Buy Now

Search

বিরহ বনে বৈরাগী [পর্ব-০২]

বিরহ বনে বৈরাগী [পর্ব-০২]

হেই বয়েজ! গেইম হয় সমানে সমানে। টু ভার্সেস টু! ওয়েট.. আ'ম ইন।”

কথিত আছে অবহেলিত ও নির্যাতিত রাজকন্যাকে বাঁচাতে ঘোড়ায় চড়ে রাজপুত্তুর আসে। মাশা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল লোকটার দিকে।
অতিরিক্ত রকমের এই শান্ত পরিবেশে ভীষণ রকমের রূঢ় আওয়াজটায় কিঞ্চিৎ ঠাট্টা আর কৌতুক মিলে এক অদ্ভুত কিছু তৈরি করল যেন। মাশা হা হয়ে রইলো। তার অবাক চোখের মাঝেই হাতাহাতি হয়ে গেল দুটো ছেলের সাথে এই লোকটার। কী পার্ফেক্টলি ছেলে দুটোকে জব্দ করে ফেলল কৌশলে! বেশ ফিলমি একটা আবহ! বখাটেগুলো শেষমেষ আর না পেরে দৌড়ে প্রস্থান ঘটালো।
অরিত্র ধীরপায়ে এগিয়ে এলো মাশার সামনে। শার্টের সিলভস ঠিক করতে করতে বলল,
-“নাম?”
-“হু?”

বিহ্বল মাশা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। বিরক্ত চাহনিতে তাকাল অরিত্র। জিভ-তালুর সন্ধিতে ‘চ্‌' উচ্চারণে অন্যদিকে চোখ ঘোরালো। ব্যস্ত ভঙ্গিতে মাশা বলল,
-“মাশনূহা.. মাশনূহা মেহনূর।”
অবাক হওয়ার ভান করে অরিত্র বলল,
-“সিরিয়াসলি? আমি ভেবেছি আপনার নাম বলদি আক্তার ছাগল।”
অপমানের "অ"-ও বোধ করল না মাশা। সে এককালে এসবে অভ্যস্ত । আপাতত দুশ্চিন্তায় কেবল এটুকু বলল,
-“আমার বাবা, হসপিটালে এডমিট.. কোনো রিকশা পাচ্ছি না। আমাকে কিছু একটার ব্যবস্থা করে দেবেন? প্লিজ?”

অরিত্র কিছুটা দূরে রাখা নিজের কালো রঙের গাড়িটার দিকে এগোতে এগোতে বলল,
-“আসুন।”

গাড়িতে বসে মাশা আর কোনো কথা বলল না। সে ভেতর থেকে একজন ইন্ট্রোভার্ট মানুষ। আজকের জন্য যথেষ্ট পরিমাণের শব্দ সে ব্যবহার করে ফেলেছে। এখন আর কথা খুঁজে পাচ্ছে না।
ড্রাইভ করতে থাকা ভদ্রলোক একদফা তার দিকে তাকিয়েছে অবশ্য। তবে বিশেষ পাত্তা দিলো না। পানির বোতলটা এগিয়ে দিলো অন্যহাতে, সম্মুখে তাকিয়েই বলল,
-“গিলে নিন।”
-“না.. আপনি যদি কিছু মেশান?”
ভ্রু কোঁচকালো অরিত্র,
-“ওহ রিয়েলি, সেনোরিটা? ওই দুইটা ভাইয়ার কাছে হেল্প চাওয়ার বেলায় আপনার এগুলো মনে হয়নি?”
এমন সুন্দর ডাক দিয়ে অপমান কেউ করে? থমথমে মুখে মাশা পানির বোতলের মুখ খুলতে খুলতে বলল,
-“আমি বুঝতে পারিনি।”
হসপিটালের সামনে এসে অরিত্র গাড়ি থামাল। মাশা একমুহূর্তও দেরি করল না। গাড়ি থেকে বের হয়ে, দরজাও বন্ধ করল না। দৌড়ে হসপিটালের ভেতর প্রবেশ করল।
অরিত্র একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে দেখতে পেল—মাশা কীভাবে ইউটার্নে ফিরে এসে মুখোমুখি হলো এবং অধৈর্য গলায় বলল,
-“অসংখ্য ধন্যবাদ, ভাইয়া। আপনার নামটা জানা হলো না..”

শান্ত কণ্ঠে অরিত্র জানাল,
-“আমি ওবায়দুল...ওবায়দুল কাদের।”
মুখে পর্যাপ্ত ক্লান্তির সাথে স্মিত হাসি এনে মাশনূরা মেহনূর বলল,
-“থ্যাংকিউ সো মাচ ওবায়দুল কাদের ভাইয়া। আপনি না থাকলে আমার কী যে হতো!”

____
রকিব সাহেব হসপিটালের বেডে শুয়ে দেখতে পেলেন একটা মেয়ে তড়িঘড়ি করে অধৈর্য ভঙ্গিতে কেবিনের ভেতরে প্রবেশ করছে। মেয়েটার পরনে আসমানি ও সাদা মিশেলের থ্রিপিস, কাঁধ অবধি ছোট চুলগুলো খোলা, চোখ-মুখ লাল হয়ে আছে। সে খুব দ্রুতই সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

রকিব সাহেব চিন্তান্বিত হয়ে বললেন,
-“একা আসতে খুব সমস্যা হয়েছে না, মা?”
-“না, আব্বু। তুমি কেমন আছো?”

শান্তকণ্ঠে এটুকু বলে থামল মাশা। নতমুখো সে, চোখ দুটো ভিজে আসছে বার বার। রকিব সাহেব বাকিদেরকে কেবিনটা খালি করতে বললেন। এত এত মানুষের মাঝে মাশা খুবই অস্বস্তিতে পড়ে আছে। সবাই চলে যেতেই মাশা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ভেজা গলায় বলল,
-“তোমার কী হয়েছে? কেন নিজের যত্ন নাও না।”

রকিব সাহেবের একটা হাত মাশার মাথায় রাখতে একটু কষ্টই যেন হলো। সামান্য হেসে তিনি বললেন,
-“একটা মাইনর স্ট্রোক..টেনশন নিও না, আম্মু। ঠিক আছি আমি। একটু পরই তোমাকে নিয়ে বাসায় যাব। হসপিটালে বসে খেতে পারবা তুমি?”

মাশার কান্নার বেগ আরও বাড়ে। রকিব সাহেব ওনার একজন কলিগকে বলে কিছু খাবার আনিয়ে নেন। এরপর বলেন,
-“একটু হাত-মুখ ধুয়ে এসে অল্প করে খাও। খুদা লাগছে না? দুপুরে খেয়েছো কিছু?”
-“উঁহু। বাবা, তুমি খাবে না?”
-“আমার স্যালাইন চলছে, আম্মু।”

মাশা একা একাই খেলো। তবে খুব বেশি খেতে পারল না। খাওয়া শেষে সে আবারও মুখ গোমরা করে বসে রইলো। একটু পর কোত্থেকে যেন মাশার দুই ফুপি এসে তাকে একপ্রকার না দেখার ভান করে ভাইয়ের দুইপাশে বসে পড়ল। মেকি কান্নার সাথে মরা বাড়ির আহাজারি!
মাশা মলিন মুখে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াল। হসপিটালটির ফিফথ ফ্লোরের দক্ষিণমুখো বারান্দা এটা। বাতাসে গা ছমছমে হয়ে এলো মাশার। সে ওড়নাটা চাদরের মতো জড়িয়ে নিল। চোখ বেয়ে গাল ভেজানো অশ্রুগুলো শক্ত হয়ে আছে মুখে, টান লাগছে।

মাশা এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখতে পেল, পার্কিংয়ের ওখানে একাধিক সারি সারি গাড়ির মধ্যে একটা গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে কালো শার্ট পরিহিত লোকটা স্মোক করছে। এই লোকটা হচ্ছে ওবায়দুল কাদের। হ্যাঁ! উনিই তো!
চিনতে পেরে যে খুব খুশি হয়েছে, এমন না। তার ভালো লাগেনি। স্মোক করা পুরুষদের সে ভীষণ অপছন্দ করে। তারা নিজের ক্ষতি করে, নিজের আশেপাশের মানুষদের ক্ষতি করে এবং পরিবেশেরও ক্ষতি করে। একজন চেইন স্মোকার দিনে গড়ে তিনশ টাকার ক্ষতি কেনে। এই টাকা দিয়ে চাইলেই পথের কিনারায় অভুক্ত ঘুমানো বিড়াল/কুকুরদের একটু খাবার কিনে দিতে পারত। পারত না?

মাশার দীর্ঘশ্বাস ফেলার মধ্যে দিয়েই জনাব একটি সিগারেট শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি ধরালেন।

____
আজ মাশা একটা ভয়াবহ কাজ করে ফেলেছে। জীবনে প্রথমবার কলেজ বাঙ্ক দিয়ে সে বাবার জন্য কিছু কেনাকাটা করতে এসেছে। এজন্য তাকে আসতে হয়েছে বাসে। তার প্রথম বাস জার্নি!

কীভাবে বাসে উঠতে হয়, তার জানা নেই। বাবা কীভাবে কীভাবে যেন লোকাল বাসে ওঠাত! মাশা অসহায় চোখে তাকিয়ে রইল ভীড় ঠেলে একগাদা লোকের বাসে চাপা দেখে। রিকশায় ভাড়া বেশি লাগবে, আর সিএনজি তো যেন ডাকাতি করে!
তন্মধ্যে আরেকটা বাস এসে তার পাশে থামবে থামবে মুহূর্তে কেউ একজন এসে তার পাশে দাঁড়াল। চোখ-মুখ কুঁচকে মাশা তার কাছে প্রথম সাহায্যটা চাইলো,
-“আপনি কি আমাকে বাসে চড়তে হেল্প করবেন? প্লিজ প্লিজ প্লিজ?”

ওপাশ থেকে মুচকি হাসির সাথে জবাব এলো,
-“শিওর!”

পর পর মাশার হাতটা শক্ত হাতে চেপে ধরল, আচমকা হাতে টান লাগল। থেমে থাকা বাসটিতে উঠতে উঠতে সে বলল,
-“বাঁ হাতটি আমি ধরেছি, ডান হাত দিয়ে ক্রস করে নিজের বুকের চার ইঞ্চি আগে রাখুন। এটা হচ্ছে ঢাল। এন্ড লেটস গো। প্রথমে ডান পা...”

বাসে উঠে যেন মহাবিশ্ব জয় করে ফেলেছে মাশা! চোখ দুটো চিকচিক করছে তার। তবে এই খুশি বেশিক্ষণ রইলো না। পুরো বাস ভর্তি মানুষ। সিট তো নেই নেই-ই, দাঁড়িয়ে থাকার জন্যও পর্যাপ্ত জায়গা নেই। এদিক-ওদিক, চারদিক থেকেই ধাক্কা। ওপরের এই হ্যান্ডেলটা ধরবে?
দ্রুত বাস টান দেওয়ায় সামান্য ঝটকা! মাশা হেলে পড়তে লাগল একদিকে। একটু আগে যেই ভদ্রলোক তাকে হাত ধরে বাসে টেনে উঠিয়েছে, সে মেয়েটার কাঁধ চেপে ধরে তাকে স্থির করল। নরম কণ্ঠে বলল,
-“আমার দিকে ঘুরে দাঁড়ান। একহাতে আমায় ধরুন আর অন্য হাতটি এই সিটের ওপরে রাখুন। আমি এনাফ স্টেবল।”
মাশা কৃতজ্ঞতা সূচক মাথা নেড়ে বলল,
-“থ্যাংক ইউ সো মাচ! আপনি না থাকলে আমার কী যে হতো।”
-“কী হতো? হু?”

উদ্দীপ্ত মস্তিষ্কটা শান্ত হলো মাত্র! আওয়াজটা কেমন যেন চেনা ঠেকছে না? আরেহ! তাই তো।
এতক্ষণে মাশা চোখ তুলে তাকাল। চোখ দুটো বড়ো বড়ো হয়ে এলো তার। কণ্ঠে বিস্ময় ও শব্দে কীজানি কী,
-“আপনি ওবায়দুল কাদের ভাইয়া না? হোয়াট আ কো-ইন্সিডেন্স!”

লোকাল বাসের ভীড় ঠেলে দাঁড়িয়ে থাকা ও সৌভাগ্যের চোটে বসে থাকা লোকজন একযোগে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল এদিকে। তাদের মনোযোগের মধ্যমণি হতে পারা ওবায়দুল কাদের অবাক হওয়ার মেকি ঢংয়ের সাথে নাটকীয়তার সুরে বলল,
-“সেনোরিটা? ওহ গড! ইটস রিয়েলি ইউ! হোয়াট আ সৌভাগ্য আমার!”

চলবে..
written by: নবনীতা শেখ

Olindo Rahman

Olindo Rahman

A good book is worth a hundred good friends. 
But a good friend is equal to a library.!! 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Your experience on this site will be improved by allowing cookies Cookie Policy