কপালের ডানদিকে তিল থাকলে জাতক হয় সৌভাগ্যবান, বামদিকে তিল থাকলে তারা নানানরকম কুমতলব আঁটে। উপরের ঠোঁটে তিল থাকলে কর্মঠ হয়, নিচের ঠোঁটে থাকলে হয় জন্মের অলস। শরীরের কোন জায়গায় তিল থাকলে কী হয় বিভার সব জানা। ক্ষুদ্র তিল বিশেষজ্ঞ একজন। ফলে আমার মুখচ্ছবির দিকে তাকিয়ে বিভা আবিষ্কার করল, আমি সারাদিন ঘরে বসে থাকি, বিশেষ কোনো কাজ করি না বসে বসে একমাত্র কুমতলব আঁটা ছাড়া। কারণ আমার নিচের ঠোঁটে একটা তিল এবং কপালের বামদিকেও একটা তিল গোঁয়ারের মতো সেঁটে বসে। বিভার তিল গবেষণা কিঞ্চিত সত্য। আমি সারাদিন ঘরে বসে থাকি। তবে বাকি দু’টো সত্য না। বিভার আত্মবিশ্বাস ভয়ানক। প্রশ্নগুলো আরও বেশী।
‘তোমার শরীরের আর কোন কোন জায়গায় তিল আছে?’
আমি ইতস্তত করলাম। আরও তিনটে তিল আছে। বাম হাতের তালুতে একটা, পেটে একটা এবং খুব সম্ভবত ডান উরুতে একটা। আমি বাম হাতের তালু দেখালাম। বিভার হতাশা বাড়লো।
‘তোমার অসৎ কর্মে লিপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।’
আমি থতমত খেয়ে পেট আর উরুর তিলের কথা চেপে গেলাম। জানালাম, আর নাই। বিভার হতাশা তাতে কমলো না। সে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘আমার কেন জানি মনে হচ্ছে তোমার পেটেও একটা তিল আছে?’
আসমান থেকে সোজা রেস্টুরেন্টের চেয়ারে ধপাস করে পড়লাম আমি। চেয়ার কেঁপে উঠল। আমার চোখজোড়াও। বিভার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা। অথবা দ্বিতীয় দেখা। ছোটবেলায় সেই কবে দেখা হয়েছিল একবার। পাশের বাসায় থাকতো ওরা। আমরা ভালো বন্ধু ছিলাম। সকালবেলা একে অপরকে নিজেদের খেলনা দিয়ে দিতাম ভালোবেসে। বিকালবেলা চুলোচুলি করে মেরেধরে নিয়ে আসতাম ওটি। ষষ্ঠ শ্রেণীতে উঠার পর বিভারা বাসা ছাড়লো। তারপর কত বৎসর যোগাযোগ নেই। ভুলেই গিয়েছিলাম। বিভা চিনতে পারলো আমায়। ক্যাম্পাসের বাইরে টং-এর পাশে বসে সিগারেট ফুঁকছিল। আমিও সিগারেট ফুঁকার জন্য গেলাম। সঙ্গে কিছু খানাদানা। দু’টো সিঙ্গাড়া, এক কাপ চা আর একটা সিগারেট নিয়ে বিভার পাশে বসলাম। সিগারেট ধরানোর জন্য লাইটার খুঁজতেই আধপোড়া সিগারেট বাড়িয়ে বিভা ভ্রুঁ কুঁচকালো, ‘তুমি সুহাস না?’
আমি মাথা উপর নিচ করলাম। তারপর হলো বিভার সঙ্গে আমার দ্বিতীয় পরিচয়। কিন্তু ততদিনে মাঝখানে দূরত্ব টের পাওয়া গেলো বেশ। সম্বোধন তুই থেকে নেমে গেছে তুমিতে। মারামারি ছেড়ে গেছে একে অপরের হাত। এমনকি চোখের দৃষ্টিও বদল হয়েছে খুব। আমি বিভার দিকে তাকাতে পারলাম না। ও কি লজ্জা? জানিনে।
‘তুমি জিজ্ঞেস করবা না আমি কেমনে জানলাম তোমার পেটে তিল?’
‘জানলে কী করে?’
‘কারণ তুমি খাদক। পেটুক। এইখানে বসার পর থেকে গিলছো আর গিলছো। যাদের পেটে তিল থাকে, তারা পেটুক হয়। ছোটবেলায়ও তুমি খানাদানায় বেশ ছিলে। আমার ভাগের নাস্তাও খেয়ে ফেলতে।’
আমি মাথা ওপর নিচ করলাম। বিভার সঙ্গে আমি সহমত। তিলপ্রসঙ্গ যত তাড়াতাড়ি যায়, তত মঙ্গল। আমি খুব সতর্ক থাকলাম। আমার কোনো আচার আচরণে যেন ডান উরুর তিলটা দাঁত বের করে না ফেলে। ঐ তিল আবার কী ঘোষণা দেয় কে জানে। হয়তো ঘোষণা দেবে আমি লালাকাতুরে। ঘুমালে আমার ঠোঁটের কোন বেয়ে লালা গড়ায়। রাস্তার প্রতিটি মেয়ে দেখে লালা পড়ে।
‘তুমি আমাকে চিনলে না কেন?’
‘চেনা চেনা লাগছিল। ঠিক মনে করতে পারছিলাম না।’
চোখের দিকে তাকিয়ে কড়কড়ে মিথ্যা বললাম। বিভাকে আমি চিনতে পারিনি। এখনও চিনতে পারছি না। ছোট্টবেলার কাঁধ পর্যন্ত লম্বা চুলওয়ালা গোলগাল মেয়েটির সঙ্গে সবুজ লতার মতোন টিংটিঙে লম্বা মেয়েটার একফোঁটাও মিল নাই। বিভা হেসে ফেলল। হাসিটাও পাল্টে গেছে খুব। ছোটবেলায় হাসলে দাঁত দেখা যেতো সবগুলো। আজকাল কায়দা করে হাসতে শিখেছে বোধহয়। দাঁত দেখা গেলো না সব। কিন্তু তাও মনে হলো, প্রাণখোলা হাসি। বিভা বলল, ‘তুমি একটা মিথ্যুক। তুমি আমাকে চিনোনি। মিথ্যা বললে কেন বলো।’
আমি মাথা নিচু করে স্বীকার করলাম, ‘তোমায় চিনিনি বললে তুমি কষ্ট পাবে হয়তো, তাই।’
‘কেন পাবো কষ্ট?’
কষ্ট পাওয়ার মতোন কথা এ নয়। ছোট্টবেলার সব বন্ধু-বান্ধব আমাদের মনে থাকে না। বিশেষত যারা উড়াল দিয়েছিল দ্রুত। বিভা আমায় চিনে ফেলল- এটাই বরং আশ্চর্য! মেয়েদের স্মৃতিশক্তি ছেলেদের চেয়ে শক্তিশালী, তা আর বলতে। রেস্টুরেন্টে আমার সামনে বসা বিভা চুল খুলে দিলো একটু পর। চুলগুলোও লম্বা হয়েছে বেশ। ছোটবেলায় বিভার আব্বা-আম্মা বলতো, তাদের মেয়ে হবে বাট্টুস। বাট্টুস মানে যারা বেঁটে। খেলনা নিয়ে গণ্ডগোল হলেই বিভাকে আমি রাগাতাম বাট্টুস বলে। চিপস কিনতে বের হলে দুইজন, বিভা পায়ের বুড়ো আঙুলে ভর দিয়ে সিনা টান টান করে হাঁটার চেষ্টা করতো। কারণ, আমি ছিলাম তার চেয়ে লম্বা খানিক। আমি হো হো করে হাসতাম। বলতাম, গলা উঁচু করে হাঁটিসনে বিভা, পিলারের তারের সঙ্গে মাথা আটকে গেলে ছেঁড়াবেড়া হয়ে যাবি। তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য খুব। বিভা ভ্রুঁ কুঁচকাতো। অবিকল এখন যেমন কুঁচকালো একটু আগে।
অনেকদিন মনে পড়েনি, হঠাৎ আমার মনে পড়ল, রেস্টুরেন্টের একটা কোনার চেয়ারে লম্বায় আমার চেয়ে ছাড়িয়ে যাওয়া বিভার কথা। ছোটবেলায় একদিন মায়ের উঁচু হিল পড়ে বের হয়েছিল বিভা। আমার পাশে হাঁটার জন্য। যেন সমান্তরাল থাকে কাঁধ। মাথা। বড়ো কষ্ট করে হাঁটছিল সে। দোকান অবধি। কিছুদূর যেয়ে দেখি মোড়ের নিকট আমার অন্যান্য বন্ধু-বান্ধব দাঁড়িয়ে। আমার মাথায় দুষ্টুমি চাপলো। এখন যদি আমি বিভাকে হালকা পা বাড়িয়ে হোঁচট খাইয়ে ফেলে দিই রাস্তায়, বন্ধু-বান্ধব হো হো করে হেসে উঠবে আমার কর্মকাণ্ড দেখে। বন্ধু-বান্ধবদের নিকট বেশ একটা নাম হবে আমার। ওরা নানান আড্ডায়, স্কুলে, কথাবার্তায় হাসতে হাসতে স্মৃতিচারণ করবে, সুহাস একটা মারাত্মক ছেলে বৈকি। ডেয়ারিং খুব। রাস্তায় ল্যাং মেরে বিভাকে ফেলে দিলো ঐ দিন। হা হা। ওসব ভেবে আমার বুকটা কিঞ্চিত ফুলে গেলো। আমি সামনে পা বাড়িয়ে দিলাম।
রাস্তায় পড়ে বিভা পা মচকে ফেলেছিল তার। বিভার বাবা মায়ের সঙ্গে আমার বাবা মায়ের সম্পর্ক চমৎকার। ওরা বাচ্চাদের দুষ্টুমি অমন পাত্তা দিলেন না। কিন্তু বিভা দিলো। বেশ কয়েকদিন আমার সঙ্গে কথা বলল না। তারপর সব আবার ঠিকঠাক। বিভা যে একটা বজ্জাত মেয়ে, আমি বুঝলাম তার একসপ্তাহ পর। তখন ওর সঙ্গে আমার কোনো ঝামেলা নেই। ঝগড়া নেই। অথচ সিড়ি বেয়ে উঠার সময় দোতলা সিড়ি থেকে ধাক্কা দিয়ে আমায় ফেলে দিলো সে। পা ছেঁচড়ে গেলো আমার। ভাঙ্গলোও বৈকি। প্লাস্টারও করা লাগলো। বিভাকে রাস্তায় ল্যাং মেরে ফেলে দেওয়ার জন্য আমার বাবা মা আমাকে কিচ্ছুটি বলেননি। কিন্তু বিভার বাবা মা বলল। বিভাকে ঐ দুপুরে মেরে তক্তা বানিয়ে দেওয়া হলো। লাল একজোড়া চোখ নিয়ে ফোঁপাতে ফোঁপাতে বিভা দিশা না পেয়ে আমাদের বাসায় ছুটে এসেছিল। আমার বাবা মা তাকে আগলে রেখেছিলেন ঐ দিন। বকাঝকা করেছিলেন বিভার বাবা মাকে। বাচ্চারা অমন করে। তাই বলে গায়ে হাত তুলতে হয়?
.
‘বিভা, তোমার আব্বু আম্মু?’
বিভা আমার চোখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। ঐ এক দৃষ্টি আমার চোখের ভেতর ঢুকে আটকে গেলো। হাতড়ালো চারপাশ। আমি জানলাম, আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে। আমাদের শৈশব আর নেই কোথাও। আমরা বড়ো হয়ে গেছি খুব। খুব সম্ভবত বিভার বাবা মা একসঙ্গে নেই আজকাল। তারা আলাদা হয়েছেন একে অপর থেকে। আর বিভা আলাদা হয়েছে তাদের থেকে। সন্তান ভাগ করে নেওয়ার ক্ষমতা থাকলে বিভাকে অবশ্যই তারা কোমর বরাবর কেটে ভাগ করতেন। দুই ভাগ নিয়ে যেতেন দুইজন। বিভা আস্ত একটা মানুষ পড়ে রইল মামার বাসায়।
‘তোমার খবর বলো সুহাস। আন্টি আংকেলের কী খবর?’
‘বেশ ভালো। বাসায় যাবে? তোমায় দেখে যে কী খুশি হবে।’
‘যেতাম। কিন্তু তোমার যে কপালের বামদিকে একটা তিল। কোন কুমতলবে বাসায় ডাকছো আমি তো জানিনে। হয়তো বাসায় যাবো, দেখবো বাসা ফাঁকা।’
আমি হেসে ফেললাম। বিভাও হাসলো। আমরা দুইজন হাসলাম। আমার ফোন বাজলো একবার। নবনীর ফোন। আজ ওর সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল। ক্যাম্পাস থেকে আমি মোটামুটি আধাঘন্টা দূরত্বে আছি। যাওয়া সম্ভব না। ফোন রেখে দিলাম। বিভা মুচকি হাসলো।
‘গার্লফ্রেন্ড জুটিয়েছে বুঝি?’
‘না না। বন্ধু।’
‘তাই? তোমায় আমি বিশ্বাস করি না।’
‘আমার আর কোথাও তিল নাই।’
বিভা শব্দ করে হেসে উঠল আবার। হাসি আটকে গেলো গলায়, চোখে। পানি খেলো। চোখে জল এলো। অমন হাসির কোনো কথা নয়। বিভা কি অনেকদিন হাসে না?
‘তোমার আব্বু আম্মুর সঙ্গে কথা হয় না বিভা?’
‘না।’
‘কেন?’
‘উনারা মারা গেছেন। সড়ক দুর্ঘটনায়। আমি ভাবলাম, তুমি জানো।’
আমি অন্যদিকে তাকালাম। আমার চোখ ভরে গেলো জলে। আমি জানি না। ক্ষনিক আগেও আমি জানতাম না, বিভা নামের একজন চমৎকার বন্ধু ছিল ছোটবেলায় আমার। তার সঙ্গে আমার দারুণ কেটেছিল শৈশব। আমি তাকে ভুলে গিয়েছিলাম। অথচ রেস্টুরেন্টের কোনার চেয়ারটায় বিভার থমথমে মুখচ্ছবির দিকে তাকিয়ে আমার দুই চোখ ছলছল করল অনেকক্ষণ। আমি অন্যদিকে তাকিয়ে সেটা সংবরণ করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করলাম। এক দুঃখবতী কন্যার চোখের দিকে তাকিয়ে আমি বাবা মায়ের বিচ্ছেদের ব্যথা পর্যন্ত অনুভব করতে পারি। মৃত্যু নয়। ওটা আরও কঠিন। আমার কল্পনাশক্তি অমন গভীর না। বিভা আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসার ব্যর্থ চেষ্টা করল, ‘কান্না কোরো না। সবার বাবা মা কি চিরদিন বেঁচে থাকে?’
আমি কান্না করলাম। কারণ বিভা আমার ছোটবেলার সঙ্গী। আমার মনে পড়ল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র টুকরো স্মৃতি। ওর বাবা মা একদিন ঝগড়া করল খুব। দুইজন দুই রুমে দরজা আটকে বসে রইল। বিভা অবিকল অমন থমথমে মুখে আমাদের বাসায় আসলো। মা জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে রে বিভা? বিভা কিচ্ছুটি বলল না। চুপিচুপি আমায় খুঁজল। আমার রুমে এসে ঘুমন্ত আমার পাশে শুয়ে পড়ল। এক হাত রাখলো আমার গায়ের ওপর। আমার ঘুম ভেঙে গেলো। আমি চুপটি করে শুয়ে রইলাম। বিভা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদল। আমি ওরকম থেকেই জিজ্ঞেস করলাম, তোকে আন্টি পিটালো আবার?
‘না।’
‘কাঁদছিস কেন?’
‘আব্বু আম্মু ঝগড়া করছে।’
‘তোর কী সমস্যা? তোর সঙ্গে তো ঝগড়া করছে না।’
‘আব্বু আম্মু ঝগড়া করলে আমার সঙ্গেও কথা বলে না।’
‘আর এইজন্য তুই গাধার মতো কাঁদছিস! তোর সঙ্গে কথা না বললে তুইও বলবি না। তোর বয়েই গেলো?’
‘হ্যাঁ।‘
‘হ্যাঁ কী রে গাধা?’
‘আমার বয়েই যায় যে। আব্বু আম্মু ছাড়া থাকতে আমার ভালো লাগে না।’
‘ওরা তোকে পিটায়।’
‘পিটাক।’
‘আমায় অমন পিটালে বাসা থেকে পালিয়ে যেতাম।’
‘আমি যাবো না।’
‘তুই একটা ছাগল।’
‘হ্যাঁ।’
বিভা ঘুমাতো তারপর। বিভার তিল গবেষণা সত্য। আমি ছোটবেলায় নানান কুমতলব এঁটেছি। সবচেয়ে বেশী বিভার বাবা মায়ের সাথে বিভার সম্পর্ক নিয়ে। আমার একটা গোপন ষড়যন্ত্র ছিল। বিভার বাবা মায়ের সঙ্গে বিভার ঝামেলা বাঁধিয়ে দেওয়া। ভদ্রলোক ও ভদ্রমহিলাকে আমার একটুও পছন্দ না। কেন অত অপছন্দ, তা জানিনে। বিভাকে মারধোর করতো বলে? সম্ভবত, না। বিভার পিটুনি আমায় তৃপ্তি দিতো। অথবা, হ্যাঁ। শৈশবের ছোট্ট একটা বুকের কোনো এক জায়গায় বিভা বড়োসড়ো একটা জায়গা দখল করে নিয়েছিল। আমি বিভাকে কানপড়া দিতাম, তোর বাবা মা খুব খারাপ। আমার বাবা মাকে দেখ, একটুকুনও মারধোর করে না। আমাকে কড়া স্বরে একটা ধমক পর্যন্ত দেয় না। আমি শিখিয়ে দিয়েছি বিভাকে কত, তোকে ধমক দিলে তুইও উল্টো ধমক দিবি। বিভা চোখ বড়ো করে বলতো, ছি! পারবো না আমি। অত ধমক, তুচ্ছ সব কারণে পিটুনি, অতকিছু সত্ত্বেও মায়ের আঁচল ধরে ঘুরে বেড়াতো সবসময় বিভা। আব্বু আব্বু- বলে নেচে উঠত। আমি অন্যদিকে তাকিয়ে রইলাম। বিভা উঠে আমার পাশে আসলো। চেয়ার টেনে বসে হাসলো শব্দ করে।
‘তুই তো এমন ছিলি না। এত ইমোশনাল!’
‘কবে হলো ওসব?’
‘বাসা ছাড়ার কয়েক বৎসর পর।’
‘আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করিসনি কেন আর?’
‘ওসব করার বয়স ছিল আমার বুঝি? পাগল। কাঁদিসনে।’
আমরা তুমি থেকে তুই-তে চলে গেলাম কত সহজে। টেবিলের ওপাশ থেকে এইপাশ আসার মাঝখানে অত বৎসর চলে গেলো। অত দূরত্ব। নিমিষেই উধাও। আমার হাত ধরে টেনে উঠালো বিভা।
‘চল, হাঁটি।’
বিভা আর আমি হাঁটলাম ফুটপাত ধরে। বিভা মিটিমিটি হাসলো। আচমকা খিলখিল হেসে উঠে বলল, ‘রাস্তায় ছেলে মেয়ে একে অপরের হাত ধরে হাঁটলে মানুষ ভাবে তারা প্রেমিক প্রেমিকা। চল, ওদের একটু কনফিউজড করি।’
‘কিভাবে?’
বিভা আমার হাত ধরল। বিভার স্পর্শ আমার মনে নেই। কামহীন চমৎকার এক সম্পর্কের স্পর্শের সঙ্গে অচেনা শিহরণ আর স্নিগ্ধতায় টুবুটুবু এই স্পর্শের মিল নেই একটুকুনও। একটা বয়সের পর স্পর্শ পাল্টায় অমন করে। বিভা হাসতে হাসতে বলল, ‘তোর কি অস্বস্তি হচ্ছে?’
‘না।’
‘ছোটবেলায় তুই ছাড়াও আমার একটা বিশেষ বন্ধু ছিল। মনে আছে তার নাম?’
আমি কিছুক্ষণ ভাবলাম। বিভার বন্ধু ছিল না তেমন। আমি ছাড়া। আমার কোনো বন্ধুর সঙ্গেই তার বনিবনা হতো না। আমরা বন্ধুর সংখ্যা গুনে মাঝে মাঝে একে অপরকে হারানোর চেষ্টা করতাম। একতরফা ঐ খেলায় আমি জিততাম সবসময়। আমার বন্ধু ছয় অথবা সাতজন। বিভার একজন। একদিন ভীষণ জেদ করে বিভা একজন বন্ধু ধরে আনলো। বয়সে আমাদের থেকে এক দুই বৎসর বড়ো। পাশের বিল্ডিং থেকে সামান্য দূরত্বে একটা অনাথ আশ্রম। ওখানে থাকা একটি বাচ্চা। হ্যাংলা শরীর। কাটা কাটা চেহারা তার। উঁচু নাক। লম্বাটে গাল। ববকাট চুল। শক্ত করে তার হাত ধরে আমায় দেখিয়ে বলল, ‘আমার বন্ধু দেখ।’
পাতানো বন্ধু বিভার জোর করে করা সম্পর্ক তেমন একটা গুরুত্ব দিলো বলে মনে হয় না। বিভার থেকে হাত ছুটিয়ে বলল, ‘আমি তোর বন্ধু না।’
‘অবশ্যই তুই আমার বন্ধু।’
‘না।’
বিভা খেঁকিয়ে উঠল। আমি হো হো করে হেসে উঠলাম। পাতানো বন্ধু ও বিভা মিলে চুলোচুলি আরম্ভ হলো। বেশ একদফা মারপিট হলো। আমি বসে বসে দেখলাম। বাচ্চাটার নাম ভুলে গেছি। দুই অক্ষরের কোনো নাম। ফুলের নামে নাম। জুঁই? বেলী?
‘জুঁই?’
‘বাহ। তার নাম ঠিকই মনে আছে তোর, আমার নাম চেহারা সব ভুলে গেলি?’
‘তোর নাম ভুলিনি বিভা, বাজে বকিসনে।’
‘আর কারোর কথা মনে আছে তোর?’
আমি মনে করার চেষ্টা করলাম। জুঁই ছাড়া বিভার আর কোনো বন্ধু ছিল না। তবে অনাথ আশ্রম খেলতে যেতো সে প্রায়শই। জুঁই-এর সাথে বন্ধুত্ব পাতানোর পর। আমায়ও নিয়েছিল একদিন। ওদের খেলা আমার পছন্দ হয়নি। ওদের ভাষা আমার পোষায়নি। ওদের ময়লা চেহারা আমায় টানেনি কোনোদিন। আমি যাইনি আর। বিভা আমায় একদিন কথাচ্ছলে শুধু বলেছিল, ওর অনেক বন্ধু হয়েছে, কিন্তু সে আমার সাথে বন্ধুর সংখ্যা গোনার খেলা খেলবে না একদম। আমি বুঝে নিয়েছি, ওটা ধুরন্ধর বিভার কঠিন চাল। হারবে সে জানে। একটা অকারণ অজুহাত দাঁড় করালো তাই।
.
বিভা আমায় দাঁড় করালো ফুটপাতে। পাশে সারি সারি বৃক্ষ। রাস্তার ওপাশেও ঘন ছায়া। শহরে এই একটুকুন ছায়া অবশিষ্ট আছে এখনও। বিভা ওতে গা এলিয়ে বলল, ‘আমি আমার আব্বু আম্মুকে প্রচণ্ড ভালোবেসেছি সুহাস। ঐ আশ্রম আমায় জানিয়েছিল বাবা মা কী। তুই কখনও ঐ আশ্রমে গিয়ে থাকিসনি একবেলা। ফুটপাতে বাবার কাঁধে চড়া একটা বাচ্চাকে দেখে ওরা যখন তাকায়, তুই কখনও দেখিসনি ঐ চোখে কী পরিমাণ কাতরতা, আহ্লাদ, আবদার, বেদনা থাকে। আমি দেখেছি। আমি ওদের জায়গায় নিজেকে একটা মুহূর্তের জন্যও কল্পনা করতে পারতাম না। আমার হতাশ লাগতো। অমন একটা বয়স, যখন আমার কথা ছিল মার্বেল নিয়ে খেলবো, পুতুল খেলবো, কাবাড়ি খেলবো দম আটকে রেখে, আর আমার দম আটকে আসতো এটা ভেবে- যদি আমার আব্বু আম্মুর কিছু একটা হয়, আমি কোথায় যাবো?’
বিভা দূরে তাকিয়ে কথা বলল। আমি হাত ধরে রাখলাম শক্ত করে ওর। ও জানুক, ওর কেউ একজন আছে। ওর বন্ধু। ওর সঙ্গী। ওর শৈশব। স্মৃতি হারায় না। গুঁজে থাকে শুধু। একটু টোকা দিলে উঁকি দেয়। বিভা ছলছল চোখ নিয়ে বলল, ‘একদিন একটা বাচ্চার অসুখ হলো। জ্বর। আশ্রমের দায়িত্বে যারা, তারা ডাক্তার ডেকে আনলেন। চিকিৎসা চলল। বাচ্চা জ্বরের ঘোরে ডাকলো, আব্বু আব্বু। বাবা মনে করে ডাক্তারের হাত শক্ত করে ধরল। ডাক্তার প্রেসক্রিপশন লিখে যাওয়ার সময় ঐ হাত ছাড়িয়ে নিলেন। আমার চোখে এখনও ভাসে ঐ মুঠো, কব্জি চেপে ধরা ঐ শক্ত আঙুলগুলো। একটা হাত ছাড়িয়ে নিচ্ছে নরম একটা হাত। আমার মাথায় ঢুকে গেলো। আমি বাসায় ফিরে অনেকক্ষণ কাঁদলাম। আব্বু আম্মুর মাঝখানে গিয়ে শুয়ে পড়লাম। ওরা দুইজন আমায় কাঁদতে দেখে দুইপাশ থেকে হাত রাখলো পেটের ওপর। ঐ রাতে ঐ দু’টো হাত ধরে আমি ঘুমাতে পারিনি একদম। নিজেকে মনে হচ্ছিলো পৃথিবীর সবচেয়ে সৌভাগ্যবতী একজন। যখন বাসা ছাড়লাম আব্বু আম্মুর সাথে, মিথ্যে বলবো না, আমার তোকে নিয়েও অত বেশী কষ্ট হয়নি, আমার কষ্ট হচ্ছিলো আশ্রম ছেড়ে আসছি আমি। প্রথম প্রথম শক্ত থাকলাম। দ্রুত ভেঙে পড়লাম। আমার কান্নাকাটি দেখে আব্বু আম্মু আশ্রম নিয়ে গেলেন গাড়ি করে আমায়। আশ্রমের বন্ধুরা আমায় দেখে সেকি আনন্দ। অনেকগুলো উপহার নিয়েছিলাম ওদের জন্য। বেশ একটা কাড়াকাড়ি হলো উপহার নিয়ে। খেলা হলো। সন্ধ্যের দিকে আমরা ফিরলাম আশ্রম থেকে।'
বিভা থামলো। দম নিলো। গলার স্বর কাঁপলো অল্প। ঢোক গিলে সম্ভবত সংশোধন করে নিলো শেষাংশ, 'আমি ফিরলাম শুধু। আব্বু আম্মু পথেই রয়ে গেলেন। তারা আর কোনোদিন ফিরলেন না।’
আমার হাতের বাঁধন শক্ত হলো। বিভা ইতস্তত করল। চোখজুড়ে খেলা করল ছায়ামাখা জল। হাত ছাড়িয়ে নিলো ধীরে সে। আমার মুখোমুখি হলো। বলল, ‘সন্ধ্যে হয়ে গেলো। আমি যাবো।’
‘যাবো মানে? তোর ফোন, ঠিকানা কিছু তো জানা নেই।’
‘তুই আমার দেখা পাবি।’
‘কিভাবে?’
তখন সন্ধ্যে। রাস্তার দুই পাশে ঝিরিঝিরি অন্ধকার। আসমান পরিষ্কার। অক্টোবর মাসের শেষদিন আজ। চারপাশ কাঁপলো শীতল হাওয়ায় কোনো। বিভা আমায় দুই হাতে জড়িয়ে ধরল। দুই হাতের তলা গলে ওর নরম শুকনো দু’টো হাত পিঠ আঁকড়ে ধরল আমার। আমিও আঁকড়ে ধরলাম। কিচ্ছুটি জানিনে আমি। ও কেমন অকালপক্ব শূন্যতা এই সন্ধ্যেয় মিশে রইল জবুথবু। আমার সব আছে। ফাঁকা লাগার কথা না আমার। বিভা আমায় রেখে কোথায় যাবে? আমি কোথায় পাবো তাকে আবার? বিভা আমায় জড়িয়ে ধরে কাঁধের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করল, ‘বিভারা কোথাও হারায় না। তুই ওদের খুঁজে পাবি। ভিন্ন ভিন্ন মুখচ্ছবি, ভিন্ন ভিন্ন চুল। ভিন্ন শরীরের আকার, ওজন, ভিন্ন স্পর্শ। তোর একটা নাম আছে। সুহাস। ভুলিসনে, ওদের অন্য কোনো নাম নেই। না জুঁই, না বেলী, না গন্ধহীন কোনো অপরাজিতা ফুল। ওরা সবাই বিভা। আমাদের ভালোবেসে একরাত্তির কেঁদেছিল একটি মেয়ে, আমরা তার হয়ে বেঁচে থাকবো অন্ততপক্ষে তিন কুড়ি বৎসর।’
বিভা আমায় রেখে হাঁটলো সামনে। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম ঠায়। বিভার সঙ্গে আমার দেখা হয়নি আর। প্রকৃত বিভার সঙ্গে আমার মূলত কোনোদিনই দেখা হয়নি বাসা ছাড়ার পর। তাকে দেখার অপার্থিব ক্ষমতা আমার নাই। বাবা মায়ের আঁচল সে কোনোদিন ছাড়েনি। অথবা অনাথ আশ্রমের বৃক্ষহীন কয়েকটা ফুলের জন্য কেঁদেছিল বলে ঈশ্বর তাকে ‘অনাথ’ হওয়ার অমন কঠিন শাস্তি দেননি। তুলে নিয়েছেন বাবা মায়ের সঙ্গে। দ্বিতীয় বিভার সঙ্গে আমার দেখা হলো তার কয়েক বৎসর পর। একটা ক্যাফেটেরিয়ার সামনে। দাঁড়িয়েছিলাম। নবনীর অপেক্ষায়। যুবতী এসে দাঁড়ালো আমার সামনে। চশমা খুলল চোখ থেকে। কাঁধে ব্যাগ। ভ্রুঁ কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি সুহাস না?’
আমি কিছুক্ষণ চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে মাথা ওপর নিচ করলাম। হাত বাড়ালাম।
‘বিভা?’
বিভা মৃদু হাসলো। তখন দুপুর। পায়ের তলায় রোদ। খুব ধীরে পুড়ছে একটা আস্ত শহর। আমার চোখে জল।
.
written by: Shakhawat Hossen
