Buy Now

Search

বিরহ বনে বৈরাগী [পর্ব-০৩]

বিরহ বনে বৈরাগী [পর্ব-০৩]

লোকাল বাসের ভীড় ঠেলে দাঁড়িয়ে থাকা ও সৌভাগ্যের চোটে বসে থাকা লোকজন একযোগে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল এদিকে। তাদের মনোযোগের মধ্যমণি হতে পারা অরিত্র অবাক হওয়ার মেকি ঢংয়ে নাটকীয়তার সুরে বলল,
-“সেনোরিটা? ওহ গড! ইটস রিয়েলি ইউ! হোয়াট আ সৌভাগ্য আমার!”

বাক্যের ভেতরকার সূক্ষ্ম খোঁচাটুকু ধরার মতো যথেষ্ট বুদ্ধিমতী আমাদের মাশা নয়। সে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো কেবল। এই লোকটা! এই লোকটা তাকে পর পর দুটো বিশাল বিপদ থেকে উদ্ধার করেছে! এখন তো সে বাচ্চা না। বড়ো হবার পর যেই দুটো কঠিন বিপদে কাউকে পাশে পায়নি, সেই দুটো সময়েই এই লোকটা ছিল। অন্য কেউ না, স্রেফ এই লোকটা। তবে কি!
আর কিছু ভাবার ইচ্ছে দেখাল না মাশা। ইন্ট্রোভার্ট সে, বন্ধু নেই। কাজেই বইজগতে ডুবে থেকে দিন কাটানো মেয়েদের মধ্যে তাকে ফেললে, কেউ দ্বিধা করবে না। আর ইতোমধ্যে কিশোরদের গল্প সরিয়ে সে বড়োদের বই পড়া শুরু করে দিয়েছে। একজন বই পড়া মানুষ কতটা রোমাঞ্চকর হয়, তা কোনো নন-রিডার আন্দাজ করতে পারবে না।

পরবর্তী স্টপেজে এসে গাড়ি আবারও ব্রেক কষল। অসাবধানবশত পড়ে যেতে নিলে, অরিত্র তাকে ধরে ফেলে। তবে তাকায় না। তার দিক বাদে এদিক-ওদিক সর্বদিকে চোখ ঘুরিয়ে দেখতে পায়, একটা সিট এখন খালি হবে৷ সে খুবই সাবধানে মাশাকে সেই সিটে বসিয়ে দিয়ে নিজে তার সামনে দাঁড়িয়ে রইলো। মাশা বলল,
-“ভাইয়া, আপনি এখানে যে?”
-“ঘুমাতে এসেছি।”

অবাক হলো মাশা,
-“লোকাল বাসে কেউ ঘুমাতে আসে?”
-“না। আমি রাস্তায় ঘুমাতে এসেছিলাম। তুমি হেল্প চাইলে দেখে বাসে উঠলাম।”

দ্বিগুণ অবাক হয়ে মাশা জিজ্ঞেস করল,
-“রাস্তায় কেউ ঘুমায়?”
-“কেন? ঘুমায় না?”
-“নাহ।”
-“তো কী করে?”
-“কোথাও যায়।”

অরিত্র দুই সেকেন্ডের বিরতি নিল, তারপর বলল,
-“এক্সাক্টলি সেনোরিটা, দ্যাটস হোয়াট আই ওয়াজ ডুইং।”

মাশা চোখ-মুখ কুঁচকে অত্যন্ত নম্রভাবে রাগ দেখানোর চেষ্টা করে বলল,
-“এক মিনিট। আপনি সবসময় আমাকে পিঞ্চ করে কেন কথা বলেন, বলুন তো?”
-“মজা পাই।”
-“মজা?”

মাশা মন খারাপ করে বসে রইলো। সেদিন ভদ্রলোক কোথায় যাবার জন্য বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন এবং কী কাজ ছিল—কোনোকিছুই মাশা জানে না। কেবল এটুকু তাকে অবাক করে দেয়, কোনোরকমের দায়বদ্ধতা না থাকা সত্ত্বেও কেনাকাটার পুরো সময়টা এবং তাকে বাড়িতে সুরক্ষিত পৌঁছে দেওয়া অবধি লোকটা সাথে ছিল। প্রথমে ওভাবে বাঁচানোর পর আজ দ্বিতীয় দেখা। মাশার মনে হতে লাগল, লোকটার সাথে তার তৃতীয় দেখা শীঘ্রই হবে, এরপর চতুর্থ, তারপর পঞ্চম... হতে থাকবে।

_____
“আমি মাশনূহা মেহনূর, বয়স সতেরো, দ্বাদশ শ্রেণীতে পড়ছি। আজ আমার সাথে অদ্ভুত কিছু ঘটছে বলে অনুধাবন করেছি আমি। গতরাতে একটা উপন্যাস পড়তে গিয়ে আমি খুব করে রিলেট করেছি। রিলেটেবল জায়গাটা নিয়েও অবাক হয়েছি। ওই পার্টটুকু, যা আমাকে থমকে দিয়েছিল.. দ্যাট ওয়াজ লাভ!
লেখক স্পষ্ট শব্দে অনুভূতির বয়ান দিয়েছে, আর তা আমার সাথে মিলে গেছে। আমিও তার প্রতি কিউরিয়াস! তাকে একবার দেখার আকাঙ্খা মনে পুষি। কখনো তাকে খারাপ লাগে, কখনো তার জন্য কাজ করে মনের ভেতরকার অস্থিরতা.. সে আমার কিছুই না, সে আমার অনেক কিছু।
অহেতুক অনুভূতিদের সাথে আমি পারছি না। সারারাত ঘুমোতে পারিনি। আমি খুব স্ট্রংলি ফিল করছি, এই উইকেন্ডে.. এই উইকেন্ডে আমি বাড়ি থেকে একা বেরোলে কোনো না কোনো বিপদে পড়ব। আমি কোনো না কোনো বিপদে পড়লে, সে আসবে। কোথা থেকে আসবে, কেন আসবে, কখন আসবে—এসব প্রশ্নগুলোর উত্তরে আছে বিশাল বড়ো শূন্যস্থান। তারপরও.. দুই দেখায় শুরু হওয়া ইনফ্যাচুয়েশনকে তৃতীয় দেখায় আমি মোহাব্বতের দাবি রাখবো।”

আজ মাসের লাস্ট উইকেন্ড। বিছানার ওপর পাতা ঝাপটাতে থাকা জার্নালটির দিকে তাকাল মাশা। আজ কি বেরোবে? বেরোবে না-কি বেরোবে না? কী করা উচিত? কোনো কিছু নিয়ে এত কিউরিয়াস মাশা অন্তত ছিল না। নিজের এমন বেহাল দশায় মাশা সেদিকেই ঢলে পড়ল, যেটা উচিত না।

সে আজ নিজের আলমারির সবচেয়ে সুন্দর জামাটা পরল। ল্যাভেন্ডার রঙের কুর্তা এটা। কাঁধ অবধি খোলা চুলগুলোকে কিনারায় সিঁথি করলো। কানে ছোট্ট মুক্তোদানা, ঠোঁটে লাগাল হালকা রঙের লিপগ্লস।

তৈরি হয়ে সে চিন্তায় পড়ে গেল। কোথায় যাবে সে? বন্ধু তার নেই, বাবাও একা বাড়ি থেকে বের হওয়া এলাউ করবে না। তবে?
অনেক বাহানা-টাহানা মনে সাজিয়ে যখন বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়াল, রকিব সাহেব মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করল,
-“কোথায় যাবে, মা?”

নার্ভাস হয়ে পড়ল মাশা,
-“এই.. তো বাবা, এদিকেই আর কী..”

রকিব সাহেব কিছু একটা ভেবে বললেন,
-“বন্ধুদের সাথে বেরোবে? খুব ভালো মা। মাঝেমধ্যে বেরোনো উচিত। একটু হাঁটাহাটিও করবে, শরীর সচল থাকবে এতে। তোমার বয়সী বাচ্চাদের আনন্দে উল্লাসে দিন কাটানো উচিত। যাও।”

সঙ্গে কিছু টাকাও দিয়ে দিলেন। মাশার খুব অনুতাপ লাগল এভাবে ধোঁকা দিয়ে বের হওয়াতে। বাবা তাকে কত বিশ্বাস করে! জবাবদিহিও চায়নি! তাকে এভাবে ঠকাতে পারল? কীভাবে পারল? বের হবার সময় মাশার প্রায় কাঁদোকাঁদো অবস্থা।

নিজেকে এই বলে সান্ত্বনা দিলো সে, যা-ই হোক! মিথ্যে তো বলেনি। আর নিজের বন্ধু সে নিজেই। সেলফ ডেটে বেড়িয়েছে মাশা। যাবে, হাঁটবে, রিকশায় ঘুরবে, ফুচকা খাবে, এরপর চলে আসবে। মাঝে যদি বিপদে পড়ে তাহলে সে আসবে, বিপদে না পড়লে সে আসবে কোত্থেকে? আর এলেই বা কী? কোনো পূর্বপরিকল্পনা তো নেই।
মাশা বাড়ি থেকে বের হয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ল। এখন কোথায় যাবে? রিকশা করেই বা কই যাওয়া যায়? কী খাবে সে.. ফুচকা? ফুচকা কোথায় পাওয়া যায়, সে তো জানে না। মাশা এমন একটা মেয়ে, যে নিজের এই সতেরো বছরের জীবনে কখনো ফুচকা খায়নি। অন্যান্য মেয়েরা বিনোদনের জন্য জীবনে যা করে থাকে, তার একাংশও মেয়েটা করে দেখেনি।

সবকিছুকে সাইডে ফেলে সে এবার একটা রিকশায় উঠে পড়ল। হাতের মোবাইলের সাথে ইয়ারফোন লাগিয়ে শুনতে লাগল ডাউনলোড করা রাখা ঊর্দু শায়েরি। চোখ বন্ধ হয়ে এলো তার। রিকশার হুডে মাথা ঠেকিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেল নিজের মধ্যে।
সে যেন এক অন্য দুনিয়ায় এবার। এই দুনিয়ায় সে আছে, আর কিছু কথা আছে। বাক্যগুলো এত সুন্দর! বাক্যগুলো তাকে খুব টানছে। তাকে বিলীন করার ইচ্ছে দেখাচ্ছে।
তারপর আচমকা ডানদিক হতে একটা ধাক্কা! মস্তিষ্কের ভেতরকার সবকিছু সম্ভবত বাঁ দিকে হেলে পড়েছে। পায়ে-হাতে, মাথায়.. আঘাতটা তীব্র। চোখ খুলতে গিয়ে আবার বন্ধ করে ফেলল সে।

কিছুটা সময় যেন আশেপাশের সবকিছু সোঁ সোঁ শব্দ করে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল সে অবস্থান করছে জীবন ও মৃত্যুর মধ্যাহ্নে। হয়তো এরপরই সব থেমে যাবে। মাশা সেদিনের মতো আবারও দুঃখ অনুভব করল ভীষণ। আবারও মনে হতো লাগল নিজের বাবাকে, রুমটাকে, আধপড়া সেই উপন্যাসের বইটিকে। এতকিছু ফেলে রেখে সে কীভাবে মরে যেতে পারে?
ত্রিশ সেকেন্ডের মধ্যে দুনিয়াবি সকল চিন্তা সে করে নিল। তারপরই টের পেল, চারপাশের চেঁচামেচি। কেউ একজন আগলে ধরে রেখেছে তাকে। কেউ একজন তাকে ও রিকশাটিকে উলটে যাওয়া থেকে আটকাতে মরিয়া। আশেপাশের মানুষ এসে প্রায় হেলে পড়া রিকশাটিকে সোজা করতে সাহায্য করল।

মাশা চোখ খুলল তখন। সে তখনো রিকশার সিটে বসে। কানে ইয়ারফোন, শায়েরির পরিবর্তন তখন বাজছে গান..

Iske uske ye hisse mein,
Tere mere ye kisse mein
Maula seekhe bin seekhe bin de seekha
Kaisa ye ishq hai...

চারপাশে সবাই আতঙ্কিত। মেয়েটা ঠিক আছে কি না, এ নিয়ে শঙ্কিত বেশ। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে মাশা আচমকা হেসে উঠল। সে রিকশায় বসে থাকলেও তার একটি হাতে ফোন এবং অন্য হাতটি এখনো লোকটার কাঁধের শার্টটি খামচে ধরা।
তার হাসি ভদ্রলোকের কপাল কোঁচকানোর কারণ, সেই সাথে এটা বলারও,
-“তুমি কি স্টুপিড?”

মাশা সেসবের পরোয়া করল নাকি? না তো। ব্যথা-জড়তা, লজ্জা, অস্বস্তি কিংবা কপাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া রক্ত ও হাত-পায়ের ছিঁলে যাওয়া চামড়ার জ্বলুনি.. যা কিছুই হোক না কেন, সব একপাশে ফেলে নিয়ে বলে ফেলল দুনিয়ার সবচেয়ে কঠিন তিনটা শব্দ,
-“আই লাভ ইউ।”

চলবে...
written by: নবনীতা শেখ
 

Olindo Rahman

Olindo Rahman

A good book is worth a hundred good friends. 
But a good friend is equal to a library.!! 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Your experience on this site will be improved by allowing cookies Cookie Policy