Buy Now

Search

শুক্লপক্ষের পরিশেষে [পর্ব-১৬]

শুক্লপক্ষের পরিশেষে [পর্ব-১৬]

গানটা সুন্দর, তবে আওয়াজটা নয়। কাইন্ডলি এর মতো আর কোনো গানকে খেয়ে দেবেন না।”
অপমান! রাগে গা শিরশির করে উঠল প্রিয়র। ত্বরিতে পিছে ঘুরে বলে উঠল,
-“ভাই, আপনার সমস্যা কী বলবেন? গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা? বুক জ্বালাপোড়া করে? ওমিপ্রাজল খান। তা না করে, আমার পেছনে লাগতে এসছেন ক্যান?”
শরৎ কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে পিছু ঘুরে চলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়াল। প্রিয়র রাগ আরও কয়েক ধাপ বেড়ে গেল। এসবের মানে কী? অভদ্র লোক! কেউ প্রশ্ন করলে উত্তর দিতে হয়, সে তো তা দিলো না, উলটো এড়িয়ে গেল! অমানবিক লোক কোথাকার! তিনবার মুখোমুখি হয়েছে, তার মধ্যে দুইবারই অপমান করে বসল। ছি ছি ছি! জঘন্য!
প্রিয়র মুখের ভেতরটা তিতকুটে হয়ে এলো। শরৎ দু-কদম এগিয়ে আবার পিছু মুড়ল। প্রিয়র পরনে একটা মাল্টি কালারের ঘাগড়া আর কালো শর্ট কামিজ, ওড়নাটা চাদরের মতো করে পেচিয়ে রেখেছে। চুলগুলো কাটা দিয়ে বেঁধে রাখা। সামনে দিয়ে দু'গাছি চুল বেরিয়ে আছে। শুক্লা চতুর্থীর ক্ষীণ আলোতে তার ছোট পান্তুয়ার ন্যায় গোল মুখটি ভালোভাবেই দৃশ্যমাণ। ঠোঁট আর চিবুক সংলগ্ন ভাঁজটা মারাত্মক গভীর। চাঁদের আলোয় প্রিয়র ক্ষণে ক্ষণে ফুঁলে ফেঁপে ওঠা ছোট নাকটা দেখে শরৎ হাসল। তার দিকটা আঁধার, সেই হাসি অদৃশ্য, প্রিয় দেখতে পেল না। তবে বুঝতে পারল, ছেলেটা দাঁড়িয়ে আছে। আবার কিছু বলতে যাবে, তার আগেই শরৎ বলে উঠল,
-“শোধ নিচ্ছি, নেব, নিতে থাকব।”
কপাল কুঁচকে উঠল প্রিয়র,
-“কীসের শোধ?”
-“মনে নেই কিছুই?”
অবাক হয় শরৎ। প্রিয়র আসলেই মনে নেই কিছু। প্রিয় ঠোঁট সামান্য উলটে দু-ধারে মাথা নাড়ে। উত্তপ্ত শ্বাস ফেলে শরৎ,
-“ডাবল শোধ হবে এবার। বি রেডি।”
চলে গেল শরৎ। প্রিয়ও আর কথা বাড়াল না। রিধিমার থেকে জেনে নেবে, ছোটবেলায় কী কাহিনি ঘটিয়েছিল। প্রিয় এসএসসির ছুটিতে আসার পর শরতের দেখা পায়নি, শরৎ তখন ঢাকায় ছিল। দেখা হলে এর আগেই হয়েছে। আর এর আগে এসেছিল সে, যখন ক্লাস টু-তে পড়ত, শরৎ ক্লাস নাইন-টেনে। শেষ দেখাটা হিসেবমতো তখনই হওয়ার কথা। কিন্তু তখন কী হয়েছিল? কীসের শোধ?
আপাতত ওসবে আর প্রিয় মাথা ঘাটাল না। তবে মন খারাপ হয়ে গেল। কী উপভোগ্য একটা পরিস্থিতি কীভাবে নষ্ট করে দিলো লোকটা! অসহ্য অসহ্য অসহ্য!
______
রাত তখন সাড়ে এগারোটা ছুঁইছুঁই। করিডোর ঘুরে, রুমে শুয়ে-বসে, ফেসবুকিং করে যখন প্রিয় বিরক্ত প্রায়। তখন গিয়ে বুকটা হু হু করে কেঁপে উঠল। কয়মাস আগেও, এই সময়টা তার শ্রেয়ানকে ভেবে যেত। শ্রেয়ানের উপস্থিতি, অনুপস্থিতি সবটাই তার সমস্ত ধ্যান-জ্ঞানে কাবু করে ফেলত। প্রিয় ভেবে পায় না, কাউকে মনে ঠায় দিতে এত সময় লাগলেও মন থেকে উঠিয়ে দিতে কয়েক ক্ষণও লাগে না কেন?
ভেতর থেকে কেমন অসহনীয় লাগছে। একবার মনে হচ্ছে, সব কিছু ভুলে গিয়ে আবারও ফিরে যাবে। তো আবার লাগছে, কীজন্য ফিরবে? কার জন্য ফিরবে? কার কাছে ফিরবে? সেই পুরুষের কাছে? যার ভেতর তার জন্য নূন্যতম সম্মানবোধ নেই, যে তাকে বন্দী করে রাখতে চায়? তার কাছে ফিরবে? প্রিয় ছিল উড়নচণ্ডী। শ্রেয়ান তার পাখা কেটে, পায়ে শেকল জড়িয়ে সামনে আটকে রাখতে চায়। প্রিয় তো তা চায় না। প্রিয় চায় ডানা মেলে বাঁচতে। কী সুন্দর আকাশ! প্রিয় সেই আকাশে উড়ে-বেড়াতে চায়। এক পুরুষের একচ্ছত্র সম্পত্তি হিসেবে সে কখনই নিজেকে মানতে পারে না।
কিন্তু মন খুব খারাপ একটা জিনিস। মন তাকে ফিরতে বলে। মন তাকে বন্দিনী হতে বলে। মন বলে, আরেকবার সেই পুরুষকে ভালোবাসতে। মন বলে, তাকে আরেকবার জড়িয়ে ধরে ভালোবাসি বলতে। কী সাংঘাতিক! প্রিয় তা পারছে না, প্রিয় তা চাইছে না। প্রভুত্ব বিষয়টা সুন্দর না। শ্রেয়ানের মধ্যে এর অভাব নেই। সে কৃতিত্ব ফলাতে চায় সর্বক্ষণ।
প্রিয়র মনে নেই, যতটা সে সম্পর্কের শেষ বছরটায় কেঁদেছে, ততটা কান্না তার পুরো জীবনের একাংশেও ছিল কি না!
“আমি জেনে শুনে বিষ করেছি পান
বিষের তরে সঁপেছি প্রাণ...
যতই দেখি তারে ততই দহি,
আপন মনোজ্বালা নীরবে সহি,
তবু পারি নে দূরে যেতে, মরিতে আসি,
লই গো বুক পেতে অনল-বাণ।”
প্রিয় খাটে হেলান দিয়ে শুয়ে সিলিংয়ে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে মিনমিনে স্বরে গানটি গাইল। নাহ! ভালো লাগছে না আর। ত্বরিতে খাট থেকে উঠে বসল। এক কোণায় পরে থাকা সিল্কের ওড়নাটা গায়ে জড়িয়ে নিয়ে ফোন হাতে বেড়িয়ে পড়ল। একবার ভাবল, নীহিনকে ডেকে নিয়ে বাইরে বের হবে। পরক্ষণেই ভাবল, থাক। এখন না, আরেকটু রাত বাড়লে তারপর যাবে। এখন কোথায় যাওয়া যায়? পশ্চিমে সিঁড়িঘর। প্রিয় ধীরপায়ে সেদিকে এগিয়ে গেল।
মৃদুমন্দ আলোয় প্রিয় সিঁড়িগুলো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে না। তবে এ-পাশটা পরিচ্ছন্ন বিধায় চাঁদের এত নরম আলোটা কিছুটা হলেও দিক বোঝাতে সাহায্য করছে। প্রিয়র আলসেমিবোধের কারণে আর ফোনের টর্চ অন করা হলো না।
সিঁড়ি দিয়ে যত কদম এগোচ্ছে, ততই উল্লাসিত আওয়াজ তার কানে তীব্রতরভাবে ধাক্কা খাচ্ছে। প্রিয় ধীর কদমে গিয়ে একদম দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে পড়ল। সে লক্ষ করল ছাদের একটা কোণা জুড়ে রাজত্ব চালাচ্ছে বাড়ির ইয়াং জেনারেশন। প্রিয় সবাইকে লক্ষ করল। নাহ, নীহিনের কথা অনুযায়ী অত মানুষও নেই এখানে। রিধিমা এক কোণায় বসে আছে। তাকে ঘিরে নীহিন, নিধি, আরুশি আর দু'জন বসে আছে। উলটো দিকে আসিফ আর তিনটে ছেলে আছে। তিনজনের একজনের মুখটা চেনা, তবে নাম মনে করতে পারল না। বোধহয় নীহিনের ছোট ভাইটা হবে। আর বাকি দু'জনকে ছেলে-মেয়েকে চিনল না, ফুপাতো ভাই-বোন হবে হয়তো।
রিধিমা তখন বলল,
-“চলো গানের কলি খেলি।”
তারপরই পিছে ঘুরে ডেকে উঠল,
-“এই ভাইয়া! তোমার হয়নি?”
প্রিয় রিধিমার দৃষ্টি অনুসরণ করে ওদিকে তাকাল। পরনে হালকা রঙের টি-শার্ট আর গ্রে ট্রাউজার। বাঁ হাত পকেটে ঢোকানো, ডান হাতটি কানে ফোন চেপে ধরা। রিধিমার ডাকে সে পকেট থেকে বাঁ হাতটি বের করে পাঁচ আঙ্গুল দেখিয়ে ইশারায় বোঝাল,
-“আর পাঁচ মিনিট।”
তারপর নিজের ফোনালাপ কন্টিনিউ করতে লাগল। এই রাতের প্রায় বারোটার দিকে অবশ্যই কোনো অফিশিয়াল আলাপন কেউ করে না। প্রিয়র ধারণা, শরৎ এখন তার গার্লফ্রেন্ডের সাথে কথা বলছে। যা ইচ্ছা করুক। কথা বলুক, নাচুক, লাফাক, প্রয়োজন পড়লে ছাদ থেকে লাফ দিক; ওর কী? কিচ্ছু না।
প্রিয় মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকাল। তখনই নিধি ডেকে উঠল,
-“প্রিয় আপিইইইইইই! এদিকে এসো।”
প্রিয় থতমত খেয়ে ওদিকে তাকায়। আসরের সবাই এখন তার দিক চেয়ে আছে। নিধির গালে এখন একটা কম বল প্রয়োগের চড় বসাতে পারলে মনটা শান্ত হতো। ফাজিল মেয়ে, এভাবে ডাকা লাগে?
প্রিয় অপ্রস্তুত হয়ে হাসল। সেদিকে এগিয়ে গেল। নীহিন একটু সরে বসে রিধিমার আর তার মাঝখানে জায়গা তৈরি করে দিলো। প্রিয় গিয়ে সেখানে বসল।
কিছুক্ষণের মধ্যে শরৎ নিজেও এগিয়ে এসে ঠিক তার সামনে বসে পড়ল। সন্ধ্যা-রাতের সেই কথা মনে পড়তেই প্রিয় মুখ ঘুরিয়ে ফেলল। বাধ্য হয়েই প্রিয়কে ওদের সাথে রাত আড়াইটা অবধি থাকতে হলো।
এখানে থমকে সময়
তবুও আবেগ ছুঁয়ে যায়
এই দূর সুদূর সীমানায়
গল্প বলে মেঘ ছায়ায়, শোনো।
এখানে অন্ধকারে,
তবু হাওয়া বারে বারে
এই গান আহ্বানে হারায়
তোমার চোখের তারায়, দেখো।
গান গাওয়া-গাওয়ি শেষ হওয়ার পর ছেলেরা সেখানেই চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল, মেয়েরা উঠে পড়ল চলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। প্রিয় নীহিনকে এক ফাঁকে বলে ওঠে,
-“সোজা আমার রুমের সামনে দাঁড়াবে।”
নীহিন মাথা নেড়ে যায়। প্রিয় নামতে গেলেই সিঁড়িঘরের ওখানে একটা ডাক পড়ে। পিছে তাকায় সে। দেখতে পেল সেই মুখচেনা ছেলেটা। প্রিয়কে জিজ্ঞেস করল,
-“তোমার নাম কী?”
প্রিয় নরম গলায় জানায়,
-“প্রিয়শ্রী। রিধিমার কাজিন আমি।”
-“ওয়েএএট! তুমি প্রহরের সিস্টার?”
প্রিয় ওপর-নিচ মাথা নাড়ে। ছেলেটা নিজ থেকে জানায়,
-“আমি নিশান। রিধিমা আপুর বড়ো চাচার ছোট ছেলেটা। মনে নেই?”
প্রিয়র মনে আছে, তবে খেয়ালে ছিল না। সে-বার এসএসসির ছুটিতে দেখা হয়েছিল, ওরা সেম ব্যাচের। প্রিয় বলল,
-“মনে আছে।”
ত্বরিতে নিশান বলে উঠল,
-“ইউ ক্যান কল মি শান। সবাই তাই ডাকে।”
-“আচ্ছা।”
প্রিয় চলে যেতে নেয়। নিশান ওকে আটকায়। গভীর দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করে বলে ওঠে,
-“তুমি খুব সুন্দর। আমার তোমাকে ভীষণ পছন্দ হয়েছে।”
প্রিয় চকিতে তাকায়, এটা কী বলল? জিজ্ঞেস করে ওঠে,
-“হুহ?”
যেন কিছুই বোঝেনি৷ চাঁদের মৃদুমন্দ আলোয় প্রিয় নিশানের হাসিটা দেখতে পেল। সেই হাসিটা খুব চওড়া। সে এবার প্রপোজালটা দিয়েই ফেলল,
-“উইল ইউ বি মাই ....”
চলবে...

Olindo Rahman

Olindo Rahman

A good book is worth a hundred good friends. 
But a good friend is equal to a library.!! 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Your experience on this site will be improved by allowing cookies Cookie Policy