তরুণ-তরুণীদের কলরবে মুখরিত ক্যাম্পাস প্রাঙ্গণ। আজ কোনো পাঠসভা নেই, নেই কোনো চিন্তা। বিশালকার বৃক্ষজালের শাখা-প্রশাখা ছিঁড়ে মিষ্টি রোদে উদ্ভাসিত এই সকাল। হালকা শীতলতা ও উষ্ণতার মাঝে আয়োজনে ব্যস্ত সর্বজন।
কিন্তু ঘুম ভাঙেনি ফরহাদের। শিরীনের মায়ের হাতের খুদের ভাত খেয়ে গাধার খাটুনি খেটেছে। বাজার করা থেকে শুরু করে স্টল সাজানো অবধি সব কাজ করতে হয়েছে। ঘুমোতে পেরেছে মাত্র দুই ঘণ্টা। রক্তিম আভায় চেয়ে থাকা চোখগুলো খুলে রাখা দায়। কিন্তু হৃদয়ে তৎপরতা। ঘুম জলে যাক, তার রূপাকে ধারণ করা অতীব জরুরী। তাই সাত-পাঁচ না ভেবে মেরুন রঙের পাঞ্জাবিটা গায়ে গিয়ে পারফিউম স্প্রে করে নিল। প্রথমে একটি জ্যাকেট বের করে সিঙ্গেল আলমারি থেকে। আয়নায় নিজেকে পরখ করল একবার। নিজেকে নিজেই কটূক্তি করে বলল,
“ছ্যাহ্! জঘন্য!”
জ্যাকেট টেনে খুলে ফেলল। আলমারি থেকে কালো রংয়ের শাল বের করল। ঘ্রাণ শুঁকে নেয় একবার। কেমন যেন এক মা মা গন্ধ। হবেই না কেন? তার মায়ের হাতেই তৈরী। ফরহাদ শাল ঘুরিয়ে গায়ে পেঁচিয়ে বিছানায় বসে ফোন হাতে নিয়ে। এক পরিচিত নাম্বারে ফোন মিলায়। অন্যপাশ থেকে ফোন রিসিভ হওয়ায় বলে উঠল,
“শরীর কেমন?”
অন্যপাশ থেকে জবাব এল, “আলহামদুলিল্লাহ, আব্বা। তোর কী অবস্থা?”
“চলছে ভালোই।”
ফোনের অন্যপাশে ফাতেমা বেগম। ফরহাদের মা। ছেলের ফোন পেয়েছেন দু’দিন পরে। নানান ব্যস্ততায় নিয়মিত কথা বলা হয় না। ফাতেমা বেগম পরম মমতাময়ী কণ্ঠে শুধান,
“খাওয়া দাওয়া ঠিকঠাক মতো করিস? না কি বাইরের হাবিজাবি খেয়ে বেঁচে আছিস?”
“করি তো। গতকালও খুদের ভাত খেলাম।”
“যাক! তুই খেলেই আমার পেট ভরে।”
ফরহাদ হাসল আর বলল, “হেডমাস্টার কোথায়?”
“হাঁটতে বেড়িয়েছেন। একটুপর তো আবার বাচ্চাদের স্কুল শুরু হবে।”
“আর তোমার ক্লাস কয়টায়?”
“দশটা থেকে এগারোটা। শোন বাবার সাথে কল করে একবার কথা বলে নিস। চিন্তা করে কিন্তু।”
ফরহাদের বাবা ফখরুল সাহেব গ্রামের একটি স্কুলের হেড মাস্টার। তার নিজেরই স্কুল সেটি। সেখানে শিক্ষকতা করেন ফাতেমা বেগম। দুজনেই চাকুরীজীবী মানুষ। পড়াশোনার ব্যাপারে ভীষণ কড়া। মনে পড়ল সেই পুরোনো স্মৃতি। কতই না মার খেয়েছে এই পড়ার কারণে। ফরহাদ ছিল দুরন্ত। গৃহশিক্ষক এলেই বাঁদরের মতো জানালা ধরে ঝুলে থাকত। বেশ বিরক্ত করত পড়াশোনা নিয়ে। সেসব এখন স্মৃতি, তবে পড়াশোনার প্রতি তার এখনও কোনো মনোযোগ নেই। ফরহাদ এসব ভেবেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
“তোমার জন্য দুটো শাড়ি আর হেডমাস্টারের জন্য দুটো পাঞ্জাবি পাঠিয়েছি। ডেলিভারি ম্যান এলে রিসিভ করবে কেমন? ফোন কাছে রেখো। রাখছি। আর হ্যাঁ, নিজেদের খেয়াল রাখবে।”
“তুইও ভালো থাকিস, বাবা।”
বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে ফরহাদ। পলাশী থেকে ক্যাম্পাসে আসতে বেশি একটা সময় ব্যয় হয় না। মিনিট দশেকের মধ্যেই এসে হাজির হওয়া যায়। কিন্তু এই দশ মিনিটও তর সইলো না সামিরের। কম হলেও দশটি ফোন করেছে এই পর্যন্ত। ক্যাম্পাসের পার্কিং বাইক রেখে ফোন হাতে নিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে সুবিশাল মাঠের দিকে। গ্রুপে মেসেজ এসেছে মেয়েরা পিঠে নিয়ে বেরিয়ে গেছে, আগেই যেন সব ঠিকঠাক করে রাখে ছেলেরা।
ফরহাদ এসেই সামিরের উদ্দেশ্যে চেঁচিয়ে বলল, “আমি তো বাইকে আসি, এরোপ্লেনে না। সময় লাগবে স্বাভাবিক। এত কল করার কী আছে?”
সামির ভ্রু কুটি করে বলল, “তোকে ছাড়া ভালো লাগে না।”
“অশ্লীল কথাবার্তা বলবি না।”
“তুই সব কথা নেগেটিভভাবে নিস কেন?”
স্টলের ভেতর পেতে রাখা চেয়ারে পিঠ এলিয়ে দিতে দিতে জবাব ছুঁড়ে ফরহাদ,
“যে যেমন তার কথা তেমনভাবেই নেই।”
এখানে কথা বাড়িয়ে কোনো লাভ নেই, কিন্তু লোকসান আছে। এক কথা দু কথায় তর্ক বেঁধে যাবে। শেষমেষ মুখ ভোতা হয়ে থাকবে সবার। ফরহাদের কাছে একটি পুরোনো মডেলের ক্যামেরা আছে, সনি সাইবার শট ডিএসসি ডাব্লিউ ফোর্টিফাইভ। ইচ্ছে করেই ২০০৭ এর ক্যামেরাটি কিনেছে। বর্তমানের আধুনিক ক্যামেরা তার কেন যেন হজম হয়না। সেসবের মান ভালো হলেও নস্টালজিক অনুভূতি দেয় না। ফরহাদ পকেট থেকে বের করে লেন্স মুছে নিল সামান্য। স্টলের সামনে এক দল গানের অনুশীলন করছে। তাদের পারফর্মেন্স আছে সন্ধ্যার দিকে। ফরহাদ ক্যামেরা অন করে তাদের ভিডিও করতে লাগল। তারা ছাড়া গলায় গান ধরেছে,
“ভূবনো মোহনো গোরা...আ
কোন মণি জনার মনোহরা
ভূবনো মোহনো গোরা
কোন মণি জনার মনোহরা
মণিজনার মনোহরা..
ওরে রাধার প্রেমে মাতোয়ারা
চাঁদ গৌড় আমার রাধার প্রেমে মাতোয়ারা
ধূলায় যাই ভাই গড়াগড়ি
যেতে চাইলে যেতে দেবো না না না
যেতে চাইলে যেতে দেবো না না না
যেতে দেবো না
তোমায় হৃদয় মাঝে..
তোমায় হৃদয় মাঝে রাখিবো ছেড়ে দেবো না
তোমায় হৃদ মাঝারে রাখিবো ছেড়ে দেবো না
যাবো ব্রজের কুলে কুলে...
যাবো ব্রজের কুলে কুলে
আমরা মাখবো পায়ে রাঙ্গাধুল…”
গান তার সুর ধরেই চলছে। শেষ লাইনে ফরহাদের মস্তিষ্ক চলছে না। নিষ্ক্রিয় হতে শুরু করল সামনের দৃশ্যে। অপরূপ এক সৌন্দর্যের মহিমা দেখে দৃষ্টি স্থবির। ব্যস্ত নীল শাড়ির কুচিগুলো, হাতের চুড়িগুলোও নিশ্চয়ই স্থির নেই? কদমের তালে রিনিঝিনি আওয়াজ তুলছে। সে ধ্বনি যেন ফরহাদের কানে পৌঁছাচ্ছে। মস্তিষ্ক অনুমান করে নিতে লাগল সেই ঝংকারকে। দেহবায়ব স্থির, তবে হৃদয়ের উত্তাল ঘূর্ণিঝড়ের কথা কাকে জানাবে? ‘রাধার প্রেমে মাতোয়ারা’ লাইনটি যেন ব্যাঙ্গ করল ফরহাদকে। যেন নীরবে বলে গেল, ‘ সে-ও রাধার প্রেমে মাতোয়ারা।’ ফরহাদ দেখল, দেখেই গেল তাকে নীল শাড়িতে।
ধ্যান তার অনিচ্ছায় ভেঙে চুরমার হয় কিছু মুহূর্ত বাদে। শোভা বেগমও এসেছেন। ফরহাদ দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নিল। ভারী নিঃশ্বাস ফেলে সরে বসল নিজের স্থান থেকে। বেকাবু মনকে স্থির করতে হবে যেকোনো উপায়ে।
“তোদের কী বিয়ে লেগেছে? শাড়ি পড়েছিস কোন খুশিতে?”
সামির অদ্ভুত মুখভঙ্গিতে বলে উঠে। কেননা সব মেয়ের পরনেই শাড়ি। রাত্রি খট করে বলে উঠে,
“তোদের মতো কামলা সেজে আসব নাকি?”
সামির দুহাত ছড়িয়ে নিজের পাঞ্জাবি দেখিয়ে বলল,
“কোনদিক দিয়ে কামলা লাগছে? পাঞ্জাবি পড়েছি দেখিস না?”
নিশি টিটকারী করে বলল, “কয়লা ধুলে ময়লা যায় না।”
সামির রেগেমেগে বলে, “এই কী বললি?”
“যা শুনেছিস তাই বলেছি।” নিশি দ্বিগুণ ঝাঁঝাল সুরে বলল।
সামির বিড়বিড় করে বলল, “সব ঝাঁঝালো লঙ্কা এসে আমার ঘাড়েই পড়েছে।”
হাতে থাকা পিঠাগুলো সাজাতে শুরু করেছে শিরীন। শোভা বেগম চোখ ঘুরিয়ে এদিক ওদিক দেখতে শুরু করলেন। আগে কখনও এত বড় ক্যাম্পাস তিনি দেখেননি। তাকে দেখেই বুঝা গেল, সে অতিরিক্ত খুশি। দোকানের নাম ফলকে নিজের নাম দেখে একগাল হেসে বললেন,
“খুব সুন্দর আয়োজন করেছ তোমরা।”
শাহেদ বলল, “থ্যাঙ্ক ইউ, আন্টি। আসুন, বসুন এখানে।”
শাহেদ স্টলের একপাশে চেয়ার টেনে বসতে দিল শোভা বেগমকে। ফরহাদ নিজের চোখ ফোনের ভেতর গেড়ে আছে। কিছুতেই তাকাবে না শিরীনের দিকে। তার মা পাশেই আছে। তাকালেই মান সম্মান শেষ! শিরীন একবার যদিও দেখেছে ফরহাদকে। মেরুন পাঞ্জাবি ঢেকে আছে কালো শালের আড়ালে। মুখটা গম্ভীর।
কিছু সময় চুপ থেকে স্টলের বাইরে গিয়ে বন্ধুদের সাথে হেসে খেলে কথা বলতে দেখে অবাক হলো শিরীন। তার সাথে কেন কথা বলে না বন্ধুদের সামনে? তাদের আড়ালে তো ঠিকই বলে। কিন্তু তাদের সামনে এমন দ্বিচারিতা কেন? বিষয়টি আজকাল শিরীনকে ভাবাচ্ছে।
শিরীন নিজেদের জন্য কিছু পিঠা আলাদা করল। প্রথমেই মা’ কে দিয়ে বাকিদের দিতে লাগল। সামির, শাহেদকে দিয়ে ফরহাদের দিকে এগিয়ে দিতেই সে অন্যদিকে ফিরে বলল,
“বাকিদের দিন। আমি পরে খাব।”
শিরীন অসম্মানবোধ করে। লোকটাকে সে ঠিকঠাক বুঝে না। এই ভালো এই খারাপ। তার সাথে একান্তে তার যা আচরণ, সেটি কী আসল? নাকি এই মুহূর্তে যে ভঙ্গিতে আছে সে, সেটি আসল? প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে শিরীনের মনে।
স্টলে মোটামুটি ভিড় আছে। সবাই পিঠা পছন্দ করছে। কিনে খাচ্ছে আর শোভা বেগমের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। মায়ের মুখে হাসি দেখে শিরীনও হাসলো। বলল,
“তুমি খুব খুশি। তাই না, মা?”
“হ্যাঁ রে। ভালোই লাগছে আমার।”
“আমিও খুশি।”
মধ্যাহ্ন বিরতিতে খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ডিসপোজেবল ফুড বক্সে বিরিয়ানি কিনে আনা হয়েছে। সবাই খেয়ে দেয়ে বিশ্রাম করতে আগ্রহী। দোকানে তেমন ভিড় নেই এই মুহূর্তে।
ফরহাদ সেখানে থেকেও নেই। আছে, তবে শুধু বন্ধুদের জন্য। শিরীনের মনে প্রশ্ন জাগলো, তার জন্যেও কী থাকা উচিত ছিল? কথা ছিল থাকার? তাহলে এসব কেনোই বা ভাবছে? তবে তার মন উদাস, ভারী উদাস এমন ব্যবহারে।
“আয় গ্রুপ ছবি তুলি।”
রেশমার বলতে দেরি কিন্তু সবার জড়ো হতে দেরি হয়নি। ফরহাদও অলস দেহ নিয়ে উঠেই গেল। কিন্তু নাকচ করল শিরীন। জড়তা গ্রাস করল তাকে। বলল,
“আমি তুলব না।”
রাত্রি শুধায়, “কেন?”
“আমার ছবি ভালো আসে না। প্লিজ জোর করবেন না।”
“আরেহ কে বলেছে ভালো আসে না? আসবে, তুমি এসো তো।” সামির বলল।
শিরীন মিনতির সুরে বলল,
“নাহ, প্লিজ!”
আর জোর করেনি কেউই। নিজেদের মতো ছবি তুলেছে। ছবি তোলা শেষে আকস্মিক গায়েব হয়ে গেল ফরহাদ। একজোড়া কাজল কালো চোখ তাকে খোঁজ করতে গিয়েও করল না। বিড়বিড় করল,
“যে দ্বৈত আচরণ করে তাকে খুঁজে কী লাভ?”
আড়াল থেকে অনেকগুলো ছবি তুলে নিয়েছে ফরহাদ। শিরীনের দৃষ্টির আড়ালে তার মায়াময় ম্লান মুখশ্রীর ছবি। সে এতটাই আড়ালে যে তাকে দেখা দুষ্কর। সে জানে না, একেবারেই জানে না তার ছবি কত ভালো আসে। অযথাই না করলো ছবি তুলতে। ফরহাদ সিদ্ধান্ত নিল এই ছবিগুলো রূপাকে দেখাতেই হবে। তাকে নীল শাড়িতে রূপার মতোই লাগছে। এক ঘোর লাগা নেত্র তার প্রতি সম্পূর্ণই মশগুল, সেটি জানতে হবে তার। হঠাৎ করে এই যে স্নিগ্ধ অনুভূতি জন্ম নিয়েছে? সেই অনুভূতি কী এক তরফা থাকবে নাকি?
“হয় অধিকার, নয় প্রত্যাখান।”
ভেবে স্টলের দিকে এগোলো ফরহাদ। কিছুক্ষণ সময় নিয়ে নিজেকে শান্ত করেছে। এখন যাওয়া উচিত। যদিও তার কোনো কাজ নেই সেখানে।
ফরহাদ হেঁটে স্টলের দিকে এগোতেই কাড়াকাড়ি লাগল রাত্রি, নিশি আর রেশমার মাঝে। অফ সিজনের রজনীগন্ধার গাজরা কে নেবে? তিনটে গাজরা আছে, কিন্তু তাদের শখ দুহাতে সাজাবে। এক হাতে নাকি মানায় না। হিসেব করলে তিনটে গাজরা দু হাতে একজনই পড়তে পারবে। তাহলে বাকি দুজন? ফরহাদ রাশভারী গলায় বলল,
“বাচ্চাদের মতো কাড়াকাড়ি করছিস কেন? তিনজন এক হাতে পড়, তাহলেই তো হলো।”
রাত্রি বলল, “অন্য হাত খালি খালি লাগবে না?”
“লাগুক। তো কী হয়েছে?”
“ভাই, বুড়ি বয়সে এসব ন্যাকামো তোদের মানাচ্ছে না। তিনজন তিনটে নে। কথা শেষ!”
শেষ পর্যন্ত সহজ হিসেবেই সকলে মত দেয়। তিনজন তিন হাতে পড়ে নিল। ঠিক তখন খেয়াল গেল শিরীনের দিকে। নিশি বলে উঠে,
“শিরীন, তোমার লাগবে না?”
শিরীন দুদিকে মাথা দুলিয়ে জবাব দিল, “না না।”
“আরেহ নাহ কেন? আমারটা নাও।”
শিরীন জবাব দেয়, “দরকার নেই। আমার হাতে চুড়ি আছে।”
রাত্রি বলল, “একটা বেশি আনা উচিত ছিল। ধুর!”
“আপনারা প্লীজ মন খারাপ করবেন না। আমি সত্যিই কিছু মনে করিনি।”
ফরহাদ বিরক্ত হয়ে সরে গেল সেখান থেকে। করিডোরের দিকে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়ায়।
মধ্যিখানে সামির চেঁচাচ্ছে। তার কাজই তো এটি। হুটহাট গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে ওঠা। নয়তো কথার মাঝে নিজের বাজে কথা শুরু করা। তাছাড়া সে হয়তো আর কিছুই পারেনা। এবারও কেঁচি খুঁজছে। কেঁচি খুঁজে খুঁজে হয়রান। পেলো না। শিরীন তার অবস্থা দেখে বলল,
“আমি ক্রাফট রুম থেকে নিয়ে আসছি। আপনি শান্ত হোন।”
শিরীন ক্রাফট রুমের দিকে এগোলো। এই শহরে দুপুর গড়িয়ে বিকেল নেমেছে। সূর্য হেলে পড়েছে পশ্চিমাকাশে। সাথে রোদের উষ্ণতা পুরোপুরি বিদায় নিল। শীতলতা ফের আধিপত্য বিস্তারে তৎপর। ক্রাফট রুমের ডান দিকে চার নাম্বার শেলফে। তার হাত যাবেনা সেখানে। শিরীন ছোট কাঠের স্টুল টেনে নেয়। সেখানে দাঁড়িয়ে কেঁচি নামাতে যাওয়ার পূর্বেই এক হাত এসে সেই বক্স নামিয়ে নেয়। শিরীন খানিক ভয় পেয়ে গেল। হুট করে এভাবে কে হাত এগোলো? তড়িঘড়ি করে নিচে নেমে দেখল ফরহাদকে।
“পড়ে গেলে কী হতো, হুম?”
শিরীন তেরছা জবাব দিল, “কিছুই হতো না।”
ফরহাদের চোখের আকৃতি ছোট হয়ে আছে। ক্ষুদ্র নয়নে চেয়ে পর্যবেক্ষণ করলো শিরীনের মুখ। ফট করে প্রশ্ন করল,
“আপনি কি রেগে?”
রেগে নয়তো কী? তার সাথে এমন দুমুখো আচরণ করলে কি তার খুশি থাকার কথা? শিরীনের রাগ হলো। কাটকাট গলায় অন্যদিকে ফিরে বলল,
“আমি জানি আমি আপনাদের মতো নই। আপনারা প্রাণবন্ত আর আমি একগুঁয়ে। আপনারা উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েন, আমি ঠিকঠাক হাসতেও জানি না। আপনাদের মাঝে আমি ভীষন বেমানান। কিন্তু এটাই আমার ব্যক্তিত্ব। সবাই এক্সট্রোভার্ট হয়না। কিছু মানুষ আমার মতো ইন্ট্রোভার্টও হয়। তারপরও আমি চেষ্টা করছি আপনাদের সাথে তাল মেলানোর। কিন্তু আমার মনে হয় আপনি ভিন্ন আচরণ করছেন। এই মুহূর্তে আমার সাথে যেইভাবে কথা বলছেন, সেই ভাবটা আপনার বন্ধুদের সামনে থাকেনা। হয়তো তাদের সামনে আমার মতো একজন গাইয়া মেয়ের সাথে কথা বলতে লজ্জাবোধ করেন। আপনার সম্মানের ভয়ে তাই না?”
ফরহাদের চোখ কপালে উঠে। মেয়েটি এক বাক্যের বেশি কথাও বলতে জানে? আগে তো জানতো না। রাগও দেখাচ্ছে আবার। নীরবে অবাক হলো ফরহাদ। ফোস করে নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
“ভুল ধারণা।”
ফরহাদের দিকে তাকিয়ে শিরীন জিজ্ঞাসা করে, “সঠিক ধারণাটা কী জানতে পারি?”
“অবশ্যই পারেন। তার আগে একটা কথা বলি?”
“বলে ফেলুন।”
“সুন্দর লাগছে আপনাকে।”
যে দৃষ্টি আবার ফিরিয়ে নিয়েছিল সেটি তৃতীয়বারের মতো ফরহাদের দিকে গেল। এই প্রশংসা আশা করেনি। তারপরও যেহেতু করেই ফেলেছে শিরীন ছোট করে বলল,
“ধন্যবাদ।”
“সঠিক ধারণা জানানোর আগে আরেকটি কাজ বাকি।”
“কী?”
পাঞ্জাবির পকেট থেকে একজোড়া রজনীগন্ধার গাজরা বের করল ফরহাদ। শিরীন হতবাক হয়ে চেয়ে রইল সেদিকে। মালা এলো কোথা থেকে? ফরহাদ এনেছে? তার জন্য? প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে। ততক্ষণে ফরহাদ এগিয়ে আসে। বলে,
“অনুমতি দিন পরিয়ে দেওয়ার। দয়া করে না করবেন না। আর নিশ্চিন্তে থাকুন, আপনার হাতে আমার হাতের স্পর্শ লাগবে না। শুধু পরিয়ে দেব। কেন দেব সেটাও নাহয় বলেই দেই, আপনি একহাত দিয়ে অন্যহাতের গাজরা বাঁধতে পারবেন না।”
হা হয়ে শুনল শুধু কথাগুলো শিরীন। আবার অনুমতি চাইছে! এবার যে দোটানায় পড়ে গেল? তার কী হবে? ফরহাদ জানে শিরীন অনুমতি দেবে না। তাই বলল,
“দেবেন নাকি এই রুমে আটকে রেখে চলে যাব?”
“হুমকি দিচ্ছেন? আমি ভয় পাই না।”
“বেশ সাহসী আপনি। তাহলে হাত এগিয়ে দিন।”
“দরকার নেই আমার।”
“আমার দরকার, ভীষণ দরকার।”
ঘোর লাগা কণ্ঠে আকস্মিক রুহ কেঁপে উঠে শিরীনের। আচ করতে পারছে আসন্ন পরিস্থিতির। আন্দাজ করতে পারছে ফরহাদকে। কিন্তু কী করবে? কী করা উচিত তার? পালাবে? নাকি থাকবে?
“হাতটা দিন, কেউ এসে পড়লে বিষয়টা খারাপ দেখাবে।”
শিরীন আপনাআপনি হাত এগিয়ে দিল। ফরহাদ হাসে। নিরাপদ দুরত্ব রেখে গাজরার সুতোতে গিট দিতে দিতে বলল,
“আবার খুলে ফেলবেন কিছু সময় পর। ওদের সামনে পড়ে যাওয়ার দরকার নেই।”
“আবার দ্বিমুখী আচরণ!”
ফরহাদ সামান্য শব্দ করে হাসলো। বলল,
“ভুল ধারণা সঠিক করি?”
শিরীন কোনো জবাব দিল না। অবচেতন মন জানতে চাইছে সেই সঠিক ধারণা। কিন্তু মুখে প্রকাশে অদৃশ্য বাঁধা। লোকটাকে নিয়ে হুট করেই ভাবতে ইচ্ছে হচ্ছে। আবার সেই ভাবনা দূরে ঠেলে দিতেও ইচ্ছে হচ্ছে। ফরহাদ দুহাতে গাজরা পরিয়ে দিয়ে বলল,
“আমার প্রিয় কেউ যে আমার কতটা প্রিয়, সেটা কেউ না জানুক। কেউ নজর না দিক, কেউ হেয় না করুক। আমার প্রিয় কেউ আমার একান্ত প্রিয় হয়েই থাকুক, নীরবে, নিভৃতে, যতনে।”
চলবে…
Leave a comment
Your email address will not be published. Required fields are marked *