Buy Now

Search

বিরহ বনে বৈরাগী [পর্ব-০১]

বিরহ বনে বৈরাগী [পর্ব-০১]


নিজের টিউশনির স্যারের সাথে যখন মাকে এক বিছানায় দেখেছিলাম, তখন আমার বয়স ছিল মাত্র ছয়, ক্লাস ওয়ানে পড়ি। বাচ্চা ছিলাম, অবুঝ ছিলাম। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিলাম দুইজনের দিকে। তারা আমাকে দেখে থমকে গেল। বাচ্চা আমি অবুঝ কণ্ঠে প্রশ্ন করে বসলাম,
-“মামনি, স্যার তোমাকে ব্যাডটাচ করছে। তুমি চুপ আছো কেন?”

মা আমার কাছে এগিয়ে এসে বলেন,
-'মাশা, কাল তোমার ফেভারিট চকোলেটের তিনটা বক্স এনে দেবো। এখন যা দেখেছো, তা যদি কাউকে বলো, চকোলেট পাবে না কিন্তু। বুঝেছো?'

চকোলেট আমার সবসময় প্রিয় ছিল। কিন্তু ওই সময় কেন যেন চকোলেটের লোভ আমায় কাবু করতে পারেনি। সন্ধ্যায় চুপিচুপি বাবাকে বলেছিলাম,
-“বাবাই, স্যারকে আসতে বারণ করে দিও। ওনাকে আমার পছন্দ হচ্ছে না।”

বাবা থমকে যান, জিজ্ঞেস করেন,
-“উনি কি তোমার সাথে বাজে কিছু করেছেন, আম্মু?”
-“এদিকে শুনো।”

আমি বাবাকে কানে কানে ফিসফিস করে বলি,
-“বাবাই, উনি মামনিকে ব্যাডটাচ করেছেন। মামনি কাউকে বলতে নিষেধ করেছে, বলেছে চকোলেট দেবে। চকোলেট আমার চাই না। তুমি ওনাকে আসতে বারণ কোরো।”

আমার অবুঝ ভাষাতেও বাবা সব বুঝে গেছিল। শুরু হয়ে গেল আমার ছোট্ট ফ্যামিলিতে অশান্তি। মা আমাকে সহ্য করতে পারে না আর। দেড়বছরের মাথায় ভেঙে যায় আমার দুনিয়াটা। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ, একাকীত্ব...আমি তৈরি করি আমার নতুন দুনিয়া। বাবা আর আমার৷

এরপর থেকে আমার স্কুলিংও জঘন্য কাটে। ক্লাসমেটদের বুলির স্বীকার হতে থাকি প্রতিনিয়ত। ছোট থেকেই বড়ো অসামাজিক ছিলাম আমি, কথা কম বলতাম। কোন জায়গায় কী বলা লাগে, তা সঠিক বুঝতাম না। ভয় পেতাম, নতমুখী হয়ে তাকিয়ে থাকতাম মাটির দিকে।

আমি তখন ক্লাস ফাইভে। বাবার বদলিজনিত কারণে ধামরাইয়ে শিফট হই। ভর্তি হই ধামরাই হার্ডিঞ্জ স্কুলে। নতুন জায়গা, নতুন মানুষ! সেই নতুন ক্লাসমেটদের কাছে আমি বিনোদনের এক অনন্য মাধ্যম। তারা আমাকে বুলি করত প্রচণ্ডভাবে।

আমার তখন ধবধবে ফরসা গায়ের রঙ, চুলগুলো কাঁধ অবধি ছোট, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, আর চাহনিতে সর্বদা আতঙ্ক। ওরা আমাকে নিকনেম দিলো, অটিস্টিক। আমাকে ক্লাসে এই নামেই ডাকা হতো। ক্যান্টিন থেকে খাবার আনানো, ব্যাগ টানানো, ছাদে দাঁড় করিয়ে রেখে নিচে আমার দিকে তাকিয়ে হাসাহাসি করা, মাঠের মধ্যে ফেলে দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে হাসা, ক্লাসে কারণে অকারণে যেকোনো দোষের দোষী সাব্যস্ত করা... এগুলো আমার দৈনন্দিন রুটিনের মধ্যেই পড়ে গেল। ওরা আমাকে বলত,
-“এই অটিস্টিক, একটু মুরগী হয়ে দাঁড়া তো। তোর জন্য সারপ্রাইজ আছে।”

আমি জানিনা, কেন সেসব সহ্য করে যেতাম। কিচ্ছু জানিনা। শুধু এখন লিখতে গিয়ে কেমন বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরোচ্ছে। আমার স্কুলিংয়ের সেই ছয় বছর কাটল দূর্বিষহ। কৈশোরের মাঝপ্রান্তে কলেজে উঠলাম। চলে গেলাম মিরপুরে।

মায়ের সাথে বাবার প্রেমের বিয়ে ছিল, দাদুবাড়ি-নানুবাড়ির সাথে সম্পর্ক নষ্ট। মা-বাবার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেলেও বাবার আর তার বাবার বাড়িতে ফেরা হয় না। শুরু হলো সম্পূর্ণ অন্যরকম এক পরিচ্ছেদ। অতঃপর আমি মাশনূহা মেহনূর, আমাকে আমার নতুন দুনিয়া মোবারক!”

ডায়ারির প্রথম পৃষ্ঠায় মাশা এটুকুই লিখেছিল। এরপর আর লিখেনি। সময় পায়নি। রোজ সকালে উঠে রান্না করা, বাবার সাথে বের হয়ে কলেজে যাওয়া, কলেজ থেকে ফিরে গোসল, খাবার গরম করে খাওয়া, এরপর কোচিংয়ে যাওয়া, কোচিং থেকে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা, বাবার ফেরা... দুইজনে মিলে রাতের খাবার রান্না করে একসাথে খাওয়া, এরপর রাত জেগে পড়া, তারপর ঘুম। মেহনূর রুটিন এটা। আরেকটা নির্মম সত্য হলো—তার কোনো বন্ধু নেই। এ কথাটা মাশা শুনলে মুখ ফুলিয়ে শ্বাস ফেলে বলত,
-“নেই? মিথ্যেবাদী। আমার বাবা আছে, প্লেলিস্টের গানগুলো আছে, একটা আকাশ আছে, বারান্দার বেলিফুলটা আছে। ওরা আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু।”

সপ্তদশী মাশার এহেন কথা শুনলে হয়তো তার স্কুলের তথাকথিত বন্ধুরা বলে বসত, “শালি অটিস্টিকের বাচ্চা!”

ঠোঁট গোল করে শ্বাস ফেলল মাশা। সে দুনিয়াদারি না বোঝা অত্যন্ত নমনীয় এক মেয়ে, যে জানে না—জীবন মানেই এডভেঞ্চার, যদি কাহিনি সরল পথে চলতে থাকে, সামনে এক ভয়াবহ ঢেউ অপেক্ষায় আছে৷
সেই সন্ধ্যায় রকিব সাহেব হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় হসপিটালে এডমিট করা হয়। কোচিংয়ের বাইরে অপেক্ষায় বসে থাকা মাশা একাধিক কল করেও মোস্তফা সাহেবকে পেল না। হাত কাঁপতে লাগল তার। চাহনি বিক্ষিপ্ত, ঠোঁট তিরতির ভয় ও নিঃশ্বাসের অস্থিতিশীলতা... বাবা বার বার বলেছে, একা না বেরোতে। অর্থাৎ সে কোনোভাবেই একা যাবে না।

কোচিংয়ের গেইটের দারোয়ান জিজ্ঞেস করলেন,
-“আপনারে নিতে আসবো কেউ?”

আচমকা কথায় আঁতকে উঠল মাশা, লাল চোখ দুটো বড়ো বড়ো... ঠোঁট উলটে কান্না গিলে বলল,
-“হ্যাঁ।”
-“আপনে কল করেন, আম্মা।”
-“ক..রে..ছিলাম ধ..ধরে না তো..”

মাশার অস্পষ্ট শব্দের মাঝেই অবিরতভাবে কল করতে থাকা ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল। কল রিসিভ হয়েছে। কম্পনরত হাতে ফোন কানে তুলে “হ্যালো” বলতেই ওপাশ থেকে এক লোক বললেন,
-“আপনি রকিব সাহেবের মেয়ে?”
“জ..জি..”
“আপনার বাবা তো একটু অসুস্থ হয়ে পড়েছে, ওনাকে হসপিটালাইজড করা হয়েছে। আপনি আসুন।”

মাশা ঠোঁট ভাঙা কান্না আটকে যায় এ কথা শুনে। সে কোনোমতে হসপিটালের নাম শুনে বেরিয়ে পড়ল। রিকশাও নেই! ওহ হো... বাঘের ভয় যেখানে, সেখানেই তো রাত পোহায়, তাই না?
পথিমধ্যে এলাকার দুটো বখাটে পথ রোধ করে দাঁড়াল। বরাবরই বাবার কনিষ্ঠ আঙ্গুল ধরে এক জীবন পাড় করে ফেলা মাশার কাছে এসব নতুন। সে বুঝল না সামনে কী হতে যাচ্ছে। শুধু কান্নাভেজা গলায় বলল,
-“ভাইয়া, আমাকে একটা রিকশা এনে দেবেন?”

দুটো লোক একে-অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে বিচ্ছিরিভাবে হেসে দিলো। হাসতে হাসতে তাকাল মাশার দিকে। বেশি চিকনা করে ছেলেটা বলল,
-“ওয় হয়, চুমকি আজ একলা যে?”
-“বাবা অসুস্থ।”

এমন ধারার জবাব আরও একদফা হেসে উঠে বলল,
-“চলো, আজ সঙ্গী হই তোমার...”

টনক নড়ল মাশার। প্রবল ধাক্কায় মূর্ছা যাওয়ার ফলে এতক্ষণে যা হচ্ছিল, তা সঠিক ঠাহর করতে পারেনি সে। এখন বুঝতে পারল। সে অত্যন্ত বাজেভাবে ফেঁসে গেছে। সে দোয়াদরুদ পড়তে পড়তে ব্যাগ থেকে পিপার স্প্রে বের করতে নিল। তন্মধ্যে দুটো ছেলেই অনেক কাছে এগিয়ে এসেছে। ভাগ্য সহায় হবে কি? হয়তো না। নিরাপত্তার জন্য সেই পিন, পিপার স্প্রে, নাইফ... সব তো এই নতুন ব্যাগে ঢোকানোই হয়নি!

মাশা চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলল। আজকে সম্ভবত সে মরে যাবে। বাবাকে আর দেখা হবে না। পৃথিবীটাকেও আর দেখবে না সে। প্রতিদিন নতুন নতুন রেসিপি আর বানানো হবে না। গতকাল যে এত এত বই অর্ডার দিয়েছিল... ওগুলো না পড়েই মরতে হবে? মাশা ফ্যাতফ্যাত করে কেঁদে দিলো।

মেয়েটার কান্নার আওয়াজ ও প্রতিপক্ষের পৈশাচিক হাসির সাথে কিছুটা দূর থেকে আচমকা একটা হুইসেল, ও পর পর গম্ভীর গলায় ভেসে এলো,

“হেই বয়েজ! গেইম হয় সমানে সমানে। টু ভার্সেস টু! ওয়েট.. আ'ম ইন।”

কথিত আছে অবহেলিত ও নির্যাতিত রাজকন্যাকে বাঁচাতে ঘোড়ায় চড়ে রাজপুত্তুর আসে। মাশা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল লোকটার দিকে।

চলবে...
written by: নবনীতা  শেখ 

Olindo Rahman

Olindo Rahman

A good book is worth a hundred good friends. 
But a good friend is equal to a library.!! 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Your experience on this site will be improved by allowing cookies Cookie Policy