সুবোধ দাঁড়িয়ে রইল। সামনে ঠেলাগাড়ি। ঠেলাগাড়ির ওপর দশটা লাশ। এবথে থেবড়ে থাকা লাশগুলো একে অন্যের গায়ের উপর পা তুলে কিংবা কারোর বেঁকে যাওয়া কনুইয়ের ভেতর হাত প্যাঁচিয়ে শুয়ে। পরনে খাকি পোশাক সবার। আপাতত ঝাঁঝরা করা শরীরের ক্ষত বেয়ে গলগল করে বের হওয়া আঠালো রক্তে পোশাকের রঙ পাল্টেছে খুব। সুবোধ রাস্তায় নামার আগে কয়েক ঢোক মেরেছিল মদ। বমি করার মতোন হুঁশ না থাকলেও সুবোধের বমি পেল। ঢের লাশ তুলেছে সে কতো। ডোমদের বুঝি রক্তের গন্ধে বমি পেলে চলে! এই লাশগুলোর অন্য ব্যাপার আছে তবে। খাকি পোশাকগুলোর গন্ধই আলাদা। দশটা খাকি লাশ সুবোধ তুলে এনেছে বাবুবাজার পুলিশ ফাঁড়ি থেকে। উপরমহলের কড়া নির্দেশ। প্রচুর লাশ সরাতে হবে। রাত্তিরে আবার কারফিউ লাগবে।
সুবোধ দুই হাত কচলে উষ্ণ করে নিলো সামান্য। তারপর ঠেলল গাড়ি। হেইয়ো! চাকা আটকালো কোথাও! সুবোধ কপালে দু’খানা ভাঁজ ফেলে চাকা পরিষ্কার করল চট করে। চাকায় প্যাঁচিয়ে ছিল একটা ফকির। ফকিরের লুঙ্গি অদূরে পড়া। প্রাণ বাঁচাতে লুঙ্গি খুলে দৌঁড়েছিল। দৌঁড়ে কতদূর যাবে একটা মানুষ! বুলেটের গতির সঙ্গে লুঙ্গি খুলে দৌঁড়েও পারা যায়? ফকিরের উরু আটকে গিয়েছিল চাকায়। টেনে বের করল সুবোধ। ওটাও ঠেলাগাড়ির ওপর নিয়ে নিলো। গন্তব্য মিডফোর্ড হসপিটাল, লাশঘর।
শূন্য অথচ লাল রক্তে মাখোমাখো একটা ঠেলাগাড়ি ঠেলে লাশঘর থেকে সুবোধ দৌঁড়ালো শাঁখারী বাজার ফের। পথিমধ্যে দেখা হলো দুয়েকটা ঠেলাগাড়ির সঙ্গে। কারোর তার মতোন শূন্য, কারোর ভরপুর লাশ। সলীলকে দেখা গেল একহাতে চোখ মুছতে মুছতে ছুটছে। তার ঠেলাগাড়ির ওপর দু’টো বাচ্চা, একটা মা আর একজন বৃদ্ধ। বৃদ্ধ তখনও জীবিত। হাত উঁচু করে আছে। পাশ কাটার সময় মদের উৎকট গন্ধ ছাপিয়ে গুয়ের গন্ধ পেল সুবোধ। ডাক দিলো, ‘সেকি রে সলীল। গুয়ের গন্ধ কেনে?’
‘বাচ্চাডা হাগছে।’
‘জিন্দা?’
সলীল জবাব দিলো না। একহাতে চোখ মুছতে মুছতে দৌঁড়ালো। মৃত্যুর সময় মানুষ হেগে দেয়। প্রস্রাবও করে। ছোট্ট বাচ্চাই তো। বড়োরাও করে ফেলে। একবার একটা লাশ তুলেছিল সুবোধ। যুবকের বয়স সাঁইত্রিশ বৎসর। তারও পশ্চাদদেশ নোংরা। ভাগ্যিস মদ আবিষ্কার হয়েছিল দুনিয়ায়। নইলে সুবোধের যে কী হতো, কী করে করত তারা এইসব কাজ। সুবোধের ভাগ্য ভালো। যতগুলো লাশ তুলেছে, সবগুলোই শক্ত সমর্থ। মৃত্যুর আগপর্যন্ত শক্ত। একেকজন চোয়াল খিঁচে আছে, হাত মুষ্ঠিবদ্ধ। অধিকাংশের চোখ খোলা। অতর্কিত আক্রমণ বলে কথা। আয়োজন করে মরলে চোখ বোজার সময় পাওয়া যায়। আচমকা কামানের আওয়াজে চোখ খোলার পর বন্ধ করার সময় পাওয়া যায় বুঝি?
জজকোর্ট পার হওয়ার পর একটা হোটেলের সামনে এসে সুবোধ দাঁড়ালো। দশ-বারোটা লাশ। সুবোধ এদের চেনে বোধহয়। ফকির। পাকিস্তানিরা কি বেছে বেছে ফকির মারছে? আজব! সুবোধ টেনে টেনে উঠালো সবগুলো লাশ। কারোর বুকে দু’টো গুলি তো কারোর ঘাড় কোমরে আর মাথায় গুলি। ছয়টা লাশ তুলতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে ধপাস করে বসল সুবোধ। পাশ দিয়ে হনহন করে ছোটা এক মৌলভী দৌঁড়ে এলো কাছে। ফিসফিস করল, ‘বইসা আছো কেন?’
‘তিয়াস লাগে মৌলভী সাব।’
‘পরে খাবা। আগে তুলো। কেউ কেউ বাঁইচা আছে মনে হয়। তাড়াতাড়ি হসপিটালে নিয়ে যাও। তোমার নাম কী?’
‘সুবোধ।’
‘কাউরে এই নাম বলবা না। তোমার নাম সুলেমান। যাও।’
‘বলুম না কেনে? আমি সরকারের কাজ করি। সাব ফরমাইশ দিছে বডি তোলার। আমি নাম বদলামু কেনে?’
‘বকর বকর কম করে নিয়ে যাও। জলদি।’
মৌলভী বাকি চারটা লাশ ধরাধরি করে তুলে দিলো ঠেলাগাড়ির ওপর। সুবোধ ঠেলা দেবে, একমুহূর্তের জন্য মৌলভী দাঁড় করালেন ঠেলাগাড়ি। কী মনে করে যেন ঠেলাগাড়ির ওপর জিভ বের করে চিৎ হয়ে শুয়ে থাকা হাড় জিরজিরে একটা বাচ্চার কপালে চুমু খেয়ে ডুকরে কেঁদে উঠে বিড়বিড় করলেন, ‘হাশরের মাঠে আমি বিচার দিবো খোদার কাছে। খোদার কসম। খোদা তোমাদের শহীদের মর্যাদা দান করুক, জান্নাত নসিব করুক।’
সুবোধ দৌঁড়ালো ঠেলাগাড়ি নিয়ে। গন্তব্য মিডফোর্ড হসপিটাল, লাশঘর। দুই দফায় বিশটা লাশ, ছয় দফা শেষ করার আগমুহূর্তে কারফিউ ঘোষণা করা হলো। রাস্তায় কাউকে দেখা হলেই গুলি। কোনো অজুহাত নয়। রাজারবাগে জ্বলছে আগুন তখনও। আট-দশটা ট্রাক রাজারবাগ থেকে বের হয়ে গেল ফুড়ুৎ করে। প্রতিটা ট্রাকে দশ বারোটা করে লাশ। দেড়শো পুলিশ বন্দী। বাকি দেড়শো ভাসিয়ে দেওয়া হলো বুড়িগঙ্গার জলে। সুবোধ ঠেলাগাড়ি নিয়ে দৌঁড়াতে গিয়ে হোঁচট খেল বেশ কয়েকবার। একবার মনে হলো, পুরো শহরটাই বুড়িগঙ্গা। এদিক ওদিক লাশ ভাসছে জলে। অল্প সরানো হয়েছে। ঢের বাকি আরও। আগামীকালও কাজ করার নির্দেশ এসেছে। রোজ সরাতে হবে লাশ। প্রতিদিন। এত কাজ। এত লাশ। আজ রাত্তিরে একটা ঘুম হলেই হয়।
.
সুবোধের ঘুম ভাঙ্গলো পরদিন। গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকাবর্ষে সেটা অবশ্য একইদিন। টানা ঘুমালো সুবোধ। বেলা পাঁচটার দিকে ঘুম ভাঙ্গলো মুহূর্মূহু চিৎকারে। চিৎকার করছে সলীল।
‘আগুন লাগছে সুবো।’
হকচিয়ে উঠে বসল সুবোধ। ‘কনে লাগলো আগুন? কনে?’ সলীল ভয়ার্ত স্বরে জানালো আগুন লেগেছে শাঁখারী বাজার, তাঁতী বাজার আর কোর্ট হাউস স্ট্রিট এলাকায়। পাকিস্তানিরা আগুন ধরিয়ে দিয়েছে চারপাশে। সব পুড়িয়ে ছাড়বে, সবাইকে পুড়িয়ে মারবে। সে কি উত্তাপ। সুইপার কলোনি অবধি আগুন না পৌঁছুলেই হয়। পানির রিজার্ভ রাখা দরকার। সুবোধের ঘুমানো হলো না আর। ঠেলাগাড়ি আনা হয়েছে। বাকি কাজগুলোও সেরে ফেলা দরকার। লাশ বেশীদিন রাস্তাঘাটে পড়ে থাকলে বিশাল সমস্যা। গন্ধ ছড়াবে। গন্ধ ছড়ালেই সাংবাদিকরা গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে এসে পৌঁছুবে। যদিও বিদেশী কোনো সাংবাদিক তখন দেশে নেই। যারা চুরি করে লুকিয়ে ছিল, অধিকাংশই ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে বন্দী। সুবোধ ঠেলাগাড়ি নিয়ে নামলো।
যখন ঠেলাগাড়ি নিয়ে একরাত্তিরের পুরনো লাশ তুলে হসপিটালের দিকে ছুটল সুবোধ, তখন গোয়ালনগর এলাকার অনর্গল গুলিবর্ষণের শব্দে কান ধরে আসলো একবার। একহাতে কান চেপে অন্য হাতে ঠেলাগাড়ি নিয়ে কতদূর যাবে সুবোধ! একটা বাড়ির আড়াল নিলো। গলির মাথায় চায়ের দোকান। বন্ধ। সুবোধ বসে হাঁপালো কিছুক্ষণ। বাড়ির বারান্দা থেকে একটা ভয়ার্ত কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।
‘দাদা। ও দাদাভাই।’
সুবোধ মাথা তুলে তাকালো। মধ্যবয়ষ্ক একজন মহিলা। হাতে শাঁখা, মাথায় সিঁদুর। উদভ্রান্ত দৃষ্টি। ভদ্রমহিলা কণ্ঠস্বরে কান্না আটকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনার ভ্যানে কোশিক বসু আছেন?’
‘দিদি..’
‘আমার হাসবেন্ড। গান করেন। কাল রাত্তিরে ধরে নিয়ে গেল ওরা। একটু দেখেন না। হাইট পাঁচ ফুট তিন। চশমা পরেন।’
সুবোধ ঠেলাগাড়ির ওপর বেশ নেড়েচেড়ে দেখল লাশগুলো। মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক। হাইট পাঁচ ফুট তিন। নেই। ভদ্রমহিলা বারান্দা থেকে চলে গেলেন চট করে। দূরে গুলিবর্ষণ অব্যাহত। সুবোধ ঠেলাগাড়ি নিয়ে দৌঁড়ালো। একা। আজ সলীল বের হয়নি। কেউ বের হয়নি। বের হলেই মিলিটারি গুলি ছুঁড়বে অনর্গল। ওদের হাতের নিশানা পাক্কা। সুবোধ ঠেলাগাড়ি রেখে দৌঁড়ালো বাসায়। ফেরত এসে কাঁপতে কাঁপতে দরজা বন্ধ করল। ধড়াম। তার অনেক অনেক দূর একটা বাসার দরজাও অবিকল বন্ধ হলো অমন। এই দরজার ওপাশে আছেন একজন ভদ্রলোক। ইংরেজী পড়ান। গতকাল রাত্তিরেও ছাত্র-ছাত্রীর খাতা দেখছিলেন। আচমকা দরজায় ধড়াম ধড়াম শব্দ। কয়েকজন ঢুকে পড়ল বাগান টপকে। প্রত্যেকের হাতে অস্ত্র। শিক্ষককে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে দাঁড় করানো হলো নিচে।
‘নাম কী?’
ভদ্রলোক নাম বললেন।
‘ধর্ম?’
ভদ্রলোক ধর্ম বললেন। পরপর দু’টো গুলি চলল। প্রথমটা ঘাড়ে। ভদ্রলোকের সমস্ত শরীর কেঁপে উঠল একবার। পরমুহূর্তে একটা গুলি চলল কোমরে। ভদ্রলোক ধপাস করে পড়লেন। ওরা বের হয়ে গেল। ভদ্রলোকের স্ত্রী ও কন্যা সন্তান মিলে টেনেহিঁচড়ে অর্ধমৃত লাশ বাসায় ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করলেন। ধড়াম। সুবোধ কেঁপে গেল অনর্গল। প্রতিটা গুলির শব্দ যেন হুল ফোঁটালো শরীরে তার। কেঁপে গেলেন ভদ্রলোকও। কিংবা তার হাত ধরে বসে থাকা কন্যা। কন্যার বয়স পনের বৎসর। কন্যা আকুতি জানালো মাকে, ‘তুমি দেয়াল টপকে যাও, নার্সদের হোস্টেল থেকে একটা নার্স নিয়ে এসো।’ মা এদিক ওদিক ছুটলেন। বাহির হওয়া মুশকিল। একটা অ্যাম্বুলেন্স যদি পাওয়া যেত। হায়! চব্বিশ ঘন্টার কারফিউ শেষ হলো পরদিন, সাতাশ তারিখ। সকাল সকাল। পনের ষোল বৎসর বয়সী এক কিশোরী পুরো চব্বিশঘন্টা বসে রইল মৃতপ্রায় পিতার হাত ধরে, কি ভয়ংকর সেই রাত! কারফিউ ভাঙ্গার পর রাস্তায় নেমে এলো কিশোরী। আশপাশের সাধারণ মানুষজনের নিকট সে কি কাকুতি মিনতি তার।
‘আমার বাবাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হসপিটালে নিয়ে যাওয়া দরকার। ইমার্জেন্সী। প্লিজ।’
ভদ্রলোক তখনও জীবিত। তখনও সচেতন। তখনও শক্ত। বেঁচে ছিলেন আরও তিনটি দিন। যদিও হসপিটালে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দেশে চলছিল হত্যাযজ্ঞ, নির্বিচারে মানুষ হত্যা। একপ্রকার বিনে চিকিৎসায়ই মারা যান ভদ্রলোক। এই ভদ্রলোক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগের অধ্যাপক। নাম, জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা।
.
সাতাশ তারিখ। সুবোধ গুঁজে রইল বাসায়। সলীল খবর নিয়ে এসেছে। ইংলিশ রোডের আশপাশের সবগুলো দোকান পুড়ে ছাই। আগুন ধরিয়ে দিয়েছে মিলিটারি। নওয়াবপুর অবধি রোডের দু’দিকে নরক তখন। কমলা রঙের আগুন, সে কি ক্ষুধা তার। গিলে নিচ্ছে গপাগপ সব। আশপাশের বাসাঘর থেকে যে বের হচ্ছে প্রাণভয়ে, গুলি করে মারছে তাদের।
‘কেনে মারে সলীল?’
‘জানিনে রে। তুই বের হবি?’
‘সাব বলছে?’
‘হ। তাঁতীবাজারে লাশ পইড়া আছে নে আরো। যাবি নে?’
‘যামু। ভ্যান কনে?’
‘ভ্যান থুইয়া আইছি। টেরাক দিবে সাব। ভ্যানে অত আঁটে না লাশ।’
বিকেল তিনটার দিকে বিকট এক শব্দে সুবোধের প্রস্রাবের বেগ পেল খুব। ট্রাকে বত্রিশটা লাশ। সাইডে ট্রাক রেখে প্রস্রাব করতে বসে ডানদিকে তাকাতেই দেখল দূরে কালো ধোঁয়া। সুবোধ সরে বসলো। ড্রেনে একজন ভদ্রলোক পড়ে আছেন। মাথা ড্রেনের ভেতর, পা একটা ড্রেনে, অন্যটা রাস্তায়। ভদ্রলোকের দুই হাত ছড়ানো দু’পাশে। মৃত্যুর আগমুহূর্ত অবধি ড্রেন থেকে উঠার চেষ্টা করেছিলেন সর্বাত্মক। প্রস্রাব শেষ হওয়ার পর সুবোধ টেনে তুলল লাশ। গন্ধ বের হচ্ছে গলগল করে। ভদ্রলোকের চোখে চশমা। ফিতে দিয়ে মাথার পেছনদিক প্যাঁচিয়ে বাঁধা চশমার ডাঁট খুলে যায়নি মৃত্যুর পরও। সুবোধ ঢোক গিলল। হাইট পাঁচ ফুট তিন নয়তো?
কৌশিক বসুর শরীর ভারী। ড্রেনের পানিতে পঁচে গলে শরীরটার ওজন হয়েছে আরও দ্বিগুন। পার্শ্ববর্তী বাসা থেকে একজন কিশোর বের হয়ে সাহায্য করল সুবোধকে। কিশোরের মা দরজা সামান্য ফাঁক করে চেঁচিয়ে ডাকলেন।
‘ফিরে আয় রিজভী। ধরিস না ওটা। ফিরে আয় বলছি। আমি বিষ খাবো নয়তো। আয়।’
কিশোর ফিরে গেল না। যতক্ষণ সুবোধ ট্রাকে উঠে না বসলো, কিশোর তাকিয়ে রইল একদৃষ্টিতে। সুবোধ চোখ বুলালো চারপাশে। তারপর চোখ বন্ধ করল। মিটফোর্ড হসপিটালের লাশঘর, শাঁখারী বাজার, তাঁতী বাজার ও জজকোর্ট এলাকা থেকে কুড়িয়ে নেওয়া লাশের সংখ্যা সুবোধ গুনতে পারলো না। গুনার কাজও নেই। সুবোধের গন্তব্য স্বামীবাগ আউটফল। ওখানে আগ থেকেই গর্ত খুঁড়ে রাখা হয়েছে। ট্রাক উপুড় করে লাশ ফেলার পর চাপা দেওয়া হবে। উপরে দুই পাক চলবে বুলডোজার। কাজ শেষ। স্বামীবাগ আউটফলে সুবোধ ছয় ট্রাক লাশ ফেলে আসলো সাতাশ তারিখ রাত হওয়ার আগ অবধি। শেষ ট্রাকের প্রায় সবাই নারী। নগ্ন, অর্ধনগ্ন। হাত নেই, পা নেই। কারোর বুক ঝাঁঝরা করা তো কারোর যোনীতে বেয়নেটের খোঁচা। বাংলা মদও কার্যকারিতা হারালো বোধহয়, সুবোধ নাক টিপে লাশ গুনতে গিয়ে দেখল, একজন নারী অন্তঃসত্ত্বা। ফোলা পেটের উপর বেয়নেট দিয়ে খোঁচানো হয়েছে। নারী মৃত্যুর আগঅবধি দুই হাতের তালু চেপে টিপেটুপে যথাসম্ভব চেষ্টা করেছে ফুটো বন্ধ করার। শেষদিকে ফুটোয় ওড়না গুজে দিয়েছে। সুবোধ না বুঝেই ওড়নাটা টান দিলো। ফুটোর রক্তের সঙ্গে লেগে শক্ত হয়ে এঁটে বসা ওড়না সামান্য নাড়াচাড়া পেতেই গলগল করে ভিজে গেল নতুন রক্তে আবার। মানুষ মরে গেলে নতুন রক্ত আসে কোত্থেকে! কাঁপা কাঁপা হাতে সুবোধ গুঁজে দিলো ফুটো।
.
ত্রিশ তারিখ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল থেকে একটা ফোন আসলো। সুবোধ তখন পৌরসভার অফিসে দাঁড়িয়ে। সঙ্গে সলীল সহ আরও বেশ কয়েকজন। ফোনটা গুরুত্বপূর্ণ। সুবোধ কান পাতল।
‘জি স্যার। জি।’
ফোন করেছেন ভারপ্রাপ্ত পাকিস্তানী সেনাদের একজন মেয়র। তিনি বেশ অসুবিধেয় আছেন। নিঃশ্বাস নিতে পারছেন না। রোকেয়া হলের আশপাশে পঁচা লাশের গন্ধ। সরানোর জন্য ডোম দরকার। সময় তিন ঘন্টা। সুবোধ চটজলদি গিয়ে পৌঁছুলো রোকেয়া হল। কোথাও কোনো লাশ নেই। গন্ধ কোত্থেকে আসে। চারতলার ছাদে উঠে পাওয়া গেল লাশ। একজন তরুণী। বয়স উনিশ-বিশ। গায়ে কাপড় নেই। সুবোধ কোলে করে নিয়ে এলো তাকে। তরুণীর চোখ খোলা। নাক থেঁতলানো। দুই নাকের ছিদ্র দিয়ে রক্তের দু’টো ধারা দুই গাল গড়িয়ে কানের ছিদ্রে ঢুকেছে। আহারে!
সার্ভেন্ট কোয়ার্টারের ভেতর থেকে উদ্ধার করা হলো নারী পুরুষ মিলিয়ে পনেরটা লাশ। সুবোধ লাশ দেখে স্বস্তি পেল। সবার চোখ বোজা। এদের জাগিয়ে মারা হয়নি। ঘুমের মধ্যেই মেরে ফেলা হয়েছে। শান্তির মৃত্যু। এমন আরামদায়ক মৃত্যু হলের কার ভাগ্যেই বা জুটেছে আর? একটা কক্ষে পাওয়া গেল আট’টা লাশ। সবুজ কুঁড়ি। কয়দিন আগেও ডামি রাইফেল হাতে কুচকাওয়াজে অংশ নিয়েছে ওরা। আহারে জীবন! সলীল ডাক দিলো, শিববাড়ির তেতলায় চারটা লাশ পাওয়া গেছে। একজন অধ্যাপক, তার স্ত্রী ও দুই পুত্র সন্তান। ট্রাক নিয়ে সুবোধ ওদিক ছুটল। শিববাড়ি থেকে চারটা লাশ তোলার পর আর জায়গা রইল না ট্রাকে। ট্রাক ছুটল স্বামীবাগ আউটফল।
‘সুবো।’
‘ক।’
‘নদীত ভাইস্যা যাওন লাশগুলা তুলন লাগবো নে দেকি।’
‘সাব কইছে?’
‘হ।’
ট্রাক ছুটল বুড়িগঙ্গার পাড়ে। সলীল জলে মুখ ধোয়ার জন্য হাতে নিয়ে ফেলে দিলো ফের। এই জল শুদ্ধ না। কত লাশ ভাসছে জলে। সুবোধ টেনে টেনে তুলল। সলীলও হাত লাগালো। বুড়িগঙ্গায় ভাসতে থাকা লাশগুলোর অধিকাংশই যুবক। তাগড়া জওয়ান। হাত পা বাঁধা। চোখ বাঁধা। সোনার টুকরো ছেলে কত। সুবোধ জীবিত থাকাকালীন এদের দেখেছে শ' দুইশো বার। ক্যাম্পাসের আশপাশ পুরোটাই মাতিয়ে বেড়াতো। সিগারেট ফুঁকতো। কী কী সব লেখা ব্যানার হাতে নির্ভয়ে নেমে যেত রাস্তায়। হৈ হৈ যুবক সব আজ চুপ। ভাসছে জলে। ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া বুক। সারাদিন ট্রাকে লাশ তুলে গেল সুবোধ। একশো পঞ্চাশটা লাশ তোলার পর শরীর আর কুলোলো না। সুবোধদের বিশ্রাম দেওয়া হলো। এক রাত্তির। ঘুমাও সুবোধ। সুবোধ ঘুমাতে পারলো না। শেষ রাত্তিরে চোখ লেগে আসলো যখন, একটা বাচ্চা মেয়ে তার শার্টের কোণা ধরে টানছে তখন। সেকি! সুবোধ হকচকিয়ে ঘুম থেকে উঠল।
রোকেয়া হল, জগন্নাথ হল ও ইকবাল হল। পরদিন ইকবাল হলে পৌঁছে সুবোধ দেখল, আশপাশে বেশ মাংস পুড়ার গন্ধ। স্থানীয়রা জানালো, গন্ধটা পাঁচ দিন পুরনো। পঁচিশে মার্চ রাত্তিরে ইকবাল হলের অধিকাংশ ছাত্রের লাশ পুড়িয়ে ছাই করে ফেলা হয়েছে। গন্ধ থেকে গেছে শুধু। এই হলে কোনো অক্ষত লাশ নেই। প্রাণভয়ে আশপাশ হতে জগন্নাথ হলে ঢুকে পড়ে পাকিস্তানী মিলিটারির গুলি আর বেয়নেটের খোঁচায় মরে যাওয়া দশ বারো জন নারী ও পুরুষের লাশ ট্রাকে তোলার পর সুবোধের ইচ্ছা করল দৌড়ে পালাতে এই জায়গা হতে। বিশ্ববিদ্যালয়। পবিত্র শিক্ষাঙ্গন। এইখানে শহীদ মিনারের সামনে সারি সারি লাশ পড়ে থাকবে কেন?
আসার পথে সুবোধ ঢাকা হল থেকে আরও চারটা লাশ ট্রাকে তুলে নিলো। মোহাম্মদপুর জয়েন্ট কলোনি থেকে সাতটা লাশ। সবক’টাই পঁচে যাওয়া। এত গন্ধ। সুবোধ মদ গিলল ট্রাকের ভেতর বসে কয়েক ঢোক। মদের উৎকট গন্ধ ছাড়া অন্য কোনো গন্ধ নাকে না আসুক। হুঁশ চলে যাক তার। হুঁশ চলে যাক।
.
জগন্নাথ হল সংলগ্ন বাড়ি। কর্তার নাম মধুসূধন দে। রাত্তিরে আচমকা ঘুম ভাঙ্গল গোলাগুলির শব্দে। জগন্নাথ হল থেকে ভেসে এলো ছাত্র-ছাত্রীর আর্তচিৎকার। সেকি! মধুসূধন কিছু বুঝে উঠার আগেই তার বাসার দরজায় ধড়াম ধড়াম। বড়ো পুত্র সদ্য বিয়ে করেছে। তা জেনে মিলিটারির কী কাজ। মুহূর্মুহু গুলি চলল। বড়ো পুত্র ধপাস করে পড়লেন মেঝের ওপর, ক্ষণিক পর নববধূও। মধুসূধন চেঁচিয়ে সামনে গেলেন। মিলিটারি বন্দুক সামনে বাড়াতেই মধুসুধনের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী সামনে এসে পড়লেন। স্বামীকে হত্যা করতে দেবেন না তিনি। অনাগত বাচ্চাটার ওপর যদি দয়া হয়। মিলিটারি একবার ফোলা পেটের দিকে তাকালো তার। তারপর বেয়নেট ছুঁড়ল। কলা গাছের পাতায় ধারালো ছুরি চালালেও অমন করে পড়ে যায় ডাল, যেভাবে টুপ করে হাত কেটে পড়ল স্ত্রীর। মধুসূধন একবার তাকালেন সামনে। অনর্গল গুলি চলল তারপর। স্বামী ও অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী দুইজনই রক্তাক্ত, মেঝেতে লুটিয়ে পড়লেন।
মধুসূধনের বাড়ির সামনে গিয়ে সুবোধ অনুভব করল পেট উল্টে বমি আসছে তার। একজন ডোম লাশ দেখে বমি করে না। সলীল যদি জানতে পারে, লাথি মারে তাড়াবে। ডোম হবে শক্ত। প্লাস্টিক। সুবোধ ছিল প্লাস্টিক। কত পঁচা গলা লাশ তুলেছে কত জায়গা থেকে, কত কাটাছেঁড়া করেছে, কখনও বমি পায়নি। মদ বোধহয় দুই নাম্বার। কাজ করছে না ঠিকঠাক। সুবোধ নাক টিপে লাশ তুলল।
এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে সুবোধ’রা শুধুমাত্র বুড়িগঙ্গা থেকেই লাশ তুলল দৈনিক দেড়শো করে। কতরকম লাশ। বিচিত্র পেশা তাদের, ভিন্ন ভিন্ন। আলাদা বয়স। আলাদা ভাবনা চিন্তা, আলাদা জায়গায় বড়ো হওয়া, আলাদা কথা বলার স্বর। অথচ আজ এক। সবাই ভাসছে বুড়িগঙ্গার জলে। সুবোধ টেনে টেনে তুলল লাশ। ট্রাক ভরাট করল। ছুটল স্বামীবাগ আউটফল।
পঁচিশে মার্চ থেকে এপ্রিল পর্যন্ত শুধুমাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আনুমানিক তিনশো লাশ সরানো হয়। কিছু লাশ পুড়িয়ে দেয় মিলিটারি। কিছু লাশ গর্ত খুঁড়ে ক্যাম্পাসেরই কোথাও চাপা দিয়ে ওপরে বুলডোজার চালানো হয়। কিছু লাশ সরিয়ে আনা হয় স্বামীবাগ আউটফলে। কিছু লাশ ভাসিয়ে দেওয়া হয় বুড়িগঙ্গার জলে। আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয় রোকেয়া হলে। আগুন থেকে বাঁচতে যখন ছাত্রীরা দৌঁড়ে বের হয়, অনর্গল ফায়ার হয় তারপর। যারা বেঁচেছিল, তাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি নিয়ে যাওয়া হয়েছিল আশপাশ তল্লাশী চালিয়ে বাসা হতে টেনেহিঁচড়ে বের করে আনা অসংখ্য তরুণী। পরবর্তীতে যারা পড়ে ছিল কোনো রাস্তার পাশে, ড্রেনে, জঙ্গলে, বাড়ির আশপাশে, ডাস্টবিনে কিংবা ক্যাম্পাসের কোথাও। ইকবাল হল সংলগ্ন নীলক্ষেত আবাসিক এলাকায় লুকিয়ে ছিল ইপিআর থেকে পালিয়ে আসা সদস্য বেশ কয়েকজন। মিলিটারি খুঁজে খুঁজে মেরে ফেলে তাদের। সুবোধের দুর্ভাগ্য হয়েছিল একটা বাসার ছাদে ওঠার। তেইশ নাম্বার ছাদ। পুরো ছাদজুড়ে লাশ ছিল ত্রিশটা। ভারী ভারী অস্ত্রের সম্মুখে নিতান্তই অসহায় আত্মসমর্পণ করা এই ত্রিশটা লাশের মধ্যে কারোর হাত নেই, কারোর পা নেই, কারোর চোখ উড়ে গেছে, কারোর ঘাড় ছিঁড়ে ঢুকে গিয়েছে বেয়নেট। সুবোধের পুরো একবেলা লাগলো সবগুলো লাশ ট্রাকে তুলতে। ট্রাকের টায়ার বসে গেল মাটির সঙ্গে চেপে একদম। এমন ভারীও লাশ হয়!
.
এপ্রিলের একুশ তারিখ।
সুবোধ দাঁড়িয়ে রইল বুড়িগঙ্গার পাড়ে। পাশে সলীল। সলীল এমনিতে খুব ভীতু। অথচ মাথা সবচেয়ে বেশী উঁচু এখন তার। অদূরে রাইফেল হাতে দাঁড়িয়ে থাকা মিলিটারির দিকে তাকিয়ে সুবোধ ফিসফিস করল, ‘ডর পাইছিস?’
‘না।’
‘ডর পাইস না। দিদি ডর পাইলো তহন? পাইস না।’
সুবোধের হাত পাঁ বাঁধা। সলীলেরও। তারা দিদির থেকে অনুপ্রাণিত। স্বামীবাগ আউটফলে এক দিদি দাঁড়িয়ে ছিল গতকাল। হাতে পতাকা। পতাকার তিন রঙ। সবুজ, লাল ও সোনালী। সবুজের ভেতর লাল, লালের মধ্যে ছোট্ট একখানা মাত্রচিত্র, সোনালী রঙা। এই পতাকা উড়িয়েছিল ছাত্ররা মার্চ মাসের দুই তারিখ। কয়েকজন ক্ষীপ্র তরুণ। তারপর বারংবার এদিক ওদিক উড়েছে পতাকা। এপ্রিলের একুশ তারিখ উড়ল ঐ জায়গায়। স্বামীবাগ আউটফল। নারীকে বেয়নেটের সামনে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলো। নারী নির্ভয়ে জবাব দিয়ে গেলেন। এই মাটির নিচে শায়িত তার স্বামী। কৌশিক বসু। তিনি এই মাটি ছেড়ে যাবেন না। মিলিটারি নারীর ইচ্ছা পুরণ করল। বেয়নেট ঢুকিয়ে দিলো পেটের ভেতর। দুই উরু দুই পাশে টেনে ধরে যোনী বরাবর বেয়নেট ঢুকিয়ে পেটের অর্ধেক পর্যন্ত নিয়ে আসার পর নারী নাকে মুখে রক্ত তুলে ছটফটিয়ে মরে গেল। তাকে ঐখানেই একটা গর্ত করে পুঁতে ফেলা হলো। নারী কী করে জানলো এই জায়গার ব্যাপারে?
সুবোধ হাত ধরল সলীলের। সলীল হেসে ফিসফিস করল, ‘এদ্দিন আমরা লাশ তুলছি, আমগো লাশ তুলবে ক’নে সুবো?’
গর্জে উঠল রাইফেল। বুড়িগঙ্গার জলে টুপ করে পড়ল দু’টো দেহ। ক্ষণিক সময় পর লাল হয়ে এলো দেহের আশপাশ ঘিরে চুম্বনরত জলের রঙ। দু’টো শরীর ভেসে গেল দূরে কোথাও। গন্তব্য জানা নেই কারোর।
.
উনিশ’শো আটাশি সাল।
ডিসেম্বর। পাঞ্জাব। গভর্নর হাউস। সামনে সোফায় উপবিষ্ট জেনারেল টিক্কা খান। উনিশ’শো একাত্তর সালের সতেরই মার্চ মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী ও মেজর জেনারেল খাদিম হুসাইন খানকে এই ব্যক্তিই ডেকে পাঠিয়েছিলেন কমান্ড হাউজে। জানিয়েছিলেন, মুজিব আর ইয়াহিয়ার আলোচনার কোনো প্রত্যাশিত অগ্রগতি নেই। ইয়াহিয়ার তরফ থেকে গ্রিন সিগন্যাল পাওয়া গেছে। যেকোনো সময় মিলিটারি অ্যাকশনের জন্য প্রস্তুত থাকা দরকার। এবং পরদিন ক্যান্টনমেন্টে খাদিম হুসাইন রাজার বাসায় সমস্ত সকাল বসে একটা নকশা এঁকেছিলেন। তিনজন মিলেই। হালকা নীল কাগজের অফিশিয়াল প্যাডের পাতায় একটা পেন্সিল দিয়ে আঁকা হয় ষোলটি প্যারা সম্বলিত পাঁচ পৃষ্ঠা দীর্ঘের পৃথিবীর ভয়ংকরতম গণহত্যার নীল নকশা। নাম, অপারেশন সার্চলাইট। নকশা আঁকার পর দায়িত্ব বন্টন করা হয়। ঢাকা এলাকা রাও ফরমান আলীর ওপর বর্তায়, বাকিটা খাদিম হুসাইন রাজা। কমান্ড হাউজ থেকে অনুমোদন দেওয়া হয়। নকশা ঠিকঠাক, শুধু কখন বাস্তবায়ন হবে, ঐ সময়ের উল্লেখ নেই। চব্বিশে মার্চ দুইটা হেলিকপ্টার নিয়ে জেনারেল রাও ফরমান আলী যশোর, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে যান। বিগ্রেডিয়ার কমান্ডারদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। প্রস্তুত থাকতে বলেন। যেকোনো সময় অ্যাকশন। সময়ের অপেক্ষা। অপেক্ষা একটা ফোনকলের। ইয়াহিয়া ঢাকা ছাড়ল। অতঃপর এলো ঐ ফোনকল। পঁচিশে মার্চ, সকাল এগারটায়। ফোনের ওপাশ থেকে একটা কণ্ঠস্বর গমগম করে জানালো, ‘খাদিম, আজ রাতেই।’ কণ্ঠস্বরটা ছিল টিক্কা খানের।
সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল রাত একটা। গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকাবর্ষে তারিখটা, ছাব্বিশ।
তার উনিশ বৎসর পর, পাঞ্জাব গভর্নর হাউসের উঁচু একখানা সোফায় উপবিষ্ট জেনারেল টিক্কা খান। সামনে সাংবাদিক।
ওখানকার একজন সাংবাদিক বাংলাদেশ থেকে গিয়েছেন মাত্র। জিজ্ঞেস করলেন, ‘ঢাকায় গণহত্যা ঠিক কোন সময় থেকে শুরু করেছিলেন আপনি?’ জেনারেল টিক্কা খান কান চুলকাতে চুলকাতে মিষ্টি করে হাসলেন পুনরায়। বললেন, ‘জগন্নাথ হলে কিছু উগ্র ছেলেপেলে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল তখন। আমরা তার প্রতিরোধ করেছি। তাদেরও মরেছে, আমাদেরও মরেছে। দু’পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত। গণহত্যা নয়। মুখোমুখি সংঘর্ষ বলতে পারেন।’
খোদ পাকিস্তান সরকার থেকে প্রকাশিত দলিল ‘পূর্ব পাকিস্তানে সঙ্কট’-এ বলা হয়েছে, ‘১৯৭১ সালের পয়লা মার্চ থেকে পঁচিশে মার্চ রাত পর্যন্ত এক লাখেরও বেশী মানুষের জীবননাশ হয়েছিল।’ মার্কিন সাংবাদিক রবার্ট পেইন লিখেছিলেন শুধুমাত্র পঁচিশে মার্চের রাতেই তিন হাজার গ্রেফতার আর সাত হাজার মানুষ হত্যা করা হয় ঢাকায়।
মুখোমুখি সংঘর্ষ !
বেঁচে থাকলে লজ্জায় মরে যেত। লাশের প্রকৃত সংখ্যা ওর জানা। ভাগ্যিস সুবোধ ভেসে গিয়েছিল বুড়িগঙ্গার জলে। টিক্কা খান মুচকি হেসে প্রসঙ্গ পাল্টান। তার ত্রিশ বৎসর পরও টিক্কা খানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কোনো এক প্রজন্ম প্রসঙ্গ পাল্টায়। আহারে সোনা রঙা মানচিত্র আমার। ভুলতে বসেছে রক্ত। তোমার যা দাগ, কোথায় গিয়ে শান্তি পাবে? কোন জলে ধুয়ে নেবে ক্ষত? সব নদীজলেই যে শ’ দুইশো রক্তাক্ত সুবোধ ভেসে উঠে রোজ।
.
রেফারেন্সঃ
ক) ‘ছাব্বিশে মার্চ রাতে ঢাকায় গণহত্যা’- মুসা সাদিক (দৈনিক ইত্তেফাক/২৬-৩-১৩)
খ) মেঘনা গুহঠাকুরতা
গ) ‘স্বাধীনতার পঞ্চাশ বৎসর: যেভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছিল অপারেশন সার্চলাইট’- সাইয়েদা আক্তার (বিবিসি নিউজ/২৫-৩-২১)
ঘ) ‘আ স্ট্রেঞ্জার ইন মাই ঔন কান্ট্রি ইস্ট পাকিস্তান, ১৯৬৯-৭১’- মেজর জেনারেল খাদিম হুসাইন রাজা
ঙ) ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’- সিদ্দিক সালিক
চ) ‘কী ঘটেছিল একাত্তরের পঁচিশে মার্চে?’- (চ্যানেল আই অনলাইন/২৫-৩-১৭)
ছ) ‘রাজারবাগ থেকে লাশ সরানো হয় ট্রাকে ট্রাকে’- শরিফুল হাসান (প্রথম আলো/২-৩-১৭)
জ) ‘স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস’- ডঃ আবু মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন
ঝ) ‘দ্য ক্রুয়েল বার্থ অফ বাংলাদেশ’- আর্চার কে ব্লাড
ঞ) ‘ভয়াল ২৫ মার্চ: লাশের স্তুপে ভরে যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস’- সাখাওয়াত আল আমিন (চ্যানেল আই/২৫-৩-১৭)
ট) ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হত্যাযজ্ঞ নজিরবিহীন’- শরিফুল হাসান (প্রথম আলো/১-৩-১৭)
ঠ) ‘রক্তাক্ত ইতিহাস পেরিয়ে ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়’- জোবায়ের আলী জুয়েল (যায়যায়দিন/১৬-১২-২০)
Leave a comment
Your email address will not be published. Required fields are marked *
