুরগী ফেলে হাত ধুয়ে যেতেও সময় হবে। রাহাকে ডাকলাম। রাহা ডাকটা বোধহয় শুনতে পেল না। মা সোফায় বসে টিভি দেখছেন। আমার রুমের পাশেই। আমি উঠে হাত ধুয়ে জলদি রুমে এসে দেখি মেয়ে কোলবালিশসহ বিছানা থেকে পড়ে গেছে।
আমার পুরো শরীর অসার হয়ে এলো। আমি ক্ষণিকেই কান্নারত মেয়েটাকে বুকে জড়িয়ে নিলাম। আমার বিছানাটা বেশি উঁচু না। এক হাতের মতো হবে। উবু হয়ে কোলবালিশের ওপর পড়েছে। অল্প লেগেছে। বোধহয় নাকে-কপালে আর ঠোঁটে। ঠোঁটের সম্মুখে কেটেছে হয়তো। সামান্য রক্ত!
বুকে এসে সোনাইয়ের কান্না থেমেছে। আমার চোখ ছলছল করে উঠল। মেয়েকে বুকে নিয়েই বাইরে গেলাম। মা কি কান্নার আওয়াজ শোনেননি? এত পাষাণ কেউ হয়?
আমি বসার ঘরে গিয়ে মায়ের মুখোমুখি হয়ে টিভির সামনে দাঁড়ালাম। তিনি ভ্রু কুঁচকে ফেলে বললেন,
-“এগুলা কীসের নাটক মারাইতেছো? সরো এহান থেকে।”
আমার চোখের জল গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল। বিতৃষ্ণায় মুখ বিষিয়ে উঠল। বোধহয় এই সাড়ে তিনবছরে প্রথমবার গলার আওয়াজ উঁচুতে তুললাম,
-“আপনি মানুষ, মা? এটা আমার একার মেয়ে? আপনাদের রক্ত না? একটুও দয়া-মায়া হয় না আপনাদের? কীভাবে মুখ ঘুরিয়ে থাকতে পারেন? আড়াইটা মাস হলো। একবারও কোলে নেননি। তাকিয়ে দেখেননি। কেন?”
চোখ রাঙিয়ে উঠলেন মা,
-“অঙ্গজা! তোমার হেডাম দেইখা অবাক হইতাছি। কার লগে কথা কইতাছো, ভুইলা গেছো?”
আমি প্রুত্যুত্তর করলাম,
-“মা, ভুল বলতেছি না আমি। আপনি দেখেন। আপনার ছেলেরই তো সন্তান। কীভাবে পারেন মুখ ঘুরিয়ে থাকতে।”
মা ধমকে উঠলেন,
-“চুপ! এত কথা কই পাইতেছিস? বাড়ি থেকে বাইর করে দিতে পারি, ভয়-ডর লাগে না? হ্যাঁ? এটারে তোর বাপের বাড়ি পাইছোস?”
আমি থমথমে আওয়াজে বলে উঠলাম,
-“আপনি আমাকে এই বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার কথা বলতে পারেন না, মা। আমি যেমন এই বাড়ির বউ, আপনিও বউ। এই বাড়ির মেয়ে নন। আপনারও এই বাড়ির ওপর অধিকার নেই।”
-“আমারে অধিকার চেনাইতেছোস?”
আমি নরম হলাম,
-“বেয়াদবি মাফ করবেন, মা। আপনি সোনাইকে দেখেন একটু। গায়ের রঙের ওপর ওর কী দোষ। আমরা তো ইচ্ছা করে করিনি, মা। একটু তাকিয়ে দেখুন। কী মায়াময় চেহারা ওর। কীভাবে আপনার দিকে তাকিয়ে আছে। দেখুন। কোলে নেবেন না? আপনাদের রক্ত না ও?”
এবারে শাশুড়ির বলা কথাটা আমার অন্তরআত্মা কাঁপিয়ে তুলল,
-“এই কালা মাইয়ারে আমি আমার রক্ত মানি না। কোনকান বেজন্মা এইটা। কোনখানে কোন কুকাম কইরা আইসা পয়দা করছোস এইডারে, কে জানে। তোদের দুইটারে যে এই বাড়িতে এতদিন জায়গা দিছিলাম, এই তোর সাতকপালের ভাগ্য ছিল। আর তুই ওড়া শুরু করছোস! থাকতে-খাইতে পারতেছিলি, ভালো লাগতেছিল না?”
আমি কথা হারিয়ে ফেললাম। একবার মেয়ের দিকে তাকালাম, একবার মায়ের। মেয়েটা আবার কান্না করে যাচ্ছে একনাগাড়ে। আমি স্তব্ধ হয়ে আছি। এমন সময় কলিং বেল বাজল। মা দৌড়ে দরজার কাছে গেলেন। দরজা খুলে আমার বরকে দেখতে পেয়েই কুমিরের কান্না কেঁদে বলে উঠলেন,
-“বাবু, আমি কী সর্বনাশ করলাম এডা! তোর লাগি এমন বউ আনলাম, বড়ো-ছোট মানে না। কুকাম কইরা একটারে পয়দা করছে, আমি জানতে পারায় আমারে গালাগাল করতাছে। কইতাছে এই বাড়িতে আমার অধিকার নাই, দুইদিন পর বাড়িত্তে বাইর কইরা দিব। আমি এখন কই যামু রে? কী কপাল কইরা এমন বউ আনছিলাম!”
শাশুড়ি মায়ের হায় হায় দেখে আমি এখনও চুপ। শুকনো মুখে তাকিয়ে আছি মাহতাবের দিকে। বাড়ি আসতে না আসতেই এসব শুনল। ওর রাগ বেশি, তারও বেশি ধৈর্য। এখন মাহতাবই শেষ ভরসা। মাহতাব, তুমিও কি মায়ের কথায় আমাকে অবিশ্বাস করবে?
“বাবু, আমি কী সর্বনাশ করলাম এডা! তোর লাগি এমন বউ আনলাম, বড়ো-ছোট মানে না। কুকাম কইরা একটারে পয়দা করছে, আমি জানতে পারায় আমারে গালাগাল করতাছে। কইতাছে এই বাড়িতে আমার অধিকার নাই, দুইদিন পর বাড়িত্তে বাইর কইরা দিব। আমি এখন কই যামু রে? কী কপাল কইরা এমন বউ আনছিলাম!”
শাশুড়ি মায়ের হায় হায় দেখে আমি এখনও চুপ। শুকনো মুখে তাকিয়ে আছি মাহতাবের দিকে। বাড়ি আসতে না আসতেই এসব শুনল। ওর রাগ বেশি, তারও বেশি ধৈর্য। এখন মাহতাবই শেষ ভরসা। মাহতাব, তুমিও কি মায়ের কথায় আমাকে অবিশ্বাস করবে?
মাহতাব নিশ্চুপ সব শুনল। এরপর বাড়ির ভেতরে এলো। এসে সোজা আমার কোল থেকে সোনাইকে নিজের কোলে তুলে নিল। ঠোঁটের উপরিভাগ সামান্য কালচে দাগ পড়েছে। মাহতাব সেদিকে তাকিয়ে আমাকে বলল,
-“তুমি কিছু বলবে না, অঙ্গজা?”
মাহতাবের দিকে দৃষ্টি স্থির রেখে বললাম,
-“কিছু বলার নেই সত্যি।”
মাহতাব সামনের সোফায় বসল। মা এগিয়ে এসে দাঁড়ালেন। মাহতাব একবার মায়ের দিকে তাকিয়ে আবার আমার দিকে তাকালেন। আমাকে বলল,
-“প্রতিটি গল্পের দুটো দিক থাকে, দুটো বিপরীত পক্ষের। মা নিজেরটা বলেছে, আমি তোমারটা শুনতে চাই। একদিক শুনে জাজ করব না আমি। হয়তো মাটিতে ফেলে রাখা সংখ্যাটিকে তুমি সিক্স দেখছ, মা নাইন। এর মানে এই নয় একজন ভুল, অপরজন ঠিক। দুজনের দিক ভিন্ন। অঙ্গজা, তুমি কি বলবে না কিছু?”
আমার ছলছল করা চোখ থেকে একফোটা জল গড়িয়ে পড়ল। আমি মুছে নিলাম তা। তারপর লম্বা একটা শ্বাস টেনে বললাম,
-“মা বলেছে, তোমাকে আবার বিয়ে করাবে।”
মাহতাব সামান্য হাসল,
-“এটুকুই?”
আমি মাথা দু-দিকে নেড়ে নেতিবাচকতা প্রকাশ করলাম। মাহতাব এবার মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
-“বয়স একত্রিশের কোঠায় পা রেখেছে। নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে বিয়ে কী করে করি বলো তো?”
মা বললেন,
-“বাবু, তোর বউ এখন তোর কান ভাঙাইবো।”
মাহতাব মুচকি হেসে বলল,
-“তুমি এখানে বসো মা। দেখি কীভাবে কান ভাঙায়? ঠিক আছে?”
মা মাহতাবের পাশে বসলেন। মাহতাব আমাকে বলল,
-“এরপর?”
-“মা আমার মেয়েকে ছুঁয়ে দেখে না। মেয়েটা আজ খাটে থেকে পড়ে গিয়ে কান্না করছিল, মা তা-ও একবার দেখেনি।”
মাহতাব মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। আমাকে থামতে দেখে বলল,
-“এরপর?”
-“মাকে প্রশ্ন করি—কেন মা এমন করেন?”
-“মা কী বলল?”
-“মা বললেন, ও নাকি আপনাদের রক্ত না। আমি কোথায় কী করে এসে, মানে ওকে জন্ম দিয়েছি, মানে ওর বাবা অন্য কেউ...”
আমার কথাগুলো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল, গলা ভিজে আসছিল। মাহতাব মেয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। মায়ের দিকে ঘুরে মাকে বলল,
-“মা, এসব সত্য?”
মা আমতাআমতা করে বললেন,
-“ভুল নাকি? দেখ, এই মাইয়ার থোতমাডা দেখ। তোর মতো কোনদিক দিয়া হইছে? না চেহারার সাইজ না গায়ের রঙ। যে কেউ দেইখাই বলে দেবে, এর বাপ তুই না।”
মাহতাব চোখ বুঁজে ফেলল। তারপর মায়ের দিকে তাকিয়ে আবার বলল,
-“তারমানে তুমি স্বীকার করছ, তুমি এসব বলেছ?”
-“হ কইছি। যা সত্য তাই কইছি। এখন তুইও কি আমারে বাড়িত্তে বাইর কইরা দিবি, বাবু? চম্পা ভাবি আমারে কইছিলো, এই বউ তোরে তাবিজ-টাবিজ করি রাখছে। এখন বুঝতে পারতাছি আমি।”
মা কাঁদতে লাগলেন। মাহতাব মায়ের দিকে এগিয়ে গেল। মেয়ের ডান হাতটা উঠিয়ে মায়ের মুখে ছুঁয়ে কান্না মুছে দিতে লাগল। মা ছ্যাঁত করে উঠে সরে গেলেন। বললেন,
-“এটা কী করতাছোস? এই বেজন্মারে দিয়া ছোঁয়াবিনা না আমারে। পাপ লাগবো আমার।”
মাহতাব সরে দাঁড়ালেন। আমার মুখোমুখি হয়ে বললেন,
-“তুমি মাকে সরি বলো।”
আমি বিস্মিত মুখে বলি,
-“কেন?”
-“তাকে অধিকার চেনানোর জন্য।”
আমি দম নিলাম। চোখের পানি মুছে মায়ের কাছে অধিকারের প্রসঙ্গের জন্য মাফ চাইলাম। মা বোধহয় সামান্য হাসলেন। আমার অসম্ভব খারাপ লাগল বিষয়টা। আর সেই মুহূর্তে মাহতাব বলে উঠল,
-“আটটা কুড়ি বাজে, অঙ্গজা। ৯টার মধ্যে তোমার, আমার আর সোনাইয়ের জিনিসপত্র সব গুছিয়ে ফেলো। আমরা বেরোব।”
আমি বুঝতে না পেরে ওখানেই দাঁড়িয়ে রইলাম। মা অবিশ্বাস্য চোখে তাকালেন মাহতাবের দিকে। জিজ্ঞেস করলেন,
-“কী কস এডি? কোনে যাবি?”
মাহতাব মুচকি হাসলেন মায়ের দিকে তাকিয়ে। বললেন,
-“আমি কারো প্রতি অবিচার করব না, মা। এখানে থাকলে রোজ-রোজ তোমার আর আমার বউয়ের ঝগড়া-ঝাঁটি হবে। মনের ভেতর একবার সন্দেহের উৎপত্তি হয়ে গেলে, কখনই আর বিশ্বাস করা যায় না কাউকে। তুমিও আমার বউকে বিশ্বাস করতে পারবে না আর। আমি চাই না যেই মেয়েটা নিজের সব কিছু ছেড়ে আমার কাছে এসেছে, সেই মেয়েটাকে কষ্টে রাখতে। পৃথিবীর সমস্ত কষ্টকে আমি শূন্যে পৌঁছাব আমার বউয়ের জন্য। কষ্টটা যদি তোমার তরফ থেকে আসে, আমি ঢাল হতে পারব না সব ক্ষেত্রে। মাতৃআজ্ঞা পালন করতে করতে হয়তো মেয়েটাকে কষ্ট দিয়ে ফেলব। তাই তোমাদের আলাদা থাকাই ভালো। তোমার জন্য তোমার পরিবার আছে, আমি আছি। আমার বউ আর মেয়ের জন্য কেবল আমি আছি। আপাতত চাইছি, সবাই ভালো থাকুক।”
মাহতাবের এত সব কথার মাঝে আমি আটকে রইলাম তার বার বার বলা ‘আমার বউ’ কথাটিতে। মা চিল্লিয়ে উঠলেন,
-“আব্বা, যাইস না। আমি কাইল তোরে হুজুরে কাছে নিয়া যামু। চম্পা ভাবি কাইলও আমারে কইছিলো, বউ তোরে তাবিজ করছে। আমি বিশ্বাস করি নাই তখন। কিন্তু এখন বুঝতাছি। আল্লাহ! আমার কী সর্বনাশ হইলো! আব্বা, কাইল না। এখনই চল। তোরে হুজুরের কাছে নিয়া যামু।”
মাহতাব বলল,
-“মা, আমার স্ত্রীর চরিত্র ও সন্তানের জন্মে প্রশ্ন তুলে তুমি আমায় বুঝিয়েছ—আমি স্বামী ও বাবা হিসেবে কতটা ব্যর্থ। সেখানে কীভাবে একজন আদর্শ ছেলে হিসেবে তোমার আঁচলে বাঁধা পড়ি বলো তো?”
মা অশ্রুসিক্ত নয়নে মাহতাবের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর কী যেন একটা ভেবে তেড়ে আসতে নিলেন আমার দিকে। বিরবির করে বলছেন,
-“হারামজাদি, আমার এত শখের সংসার নষ্ট করতে আইছিস তুই। আগে থেকেই ভাবিরা কয়ছিল বউ কখনও মাইয়া হয় না। আগে থেকেই টাইটে রাখতে হয়, নাইলে মাথায় চইড়া নাচোন শুরু করে। তারপর একসময় সংসার ভাঙে। আমার পোলাডা! একটা ছাড়া দুইটা কথা কইতো না আমার উপরে। সে আমারে কথা শুনায় তোর লাগি। তোরে..”
মা এগিয়ে এসে আমার চুলের মুঠি ধরতে এলেন। ওপাশ থেকে মাহতাব এসে মাঝে দাঁড়িয়ে পড়ল। মা হিঁসহিঁস করতে করতে বললেন,
-“বাবু, পথ ছাড়। সামনেত্তে সর।”
মাহতাব কঠিন গলায় আমাকে আদেশ করল,
-“৫ মিনিট। যা প্রয়োজন গোছাও।”
মা বললেন,
-“কোত্থাও যাইবি না তুই। এই মা*রে যাইতে ক। ওরে আমার বাড়িত্তে বাইর হইতে ক।”
মাহতাবের গলা আরও গম্ভীর হলো,
-“অঙ্গজা, তোমায় যেতে বলেছি না রুমে? যাও।”
আমি চলে এলাম। রুমের ভেতর থেকেও মা-ছেলের কথা শুনতে পেলাম। মা বিভিন্ন কথা বলে যাচ্ছেন, মাহতাব তা শুনছে। যখনই মা আমাকে, আমার পরিবার তুলে গাল দিতে যাচ্ছে, তখনই মাহতাব বলে উঠছে,
-“মা, যা বলছ একটু ভেবে চিন্তে বোলো। পরের বাড়ির মেয়েকে কিছু বলার আগে একবার ভেবে দেখো, তোমার ঘরেও একটা মেয়ে আছে। তোমার ঘরের মেয়েকেও একদিন পরের ঘরে যেতে হবে।”
আমি কাপড় গুছিয়ে বের হলাম। পাশের বাড়ি থেকে এলো রাহা। ও-বাড়ির মেয়ে প্রিয়া আর ও একই ক্লাসে পড়ে। গ্রুপস্টাডির জন্য বোধহয় গিয়েছিল। ফিরে এসে আমাদের এভাবে বেরিয়ে যেতে দেখে ও বিস্ময় নিয়ে বলল,
-“কই যাচ্ছ তোমরা?”
মাহতাব ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
-“মায়ের খেয়াল রাখিস, কেমন?”
আমার হাতের লাগেজ দেখে বোধহয় কিছু ধরতে পারল রাহা। কেঁদে ফেলে বলল,
-“যেয়ো না!”
মাহতাব বলল,
-“তোর ভাবি আর ভাতিজির থাকার উপযুক্ত স্থান এটা না, রাহা। তুই চাস না ওরা সুখে থাকুক?”
রাহা আমাদের আর আটকালো না। মা-ও আটকালেন না। মাহতাব আমার কোল থেকে ঘুমিয়ে যাওয়া মেয়েটাকে কোলে তুলে নিল, ওকে বুকে জড়িয়ে অন্য হাতে লাগেজটা নিয়ে বলল,
-“এসো।”
ও বেরিয়ে গেল। আর আমি সদরের চৌকাঠে আটকে গেলাম। আমার জন্য এই বাড়ি ছাড়া এতটাও সোজা না। বাড়ির বউ সারাদিন যেখানেই থাকুক, দিনশেষে তাকে ঘরে ফিরতে হয়, ঘরে বাঁধা পড়তে হয়। আমার সাড়ে তিনবছরের একটু একটু করে সাজানো সংসার! আমি কীভাবে ছাড়ি?
একবার পিছে ঘুরে সোফায় মুখ কালো করে নতমুখী হয়ে বসে থাকা শাশুড়ি মা ও কান্না করতে থাকা ননদকে দেখলাম। একটু পর বাবা ফিরবেন। এসে বলবেন, ‘আম্মু এককাপ চা দিয়ে যাও তো দেখি।’
আমার আর চা নিয়ে যাওয়া হবে না। আমার আর চায়ের বাহানায় বাবার সাথে ঘন্টা খানেকের আলাপন হবে না। এ-বাড়িতে সবচেয়ে বেশি কথা তো বাবার সাথেই বলি। মানুষটাকে বলে যাওয়া উচিত নয় কি?
মাহতাব তাড়া দিলো,
-“অঙ্গজা, এসো! দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
আমি চৌকাঠ পেরোলাম। কিন্তু এই রাতের নয়টা বাজে, আমাকে আর আমার আড়াই মাসের বাচ্চা সন্তানকে নিয়ে মাহতাব যাবেই বা কোথায়? ব্যথিত চোখে যখন ওর দিকে তাকালাম, চোখের প্রগাঢ় পলক ফেলে মাহতাব আমায় আশ্বাস দিলো,
-“আমি আছি।”
বাতাসেরা যেন একত্রে গান গেয়ে উঠল, “পুরো পৃথিবী তোমার বিপরীতে থাকলেও, আমাকে তুমি পাশে পাবে।
মাহতাব আমাকে নিয়ে সেদিন ওর একটা বন্ধুর বাড়িতে উঠল। বন্ধুর পরিবারের লোকেরা আমাকে আর আমার মেয়েকে আপন করে নিল ক্ষণিকেই। ভাবির সাথে দারুণ একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে উঠেছিল আমার।
বাবা কল দিয়েছিল রাতে। আমাকে ফিরতে বলেননি। কেবল হাসিমুখে বলেছিলেন,
-“মা, আমি চাই তুই ভালো থাকিস। আমি জানি এখন তুই ভালো থাকবি। আমার নাতনির খেয়াল রাখিস। আমি প্রতি সপ্তাহে দু-বার করে তোদের দেখে আসব।”
মাহতাব পরের তিনদিনের জন্য অফিস থেকে ছুটি নিয়ে নেয়। সকালে উঠেই অফিসের নিকটবর্তী এলাকায় বাসা দেখে ফেলল। একটা দুই বেডের বাসা। মাসের শুরু, বেতনটা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করা হয়েছে দু-দিন আগেই। এতে সুবিধা হলো। মাহতাব বেতনের ষাট হাজার উঠিয়ে নিয়েই সেখান থেকে কুড়ি হাজার বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। বাবার ইনকাম যথেষ্ট হলেও, মাহতাব বরাবরই কুড়ি হাজার মার হাতে এবং কুড়ি হাজার আমার হাতে তুলে দেয়। আমার টাকাগুলো ডিপোজিট করে রাখতাম। বাকি টাকার কিছুটা বোনের কাছে এবং নিজের হাত খরচের জন্য রাখত। বাড়ির খরচ বাবার টাকাতেই চলত। এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। তবুও নিজ দায়িত্বে মায়ের কাছে পনেরো হাজার এবং বোনের হাত খরচার জন্য পাঁচ হাজার পাঠিয়ে দিল। মোটামুটি চলার জন্য বাকি টাকায় বাসার এডভান্স দিয়ে টুকিটাকি সামগ্রী কেনা হলে, ১০ হাজারের মতো রইল।
বাসা পরিষ্কারের কাজে আমি হাত দিতে পারিনি। আমার মাত্রাতিরিক্ত ডাস্ট এলার্জি। আবার ঝুঁকে মোছামুছিও করতে পারিনি। সবটা মাহতাব একাই করল বিনা অভিযোগে। সারাদিন বাইরের খাবার দিয়েই চললাম। রাতে মেয়েকে ঘুম পাড়ানোর জন্য যখন শুয়েছি, মাহতাব এসে দুম করে পাশে শুয়ে পড়ল। আমি মলিন চোখে ওর ক্লান্তি দেখলাম। ও প্রচণ্ড উদাস গলায় আমাকে জিজ্ঞেস করল,
-“খুব কষ্ট হচ্ছে, অঙ্গজা? এই তো, ক'টা দিন কষ্ট করো। তারপর আমি সব ঠিক করে দেবো।”
আমার কী যে খারাপ লাগল! এই মানুষটার আমার প্রতি কোনো অভিযোগ নেই কেন? অন্য কোনো পুরুষ হলে এই ক্লান্তির জন্যই বোধহয় খারাপ ব্যবহার করে ফেলত। অথচ আমার পুরুষটা এমন কেন? নিজেকে নিয়ে ভাবে না কেন?
আমি বিরবির করে বললাম,
-“মাহতাব, চলো ফিরে যাই। এভাবে তোমার অনেক কষ্ট হবে।”
মাহতাব হাসল,
-“আর ও-বাড়িতে তোমাদের কষ্ট হবে।”
-“আমি মানিয়ে নেব।”
-“আমি তোমার কষ্ট মেনে নিতে পারব না যে। আমি তোমাদের কাউকেই কিছু বলতে পারব না। তবে মা-কে বোঝাব। মাঝে মাঝেই বোঝাব সবটা মা-কে। আমি অনেকদিন ধরেই আমার মেয়ের প্রতি মায়ের উদাসীনতা লক্ষ করেছি। কিন্তু টের পাইনি। তোমার বিষয়টা আগে বলা উচিত ছিল।”
আমি ফুঁপিয়ে উঠে বললাম,
-“ভালোবাসি, মাহতাব!”
মাহতাব এক হাত আমার গালে রেখে বলল,
-“আমিও আমার সন্তানের মাকে ভীষণ ভালোবাসি।”
আমার সে কী সুখ! ধীরে ধীরে সংসারটা গুছিয়ে নিতে লাগলাম। সোনাই বড়ো হতে লাগল। ওর ভালো নাম মেহেরিন সিদ্দিকী অঙ্গনা। ওর চাঞ্চল্য বাড়ল, বাড়ির এ কোণা থেকে ও কোণা হামাগুড়ি দিতে লাগল। বাবা প্রায়ই আসে। রাহাও রোজ স্কুল থেকে ফেরার পথে সোনাইকে দেখে যায়। মেয়েটা বড়ো হতে লাগল বাবার মতো করে। সবসময় ঠোঁটের কোণে বিশালে একটা হাসি থাকে। কাঁদে কম। হাঁটতে গেলে যদি পড়ে যায়, তখন কাঁদে না। কিছুক্ষণ বসে থেকে এদিক-ওদিক দেখে। তারপর ওঠার চেষ্টা করে।
এখন সে কিছু শব্দ বলতে পারে। যেমন মা, বাব্বা, দাদ্দা, মাম্মানি, খাব, যাব! এসব। দু'দিন ধরে ওকে শেখাচ্ছি দাদ্দু বলা। ও শিখেছেও। তারপর আজ আমার অন্য নাম্বার দিয়ে মাকে কল দিলাম। মা যখন কল রিসিভ করল, সোনাইয়ের সামনে ধরলাম। সোনাই একগাল হেসে দাদ্দু দাদ্দু বলতে লাগল। ওপাশে তখন থমথমে নীরবতা। আমি হেসে ফেলে কল কেটে দিই। এরকম কাহিনি আমি মাঝে মাঝেই করতে লাগলাম।
___
সোনাইকে নিয়ে আজ একটু বের হয়েছিলাম কিছু কেনাকাটায়। রাস্তায় মায়ের সাথে দেখা হয়ে যায়৷ তিনি এড়িয়ে গেলেন না। এগিয়ে এসে আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
-“কী খবর?”
আমি মুচকি হেসে বললাম,
-“আলহামদুলিল্লাহ মা, ভালো আছেন?”
-“যার পোলা বাড়ি ছাড়ে, সেই মা ভালো থাকে?”
আমি টের পাই তাঁর সূক্ষ্ম ব্যথাটা। এর মধ্যে সোনাই দু-হাত বাড়িয়ে দিলো মায়ের কোলে যাওয়ার জন্য। গোল মুখের, ফুলো ফুলো গালে হাসছে। মা এড়িয়ে যেতে পারলেন না। কোলেও নিলেন না। কেমন একদৃষ্টে সোনাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। গাড়ির হর্ন বাজতেই মা সংবিৎশক্তি ফিরে পেলেন। এদিক-ওদিক তাকালেন। তারপর বললেন,
-“আমার পোলাকে আমারতে আলাদা কইরা ভালো করো নাই।”
-“আমার ইচ্ছাকৃত না।”
-“বুঝি।”
মা চলে গেলেন। আমিও ফিরে এলাম। তারপর কো-ইন্সিডেন্টলি মায়ের সাথে আমার একাধিকবার দেখা হতে লাগে। একরাতে বাবা আমার ফোনে ভয়েস ম্যাসেজ পাঠায়। সেখানে মা আর বাবার কথপোকথন ছিল। সম্ভাব্য মায়ের অজান্তে তা রেকর্ড করা। মা বলছিলেন,
-“জানেন বাবুর আব্বা, মাইয়াডা না এক্কেরে বাবুর মতো দেখতে। আমার বাবু ছোটকালে যেমনে খালি হাসতো না? ওমনে। বাবুর মতো ডান গালে একটা টোলও আছে। আর চোখও ছোট ছোট হয়ে যায় হাসার সময়। খালি তাকায়া থাকতে মন চায়।”
বাবা বললেন,
-“তুমি না মেয়ের আর মেয়ের মায়ের ব্যাপারে কত কথাই বলছিলা।”
মায়ের থেকে অনেকক্ষণ বাদে উদাস গলায় কথা এলো,
-“পাশের বাড়ির ভাবিরা আমার নাতনির গায়ের রঙ নিয়া যেমনে চোখ-মুখ কোঁচকায়, আমার খারাপ লাগে। সেদিন ভাবি তো মেলা কথা কইলো। রাগের মাথায় অঙ্গজার উপরে ঝারছি। আমার উচিত হয়নাই।”
-“তাইলে কল দিয়ে কও ফিরতে।”
-“কইলেই ফিরবো?”
বাবা বললেন,
-“চেষ্টা করতে পারো।”
মা চেষ্টা করলেন না। কথাও বললেন না আর। এভাবে আরও ক'টা মাস কাটল। ও-বাড়ি থেকে চলে আসার দেড় বছরের বেশিই পেরিয়েছে। একদিন মাহতাব সন্ধ্যের আগেই অফিস থেকে চলে এলো। সাথে মাকে নিয়ে এলো। আমি প্রচণ্ড অবাক হয়ে যাই। মাকে ভেতরে এনে বাড়ির এদিক-ওদিক দেখাতে লাগল। আমাকে বলল মায়ের পছন্দমতো রান্না করতে। আমি রান্নায় লেগে যাই। সোনাই রুমে খেলছিল।
মাহতাব গোসলে গেল। আমি রান্নার একফাঁকে সোনাইকে দেখতে রুমে আসি। ভিড়িয়ে দেওয়া দরজার এক প্রান্ত দিয়ে সোনাইয়ের পাশে মাকে বসে থাকতে দেখলাম। সোনাই তার প্লাস্টিকের খেলনাগুলো নিয়ে খেলছে। একটা একটা মায়ের দিকে দিচ্ছে। আবার খেলছে। মা চুপ হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। আদর করছে না, ফেলেও দিচ্ছে না। কেমন যেন বিমুগ্ধ চোখে আমার মেয়েকে দেখে যাচ্ছে। প্রশান্তির শীতল হাওয়া আমার অন্তর ছুঁয়ে গেল। আমি দৌড়ে রান্নাঘরে এসে রান্নায় মন দিলাম, পাছে না মা দেখে ফেলে। মাহতাব গোসল সেড়ে বেরোতেই ওকে জিজ্ঞেস করলাম,
-“মা এলো? নাকি জোর করে নিয়ে এলে?”
মাহতাব হেসে বলল,
-“এভাবে আসত নাকি? আসতে ইচ্ছে হলেও আসত না। তাই জোর করে নিয়ে এলাম।”
আমি আমার দায়িত্বশীল স্বামীকে মুগ্ধ চোখে দেখে গেলাম। যাওয়ার সময় মা বার বার পিছে ফিরে চাইছিলেন। আমি বললাম, মা একদিন থেকে যান। মা তাতে রাজি না। মাহতাবের হাত শক্ত করে ধরে বললেন,
-“আব্বা, ফিরে আয়।”
মাহতাব নিশ্চল আওয়াজে বলল,
-“তোমাকে রেখে বাবা কখনও অন্য জায়গায় থেকেছে, মা? তুমি নানুবাড়ি গেলেও তো বাবা গিয়ে থাকত।”
মা চুপ থাকলেন। মাহতাব আবার বলল,
-“তাহলে আমি কীভাবে ওদের রেখে যাই?”
মা হয়তো খুব করে বলতে চাইলেন, ‘ওদের নিয়েই আয়।’
কিন্তু বললেন না কিছু। প্রলম্বিত শ্বাস ফেলে চলে গেলেন।
____
এরপর সম্ভবত আরও ক'টা মাস যাওয়ার পর একদিন হুট করেই মাহতাব আমাকে বলল, একজায়গায় নিয়ে যাবে, তৈরি হতে৷ আমি সোনাইকে নিয়ে তৈরি হলাম। মাহতাব আমাকে চমকে দিয়ে আমার বাড়িতে নিয়ে এলো। মা দেখে অবাক হলেন প্রচণ্ড। চেহারায় বিস্ময়ের সাথে একঝাঁক খুশি নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
-“চলে আসছিস তোরা?”
যেন তিনি চান আমরা থেকে যাই। কেবল মাত্র ইগোর জন্য মুখ ফুটে বলতে পারছেন না। মাহতাব জবাবে হাসল, কিছু বলল না। রাহা এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল। দুপুরের খাওয়া-দাওয়া শেষ হলো। আরও কিছুক্ষণ থাকার পর হুট করেই মাহতাব বলল,
-“আবার একদিন আসব, মা। আজ যাই।”
মা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
-“না গেলে হয় না?”
মায়ের আওয়াজ ভেজা। মাহতাব মায়ের দুগালে হাত রেখে কপালে চুমু খেয়ে বলল,
-“আবার আসব।”
মা হয়তো কেঁদেই দিতেন। আমরা তখন বিদায় নিয়ে চলে এলাম। তারপর একদিন আমার ফোনে মায়ের কল আসে। মায়ের গলার স্বর ভেজা,
-“কেমন আছ, অঙ্গজা?”
-“আলহামদুলিল্লাহ, আপনি?”
-“খালি বাড়িতে ভাল্লাগেনা। সারাদিন একা থাকি। মইরা পইড়া থাকলেও কেউ জানব না।”
-“এভাবে বলছেন কেন, মা?”
-“কেমনে কমু আর?”
মায়ের কথা শুনে খারাপও লাগল, বাচ্চামো দেখে হাসিও পেল। আমি জিজ্ঞেস করলাম,
-“আমরা কি আসব, মা?”
-“আইসাই তো চইলা যাও।”
-“আপনি কি চান আমরা এসে থাকব?”
-“এখন কি মাইক লাগাইয়া কওন লাগব?”
মা রেগে যাচ্ছেন। আমি হেসে ফেলে বললাম,
-“মা, আসছি। দাঁড়ান।”
কল কেটে দিলাম। মাহতাবকে কল দিয়ে বললাম,
-“আমি বাড়ি ফিরব। অফিস থেকে সোজা ও-বাড়িতে এসো। আর এ-বাড়ির সবকিছু ও-বাড়িতে নেওয়ার ব্যবস্থা কোরো।”
মাহতাবকে কিছু বলতে না দিয়েই আমি চলে এলাম। বাড়ি এসে দেখলাম মা সিঁড়ির সামনে বসে আছেন, এদিকে চেয়ে। কেমন যেন লাগল। এগিয়ে গিয়ে সোনাইকে সিঁড়িতে বসিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরলাম। বললাম,
-“আর যাব না।”
মা কিছু বললেন না, আগলে ধরলেন না, সরিয়েও দিলেন না। আমি সময় নিয়ে সরে এলাম। মা ভেতরে আসতে বলে তড়িঘড়ি করে ভেতরের দিকে চলে গেলেন। যাওয়ার আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম তাঁর চোখ ভেজা। রাতে মাহতাব এলো। মায়ের কাছে বলল,
-“মা, মানুষের কথার জাল খুব শক্ত। কারো কথায় প্যাঁচাবে না, কেমন? তোমার মন-মস্তিষ্ক তাদের শব্দরা কন্ট্রোল করতে পারে। আমার মা এত দূর্বল নাকি? মোটেও না। নিজে দেখবে, শুনবে, তারপর সঠিক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে। কথার আঘাতের চেয়েও বড়ো আঘাত নেই, মা। এই আঘাত ওষুধ নেই।”
মা সম্পূর্ণ কথা বুঝতে পারে। তারপর আর আমাকে নিচু করে কখনও কিছু বলেনি। মাহতাব! পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো স্বামী। তোমার নিরপেক্ষতা আমায় এক আসমান সুখ উপহার দিয়েছে। সব স্বামীরা তোমার মতো হলে হাজারো মায়ের ঘর ভাঙে না, হাজার নারী অবহেলায়, অবজ্ঞায়, নির্যাতনে এক কোণায় গুমরে মরে না। সব অঙ্গজার ভাগ্যে কেন মাহতাব নেই?
written by: নবনীতা শেখ
~ সমাপ্ত ~
Leave a comment
Your email address will not be published. Required fields are marked *