রাতের আকাশে বাঁকা চাঁদটি আলো ছড়াচ্ছে কোনোরকম। সেই ক্ষীয়মান আলো কাঠের জানালার পাল্লা ভেদ করে মেঝেতে আছড়ে পড়ছে। রুমে জ্বলছে মৃদু আলো। এই সময়ে প্রিয়র তীব্র আলো পছন্দ নয়। রাতের খাবার খাওয়া খানিকক্ষণ আগেই চুকিয়েছে সে। বিকেলের সেই ঘটনাটা মস্তিষ্ক থেকে সড়ছেই না। যতবার ভাবছে, ততবারই উত্তেজিত পড়ছে। মুখে এসে যাচ্ছে কিছু খাস বাংলার গালি। কীভাবে কীভাবে যে নিজেকে ঠান্ডা রেখেছে, প্রিয় নিজেও জানে না। ঠান্ডা রাখতে রাখতে সর্দি বাঁধিয়ে নিয়েছে।
বিছানায় হেলান দিয়ে বসে আছে সে, কোলে টিস্যু বক্স। মিনিটে দু-চারটা হাঁচি এক নাগাড়ে এসে ক্ষণিকের বিরতি নিচ্ছে। প্রিয় বিরক্ত হয়ে পড়ে। মনে মনে আরও দু'টো গালি উচ্চারণ করল ওই শরৎকালের উদ্দেশ্যে। অসভ্য লোক! শরৎ নাম রাখল কেন ওর? শরৎকাল হবে নরম, কোমল, প্রশান্তিদায়ক। অথচ এটা?
প্রিয় অতিষ্ঠ হয়ে দু'ধারে মাথা নাড়ে। পরক্ষণেই আবার হাঁচি আসতে লাগে। এভাবেই পেরোল অনেকটা সময়। আস্তে-আস্তে সর্দি নেমে যেতে লাগে। প্রিয়র ঘুম প্রয়োজন। রাত তখন এগারোটা ছুঁইছুঁই। উঠে রুমের লাইট জ্বালাল। আলমারিটা খুলে প্রয়োজনীয় সামগ্রীর মধ্যে থেকে ওষুদের বাক্সটা বের করল। রাতের খাওয়ার পর এখন শুধু ঘুমের ওষুধ নিতে হবে। আশ্চর্যজনকভাবে প্রিয় সেই ওষুধের প্যাকেটটা খালি দেখতে পেয়েই চমকে গেল। কাল শেষ হয়েছে, আর প্রিয়র খেয়ালই নেই।
একহাতে কপাল চাপড়াল। তারপর আবার লাইট অফ করে বিছানায় চলে গেল। ফোন ঘাটছে। ঘুম পাচ্ছে, কিন্তু কেন যেন ঘুমোতে পারছে না। অদ্ভুত আওয়াজ পাচ্ছে। রাত বাড়ার সাথে সাথে তার মাথা খারাপ হতে থাকে। এ-পাশ ও-পাশ করতে করতেই হুট করে উঠে বসে। কাঁপা কাঁপা হাতে নিজের ফোন খুঁজতে লাগে। বুকটা কাঁপছে তার।
সাইড টেবিলে ফোন ছিল। উলটো-পালটাভাবে খুঁজতে গিয়ে অস্থিরতায়, অধীরতায় ভুলবশত কাঁচের গ্লাসটা মেঝেতে বিকট শব্দ তুলে পড়ে ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। আশ্চর্য! সেই শব্দ প্রিয়র কানেই এলো না। সে ইচ্ছাকৃতভাবে এবার টেবিলের ওপর সব হাতড়ে হাতড়ে ফেলে দিলো। অবশেষে ফোন পেল। পাগলের মতো কার্যকলাপ তার।
ফোন পেয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই টর্চ অন করে। দেখতে পায় কী অসম্ভবভাবে তার হাত-পা কাঁপছে। অন্ধকারে আশে-পাশে তাকাল। কিছু দেখা যাচ্ছে না। চাঁদটাও মেঘের পিছে গা লুকিয়েছে। প্রিয় অন্ধকারে ফার্নিচারগুলোকে বিভিন্ন কুৎসিত আকৃতির হয়ে যেতে দেখল। পর্দাগুলোও যেন ওর দিকে তেড়ে আসছে! উলটো দিকের কাউচটা একটা বিশ্রী রকমের জন্তুর আকৃতির হয়ে গেল। প্রিয়র ভয় মাত্রা ছাড়াতে লেগেছে। সে হাঁপাচ্ছে। নিঃশ্বাস নিচ্ছে ঘন ঘন। ফাঁকা ঘরে বাতাসটাও আসছে না আর। স্বকীয় নিঃশ্বাসের প্রকট শব্দে প্রিয় নিজেই আঁতকে উঠল।
দৌড়ে গিয়ে লাইট অন করল সবগুলো। অসাবধানতাবশত ছিটকে আসা কাঁচের ছোট্ট একটা টুকরোয় তার পায়ে সামান্য ক্ষত হলো। সাদা মেঝেতে লাল ছোপ ছোপ রক্ত। প্রিয় তা দেখতে পেল না, অনুভব করতে পারল না। মস্তিষ্কের ভ্রম তার শারীরিক যন্ত্রণাকে দাবিয়ে রেখেছে। সে যেভাবে ছুটে গিয়েছিল সেভাবেই ছুটে এসে বিছানায় বসে পড়ল।
পা দুটো বুক বরাবর তুলে, দু'হাতে জড়িয়ে চুপিসাড়ে বসে আছে। এখনও কাঁপছে। এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। সব স্বাভাবিক। আর কিছু নেই, কিচ্ছু না। মাথা দ্রিমদ্রিম করছে, মনে হচ্ছে মগজটা কেউ চটকাচ্ছে। হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক হারে স্পন্দিত হচ্ছে। শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। ঘামছে প্রচণ্ড। তারপর অকারণেই ডুকরে কেঁদে উঠল। কান্নার আওয়াজ তার কানে পৌঁছাতেই সে নিজের ডান হাতের পিঠটা কামড়ে ধরে কাঁদতে লাগল।
___
দোতলার দক্ষিণের এদিকের রুমগুলো যথাক্রমে শরৎ, প্রিয়, প্রহর, নীহিন-রূপা-আরহা, আরুশি-নিধি, রিধিমার। একদমই ভেতরের দিকে শরতের রুম। তার পরেই প্রিয়র। তার পর প্রহরের। এখন এ-পাশে সবাই ঘুম, তাই আওয়াজটা কারোরই কানে এলো না।
শরৎ একটা বই পড়ছিল। গ্লাস পড়ে যাওয়ার আওয়াজ পেতেই কান খাঁড়া হয়ে আসে তার। পরপরই আরও কিছু পড়ে যাওয়াতে শরৎ নিজের বিছানা থেকে উঠে পড়ে, করিডোর দিয়ে বেরিয়ে যায়। প্রিয়র পশ্চিমের দরজা খোলা ছিল। লাইট অন!
কান্নার আওয়াজ পেয়েই শরৎ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে যায়। চোখ উঠিয়ে দেখে বিছানায় গুটিশুটি মেরে বসে আছে প্রিয়। একহাত কামড়ে ধরে কান্নার আওয়াজ বন্ধ করল। শরীরের কম্পন দৃশ্যমান। শরৎ এগিয়ে যেতে নিয়েও গেল না। ফিরতি রাস্তা ধরে নিজের রুমের উদ্দেশ্যে পা বাড়াল। প্রিয়র বয়স এখন ২৪। এই বয়সে, এই যুগের অবিবাহিত মেয়েরা অবশ্যই সিঙ্গেল থাকে না। হবে হয়তো কোনো রিলেশনশিপের ঝামেলা। সেজন্যই কাঁদছে। শরতের ধারণা, এভাবে এতরাতে কোনো মেয়ের ঘরে যাওয়া উচিত হবে না।
তাই তো ফিরে যেতে নিল। নিজের রুমের সামনে এসে দরজা পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতে যাবে, ওমনিই কী যেন হলো।
পিছে মুড়ে কোথাও না থেমে সোজা প্রিয়র রুমে ঢুকে গেল শরৎ। প্রিয়র কান্না থেমেছে। কান্নার বদৌলতে হেঁচকি উঠে গেছে। শরৎ প্রিয়র দিকে এগিয়ে গিয়ে ওর পাশে দাঁড়াল। সামনে কিছু একটার উপস্থিতি অনুভব করে প্রিয় মুখ তুলে তাকায়। অনাকাঙ্ক্ষিত পুরুষটাকে দেখে নেহাতই মস্তিষ্কের ধোঁকা মনে করল।
শরৎ দেখতে পেল, ওপাশের ফ্লোরে ভাঙা কাঁচের টুকরোর সাথে পানি পড়ে আছে। ওদিকটায় সামান্য রক্তও দৃশ্যমান। প্রিয় উঠে দাঁড়াতে গেলেই শরৎ বলে উঠল,
-“স্টপ! ওখানেই বসে থাকো।”
প্রিয় বসে থাকে। শরৎ সেন্টার টেবিলের ওপর থেকে পানির বোতল নিয়ে এসে প্রিয়র হাতে দিয়ে বলল,
-“ড্রিংক ইট।”
প্রিয় বোতলটা হাতে নেয়। শরৎ নিজের বোন-হোয়াইট ফুল স্লিভসের টিশার্টের স্লিভস ফোল্ড করল। তারপর করিডোর থেকে একটা স্কুপ এনে কাচের টুকরোসহ যতটুকু পানি সম্ভব হয়েছে তাতে তুলে নিয়ে বাইরে রেখে, সুন্দর মতো মেঝেটা পরিষ্কার করল।
প্রিয় পানি খেয়ে ওর দিকে তাকিয়ে ছিল। শরৎ সব কাজ শেষ দিয়ে ওর মুখোমুখি টানটান হয়ে দাঁড়াল। জিজ্ঞেস করল,
-“রাত-বিরেতে কান্না কার জন্য তা জিজ্ঞেস করাটা বোকামি। বাট আই ওয়ান্ট টু সে, কার জন্য চোখের জল ফেলা উচিত আর কার জন্য নয়—তা বোঝার মতো তোমার বয়স কম হয়নি।”
প্রিয় বাঁ হাতের পিঠ দিয়ে ডান গালের জল মুছে নিয়ে বড়ো করে শ্বাস টানে। শরতের চোখে চোখ রেখে মিনমিনে স্বরে বলে,
-“চোখের জল যে প্রতিবার নির্দিষ্ট একটা মানুষকে কেন্দ্র করেই হবে, তার মানে নেই।”
সে চোখে বেশিক্ষণ তাকানো যায় না। প্রিয় দৃষ্টি সরিয়ে নিল। শরতের চাহনি হলো আরও দৃঢ়। সে অনিমেষ তাকিয়ে বলল,
-“মরা-কান্না কাঁদছ কী জন্য?”
প্রিয় কথা বলতে গিয়ে ঠোঁটটাও কেঁপে উঠল,
-“আমি জানি না।”
-“কেন জানো না?”
-“জানি না।”
-“কী?”
-“জানি না।”
প্রিয়র কথার ধরন কেমন যেন অপ্রকৃতস্থ শোনাচ্ছে। শরতের কপাল কুঁচকে যায়। তন্মধ্যে প্রিয় বিরবির করে যাচ্ছে, জানি না, জানি না, জানি না...
শরতের বুঝতে সময় লাগল না আর, এগিয়ে গিয়ে প্রিয়র পাশে বসে পড়ল। ওর মাথায় হাত রেখে বলে উঠল,
-“কিচ্ছু হয়নি। জাস্ট টেক অ্যা ডিব ব্রিথ। সবকিছু নরমাল আছে।”
প্রিয় কেমন ঘোর লাগানো চোখে তাকায়, পরক্ষণে ওর থেকে ছিটকে সরে আসে। গলার স্বর তুঙ্গে তুলে বলে,
-“রুম থেকে বের হও।”
-“প্রিয়, শোনো।”
-“বেরোতে বলছি। কথা শুনতে পাচ্ছ না? কী চাইছ? আর কী চাইছ? মরে যাই?”
শরৎ ওর দিকে আরও এগিয়ে আসতে নিলে, প্রিয় সর্বোচ্চ চিৎকার করে কেঁদে ওঠে,
-“মরে যাব, প্রমিস! কাছে আসবে না। চলে যাও। আল্লাহর দোহায় লাগে তোমায়। আর পারছি না নিতে।”
শরৎ সরে গেল,
-“রিল্যাক্স! কাছে আসছি না। শোনো আমার কথা..”
-“কিচ্ছু শুনতে চাই না। লেট মি লিভ.. আমি বাঁচতে চাই..”
শরৎ বলে উঠল তবুও,
-“যে-কোনো ডিসিশনের আগে জাস্ট থিংক এবাউট ইওয়োর প্যারেন্টস। হড়বড়ে কাজ করবে না। ঘুমিয়ে যাও। ফোনে সূরা আর-রহমান প্লে করে শোনো। ভালো লাগবে। এগেইন বলছি, উলটা-পালটা কিছু ভাববে না। আমি পাশের রুমেই আছি। সমস্যা হলে ডাকবে।”
প্রিয় আবার বলে,
-“যাও প্লিজ। যাও না...”
শরৎ চলে যায়। প্রিয় বিড়বিড় করতে থাকে শরতের প্রস্থানের দৃশ্যে,
-“শ্রেয়ান, তোমাকে ছাড়া আমি খুব ভালো আছি। দেখেছ? শান্তি? প্লিজ আমার শান্তি নষ্ট করতে আর এসো না। শ্রেয়ান, আমি তোমাকে চাই না। আর চাই না। কেন বার বার আসছ? আর নিতে পারছি না আমি। আমি বাঁচতে চাই তো। কেন আসছ? সহ্য হচ্ছে না ভালো আছি? তবুও কেন? কী চাও? মরে যাই? মরব? না, মরব না। ভালোবাসি না, মরব না..”
প্রিয় উলটা-পালটা বকতে থাকে। অথচ সে যে শরতের মধ্যে শ্রেয়ানকে দেখতে পেয়ে ওমন রিয়্যাক্ট করল, তা শরৎ টের পেল না। নিজের রুমে এসে অস্থির ভঙ্গিমায় বসে মাথার চুলগুলো টানল কিছুক্ষণ।
___
রাতে আর প্রিয় ঘুমোল না, ঘুম এলো না। গায়ে একটা পাতলা চাদর পেঁচিয়ে রুম থেকে বের হয়ে গেল। শরতের রুমের পাশ দিয়েই সে সিঁড়ি ভেঙে নিচে নেমে গেল, অথচ শরৎ দেখতে পেল না। প্রিয় বাগানের রাস্তা হয়ে কালকের সেই কাঙ্ক্ষিত জায়গাটিতে চলে এলো। ঐশ্বরিক সৌন্দর্য পায় সে এখানটায়।
প্রিয় বিলের শানে বসে জলে পা ভেজাল। এখানটায় চাঁদের আলো তীক্ষ্ণ। শান্তি লাগছে তার। এতক্ষণের কান্নাকাটির জন্য চোখ-মুখ ফুলে আছে। শুক্লা পঞ্চমীর আলোয় প্রিয়কে এরূপে দেখে যে কোনো পুরুষের মরণ ঘনাবে।
ঠিক সেই মুহূর্তে প্রিয় উপলব্ধি করল, তার পাশে তার বড়ো আকাঙ্ক্ষিত মানুষটির উপস্থিতি। সে গা ছুঁইছুঁই হয়ে বসে আছে। প্রিয় মেকি রাগ দেখিয়ে তাকে বলল,
-“অপেক্ষা করাতে ভালো লাগে খুব, না? আসতে দেরি করলে কেন এত? কথা বলব না তোমার সাথে।”
সাদা শার্ট পরিহিত পুরুষটি প্রিয়র চোখে চোখ রেখে হাসে।
চলবে...
Leave a comment
Your email address will not be published. Required fields are marked *