Buy Now

Search

উনিশ পৃষ্ঠা

উনিশ পৃষ্ঠা
উনিশ তারিখ, নভেম্বর মাস, দুই হাজার পনের সাল। আমি প্রেমে পড়েছিলাম। সর্বদিক দিয়ে অভাগা হওয়ায় ওই প্রেম আমার জন্য ছিল আলীবাবার সম্পদ, বৎসরের পর বৎসর ধরে জমাকৃত রাশি রাশি স্বর্ণ্য রৌপ্য ও হীরে সমান মূল্যবান। অবশেষে আমারও একটা মানুষ হলো। আমি তাকে প্রার্থনার উদ্দেশ্যে বাড়িয়ে রাখা হাতে রাখবো নাকি মাথায় রাখবো ভেবে দিশা পেলাম না। জমিনে রাখলে পিঁপড়া কামড়াবে, মাথায় রাখলে উকুন। আমি হাতে রাখলাম। আর অমন শক্ত মুঠো করলাম, দুই বৎসরেই শ্বাস প্রশ্বাস নিতে না পেরে মানুষটা মরে গেল। অন্দর থেকে।
সতের তারিখ, ফেব্রুয়ারি মাস, দুই হাজার সতের সাল। আমাদের বিচ্ছেদ হলো। বিচ্ছেদের পর থেকে আমার প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়ালো তাকে অনুসরণ করা। প্রথম প্রথম প্রতিদিন অনুসরণ করতাম। তারপর ধীরে ধীরে সপ্তাহে একদিন, মাসে একদিন, ছয় মাসে একদিন এবং সর্বশেষ, বৎসরে একবার। প্রতিটা অনুসরণ দিবস-এর বিস্তারিত আমি লিখে রাখতাম। আজ মার্চ মাসের নয় তারিখ, দুই হাজার একুশ সাল। ডায়েরীর উনিশ নম্বর পৃষ্ঠায় আছি আমি। এবং সম্ভবত সর্বশেষ পৃষ্ঠা। কেননা ডায়েরী লেখা শেষ হলো আমার আজ। আর কোনোদিন ডায়েরী লেখার প্রয়োজন পড়বে না।’
.
~ ফেব্রুয়ারির আঠার তারিখ, দুই হাজার সতের সাল।
বিচ্ছেদের পর একটা মানুষের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া কী হয়? মন খারাপি? কান্নাকাটি? একাকীত্ব? হা-হুতাশ? ওসবের কিছুই দেখলাম না জেসির মধ্যে আমি। সকাল থেকে রাত। একটা মুহূর্তের জন্যও না।
জেসি ঘুম থেকে উঠল সকাল নয়টায়। দুই বৎসর আমার সঙ্গে ছিল, আমি জানি নয়টা-ই ওর ঘুম থেকে উঠার স্বাভাবিক সময়। আমার ধারণা ছিল, জেসি রাত্তিরে ঘুমায়নি। ঘুম হওয়ার কথা না। রাত্তিরে ঘুম না হলে সকাল সকাল সময়মতো উঠা যায় না। জেসি উঠল। শুধু তা-ই না, সে ঘুম থেকে উঠে হাই তোলে, আড়মোড়া ভাঙে, ফোন হাতড়ে কিছুক্ষণ পড়ে থাকে ফোনের ভেতর, তারপর বিছানা ছাড়ে; আমি জানি। জেসি যে জানালা পাশে নিয়ে শোয়, ওই জানালায় আমি তাকে দেখতে পেলাম স্পষ্ট, আনুমানিক হাজারখানেক হাত দূরত্ব থেকে। আমার অবস্থান, পার্শ্ববর্তী বিল্ডিং-এর ছাদ; হাতে ছিল বাইনোকুলার।
জেসি অবিকল তা করল, যা সে সম্পর্ক থাকাকালীন করত। একটুকুনও পার্থক্য নেই। যদিও সম্পর্কটা নেই আর। তবে কি জেসি ভুলে গেল বিচ্ছেদের কথা? সকাল সকাল আমরা অনেককিছু ভুলে যাই। ফোন হাতে নিয়ে জেসি কি আমায় ভুলে ফোন দিয়ে ফেলেছিল প্রায়? আমি ওর ভ্রু’জোড়ায় প্রখর দৃষ্টি রাখলাম। তার অঙ্গভঙ্গি, তার শুষ্ক ঠোঁট, নাক কুঁচকানো, গাল চুলকানো। নাহ। আমায় ফোন দেয়নি সে। চেষ্টাও করেনি। দুই বৎসরের টানা অভ্যাস একদিনেই সামলে নেওয়া সহজ কথা না। জেসি সহজ মেয়ে না। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে চোখ খোলার সময়ই তার মাথায় ছিল, আমাদের বিচ্ছেদ হয়ে গেছে। সুতরাং, ভুল করার প্রশ্নই আসে না।
জেসি টেবিলে বসে ছিল। সকালের নাস্তা সামনে নিয়ে। রুমের দরজা খোলা থাকলে জানালা দিয়েই টেবিলের একাংশ দেখতে পাওয়া যায়। আমি দেখলাম আর আশ্চর্য হলাম। বিচ্ছেদের পর মানুষ খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দেয়। আমি খেতে পারিনি। এক গ্লাস পানি গিলেই বাইনোকুলার হাতে ছুটে গিয়েছি। অথচ জেসি নাস্তা করল। পাউরুটি খেল, উপরে জেলির প্রলেপ বসালো চমৎকার। বেশ যত্ন করেই বসালো। যেন সদ্য সিমেন্ট শুকিয়ে শক্ত হওয়া একখানা নিরেট দেয়াল, ওখানে রঙ মাখাচ্ছে কোনো দক্ষ রঙবাজ। জেসি পাউরুটি খেল আয়েশ করে চিবিয়ে, পানি খেল। খাওয়ার টেবিলে মা কী যেন জিজ্ঞেস করল, উত্তর দিতে যেয়ে জেসি হাসলো খিলখিল। হাসির দমকে শরীরটা কেঁপে কেঁপে উঠল তার। যখন জেসি মন খুলে হাসে, তখন ওর শরীরটা এমন করে দোলে।
সকালের নাস্তা শেষেই জেসি বের হয়েছিল রাস্তায়। কাকে যেন ফোনও করেছিল। সম্ভবত বান্ধবী। বের হওয়ার আগে প্রায় পনের মিনিট সময় লাগিয়ে সাজুগুজু করেছে। জেসির সাজুগুজুর স্বাভাবিক সময় আমি জানি। পনের থেকে বিশ মিনিট। আমি বাইনোকুলার ব্যাগে পুরে তড়িৎ গতিতে নেমেছিলাম বিল্ডিং থেকে। নিরাপদ দূরত্ব থেকে দৃষ্টি রেখেছি তাদের উপর। জেসির বান্ধবীর নাম সানিয়া। ওরা দুইজন শপিং মল ঘুরল প্রায় দেড়ঘণ্টা সময় লাগিয়ে। সেকি হাসি। একজন হাসতে হাসতে অন্যজনের গায়ে পড়ে যাচ্ছে। আমার মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল।
মানুষ তার সবচেয়ে ভালো বন্ধুটির সঙ্গেই নিজের সব দুঃখ আনন্দ ভাগাভাগি করে। সানিয়া কি এখনও জানে না জেসির বিচ্ছেদ হয়েছে? জানার তো কথা। জেসিকে কখনই একলা দেখেনি সে। সর্বক্ষণ আমি সঙ্গে ছিলাম। আজ যখন ওকে একলা দেখল, নির্ঘাত তার মনে প্রশ্ন উঁকিঝুঁকি দিয়েছে- তোদের কী বিচ্ছেদ হয়েছে? আমি এমন একটা প্রশ্নের অপেক্ষায় ছিলাম। অথচ সানিয়া একটিবারের জন্যও বিচ্ছেদ প্রসঙ্গ তুলল না। ওরা হাসতে হাসতে শপিং করল, বইয়ের দোকানে গেল, বই কিনলো, সিনেমাও দেখল একটা।
রাত্তির বারোটা পর্যন্ত আমি নজর রাখলাম। এমন একটাও ইঙ্গিত পেলাম না, যা থেকে আমি অন্তত ধারণা করতে পারি, জেসির বিচ্ছেদ হয়েছে। কোথাও না কোথাও সে অল্প হলেও কষ্ট পাচ্ছে। কিন্তু কোথায়? রাত সাড়ে এগারটা পর্যন্ত ফোনে মুভি দেখল, বই পড়ল কিছুক্ষণ, তারপর বুকের উপর বই মেলেই ঘুমালো।
এখন রাত একটা বেজে বিশ মিনিট। আমি ফেরত এসেছি বিল্ডিং থেকে। লিখছি। আমার কান্না পাচ্ছে। হয়তবা প্রথমদিন, তাই জেসি অনুভব করল না আমার অভাববোধ। কাল করবে। আলবৎ করবে।
.
~ ফেব্রুয়ারির উনিশ তারিখ, দুই হাজার সতের সাল।
আমার অবস্থান ছিল পার্শ্ববর্তী বিল্ডিং-এর ছাদ; হাতে বাইনোকুলার। জেসি ঘুম থেকে উঠেছিল নয়টায়। হাই, আড়মোড়া ভেঙে ফোন হাতড়ে কাকে যেন ফোনও দিয়েছিল। সকালের নাস্তায় পাউরুটি, উপরের জেলির প্রলেপ, খাওয়ার টেবিলে মায়ের সঙ্গে কিছুক্ষণ হাসিঠাট্টা, তারপর পনের মিনিট সাজুগুজু করে যখন বের হয়েছিল জেসি রাস্তায়, তখন সকাল এগারটা। আমি বাইনোকুলার ব্যাগে পুরেই নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়েছিলাম। কাকে ফোন করেছিল জেসি? একটুক্ষণ পরই রিকশা নিয়ে আসলো অমৃতা। জেসির বান্ধবী। তাকে ফোন করেছিল তবে।
জেসি আর অমৃতা ভার্সিটি গেল। ক্লাস করল। ফেরত আসলো। ফেরত আসার পথে ফুচকা খেলো রাস্তায়। সঙ্গে আরও দুইজন ছেলে বন্ধু। ওরা ফানি হওয়ার চেষ্টা করল খুব। জেসি এমনিতেই অনেক হাসে। আজ ফুচকা হাতে হাসলো। হাসতে হাসতে একবার ফুচকা মুখ থেকে পড়ে গেল। দেখে ছেলে বন্ধুদের সে কি হাসি! যেহেতু হাসতে হাসতে মুখ থেকে ফুচকা পড়ে যাওয়ার মতো এমন দমফাটানো হাস্যকর দৃশ্য পৃথিবীতে আর দু’টো হয় না।
জেসি বিকালবেলা ঘুমায় না। ওর যুক্তি ছিল, যখনই তুমি দিনে এক ঘণ্টা ঘুমিয়ে ফেলবে, তখনই তোমার রাতের ঘুম থেকে এক ঘণ্টা বাদ পড়বে। যদি তুমি রাত বারোটায় ঘুমাও, তবে দিনে এক ঘণ্টা ঘুমালে রাতে তোমার ঘুম আসতে আসতে বাজবে একটা। তাই বিকালবেলা আমাদের ফোনে কথা হতো। দীর্ঘ সময়। একদম সন্ধ্যা অবধি। আমায় বলত, তুমি আমায় জাগিয়ে রাখো। আমি জাগিয়ে রাখতাম। শারীরিক ও মানসিক।
ভার্সিটি থেকে ফিরে জেসি বিকালবেলা ঘুমালো। দুই দিনের পর্যবেক্ষণে একটা মাত্র বিষয়ই দৃষ্টিগোচর হলো, আমার সঙ্গে যে সময়টা জেসির কাটত, বিচ্ছেদের পর ওই সময়টা সে দিচ্ছে বইকে অথবা ঘুমকে। অথবা দু’টোকেই। বুকের উপর খোলা বই নিয়ে জেসিকে আরামসে ঘুমাতে দেখে আমার ভাঙা বুকটা আরও চূর্ণ হলো।
রাত্তিরে যখন ফিরে এসে আমি লিখছি, আমার চোখে ভাসছে জেসির নিশ্চিন্ত ঘুমানোর ওই দৃশ্য। দুই বৎসর সম্পর্ক ছিল আমাদের, অন্তত একফোঁটা চোখের জল আমি ডিজার্ভ করি। জেসি তাও বিসর্জন দিলো না। আমার বড্ড অভিমান হলো আর আমি শংকিত হলাম, তবে জেসি কি আমায় কোনোদিন ভালোবাসেনি?
.
~ মার্চের এক তারিখ, দুই হাজার সতের সাল।
আজ প্রায় ধরা পড়ে গিয়েছিলাম। ভার্সিটি যাওয়ার পথে জ্যামে আটকালো জেসির রিক্সা, পেছনের রিক্সায় আমি। একটুকুন ফাঁক পেয়ে আমার রিক্সাটা এগিয়ে গেল। তারপর দুইটা রিক্সা পাশাপাশি। আমার বুক থরথর করে কাঁপলো। আমি যে তাকে অনুসরণ করছি গত এক মাস ধরে প্রায়, যদি টের পায় তো থানা-পুলিশও করে ফেলবে। যা রাগ জেসির। আমি ডানপাশে তাকালাম না ভয়ে। জেসি তাকালো। বামপাশে। তাকিয়েই হাত উঁচু করে ডাকলো, আরে, কী খবর?
‘এই তো, ভালো। তোমার?’
‘চলছে কোনোরকম। কোথায় যাচ্ছো?’
‘এই যে একটু অফিসের কাজে বের হলাম।’
‘আচ্ছা।’
জেসি হাসলো, আমিও হাসলাম মৃদু। জ্যাম ছাড়ল তৎক্ষনাৎ। বাঁচলাম। অবশ্য এই দেখা হওয়ায় আমি খুশি হলাম। আজকের পর্যবেক্ষণ আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এতদিন তার সঙ্গে আমার দেখা হয়নি, আমি তার দৈনন্দিন কোনো স্মৃতিতে নেই, আজ আছি। আজ তার দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে একটু হলেও পরিবর্তন যদি দেখতে পাই, ওটাই আমার দুই বৎসরের অর্জন।
আমার ভারী আনন্দ হয়েছিল সারা পথ। কিন্তু রাত্তিরে ওই আনন্দ উবে গেল। সন্ধ্যার পর আমি প্রথমবার জেসিকে মনমরা দেখতে পেলাম। পার্শ্ববর্তী বিল্ডিং-এর ছাদের উপর বাইনোকুলার হাতে বসা আমার যেন ডানা গজালো পিঠে, ইচ্ছে করল লাফ দিই তীব্র আনন্দে ছাদ থেকে, মনমরা জেসি! আহারে! আহা! অতঃপর প্রেয়সী অভাববোধ করল আমার।
পৃথিবীর তাবৎ বড়ো বড়ো দার্শনিকগণ অহরহ বলেছেন, আনন্দ স্বল্পস্থায়ী। ক্ষণিক সময় পরই আমি তা বুঝতে পারলাম। আমার পিঠে সদ্য গজিয়ে উঠা ডানাজোড়া ফের গুঁজে গেল চামড়ার অন্দর, তীব্র আনন্দ ফুস শব্দ করে উড়ে গেল আসমানে। জেসি মনমরা আমার জন্য নয়, মায়ের জন্য। মায়ের অসুখ করেছে। সন্ধ্যার পরই মাকে হসপিটাল নেওয়া হলো। কেয়ার হসপিটাল। শহরের সবচেয়ে বড়ো হসপিটাল।
হসপিটালের বাইরে আমি দাঁড়িয়েছিলাম একঘণ্টা। সম্ভবত কোনো টেস্ট দিয়েছিল, মাকে নিয়ে ফাইল সহ বের হয়ে আসলো জেসি। তখন মনমরা ভাব নেই আর। কিছুটা স্বস্তি কাজ করছে। হয়তবা মায়ের অসুখ অমন বড়ো কিছু নয়। আমি বাসায় ফেরত আসলাম তারপর। একলা বাসায়। সবার পৃথিবীই কানায় কানায় পূর্ণ, আমারই শুধু কেউ নেই, কিছু নেই।
.
~ সেপ্টেম্বরের নয় তারিখ, দুই হাজার সতের সাল।
জেসির একটা ছেলের সঙ্গে ভাব হয়েছে। ভার্সিটির একটা ছেলে। ছেলেটা ওকে পছন্দ করে। আমি জানি। ছেলে বলেই জানি। জেসি কি জানে? হয়তবা জানে। নয়তো পাত্তা দেবে কেন? হাসতে হাসতে গায়ে ঢলে পড়ে যাবে কেন? জেসিও কি কিছুটা পছন্দ করে তাকে?
সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে জেসি ফোনে অনেকক্ষণ কথা বলল। হেসে হেসে। ওই হাসির সঙ্গে ছেলেটির গায়ে ঢলে পড়া হাসির বড্ড মিল। কান না পেতেও আমি জানি, সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে জেসি এই ছেলের সঙ্গেই ফোনে কথা বলল। রোজ বলে হয়তবা। আমি আজকাল রোজ অনুসরণ করতে পারি না। অফিসের কাজ বেড়েছে। কতদিন আর অসুস্থতার কথা বলে ছুটি নেওয়া যায়?
জেসির মায়ের অসুখটা মোটামুটি সেরেছে। জেসিই দেখাশোনা করছে মাকে। আর জেসিকে দেখাশোনা করছে ছেলেটা। নাম, সৌভিক। দুইজন একইসঙ্গে ঘুরে বেড়ায়। হসপিটালে মায়ের ফাইল নিয়ে দুইবার গেল, সঙ্গে সৌভিকও গেল। খুবই আঠালো ছেলে তা আর বলতে। দুইজন ভার্সিটিও একসঙ্গে যায়। একই রিক্সায়। সৌভিক রিক্সা নিয়ে জেসির বাসার সামনে যায়, জেসি ওখান থেকে উঠে রিক্সায়। তারপর দুইজন ভার্সিটি। সোজা ভার্সিটি না, মাঝপথে ওরা থামে। কখনও ফুটপাতে নেমে যায়। টং-এ দাঁড়িয়ে চা খায়। চা খেতে খেতে হাসাহাসি করে। হাসতে হাসতে জেসির ওড়না পড়ে যায় বুক থেকে খসে। জেসির খেয়াল থাকে না তা। নাকি থাকে? পড়ে যাওয়া ওড়নাটা সৌভিক তুলে দেয় বুকে আবার। তোলার সময় বুকের সঙ্গে একটুখানি স্পর্শও নিয়ে নেয় আঙুল তার। ওই স্পর্শেই নিশ্চয় সৌভিকের জীবন ধন্য হয়ে যায়। জেসিরও হয়ে যায় হয়তবা। অযাযিত স্পর্শ মেয়েরা টের পায়। অমন কিছু যদি হতো, জেসি নিশ্চয় একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিতো সৌভিকের গালে। জেসির যা রাগ। ওই স্পর্শ কি জেসিও উপভোগ করে তবে?
অফিসের কাজে ব্যবহার করার জন্য দেওয়া বাইকে বসে থাকি আমি অদূরে। অকারণেই মোচড়ামুচড়ি করি ব্রেক। ফুঁসে উঠি। গলার রগ ফুলে ওঠে। ইচ্ছা করে ফুটপাতে বাইক তুলে দুইজনকে পিষে দিই। দুইজন নিকৃষ্ট পশু। ইচ্ছা করে, আর কখনই না অনুসরণ করি তাকে। অথচ ঠিক বিকালবেলা আমি পৌঁছে যাই পার্শ্ববর্তী বিল্ডিং-এর ছাদে। হাতে বাইনোকুলার। জেসি বই পড়ে। পড়তে পড়তে ঘুমায়। নিশ্চিন্ত ঘুম। রাত্তিরে বারোটায় ঘুমায়। আমি ফেরত আসি বাসায়। আমার এমন ফাঁকা ফাঁকা লাগে চারপাশ। বিচ্ছেদ তো দুইদিক থেকেই হয়, একদিকের মানুষটারই শুধু ফাঁকা লাগে কেন এত?
.
~ ফেব্রুয়ারির সতের তারিখ, দুই হাজার আঠার সাল।
কোনো মানুষের বাচ্চা অত সহজে বিচ্ছেদের বেদনা ভুলতে পারে না। আমি পারি নাই। বিচ্ছেদের এক বৎসর পার হলো আজ। রাস্তায় নামলে এখনও আমার ঘোর লাগে, আমার মনে হয় রাস্তার ওপাশের ফুটপাতে হাঁটছে জেসি। দুঃখী জেসি। তার চোখজোড়া ছলছল। ভাবতে ভালো লাগে। কিন্তু বাস্তব অমন নয়। কোনো মানুষের বাচ্চা অত সহজে বিচ্ছেদের ব্যথা কাটিয়ে উঠতে পারে না। আমি পারি নাই। জেসি পারল। অথবা সে ব্যথাই অনুভব করল না।
এখনও তার সকাল ভাঙে চমৎকার এক ঘুমের পর, শরীর স্বাস্থ্য চমৎকার, চোখের নিচে কালি নেই, ভেঙে পড়া নয়, ঝুরঝুরে নয়, মনমরা নয়, বিষণ্ণ নয় একফোঁটা। আজ ফোন দিয়েছিলাম। পার্শ্ববর্তী বিল্ডিং-এর ছাদের উপর থেকে। ভাবলাম স্ক্রিনে আমার নম্বর দেখে চমকাবে, হাত কাঁপবে, হাত ফসকে হয়ত ফোনটাও পড়ে যাবে নিচে। অথচ কোনোরকম অস্থিরতা ছাড়াই ফোন তুলে ওপাশ থেকে জেসি স্বাভাবিক স্বরেই বলল, হ্যালো।
‘কেমন আছো?’
‘ভালো। তুমি?’
‘আমি ভালো নেই।’
কিছুক্ষণ চুপ থেকে জেসি বলল, সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।
‘আমার কথা তোমার মনে পড়ে?’
‘সত্যি উত্তর শুনতে চাচ্ছো?’
‘হ্যাঁ।’
‘শোনার প্রয়োজন নেই। তুমি কষ্ট পাবে অযথা। আর যোগাযোগ করো না। তোমার জন্য ভালো হবে না।’
জেসি আমায় ব্যঙ্গ করল খুব সম্ভবত। আমায় বুঝিয়ে দিলো, আমি কত দুর্বল ও বেহায়া; আর সে কত মানবিক! আমার জন্য অনেক খেয়াল এখনও তার। আমি কষ্ট পাবো বলে সত্য বলল না, আমার মুভ অন-এর জন্য ভালো হবে না বলে যোগাযোগ করতে নিষেধ করল- আমি জানি এইসব ভনিতা। মহানুভবতার ভনিতা। আমার কাঁধে বন্দুক রেখে আমাকেই নিশানা করা।
আমার কথা জেসির মনে পড়ে না, এটা সরাসরি বললে আমার নিকট সে প্রকাশিত হবে দয়ামায়াহীন নিকৃষ্ট একজন পশু। কিন্তু আমার কষ্ট হবে ভেবে সত্যি না বলতে চাওয়াটায় আমার নিকট সে প্রকাশিত হলো দয়ামায়াযুক্ত উৎকৃষ্ট একজন পশু। এক অর্থে আমাকেই আঙুল তুলে দেখিয়ে দেওয়া যে, আমি কতটা নির্দয়, এবং বিচ্ছেদের জন্য আমার দায় সবচেয়ে বেশী। নাহলে অমন মহানুভব মেয়ের সঙ্গে কোনো মানুষের বাচ্চা সম্পর্ক ছেদ করে?
আমি ফোন রেখে বাইনোকুলার তুললাম। আমার সঙ্গে ফোনে কথা বলে যদি একটু মনমরা হয় জেসি। উহু, জেসি কাকে যেন ফোন দিলো। তারপর বেশ কিছুক্ষন হাসাহাসি করল। হয়তবা আমার ফোনের কথা কোনো বান্ধবীর সঙ্গে ভাগাভাগি করেছে। ভাবখানা এমন যে, দেখ আমি কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সম্পর্ক ছেদ হওয়ার এক বৎসর পরও ছেলেটা কেঁদে কেঁদে ফোন দিচ্ছে, ফেরত আসতে চাচ্ছে, ছ্যাচড়া কোথাকার। সাধারণত বান্ধবীরা বান্ধবীর প্রেমের সম্পর্কের এইসব ছ্যাচড়া গল্প শুনে হাসতে হাসতে মেঝেতে গড়াগড়ি খায়। সকালে এইসব ঘটনা শুনলে বিকাল অবধি তাদের মুখচ্ছবি থাকে হাসৌজ্ব্বল, চোখের মনিতে লেগে থাকে বিদ্রুপ, ঠোঁটের ফাঁকফোকর গলে ঝরে ঝরে পড়ে তাচ্ছিল্য মার্কা হাসি। গ্রিক দার্শনিক ক্রিসিপাস হাসতে হাসতে মারা গিয়েছিলেন গাধার ডুমুর খাওয়া দেখে, বান্ধবীরাও হাসতে হাসতে প্রায় মৃত্যুর কাছাকাছি গিয়ে পৌঁছায়- একটা ভেঙে চুরচুর হওয়া যুবক-এর সঙ্গে গাধার সামঞ্জস্য কম নয়।
জেসির পরিবর্তন হয়নি কোনো। রাত্তিরও পরিবর্তন হয়নি। এগারটা অবধি ফোন, বই। বারোটায় ঘুম। তারপর আমি আমার বাসায় বারান্দায় বসে থাকি। বাইরে দমকা হাওয়া। কেন জানি না, সমস্ত গা ঘেন্নায় রি রি করে। নিজের উপর ঘেন্না। এতটাও আত্মসম্মানবোধহীন না হলেও চলে আমার। রাত দুইটা অবধি বারান্দায় বসে থাকি আমি। একবার মনে হয় মাকে ফোন দিই। ফোন দিয়ে একটু কান্নাকাটি করি। জড়িয়ে ধরতে তো পারি না এত দূর থেকে। একটু হালকা হওয়া গেলে ক্ষতি কী? আমার বাড়ি যাওয়া দরকার।
.
~ ফেব্রুয়ারির সতের তারিখ, দুই হাজার উনিশ সাল।
জেসির সঙ্গে দেখা হয়ে গেল আবার। রাস্তায়। ফুটপাতে। টং-এর সামনে। জেসির সঙ্গে একটা ছেলে। সৌভিক নয়, অন্য কেউ। নিয়মিত অনুসরণ করলে হয়ত জানতাম, ছেলেটা কে। আজকাল বৎসরে একবার অনুসরণ করা হয় বলে জানা গেল না ছেলেটার পরিচয়। জেসি বিব্রতবোধ করল না একফোঁটা। আমি বিব্রতবোধ করলাম ওর দেখা পেয়ে। জেসি পরিচয় করিয়ে দিলো ছেলেটার সঙ্গে আমার। ছেলেটা সম্পর্কে তার বন্ধু হয়। আমি মনে মনে হাসলাম। হতেই পারে বন্ধু। আমিও বন্ধু ছিলাম একসময়।
বন্ধু তুমি করে বলে না। জেসি ও ছেলেটা একে অপরকে তুমি করে বলল। আমার সামনেই। ওদের মুখচ্ছবিজুড়ে খেলা করল প্রেম। অথচ ওরা আমায় বলল বন্ধু। আমার থেকে লুকোনো কেন? আমার মুভ অন-এ সমস্যা হবে বলে? আমি কষ্ট পাবো বলে? যেন জেসি আরও একবার আমায় চোখে আঙুল গুঁতিয়ে জানালো, সে মহান, আমি নিকৃষ্ট। আমার কথা সে বড্ড ভাবে, তাই সে তার প্রেমিককে আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে বন্ধু বলে। যাতে আমি কষ্ট না পাই। হা হা। মানুষের বাচ্চার মাথায় এত কূটচাল রাজনীতি থাকে না। জেসির মাথায় থাকে। মাত্র পনের মিনিট আমরা দাঁড়ালাম তিনজন একসঙ্গে। ওই পনের মিনিটে জেসি আমায় পনেরবার মনে করিয়ে দিলো, আমার ভালোমন্দ সম্পর্কে সে খুব ভালো করে অবগত। যেমন সে প্রথম দর্শনেই বলল, তুমি এত রোগা হয়েছো কেন? খাও না কিছু?
তারপর একে একে ছুঁড়ল অন্য অস্ত্র।
‘ছাতা নিয়ে বের হও না কেন? যা রোদ।’
অথচ ওর নিজেরই ছাতা নেই। ছাতা থাকবে কেন? প্রেমিক সঙ্গে আছে, মাথার উপর দু’হাত বিছিয়েই প্রেমিক পার করে তাকে রাস্তা। রোদের সাধ্যি আছে তাকে ছোঁয়ার? রোদ তো আমাদের মতোন অভাগাদের ছোঁবে।
‘সিগারেট খেয়ো না বেশী। গলার স্বরও তো বসে গেছে তোমার।’
অথচ তার নিজের হাতেই সিঙ্গাড়া। বাইরের সিঙ্গাড়া খেলে ওর সারাদিন খারাপ যায়। পেট মোচড় দেয়, বুক জ্বালা করে। কই আমি তো তাকে বললাম না, তুমি এইসব খেয়ো না, শরীর খারাপ করে তোমার। কারণ, আমি ভনিতা জানি না। ভনিতা যদি শিল্পী হয়, জেসি ওই শিল্পের ভিঞ্চি।
পনের মিনিটেই সে আমাকে ঝাড়া ঝাড়া করে বিদায় নিলো। ওই রাত্তির বাসায় ফিরে আমি আমার সংগ্রহে থাকা জেসির সমস্ত ছবি পুড়িয়ে ফেললাম। উপহার যা দিয়েছিল দুই বৎসরে, সবকিছু ফেলে দিলাম ডাস্টবিনে। বড্ড স্বস্তি পেলাম। আস্তে আস্তে আমায় বের হতে হবে এই ঝামেলা থেকে। তার জন্য দুঃখ পাওয়া সাজে, যে ওই দুঃখ পাওয়া ডিজার্ভ করে। জেসি উপযুক্ত নয়। আমি একটা ছিদ্রযুক্ত পেয়ালায় জল ঢেলে গিয়েছি বৎসরের পর বৎসর। জেসি কোনো মানুষের বাচ্চা না। মানুষের বাচ্চা এত সহজে রঙ বদলায় না, এত সহজে খাপ খায় না জগতের অন্য সব রঙের সাথে। জেসি মানুষই নয় কোনো, দক্ষ রঙবাজ।
.
~ মার্চ মাসের আট তারিখ, দুই হাজার একুশ সাল।
জেসির একটা চাকুরি হয়েছে। আমি জেসির খবর রাখিনি আর। চাকুরির কথা জানার কথা না। ওর চাকুরির সংবাদ দিলো আমায় অমৃতা। অমৃতার সঙ্গে দেখা হলো রাস্তায়। অফিস যাওয়ার পথে। সামান্য কথাবার্তা হলো। নিজ থেকেই যেচে সংবাদটা দিলো সে। দেওয়ার সময় ওর আনন্দময় চোখজোড়ায় সূক্ষ্ণ তাচ্ছিল্যও খেলা করল। তাচ্ছিল্যটা এমন- আমার সঙ্গে সম্পর্ক থাকাকালীন মেয়েটার কোনো গতি হয় নাই, যখনই আমার থেকে দূরে সরল, মেয়েটা যেন নিজেকে খুঁজে পেল।
অমৃতার মধ্যে জেসির স্বভাব ভালো করেই বিদ্যমান। দুইজনেরই মুখ এক কথা বলে, অন্দর আরেক কথা। দুইজনের চোখের ভাষাও প্রায় একরকম। খোঁচা খোঁচা দৃষ্টি। দুইজন তবেই না ভালো বান্ধবী। বড়ই মিল। আমি সংবাদ শুনে বললাম, ওহ আচ্ছা।
‘জেসি অনেক বদলে গেছে।’
‘তাই নাকি?’
অমৃতা হাসলো মৃদু। গর্বে ওর মুখ ঝিকমিক করল। বলল, অনেক ম্যাচিউরিটি আসছে ওর মধ্যে। আগে তো পাগলামি করতো কত। এখন ওইসব নেই। অনেক হ্যাপি।
ওইদিন বাসায় ফিরেই হ্যাপি জেসিকে দেখার ইচ্ছা হলো আমার। পার্শ্ববর্তী বিল্ডিং-এর ছাদ থেকে বাইনোকুলার বের করে চোখ রাখলাম জানালায়। অমৃতা মিথ্যা বলেনি। জেসির স্বাস্থ্য বেড়েছে আগের থেকে, মুখটা গোলগাল হয়েছে আরও, অস্থিরতা নেই তেমন, হাঁটাচলায় ধীরস্থির ভাব। সন্ধ্যার পর কিছুক্ষণ বই পড়ল সে, রাতের খাবার খেলো, বই পড়ল আবার আর বই পড়তে পড়তে ঘুমালো। আমি জানালায় তাকিয়ে রইলাম।
বাসায় যখন ফিরলাম, তখন রাত একটা বেজে পনের মিনিট। বাইরে আবছা অন্ধকার, চাঁদ নেই। বারান্দায় বসে রইলাম অনেকক্ষণ। সবারই অতল সমুদ্র থাকে, আর ওরা কোনো না কোনো খড়কুটা খুঁজে পায় তীরে উঠার জন্য। অমৃতা পায়, সৌভিক পায়, সানিয়া পায়, নামহীন ছেলেটা পায়, জেসি পায়; সবাই পায় ওই খড়কুটা। একলা থমথমে বারান্দায় বসে আমি আমার অতল সমুদ্র হাতড়ে গেলাম। আমার কোনো খড়কুটা নাই।
.
মার্চ মাসের নয় তারিখ, দুই হাজার একুশ সাল।
‘সুইসাইড না মার্ডার?’
‘সুইসাইড স্যার।’
‘কী করে নিশ্চিত?’
‘নিশ্চিত না স্যার, খুব সম্ভবত সুইসাইড। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল, কোনোরকম ধস্তাধস্তির চিহ্ন নেই, চেয়ার বিছানায় তুলে চেয়ারের উপর উঠে ফ্যানের সঙ্গে দড়ি বেঁধেছে, গলায় ফাঁস নিয়েছে, লাথি দিয়ে চেয়ার ফেলেছে, তারপর ঝুলে পড়েছে।’
‘সুইসাইডের কারণ?’
‘খুব সম্ভবত ডিপ্রেশন স্যার। ঔষধও খাচ্ছিল বেশ কয়েক বৎসর যাবৎ। ওয়াশরুমের বাক্সে পাওয়া গেছে ঔষধ।’
‘ডিপ্রেশনের কারণ?’
‘জানা নেই স্যার। কারোর কিছু জানা নেই। মোবাইল ল্যাপটপ ঘেঁটেও কিছু পাওয়া যায়নি।’
‘কোনো সুইসাইড নোট?’
‘পাওয়া যায়নি স্যার।’
‘মৃত্যুর সময়?’
‘রাত একটা থেকে দেড়টার মধ্যে স্যার।’
‘ভিক্টিমের নাম?’
‘জেসি। জেসিয়া রহমান।’
দুইজন পুলিশ ছাদের উপর চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। বাইরে সন্ধ্যা নামছে তখন। মোলায়েম সন্ধ্যা। স্তব্ধ ও নির্জন। পশ্চিম আকাশ টকটকে লাল। আচমকা ওই লাল আর নির্জনতা চূর্ণ করে একটা কাক চিৎকার করে উড়ে গেল মাথার উপর দিয়ে।
 
written by: Shakhawat Hossen"
 
Alamgir Hossain

Alamgir Hossain

Hi, I’m Annalise Quitzon, Your Blogging Journey Guide 🖋️. Writing, one blog post at a time, to inspire, inform, and ignite your curiosity. Join me as we explore the world through words and embark on a limitless adventure of knowledge and creativity. Let’s bring your thoughts to life on these digital pages. 🌟 #BloggingAdventures

Your experience on this site will be improved by allowing cookies Cookie Policy