Buy Now

Search

শার্টের শেষ বোতামটি

শার্টের শেষ বোতামটি

সাহেবের সাথে আমার প্রেমের গল্পটা মধ্যবিত্তের ডাল-ভাতের মতনই সরল, সাদামাটা তবে তৃপ্তিময় ছিলো। দু'জনেই তখন পড়াশোনার পার্ট প্রায় চুকিয়ে ফেলার অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। সাহেব হন্যে হয়ে চাকরি খুঁজছিলো আর আমার পরিবার আমার জন্য পাত্র খুঁজছিলো। আমাদের ডাল-ভাতের মতন নরম প্রেমে তখন এই দুই পক্ষের এক পক্ষের খোঁজাখুঁজি সমাপ্ত হলেই একটি ভিন্ন গল্প রচনা হওয়ার আভাস ভাসছিলো। সাহেব চাকরি পেলে আমাদের ডাল-ভাতের প্রেম একটি থালা খুঁজে পেতো সংসার নামক। অন্যদিকে আমার পরিবার সঠিক পাত্র পেলে সেই ডাল-ভাত ভেসে যেতো কারো এক গ্লাস জল ঢেলে দিয়ে খাবারের পাত ছেড়ে উঠে যাওয়ার মতন বিষণ্ণতায়।
আমাদের পাশাপাশি বাড়ি। বারান্দায় দাঁড়ালেই দেখতাম সাহেব ওর জানালার সাথে লাগোয়া পড়ার টেবিলটায় বসে আছে। এই দৃশ্য ছিলো বহু বছরের পুরোনো ইতিহাসের মতনই খোদায় করা। প্রেমটাও হয়েছিলো এই জানালা-বারান্দার নৈকট্যতার জন্য।
বাবার যখন সরকারি চাকুরিতে বদলী হলো তখন আমি ক্লাস নাইনে। সাহেব পড়তো দশম শ্রেণীতে। পুরোনো একটি বাড়িতে উঠলাম আমরা। দেয়ালের রঙ মেটে হয়ে, চুন খসে পড়েছিলো। এবড়োখেবড়ো ছিলো প্রাচীর ঠিক আমার আর সাহেবের প্রথম পরিচয়টার মতন।
বাড়িটাতে এসেই আমার পছন্দ হয়েছিলো পূর্ব দিকের কাঠের বারান্দা দেওয়া রুমটি। বারান্দায় কোনো শক্ত শিক না থাকায় আমাদের প্রেমের লতাপাতাগুলো অনায়াসেই ডাল-পালা মেলে ছড়িয়ে উঠতে পেরেছিলো। প্রথম যেদিন রুমটায় ঢুকেছিলাম মুগ্ধ হওয়ার মতন কিছুই ছিলো না একটি বেলীফুলের গাছ ব্যতীত। কী সুঘ্রাণ আসছিলো গাছটি থেকে! সেই মন মাতানো ঘ্রাণটিই সেই অগ্রহায়ণে আমার মন কেঁড়েছিলো। পরের অগ্রহায়ণে খেয়াল করলাম ওখানে কেবল বেলীফুলই আকর্ষনীয় ছিলো না, আকর্ষণীয় ছিলো সাহেবের মন ভোলানো চাহুনিটাও।
আমি যখন আনন্দ নিয়ে বারান্দা দেখছিলাম আবিষ্কার করেছিলাম ঠিক আমার চোখ বরাবর অন্য দালানের একটি বন্ধ জানালা। সবুজ রঙের কাঠের জানালাটি আমার প্রথম দিনের আগ্রহের বিশেষ কারণ হয়নি। সপ্তাহ খানেক সেই বন্ধ জানালাটি বন্ধ দেখে আমি ভেবেই নিয়েছিলাম সামনের বিল্ডিংটির এই ঘরটায় কেউ বোধহয় থাকে না। তাই বন্ধ জানালা দেখাটাই আমি অভ্যাস হয়ে উঠেছিলো। অবাক হয়েছিলাম বরং সপ্তাহখানেক পর জানালাটিকে খোলা পেয়ে। সেদিন শুক্রবার ছিলো। সকালে স্কুলে যাওয়ার তাড়া থাকতো বিধায় বেলা করে ঘুমানো হতো না। ভোরে উঠার অভ্যেস ছিলো। সেই মোতাবেক শুক্রবারেও ভোরে আমার ঘুম ভেঙে যায়। ভোরের মোলায়েম হাওয়ার লোভে আমি বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। সূর্য সবে আমার কাঠের বারান্দাকে দালানের ফাঁক গলিয়ে ছুঁয়ে দিচ্ছিলো অবাধ্য প্রেমিকের মতন। ঠিক তখনই আমাকে অবাক করল সবুজ জানালাটি। যা খোলা ছিলো সেদিন। জানালাটিতেও শিক ছিলো না মোটেও। তাই সামনের দৃশ্যটি একদম সুস্পষ্ট। দেখলাম একটি পড়ার টেবিল পাতা সেখানটায়। একটি কাঠের চেয়ারও আছে সেখানে। সেই চেয়ারটিতে একটি ছেলে বসে আছে অন্যমনস্ক ভাবে। চোখগুলো টানছে তার। দৃষ্টি আমার দোতালা বিল্ডিং এর পেছনের সুবিস্তীর্ণ আকাশে। মাথাভর্তি চুল এলোমেলো হয়ে আছে, কিশোর মুখে সবে দাড়ি-গোঁফ মাথা চাঁড়া দিয়ে উঠছে উঠছে ভাব। মুখটা তুলনামূলক বিষণ্ণ। যেন অতটুকু জীবনে কোন অকাল দুঃখ চেপে ধরেছে তাকে। সেই নীল বিষাদে ডুবে থাকা চোখ, অন্যমনস্ক থাকা শ্বাস-প্রশ্বাস আমার গায়ে শিরশির করে লাগছিলো। আমি চোখ ফিরিয়ে নিয়েছিলাম। অল্প বয়সী মেয়ে এমন কিশোর ছেলের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকাটা যে মোটেও শোভনীয় নয় তাই। সেদিন আমার গায়ে সূর্যের আলো পড়ল না। আমি চলে এসেছিলাম ঘরে। ছেলেটা আমায় দেখে নিলে কী না কী ভাববে সেই চিন্তায়।
এরপরের দিনগুলোতে আবার দেখলাম সেই বন্ধ জানালা। ধূলো পড়েছে জানালার সবুজ রঙটিতে।
নভেম্বর শেষ হলো। আমি মামার বাড়ি গেলাম। ভুলে গেলাম সেই উদাস দু'টি চোখের কথা। ভুলে গেলাম সেই বিষণ্ণ মুখটির কথা। ঐ এক মুহূর্তের দেখা আর কতক্ষণই বা মনে থাকবে?
মামার বাড়ি থেকে যখন ফিরলাম তখন ডিসেম্বর প্রায় শেষ হবে। শীত পড়েছে জেঁকে। কুয়াশায় আর সকাল দেখা যেতো না। ভেরের সূর্য এসে হামাগুড়ি দিতো আমার বারান্দায় দুপুরে। সকালে তখন সূর্য দেখার পালা চুকেছে। ঘুম থেকে উঠতাম কিছুটা বেলা করেই। সেদিনও তাই। বেলা করে ঘুম থেকে উঠে শুনতে পেলাম বসার রুমে মা ব্যতীত আরেকজনেরও কণ্ঠ ভেসে আসছে। আমাদের ঘরে আমি, মা, বাবা আর ছোটো বোনটা ছাড়া কেউই নেই। তাই নতুন কণ্ঠের মানুষটিকে দেখার জন্য একটু কৌতূহলীই হয়েছিলাম। তখন বয়সটাই এমন ছিলো!
বিছানা ছেড়ে দপদপ করে বসার রুমে যেতেই দেখলাম শ্যামলাটে বর্ণের লম্বাটে মুখের একটি মায়াময়ী নারী বসে আছেন আমাদের আধভাঙা সোফাটায়। হাসছেন মায়ের সাথে কোনো গল্প বলার ছলে। শ্যামলা মুখে কী সুন্দর মায়া! দেখে যেন মনে হলো তার গায়েও মায়ের মতন একটি ঘ্রাণ আছে। যা আমার নাক নয় চোখ অনুভব করতে পারছে।
মহিলাটিও কথার এক ফাঁকে আমাকে দেখলেন। তার হাসিটি আরও অধিক প্রসস্থ করে আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“তুমিই কি তবে আমোদিনী? বড্ড মিষ্টি দেখতে তো! এখানটায় আসো।”
মহিলাটিকে আমি তখন অব্দি চিনতাম না। তা-ও এগিয়ে গিয়েছিলাম। গুটিশুটি হয়ে বসেছিলাম তার গা ঘেঁষে। তার মলিন কাপড়ের উপর জড়ানো ঘিয়ে রঙের শালটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। মা আমাকে আগ বাড়িয়ে পরিচয় করিয়ে দিলেন,
“সুখী, উনি আমাদের বরাবরের বিল্ডিং এর দোতালায় থাকেন। তোমার আন্টি। ঐ যে সবুজ জানালাটার ঘরটা দেখো না? ওখানটাতেই থাকেন। আমার রান্নাঘর আর তোমার আন্টির রান্নাঘর বরাবর। সেখান থেকেই আমাদের পরিচয়। দেখো না তোমার আন্টি পিঠে নিয়ে এলেন।” শেষে কথাটি বলার সাথে সাথে মা টেবিলে ইশারা করে পিঠাও দেখালেন।
আমি যদিও খেজুরের গুড়ে ডুবে থাকা পুলিপিঠার দিকে তাকিয়ে ছিলাম কিন্তু আমার চোখে ভাসছিলো সেই সবুজ জানালাটি। যেটি বন্ধ থাকে সবসময়। এত দিনে একটিবার কেবল খোলা দেখেছিলাম। আমার মুখ ফসকে তখনই বেরিয়ে গিয়েছিলো সেটি,
“সবুজ রঙের জানালার ঘরটি আপনাদের, আন্টি? সেটি বন্ধ রাখেন কেন তাহলে সবসময়?”
ফট করে আমার মুখ থেকে হড়বড়িয়ে এমন প্রশ্ন বের হয়ে যাবে আমিও বুঝতে পারিনি। প্রশ্নটি করে নিজেই লজ্জা পেয়েছিলাম। মা চোখ রাঙিয়ে তাকিয়ে ছিলেন সেজন্য। কিন্তু আন্টি মোটেও রাগ করেননি। বরং বেশ হাসিখুশি মেজাজেই উত্তর দিয়েছিলেন,
“ওটা আমার ছেলে- সাহেব এর রুম, আম্মু। ও জানালা খোলা পছন্দ করে না। অন্ধকার রুমে বসে থাকতে ও পছন্দ করে।”
শেষের বাক্যটি কেবল যে আমাকে অবাক করেছিলো তা নয়। মাকেও অবাক করেছিলো বেশ। বুঝতে পারলাম মা এতদিন কথা বললেও ছেলের এই অন্ধকার রুমের গল্পটি বোধহয় জানেন না।
আমাদের অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে আন্টিই বললেন,
“আসলে ও গতবার দশম শ্রেণির বোর্ড পরীক্ষায় একটি সাবজেক্টে ফেল করেছিলো। এরপর থেকেই কেমন যেন হয়ে গিয়েছে। খেলতে যায় না, খায় না, সারাদিন রুম অন্ধকার করে চেয়ারটায় বসে থাকে। পড়াশোনা ভীষণ ভালোবাসতো কি-না! তাই মেনে নিতে পারেনি এই ফলাফল।”
মা বড়ো দুঃখ প্রকাশ করলেন সেই কথা শুনে। আমার দুঃখ হয়েছিলো যদিও কিন্তু প্রকাশ করতে পারিনি। তবে একটু অবাকও হয়েছিলাম। সামান্য পরীক্ষায় ফেল করাতে একটি ছেলে এমন হয়ে গিয়েছে তা আমার মাথায় ধরছিলো না। আমার জীবন তখনও বেশ আমোদেই পরিপূর্ণ ছিলো। সেজন্য তো বাবা শখ করে আমোদিনী রেখেছিলেন। যার জীবনে সুখ আর সুখ। অনন্ত সুখ…
এরপর থেকে সাহেব নামের ছেলেটির সবুজ জানালাটি দেখা আমার একটি অভ্যাস হয়ে উঠেছিলো৷ প্রতিদিন সকালে একবার হলেও তাকাতাম সেই জানালাটির দিকে। মনে মনে ভাবতাম, ওপাশে বন্ধ জানালার পেছনে একটি ছেলে কি এখনও বসে আছে? রুম কি তার আজও অন্ধকার? কী ভাবছে সে? তার কি ভীষণ দুঃখ?
জানুয়ারীর এক বিকেলে কোচিং থেকে ফিরে বসেছিলাম বিছানায়। যেহেতু দশম শ্রেণীতে পড়াশোনার চাপ বেশি তাই জানুয়ারী থেকেই সেই খাটুনি শুরু হয়ে গিয়েছিলো।
বিছানায় বসেই শুনতে পেলাম কারো কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে। একটু উচ্চস্বরেই কথা বলছে কেউ। শীতটা তখনও কাটেনি বিধায় ফ্যান বন্ধ ছিলো। সেই সুবাদেই কথাগুলো বেশ এসে কানে লাগছিলো। আমি আগ্রহী হয়ে বারান্দার দরজায় গিয়ে দাঁড়াতেই দেখলাম সাহেবের জানালাটা খোলা। বিকেলের ম্লান আলোয় ঘরের ভেতরটা তেমন স্পষ্ট দেখা না গেলেও কিছুটা দেখা যাচ্ছে। তবে জানালার পাশে বসা সাহেবকে দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট। পাথরের মতন বসা। চোখগুলো বহুদূরে হারানো। ওর ঘর থেকে পুরুষ কণ্ঠ ভেসে আসছে। কিছু বলছিলো এমন যে,
“মানুষ কি ফেল করে না? তোর মতন এমন ঘরে বসে থাকে? বাহিরে বের হবি না, খাবি না, ঘুমাবি না তো করবি কী? এখন বলছিস পরীক্ষাও দিবি না! আর আছে ছয়টা দিন। পরীক্ষায় না বসলে কী করবি? ফেল করলে মানুষ এমন করে? এমনিই বাহিরে মুখ দেখাতে পারিনি এতদিন। এখন আরও পারবো না।”
শাসনের ভঙ্গিমায় বুঝলাম কণ্ঠটা সাহেবের বাবার। উনি বোধহয় ছেলের উপর রেগে আছেন। কিন্তু আমার খারাপ লাগলো সেই রাগ। ছেলেটাতো এমনিই কষ্টে আছে এই ফলাফলে তাকে আবার এমন করে কথার ঘা দেওয়ার কী দরকার?
সাহেবের মা মমতাময়ী ছিলেন। তিনি এগিয়ে এসে ছেলের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে স্বামীকে শান্ত করতে বললেন,
“এমন করে বলছেন কেন? ও কেমন পড়ুয়া ছাত্র সবাই জানতো। ভাগ্যের উপর কি কিছু আছে?”
লোকটা যেন আরও রাগলেন, “চুপ করো তুমি। তোমার জন্য আজ এই দশা। অলস মেয়েলোক আর মূর্খ মেয়েলোকেরা সংসার ডোবায়।”
বিকেলের নরম আলোয় আন্টির ভঙ্গুর মুখটি বেশ দেখতে পেলাম। সেই প্রথম সাহেবের কণ্ঠ শুনলাম। কিশোরের অত্যন্ত রুক্ষ কণ্ঠ,
“মাকে কিছু বলবেন না, আব্বু। সমস্তই আমার দোষ।”
“হাজারবার বলবো। কী করবি তুই?” ভদ্রলোকের যেন মাথা ঠিক নেই।
সেই বিকেলেই আমাকে অবাক করে দিয়ে কিশোর, বিষণ্ণ সাহেব তার অন্য রূপ দেখালো। তার সামনে থাকা টেবিল ল্যাম্পটি জোরে মাটিতে ফেলে দিলো। সেই শব্দ তীক্ষ্ণ ভাবে ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে। কেঁপে উঠলেন ভদ্রলোক। আন্টিও কাঁপলেন। দেখলাম অগ্নিশর্মা রূপ ধরা সাহেব হনহনিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে ঘর থেকে। পেছন থেকে আন্টি ডাকছেন, আঙ্কেল ধমকাচ্ছেন কিন্তু ও জানালার ওপাশে থাকা অন্ধকারে মিলিয়ে গেলো। সেদিন জানলাম সাহেব কেবল বিষণ্ণ নয় অতি রাগী ছেলেও। তবে কথা খুব কমে বলে। পুরোই যেন আমার বিপরীত। আমি আমোদিনী আর ও বিষাদপ্রিয়।
সেই দিনের পর টানা সপ্তাহখানেক সাহেবের রুমের জানালা খোলা ছিলো অথচ ঘরটায় সাহেব ছিলো না। হা করে খোলা জানালার দিকে প্রায় প্রায় তাকিয়ে ভাবতাম সাহেব কি বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছে? আর কি আসবে না? আন্টি কি কাঁদছেন ছেলেকে হারিয়ে? আন্টির জন্য বড়ো মায়া হতো। সাহেবের জন্যও হয়তো হতো! বুঝতাম না।
ফেব্রুয়ারীর আট তারিখ।
আমি বারান্দার দরজায় বসে রুমাল সেলাই করছিলাম। সেলাইয়ের কাজে পটু ছিলাম বেশ। সেদিন শুক্রবার ছিলো। ঝলমলে দুপুর। একটি খট করা শব্দে আমার ধ্যান চ্যুত হলো। ঘাড় ঘুরিয়ে সাহেবদের জানালায় তাকাতেই দেখলাম সাহেব বসা চেয়ারটায়। তার সামনে খাবার এনে রেখেছেন আন্টি। সাহেবকে দেখে ভূত দেখার মতন চমকে গিয়ে ছিলাম। সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম।
আমি দাঁড়াতেই আন্টির নজর আমার বারান্দার দিকে পড়ল। আমাকে দেখেই তিনি একগাল হেসে শুধালেন,
“আমোদিনী যে! কী করছিলে এখানে? সেলাই করছো বুঝি?”
আমার নামটা কেউ এমন আদর করে ডাকলে কী যে ভালো লাগতো আমার! খেয়াল করলাম সাহেবও এক পলক তাকিয়ে ছিলো আমার দিকে। এরপর আবার চোখ নামিয়ে নিয়েছিলো। যেন আমি খুব নগন্য কেউ। অথচ ওর জন্য আমি কতদিন খোলা জানালায় তাকিয়েছিলাম সে খবর কি ওর আছে? ও তো তখন গোটা পৃথিবী সম্পর্কেই উদাসীন।
আমিও আন্টির প্রতিত্তোরে মাথা নাড়িয়ে ছিলাম। আন্টি বেশ প্রশংসা করে, সাহেবকে খেতে বলে রান্নাঘরের দিকে ছুটে গিয়েছিলেন। আঙ্কেল ঘরে থাকলে আন্টি আবার কথা বলতেন না। আংকেলের বিশেষ পছন্দ ছিলো না হয়ত।
আন্টি চলে গেলেও আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। বুঝতে চাইলাম সাহেব কী করে। দেখলাম সহেব আগের মতনই বসা। খাবারের প্রতি তার টান নেই। ভাবুক ভীষণ।
আমি আগ বাড়িয়ে বললাম, “খাবারের প্রতি রাগ দেখাতে নেই। খেয়ে নাও। পেটে খেলেই পিঠে সয়, জানো না? খেলে চকলেট দেবো।”
আমার কথা শুনতেই সেদিন ছেলেটা চমকে গিয়েছিলো। তার ঘরের একান্ত ঝগড়ার মুহূর্ত আমি বুঝে ফেলেছিলাম বুঝতে পেরেই ওর লজ্জা, অস্বস্তি আর রাগ জড়ো হয়েছিলো মুখে। আমার দিকে সরাসরি একপলক তাকিয়ে বলেছিলো,
“অন্যের ঘরের বিষয়ে কথা বলা কিংবা শোনা ব্যাড ম্যানারস, আমোদিনী।”
যেন কত বছরের চেনা ও আমার এমন করে নামটা ডাকল! গায়ে সেদিন অন্যরকম শিহরণ বয়েছিলো। আমার ডাল-ভাত প্রেমের প্রথম উনুন যেন সেদিনই জ্বলেছিলো। সাহেব আমার উত্তরের অপেক্ষা করেনি, মুখের উপর ওর ধূলো পড়া জানালাটা সে কী প্রবল আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে লাগিয়ে দিয়েছিলো!
আমার অপমানিত বোধ হওয়ার কথা থাকলেও আমি নির্লিপ্ত ছিলাম। ওর জন্য তখন আমার মায়া ছিলো। একটি বিষণ্ণ ছেলে যাকে আমার ভীষণ বুঝতে ও বুঝাতে ইচ্ছে হতো। তাই রাগ আসেনি।
আমি ভেবেছিলাম সেদিনের পর সাহেব বোধহয় আর জানালা খুলবে না। কিন্তু সে ভাবনা ভুল প্রমাণিত হলো পরেরদিন ভোরেই। যখন আমি সূর্য দেখতে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম স্কুলের পোশাক পরে দেখলাম সাহেবের জানালাটা খোলা। ও বসে আছে চেয়ারটায়। এবং আমাকে অবাক করে দিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলো,
“তুমি কি রোজই সূর্য দেখো?”
আমি বোকার মতন মাথা নাড়িয়ে ছিলাম।
সাহেব আমাকে চুপ থাকতে দেখে দ্বিতীয় বার বলেছিলো, “খেয়েছিলাম। চকলেট দিলে না তো!”
আমার কাছে সে দিনটি ছিলো অতি বিষ্ময়কর। গতকালকের ছেলেটিই এমন ভরাট স্বরে আমার কাছে চকলেট চাইবে আমি ভাবিনি কখনো। সাহেব যে চকলেটের কথা মনে রাখবে তা-ও অবিশ্বাস্যকর ছিলো।
আমি লজ্জিত ভঙ্গিতে বলেছিলাম,
“স্কুল থেকে ফেরার সময় আনবো। এখন নেই।”
সাহেব শান্ত শিশুর মতন কেবল ঘাড় নাড়িয়েছিলো।
সেদিন সত্যি সত্যিই আমি চকলেট এনেছিলাম। এবং সেই চকলেট সাহেবকে ছুঁড়ে দিয়েছিলাম। এবং বুঝেছিলাম সাহেবও কথা বলতে জানে। ওর কথা গুলো আমার বারান্দার বেলি ফুলের চেয়েও সুন্দর। সেই থেকে আমার কথা শুরু।
সাহেবের মায়ের সাথে আমার মায়ের বেশ ভালো একটা সম্পর্কও হয়ে ওঠেছিলো ততদিনে। আর সাহেবের সাথে আমার। ওর বন্ধু হয়ে ওঠেছিলাম আমি। তাই তো আমার কথায় ও বহুদিন পর ঘরে আলো জ্বালতে আরম্ভ করল। আমার সেলাই করা রুমাল লুকিয়ে পকেটে রাখতে আরম্ভ করল। হাওয়াইমিঠাই এনে দিতে লাগলো আমাকে। সে বছর বোর্ড পরীক্ষা মিস করলেও পরের বছর আমার সাথে বোর্ড পরীক্ষায় বসলো ঠিক।
সবাইকে অবাক করে দিয়ে দুর্দান্ত ফলাফলও আনলো। আমি সে তুলনায় খুবই কম। অথচ আমার আজও মনে আছে, সাহেবের রেজাল্টের খুশিতে আমি আমার ফলাফলের দুঃখ ভুলে গেলাম। মা আমাকে বকলেও গায়ে মাখলাম না। তবে বাবাতো আমাকে কখনো বকেননি তাই সেবারও বকলেন না। কেবল বুঝালেন, ভালো করতে হবে আরও।
সাহেব আর আমার বন্ধুত্ব তখন রূপ নিলো প্রেমে। আমার প্রেমের উনুনে ভাতের হাঁড়ি বসলো তখন। সাহেবের জন্য আমি সেলাই করলাম নিজের হাতে শার্ট। কিন্তু সেখানেই বাঁধলো বিপত্তি। মায়ের কাছে ধরা পড়ে গেলাম। মিথ্যে বললাম যে বান্ধবীর ভাইয়ের জন্য শার্ট বানাচ্ছি। বান্ধবী টাকা দিবে বলেছে। প্রেমে পড়লে একটু আধটু মিথ্যে তো বলতেই হয়! মা মিথ্যেটা বিশ্বাস করলেন না বোধহয়। বললেন যতটুকু বানানো হয়েছে ততটুকুই ফেরত দিতে। আর যেন অন্য কারো জিনিস না বানাই। শেষমেষ বাধ্য হয়ে শেষ বোতামটি না লাগিয়েই সাহেবকে শার্টটি দিয়ে দিই।
সাহেবের কি আর আনন্দ ধরে! বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে সেই শার্ট। বার বার করে বলতে থাকে,
“আমোদিনী, তুমি বানিয়েছো এটা আমার জন্য? অবশ্যই পরব আমি। পরবই পরব।”
আমি তখন লজ্জিত স্বরে বলি, “বুকের কাছের বোতামটা লাগানো হয়নি যে! মা না শেষ করতে দেয়নি কাজটা।”
সাহেবের থোড়াই সেসব নিয়ে মাথাব্যথা ছিলো? ও খুশি মনে বলেছিলো, “লাগিয়ে দিও। আমার কাছে রইলো। বিয়ের দিন রাতে লাগিয়ে দিও কেমন?”
আঠারো বছরের জীবনে বিয়ে শব্দটায় আলাদা কম্পন হলো বুকে। বিয়ে! এই বন্ধনের পরই আমি একেবারে সাহেবের হয়ে যাবো আর সাহেব আমার! এই আনন্দ, এই শিহরণ এত অদ্ভুত কেন? এমন মধুর কেন?
সাহেব ও আমার প্রেম ছিলো তখনও নরম রাতের মতন কোলাহল বিহীন। সাজানো বাগানের মতন সুন্দর।
আমার রাগী সাহেব মাঝে মাঝে শিশুর মতন আবদার করে বলতো, “তুমি আমার থাকবে তো, আমোদিনী?”
আমার বুকটা তখন কাঁপতো, আঁতকে উঠে বলতাম, “কেন থাকবো না? আমি চিরজীবন তোমারই।”
নিজেকে চির জীবনের মতন অন্যের হাতে তুলে দেওয়ার মতন বিরাট সিদ্ধান্ত আমি অকপটেই নিয়েছিলাম। সাহেবের মতন অমন আদর কেই-বা করতে পারতো আমাকে? কেই-বা আমার ভারী ব্যাগ তুলতো সাহেবের মতন? সাহেব যেন তখন ভারী ব্যাগের সাথে আমার সারাজীবনের সমস্ত ভার তুলে নিয়েছিলো গোপনেই। আমার সাহেব, যার বলিষ্ঠ হাতের মুঠোয় আমি দেখতে লাগলাম আমার জীবনের নরম স্বর্গ।
কিন্তু এর মাঝেই বড়ো বিপত্তিটা ঘটল। একদিন সকালে তুমুল হৈচৈ-এ আমার ঘুম ভাঙলো। ধড়ফড়িয়ে উঠে দেখলাম পুরো ঘর খালি। দরজা খোলা। আমি তখন অন্ধের মতন নিচে গিয়ে দেখি রাস্তায় মানুষের ভীড়। সাহেবের বাবা আর আমার বাবার ভেতর ভীষণ হাতাহাতি চলছে। রক্ত এসেছে আমার বাবার ঠোঁটে বেয়ে। সাহেব, ওর মা, ওর বোন মিলে চেষ্টা করছে ওর বাবাকে সরাতে। আমার বোনটা কাঁদছে পাশেই। মা-ও ছাড়ানোর চেষ্টা করছেন। বাবার ঠোঁটের রক্ত দেখে আমার যেন পৃথিবী ঘুরে উঠলো। সাহেবের বাবার বুকে গিয়ে ধাক্কা দিলাম। জড়িয়ে ধরলাম আমার বাবাকে। আমার আদুরে বাবা, আমার কোমল বাবার ঠোঁটের রক্ত আমার মাথা নষ্ট করে দিয়েছিলো। যে বাবা আমাদের সাথে কখনো বড়ো করে কথা বলেননি তার গায়ে হাত দিলেন ঐ মানুষটা? কেন?
সাহেব ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিলো কাঁপতে থাকা আমিটার দিকে। এরপরই এই ঝগড়ার মীমাংসা হলো তীব্র ভাঙনে। সাহেবদের সাথে আমাদের মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়ে গেলো। মায়ের রান্নাঘরের জানালা বন্ধ হয়ে গেলো। সাহেবের জানালা বন্ধ করালেন সাহেবের বাবা। আমার মা আমার বারান্দায় খিল দেওয়ালেন। আর কোনো কথা নয়। আর কোনো দেখা নয়। সব বন্ধ। কোলাহল বিহীন প্রেমে নেমে এলো তীব্র নীরবতা।
অথচ প্রেম কি আর বন্ধ দরজা বুঝে?
ও ঘরে যে আমি সংসার পেতেছি গোপনে। সেই না হওয়া সংসারের মায়া, সেই না লাগানো শার্টের বোতাম কি আর বাঁধা মানে?

ডাল-ভাতের প্রেম একটু অদ্ভুত হয়। মনে হবে সাদামাটা, কোনো বিশেষত্ব নেই কিন্তু মূলত এর বিশেষত্বই হলো এটি ছাড়া যায় না। বিরিয়ানির মতন প্রেমগুলো ভীষণ ঝকঝকে, মুখরোচক হলেও টেকসই হয় না। কারণ বিরিয়ানি মানুষের পছন্দের খাবার হলেও রোজ কিন্তু খাওয়া যায় না। বদহজম আর রুচি নষ্ট হয়। অথচ অন্যদিকে ডাল-ভাতেই দিন শেষে শান্তি।
তাই আমার আর সাহেবের ডাল-ভাতের প্রেম পরিবারের তীব্র অমতেও থামলো না। মুখ দেখাদেখি বন্ধ হলো, বন্ধ হলো জানালা-দরজা। প্রেমের শিখা জেগে থাকলো শেষ রাত্তিরেও।
কলেজ ছুটির সময় হলে সাহেব দাঁড়িয়ে থাকতো আমার জন্য। কলেজ থেকে বাসায় ফেরার সহজ পথটি ছিলো দশ মিনিটের। অথচ আমরা কঠিন পথটি বেছে নিতাম। যেটা দিয়ে ফিরতে লাগতো আধাঘন্টা। কথাতেই যে আছে, প্রেমের পথ দীর্ঘ হয় ভীষণ।
রাত হলে যখন আলো নিভে যেতো শহরের তখন সাহেবের টেবিলল্যাম্প জ্বলে উঠতো। খুলে যেতো আমাদের সদা বন্ধ রাখার প্রতিশ্রুতি দেওয়া জানালা ও বারান্দার দরজা। দু'জনেই সমস্ত পৃথিবীর থেকে লুকিয়ে কথা ভাগ করতাম। কথা ভাগ করতে গিয়ে জানলাম সাহেবের পাহাড় পছন্দ আমার সমুদ্র। ঠিক করলাম বড়ো হয়ে আমি সাহেবের পাহাড় দেখবো ও দেখবে সমুদ্র। একসাথে আমরা পৃথিবী দেখবো। যদিও মনে ভয় হতো, এই যে দুই বাড়ির মুখ দেখাদেখি বন্ধ প্রেমটা আদৌ পূর্ণতা পাবে তো? নাকি সাহেবের বুকের পাশটার বোতাম চিরজীবন খোলা থাকবে অপূর্ণতায়?
দেখতে দেখতে দু'জনে কলেজটাও পাশ করে গেলাম। দু'জনে ঠিক করলাম আমাদের এই দূরত্ব কিছুটা ঘোচাতে হবে। একটু পাশাপাশি বসতে হবে, একটু হাতে হাত রাখতে হবে, চোখের দেখার সময়টা বাড়াতে হবে আরও খানিকটা। এই দূরত্ব প্রেমের সইছে না আর। তাই দু'জনে মন লাগালাম ভীষণ পড়াশোনায়। অবিশ্বাস্যকর ভাবে রাতের পর রাত জেগে দেখা স্বপ্ন তখন আমাদের হাতের মুঠোয় এসে গেলো। দু'জনেই ভর্তি হতে পারলাম একই বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেদিনের খুশির কথা আমি আজও বিশ্লেষণ করতে পারি না। বোকার মতন কেঁদে দিয়ে ছিলাম খুশিতে। বাবা ভাবতে পারেননি তার মোটামুটি পড়াশোনা করা মেয়েটা এমন অদ্ভুত ভাবে চমকে দেবে। এতটাই ডুবে যাবে পড়াশোনায়। মা তো বলেই বসলেন, “এ বাড়িতে আসার পর তোমার বেশ উন্নতি হয়েছে। ভিন্ন তোমাকে দেখছি।”
আমি মিটমিট করে হেসেছিলাম কেবল। ভিন্ন আমাকে দেখবে না? এ বাড়িতে আসার আগে আমার সাহেব নামের কোনো গন্তব্য ছিলো না। কোনো পথ ছিলো যেখানে হাঁটলে আমি খুঁজে পেতাম স্বর্গকে। আমার প্রেমের উনুনে তখন সবে রান্না ঘনিয়ে এসেছে। একসাথে দু'জনের দুই পরিবারকে লুকিয়ে ভার্সিটি যাওয়া। একই ক্লাসেই বসা। গায়ের সাথে গা ঘেঁষে খুব কাছ থেকে দু'জন দু'জনের শরীরের ঘ্রাণ চিনে নেওয়া…
সে সবই ছিলো আমার স্বপ্নের মতন পৃথিবীর একটি অংশ। এত সুখ এত আমোদে আমোদিনীর জীবন ভরিয়ে দিয়েছিলেন স্রষ্টা যে কেউ শুনলেও হয়তো ঈর্ষা করতো।
আমার নিজস্ব ফোন ছিলো না। মধ্যবিত্ত ছিলাম তো, এত শখ করে বাবার ঘাড়ের বোঝা বাড়াতে চাইনি। সাহেব আমাকে কলেজ পাশ করার পরই একটা ফোন কিনে দিলো। ওর পছন্দের ক্যামেরাটা কেনার জন্য যেই যৎসামান্য টাকা জমিয়ে ছিলো তা-ই দিয়ে আমার জন্মদিনে একটি ফোন কিনে দিলো। এমন করেই যেন আমার সমস্ত শখ সাহেব ওর সঞ্চিত সুখ থেকে পূরণ করতে লাগলো।
সে’বার আমার বয়স একুশ হলো। ভার্সিটির ক্যাম্পাসে বসে ছিলাম। সাহেব যেন হুট করে কোথা থেকে এলো এবং আমার হাতে একুশটা গোলাপ ধরিয়ে দিয়ে বলল,
“তোমার প্রতিটা জন্মদিনে গোলাপ ফুটবে এমন করে। আর আমি এমন করেই তা পৌঁছে দেবো তোমার কাছে। সে আমরা পৃথিবীর যেই প্রান্তেই থাকি না কেন, গোলাপ তোমার কাছে ঠিক পৌঁছে যাবে।”
আমি ওর এলোমেলো চুল গুছিয়ে দিয়ে বলেছিলাম,
“পৃথিবীর কোন প্রান্তেই বা যাবো আমরা? আমাদের গন্তব্য যে আমাদের কাছে এসেই শেষ হবে!”
সাহেব ভীষণ খুশি হয়েছিলো আমার উত্তরে। এর পরেই ফোনটা ধরিয়ে দিয়েছিলো হাতে। আমাদের সম্পর্কের রাস্তায় আরও একটি সুন্দর মুহূর্ত তৈরি করে দিয়ে।
সেই ফোনেই সাহেবের সাথে আমার রাতের পর রাত কথা হতো। চোরের মতন। প্রেমে পড়লে যে কতকিছু করতে হয়! মিথ্যে বলা, চুরি করা আরও কত কী! প্রেম বিষয়টা ভীষণ সহজ ছিলো না তখনই আবিষ্কার করলাম।
তবে আমার এই লুকোচুরি বেশিদিন চললো না। এক সোমবারে আমি ফোনটা রুমেই রেখে চলে গিয়েছিলাম ভার্সিটিতে। ফিরে যখন এলাম তখন বিকেল। অন্য সময় ফিরে এলেই মা খাবার বেড়ে দিতেন। পাশে বসে জিজ্ঞেস করতে আর কিছু লাগবে কি-না। তরকারিটা কেমন হয়েছে। লবন আরেকটু কম হলে ভালো হতো না বেশি। অথচ সেদিনটা ভিন্ন ছিলো। এসে দেখলাম মা আমার রুমেই বসা। মুখ চোখ অত্যাধিক গম্ভীর। আমি তখনও বুঝিনি হয়েছে কী? কিন্তু যখন বুঝলাম তখন অনেকটাই দেরি হযে গিয়েছিলো।
মায়ের হাতে আমার ফোনটা জ্বলজ্বল করছে। সেই দম বন্ধকর উত্তেজনা, বুক ধড়ফড় করা এর আগে কখনো আমি অনুভব করিনি। মা'কে কী বলবো, না বলবো গুছিয়েই উঠতে পারছিলাম না। কেবল ভয় পাচ্ছিলাম মা সাহেবের কথাটা জেনে যাননি তো!
আমার হতভম্ব মুখাবয়ব, ভীতু চোখ মায়ের নজর এড়াতে পারেনি। মা কোনো চিৎকার চেঁচামেচি না করে অত্যাধিক শীতল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেছিলেন,
“ছেলেটা কে?”
ভেবেছিলাম জিজ্ঞেস করবেন প্রথমে ফোনের কথা। কিন্তু এত নাটকীয়তা ছেড়ে মা যে সোজাসুজি এমন প্রশ্ন করবেন আমি আঁচও করতে পারিনি। আমার ভয় তখন বাড়ন্ত রকমের। অপরিণত বয়সে ছিলাম কি-না তখনও! তবুও মিথ্যে বলতে চেয়েছিলাম। আমতাআমতা করে বলেছিলাম,
“কোন ছেলে?”
এরপর আর কী! সকলের যা গতি হয় আমারও তা-ই হলো। মায়ের বিশাল চড়টি পড়লো আমার গালে। আমি স্তব্ধ হয়ে গিয়ে ছিলাম। মা কখনোই আমার গায়ে হাত দেননি যত যা-ই করেছেন। সেই প্রথম হাত দিলেন।
সেদিন বুঝলাম প্রেমে পড়লে অনেককিছু করতে হয়। এমন দুই-চারটা চড়ও হজম করে নিতে হয় অনায়াসেই। মা আবারও একই প্রশ্ন করলেন। কিন্তু আমি তখন যেন সীমিত সময়ের জন্য বোবা হয়ে গিয়েছিলাম। কথা বললেই যে সত্যিটা বলতে হতো। ছেলেটা কে পরিচয় দিতে হতো। এরপরের গল্প হতো আরও ভয়াবহ। ঝামেলা তখন দুই পক্ষেরই পোহাতে হতো। তাই নাম বললাম না। নিজের হয়ে সাফাইও গাইলাম না।
আমার নীরবতা ঠিক সহ্য হলো না মায়ের। মা আমার থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে আরও রেগে গেলেন। সাহেবের শখের টাকায় কেনা ফোনটা গুড়িয়ে ফেললেন একেবারে। দ্বিতীয় চড়টাও মারলেন। তবুও নাম বের করতে পারলেন না মুখ দিয়ে। শেষমেশ অতিষ্ঠ হয়ে বললেন,
“পড়াশোনার নামে এসব করছো? তোমার বাবা জানলে কী হবে বুঝতে পারছো তো? তোমার বিয়ের বন্দোবস্ত করবো শীগ্রই। আমরা মধ্যবিত্ত। আমাদের ঘরের সবচেয়ে বড়ো অলংকার হলো সম্মান। সেই সম্মানই যদি না থাকে তবে আর বাঁচবো কী নিয়ে?”
বিয়ের কথাটা শুনে আমার বুকে যেন মোচড় দিয়ে উঠেছিলো। সাহেবকে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করব তা কি আমি কখনো দুঃস্বপ্নেও ভেবেছিলাম? ভাবিনি। ভাবিনি বলেই মায়ের পা চেপে ধরলাম। ভীষণ আকুতি মিনতি করে বললাম,
“আমি আর এসব করব না, মা। তবুও বিয়ের কথা বলো না। তুমি তো ফোন ভেঙেই দিয়েছো আর যোগাযোগ হবেই বা কী করে? আমি আর এমন করব না, মা।”
মা তখন কঠোর ভাবে বললেন, “আমার গা ছুঁয়ে বলছো তো?”
মায়ের গা ছুঁয়ে মিথ্যা বলাটা ছিলো পৃথিবীর ঘৃণ্যতম পাপের একটি। এবং প্রেম শেষমেশ আমাকে সে পাপটি করতেও বাধ্য করেছিলো। আমি পা ছুঁয়ে মিথ্যে বললাম। বললাম আমি আর ছেলেটির সাথে কোনো যোগাযোগ রাখব না।
তখন আমার অতটুকু মাথায় সেটাই সঠিক মনে হয়েছিলো। প্রেমিকের সাথে সংসার করার সাধ প্রেমিকাদের কেমন চালাক করে তোলে তাই না? নয়তো এত বুদ্ধি প্রেম ছাড়া আর কীভাবেই বা মাথায় আসতো?
এরপর যদিও আমি ভয়ে ছিলাম বাবাকে না মা আবার এসব বলে দেন। বাবা যদিও আমাকে মারতেন না, বকতেন না কিন্তু কষ্ট তো পেতেন। বাবার কষ্ট পাওয়াকে আমি আবার ভীষণ ভয় পেতাম। আমার মোমের মতন বাবা কষ্ট প্রকাশ করতেন না বলেই তার কষ্টগুলো আমি বুঝে নিতাম, লাঘব করার চেষ্টা করতাম। সেই আমি-ই কীভাবে তাকে কষ্ট দিতাম?
এবং আমি আবিষ্কার করলাম বাবার এই কষ্ট পাওয়ার বিষয়টিকে মা-ও ভয় পেতো। তাই তো এত বড়ো কথাটি তিনি আর বাবাকে জানাননি। হয়তো ধরে নিয়ে ছিলেন তার গা ছুঁয়ে তার মেয়ে মিথ্যে বলবে না। ছেড়ে দিবে তার অজ্ঞাত সেই ছেলে প্রেমিকটিকে। কিন্তু মা তো আর জানতেন না, আমার প্রেম তখন গা ছুঁয়ে করা প্রতিজ্ঞার চেয়েও আমার কাছে বড়ো হয়ে উঠেছিলো।
এরপরের সময়গুলোতে আমরা আরও বেশি সচেতন হয়ে যাই। লুকোচুরি বাড়ে আরও। ফোন হারিয়ে যখন আমার মন অনেক ব্যথিত ছিলো তখন সাহেব স্নেহ ভরা কণ্ঠে কত বুঝিয়ে ছিলো। প্রেমে নাকি কিছু জিনিস হারাতে হয়। ওসব ধরতে হয় না।
সাহেবের হাত ধরে আমার অনেকগুলো দিন কেটেছিলো স্বপ্নের মতন। সেই ঘটনার পর মা আমাকে একটু অবিশ্বাস করতেন অবশ্য কিন্তু মুখ ফুটে দ্বিতীয় বার কিছু বলেননি।
আমি তখন অনার্স তৃতীয় বর্ষে। আমাদের সুখী পরিবারে হুট করে বিষণ্ণ বিকেল নেমে এলো। একদিন বিকেলে বাবার অফিস থেকে ফোন করে জানানো হলো বাবা ব্রেন স্ট্রোক করেছেন। আমি কলেজ থেকে এসে সবে ঘুমিয়ে ছিলাম। আমার ঠিক মনেও নেই কীভাবে, কেমন করে আমি, মা আর আমার বোন- নিলুফা হসপিটালে গিয়ে পৌঁছে ছিলাম। আমাদের সংসারের ঐ একটি মাত্র ছায়াই তো আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছিলো। সেই ছায়ার বিধ্বস্ততায় আমরা কেমন করে ঠিক থাকি?
বাবার স্ট্রোক কেবল বাবার হাত আর পায়ের কার্য ক্ষমতা কেঁড়ে নেয়নি, কেঁড়ে নিয়েছিলো আমাদের পরিবারের হাসি, আনন্দ আর সুখকে। কেঁড়ে নিয়েছিলো আমোদিনীর সমস্ত আমোদকে। আমি তখন বুঝলাম, বাবাকে কেবল আমি ভালোবাসি না, ভীষণ ভীষণ রকমের ভালোবাসি। আমার শান্ত বাবা তখন কেবল চোখ মেলে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতে পারতেন। কথা বলতেন ভাঙা ভাঙা। খুলে বলতে পারতেন না সব। বাবার সাথে সাথে আমিও সব খুলে বলার ক্ষমতা তখনই হারালাম। কারণ বাবার পরেই পরিবারে ছিলাম আমি। আমি হাল না ধরলে ভেসে যেতো পুরো পরিবারটা। হাল ধরতে গিয়ে আমোদিনীর আমোদ হারালো। হারালো সুখী গল্পগুলো। বাবাকে বলতাম— কিছু হবে না। সব ঠিক হয়ে যাবে।
কিন্তু আমি জানতাম, আসলে কিছুই ঠিক হওয়ার নয়। কিছুই আর আগের মতন হবে না…
আমার সেই ভঙ্গুর দিনগুলোতে মাথা রাখার কাঁধ হয়েছিলো সাহেব। আরও বেশি আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে নিয়েছিলো আমাকে। যেন বাবার ভাগের স্নেহটুকুও ও ঢেলে দিচ্ছিলো। বাবা যেমন করে জিজ্ঞেস করতেন, “কী লাগবে তোর বল, আমোদিনী?”
ঠিক তেমন করেই সাহেব জিজ্ঞেস করতো, “যা লাগবে আমায় বলবে, আমোদিনী। তোমায় সব দিবো আমি।”
বাবা আর সাহেবের ভেতর এই একটি দিকে ভীষণ মিল ছিলো। ওরা আমাকে প্রচণ্ড ভালোবাসতো। আমি আকাশের তারা চাইলে তা-ও যেন দিতে প্রস্তুত। পুরুষদের ভালোবাসা ভীষণ স্বচ্ছ হয়। তা প্রথম বুঝেছিলাম বাবাকে দেখে। আর তা পরবর্তীতে বিশ্বাস করেছিলাম সাহেবকে পেয়ে।
সাহেবদেরও মধ্যবিত্তের সংসার ছিলো। অনেক টাকা ছিলো না, পরিবারের বড়ো ছেলে ছিলো। বড়ো হওয়ার সাথে সাথে আমরা দু'জন আবিষ্কার করলাম, বড়ো হওয়ার কী যে যন্ত্রণা। বড়ো হলে বাবার কাঁধের ভার নিজের কাঁধে যখন বইতে হয় তখন বুঝলাম, বাবারা কত কষ্টের বিনিময়ে পরিবারের জন্য হাসি কিনে আনতো! কিন্তু আফসোস, আমরা বোধহয় বড়ো হওয়ার আগে বাবাদের কম ভালোবাসি কারণ তখন তো অবুঝ থাকি। আর যখন বুঝ হয় তখন বাবাদের আর পাই না।
সাহেব আর আমি টিউশনি শুরু করলাম। সাহেবের বাবাও ততদিনে অবসাদ গ্রহণ করেছেন চাকুরি থেকে। সাহেবের মা-ও মারা গেলেন পরের বৈশাখে। সেই শ্যামলাটে মুখের মায়াবী মহিলাটি ঘুমিয়ে গেলেন চিরনিদ্রায়। যাকে দেখে আমার মনে হয়েছিলো, তার গায়েও মায়ের মতন ঘ্রাণ আছে। আসলে বড়ো হওয়াটা না খুব ক্ষতির। বড়ো হওয়ার সাথে সাথে অনেককিছু হারাতে হয়।
দেখতে দেখতে আমাদের অনার্স শেষ হয়ে এলো। সাহেব শুরু করল চাকরির আবেদন করা। আর আমার জন্য শুরু হলো পাত্র দেখা। মায়ের যেন তখন সংসার থেকে একটি মেয়ে পাড় করতে পারলে স্বস্তি মেলে। করবেনই বা কী মানুষটা? বাবা প্যারালাইজড হওয়ার পর সংসারের অধিক দায়িত্ব যে তার উপরও বর্তে ছিলো। আমাকে যেই মানুষটা বলেছিলেন অন্যের পোশাক সেলাই করার প্রয়োজন নেই সেই মানুষটাই সংসারের দিকে তাকিয়ে অন্যের পোশাক সেলাইয়ের পেশাটি বেছে নিলেন। আমার বোন নিলুফা পড়তো দশম শ্রেণিতে অথচ টিউশনি খুঁজতে শুরু করে দিয়েছিলো। কারো বিয়েশাদি লাগলে ঘন্টার ঘন্টা বসে থেকে মেহেদি লাগিয়ে দিয়ে আসতো কয়েকশো টাকা উপার্জনের জন্য। পাছে যদি মা আর আপুর সংসার চালাতে কিছু সুবিধা হয় সেজন্য। বাবার একার দায়িত্ব আমরা তিনজন ভাগাভাগি করে মাথায় তুলে নিয়েও দেখলাম বাবার মতন সবটা পরিপূর্ণ করতে পারলাম না। বাবার বিকল্প যে কেউ নেই। কেউ হতে পারে না।
সাহেবের আর আমার তখন ডাল-ভাতের প্রেমের উনুন নিভু নিভু। দু'জনে লেকের পাশটায় গিয়ে বসতাম প্রায় প্রায়। হতাশাগ্রস্ত দু'টো মানুষ। আশায় থাকতাম একটু সুসংবাদের। সাহেবের চাকরি হওয়ার সুসংবাদ। একমাত্র সাহেবের চাকরিই পারবে যে আমাদের এক করতে। মা যে তার অভাবের সংসারের মেয়েটিকে বেকারের হাতে তুলে দিবেন না! যদিও কেউই তখনও জানতো না আমাদের ব্যাপারে।
সেদিন বুধবার। সাহেবের একটি ইন্টারভিউ ছিলো। কিন্তু আবারও ব্যর্থ গেলো। ভাগ্য তখন আমাদের সাথ দিতে নারাজ। লেকের পাশটায় আমরা দু'জন বসা। মাথার উপর অভাগিনী কাকটি ডেকে যাচ্ছিলো অনবরত। যেন কোথাও তার বিচ্ছেদ ঘটেছে!
চারপাশটা তুলনামূলক নীরব ছিলো। সাহেবের হতাশা ভরা নিশ্বাস ভেসে আসছিলো কেবল। লাগছিলো কানে এসে। আমার তখন বুক ভার। বাসায় বিয়ের জন্য পাত্র দেখাদেখি হচ্ছে জোরেশোরে। বললাম,
“চাকরিটা এবারও হলো না?”
সাহেবের মাথা নত। ঘাম গড়িয়ে পড়ছে ওর কপাল বেয়ে। রাগী, উদাসীন সাহেব সেদিন কেমন মিইয়ে ছিলো। চাপা স্বরে বলল,
“খারাপ সময় আমাদের বোধহয় কাটবে না, আমোদিনী। কী করব আমি?”
সাহেবের অপারগতা ওর কণ্ঠে প্রকাশ পাচ্ছিলো। আমি তপ্ত শ্বাস ফেলে বলেছিলাম,
“ধৈর্য ধরা ছাড়া আর গতি কী? কখনো কখনো ভাগ্য আমাদের বিপরীতে যায়। অপেক্ষা করতে হবে।”
“অপেক্ষায় না তোমায় হারাতে হয় সেটাই ভয়। বোনটারও বিয়ের কথা চলছে। টাকার প্রয়োজন। বাবার রোগ বাড়ছে। ফ্ল্যাটের ভাড়া, খাবার খরচ। আমি কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছি না, আমোদিনী। এই পৃথিবী বড্ড ভারি লাগছে।”
আমি সাহেবের ভারি পৃথিবী আর হালকা করতে পারলাম না। কেবল দু'জন নীরবে দু'জনের হাতে হাত রেখে কাটিয়ে দিলাম অনেকটা সময়। যদি জানতাম সেটাই আমাদের একসাথে কাটানো শেষ মুহূর্ত তবে বোধহয় আরেকটু বেশি সময় পাশাপাশি থাকতাম। আমি যখন চলে আসছিলাম সাহেব কেবল একটা কথাই বলেছিলো, “বিয়ে করে নিও, আমোদিনী। তোমার আমোদে পরিপূর্ণ জীবনটা দেখতে চাই। তোমার নামের পরিপূর্ণতা চাই।”
সাহেবের এহেন কথায় বুক কেঁপে উঠেছিলো। জিজ্ঞেস করেছিলাম, “নামের পরিপূর্ণতার কথা ভাবলে। সম্পর্কের পরিপূর্ণতার কী গতি হবে?”
সাহেব মুচকি হেসে বলেছিলো,
“অন্য কোনো গল্পে আমরা আমাদের খুঁজে নিবো না-হয়!”
আমি জানি না সাহেব বোধহয় ভবিষ্যৎ বুঝতে পারতো। নয়তো সেদিন ওর কাছ থেকে এমন কথা শুনে যখন বাড়ি ফিরলাম, বাড়ি এসে দেখি বিস্ময় ঘটে গিয়েছে। আমাকে দেখতে পাত্রপক্ষ এসে বসে আছে ঘরে। মা কিচ্ছুটি জানাননি আমাকে। ভালো পাত্র ছিলো, জানাতে গিয়ে সময় নষ্ট করতে চাননি বোধহয়।
এবং আমাকে যারা দেখতে এলেন তাদের পছন্দও হয়ে গেলাম আমি। এবং শুক্রবারেই ঠিক করা হলো আমাদের বিয়ের তারিখ। সবটা এত তাড়াতাড়ি, এত আকস্মিক ছিলো যে আমিও বুঝে উঠতে পারলাম না আমার প্রেমের এমন অকাল মৃত্যু ঘটার কারণ কী? কেন ভাগ্য এত নিষ্ঠুর খেললো।
সেদিন রাতটা ছিলো আমার আর সাহেবের জানালা-দরজার শেষ কথোপকথনের রাত। কী কান্নাটাই না কেঁদেছিলাম আমি! আর সাহেব জানালার সামনে ঐ চেয়ারটা বসে হাসছিলো। অথচ ওর চোখগুলো নক্ষত্রের মতনই জ্বলজ্বল করছিলো। বাস্তবতার কাছে ডাল-ভাতের প্রেম এমন করে হেরে যাবে তা কি আর আমরা কেউই জানতাম?
আমি সাহেবকে মোটেও আবদার করে বলিনি আমায় বিয়ে করতে। কীভাবেই বা বলি? ওর মাথায় এত বোঝা ছিলো, সে সকল বোঝার ভারে ও ক্লান্ত ছিলো, আমার বোঝাটা কীভাবে বলতাম বইতে?
সে রাত আমাদের নির্ঘুম কেটেছিলো।
সহায়সম্বলহীনদের মতন অসহায় আমরা দু'টি মানুষ একই দুঃখে তখন জর্জরিত। সেই দুঃখে আমি কাঁদছিলাম আর সাহেব বলেছিলো,
“তুমি ঠিক সুখী হবে দেখো, আমোদিনী। ভীষণ সুখী হবে।”
আমার তখন মনে হয়েছিলো সাহেব মিথ্যে স্বান্তনা দিচ্ছে আমাকে। আমার না হওয়া সংসারটা ওর ঘরে উপোস করে মরবে আর আমি কি-না সুখী হবো? যেই বালিশে আমাদের পাশাপাশি মাথা রাখার গল্প হওয়ার কথা সেই বালিশ আমি ভাগাভাগি করে নিতে পারবো অন্য কারো সঙ্গে? আমার ডাল-ভাতের প্রেমে এক গ্লাস জল ঢালার বিষণ্ণতা নিয়ে আমি সুখী হবো?
সাহেব তা-ও বলেছিলো, ওসব ভুলে যাবো একদিন। ভুলে যাবো প্রেমের গল্প। সংসার সব ভুলিয়ে দেয়। এমনকি আমার না-হওয়া সংসারকেও!
ঘরোয়া ভাবেই হয়ে গেলো আমার বিয়েটি। একদম সাদামাটা। ঝড়ের পর যেমন শান্ত থাকে প্রকৃতি তেমন ভাবেই। বিদায়ের আগ মুহূর্তে যখন বাবার কাছে গেলাম তখন বাবার ঘরে হলদেটে আলো জ্বলছিলো। বাবা শোয়া বিছানায়। বাবার হাত ধরে খুব কেঁদে ছিলাম। ছোটোবেলার মতন সবটা থাকলে অভিযোগ করে বলতাম বাবাকে, মা জানতে চায়নি আমার বুকের পাশে কে আছে। কাকে চাই আমি। বলতাম, ভাগ্য আমার সাথ দেয়নি।
অথচ দুর্ভাগ্য দেখো! বড়ো হয়ে গিয়ে ছিলাম কি-না! অভিযোগ আর করতে পারিনি। বাবা যদি আগের মতন থাকতো তাহলো ঠিক সাহেবকে যেকোনো মূল্যে আমার করে দিতো আমি জানি। কিন্তু…
কিছু কিন্তু দীর্ঘশ্বাসেই হারিয়ে যায় যে!
সাহেবের জানালাটা যে সেই বন্ধ হলো। এরপর বহুবছর আর খুলেনি। জানতে ইচ্ছে হতো— বড়ো সাহেব কি কিশোর সাহেবের মতনই রুম অন্ধকার করে রাখতো? বিষণ্ণ চোখে তাকিয়ে থাকতো নির্নিমেষ? ওর ঘরে নতুন করে আলো জ্বালার মতন কেউ কি আসবে? ওকে নতুন করে কেউ কি আর রুমাল বানিয়ে দিবে?
বিয়ের পর বুঝলাম, আমার যার সাথে বিয়ে হয়েছিলো মানুষটা নিখাঁদ আন্তরিক। বিয়ের দিন রাতে এসেই প্রথমে জিজ্ঞেস করেছিলে আমার পেট ভরেছে কি-না। খাবার ঠিকঠাক খেয়েছিলাম কি-না।
আমার স্বামী হাবিবের ভালোবাসা আমাকে সত্যি সত্যি সুখী রাখলো। এতটাই সুখী যে আমি আমার না হওয়া সংসারের কথা ভুলতে বসলাম। ভুলতে লাগলাম জানালা-বারান্দার প্রেমকে। কিন্তু সাহেব আর সাহেবের ঐ শার্টের বোতাম… তা রয়ে গেলো অমলিন হয়ে। সাহেব বলেছিলো প্রেমে পড়লে অনেককিছু হারাতে হয়। তাই বলে প্রেমিককেই হারাতে হবে তা তো বলল না!

সাহেবের বিয়ে হয়েছে বছর তিনেক হলো। সেবার বাবাকে দেখতে গেলাম যখন তখন দেখলাম বউটা কী সুন্দর! পুতুলের মতন। বাবু হবে না? তাই আরও সুন্দর হয়ে গিয়েছে। গাল ভরে হাসি দিলো আমায় দেখে। বহুবছর পর ওর ঘরের জানালাটা সেবার খুলল আবার। নতুন কারো হাতে আবার সেই ঘরে আলো ঢুকল। সাহেবের চাকরিও হয়েছিলো আমার বিয়ের পরের বছর। বেশ ভালো মাইনের।
আজও বাবার বাসায় এসেছি। বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি। বেলীফুলের গাছটা নেই আর। বারান্দায় আজকাল আর সূর্য আসতে পারে না সামনে বিল্ডিং হওয়ায়। আমার ছেলেটা ঘুমিয়ে আছে আমার কাঁধে।
সাহেবের ঘরের জানালাটা খোলা। দেখলাম চেয়ারে একটি শার্ট রাখা। শার্টটার দিকে আমার চোখ আটকে আছে। সেই গাঢ় নীল রঙের শার্টটা আজও নতুন। রঙটা মেটে হয়নি মোটেও। সাহেব কখনো পরেইনি মেটে হবে কী করে!
শার্টের বোতাম গুলোর দিকে তাকিয়ে দেখলাম বুকের পাশটার বোতামটা আজও লাগানো হয়নি।
তখনই দেখলাম ব্যস্ত পায়ে রুমে ঢুকলো সাহেবের বউ। এসেই আমাকে দেখে গাল ভরে হাসল৷ জিজ্ঞেস করল কখন এসেছি। আমি উত্তর দিতে গিয়ে খেয়াল করলাম সাহেবের বউ শার্টটা হাতে তুলে নিয়েছে। তার হাতে সুই, সুতো। হাতের সামনে থাকা বাক্সটা থেকে বোতাম খুঁজতে খুঁজতে বলল,
“দেখুন না, কত সুন্দর শার্টটা রেখে দিয়েছে ও! ন্যাপথিনের ঘ্রাণ লেগে আছে শার্টটায়। উপরের বোতামটা লাগানো নেই। ভাবলাম সেলাই করে দিই। সুন্দর না বলুন আপু?”
মেয়েটার হাসি হাসি মুখ।
আমার চোখগুলো জ্বালা করছে। ঠোঁটে হাসিটা প্রসস্থ হলো। মাথা নাড়ালাম কেবল। দেখতে লাগলাম সাহেবের বউ কত যত্ন করে শার্টের বোতামটা সেলাই করছে! কার বানানো শার্ট, কে পরিপূর্ণ করছে! কেমন অদ্ভুত না সংসারের নিয়ম!
আমার না হওয়া সংসারটি এই মেয়েটি আজ পরিপূর্ণ করে দিয়েছে। কার দেখা স্বপ্ন কার কাছে সত্যি হয়ে ধরা দেয়! দুনিয়া বড়ো অদ্ভুত তাই না? স্বপ্ন দেখায় একজনকে আর পূরণ করে অন্য কাউকে দিয়ে।
আমি আজ দুঃখে নেই। কিশোরী বয়সের প্রেম ভুলে গিয়ে দিব্যি সংসার করছি। কিন্তু হয় না মাঝে মাঝে? কিছু জিনিস কখনো মোছা যায় না!
সাহেবের বউ সেলাই করতে করতে আনমনে বলল,
“এত পুরোনো পোশাক ও রেখে দিয়েছে কেন কে জানে!”
আমি হাসলাম। বারান্দা থেকে সরে যেতে যেতে বললাম,
“কোথাও একটা শুনেছিলাম— মধ্যবিত্তের শার্ট আর সম্পর্ক, ছিঁড়ে গেলেও ফেলতে পারে না যে!”
মেয়েটা আমার কথা শুনেছে কি-না কে জানে! দেখলাম সাহেব ঘরে ঢুকেছে। ব্যস্ত হাতে ওষুধ খাওয়াচ্ছে বউকে। কী আদুরে সংসার ওদের। আমার হতো ওটা তাই না?
সাহেবের বউ কি কখনো জানবে, ন্যাপথিনের ঐ ঘ্রাণের আড়ালে আমার গায়ের গন্ধ মিশে আছে? জানবে কি, ঐ শেষ বোতামটি আমার সেলাই করার কথা ছিলো! জানবে না হয়তো।
ডাল-ভাতের প্রেমে কোনো থালা হয়নি সংসার নামক। তাই তা উড়ে যাবে দীর্ঘশ্বাসে।
দরজায় মা দাঁড়ানো। সাহেবের বউয়ের হাতের শার্টটার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন। মা-ও বোধহয় আমার না-হওয়া সংসারটিকে এত বছরে চিনতে পেরেছেন!


~সমাপ্ত~


written by: মম সাহা

Olindo Rahman

Olindo Rahman

A good book is worth a hundred good friends. 
But a good friend is equal to a library.!! 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Your experience on this site will be improved by allowing cookies Cookie Policy