বসার ঘরের নরম গদিতে একজন ছেলে বসে আছে, আর তাকে ঘিরে সবার যত উল্লাস! পড়াশোনার সুবাদে ছোটো থেকেই ঢাকায় থাকা হয়েছে তার। এরপর কী মনে করে যেন সেখানেই বশত গেড়েছে। বাড়িমুখো হয় অবশ্য, ওই মাসে কিছুদিনের নামে। এই নিয়ে বাড়ি থেকে কেউ এখন আর তাকে কিছু বলে না। কিছু বললে, মাস চার-পাঁচের নামে নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতাটা তার আছেই।
প্রিয়র বুদ্ধি হওয়ার পর সে ছেলেটাকে দেখেনি, অথবা দেখেছে। ছোটবেলার সব স্মৃতি তো আর মাথায় থাকে না। প্রিয়র মনে একদমই নেই। তবে দেখা হয়েছিল, সেই নয় সনে। প্রিয় তখন হাঁটুর ওপর অবধি ফ্রক পরে ঘুরতে থাকা দশম বর্ষের কন্যা, ছেলেটা তখন ম্যাট্রিকের প্রিপারেশন নিয়ে নাওয়া-খাওয়া বাদ দিয়ে দেওয়া অবস্থায় থাকা তেজদীপ্ত কিশোর।
মনোহরা ভীড় অপছন্দ করলেও এগিয়ে গেলেন সেদিকে। সবাই চকিতে শান্ত হয়ে গেল। এতক্ষণের হইহট্টগোল এক নিমিষেই থমকে গেল। মনোহরা নরম গদিতে ছেলেটার পাশেই বসলেন, কণ্ঠে অমায়িক কোমলতার ছোঁয়া তার,
-“ভালো আছেন, শরৎ?”
শরৎ ভদ্রতাসূচক হেসে বলল,
-“জি, বুবুজান। আপনার শরীর ভালো?”
-“ভালো। হাত-মুখ ধুয়ে নিন। সবার সাথে পরেও কথা বলা যাবে।”
-“আচ্ছা।”
শরৎ উঠে পড়ল সেখান থেকে। সিঁড়িঘরের সামনে প্রিয় দাঁড়িয়ে আছে, একা। শরৎ শার্টটের হাতা ফোল্ড করতে করতে সিঁড়িঘরের দিকে এগোচ্ছে। প্রিয়কে ক্রস করে এক কদম এগিয়ে গিয়ে আবার দু-কদম পিছিয়ে এলো। প্রিয় তার দিকেই তাকিয়ে ছিল। শরৎ তাকে বেশ কিছু সেকেন্ড লক্ষ করল। পরক্ষণেই শুধাল,
-“প্রিয়?”
যেন সে নিশ্চিত নয়, এই মেয়েটি প্রিয় কি না। প্রিয় বিস্মিত ভঙ্গিমায় মাথা ওপর-নিচ নাড়ে। চিনল কী করে? জিজ্ঞেস করতে যাবে তা, ওমনিই শরৎ সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল। যাওয়ার পূর্বে তার ঠোঁটের কোণঘেঁষা হাসিটা প্রিয়র নজরটা কীভাবে কীভাবে যেন এড়িয়ে গেল।
____
বিকেল হতে হতেই প্রিয় মনোহরার রুমে চলে এলো। দরজায় নক করে বলল,
-“বুবুজান, আসব?”
ক্ষণকাল ব্যয়ের পর ওপাশ থেকে ক্ষীণ আওয়াজ আসে,
-“আসুন।”
প্রিয় ভিড়িয়ে দেওয়া দরজাটা খুলে ভেতরে প্রবেশ করতে গেলেই, দেখতে পেল খাটে বুবুজান আর তার সামনে চেয়ার টেনে শরৎ বসে আছে। মনোহরা ডান হাতের তর্জনী দিয়ে ওকে ভেতরে আসতে ইশারা করলেন। প্রিয় বলে উঠল,
-“আপনারা বোধহয় কথা বলছিলেন, আমি পরে আসি।”
বিরোধ করল একত্রে মনোহরা এবং শরৎ দুজনই,
-“ভেতরে আসুন।”
থতমত খেয়ে প্রিয় ভেতরের দিকে পা বাড়াল। এরপর কী করবে বুঝতে পারছে না। মনোহরা প্রিয় নাতির সাথে খানিকক্ষণ আগের কথোপকথন চলমান করলেন,
-“ক'দিনের ছুটিতে এসেছেন?”
-“দশদিনের ছুটি নিয়েছি।”
-“বিয়ের পরই ফিরছেন তবে?”
-“জি।”
-“আপনার পুরো পরিবারই এখানে আছে, থেকে গেলে হয় না?”
-“মন টানে না।”
-“বিয়ে-শাদির বন্দবস্ত করব কি?”
শরৎ মাথা নিচু করে হেসে ফেলল। মনোহরাও হাসলেন,
-“রাজি?”
-“এখনও না।”
-“হ্যাঁ-সূচক জবাবের আশাটা সত্যিই আমার ছিল না।”
শরৎ কিছু বলে না। মনোহরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শুধান,
-“ছোটটাকেও কি সাথে নিয়ে ওড়াল দেওয়ার পরিকল্পনা আছে?”
-“না, বুবুজান। ও এখানেই আনন্দ পায়।”
-“আর আপনি?”
-“আপাতত নিজের কাজে।”
-“ঠিক আছে। যতদিন আছেন ঘুরে-ফিরে আনন্দ করুন। বাড়ি ঘেঁষেই থাকবেন। আপনার মা খুশি হবে।”
-“আচ্ছা, বুবুজান।”
-“এরপরের কোনো পরিকল্পনা আছে?”
শরৎ চোখে হাসে,
-“পরিকল্পনাহীন লাইফ লিড করতে শিখিয়েছেন আপনি আমায়। ভাগ্যে যা আছে, তা হবেই। আপনি বলেছিলেন সৎ থাকতে, আদর্শবান হতে। আল্লাহ ভরসা, তিনি উত্তম পরিকল্পনাকারী।”
সন্তুষ্ট হন মনোহরা। বলতে লাগেন,
-“কাল বিকেল করে উত্তরপাড়ায় যাবেন। পানি উঠেছে ওখানে, নৌকা নিয়ে ঘুরতে ভালো লাগবে। ঠিক আপনার পছন্দমতো পরিবেশ যেন।”
-“ঠিক আছে, বুবুজান।”
-“কাউকে নিয়ে যাবেন?”
প্রিয় দাঁড়িয়ে থেকে কী করবে বুঝতে পারছে না। শুধু শুধু এই অসময়ে এখানে আসা হলো! না এলে কি মরে যেত? ধ্যাত!
শরৎ একবার ওর দিকে আঁড়চোখে তাকাল। ওর হাবভাব লক্ষ করে মনোহরাকে বলল,
-“দেখি।”
-“আচ্ছা।”
-“বুবুজান, আমি আসি তবে। থার্ড পার্সনের সামনে তো খোলাখুলি সব বলা যায় না। পরে বলব।”
মনোহরা মুচকি হেসে বললেন,
-“আসুন।”
শরৎ যেতে যেতেও বাঁকা চোখে প্রিয়কে দেখে গেল। প্রিয়র মস্তিষ্ক এখনও আটকে আছে শরতের ওই “থার্ড পার্সন” সম্বোধনে। বাই এনি চান্স, সে কি ওকে উদ্দেশ্য করে বলল কথাটি? বাই এনি চান্স না, আসলেই ওকে উদ্দেশ্য করে বলেছে। ব্যাপারটি ধরতেই প্রিয়র ছোট্ট সাইজের গোলাকৃত মুখটি হা হয়ে এলো।
মনোহরা ওকে ডাকল তখন,
-“বলুন, প্রিয়শ্রী।”
প্রিয় এগিয়ে গিয়ে মনোহরার পাশটায় জায়গা করে নিল। পা তুলে বসে বলল,
-“বুবুজান, আসুন একটু সিরিয়াস আলাপ করি।”
-“আসুন, করি।”
-“চরম সিরিয়াস। সুখ-দুঃখের গল্প, বুঝলেন?”
-“বুঝলাম।”
-“আপনি নির্বিকার থাকতে পারবেন না। বিভিন্ন এক্সপ্রেশন দেবেন।”
-“যেমন?”
-“এই ধরুন, আমি হাসির কিছু বললে আপনি হাসবেন। বিরক্তিকর কিছু বললে ভ্রু কুঁচকাবেন। কষ্টের কিছু বললে ব্যথিত হবেন। এসব আর কি।”
-“আচ্ছা, ঠিক আছে।”
___
সন্ধ্যার দিকে প্রিয় নিজের রুমের সামনের করিডোরে দাঁড়িয়ে আছে। এখান থেকে বাড়ির পেছনের ফল বাগানের দিকটা দেখা যাচ্ছে। প্রিয়র চোখ যতদূর যাচ্ছে, তাতে সে বুঝতে পারছে বাগানের সীমানাটার পর সব ঘন গাছগাছালি দিয়ে বেশ অনেকটা রাস্তা পরিপূর্ণ। বাচ্চাকালে এত কিছু খেয়াল করেনি। এখন সবকিছুতেই নজর যাচ্ছে।
প্রিয়র হুট করেই একবার ইচ্ছে করল, ভেতরে যেতে। কিন্তু ভয় লাগছে। আবার ভয়কেও ছাপিয়ে যাচ্ছে মনুষ্যজাতির আদিম স্বভাববিশিষ্ট অদম্য কৌতুহলটি।
হুট করেই সেখানে নীহিনের আওয়াজ আস্তে আস্তে করে এগিয়ে এলো,
-“প্রিয়দি, তুমি এখানে? আমি তোমাকে রুমে না পেয়ে ওদিক দিয়ে খুঁজে হয়রান!”
প্রিয় পিছে ঘুরে ওর দিকে তাকায়। মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করে,
-“খুঁজছিলে কেন?”
নীহিন জানায়,
-“সবাই মিলে ছাদে আড্ডা দেবো। চলো।”
প্রিয় কিছুক্ষণ ভাবে, তারপর শুধায়,
-“কতক্ষণের আড্ডা ডিউরেশন?”
-“সারারাত, সারারাত।”
নীহিন মুচকি হেসে আবারও বলল,
-“বহুদিন পর সবাই একসাথে হয়েছি, আজ কাউকে ছাড়ব না। আসো।”
-“কতজন আছে?”
-“ছোটদাভাই, সৌরভ ভাইয়া, আসিফ ভাইয়া, রিধিমাদি, নিধিদি, আরুশিদি, আরহা, রূপা আর ফুপাতো বোনেরা আর রিধিমাদির কিছু ফ্রেন্ডস..”
-“তোমার দাদাভাই?”
-“ওর কিছু কল এটেন্ড করার ছিল, শেষ দিয়ে আসবে বোধহয়। আবার রাতের খাওয়া শেষেও আসতে পারে। ওর ব্যাপারে কিছুই বলা যায় না।”
প্রিয় হাসে। নীহিন বলে,
-“চলো যাই।”
প্রিয়র উপায়ন্তর না পেয়ে জানিয়েই দেয়,
-“যেতে ইচ্ছে করছে না..”
নীহিন চার আলিফ সমান টেনে জিজ্ঞেস করে,
-“কেনওওও?”
-“এমনি।”
-“প্রিয়দি, কোনো সমস্যা হচ্ছে? বলো আমায়।”
প্রিয় নীহিনের গালে হাত বুলিয়ে বলে,
-“সমস্যা হচ্ছে না। কিন্তু ওখানে অনেক মানুষ। এত মানুষের মাঝে যেতে ইচ্ছে করছে না।”
-“একা থাকবে?”
-“হু।”
-“ভালো লাগবে একা থাকতে?”
-“হু।”
-“আমি থাকি সাথে?”
কী আদুরে আবদার! প্রিয়র হাসি পেয়ে গেল। মুচকি হেসে বলল,
-“তুমি ওদের সাথে এনজয় করো। আমি কিছুক্ষণ এখানে দাঁড়িয়ে হাওয়া খাব।”
-“আচ্ছা, শোনো। আমি তোমাকে মেসেঞ্জারে নক দিয়েছি। কোনো সমস্যা হলে আমাকে একটা ম্যাসেজ বা কল দিয়ে দেবে। ঠিক আছে, প্রিয়দি?”
-“ঠিক আছে।”
-“প্রিয়দি, যাই তবে।”
প্রিয় ঢের বুঝতে পারছে, মেয়েটা থেকে যেতে চাইছে। ভালো লাগল তার খুব। কিছুক্ষণ রেখে দেওয়ার ইচ্ছেও জাগল। এখন সে নিজের ইচ্ছের কথা শোনে। তাই তো বলে উঠল,
-“না, পরে যেয়ো।”
ভীষণ চওড়া একটা হাসি নীহিনের ছোট্ট মুখটায় ঢেউ খেলে গেল। প্রিয় তা দেখে হাসল। বলল,
-“রাতে ঘুরতে বেরোব।”
-“কই যাবে, প্রিয়দি?”
-“আমি একা নই, তুমিও যাবে।”
-“আমি? রাতে?”
নীহিনের ভীতসন্ত্রস্ত কণ্ঠস্বর। প্রিয় ভ্রু-কুঁচকে শুধাল,
-“সমস্যা?”
-“অন্ধকারে ভয় লাগে।”
-“কীসের ভয়?”
-“ভূতের।”
প্রিয় হো হো করে হেসে উঠল,
-“তার মানে আমার সাথে যাবে না?”
নীহিনের রাত করে ওয়াশরুমে যেতেও ভয় লাগে, সেখানে বের হওয়াটা! কিন্তু বেরোলে অনেকটা সময় সে প্রিয়র সান্নিধ্যে থাকতে পারবে। ছোটবেলা থেকেই ওর প্রিয়কে ভালো লাগে, প্রিয়র সাথে সময় কাটাতে ভালো লাগে। এখনও লাগছে। প্রিয়র সাথে সময় কাটানোর একটা সুযোগও সে হাতছাড়া করতে চায় না। কী মিষ্টি একটা মেয়ে তার প্রিয়দি! কী সুন্দর করে কথা বলে! নীহিনের কেবল শুনেই যেতে ইচ্ছে করে। তাই তো সব ভয়কে সাইডে ফেলে বলে উঠল,
-“যাব। কিন্তু কোথায়?”
-“পরে বলব।”
-“আচ্ছা, প্রিয়দি।”
-“তোমার সম্পর্কে কিছু বলো। বয়ফ্রেন্ড আছে?”
নীহিনের মুখটায় ভয় ছেয়ে গেল,
-“না, প্রিয়দি। এ-বাড়িতে মেয়েদের ছেলেমানুষের সাথে মেশার কঠোর নিষেধাজ্ঞা আছে।”
-“স্কুলে বন্ধু ছিল না?”
-“ছেলে বন্ধু ছিল না। শিকদার বাড়ির মেয়ে শুনলেই ছেলেরা দশ হাত দূরে দৌড় দেয়।”
-“রাস্তা-ঘাটে কেউ টিজ করেনি কখনও?”
প্রিয় বিস্মিত কণ্ঠস্বর। নীহিন জানায়,
-“রিধিমাদিকে স্কুলে পড়াকালীন পূবপাড়ার এক ছেলে কেবল সিটি বাজিয়েছিল। দাদাভাই সেই ছেলেটার এমন দশা করেছিল, শুধু আমাদের গ্রাম না, আশে-পাশের দশ গ্রাম অবধি এখন আমাদের দিকে চোখ তুলে তাকাতে ভয় পায়।”
প্রিয়র মনে জানার অসীম ইচ্ছে, জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করল ‘কী করেছিল’। কিন্তু তা করল না। অনেকটা সময় হলো মেয়েটা ওর সাথে আছে। এখন ওর যাওয়া উচিত। তাই বলল,
-“এখন তুমি যাও।”
-“আরেকটু থাকি?”
বাচ্চা মেয়েটির মলিন আওয়াজ শুনে প্রিয় মুচকি হেসে বলল,
-“রাতে জম্পেশ আড্ডা হবে, ওকে?”
-“ঠিক আছে, প্রিয়দি।”
নীহিন চলে গেল। প্রিয় সেখানেই অনেকটা সময় দাঁড়িয়ে রইল। মাঝে মাঝে এদিক-ওদিক।ধীর পায়ে হাঁটছে, মাঝে সাঝে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। হাতের ফোনটা কখনও বা ঘাটছে। ফেসবুকে ঢোকা হয়নি আজ। পরে ঢুকবে। সে সোশ্যাল মিডিয়ায় এডিক্টেড, একবার ঢুকলে আর বেরোতে পারবে না। এত সুন্দর সাঁঝরাতটি সে এভাবে পার করতে চাইছে না।
গুনগুন করতে করতে প্রিয় রেলিংয়ে হাত দু-হাত রেখে ঝুঁকে দাঁড়াল। গান গাইতে লাগল,
-“অতীতের ছবি আঁকা হয়ে গেলে
চারিদিকে এই চোখ দুটি মেলে
পলাতক আমি কোথা যেন যাই
আঁধারের রিদন শুনে...”
আকাশে শুক্লা চতুর্থীর চাঁদ দেখা যাচ্ছে। প্রিয়র চোখ বন্ধ, গোলমুখের ছোট্ট ঠোঁটদুটো সেই বাঁকা চাঁদটির মতো করে হেসে যাচ্ছে। বাতাসের সাথে ভেজা মাটির গন্ধটা তার মন মাতিয়ে তুলছে। এই হাসি থামবার নয়। অথচ থেমে গেল চকিতেই। কামিনী ফুলের ঘ্রাণে প্রিয়র কপাল কুঁচকে এলো, আশে-পাশে কোনো কামিনীফুলের গাছ নেই। কী আশ্চর্যকর ঘটনা! স্মেলটা সে অনেকক্ষণ ধরেই পাচ্ছে, তবে খেয়াল করল এই মাত্র।
তার পরই একটা পুরুষালি দাম্ভিক কণ্ঠ সে শুনতে পেল,
-“গানটা সুন্দর, তবে আওয়াজটা নয়। কাইন্ডলি এর মতো আর কোনো গানকে খেয়ে দেবেন না।”
চলবে..
Leave a comment
Your email address will not be published. Required fields are marked *