খালি পায়ে দাঁড়িয়ে একা পাগলের মতো কর্মকাণ্ড করতে থাকা মেয়েটার দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে রইলেন রকিব সাহেব। সময় নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
-“কোচিং থেকে বের হয়েছো কখন?”
-“যাইনি।”
-“তোমার ফোন ফেলে রেখে এসেছিলে, তোমার ক্লাসমেট দিয়ে গেছে।”
রকিব সাহেব মাশার ফোন এগিয়ে দিলে মাশা বিভ্রান্ত হাসে। তারপর আচমকা একটু আগের ছটফটে ভঙ্গিতে অরিত্রকে বিশ্লেষণ করা থেকে পালটে গিয়ে আহ্লাদী হয়ে যায়। বাবার ডান হাতটা নিজের দুইহাতে জড়িয়ে মুচকি হেসে বলে,
-“বাবা, আজকে আলু-পরোটা বানাই?”
-“আচ্ছা।”
-“ঠিকাছে। আমি ফ্রেশ হয়েই বানাবো।”
এরমধ্যে ফ্ল্যাটে প্রবেশ করতে করতে রকিব সাহেব আবার জিজ্ঞেস করলেন,
-“খালি পায়ে কেন হাঁটছো?”
-“বাবা, কোচিংয়ে যাবার সময় জুতো ছিঁড়ে গেছে। কোচিংয়ের পাশে সেলাইয়ের দোকান ছিল.. ওইদিকে ক্লাস শুরু হয়ে গেছে। আমি জুতা ওইখানে রেখেই ক্লাসে চলে গেছি। ফেরার সময় মনে নেই আনতে। আগামীকাল আনব।”
এইকথাগুলো তার ঠিক ততটাই সত্য, যতটা মিথ্যে ছিল কিছুক্ষণ আগের ঘটনাগুলো। রকিব সাহেব স্থির চোখে তাকিয়ে রইলেন।
______
“অরিত্র! যার কোনো সারনেম নেই, আমি দিইনি। সে ছিল পুরোদস্তুর আমার ভ্রম। এই সত্যের মুখোমুখি হলাম সেদিন, যেদিন তাকে আমি প্রথম চুমু খেলাম। সেদিন, যেদিন বাবা সব জেনে গেল। এত সব সাইকিয়াট্রিস্ট ঘুরিয়ে-টুরিয়ে বাবা কতভাবেই না চেষ্টা করল মানাতে যে, বিশিষ্ট জনাব আমার স্রেফ ভ্রম।
আমি মানতে রাজি নই। ওই বখাটেদের থেকে বাঁচানো, বাসে ওঠানো, ফুচকা গলায় আটকে গেলে পানি এনে দেওয়া, উলটে যাওয়া রিকশা থেকে বাঁচানো কিংবা জুতো ছিঁড়ে যাওয়ায় নতুন জুতো কিনে দেওয়া ও তার অ্যাপার্টমেন্টে নিয়ে যাওয়া... এসব কীভাবে আমার ভ্রম হতে পারে, বলুন তো? কোনোভাবেই সম্ভব না। এত ডিটেইলস তো মানুষের স্বপ্নেও থাকে না।
তারপর একদিন একদিন করে, আমি বুঝতে শিখলাম। আমি সুস্থ হলাম। আমার একাকিত্ব আমাকে দিয়ে যেই কল্পনাটা করিয়ে নিয়েছে, তা তো এতটাই ডিটেইল্ড হবার কথা। তাই নয় কি?
আমি আমার সেশনের মাঝ দিয়ে বসুন্ধরার সেই এলাকাতেও গেলাম। সেখানে ওইরকম অনেক অ্যাপার্টমেন্টের মাঝে এক্সাক্ট কোন অ্যাপার্টমেন্টের দিকে অরিত্র আঙ্গুল উঁচিয়ে দেখিয়ে বলেছিল, “যদি কখনো আমাকে খুঁজে না পাও, এখানে চলে আসবে।”—আমার মনে আছে স্পষ্ট।
আমি সেখানেও তাকে খুঁজেছিলাম।
পাইনি।
ওইযে প্রথম দেখা! ওইদিন রাস্তায় দুটো ছেলের টিজ করার মধ্যে দিয়ে আমি রিকশায় উঠে পড়লাম। সারাদিন-রাত এক করে ফিকশনাল নোভেল পড়তে থাকা আমিটা আটকে রাখা শ্বাস ফেলে ভাবতে লাগলাম, কোনো এক রাজপুত্র এসে যদি আমাকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করত? যদি করত? সে কিছুটা গম্ভীর, খানিকটা দুষ্ট আর আপাদমস্তক ইগোয়েস্টিক হয়ো। সে ঠিক কীভাবে আমাকে সেইফ করত!
বাসের অমন পরিস্থিতিতে, যদি কেউ আসত! যদি কেউ এসে আমাকে একহাতে শক্ত করে ধরত, তারপর বাসে উঠিয়ে দিত! আর ওই কথপোকথনগুলো! আমি সেদিনও বাসেই গিয়েছিলাম, তবে একা।
রিকশা সেদিন উলটে পড়েছিল ঠিকই, তবে আমাকে বাঁচিয়েছে সেখানে থাকা মানুষেরাই। ফুচকা কাণ্ডে পানি আমি নিজেই খেয়েছি। আর সেই হাঁটতে থাকা রাস্তা তো কল্পনার 'পরে উৎসর্গ করে দিয়েছি।
তারপর ছিঁড়ে যাওয়া জুতো মুচির দোকানে দিয়ে ক্লাসে গিয়ে অমনোযোগী বসে ছিলাম। সেই কালো গাড়িটা, কালো শার্টের প্রথম দুটো বোতাম খুলে রাখা মানুষটা, যার হাতে কালো ওয়াচ, ফরসা বুক, চোখ দুটোয় ছিল কিছু একটা...
আর শেষমেষকার চুমুটা ছিল আমার ফিরতি রাস্তার ভ্রম।
My First Kiss...
With Someone Who Doesn't Even Exist!
যেদিন আমি তাকে আমার কল্পনা হিসেবে কবুল করে নিলাম, সেদিন আমি কতটা ভেঙেছিলাম—সেটুকু না-ই বা বললাম। শুধু এটুকু সত্য.. ওই মানুষটা, যাকে আমি অরিত্র বলে মানতাম, যাকে আমি আমার গুমোট জীবনের চাঞ্চল্য হিসেবে মনে জায়গা দিয়েছিলাম—সে এরপর হারিয়ে গেল একদিন। আমিও হারালাম আমার অনুভূতিগুলো। আমিও হয়ে উঠলাম নির্লিপ্ত। ছোট্ট মাশা, তারপর এভাবে এভাবেই বড়ো হয়ে গেল।
মাশনূহা মেহনূর
১১ জুলাই, ২০১৬
বাড্ডা, ঢাকা।
____
আট বছর পুরোনো জার্নালটার শেষ পৃষ্ঠায় এটুকুই লেখা। এরপর আর মাশনূহা সেটা খুলে দেখেনি, ফেলেও দেয়নি৷ অযতনে রেখে দিয়েছে আলমারির পুরোনো এক ড্রয়ারে।
দীর্ঘ দশ পর মাশনূহার জীবনের সবচেয়ে বড়ো পরিবর্তন যেটা, সেটা হলো—রকিব সাহেবের মৃত্যু। তিনি যখন মারা যান, তখন মাশার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া শেষ, দেশের বাইরে যাওয়ার পরিকল্পনায় ছিল। শান্ত, শক্ত, অনুভূতিহীন একটা বাস্তবজ্ঞানসম্পন্ন মেয়ে সে। দাদার বাড়িতে বাবার দাফন হলো। দুইদিন সেখানে থেকেই মাশনূহা পুরোনো অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে এলো। সে আরও একবার নিজেকে হারাল। হারিয়ে গেল তার নামটুকুও। বাবা ছাড়া কেউ তো ছিল তাকে মাশা ডাকার। সে হয়ে উঠল মাশনূহা মেহনূর, অথবা স্রেফ মাশনূহা। আর তারপর চলে গেল অস্ট্রেলিয়া...
সেখান থেকে যখন ফিরল, তখন যেন মাশনূহার মধ্যে আরও একদফা গাম্ভীর্য কেউ ঢেলে দিয়েছে। অহেতুক তো আগেই হাসত না, এখন সম্মানসূচক হাসিটাও তার আসে না। দেশে ফিরেই সে একটা কোম্পানির অফার লেটার পেয়ে গেল।
জয়েনিংয়ের পর মাশনূহার রুটিনটা এমন, সকালে কফি, লাঞ্চ অফিসে, রাতের মিল স্কিপ; ইচ্ছে করলে মিডনাইটেও এভেলেবল রেস্তোরাঁ আছে, যারা হোম ডেলিভারি দিয়ে থাকে।
রুটিনটা চেনা লাগছে না? লাগারই কথা।
এসবের মাঝে মাশনূহার পানসে জীবনটা অহেতুক এক শখ পোষণে কাজ করতে লাগল। তার ছয় ডিজিটের সেলারি থেকে সে হিসেবি খরচ করতে লাগল। আর বাকিটা?
সে-ভি-ং-স!
তারপর একদিন সে করে বসল একটা অভাবনীয় কাজ। তার সেভিংসের সবটাই ব্যাংক থেকে উইথড্র করে নিল। আর ওইযে, ওই অ্যাপার্টমেন্ট... ওইটা! কালো রঙের গাড়ি থেকে যেটার দিকে আঙুল তাক করা ছিল, ওইটা বিক্রি হচ্ছে। এ কথা জানার পরও মাশনূহার মতো উন্মাদ মেয়ে চুপ থাকবে? নিজের এ অবধি জমানো সব টাকা ডাউন পেমেন্টে সে কিনে নিল অ্যাপার্টমেন্টটি।
আর যে বলেছিল, সে বাস্তবজ্ঞানসম্পন্ন হয়ে গেছে। সে এইখানে ভীষণ ভুল! মেয়েটা এখন আগের চেয়েও বেশি পাগলামি করে। তবে তার পাগলামিগুলো অনেক শান্ত, অনেক নির্লিপ্ত।
_____
অফিসের নিচে দাঁড়িয়ে মাশনূহা বৃষ্টি থামার অপেক্ষায় ছিল, ছাতা নিয়ে আসেনি আজ। বাঁ হাতে ঘড়ির সময় দেখে সে আবার সম্মুখে তাকাল। হঠাৎ তার এক কলিগ ডাক দিল,
-“এক্সকিউজমি? মাশনূহা?”
মাশনূহা পিছে ঘুরে বলল,
-“জি?”
-“আমি আতিফ। নিউ জয়েন করেছি। আপনার সাথে পরিচয় হওয়া হয়নি। আপনি কি আমাদের সাথে ডিনারে জয়েন করবেন? না বলবেন না।”
বৃষ্টি থেমে গেছে। মাশনূহা সরু চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। আতিফ যখনই তার নিরবতাকে সম্মতির লক্ষণ ধরে নিয়ে স্বস্তির শ্বাস ফেলতে যাচ্ছিল, মাশনূহা তার আপাদমস্তক চোখ বুলিয়ে ছোট্ট দুটো শব্দে বলে উঠল,
-“নট ইন্ট্রেস্টেড।”
র্যুড! ট্যু র্যুড! আতিফ থতমত খেয়ে তাকিয়ে রইল মাশার চলে যাওয়ার দিকে। মেয়েটা অন্তত ভদ্রতার খাতিরে একটুখানি বিশ্লেষণের সাথেই বলতে পারত যে, যাওয়া সম্ভব নয়! তাই বলে এভাবে ডিনারে যেতে অনাগ্রহী জানাল?
ওয়্যেইট! আতিফ আরও এক দফায় ভড়কে গেল এটা বুঝে ওটবার পর। মেয়েটা সরাসরি তাকে রিজেক্ট করেছে। ডিনারকে না।
_____
কালো ফুল স্লিভস কুর্তার সাথে ফ্ল্যাট হিলের খটখট শব্দ ব্যস্ত রাস্তার পাশ ঘেঁষে বিশেষ প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না। মাশনূহা আজ উবারের বদলে হেঁটেই এসেছে। রাস্তা নেহাতই কম নয়।
হাঁটতে হাঁটতে আচমকা আবারও ঝুম বৃষ্টি নামে। এই বৃষ্টি মাশনূহার যাত্রা সেকেন্ড দুয়েকের জন্য থামিয়ে দেয় অবশ্য, তবে অন্যত্র ছাউনিতে নিতে পারে না একদমই। সে এভাবেই হাঁটতে লাগে। সম্পূর্ণ ভেজা অবস্থায়। কাঁধ অবধি চুলগুলো লেপটে থাকে ঘাড়ে।
এদিকে সারাদিনের বৃষ্টির বদলে রাস্তাটাও ভিজে পিচ্ছিল। তার আজকের দিনে হেঁটে আসাটা ছিল এ বছরের সবচেয়ে বড়ো বোকামি। কিছুক্ষণের মধ্যেই মাশনূহা সেটা টের পেল, যখন তার তিন ইঞ্চির হিল তার বিরুদ্ধাচারণ ঘটাল।
স্লিপ! অলমোস্ট স্লিপড! মাশনূহা চোখ-মুখ কুঁচকে ফেলল। কিন্তু আশ্চর্য! সে পড়ল না। কারো শক্ত হাতটা তার কোমর জড়িয়ে রেখেছে। কারো চোখ দুটো আটকে আছে তার নিষ্পাপ মুখের দিকে।
মাশা ধীরে-ধীরে চোখ খুলল। অন্য কারো হাত শরীর স্পর্শ করেছে ভাবতেই গা ঘিনঘিন করে উঠল। সে দ্রুততার সাথে সড়তে গিয়ে আরও একবার পিছলে গেল। ভদ্রলোকের হাত আরও শক্ত করে চেপে ধরল তার কোমর। ক্রুর হাসল লোকটা,
-“ভালো কিছু সহ্য হয় না, না?”
সেভাবে তাকিয়ে মাশনূহা দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
-“লিভ।”
-“ও-কে।”
সত্যি সত্যিই ছেড়ে দিলো! মাশা পড়ে গেল কর্দমাক্ত রাস্তায়। তার চোখ-মুখ আবারও কুঁচকে গেল ব্যথায়। এভাবে ছাড়তে তো বলেনি সে! হতাশ হলো। হতাশা নিয়ে চোখ খুলে সামনে তাকাতেই সে দেখতে পেল ঠিক সামনে দাঁড় করে রাখা গাড়ির হেডলাইটের তীব্র আলো; চোখে প্রবলভাবে আছড়ে পড়ল। সেই আলো দিয়ে সম্মুখের অবয়বকে হালকাভাবে তার দিকে ঝুঁকে থাকতে দেখল।
ভদ্রলোক নিজের বিদ্রুপের হাসিটা ঠোঁটের বাঁকে রেখে বলল,
-“ব্যথা পেয়েছো? You deserve it. সবখানে ইগো দেখানো লাগে না। And huh... Better to know now than regret later—”
ভদ্রলোক থামল, আরও সামান্য ঝুঁকে ফিসফিয়ে বলে উঠল পরবর্তী কথাটা। তারপর? তারপর বয়স সাতাশের মাশনূহা মেহনূরকে কর্দমাক্ত অবস্থায় সেখানে ফেলেই উঠে পড়ল নিজের কালো রঙের সেই স্পোর্টস কারটিতে।
রাগে, দুঃখে কথা হারিয়ে ফেলেছিল মাশনূহা। কাঁপছিল থরথর করে। তার শেষবাক্যটা মাশনূহাকে জমিয়ে ফেলল এক নিমিষেই। সে তাকিয়ে রইলো বড়ো বড়ো চোখে। এটা কোনোমতেই তার ভ্রম নয়। আর না তো এই দৃশ্য।
সম্মুখের ভদ্রলোকটা নিজের গাড়ি নিয়ে ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যেতে লাগল। তবু কানে বাজতে থাকল তার কিছুক্ষণ আগে বলা কথা,
-“এটাই লাইফ, সে-নো-রি-টা! এখানে ঘোড়ায় চড়ে রাজপুত্র আসে না; রাক্ষস আসে। লাইক মি...”
হয়তো নতুন কোনো সংঘর্ষ! হু নো'জ?
।। সমাপ্ত।।
Leave a comment
Your email address will not be published. Required fields are marked *