"এক ভয়ংকর হাসি শুনতে পেলাম... তীক্ষ্ণ... যেন কাচের তৈরি ঘন্টা বেজে উঠলো। এখনো সেই হাসির কথা মনে পড়লে বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। ওটা কোন মানুষের গলার আওয়াজ হতে পারে না!"
শুরুতেই স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, "এই কাহিনী বিশ্বাস করা বা না করা সম্পূর্ণ পাঠকের ব্যক্তিগত ব্যাপার।"
অনুবাদকের মতে যারা ড্রাকুলা পড়েননি, তাদেরও এটা পড়তে সমস্যা হবেনা। যেহেতু এটা ড্রাকুলার অফিশিয়াল প্রিক্যুয়েল। এবং সাথে পরামর্শ দিয়েছেন, যারা "ড্রাকুলা" পড়েননি, তারা "ড্রাকুল" পড়ার পর, "ড্রাকুলা'স গেস্ট" ছোটগল্প পড়ে তারপর যেনো "ড্রাকুলা" পড়েন। এতে করে পাঠকেরা পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারবেন।
.
"ড্রাকুল" ~ নতুন এক ক্লাসিক ভ্যাম্পায়ার। গল্পটা শুরু হয় ব্রাম স্টোকারের শৈশবকাল থেকে। ব্রামের বয়স তখন ৭ বছর। ব্রাম ছিলো খুবই অসুস্থ এবং প্রায় মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে। হুট করেই ব্রাম পরিবারে আগমন ঘটে "এলেন ক্রোন" নামের এক আয়ার। এলেন ক্রোন ব্রামকে খুবই ভালোবাসে। ব্রামও একই। এমনই একদিন ব্রামের শারীরিক অবস্থা খুবই করুন হয়। এমনকি বাঁচার আশা ছেড়েই দেয়। চিকিৎসা করতে আসে এডওয়ার্ড চাচা। সারা শরীরে জোঁক বসিয়ে ব্রামের চিকিৎসা করার চেষ্টা করেন তিনি। ব্রামের অবস্থা আরোও করুন হতে থাকে। যন্ত্রণায় ছটফট করছিলো ব্রাম। এর মধ্যেই ব্রামের প্রিয় আন্টি এলেন ক্রোনের হাতে ঘটে যায় এক অলৌকিক ঘটনা। ব্রাম একদম পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যায়। ব্রামের মা-বাবা বলেন এডওয়ার্ড চাচা ব্রামকে সুস্থ করেছেন। কিন্তু ব্রামের বোন মাতিলদা এবং ব্রাম এটা কিছুতেই বিশ্বাস করে না। আসলে কে ব্রামকে বাঁচিয়েছিলো সেদিন?
প্রতি রাতে এলেন আন্টি কাউকে কিছু না বলে যেনো কোথায় যান। এলেন আন্টির আচার-আচরণ খুবই রহস্যময়। ব্রাম এবং মাতিলদা একদিন চুপি চুপি এলেন আন্টির ঘরে গিয়ে অদ্ভুত সব কীর্তির সম্মুখীন হয়। এবং অবশেষে এক গভীর রাতে দুই ভাইবোন এলেন ক্রোনের পিছু নেয়। এবং স্বাক্ষী হয় কিছু ভয়ংকর ঘটনার। যা কিছু লৌকিক নয় মোটেও। কী দেখেছিলো ওরা দুজন?
এরইমধ্যে হুট করেই এলেন আন্টিকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়না। তবে কি প্রিয় এলেন আন্টি ব্রামদের ছেড়ে চলে গেলো?
প্রায় ২২ বছর পর মাতিলদা এলেন আন্টিকে দেখেন প্যারিসে। ঠিক সেই ছোটবেলার এলেন আন্টি। বয়স একদমই বাড়েনি। হুবহু একই চেহারা। অথচ এর মধ্যে পেরিয়ে গেছে ২২ টি বছর। কীভাবে এলেন আন্টি এখনো সেই আগের বয়সেই আছেন? মাতিলদা ব্রামকে জানালে চোখের ভুল ভেবে উড়িয়ে দেয়।
কী ভেবে একদিন ব্রামও সবকিছু মেনে নিলো। ওদিকে ব্রামের ভাই থর্নলির স্ত্রী এমিলি হুট করেই রহস্যজনক আচরণ শুরু করলো। থর্নলি একদিন দেখতে পায় এমিলি ইঁদুর ধরে খাচ্ছে। কেনো এমন করছে এমিলি? এলেন ক্রোনই বা কে ছিলো? কোনোভাবে ড্রাকুলার সাথে এলেন ক্রোনের সম্পর্ক আছে? এ এক অদ্ভুত রহস্য।
রহস্যের পিছনে ছুটে চলেছে ব্রাম, মাতিলদা, থর্নলি এবং অতিপ্রাকৃত সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞান রাখা আরমিনিয়াস ভামব্রে!
.
ইতোমধ্যেই বলেছি "ড্রাকুল" হচ্ছে পৃথিবীজুড়ে বিখ্যাত ক্লাসিক উপন্যাস "ড্রাকুলা" র প্রিক্যুয়েল। লেখকদ্বয়ের ভাষ্যমতে ব্রামের ব্যক্তিগত নোট এবং স্টোকার পরিবারের ডায়েরি থেকে সুক্ষ্ম গবেষণার মাধ্যমে তিনি গল্পটি একত্র করেছেন।
মূলত দুটো টাইমলাইন ধরে গল্পটা আগানো হইছে। একটা বর্তমান সময়, যেখানে আমরা দেখি ব্রাম একটা মিনারে কিছু দানবকে আটকানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু সমস্যা সৃষ্টি হয় যখন দানবকে আটকানোর যাবতীয় উপকরণ শেষ হতে চলছে। কীভাবে বের হবে এই দানবের হাত থেকে? এবং আরেকটা ১৮৪৬-১৮৬৮ সালের মধ্যবর্তী সময়ের। যেখানে ব্রাম,মাতিলদা,থর্নলি এবং মি.ভামব্রে একসাথে হয়ে রহস্যের সমাধানে বেরিয়েছেন। ডেকর স্টোকার বিভিন্ন সূত্রে কাহিনীগুলো বর্ণনা করেছেন। ব্রামের জার্নাল, মাতিলদার এলেনকে লেখা চিঠি, থর্নলির ডায়েরি, মি.ভামব্রের নোটসহ আরোও বেশকিছু দৃষ্টিকোণ। বইটা এমনভাবে লেখা হয়েছে, যেনো এটা একটা সত্য ঘটনা।
.
বইটা পড়ার সময় মনে হচ্ছিলো, আমি পড়ছি না বরং নিজেই চলে গেছি সেই ব্রাম পরিবারে। নিজের চোখেই সবকিছু দেখতেছি। ভ্যাম্পায়ারের কাহিনী। এখানে থাকবে শুধু ভয় আর ভয়। ঘুমে ব্যাঘাত ঘটানো, ভয়ানক স্বপ্ন দেখা, ঘুমের ঘোরে আচমকাই জেগে ওঠা। এদিকে ভয়ের বদলে বইয়ের আবেগঘন প্রেম অশ্রুশিক্ত করেছে আমায়। ব্যাপারটা মজার না? যদিও স্বপ্নে আমি একবার "ড্রাকুল" কেও দেখলাম মনে হলো। ইভেন ওদের সাথে মারামারিও করলাম। কিন্তু আমি খুব বেশী সময় ভয় পাইনা এসবে। এজন্য এটা যে ভয়ের বই ছিলো না, সে ব্যাপারে আমি যথেষ্ট বলতে পারবোনা। বইয়ের প্লট এবং টুইস্ট এন্ডিংয়েও বলবৎ ছিলো। আমার খুব করে ইচ্ছে করে, "এলেন আন্টি, তুমি ফিরে এসো। আমার কাছে ফিরে এসো।" দূর্ভাগ্যবশত সেটা সম্ভব না।
.
১৮ শতকের আয়ারল্যান্ডের গা ছমছমে আবহ, সেই সাথে এলেন আন্টির রহস্যময় নিখোঁজ, পুরনো মিনার, ভ্যাম্পায়ারদের রহস্য সবে মিলে দারুন একটা সময়ের সাক্ষী হলাম। ডেকর স্টোকার ভ্যাম্পায়ার সংক্রান্ত কিছু নিয়মের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ভ্যাম্পায়াররা কী কাজ করে, কী করে না, সীমাবদ্ধতা কী হতে পারে ইত্যাদি ইত্যাদি। তারা কীসে রূপান্তরিত হতে পারে? চোখের রঙ পরিবর্তন, কিছু টেলিপ্যাথি ক্ষমতা, এমনকি মৃতপ্রায়দের বিচ্ছিন্ন অংশ সম্পর্কেও তথ্য দিয়েছেন। ক্লাসিক ভ্যাম্পায়ার tropes ও প্রচুর রয়েছে সাথে মূল ভ্যাম্পায়ারকে দিয়ে নিজেকেও স্মরণ করানো হইছে, যেমন কিভাবে সে তার শত্রুদের সঙ্গে ব্যবহার করতো (স্পেশালি Carpathian প্রসঙ্গ)। ধারণা করা হয়, ভ্যাম্পায়ারদের মধ্যে সবচাইতে শক্তিশালী ভ্যাম্পায়াররা যেকোনো রুপ ধরতে পারে। যেমন: বাদুড়, নেকড়ে, কুয়াশা এমনকি মানুষেরও। আবার এদের মধ্যেও যারা অত্যাধিক শক্তিশালী হয়, তারা প্রকৃতিকেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। যেমন তারা চাইলেই কুয়াশা, ঝড় কিংবা বজ্রপাত ঘটাতে সক্ষম। এরা চাইলে তাদের ক্ষমতার বলে মানুষকেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
.
ডেকর স্টোকার যে ভ্যাম্পায়ার বিষয়ে প্রচুর ধারণা রাখে এতে অবাক হবার তেমন বিশেষ কারণ নাই। কজ "ড্রাকুল" বইয়ে আমরা যে ব্রাম স্টোকারের জীবনী পড়ছি, তিনি আর কেউ নন, স্বয়ং ডেকর স্টোকারেরই প্রপিতামহ। মজার ব্যাপার হচ্ছে স্বয়ং ব্রাম স্টোকারের রচিত ১৮৯৭ সালের "ড্রাকুলা" এবং ডেকর স্টোকারের রচিত "ড্রাকুল" উভয় বইয়েই মেইন ভিলেন হিসেবে "কাউন্ট ড্রাকুলা" ই এসেছে।
.
এখানে আরোও একটা মজার ব্যাপার যা এই বইয়েরই শেষের দিকে যুক্ত করা হইছে। সেটা হলো, ব্রাম স্টোকার যখন তার প্রথম পাণ্ডুলিপি জমা দিয়েছিলেন, অর্থাৎ "ড্রাকুলা" বইয়ের, তখন ওইটা ছিলো পুরোপুরি নন ফিকশন একটা কাজ। ব্রামের পুরো ভূমিকাটার সারমর্ম মোটামুটি এমন। "ঘটনাগুলো যাদের দৃষ্টিকোণ থেকে বর্ণনা করা হইছে, তারা প্রত্যেকেই পৃথিবীতে এক্সিস্ট করে। যাদের থেকে তিনি এই নথিগুলো নিয়েছেন। কিছু কারণে কয়েকজনের নাম এবং কিছু যায়গার নাম বদলে দিয়েছিলেন। কিন্তু যখন প্রকাশ করতে যান, তখন প্রকাশক জানান, তৎকালীন সময়ে লন্ডনে হোয়াইট চ্যাপেলে হয়ে যাওয়া মৃত্যুশোক স্থানীয়রা ভুলে যায়নাই। এমনকি খুনিকেও গ্রেপ্তার করতে পারেনাই পুলিশ। যদি এই ভূমিকাতে বই ছাপানো হয়, তবে লোকেদের মধ্যে আতংক সৃষ্টি করবে। যেজন্য বইয়ের প্রথম ১০১ পৃষ্ঠা বাদ দেওয়া হয়। যদিও ধারণা করা হয় "ড্রাকুলা'স গেস্ট" বইটা ড্রাকুলা বইয়েরই অংশ। এই কাহিনীতে প্রকাশকের উপর বেজায় চটে গিয়েছিলেন ভদ্রলোক। কী আর করার। এখানে তো বৈজ্ঞানিক কোনো প্রমাণও নেই। এরপরে সেই ১০১ পৃষ্ঠা বাদ দিয়েই ২৬ মে, ১৮৯৭ সালে প্রকাশিত হয় "ড্রাকুলা"। এরপরেও লেখক বারবার করে বলেছেন, "যে ভয়ংকর কাহিনি আমি তুলে ধরতে যাচ্ছি তা পুরোটাই সত্য। পুরো ইউরোপের অনেকেই জানেন ব্যাপারটা। অনেকের কাছে সবকিছুই অবিশ্বাস্য লাগতে পারে। বিজ্ঞানের মাধ্যমেও হয়তো ব্যাখ্যা করা যায়না। কিন্তু বিজ্ঞানের নিয়মিত উন্নতির ফলে হয়তো ভবিষ্যতে এই ঘটনাগুলোরও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আমরা পাবো।"
.
বইয়ের প্রোডাকশন কোয়ালিটি টপনচ ছিলো। বেশ ঢাউস সাইজের বই হইলেও পড়তে একেবারেই অসুবিধে হয়নাই। কিন্তু সম্পাদনায় 'র' এর ব্যবহারে মাত্রাতিরিক্ত ভুল। এর বাইরেও টাইপিং মিস্টেক, ভুল বানানসহ প্রায় ১৫০ টার মতন ভুল নজরে আসছে। এটা দুঃখজনক বটে। ৫০০ পৃষ্ঠার বইয়ে এত ভুল। লেখকের ইনবক্সে পৃষ্ঠাসহ সেগুলো দিয়ে দিয়েছি। আশা করছি পরের সংস্করণে ভুল বানানের দিকে নজর দিবেন।
আমার আরেকটা ছোট প্রশ্ন ছিলো। ব্রাম এবং মাতিলদা যখন ও'কুইভের কবর খুঁড়ছিলো তখন প্রায় ১ ঘণ্টার বেশী সময় লেগেছিলো। কিন্তু এমিলির কবর খুঁড়তে মাত্র ৫ মিনিট লাগলো? তাও আবার ভারী পাথর দিয়ে ঢাকা ছিলো। অদ্ভুত না?
.
এরপরেও আমি দারুন একটা সময় উপভোগ করেছি "ড্রাকুল" বইয়ের সাথে। যারা এই গথিক ঘরানা পছন্দ করেন, নিঃসন্দেহে বগলদাবা করতে পারেন।
বই: ড্রাকুল
মূল লেখক: ডেকর স্টোকার এবং জে.ডি.বার্কার
অনুবাদক: লুৎফুল কায়সার
ঘরানা: গথিক হরর
প্রকাশনী: চিরকুট প্রকাশনী
অনুবাদ স্বত্ব: বুকোলজি পাবলিকেশন
মুদ্রিত মূল্য: সাতশ টাকা মাত্র
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৪৮০
ব্যক্তিগত রেটিং: ৪.৭/৫
pic & review: আফ্রিদি হাসান
