অরিত্র থেমে থেমে বলল,
-“সে-নো-রি-টা।”
মাশা শ্বাস ফেলল। সবকিছুই কো-ইন্সিডেন্স! এই লোকটা তার ব্যাপারে কিচ্ছু জানে না। কিচ্ছু না। সে আগেই একদিন বাসার সামনে পৌঁছে দিয়েছিল, তাই এখন এভাবে ঘুরিয়ে যাওয়াটাও তার নাটক ছাড়া কিছু না।
অতিষ্ঠ মাশা একসময় জিজ্ঞেস করল,
-“আপনার বাসা কই?”
-“বাসায়।”
-“থাকেন কোথায়?”
-“মাটির ওপরে।”
জিলাপি কোথাকার! মাশার প্রশ্ন করাই ভুল হয়েছে। মাশা গাল ফুলিয়ে অন্যদিকে তাকাল। অরিত্র আড়চোখে সেটা দেখে না হেসে পারল না৷
তারপর যখন তারা বাড়ির সামনের রাস্তায় পৌঁছাল, তখন নেমে যাওয়া সন্ধ্যা। এলাকার ইলেকট্রিসিটিতে সমস্যা হয়েছে বোধহয়। সবখানের সব আলো নেভানো। স্ট্রিট লাইটও জ্বলছে না। গাড়ির হেডলাইটে যতদূর দেখা যাচ্ছে, ততদূরও কেবল অন্ধকার।
মাশা গাড়ি থেকে নামার বদলে চুপ হয়ে বসে রইলো। অরিত্র কিছুক্ষণ ভেবে জিজ্ঞেস করল,
-“কোনো সমস্যা?”
মাশা তাকাল তার দিকে, তারপর আবার জানালার বাইরে,
-“আমার যেতে ইচ্ছে করছে না। মনে হচ্ছে, আরও একটু সময় কাটানো উচিত।”
-“কোনো বিশেষ কারণ?”
-“উঁহু... এমনিই।”
-“তাহলে এখন কী করবে? আমার সাথে যাবে?”
চোখ মুখ জ্বলে উঠল মাশার,
-“সত্যি? আপনার সাথে নিয়ে যাবেন?”
ঘাড় নাড়ল অরিত্র,
-“যাওয়া যায়। তবে.. একটা শর্ত।”
-“কী?”
-“কোনো প্রশ্ন করা যাবে না।”
-“আ-চ্ছা-আ।”
এ আর এমন কঠিন কী? চুপ থাকার চেয়ে শান্তি আর কিছু আছে নাকি? মাশা ঠোঁট চেপে হাসতে লাগল। অরিত্র গাড়ি ঘোরাল। সে জানে, মাশা প্রশ্ন না করে থাকতে পারবে না। এই যে, তাকে বলা হয়েছে প্রশ্ন করা যাবে না। এতে করে সে যদি আগে কুড়িটা প্রশ্ন করত, এখন করবে বাইশটা।
মাশার সর্বপ্রথম প্রশ্নটা এ-ই ছিল,
-“আচ্ছা, আমি কোনো প্রশ্ন করব না। কিন্তু কোথায় যাচ্ছি?”
এক! কাউন্ট করতে গিয়ে এক খণ্ড শ্বাস ফেলল অরিত্র। ক্লান্ত গলায় জবাব দিলো,
-“সপ্তম আকাশে।”
ঠোঁট গোল করে “ওওও” বলে মাশা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
-“আচ্ছা। আর কোনো প্রশ্ন করব না। কিন্তু সপ্তম আকাশে কীভাবে যাব?”
দুই! অরিত্র জবাবে বলল,
-“উড়ে উড়ে।”
মাশা পূর্বের ভঙ্গিমায় ফের বলল,
-“আচ্ছা, আপনার গাড়ি উড়তেও পারে?”
তিন! অরিত্র হেসে ফেলল নৈঃশব্দ্যে। তারপর একাধারে একটা একটা করে প্রশ্ন শুরু হলো মাশার। সেই প্রশ্নগুলো থামল তখন, যখন গাড়ি ব্রেক কষল একটা অষ্টম তলা বাড়ির সামনে। আচমকা ব্রেক কষায় থমকে গেল মাশা। সুবিশাল সেই বাড়িটা, যা পুরোদফা আভিজ্যতে পূর্ণ.. তার দিকে অনিমেষ তাকিয়ে রইল উইন্ডো দিয়ে।
মেয়েটার পিঠ এখন অরিত্রের চোখের সামনে। অরিত্র তার দিকে সামান্য ঝুঁকল। ডান কাঁধের চেয়ে সামান্য দূরত্ব রেখে মাশার ডান হাতটা ধরল। কেঁপে উঠল মাশা। পিছে তাকানোর পূর্বেই অরিত্র সেই হাতের তর্জনী নিয়ে অষ্টম তলা বরাবর তাক করল। আঙ্গুলের দিক অনুসারে দৃষ্টি স্থির করল মাশা। অরিত্র শান্ত স্বরে বলল,
-“ওই অ্যাপার্টমেন্টে আমি থাকি। যদি কখনো আমাকে খুঁজে না পাও, এখানে চলে আসবে। হু?”
তারপর অরিত্র সরে গেল। বের হয়ে গেল গাড়িটা থেকেও। তার আগে অবশ্য একবার বলে গেল,
-“তোমাকে বাড়িতে পৌঁছে আমার অফিসে যেতে হবে। একটা জরুরি ফাইল আছে আমার স্টাডিরুমে। আমি নিয়ে আসি। তুমি চাইলে এখানে থাকতেও পারো, চাইলে আসতেও পারো।”
তারপর আর পিছে না তাকিয়ে সোজা ভেতরে, লিফটে। বাটন প্রেস করে লিফটের দরজা বন্ধ করতে যাবে, তার আগেই কোচিং ব্যাগ কাঁধে হিল পরা মেয়েটা দৌড়ে দৌড়ে ভেতরে চলে এলো। সে হাঁপাচ্ছে, অথচ হাসছেও। তার হাসি দেখে অরিত্র আর কিছু বলল না। তবে বলতেও ইচ্ছে করল খুব—বোকা সেনোরিটা!
বসুন্ধরার সেভেনথ ফ্লোরের একটা লাক্সারিয়াস অ্যাপার্টমেন্টের হলরুমে বসে হা হয়ে আছে মাশা। নাহ! এত আভিজাত্য দেখে সে অবাক হয়নি। অবাক হয়েছে এটা দেখে যে, দুইসিটের একটা সোফা, একটা টেবিল আর একটা শেলফ ছাড়া এত বিশাল রুমটা পুরোটাই খালি? আশ্চর্য!
সে বসে থাকতে পারল না। উঠে দাঁড়াল। আর যেদিকে দু'চোখ যায়, যেতে লাগল। সবার আগে চলে এলো ডাইনিংয়ে। ছোট্ট এটা, কিচেনের সাথে লাগোয়া। এখানে কোনো টেবিল নেই। কেবিনেটের সাথে লাগোয়া একটা এক্সট্রা স্পেস আর একটা চেয়ার। পুরো কিচেন ঘুরে খাবার মতো পেল শুধু কফি, কিছু মগ, একটা গ্লাস, একটা জগ আর দুটো চামচ। ওহ! ওয়াও!
হাঁটতে হাঁটতে মাশা দেখতে পেল, বেডরুমেও চলে গেল। এখানে এসে আর অবাক হলো না মাশা। বেড আর ক্লথ-কেবিনেট বাদে আর কিছুই নেই। মাশা এবার স্টাডিরুমের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। যাক! এই রুমটা অন্তত একটু ভরা। চেয়ার, ডেস্ক আর তিন দেয়াল ভর্তি বই। হাঁপ ছাড়ল মাশা।
যা খুঁজতে এসেছিল, তা খুঁজে পেতেই অরিত্র মাথা তুলে তাকাল। মাশাকে তখন ঠিক তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করল,
-“কিছু খাবে? কফি অর সামথিং এলস?”
হাপিত্যেশের সুরে মাশা জিজ্ঞেস করল,
-“সামথিং এলসে কী কী অপশন আছে?”
ওহ! মেয়েটা তাহলে দেখে ফেলেছে! হেসে ফেলল অরিত্র,
-“পা-নি আছে, সেনোরিটা। খাবে?”
মাশা চোখ সরু করে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। আর তারপর জিজ্ঞেস করল,
-“ঘরে কিচ্ছু নেই। আপনি কি এখানে আসলেই থাকেন?”
বের হতে হতে অরিত্র পিছে ফিরে তাকাল,
-“আমি রাতের মিল স্কিপ করি। আর সকালে স্রেফ কফি। লাঞ্চ অফিসেই করি। বাকি সময় খিদে পেলে, অনলাইন অর্ডারে আনিয়ে নিই। তারা মিডনাইটেও এভেলেবল।”
মাশা আর কিছু বলল না এখন। অরিত্রের পিছে পিছে লিফট, এরপর আবার গাড়ি। উঠে বসল দুইজনই। গাড়ি স্টার্ট করা হলো। ড্রাইভ করতে থাকা অরিত্রের দিকে অনিমেষ তাকিয়ে রইলো মাশা। টের পেতে অরিত্র জিজ্ঞেস করল,
-“কোনো সমস্যা?”
দীর্ঘশ্বাস ফেলে জিজ্ঞেস করল মাশা,
-“আপনার বাড়ির খাবার খেতে ইচ্ছে করে না?”
-“নাহ।”
-“আসলেই নাহ? কেউ একজন অনেক ভালোবাসা নিয়ে আপনার জন্য কিছু খাবার রান্না করবে, আপনার ইচ্ছে করে না?”
সম্মুখে চোখ স্থির রেখে অরিত্র জানাল,
-“এমন কেউ নেই।”
অবাক হলো মাশা,
-“নেই? আপনার প্যারেন্টস?”
-“তারা দেশের বাইরে থাকেন।”
-“তাদের রান্না মিস করেন না?”
-“আমার মা রান্না করতে জানেন না।”
-“ওমাহ! তাহলে কী খেয়ে বড়ো হয়েছেন?”
-“বাতাস।”
মাশার প্রশ্নগুলো একেকটা তার মতোই আজব। দ্বিতীয়বার যখন তার প্রশ্নগুলো থামল, তখনও ব্রেক কষল অরিত্র। তার বাড়ির সামনে। এখনো ইলেকস্ট্রিটি নেই। মাশা থেমে থেমে জিজ্ঞেস করল,
-“পৌঁছে..গেছি?”
-“হু।”
মাশা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নামল। এরপর একবারও না তাকিয়ে সোজা চলে গেল বাড়ির ভেতর। অরিত্র সেখানে দাঁড়িয়েই গাড়িতে হেলান দিলো, পকেট হাতড়ে বের করল সিগারেটের প্যাকেট, লাইটার। একটা জ্বালিয়ে ঠোঁট গুঁজতেই মাশা যেভাবে ভেতরে প্রবেশ করেছিল, ইউটার্নে সেভাবেই ফিরে এলো। একদম সেই প্রথম দিনের মতো।
হড়বড়ে পদক্ষেপে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলল,
-“আপনি স্মোক করছেন, অরিত্র?”
অরিত্র শান্ত কণ্ঠে বলল,
-“তোমাকে এখনো আমার নাম বলিনি।”
মাশা থমকে গেল। তবু দমে না গিয়ে বলল,
-“বলেননি। যাই হোক। আপনি সিগারেট খাবেন না।”
অরিত্র তাচ্ছিল্যের সাথে সূক্ষ্ণ হাসল। অন্যদিকে চোখ ঘোরাল,
-“তো কি খাব? তোমায়?”
-“হ্যাঁ।”
মাশার অবিলম্ব জবাব। সে কথাটা বলে এক সেকেন্ডও অপেক্ষা করল না। পা উঁচিয়ে দাঁড়াল, তার একহাতের সিগারেটটা নিজের হাত দিয়ে ফেলে দিয়ে ঠোঁটের ভাঁজে ঠোঁট ছোঁয়াল। সামান্য স্পর্শ। স্রেফ স্পর্শ! এটাকে কোনোভাবেই কি চুমু বলা যায়? যায় না।
মাশা মুখ একটুখানি সরিয়ে নিয়ে সেভাবেই চোখে চোখ রেখে বলল,
-“উইল ইউ লাভ মি, লাইক দ্য পেইন লাভস মি?”
-“লাইক দ্য পেইন লাভস ইউ?”
প্রশ্নটা করেই থামল অরিত্র, প্রায় সেকেন্ডের বিরতিতে বলে উঠল,
-“ও-কে।”
তারপর আর কোনো কথা হলো না দু'জনের মধ্যে। একটা অর্থবোধক শব্দও না। ঠোঁটের দূরত্বে মাইনাসে চলে এলো। যেন অরিত্র তাকে বোঝাতে লাগল এটা যে, দেখো বোকা মেয়ে, একটা পার্ফেক্ট কিস এটাকেই বলে!
মাশা ঘোরে চলে গেল। হাত দুটো হয়ে এলো মুষ্টিবদ্ধ, চোখ দুটো বন্ধ আর ঠোঁটে মৃদু হাসি। সে এক অন্য দুনিয়ায়, অন্য জগতে ভাসছে। এর মধ্যে নিঃশ্বাস নেবার প্রয়োজনীয়তায় যখন অন্তরঙ্গতা কমল, ফিসফিসিয়ে অরিত্র ডাকল,
-“সেনোরিটা!”
তারপর? কিছুটা দূর থেকে ভেসে এলো একটা গম্ভীর স্বর। মাশা আঁতকে উঠল। বড়ো বড়ো চোখে তাকাল ডাকের উৎসের দিকে। রকিব সাহেবের স্বর ছিল সেটা। তিনিই বলেছিলেন, “মাশা! কী করছো?”
মাশার হাঁটু কাঁপতে লাগল, দূর্বল লাগতে লাগল ভীষণ। ব্যাখ্যায় বলতে লাগল,
-“বাবা, প্লিজ রাগ কোরো না। আ'ম সরি। ও হচ্ছে, অরিত্র। আমি ওকে খুব পছন্দ করি বাবা। আ'ম সরি এগেইন। রিয়েলি ভেরি সরি।”
মাশা কাঁদো কাঁদো গলায় এটুকু বলেই অরিত্রের দিকে তাকাল। প্রতিবার তো সামান্য থেকে সামান্য বিপদে লোকটা তাকে হেল্প করেছে। আজ কেন মূর্তির মতো এভাবে দাঁড়িয়ে? কেন কিছু বলছে না? ঠোঁট উলটে এলো মাশার। শব্দ করে কেঁদে উঠল।
খালি পায়ে দাঁড়িয়ে একা পাগলের মতো কর্মকাণ্ড করতে থাকা মেয়েটার দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে রইলেন রকিব সাহেব।
চলবে..
Leave a comment
Your email address will not be published. Required fields are marked *