সেদিন ছিল শ্রাবণ মাসের চার তারিখ। প্রকৃতি বিরোধ করল, চৈত্রের কাঠফাটা রোদে গা ঝলসে দেওয়ার প্রয়াস চালালো। তীব্র গরম, অস্বস্তি আর গায়ে কাটা দেওয়া রোদ! তিনচাকার গাড়িটা গতি হারালো, হেলে পড়ল একদিকে। সেদিন, সে যাত্রায় আমি বেঁচে গেছিলাম। আমার অনুমান সঠিক হয়। সে আসে। এই নিয়ে তিনবার। আমি টের পাই, সে আসবে। আগামী সকল বিপদ ও প্রয়োজন কিংবা আমার নিঃসঙ্গ দুঃখে.. সে আসবে বার বার।
সেদিন যখন তার চোখে চোখ রেখে মুচকি হাসির সাথে ম্যাজিকাল থ্রি ওয়ার্ডস বলে ফেলি, তার চোখে আমি এক চিমটি বিস্ময়ও দেখতে পাইনি। খুব সাধারণ মুখভাব ছিল তার। যেন এমনটা হওয়া স্বাভাবিক, যেন এমনটা হবে বলে আগে থেকেই ধারণা ছিল তার। তবে নির্লিপ্ত থাকল যে... কে জানে কেন? হয়তো প্রতিক্রিয়া আগে থেকে ভেবে আসেনি বলে।
রৌদ্রময়ী দুপুরটা গুমোট আঁধারে ঢেকে যায়, আকাশটা ডেকে ওঠে আচমকা। একবার মেঘের গর্জন, পরবর্তী ধাপে আকাশ ফেটে বৃষ্টি নামে। আমার ক্ষততে বৃষ্টির একেকটা ফোঁটা তীব্র ঘর্ষণ সৃষ্টি করছিল, রক্ত ধুয়ে শহর ভেজাচ্ছিল। ব্যথায় না, অতিরিক্ত উত্তেজনায় আমার ব্ল্যাকআউট হয়।
যখন আমার জ্ঞান ফেরে, তখন আমার সামনে চিন্তান্বিত বাবাকে দেখতে পাই। হসপিটাল, রোগী, ডাক্তার, নার্স, ওয়ার্ডবয়, কিংবা রোগীর আত্মীয় ও অন্যান্য কর্মচারী.. এসবের মাঝে আমি তাকে খুঁজে পেলাম না, যাকে খুঁজে যাচ্ছিল আমার চোখদুটো। সম্ভবত আমাদের পরবর্তী দেখাটা অন্য এক সংঘর্ষের জন্য তোলা রইলো। এবার দেখা হলে আমি জিজ্ঞেস করব, “উইল ইউ লাভ মি লাইক দ্য পেইন লাভস মি?”
_
জার্নালের পৃষ্ঠা থেকে মুখ তুলল মাশা। খেয়ালি জগত থেকে বের হতে তার বড়ো আলস্য। চোখ-মুখে মৃদু হাসি রেখে উবু হয়ে শুয়ে রইলো সে। জীবন আমাদের কী দেয়? পেইন? লাভ? ইনফ্যাচুয়েশন? নাকি কিছুই না?
আচ্ছা, যদি কোনো একক্ষণে জীবন একযোগে এ সকল কিছু দিয়ে দেয়? কী হবে তখন? এর উত্তর তখনই মিলবে, যখন চতুর্থ দেখা হবে।
পরবর্তী দেখাটা হলো তিনমাস পর। এই তিনমাসে মাশার মধ্যকার সবচেয়ে বড়ো পরিবর্তন হলো, সে এখন একা একা রাস্তা পাড় হতে পারে। সন্ধ্যায় বাবার কোচিং থেকে নিয়ে আসা বাদে অন্যান্য সময়গুলো মাশা একাই যায়। তবে বিপদে পড়ে না। কী আশ্চর্য! বিপদে পড়ুক বা না পড়ুক, সে কেন আসবে না?
যার বাসার এড্রেস মাশার জানা নেই, মোবাইল নাম্বার তো দূরে থাক জিপি না-কি এয়ারটেল সিম অপারেটর ইউজ করে সেটাও জানে না, বয়স জানে না, জানে না পড়াশোনা কতদূর। জানার মধ্যে শুধু জানে তার নাম, ওবায়দুল কাদের। এই নাম নিয়ে সে তাকে কোথায় খুঁজবে?
মাশার খুঁজতে যেতে হলো না। আজ কোচিংয়ে যাবার পথে ফুচকার একটা দোকান দেখে দাঁড়িয়ে পড়ে সে। না সামনে এগোয়, না ফিরে যায়। খাবে? কেমন খেতে হবে? কী আনহেলদি! মেয়েদের নাকি প্রিয় খাবার? কতসব দোটানায় নাজেহাল মাশা পরিশেষে এগিয়েই যায়। যাক, যা আছে কপালে।
ফুচকার দোকানি মাশাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলেন,
-“আম্মা, কী বানামু? ফুসকা নাকি পানিপুড়ি? না ভেলপুড়ি?”
মাশা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর জিজ্ঞেস করে,
-“কোনটা পানিপুড়ি, কোনটা ফুচকা, কোনটা ভেলপুড়ি?”
দেখতে তো সব ফুচকা! তারও নাকি এত রঙ্গভেদ! অদ্ভুত কিছু দেখেছে, এমনভাবে দোকানি মাশাকে দেখে শ্বাস ফেলেন। এরপর জানান, কোনটা কী!
সবচেয়ে ছোট সাইজের ফুচকাটা বানিয়ে দিতে গিয়ে জিজ্ঞেস করেন,
-“ঝাল দিমু?”
মাশা ঠোঁট চেপে তাকিয়ে থাকে,
-“দিবেন? দেন।”
ঝাল দেওয়া হলো। একটু বেশিই। ছোট্ট একটা বাটি, অর্ধেক ভরা টকপানি। তারমধ্যে ছেটানো চাট মশলা ও চিলিফ্লেক্স। সেই পানিতে ডুবে আছে ছয়টা ছোট ফুচকা। চামচের সাহায্যে একটা খায়। প্রথম দফায় ঝালের আন্দাজা সে করতে পারে না। শুধু টের পায়, স্বাদটা অদ্ভুত রকমের মজার। টক, ঝালের মিশেলে কুড়মুড়ে কিছু.. আরেকটা, তারপর আরেকটা। চার নাম্বারটা খাওয়ার সময় ঝাল তালুতে ঠেকে। কাশতে কাশতে শ্বাস আটকে আসে মাশার। সেই সময় মাশা কষ্ট পাচ্ছিল প্রচুর, তবে কষ্টের চেয়ে বেশি স্বস্তি পাচ্ছিল। কেননা সে টের পাচ্ছে, তার কিচ্ছু হবে না। বরঞ্চ তিনমাস ধরে যাকে খুঁজছিল, সে আসবে।
পানি খেয়ে একটু স্থির হলো মাশা। বুকে হাত রেখে নতমুখী হয়ে শ্বাস ফেলছিল, সেভাবেই হেসে ফেলল। চোখ উঁচিয়ে তাকাল, স্মিত হাসির সাথে বলল,
-“আজকেও গায়েব হয়ে যাবেন?”
ওপর-নীচ মাথা নাড়ল অরিত্র,
-“গায়েব? কেন? তুমি বাঘ? আমি হরিণ?”
হাসির রেশ বাড়ল মাশার,
-“আপনি মায়া হরিণ, কেমন যেন চোখের নিমিষেই হারিয়ে যান।”
মাশা থামে। পর পর বলে ওঠে,
-“ওসব ছাড়ুন। আমার আপনার জন্য একটা প্রশ্ন আছে.. ঠিক প্রশ্ন না এটা। একটা কথা আছে, একটা প্রস্তাবও বলা যায়। আপনি যা মনে করে খুশি, মানতে পারেন। আমি একটু পরে বলব। আপনি কিছু বলুন এর আগে।”
অরিত্র কথা হারায়। এই মেয়েটা তো দুইদিন আগেও ইনট্রোভার্ট ছিল। এমন ছাগলের মতো ম্যা ম্যা করা কবে শিখল? অসহায় চোখে তাকিয়ে রইল অরিত্র। দু'খণ্ড শ্বাস ফেলে বলল,
-“তুমি কি জানো, তুমি পালটে গেছো?”
-“না তো। আমি একই আছি।”
-“কতটা পালটেছ তুমি.. আমি ধরিয়ে দেই?”
-“আ-চ্ছা-আ।”
টেনে টেনে বলল মাশা। হাঁটতে শুরু করল তারা। কোচিংয়ের পথে না গিয়ে অন্য রাস্তা ধরল। শহরের ভেতরেই এটা, তবে অন্যরকম! এই রাস্তায় মানুষজন কম, গাছপালা প্রচুর। মাশা ঢাকায় আসার পর থেকে এমন পরিবেশ দেখার সৌভাগ্য পায়নি। ধামরাই ছেড়ে আসার পর যা মিস করছিল, তা দেখে উৎফুল্ল হলো ভীষণ। এরমধ্যে অরিত্র বলতে লাগল,
-“তুমি.. তুমি চঞ্চল হয়ে গেছো।”
-“আগে কেমন ছিলাম?”
-“শান্ত ছিলে।”
-“আচ্ছা, আর?”
-“তুমি বেশি কথা বলা শুরু করেছো, ওভার শেয়ার করছো।”
-“আগে?”
-“আগে তুমি চুপচাপ ছিলে, কথা কম বলতে।”
-“আচ্ছা.. তারপর?”
-“তুমি ইমম্যাচিউর হয়ে যাচ্ছো। ইমপ্র্যাক্টিকাল আচরণ করছো।”
-“আগে?”
-“বয়সের তুলনায় অনেক বেশি ম্যাচিউর ছিলে।”
-“আচ্ছা.. শুনুন।”
মাশা ঘুরে দাঁড়ায়। এবার সে মুখোমুখি অরিত্রের, উলটো হয়ে হাঁটতে লাগল। চোখ দুটো চোখে আবদ্ধ, ঠোঁটের কোণে বরাবরের মতো মৃদু হাসি,
-“আসুন, আপনার ভুল ভাঙাই।”
মাশা নিজের হাত দুটো নিজের কোমরের পেছনে গুজল। সেভাবেই হাঁটতে হাঁটতে পেছোচ্ছে। বড়ো গম্ভীর ভঙ্গিমা তার। কণ্ঠে ধীরতা,
-“আমি বরাবরই ইমম্যাচিউর, ইমপ্র্যাক্টিকাল, চঞ্চল, বাঁচাল ও ছটফটে ছিলাম। সত্যি বলছি, শুরু থেকেই। আমি আমার বাবার কাছে এখনো আপনার বলা এ সকল শব্দগুলো নিয়েই বড়ো হচ্ছি। তবে বাইরের দুনিয়ায় আমি সেটা, যেটা আপনি আমাকে ভাবতেন। কেননা তারা আমার মানুষ নয়। তারা এমন কেউই নয়, যাকে আমি আমার দূর্বল দিকগুলো দেখাব। এটাকে আমার পরিবর্তন ভাবলে ভুল হবে আপনার।”
অরিত্র জিজ্ঞেস করে,
-“আর যা আমি দেখতে পাচ্ছি, সেটা?”
মাশা হাসে,
-“আপনি আমার ধারণার চেয়েও বেশি বোকা। ঘরে কি কেউ সেজেগুজে থাকে? ঘর তো সেটাই, যেখানে আমি যা, সেভাবেই থাকা যায়... ইউ আর জাস্ট লাইক মাই হোম নাউ।”
মাশার ছোট ছোট শব্দগুলোতে আবিষ্ট হয় অরিত্র। কিছু বলে না। বলতেও চায় না। অন্তিমে সতর্ক করে কেবল,
-“পথ দেখে হাঁটো... নয়তো হোঁচট খাবে।”
-“উঁহু, আপনি আছেন, আমি জা..”
বাক্যটা শেষ করতে পারল না মাশা। একটা ইটের টুকরা পায়ে বিঁধল। অসাবধানতাবশত পড়ে যাবার উপক্রম। সে চোখ বন্ধ করে হাসল। নিজেকে কোনোভাবে বাঁচানোর প্রয়াস দেখাল না।
সে পড়ল না। কেউ একজন তাকে ধরেছে শক্তভাবে। তার কোমরের পেছনে সেই কেউ একজনের একটি হাত, অন্য হাতটি দিয়ে শক্ত করে ধরেছে তার বাহু। মুখে পড়তে থাকা অশান্ত শ্বাসে যেন ঝড়ুয়া উন্মাদনা!
হেসে ফেলল মাশা, নিজের অসম্পূর্ণ বাক্যটা সম্পূর্ণ করতে সে অবস্থাতেই বলল,
-“আপনি আছেন, আমি জানি।”
চলবে..
written by: নবনীতা শেখ
Leave a comment
Your email address will not be published. Required fields are marked *