Buy Now

Search

বিরহ বনে বৈরাগী [পর্ব-০৫]

বিরহ বনে বৈরাগী [পর্ব-০৫]

হেসে ফেলল মাশা, নিজের অসম্পূর্ণ বাক্যটা সম্পূর্ণ করতে সে অবস্থাতেই বলল,
-“আপনি আছেন, আমি জানি।”

অরিত্র বোকার মতো তাকিয়ে থেকে মাশাকে ছেড়ে দিলো। চমকানোর অবকাশ পেল না মেয়েটা। কোমরটায় ভালোই ব্যথা পেল। চোখ-মুখে ফুটে উঠল অসহায়ত্ব। কণ্ঠে অবিশ্বাস,
-“ওবায়দুল কাদের ভাইয়া, আপনাকে আমি ভালো ভেবেছিলাম।”
সরু চোখে অরিত্র জিজ্ঞেস করল,
-“আমি কি বলেছি, আমাকে ভালো ভাবতে?”
ব্যথা ভুলে মাশা নিজ থেকেই উঠে দাঁড়াল। আত্মবিশ্বাসী গলায় শুধাল,
-“বলুন তো, এটা আমাদের কততম দেখা?”
-“চতুর্থ।”
-“জি না। পনেরোতম।”

____
বিশিষ্ট ভদ্রলোক, যিনি আমাকে নিজের নামটাও বলেছিলেন মিথ্যে, সেটা ছিল আমাদের পনেরোতম দেখা.. আমার দিক থেকে; ওনার তরফ থেকে চতুর্থ। আমার দিককার সংখ্যা জেনে জনাব প্রথম দফায় অবাক হলেন। তার বিহ্বল চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে জানিয়েছিলাম, তাকে আমি এ ছাড়াও আরও এগারোটি পরিস্থিতিতে দেখতে পেয়েছি। প্রথমটি আমার রুমের ভেতর, দ্বিতীয়টি বারান্দায়, তৃতীয়টি কোচিংয়ের পাশের সিটে, চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ কিংবা একাদশ—পরবর্তীগুলোও আমার ভ্রমে।
মাথা খারাপ মেয়ে মানুষ উনি আমাকে আগে থেকেই ভাবতেন। এরপর থেকে ভাবতে লাগলেন বদ্ধ উন্মাদ। তার সেই এক টুকরো শ্বাস ফেলাতে আমি এটুকু অন্তত বুঝে গিয়েছিলাম। পাগল ভাবেন আর যাই ভাবেন না কেন, উত্তর আমার চাই। স্মিত হাসির সাথে সেদিনকার প্রস্তাবের উত্তর চাইলাম।
সিজনটা এমনই, কখনো কাঠফাটা রোদ, তো কখনো মেঘের গর্জন। আমি বিস্ময় নিয়ে ওনাকে রেগে যেতে দেখলাম। রাগে ওনার মুখ রক্তিম হয়ে উঠল। শব্দে বেরোতে লাগল কাঠিন্য। স্পষ্ট বাক্যে আমাকে জানালেন, “কখনো সময় ভুল হয়, কখনো মানুষ ভুল হয়। এমন কিছু করার আগে একশবার ভাববে, যা ফিউচারে তোমার আফসোসের কারণ হতে পারে।”

বিস্ময়ের সাথে ঠোঁটে চেপে গেল হাসি, চোখে তীব্র কৌতূহল,
“প্রেমে থাকুন, না-হয় অপ্রেমে, তবু আপনি থাকুন।
আচ্ছা, আফসোসেই মঞ্জুর, তবু আপনি থাকুন।”

আমি কি ওনাকে ভড়কে দিতে সফল?
____

বিছানার উবু হয়ে জার্নালের শেষ লেখাটুকর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল মাশা। প্রায় হারিয়েই গেছিল কোথাও একটা। সেই খেয়ালি জগতে তার সাথে অরিত্রের আবারও দেখা হলো। এটা কততম দেখা? মাশা হিসেব ভুলে গেছে বলে মন খারাপই লাগল। ওদিকে রকিব সাহেবের ডাকে আর এসবে পড়ে থাকার অবসর তার পাওয়া গেল না।

হাঁপ ছাড়ল মাশা। জার্নালটা বন্ধ করে উঠে চলে এলো বাবার কাছে। তিনি গম্ভীরমুখে বসে আছেন লিভিং রুমে। হাতে সংবাদপত্র। মাশাকে দেখে তিনি একবার তাকালেন। তারপর সংবাদপত্র ভাজ করে হাঁটুর ওপর হাত রেখে বললেন,
-“তুমি কোচিংয়ে যাচ্ছো না কেন ইদানিং? ওখান থেকে কল এসেছে আজ।”

মাশা ইতিউতি করে বলল,
-“বাবা, এমনিই।”
-“তুমি কোথায় যাচ্ছো?”

এ প্রশ্নের উত্তর দিতে হিমশিম খেয়ে গেল মাশা। সে আসলে কোথায় যাচ্ছে? সে কি জানে? যেদিকে দু-চোখ যায়, যাচ্ছে চলে। গন্তব্য অজানা রেখে পথ যেদিকে নিয়ে যায়, যাচ্ছে সেদিকে। কিন্তু সে কোথায় যাচ্ছে?

রকিব সাহেব নিজেকে শান্ত করলেনন। নরম কণ্ঠে বললেন,
-“আম্মু, এখানে বসো।”

মাশা তার পাশে বসতে তিনি বললেন,
-“আমি ছোট থেকে এ অবধি কখনো তোমার সাথে উচ্চবাচ্য করিনি, কখনো তোমার ইচ্ছের বাইরে কিছু চাপিয়ে দিইনি। তুমি চেয়েছো, আমি দিইনি, এমন কিছু আছে?”

মাশা ভাবল, এমন কিছু আসলেই নেই। মাথা নাড়ল দু-ধারে। ছোট্ট একখণ্ড শ্বাস ফেলে মাশা বলল,
-“নেই।”
-“এমনটা কেন করেছি জানো? যাতে তুমি আমার কাছে পর্যাপ্ত স্পেস পাও। যাতে একটা খুন করার পরও নির্দ্বিধায় আমার কাছে জানাতে পারো, যে বাবা.. এমনটা হয়ে গেছে। যাতে পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কথাটাও অকপটে আমাকে বলে ফেলতে পারো, সবার আগে।”
রকিব সাহেব কিছু সময়ের বিরতি নিয়ে আবার বললেন,
-“তারপর এমন কী ঘটল, যা তুমি লুকিয়ে গেলে?”

মাশা নিশ্চুপ হয়ে বসে রইল। রকিব সাহেব তাকে ভাবার জন্য অনেকটা সময় দিলেন। এই অনেকটা সময় ধরে মাশা এটা ভাবল না যে, তার কথা বলবে কি বলবে না। সে শুধু এটাই ভাবল যে, বলবে তো কী বলবে? বলার মতো আছে কী? কতটাই বা জানে সেই ব্যক্তি সম্পর্কে, যাকে কখন মন দিয়ে বসেছে সেটুকুও জানে না।

_____
আজও দেখা হয়েছে অরিত্রের সাথে তার। অবশ্যই বিপদের সময় হয়েছে৷ আজ মাঝ রাস্তায় তার জুতো ছিঁড়ে যায়। অসহায়ের মতো বসে থাকে সেখানেই। তখন কোত্থেকে যেন অরিত্র এসে তার হাত ধরে বসল। কোনো কথা বার্তা নেই, কিচ্ছু নেই, তাকে নিয়ে প্রবেশ করল সর্বোচ্চ কাছের একটি জুতার দোকানে।
মাশার ব্যাগে আপাতত দুইটা একশ টাকার নোট, একটা পঞ্চাশ টাকার নোট, দুইটা দশ টাকার নোট, দুইটা দুই টাকার নোট মিলিয়ে আছে মাত্র ২৭৪ টাকা। এই টাকা দিয়ে জুতা তো হবে না, হলেও অন্তত এমন দোকান থেকে হবে না। মোজা পাওয়া যেতে পারে।

সে ইতস্তত করে প্রথম কথাটা নিজেই বলল,
-“আমাকে একটা রিকশায় উঠিয়ে দিন... আমি বাড়ি চলে যাই।”
চোখ রাঙিয়ে তাকাল অরিত্র। তারপর এক মেয়ে স্টাফকে ডেকে বলল,
-“ওনাকে কিছু জুতা দেখান।”

মাশা আর কিছু বলল না। বেশ কিছু কালেকশন ট্রাই করার পর একটি কালো রঙের স্টিলেটো হিলে চোখ আটকে যায়। সেটাই নিল সে। কিছুক্ষণ পর বিল পে করে অরিত্র তাকে না নিয়েই বেরিয়ে গেল।

এক প্রকার দৌড়েই তার পিছে পিছে এলো মাশা। তার বড়ো বড়ো কদমের সাথে তাল মেলাতে বেগ পোহাতে হচ্ছে বেশ। একহাতের ব্যাগের ভেতরে ছিঁড়ে যাওয়া জুতাটাও নিয়ে এসেছে। মাশা বলতে লাগল,
-“দেখুন, আমি টাকা ফেরত দিয়ে দেবো কিন্তু।”
থেমে গেল অরিত্র। পিছে না তাকিয়েই হেসে ফেলল। মাথা নেড়ে বলল,
-“ইন্ট্রেস্টসহ.. ও-কে সেনোরিটা?”
থতমত খেয়ে গেল মাশা। গাল ফুলিয়ে বলল,
-“হারাম, ব্রো।”
-“ঠিক আছে। প্রতি এক ঘন্টা অন্তর সুদ বাড়বে দুইশ টাকা। সেই হিসেবে আগামীকাল এই সময়ে ফোরটি এইট হান্ড্রেড টাকা বেশি দেবে।”
-“এইটা তো আমার জুতার দামের চেয়েও বেশি।”
কাঁধ উঁচাল অরিত্র,
-“তো তোমাকে দিতে বলেছে কে?”

হাপিত্যেশ করল মাশা। এই লোকের কাছ থেকে জুতাই নেওয়া উচিত হয়নি।
পরক্ষণে নিজেকে এই বলে সান্ত্বনা দিলো, ভালোবাসার মানুষটির থেকে পাওয়া প্রথম উপহার এটা। উপহারে সে জুতা পেল। যেদিন সে নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে পাবে না, সেদিন এই জুতাটাই ছুড়ে মারবে ফর শিওর। এসব ভেবে পুরোদস্তুর শান্ত হলো। মাশার এ রূপ কে দেখেছে আগে?

অরিত্র পকেটে হাত গুঁজে আগের চেয়ে ধীরভাবেই হাঁটছে এখন। আঁড়চোখে মাশাকে একবার দেখে বলল,
-“ক্লাস নেই?”
-“আমার তো জুতা ছিঁড়ে গেছে। এত সুন্দর বাহানা থাকলে ক্লাসে যাব কেন?”
-“এখন কি খালি পায়ে হাঁটছো?”
-“এইটা তো আপনি জানেন। বাসায় গিয়ে পায়ের জুতাটাও ব্যাগে ঢুকিয়ে খালি পায়ে হাঁটব।”

অরিত্র কপাল কুঁচকে তাকাল,
-“তোমাকে আমি সিরিয়াসলি খুব ইনোসেন্ট মেয়ে ভেবেছিলাম।”

চোখ পিটপিট করল মাশা, ঠোঁট গোল করে বলল,
-“হ্যাঁ, সেটা তো আমিই। ই-নো-সে-ন্ট! কোনো ডাউট আছে? থাকার কথা না। আমি অত্যন্ত ভালো মানুষ। আমি এখনো ব্যাগে থেকে বিশ টাকা হারিয়ে ফেললে ফ্যাতফ্যাত করে কান্না করে ফেলি।”

অরিত্র আর কিছু বলল না। রাস্তার মাঝে দাঁড় করিয়ে রাখা তার কালো রঙের গাড়িটিতে উঠতে উঠতে বলল,
-“চলো, তোমাকে বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে আসি।”
মুচকি হেসে মাশা উঠে বসল ফ্রন্ট সিটে। কিন্তু কোনোমতেই নিজের এড্রেস বলল না। প্রসঙ্গ পালটে বলে যেত লাগল,
-“একবার ঘটলে ইনসিডেন্স, দ্বিতীয়বার কো-ইন্সিডেন্স। অথচ আমাদের দেখুন! এটা আমাদের পঞ্চম কো-ইন্সিডেন্স।”
ড্রাইভিংয়ে সম্পূর্ণ মনোযোগী অরিত্র বলল,
-“তোমাকে কে বলল এটা কো-ইন্সিডেন্স? প্রথমটা কিংবা এই পঞ্চমটা? কে বলল?”

মাশা অবাক হতে হতেও হলো না। বরঞ্চ আনন্দ নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
-“তাই না? আমিও তাই ভেবেছিলাম। আচ্ছা, প্রমাণ করুন এটা কো-ইন্সিডেন্স না। আমাকে বলুন, আমার নাম কী?”

অরিত্র একটু ভেবে নিয়ে বলল,
-“মাশনূহা মেহনূর।”
-“সেটা তো ভালো নাম৷ ডাকনাম কী?”
অরিত্র থেমে থেমে বলল,
-“সে-নো-রি-টা।”

চলবে...
written by: নবনীতা শেখ

Olindo Rahman

Olindo Rahman

A good book is worth a hundred good friends. 
But a good friend is equal to a library.!! 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Your experience on this site will be improved by allowing cookies Cookie Policy