[১৮+ অ্যালার্ট]
বইটা একেবারে খোলাখুলিভাবে লেখা হইছে। এজন্য অনেকেই ইতস্ততবোধ করতে পারেন পড়তে গিয়ে। কিন্তু প্রতিটা অ্যাডাল্ট সিন কাহিনীর প্রয়োজনেই আনা হইছে। মূল বিষয় ধরতে পারলে আর ইতস্ততবোধ করবেন না আশা করি।
যাই হোক, গল্পে ফিরি। বইয়ের কেন্দ্রীয় চরিত্র ইয়ং-হে। খুবই সাদামাটা এক গৃহবধূ। হুট করেই একদিন আসে, যেদিন থেকে তিনি মাংস খাওয়া বন্ধ করে দেন। মাংসের পর ধীরে ধীরে পুরো নিরামিষভোজী হয়ে যান আরকি। একইসাথে বাসাতেও তিনি আমিষ রান্না করতে দেন না। কারণ হিসেবে দেখানো হইছে এক ভয়াবহ, রক্তাক্ত স্বপ্ন। এই মেটারটাকে কেন্দ্র করেই তিনটা আলাদা আলাদা অধ্যায়ে বইটাকে পূর্ণাঙ্গ রুপ দেওয়া হইছে।
The Vegetarian (দ্য ভেজিটেরিয়ান), এই অধ্যায়ে মূলত ইয়ং-হে'র নিরামিষভোজীর ঘটনাগুলো উঠে আসছে। একটু স্পয়লার দিলে, গল্পের একটা যায়গায় এসে ইয়ং-হে'র বাবা ইয়ং-হে কে জোর করেও কোনো মাংস খাওয়াতে পারতেছিলেন না দেখে রীতিমতো সজোরে থাপ্পড় অব্দি দেন। যাই হোক, এর পরের অধ্যায়-
The Mongolian Mark (মঙ্গোলীয় চিহ্ন) আরেকটা স্বতন্ত্র অধ্যায়ে ইয়ং-হে'র বোন জামাই অর্থাৎ দুলাভাইয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা হইছে। হইচই এর একটা ওয়েব সিরিজ "সম্পূর্ণা" অনেকেই দেখেছেন নিশ্চয়ই। কিংবা কোরিয়ান মুভি "আয়লা"। একইভাবে এইযে "দ্য ভেজিটেরিয়ান" বই, এইখানেও আপনি নারীদের যৌন নিপিড়নের ব্যাপারে বেশ ভালো একটা ধারণা পাবেন। এক্স্যাক্ট কীভাবে নারীরা প্রতিটা যায়গায়, প্রতিটা সেক্টরে, প্রতিটা পরিবেশে যৌন নিপিড়নের শিকার হয়।
সর্বশেষ অধ্যায় The Flaming Trees (জ্বলন্ত বৃক্ষেরা), যেখানে ইয়ং-হে'র বোন ইন-হে'র দৃষ্টিতে সমাপ্তি টানা হইছে। এইযে পুরো ঘটনাচক্র, যার মূল কেন্দ্র ইয়ং-হে'র নিরামিষভোজী হওয়াটা মূখ্য করে দেখানো হইসে৷ যার কারণে পরিবার, সমাজ এবং নিজ সত্ত্বার কাছেও একটা খুব বড় পরিবর্তন দেখানো হইসে। বইয়ের মূল বিষয়বস্তুই এটা।
আচ্ছাহ, ভেঙ্গে বলা ভালো। স্পেশালি কোরিয়ান সমাজের পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার আদ্যপ্রান্ত উঠাইয়া নিয়ে আসছেন লেখিকা হান-কাং। যেমন ইয়ং-হে'র স্বামীর কাছে থেকে অবহেলা কিংবা যার ঔরসে তিনি জন্মেছেন, তাঁর থেকেও শোষণ এবং বঞ্চনা শিকার, নিজের পরিবারের থেকে তাচ্ছিল্য হওয়া, নিজের সহোদরা বোনের জামাইয়ের থেকে যৌনতার শিকার যেখানে ইয়ং-হে'র শরীরকে ব্যবহার করে কেবল নগ্ন বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটানো হইসে ~ প্রতিটা সুক্ষ্ম সুক্ষ্ম বিষয়ই মূলত পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার চিন্তা-ভাবনার প্রতিনিধিত্ব করে।
এইযে একজন সাধারণ নারী, যে কিনা কেবল আমিষ না খাওয়ার জন্য এতো শোষণের শিকার হলেন। এমনকি পিতার জোরপূর্বক আমিষ খাওয়ানোর প্রতিবাদে নিজের হাতের কব্জি কেটে ফেলে আত্মহত্যার চেষ্টা করলেন। দুলাভাই কেবল শিল্পের নামে তাঁর শরীর ব্যবহার করলেন। এবং অতঃপর সব যন্ত্রণা সহ্য করে তিনি এও সিদ্ধান্ত নেন যে, তিনি আর নিরামিষ ও খাবেন না৷ কেবল পানি আর সূর্যের আলো গ্রহণ করবেন। অর্থাৎ পুরোপুরি মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েন। কী হয় এরপর? এটা তো চরম বাস্তবতা। প্রতিনিয়ত তাই ঘটছে। একজন নারী কেবল মা, স্ত্রী কিংবা দেহ? এর বেশী কিচ্ছু না? সমাজ আমাদের চিন্তাভাবনা দমন করার অধিকার রাখে?
এইতো রিসেন্ট একটা জরিপে দেখলাম, চলতি বছরে স্বামীর হাতে স্ত্রী খু ন হয়েছেন ১৩৩ জন। কেনো?
বইয়ের এইযে আমিষ/নিরামিষ চ্যাপ্টার, এটা পুরোটাই পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাকে ইঙ্গিত করে। আপনি যদি ইয়ং-হে'র মাংস খাওটাকে শ্রেফ মাংসে সীমাবদ্ধ না রেখে পুরুষতান্ত্রিক ভোগবাদ ধরতে পারেন কিংবা সর্বশেষ অধ্যায়ের ইয়ং-হে'র গাছ হয়ে ওঠাকে যাবতীয় সামাজিক সম্পর্ক থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনতা ধরতে পারেন। তাহলেই আপনি এই বইটাকে অনুধাবন করতে পারবেন। আপনি আবিষ্কার করতে পারবেন প্রতিটা যায়গায় ইয়ং-হে'র পিতার আদলে পিতা, স্বামীর আদলে স্বামী এবং দুলাভাইয়ের আদলে দুলাভাই জন্ম নেয় এবং বেড়েও ওঠে। যাদের অসুস্থ মানসিকতাকে সুস্থ না করতে পারলে প্রতিটা নারীই ইয়ং-হে'র মতো বৃক্ষে রুপান্তরিত হয়ে যাবে।
কেউ বলে এটা একটা মানসিক অসুস্থতার গল্প। আবার কাউকে বলতে শুনেছি এটা কেবল নারীর দমন ও বিদ্রোহের গল্প। কেউ কেউ এও বলেন, এটা প্রকৃতির সাথে মানুষের আত্মিক সম্পর্ক স্থাপনের গল্প৷ প্রতিটা ব্যক্তির দৃষ্টিকোণ থেকে প্রতিটাই সত্য। যেমন সে সময় দক্ষিণ কোরিয়ায় আলোচনার ঝড় বইতেছিলো, কারণ এই বই নারীর দমন এবং মানসিক ভাঙ্গনের কথাগুলো স্পষ্ট ভাষায় বলে।
যেহেতু বইটা খোলামেলা ভাবে লেখা হইছে। সেক্ষেত্রে আপনি চাইলে আপনার মতো করেই ফোকাস করতে পারেন। হয়তো আপনার কাছে অস্বস্তিকর মনে হবে, নয়তো মুক্তির প্রতিক।
বইয়ের অনুবাদ করেছেন "শাওন আরাফাত" ভাই। আমি এর আগে কখনো ভাইয়ের অনুবাদ পড়িনাই। কেনো যেনো মনে হলো অনুবাদটা চাইলে আরোও ভালো করা যেতো। ছোট্ট একটা বই শেষ করতে বেশ বেগ পেতে হইছে। বইয়ে বেশ কিছু বানান ভুল, শব্দের অনুপস্থিতিও নজরে এসেছে। বইয়ের প্রোডাকশন ভালো ছিলো।
বই: দ্য ভেজিটেরিয়ান
লেখক: হান কাং
অনুবাদক: শাওন আরাফাত
ঘরানা: মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস
প্রকাশনী: ঋদ্ধ প্রকাশ
মুদ্রিত মূল্য: তিনশত পঞ্চাশ টাকা মাত্র
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ১৭২
ব্যক্তিগত রেটিং: ৪/৫
review: আফ্রিদি হাসান
