Buy Now

Search

এই শহরে [পর্ব-০১]

এই শহরে [পর্ব-০১]

কনকনে শীতের চাদরে মোড়ানো রাজধানী। কুয়াশা মেঘের ন্যায় উড়ছে যেন। কথা বললেই নিঃশ্বাসের সিগারেটের ন্যায় ধোঁয়া বেরোচ্ছে মুখ থেকে। বাংলাদেশের মানচিত্রের মধ্যিখানে মায়ার শহর ঢাকার অবস্থান। এখানে শীতের ঝাপ্টা খুব একটা পড়ে না বললেই চলে। প্রভাব পড়ে সাধারণত উত্তরবঙ্গে। তবে এবারের শীতটা একটু বেশীই মনে হচ্ছে। জানুয়ারির ঠিক মাঝামাঝি সময়। তাপমাত্রা দেখাচ্ছে ষোলো ডিগ্রি সেলসিয়াস। খোলা মাঠের মধ্যিখানে জ্বলছে আগুনের লালচে শিখা, শীত নিবারণের মাধ্যম হিসেবে। আর ছোট্ট সাউন্ড বক্সে বাজছে সৌরভ শাহ এর ‘ প্রিয়তম ’ গানটি। আগুনের উষ্ণতাকে গায়ে মেখে নিল একদল। তাদেরই মাঝে একজন বলল,
“ঢাকার শীতকালের সাথে আর কিছুর তুলনাই হয়না। হাইওয়ের যানজটও তখন ভালো লাগে, মানুষের কোলাহল তখন প্রিয় হতে শুরু করে। আশপাশে কতই আয়োজন। এই শহরে শীত নামে প্রেমের ঘ্রাণ নিয়ে। এই শহরে একটি শীতের সন্ধ্যা উৎসবের চেয়ে কম নয়।”
কথাটি শেষ হওয়ার সাথে সাথেই মুঠোফোন বিদঘুটে আওয়াজে বেজে উঠে। এই হিমশীতল সন্ধ্যায়, সুন্দর গানের মজলিশে ফোনের আওয়াজটা এক প্রকার বিরক্তির কারণ হয়েই দাঁড়ালো সবার কাছে। তার মাঝে শীতকালীন হাঁচি কাশি। একদম জুড়ে বসেছে দেহের সাথে। কয়েকদফা কেশে বুকে হাত ঘষতে ঘষতে ফোনটা রিসিভ করে,
“আসসালামু ওয়ালাইকুম, ফরহাদ বলছেন?”
ফরহাদ কান থেকে ফোন নামায়। নাম্বারটা আরেকবার চেক করল। আননোন নাম্বার। কন্ঠটাও অপরিচিত। পুনরায় ফোন কানে চেপে বলল,
“ওয়ালাইকুম আসসালাম। জি, তবে আপনি কে বলছেন?”
“আমাকে চিনবেন না।”
ফরহাদ হকচকিয়ে গেল খানিক। বন্ধুমহলের চোখ তার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ফরহাদ দ্রুত গতিতে কয়েকবার পলক ফেলে বলল,
“তাহলে… আই মিন কল করার কারণটা জানতে পারি?”
অন্যপাশ থেকে জবাব এলো, “জি, আপনার একটি প্রিয় জিনিস আমার কাছে।”
কথার এক পর্যায়ে ফরহাদের মনে হলো তার কণ্ঠটি অদ্ভুত রকমের সুন্দর। যে সুন্দরকে ঠিক সুন্দর বলে আখ্যা দেওয়া যায় না। এই শান্ত-শীতল আবহে স্নিগ্ধ কণ্ঠস্বর শিরশির অনুভূতি দিচ্ছে। ফরহাদ কানে ফোন গুঁজে থমকে গেল এক মুহূর্তে। এসব কী ভাবছে! অথচ মেয়েটি ফোনের অন্যপার্শ্বে অপেক্ষমান। কথার অর্থ বোধগম্য না হওয়ায় প্রশ্ন করল,
“আমার প্রিয় জিনিস? কী বললেন বুঝতে পারিনি।”
মেয়েটি জবাবে বলল, “মনে হচ্ছে আপনি হিমুর বিশাল ভক্ত। আমার হাতে বর্তমানে হুমায়ূন আহমেদ স্যারের হিমু বইটি আছে। সেখানে আপনার নাম, নম্বর আর ফিরিয়ে দেওয়ার একটি ছোট্ট আবেদন পেলাম।”
ফরহাদ কপাল কুঁচকে ফেলে। সাথে সাথে সেই ভাঁজ পড়া কপাল সমানও হলো। আচমকা মনে পড়ল বইটির কথা। এককালে একটু বেশীই প্রিয় ছিল। প্রিয় হওয়ার কারণটাও কম বিশেষ ছিল না। হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে নাম, নাম্বার লিখে রেখেছিল। প্রিয় নারীর দেওয়া শেষ চিহ্ন বলে কথা। একজন জুনিয়রকে পড়তে দিয়েছিল বইটি। তখনই বইটির সাথে সেটির সাথে জড়ানো পুরোনো বেখেয়ালি স্মৃতিটুকু হারিয়েছে। হাস্যকর লাগছে বিষয়টি এখন। মনের আনাচে কানাচেতে সেই অতীত অনুভূতির অ’ টুকু অবশিষ্ট নেই।
“আমি ফরহাদ, এটা আমার নাম্বার - ০১৯xxxxxxx। বইটি যদি কখনও কেউ পেয়ে থাকেন, দয়া করে আমাকে ফিরিয়ে দেবেন। আমি চাইলে একটি নতুন বই কিনতেই পারি। কিন্তু এই বইটি বিশেষ, অনেক স্মৃতি জড়ানো। অনুরোধ করছি, যদি কখনও বইটি আপনার হাতে আসে দয়া করে উপরে দেওয়া নাম্বারে যোগাযোগ করবেন। আমি আপনাকে নতুন একটি বই দিব। কিন্তু এই বইটি আমার চাই।”
শীতল কণ্ঠে পুরো লেখাটা পড়ে শোনালো মেয়েটি। ভাবনার ব্যাঘাত ঘটে এখানেই। হ্যাঁ! ঠিক এটাই লিখেছিল সে। ফরহাদ নীরবে বাঁকা হাসলো। যত্তসব ছেলেমানুষী! বই আর বই উপহার দেওয়া মানুষকে অনেক আগেই ভুলে গিয়েছে। ফরহাদ নীরবতা ভেঙে বলল,
“আপনার কাছেই রেখে দিন। আমার আর এই বইয়ের প্রয়োজন নেই।”
মেয়েটি উৎকণ্ঠা হয়ে জানতে চায়, “কেন? এতটা ডেসপারেট হয়ে লিখে রেখেছেন, যেন আপনার সম্পূর্ণ মায়া এই বইটার মধ্যেই জড়িয়ে। এখন বলছেন লাগবে না?”
“জড়িয়ে ছিল, ছাড়িয়ে নিয়েছি।”
ফরহাদের উচ্চারিত বাক্য এতটাই নিম্নস্বরে ছিল যে অপরপ্রান্তের মেয়েটি শুনতেই পেলো না। তাই জিজ্ঞাসা করল,
“কিছু বললেন?”
“উহু! আপনি বইটি রেখে দিন।”
“রাখতে চাইছি না।”
ফরহাদ ফোস করে নিঃশ্বাস ফেলে শুধায়, “কোথায় পেলেন বইটি?”
“নীলক্ষেতের পুরানো বইয়ের দোকানে।”
ফরহাদের মুখ কুঁচকে আসে। জুনিয়র ছেলেটি বই নিয়েছিল পড়তে, সেকিনা আবার বিক্রি করে দিয়েছে। অদ্ভুত মানুষ! রেখে দিলে কী হতো? পুরোনো বই বিক্রি করে আর কত টাকাই বা পেয়েছে?
“রেখে দিলে কী খুব সমস্যা হবে? নিশ্চয়ই পড়ার জন্য কিনেছেন?”
“মনটা খচখচ করছে রাখতে। জানি না কেন? বইটি আনার পর থেকে এই লেখাগুলো পড়ে শান্তি পাচ্ছি না। মনে হচ্ছে কারো প্রিয় জিনিস সামান্য টাকার বিনিময়ে কিনে নিয়ে এসেছি। আপনার নিশ্চয়ই অদ্ভুত লাগছে? কিন্তু আমি সত্যিই জানি না এই সমস্যাকে কী বলে? কিন্তু আমি বইটি ফেরত দেব। তার আগে স্বস্তি পাচ্ছি না।”
শীতল স্বর আকস্মিক অস্থিরতায় ঘিরে গেছে। সেদিকেও বিশেষ খেয়াল গেল ফরহাদের। এটিও মন্দ নয়। ফরহাদ জবাব দেয়,
“বিরাট সমস্যা। কীভাবে দিবেন বলুন?”
“আপনার অ্যাড্রেস দিলেই হবে আমাকে। আমি পার্সেল পাঠিয়ে দিব।”
ফরহাদ ভ্রুদ্বয় কপালে তুলে ভিন্ন সুরে বলল, “একেবারে অ্যাড্রেসটাই দিয়ে দেব?”
ফোনের অন্যপাশে ঘোর নীরবতা। ফরহাদ হাসলো। মেয়েটি নিশ্চয়ই বিব্রতবোধ করছে? ফরহাদ বলল,
“আগামীকাল নীলক্ষেত মোড়ে দাঁড়াবো। স্থান, দিন আমি নির্ধারণ, সময়টা কষ্ট করে আপনি নির্ধারণ করুন।”
অনেকটা সময় নিয়ে জবাব আসে, “সন্ধ্যা ছয়টা।”
কল এখনই কেটে যাবে। তার পূর্বেই ফরহাদ আগ বাড়িয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ে, “আপনার নামটা?”
“একেবারে পুরো নামটাই বলে দেব?”
তার কথাই তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হল। ফরহাদ এবার শব্দ করে হাসে। সামনে থাকা বন্ধুমহল তার হাসি দেখে আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে রয়। ফরহাদ একহাতে ঘাড় ঘষে কিছু বলতে যাবে তখনই মেয়েটি বলে উঠে,
“রূপা.. আমার নাম রূপা।”
“ওহ! নাইস নেইম।”
মৃদু হাসির ঝংকার কর্নোগোচর হয়। এই হাসিটি স্বাভাবিক শোনাচ্ছে না। যেন কেউ তার বোকামিতে বিদ্রুপ করে হাসছে। ফরহাদ হন্তদন্ত ভঙ্গিতে বলে,
“আচ্ছা.. ওয়েট! আপনি মিথ্যা…”
“জি, আপনি যা ভেবেছেন তাই।”
কথাটি অসম্পূর্ণই রয়ে যায়। সে সাথে সাথেই ফোন কেটে দিয়েছে ততক্ষণে। ফরহাদের জমে যাওয়া মস্তিষ্ক জ্বলে উঠেছে ততক্ষণে। মেয়েটি ছলনা করল তার সাথে। মধু মিশ্রিত স্বরে ধোঁকা দিল তাকে। সে তার আসল নাম বলেনি। বলেছে হিমুর রূপার কথা।
___
“বয়স তো কম হলো না! বিয়ে হচ্ছে না নিশ্চয়ই কোনো খুত আছে মেয়ের মাঝে। আমাদের সময় মেয়েদের সতেরো বছরেই বিয়ে হয়ে যেতো। আপনার মেয়ের বয়স চব্বিশ পেরিয়ে পঁচিশ। বাপহারা মাইয়া। কতদিন ঘাড়ে বসিয়ে খাওয়াবেন?”
প্রতিবেশী রেহানা। পেশায় তিনি একজন ‘ ঘটক ’। পাড়ার ছেলে মেয়েদের বিয়ে দেওয়া যেন তার জীবনের প্রধান লক্ষ্য। শিরীনের ক্ষেত্রেও তাই। কিন্তু এখনও তার কার্য ফলপ্রসূ হয়নি। দীর্ঘ দুই বছর যাবত বিয়ে দিতে চাইছেন মেয়েটিকে, পারছেন না। আজ এগারতম পাত্র পক্ষও হাতছাড়া হলো। কেন? কী সমস্যা? জানা নেই। সৌন্দর্যের দিক থেকেও কোনো কমতি নেই মেয়েটির মাঝে। তাহলে? বিয়ে হচ্ছে না কেন? আজ মুখের উপরই শোভা বেগমের সামনে কটু কথা বললেন রেহানা। বলেই পার্স বগলদাবা করে বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে।
পর্দার আড়াল থেকে শিরীন সবটা শুনল। রেহানা বেরিয়ে যাওয়ার পরপরই বেরিয়ে এসে প্রশ্ন করল,
“বিয়েটাই মেয়েদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য?”
শোভা বেগম হতাশ স্বরে বললেন, “লক্ষ্য না, প্রয়োজন।”
“আমি অস্বীকার করব না এটা। একটি মেয়ের পেছনে ঢাল হয়ে দাঁড়ানোর জন্য একজন প্রয়োজন। পৃথিবী যতই উন্নত হয়ে যাক না কেন? আর বলুক না কেন মেয়েদের কাউকে প্রয়োজন নেই? কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ছেলে-মেয়ে উভয়েরই কাউকে না কাউকে প্রয়োজন। কিন্তু যদি ভাগ্যে সেটা লিখা না থাকে, তাহলে আমরা চাইলে পারবো বদলাতে?”
শোভা বেগম নীরস মুখে জবাব দিলেন, “চেষ্টা করতে তো বারণ করা হয়নি।”
“তোমরা যেটা করছো সেটা চেষ্টা নয়, জোর। চাইলেই পারবে জোর করে সৃষ্টিকর্তার বিরুদ্ধে যেতে? সে যদি আমার ভাগ্যে বিয়ে লিখে না রাখেন, তাহলে পারবে আমাকে তার সিদ্ধান্তের বিপক্ষে যেতে? চেষ্টা আর জবরদস্তির মধ্যে পার্থক্য আছে।”
শোভা বেগম মেয়ের খাপ্পা মুখপানে তাকালেন। ছোটবেলা থেকেই স্বল্পভাষী মেয়ে, বেশিরভাগ সময় একা থাকতেই পছন্দ করে। সহজে রেগে যায় না। কিন্তু রেগে গেলে কণ্ঠ কাঁপে। এখনও সেটিই হচ্ছে। শোভা বেগম বললেন,
“আমি জানি ভাগ্য পরিবর্তন সম্ভব নয়। আমি এটাও জানি সমাজের মানুষের মুখ আটকে রাখা সম্ভব নয়। ভাগ্য আর সমাজের মধ্যে পিষে আমরাই মরছি।”
“আমার বিয়ে হচ্ছে না কেন জানো? কারণ এই পৃথিবীর মানুষ মূলত লোভী। আমার বাবা নেই। বাবাহীন মেয়েদের ভালো চোখে দেখা হয়না। তাদের বোঝা মনে হয়। তাদের মধ্যে সন্দেহ, আমরা তাদের আদর আপ্যায়ন করতে পারবো নাকি?”
একই ঘ্যান ঘ্যান আর ভালো লাগেনা। এই কথার জবাব শোভা বেগমের কাছে নেই। তাই তিনি উঠে ঘরে চলে গেলেন। শিরীন নিজের পরিস্থিতির উপর তাচ্ছিল্য করে হাসলো। সাথে বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।
______
‘এই শহরের কোলাহল যেদিন থেমে যাবে, সেদিন হয়তো চারিপাশে এক দমবন্ধ শূন্যতা নেমে আসবে। নিস্তেজ অভিমানের চাদরে নিজেকে মুড়িয়ে নেবে,
এ শহর…”
কথাটি এক নারী তার প্রিয় পুরুষকে বলছে। নীলক্ষেতের কোলাহলে পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে। মানুষ, গাড়ি, রিকশার শোরগোলের মধ্য দিয়েই হাঁটছে ফরহাদ। পরনে আসমানী রঙের শার্ট, রংচটা জিন্সের প্যান্ট আর কালো শাল মোড়ানো। ফোনটি কানে গুঁজে আছে। হন্তদন্ত ভঙ্গিতে পা বাড়িয়ে এগোচ্ছে নীলক্ষেত মোড়ের দিকে।
“কী রঙের পোশাক পরেছেন? চিনব কী করে?”
গতরাতের সেই শীতল কণ্ঠী মেয়ে জবাব দিল, “গাঢ় খয়েরী।”
“কোথায় দাঁড়িয়ে?”
“পুলিশ বক্সের সামনে।”
ফরহাদ ফোন রেখে গায়ের শালটা ঠিকঠাক করে নেয়। ভিড় ঠেলে চৌরাস্তার দিকে এগোয়। রাস্তা পাড় হলো কিছুটা দৌড়ে। সরাসরি এসে দাঁড়ালো গাঢ় খয়েরী রঙের পোশাক পরিহিত মেয়েটির সামনে। এক পলক তাকিয়ে বলল,
“আপনি?”
মেয়েটি হাতে থাকা বই এগিয়ে ধরে বলে, “আপনিই তাহলে এই বইয়ের মালিক?”
ফরহাদ বিনয়ী হাসলো। বলল, “জি। ধন্যবাদ।”
মেয়েটি কিছু বলল না কথার পৃষ্ঠে। জোরপূর্বক হেসে এদিক ওদিক তাকালো। অন্যদিকে ফরহাদ ঘাড় বেঁকিয়ে দেখল বইটি। কোনো অনুভূতি কাজ করছে না এই বইয়ের প্রতি। সামান্য একটি কাগজে তৈরি বইমাত্র মনে হচ্ছে।
“আসি।”
মেয়েটি চলে যেতে চাইলে ফরহাদ বলে উঠে, “এক মিনিট দাঁড়ান।”
ফরহাদ বিব্রত চেহারায় বলল, “না মানে কষ্ট করে এসেছেন আমার বইটি দিতে… এভাবে..।
ফরহাদের হচকচে ভঙ্গিমা দেখে মেয়েটি। ফরহাদ ফোস করে নিঃশ্বাস ফেলে সরাসরি বলে উঠে, “চা?”
“বিনিময়ে চায়ের ট্রিট দিতে চাইছেন?”
ফরহাদ হেসে বলে, “তেমনটাই… তবে আপনি চাইলে একটি নতুন বই আপনাকে দিতে পারি..”
“তার আর প্রয়োজন পড়বে না।”
মেয়েটি প্রশ্ন করল, “এখানে যাতায়াত হয়?”
“হ্যাঁ, প্রায় প্রতিদিনই হয়।”
“তাহলে আপনার জানার কথা নীলক্ষেতে ভালো চা পাওয়া একটু কঠিন।”
“একটু না অনেকটাই কঠিন। তো পলাশী?”
মেয়েটি কী যেন ভাবলো। কানের পেছনে চুল গুঁজে বলল, “হাতে সময় কম।”
“বেশিক্ষণ লাগবে না।” ফরহাদ নত সুরে বলল।
মাটির ঘড়ায় দু কাপ ধোঁয়া ওঠা চা। বেঞ্চির মধ্যিখানে কিয়ৎ ব্যবধান। সাবলীল ভঙ্গিতে বসে আছে সে শীতল কণ্ঠী মেয়ে। দুজনার মাঝে শুনশান নীরবতা। ফরহাদের মাঝে এক ব্যতিক্রমী আচরণ ঘটল। চক্ষু না চাইতেই বারবার আড়চোখে চেয়ে তার মুখখানা পর্যবেক্ষণ করছে। উজ্জ্বল শ্যামলা বর্ণ তার, মলিন মুখশ্রী, পরিপাটি পুরোটাই। মাথার একটি চুলও এলোমেলো নেই। ফরহাদের মনে প্রশ্ন জাগল, তাহলে একে কী বলে? বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ নিশ্চয়ই?
ইচ্ছে হলো কণ্ঠের মাধুর্য শুনতে। নিস্তব্ধতা কাটিয়ে বলল,
“কখনও ভাবিনি চার বছর পর বইটি পাব।”
মেয়েটি চায়ের কাপের দিকে চেয়ে জবাব দেয়, “ডেসটিনি।”
ফরহাদ ঠোঁটে ঠোঁট চেপে মাথা দোলায়। বলে, “হুউউম। ডেসটিনি কাকে, কখন, কোন অবস্থানে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়, বলা মুশকিল।”
মেয়েটি ত্বরিতে জবাব দিল, “আপনাকে পলাশীতে নিয়ে এসেছে।”
কথার ছলে ব্যাঙ্গ ঠিক বুঝতে পারল ফরহাদ। প্রতিক্রিয়াশূন্য মুখে ঠাট্টা করে, কিন্তু বুঝতে দেয় না। পুরোটা সময় নেত্রদ্বয় নামিয়েই রেখেছে। একবারের জন্যও তাকায়নি ফরহাদের দিকে। সেখানে ফরহাদের হাল ভিন্ন। এই শীতল সন্ধ্যায় মেয়েটির মুখ শীতলতা দ্বিগুণ করছে। আকর্ষণবোধকে আস্কারা দেওয়ার মতো সময়।
“আপনার আসল নাম রূপা?”
“শিরীন।”
শিরীন, খুব দ্রুত স্বরে জবাব এল। ফরহাদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে দোকানীর দিকে দশ টাকার দুটো খুচরো নোট এগিয়ে দিল। ততক্ষণে শিরীন তার মসৃন কেশমালা কানের পেছনে গুঁজতে ফের ব্যস্ত। এই দৃশ্যটি তাকে পৃথকভাবে টানছে। আকস্মিক মুখপতট গম্ভীর হয়ে ফরহাদের। বইটি শিরীনের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
“বইটি রাখুন।”
শিরীনের দৃষ্টি তোলার ফুরসত হলো তবে। গোলাকার চোখে চেয়ে বিস্ময় নিয়ে জানতে চায়,
“কেন?”
“উপহার দিলাম।”
কণ্ঠে আরও বিস্ময় টেনে শিরীন শুধায়, “কিন্তু কেন?”
ফরহাদ জবাবে বলল,
“বই ফেরানোর অজুহাতে আরও দু’ কাপ চা খাওয়া যাবে।”
চলবে…
কনকনে শীতের চাদরে মোড়ানো রাজধানী। কুয়াশা মেঘের ন্যায় উড়ছে যেন। কথা বললেই নিঃশ্বাসের সিগারেটের ন্যায় ধোঁয়া বেরোচ্ছে মুখ থেকে। বাংলাদেশের মানচিত্রের মধ্যিখানে মায়ার শহর ঢাকার অবস্থান। এখানে শীতের ঝাপ্টা খুব একটা পড়ে না বললেই চলে। প্রভাব পড়ে সাধারণত উত্তরবঙ্গে। তবে এবারের শীতটা একটু বেশীই মনে হচ্ছে। জানুয়ারির ঠিক মাঝামাঝি সময়। তাপমাত্রা দেখাচ্ছে ষোলো ডিগ্রি সেলসিয়াস। খোলা মাঠের মধ্যিখানে জ্বলছে আগুনের লালচে শিখা, শীত নিবারণের মাধ্যম হিসেবে। আর ছোট্ট সাউন্ড বক্সে বাজছে সৌরভ শাহ এর ‘ প্রিয়তম ’ গানটি। আগুনের উষ্ণতাকে গায়ে মেখে নিল একদল। তাদেরই মাঝে একজন বলল,
“ঢাকার শীতকালের সাথে আর কিছুর তুলনাই হয়না। হাইওয়ের যানজটও তখন ভালো লাগে, মানুষের কোলাহল তখন প্রিয় হতে শুরু করে। আশপাশে কতই আয়োজন। এই শহরে শীত নামে প্রেমের ঘ্রাণ নিয়ে। এই শহরে একটি শীতের সন্ধ্যা উৎসবের চেয়ে কম নয়।”
কথাটি শেষ হওয়ার সাথে সাথেই মুঠোফোন বিদঘুটে আওয়াজে বেজে উঠে। এই হিমশীতল সন্ধ্যায়, সুন্দর গানের মজলিশে ফোনের আওয়াজটা এক প্রকার বিরক্তির কারণ হয়েই দাঁড়ালো সবার কাছে। তার মাঝে শীতকালীন হাঁচি কাশি। একদম জুড়ে বসেছে দেহের সাথে। কয়েকদফা কেশে বুকে হাত ঘষতে ঘষতে ফোনটা রিসিভ করে,
“আসসালামু ওয়ালাইকুম, ফরহাদ বলছেন?”
ফরহাদ কান থেকে ফোন নামায়। নাম্বারটা আরেকবার চেক করল। আননোন নাম্বার। কন্ঠটাও অপরিচিত। পুনরায় ফোন কানে চেপে বলল,
“ওয়ালাইকুম আসসালাম। জি, তবে আপনি কে বলছেন?”
“আমাকে চিনবেন না।”
ফরহাদ হকচকিয়ে গেল খানিক। বন্ধুমহলের চোখ তার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ফরহাদ দ্রুত গতিতে কয়েকবার পলক ফেলে বলল,
“তাহলে… আই মিন কল করার কারণটা জানতে পারি?”
অন্যপাশ থেকে জবাব এলো, “জি, আপনার একটি প্রিয় জিনিস আমার কাছে।”
কথার এক পর্যায়ে ফরহাদের মনে হলো তার কণ্ঠটি অদ্ভুত রকমের সুন্দর। যে সুন্দরকে ঠিক সুন্দর বলে আখ্যা দেওয়া যায় না। এই শান্ত-শীতল আবহে স্নিগ্ধ কণ্ঠস্বর শিরশির অনুভূতি দিচ্ছে। ফরহাদ কানে ফোন গুঁজে থমকে গেল এক মুহূর্তে। এসব কী ভাবছে! অথচ মেয়েটি ফোনের অন্যপার্শ্বে অপেক্ষমান। কথার অর্থ বোধগম্য না হওয়ায় প্রশ্ন করল,
“আমার প্রিয় জিনিস? কী বললেন বুঝতে পারিনি।”
মেয়েটি জবাবে বলল, “মনে হচ্ছে আপনি হিমুর বিশাল ভক্ত। আমার হাতে বর্তমানে হুমায়ূন আহমেদ স্যারের হিমু বইটি আছে। সেখানে আপনার নাম, নম্বর আর ফিরিয়ে দেওয়ার একটি ছোট্ট আবেদন পেলাম।”
ফরহাদ কপাল কুঁচকে ফেলে। সাথে সাথে সেই ভাঁজ পড়া কপাল সমানও হলো। আচমকা মনে পড়ল বইটির কথা। এককালে একটু বেশীই প্রিয় ছিল। প্রিয় হওয়ার কারণটাও কম বিশেষ ছিল না। হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে নাম, নাম্বার লিখে রেখেছিল। প্রিয় নারীর দেওয়া শেষ চিহ্ন বলে কথা। একজন জুনিয়রকে পড়তে দিয়েছিল বইটি। তখনই বইটির সাথে সেটির সাথে জড়ানো পুরোনো বেখেয়ালি স্মৃতিটুকু হারিয়েছে। হাস্যকর লাগছে বিষয়টি এখন। মনের আনাচে কানাচেতে সেই অতীত অনুভূতির অ’ টুকু অবশিষ্ট নেই।
“আমি ফরহাদ, এটা আমার নাম্বার - ০১৯xxxxxxx। বইটি যদি কখনও কেউ পেয়ে থাকেন, দয়া করে আমাকে ফিরিয়ে দেবেন। আমি চাইলে একটি নতুন বই কিনতেই পারি। কিন্তু এই বইটি বিশেষ, অনেক স্মৃতি জড়ানো। অনুরোধ করছি, যদি কখনও বইটি আপনার হাতে আসে দয়া করে উপরে দেওয়া নাম্বারে যোগাযোগ করবেন। আমি আপনাকে নতুন একটি বই দিব। কিন্তু এই বইটি আমার চাই।”
শীতল কণ্ঠে পুরো লেখাটা পড়ে শোনালো মেয়েটি। ভাবনার ব্যাঘাত ঘটে এখানেই। হ্যাঁ! ঠিক এটাই লিখেছিল সে। ফরহাদ নীরবে বাঁকা হাসলো। যত্তসব ছেলেমানুষী! বই আর বই উপহার দেওয়া মানুষকে অনেক আগেই ভুলে গিয়েছে। ফরহাদ নীরবতা ভেঙে বলল,
“আপনার কাছেই রেখে দিন। আমার আর এই বইয়ের প্রয়োজন নেই।”
মেয়েটি উৎকণ্ঠা হয়ে জানতে চায়, “কেন? এতটা ডেসপারেট হয়ে লিখে রেখেছেন, যেন আপনার সম্পূর্ণ মায়া এই বইটার মধ্যেই জড়িয়ে। এখন বলছেন লাগবে না?”
“জড়িয়ে ছিল, ছাড়িয়ে নিয়েছি।”
ফরহাদের উচ্চারিত বাক্য এতটাই নিম্নস্বরে ছিল যে অপরপ্রান্তের মেয়েটি শুনতেই পেলো না। তাই জিজ্ঞাসা করল,
“কিছু বললেন?”
“উহু! আপনি বইটি রেখে দিন।”
“রাখতে চাইছি না।”
ফরহাদ ফোস করে নিঃশ্বাস ফেলে শুধায়, “কোথায় পেলেন বইটি?”
“নীলক্ষেতের পুরানো বইয়ের দোকানে।”
ফরহাদের মুখ কুঁচকে আসে। জুনিয়র ছেলেটি বই নিয়েছিল পড়তে, সেকিনা আবার বিক্রি করে দিয়েছে। অদ্ভুত মানুষ! রেখে দিলে কী হতো? পুরোনো বই বিক্রি করে আর কত টাকাই বা পেয়েছে?
“রেখে দিলে কী খুব সমস্যা হবে? নিশ্চয়ই পড়ার জন্য কিনেছেন?”
“মনটা খচখচ করছে রাখতে। জানি না কেন? বইটি আনার পর থেকে এই লেখাগুলো পড়ে শান্তি পাচ্ছি না। মনে হচ্ছে কারো প্রিয় জিনিস সামান্য টাকার বিনিময়ে কিনে নিয়ে এসেছি। আপনার নিশ্চয়ই অদ্ভুত লাগছে? কিন্তু আমি সত্যিই জানি না এই সমস্যাকে কী বলে? কিন্তু আমি বইটি ফেরত দেব। তার আগে স্বস্তি পাচ্ছি না।”
শীতল স্বর আকস্মিক অস্থিরতায় ঘিরে গেছে। সেদিকেও বিশেষ খেয়াল গেল ফরহাদের। এটিও মন্দ নয়। ফরহাদ জবাব দেয়,
“বিরাট সমস্যা। কীভাবে দিবেন বলুন?”
“আপনার অ্যাড্রেস দিলেই হবে আমাকে। আমি পার্সেল পাঠিয়ে দিব।”
ফরহাদ ভ্রুদ্বয় কপালে তুলে ভিন্ন সুরে বলল, “একেবারে অ্যাড্রেসটাই দিয়ে দেব?”
ফোনের অন্যপাশে ঘোর নীরবতা। ফরহাদ হাসলো। মেয়েটি নিশ্চয়ই বিব্রতবোধ করছে? ফরহাদ বলল,
“আগামীকাল নীলক্ষেত মোড়ে দাঁড়াবো। স্থান, দিন আমি নির্ধারণ, সময়টা কষ্ট করে আপনি নির্ধারণ করুন।”
অনেকটা সময় নিয়ে জবাব আসে, “সন্ধ্যা ছয়টা।”
কল এখনই কেটে যাবে। তার পূর্বেই ফরহাদ আগ বাড়িয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ে, “আপনার নামটা?”
“একেবারে পুরো নামটাই বলে দেব?”
তার কথাই তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হল। ফরহাদ এবার শব্দ করে হাসে। সামনে থাকা বন্ধুমহল তার হাসি দেখে আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে রয়। ফরহাদ একহাতে ঘাড় ঘষে কিছু বলতে যাবে তখনই মেয়েটি বলে উঠে,
“রূপা.. আমার নাম রূপা।”
“ওহ! নাইস নেইম।”
মৃদু হাসির ঝংকার কর্নোগোচর হয়। এই হাসিটি স্বাভাবিক শোনাচ্ছে না। যেন কেউ তার বোকামিতে বিদ্রুপ করে হাসছে। ফরহাদ হন্তদন্ত ভঙ্গিতে বলে,
“আচ্ছা.. ওয়েট! আপনি মিথ্যা…”
“জি, আপনি যা ভেবেছেন তাই।”
কথাটি অসম্পূর্ণই রয়ে যায়। সে সাথে সাথেই ফোন কেটে দিয়েছে ততক্ষণে। ফরহাদের জমে যাওয়া মস্তিষ্ক জ্বলে উঠেছে ততক্ষণে। মেয়েটি ছলনা করল তার সাথে। মধু মিশ্রিত স্বরে ধোঁকা দিল তাকে। সে তার আসল নাম বলেনি। বলেছে হিমুর রূপার কথা।
___
“বয়স তো কম হলো না! বিয়ে হচ্ছে না নিশ্চয়ই কোনো খুত আছে মেয়ের মাঝে। আমাদের সময় মেয়েদের সতেরো বছরেই বিয়ে হয়ে যেতো। আপনার মেয়ের বয়স চব্বিশ পেরিয়ে পঁচিশ। বাপহারা মাইয়া। কতদিন ঘাড়ে বসিয়ে খাওয়াবেন?”
প্রতিবেশী রেহানা। পেশায় তিনি একজন ‘ ঘটক ’। পাড়ার ছেলে মেয়েদের বিয়ে দেওয়া যেন তার জীবনের প্রধান লক্ষ্য। শিরীনের ক্ষেত্রেও তাই। কিন্তু এখনও তার কার্য ফলপ্রসূ হয়নি। দীর্ঘ দুই বছর যাবত বিয়ে দিতে চাইছেন মেয়েটিকে, পারছেন না। আজ এগারতম পাত্র পক্ষও হাতছাড়া হলো। কেন? কী সমস্যা? জানা নেই। সৌন্দর্যের দিক থেকেও কোনো কমতি নেই মেয়েটির মাঝে। তাহলে? বিয়ে হচ্ছে না কেন? আজ মুখের উপরই শোভা বেগমের সামনে কটু কথা বললেন রেহানা। বলেই পার্স বগলদাবা করে বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে।
পর্দার আড়াল থেকে শিরীন সবটা শুনল। রেহানা বেরিয়ে যাওয়ার পরপরই বেরিয়ে এসে প্রশ্ন করল,
“বিয়েটাই মেয়েদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য?”
শোভা বেগম হতাশ স্বরে বললেন, “লক্ষ্য না, প্রয়োজন।”
“আমি অস্বীকার করব না এটা। একটি মেয়ের পেছনে ঢাল হয়ে দাঁড়ানোর জন্য একজন প্রয়োজন। পৃথিবী যতই উন্নত হয়ে যাক না কেন? আর বলুক না কেন মেয়েদের কাউকে প্রয়োজন নেই? কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ছেলে-মেয়ে উভয়েরই কাউকে না কাউকে প্রয়োজন। কিন্তু যদি ভাগ্যে সেটা লিখা না থাকে, তাহলে আমরা চাইলে পারবো বদলাতে?”
শোভা বেগম নীরস মুখে জবাব দিলেন, “চেষ্টা করতে তো বারণ করা হয়নি।”
“তোমরা যেটা করছো সেটা চেষ্টা নয়, জোর। চাইলেই পারবে জোর করে সৃষ্টিকর্তার বিরুদ্ধে যেতে? সে যদি আমার ভাগ্যে বিয়ে লিখে না রাখেন, তাহলে পারবে আমাকে তার সিদ্ধান্তের বিপক্ষে যেতে? চেষ্টা আর জবরদস্তির মধ্যে পার্থক্য আছে।”
শোভা বেগম মেয়ের খাপ্পা মুখপানে তাকালেন। ছোটবেলা থেকেই স্বল্পভাষী মেয়ে, বেশিরভাগ সময় একা থাকতেই পছন্দ করে। সহজে রেগে যায় না। কিন্তু রেগে গেলে কণ্ঠ কাঁপে। এখনও সেটিই হচ্ছে। শোভা বেগম বললেন,
“আমি জানি ভাগ্য পরিবর্তন সম্ভব নয়। আমি এটাও জানি সমাজের মানুষের মুখ আটকে রাখা সম্ভব নয়। ভাগ্য আর সমাজের মধ্যে পিষে আমরাই মরছি।”
“আমার বিয়ে হচ্ছে না কেন জানো? কারণ এই পৃথিবীর মানুষ মূলত লোভী। আমার বাবা নেই। বাবাহীন মেয়েদের ভালো চোখে দেখা হয়না। তাদের বোঝা মনে হয়। তাদের মধ্যে সন্দেহ, আমরা তাদের আদর আপ্যায়ন করতে পারবো নাকি?”
একই ঘ্যান ঘ্যান আর ভালো লাগেনা। এই কথার জবাব শোভা বেগমের কাছে নেই। তাই তিনি উঠে ঘরে চলে গেলেন। শিরীন নিজের পরিস্থিতির উপর তাচ্ছিল্য করে হাসলো। সাথে বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।
______
‘এই শহরের কোলাহল যেদিন থেমে যাবে, সেদিন হয়তো চারিপাশে এক দমবন্ধ শূন্যতা নেমে আসবে। নিস্তেজ অভিমানের চাদরে নিজেকে মুড়িয়ে নেবে,
এ শহর…”
কথাটি এক নারী তার প্রিয় পুরুষকে বলছে। নীলক্ষেতের কোলাহলে পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে। মানুষ, গাড়ি, রিকশার শোরগোলের মধ্য দিয়েই হাঁটছে ফরহাদ। পরনে আসমানী রঙের শার্ট, রংচটা জিন্সের প্যান্ট আর কালো শাল মোড়ানো। ফোনটি কানে গুঁজে আছে। হন্তদন্ত ভঙ্গিতে পা বাড়িয়ে এগোচ্ছে নীলক্ষেত মোড়ের দিকে।
“কী রঙের পোশাক পরেছেন? চিনব কী করে?”
গতরাতের সেই শীতল কণ্ঠী মেয়ে জবাব দিল, “গাঢ় খয়েরী।”
“কোথায় দাঁড়িয়ে?”
“পুলিশ বক্সের সামনে।”
ফরহাদ ফোন রেখে গায়ের শালটা ঠিকঠাক করে নেয়। ভিড় ঠেলে চৌরাস্তার দিকে এগোয়। রাস্তা পাড় হলো কিছুটা দৌড়ে। সরাসরি এসে দাঁড়ালো গাঢ় খয়েরী রঙের পোশাক পরিহিত মেয়েটির সামনে। এক পলক তাকিয়ে বলল,
“আপনি?”
মেয়েটি হাতে থাকা বই এগিয়ে ধরে বলে, “আপনিই তাহলে এই বইয়ের মালিক?”
ফরহাদ বিনয়ী হাসলো। বলল, “জি। ধন্যবাদ।”
মেয়েটি কিছু বলল না কথার পৃষ্ঠে। জোরপূর্বক হেসে এদিক ওদিক তাকালো। অন্যদিকে ফরহাদ ঘাড় বেঁকিয়ে দেখল বইটি। কোনো অনুভূতি কাজ করছে না এই বইয়ের প্রতি। সামান্য একটি কাগজে তৈরি বইমাত্র মনে হচ্ছে।
“আসি।”
মেয়েটি চলে যেতে চাইলে ফরহাদ বলে উঠে, “এক মিনিট দাঁড়ান।”
ফরহাদ বিব্রত চেহারায় বলল, “না মানে কষ্ট করে এসেছেন আমার বইটি দিতে… এভাবে..।
ফরহাদের হচকচে ভঙ্গিমা দেখে মেয়েটি। ফরহাদ ফোস করে নিঃশ্বাস ফেলে সরাসরি বলে উঠে, “চা?”
“বিনিময়ে চায়ের ট্রিট দিতে চাইছেন?”
ফরহাদ হেসে বলে, “তেমনটাই… তবে আপনি চাইলে একটি নতুন বই আপনাকে দিতে পারি..”
“তার আর প্রয়োজন পড়বে না।”
মেয়েটি প্রশ্ন করল, “এখানে যাতায়াত হয়?”
“হ্যাঁ, প্রায় প্রতিদিনই হয়।”
“তাহলে আপনার জানার কথা নীলক্ষেতে ভালো চা পাওয়া একটু কঠিন।”
“একটু না অনেকটাই কঠিন। তো পলাশী?”
মেয়েটি কী যেন ভাবলো। কানের পেছনে চুল গুঁজে বলল, “হাতে সময় কম।”
“বেশিক্ষণ লাগবে না।” ফরহাদ নত সুরে বলল।
মাটির ঘড়ায় দু কাপ ধোঁয়া ওঠা চা। বেঞ্চির মধ্যিখানে কিয়ৎ ব্যবধান। সাবলীল ভঙ্গিতে বসে আছে সে শীতল কণ্ঠী মেয়ে। দুজনার মাঝে শুনশান নীরবতা। ফরহাদের মাঝে এক ব্যতিক্রমী আচরণ ঘটল। চক্ষু না চাইতেই বারবার আড়চোখে চেয়ে তার মুখখানা পর্যবেক্ষণ করছে। উজ্জ্বল শ্যামলা বর্ণ তার, মলিন মুখশ্রী, পরিপাটি পুরোটাই। মাথার একটি চুলও এলোমেলো নেই। ফরহাদের মনে প্রশ্ন জাগল, তাহলে একে কী বলে? বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ নিশ্চয়ই?
ইচ্ছে হলো কণ্ঠের মাধুর্য শুনতে। নিস্তব্ধতা কাটিয়ে বলল,
“কখনও ভাবিনি চার বছর পর বইটি পাব।”
মেয়েটি চায়ের কাপের দিকে চেয়ে জবাব দেয়, “ডেসটিনি।”
ফরহাদ ঠোঁটে ঠোঁট চেপে মাথা দোলায়। বলে, “হুউউম। ডেসটিনি কাকে, কখন, কোন অবস্থানে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়, বলা মুশকিল।”
মেয়েটি ত্বরিতে জবাব দিল, “আপনাকে পলাশীতে নিয়ে এসেছে।”
কথার ছলে ব্যাঙ্গ ঠিক বুঝতে পারল ফরহাদ। প্রতিক্রিয়াশূন্য মুখে ঠাট্টা করে, কিন্তু বুঝতে দেয় না। পুরোটা সময় নেত্রদ্বয় নামিয়েই রেখেছে। একবারের জন্যও তাকায়নি ফরহাদের দিকে। সেখানে ফরহাদের হাল ভিন্ন। এই শীতল সন্ধ্যায় মেয়েটির মুখ শীতলতা দ্বিগুণ করছে। আকর্ষণবোধকে আস্কারা দেওয়ার মতো সময়।
“আপনার আসল নাম রূপা?”
“শিরীন।”
শিরীন, খুব দ্রুত স্বরে জবাব এল। ফরহাদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে দোকানীর দিকে দশ টাকার দুটো খুচরো নোট এগিয়ে দিল। ততক্ষণে শিরীন তার মসৃন কেশমালা কানের পেছনে গুঁজতে ফের ব্যস্ত। এই দৃশ্যটি তাকে পৃথকভাবে টানছে। আকস্মিক মুখপতট গম্ভীর হয়ে ফরহাদের। বইটি শিরীনের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
“বইটি রাখুন।”
শিরীনের দৃষ্টি তোলার ফুরসত হলো তবে। গোলাকার চোখে চেয়ে বিস্ময় নিয়ে জানতে চায়,
“কেন?”
“উপহার দিলাম।”
কণ্ঠে আরও বিস্ময় টেনে শিরীন শুধায়, “কিন্তু কেন?”
ফরহাদ জবাবে বলল,
“বই ফেরানোর অজুহাতে আরও দু’ কাপ চা খাওয়া যাবে।”
চলবে…
written by: আয্যাহ সূচনা

Olindo Rahman

Olindo Rahman

A good book is worth a hundred good friends. 
But a good friend is equal to a library.!! 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Your experience on this site will be improved by allowing cookies Cookie Policy