“তুমি ফোন এডিক্টেড। আগামী ২৪ ঘন্টা তাই নিজের ফোন থেকে দূরে থাকবে। তোমার ডেয়ার এটাই, তোমার ফোনটা আমার কাছে আগামী ২৪ ঘন্টা জিম্মি থাকবে।”
সবাই একত্রে “হোওওওও” বলে চিল্লিয়ে উঠল। প্রিয়র রাগ লাগল। ফোন হচ্ছে ব্যক্তিগত জিনিস। ফোন নিয়ে কেন কথা উঠবে। এ নিয়ে কিছু বলতে চেয়েও প্রিয় থেমে গেল। চোখ-মুখ কুঁচকে হাতের ফোনটা উলটো দিকে প্রায় খানিকটা ছুঁড়েই মারল। হেসে উঠল শরতের গাঢ় বাদামি দৃষ্টি। সেই হাসি প্রিয়র রাগ আরও বাড়িয়ে তুলল। ত্বরিতে সেখান থেকে উঠে গটগট করে চলে যেতে লাগল।
সবার হাসি-তামাশা শেষে আবারও বোতল ঘোরানো হলো। এবার এলো আরহার দিকে। আরহাকে ট্রুথ দেওয়া হলো, নিজের একটা সিক্রেট রিভিল করতে। ও ইতস্তত করে বলল,
-“কাল রান্না ঘর থেকে উধাও হওয়া নাড়ুর বৈয়াম দুটো আমাদের রুমে। আমি নীহিন আর রূপা শেষ করেছি।”
আশরিফা জয়াকে ঘুম পাড়িয়ে ওদের জন্য শরবত নিয়ে এসেছিল। মেয়ের মুখ থেকে নাড়ু চুরির ঘটনা শুনে বিচলিত হয়ে বলে উঠল,
-“তো আসল চোর আপনারা?”
আরহা ভড়কে গিয়ে পিছে ঘোরে। মা'কে দেখে “ও মা গো” বলে দৌড় দেয়।
______
রাত গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে। আকাশে হানা দিচ্ছে বিষণ্ণ মেঘেরা। চাঁদ ঢেকে যাচ্ছে মেঘের চাদরে। সব যখন আঁধারে তলিয়ে, ধানমন্ডির একটি অ্যাপার্টমেন্টের এইটথ ফ্লোরের বেডরুমের লাইটগুলো তখন জ্বলজ্বল করছে। ওয়াশরুমে পানির শব্দ হচ্ছে অনেকক্ষণ ধরে।
একটা মেয়ে কিছুক্ষণ আগেই এখানে এসেছে। পরনে ওয়েস্টার্ন ড্রেসটা চকচক করছে। আধুনিকতার সাথে গায়ের প্রতিটি ভাঁজে ভাঁজে প্রদর্শিত হচ্ছে কামুকতা। মেয়েটি পায়ের ওপর পা তুলে কাউচে গা এলিয়ে বসে আছে। হাতে রেড ওয়াইনের গ্লাস। চেহারায় আকর্ষণ। যেকোনো পুরুষের মাথা খারাপ হয়ে যেতে বাধ্য। মেয়েটির নাম কুহক।
ওয়াশরুমের দরজাটা ফট করেই খুলে গেল। সেকেন্ডের ব্যবধানে ধীর পায়ে বের হলো সুঠাম দেহের আকর্ষণীয় পুরুষটি। পরনে কেবল টাওয়াল। গায়ে বিন্দু বিন্দু জল। কুহক বাঁকা নজরে একবার তীব্র পছন্দের পুরুষটিকে দেখে সামান্য হাসল। আবারও দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিল।
শ্রেয়ান ওকে দেখেও না-দেখা করে চুল ঝাড়তে ঝাড়তে ড্রেসিং মিররের সামনে দাঁড়াল। মিররে মেয়েটাকে দেখা যাচ্ছে। একবারও তাকাচ্ছে না ওর দিকে। শ্রেয়ান কপাল কোঁচকাল। দৃষ্টি প্রতিবিম্বে স্থির রেখে শুধাল,
-“দেখার জিনিস, না দেখলে পাপ হবে। এদিকে তাকাও।”
কুহক তাকায়। চোখে লাজের নূন্যতম আভা নেই। শ্রেয়ান আজ অবধি যত মেয়েদের সাথে ডেট করেছে, সবাই যতই বোল্ড হোক না কেন, কিছু না কিছু সময়ে, অল্পক্ষণের জন্য হলেও লজ্জায় বুদ হয়েছেই। কিন্তু এই মেয়েটা? কেমন অদ্ভুত! সম্মোহনী! কুহকিনী!
কুহকের দৃষ্টি তার হাতের গ্লাসে। সেন্টার টেবিলের ওপর বোতল আর গ্লাস রাখা। সে নিজের গ্লাসে ওয়াইন ঢালতে ঢালতে বলল,
-“ওয়ানা ড্রিংক, বেইবি?”
শ্রেয়ান ততক্ষণে ওর দিকে এগিয়ে এসেছে। একপা দু'পা করে একদম কাছে। বিপরীতে রাখা সোফাটিতে বসে পড়েছে। কুহক ভ্রু উঁচিয়ে শুধায়,
-“হু?”
শ্রেয়ানের ওর দিকে ঝুঁকে পড়ে। কুহকের ভেজা ঠোঁটে আঙ্গুল স্লাইড করে বলে,
-“আই ওয়ানা ইট..”
থামে সে, তার কথা, তার চোখ এই লাল রঙা ঠোঁটের ওপর স্থির হয়। বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে লিপ্সটিকটা ছড়িয়ে দিয়ে নিজের অসমাপ্ত কথাটি সম্পূর্ণ করল,
-“ইউ!”
মেয়েটি সেভাবেই হাসে। গ্লাসটা টেবিলের ওপর রেখে উঠে দাঁড়ায়। শ্রেয়ান হাত বাড়িয়ে তার কোমর চেপে নিজের সাথে লাগোয়া করে। কুহক এক হাতে শ্রেয়ানের চুলগুলো মুঠো করে মাথাটা উঁচু করে ধরে, অন্য হাতটি শ্রেয়ানের গলায় স্লাইড করছে। একে-অপরের উত্তপ্ত নিঃশ্বাস দুজনেই অনুভব করছে। কুহক ওর ঠোঁটের খুব কাছে। অথচ চুমু খাচ্ছে না, ছুঁইছে না। নিঃশ্বাসের ঘনত্ব বাড়ছে ক্রমেই। টান লাগছে চুলে, শক্ত হচ্ছে কুহকের হাত। আজ অবধি তার কোনো গার্লফ্রেন্ডের সাহস হয়নি তাকে ছুঁয়ে দেখার, তার ওপর অধিকার ফলানো। সে যা চাইত, তা-ই হতো। কিন্তু কুহকের বেলায় তার সবকিছু এপিঠ-ওপিঠ হয়ে গেছে। মেয়েটা রীতিমতো তাকে নিয়ে খেলতে পছন্দ করে! এই যে! এখন জ্বালাচ্ছে! উফফ!
শ্রেয়ান কোমরে চাপ প্রয়োগ করল। মুখ উঁচিয়ে ছুঁতে গেলে, মেয়েটা আরও দূরে সরে যাচ্ছে। ঠোঁটের কোণাটা কিঞ্চিৎ বাঁকা হয়েছে কুহকের। হাসল কি? শ্রেয়ানের রাগ লাগে। খামচে ধরে কোমর। ‘আহ’ শব্দ উচ্চারণ করে কুহক হেসে বলে,
-“মাই বয়!”
শ্রেয়ান উত্তেজিত হয়ে ওঠে। ওকে নিজের উরুতে বসিয়ে ফেলে ওর ঠোঁটে, চিবুকে, গলায়, বুকে চোখ বোলাতে থাকে। লো নেকের ক্রপটপে তার ক্লিভেজ দৃশ্যমান। শ্রেয়ান বলে,
-“তুমি খুব সুন্দর, কুহকিনী!”
কুহক কামড়ে ধরল শ্রেয়ানের ঠোঁট। শ্রেয়ান পাগলের মতো কুহকের স্পর্শকাতর জায়গাসমূহে হাত বোলাতে লাগে। পরনের ক্রপটপটির স্লিভ কাঁধ গলিয়ে নামিয়ে ফেলল। ঠোঁট ছুঁয়ে যায় কুহকের গলা থেকে বুকের বিভাজিকায়। কুহক হুট করেই নিজেকে শ্রেয়ানের থেকে ছাড়িয়ে নিল। হাতের পিঠ দিয়ে ঠোঁট মুছে নিয়ে হাসল।
শ্রেয়ান এগোতে গেলে কুহক হাতের তালু সামনে তুলে তাকে সেখানেই থামিয়ে দিলো। আবেদনময়ী গলায় বলে উঠল,
-“আমি ভীড় পছন্দ করি না, বেইবি..”
সহসা শ্রেয়ান থমকে গেল। সে-ও প্রিয়কে এই কথাটা বলেছিল! শিট ম্যান! এই মেয়েকে ছাড়া দু'দণ্ড স্বস্তিতে কেন থাকতে পারে না? আর পারল না কুহকের সামনে থাকতে। উঠে চলে গেল অন্য রুমে।
কুহক কাপড় ঠিক করে কাউচে গা এলিয়ে গ্লাসটা হাতে তুলে নিল, সেই সাথে তার ওষ্ঠ বাঁকানো অসম্ভব সুন্দর হাসিটা ছড়িয়ে পড়ল ঠোঁট, গাল হয়ে চোখে...
_____
আজ ফোন নেই, চোখে ঘুমও নেই। রাত নামতেই প্রিয় বিলপাড়ে চলে আসে। শুষ্ক পাতাগুলোর মাঝে সোজা শুয়ে পড়ে, চাঁদ দেখে। তারপর চোখ বন্ধ করে নেয়। সে টের পায় কামিনী ফুলের মিষ্টি সৌরভ। মুচকি হাসি ওষ্ঠে লেপটে যায়। টের পায় ঠিক পাশেই কাল্পনিক প্রিয় পুরুষের অস্তিত্ব। প্রিয় শুধায়,
-“কেমন আছ, প্রাণ?”
কল্পনায় প্রিয় তার কল্পপুরুষকে প্রাণ সম্বোধন করে। এই লোকটার চেহারার আকৃতি প্রিয় বোঝে না, তার কণ্ঠস্বরও চেনে না। কেমন ধাঁচের তা-ও বুঝতে পারে না। মাঝে মাঝে মনে হয় খুব চেনা এই লোকটা। অথচ প্রিয় চিনতেই পারছে না।
প্রাণ তাকে বলে,
-“ভালো আছি। তুমি ভালো আছ, ফুল?”
-“তুমি পাশে থাকলে খুব ভালো থাকি।”
-“আমি তো সবসময়ই আছি।”
-“তবে সবসময় দেখা দাও না কেন?”
-“তুমি ভাবলেই আমার উপস্থিতি টের পাবে। যতটা ভাববে, ততটাই। অথচ তুমি আমায় ভাবো না।”
প্রিয় আঁতকে ওঠে,
-“কী বলো? তোমায় ভাবি না?”
-“কম।”
প্রিয় অত্যন্ত দুঃখিত হয়ে বলে,
-“এটা বলতে পারলে?”
-“পারলাম।”
-“তুমি পাষণ্ড হয়ে যাচ্ছ, প্রাণ!”
-“না, ফুল। তুমি আমাকে নিজেই তা বানাচ্ছ। আমার হাতে আমার কিছুই নেই। তুমি যেমনিভাবে আমায় চাইবে, তেমনিভাবেই পাবে।”
-“ভালোবাসি বলো!”
-“আমি তো তোমায় ভালোবাসি না, ফুল। মিথ্যা বলব?”
-“হ্যাঁ, মিথ্যা বলো।”
-“কামিনীফুলকে ভালোবাসি।”
প্রিয় খিলখিল করে হেসে ওঠে,
-“প্রাণ, ভালোবাসি।”
প্রাণ মুচকি হাসে। প্রিয় বলতে লাগে,
-“জানো? তুমি থাকলে বড়ো শান্তি লাগে। কেন লাগে বলো তো?”
-“কারণ তুমি মনে করো আমি থাকলে শান্তি পাও, তাই।”
-“হ্যাঁ। একমাত্র তোমার কাছে এসেই আমি নিজের মর্জির মালিক হই। যা চাই, সব পাই। স–ব..”
-“হুঁ।”
প্রিয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে শুধায়,
-“প্রাণ, যা চাই, তা পাই না। যা পাই, তা কখনও চাই-ও না। কেন?”
-“এটাই নিয়ম, ফুল। আমরা যাকে মনে-প্রাণে চাই। তাকেই মনের মতো পাই না।”
-“কী সুন্দর নিয়ম তোমার পৃথিবীর!”
-“পৃথিবীটা যদি আমার হতো, তবে অন্যরকম হতো।”
-“খুব সুন্দর হতো..”
_____
রাত তখন দেরটার কাছাকাছি। শরৎ বিছানায় বসে বসে বই পড়ছিল। এমন সময় ফোন বেজে ওঠে। এই রিংটন তার ফোনের নয়। ফোনটা যে প্রিয়র, তা বুঝতে সময় লাগল না। সাইডবক্স থেকে ফোন বের করল। একটা প্রাইভেট নাম্বার থেকে কল এসেছে। রিসিভ করা কি উচিত হবে? যদি এটা প্রিয়র বয়ফ্রেন্ড হয়ে থাকে? থাক, রিসিভ না করাটাই ভালো।
শরৎ ফোন সাইলেন্ট করে পাশে রেখে দিলো। অথচ বার বার বেজেই যাচ্ছে। ডিস্প্লে লাইট যতবার অন হচ্ছে, ততবারই শরতের চোখ সেদিকে যাচ্ছে। শেষমেশ আর পারল না নিজেকে আটকাতে। কল রিসিভ করে নিল।
-“প্রিয়শ্রী, আই মিসড্ ইউ ব্যাডলি.. এরকম করছ কেন? আর কতবার সরি বলব বলো তো? কানে ধরব? লেট'স মিট, কিউটিপাই। সব রাগ ভুলিয়ে দেবো..”
-“তো তুই-ই সেই বাস্টার্ড?”
চলবে..
Leave a comment
Your email address will not be published. Required fields are marked *