Buy Now

Search

এই শহরে [পর্ব-০৫]

এই শহরে [পর্ব-০৫]

Who ever loved that loved not at first sight?” 
অর্থ, “যে কেউ ভালোবেসেছে, সে কি প্রথম দেখায় ভালোবাসে নি?” 
ক্রিস্টোফার মার্লো তার ‘Hero and Leander’ কবিতায় এই প্রশ্নটি রেখে গিয়েছিলেন। কবিতাটি প্রকাশ পায় ১৫৯৪ সালে। দুর্ভাগ্যবশত মার্লো তখন আর বেঁচে নেই। তিনি প্রথম দর্শনে ভালোবাসার সম্পর্কে মানুষকে অবগত করেন। মানুষের মনে হয়তো তখন প্রশ্নের ঝড় উঠে। হয়তো মিলিয়ে নেয় তার এই প্রশ্নকে নিজের জীবনের সাথে। 
হুট করে কোনো শীতল সন্ধ্যায় কারো ছোটখাটো বৈশিষ্ট্য কী কখনও কাউকে আকর্ষণ করেনি? কখনও এক অগোছালো অনুভূতির ঝাপটা এসেছে অন্তরস্থলে আছড়ে পড়েনি? হুট করে কোনো এক অজ্ঞাত মানুষ সামনে এসে হাজির হলো, তার দিকে চেয়ে থাকতেই ইচ্ছে হয়। যেন দৃষ্টি চুম্বকের মতো টেনে ধরে আছে সামনের মানব অথবা মানবী। কখনও সম্মুখে থাকা মানুষটির চোখ মনোহারী ঠেকেনি? কখনও হাসিতে বুকের ভিতর ঝড় ওঠেনি? কখনও তার কথা শুধু শুনে যেতেই ইচ্ছে জাগ্রত হয়নি? হয় না এসব? অবশ্যই হয়। 
মানবজাতি সেটিকে সংজ্ঞায়িত করতে পারেনি। সেখানে ক্রিস্টোফার মার্লো সেই প্রথম দৃষ্টিতে সৃষ্ট অনুভূতির নাম দিলেন ‘ love at first sight ’। মানুষ যখন ভাবনার সমুদ্রে ডুবে তখন উইলিয়াম শেক্সপিয়ার তাদের এই ভাবনাকে তার ‘ As you like it” নাটকে জনপ্রিয় করে তোলেন। 
1990 Cafe তে বসে বিষয়টি জানলো ফরহাদ। টেবিলের উপর হাত মুড়িয়ে রেখেছে। থুতনী সেই হাতের উপর ঠেকিয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে গুগলে সম্পূর্ণ বিষয়টি পড়ে সে। আজকাল লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট ধারণাটি তাদের সমাজে বহুল প্রচলিত। তার অভ্যন্তরে যা ঘটছে, সেটি লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইটের চেয়ে কম কিছু নয়। 
মাথা চুলকিয়ে ভারী নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “হাহ! গেলাম ফেঁসে!” 
অলসতা ধরে আছে প্রতি অঙ্গে। আজ ক্যাফেতে মানুষের ভীড় কম। ঠিক তেমনইভাবে শীতও মোটামুটি আজ। লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট রোগে আক্রান্ত ফরহাদের মন বসছে না আপাতত। শিথীল হয়ে আছে মন-মস্তিষ্ক। ঠিক তখনই বন্ধুদের গ্রুপে মেসেজ এল। মেসেজটি দিয়েছে রেশমা, 
“২০২৫ পিঠা উৎসবে আমরা স্টল দিচ্ছি।” 
তার বার্তার বিপরীতে শাহেদ শুধায়, “তোরা পিঠা বানাতে জানিস?” 
রেশমা উত্তর দেয়, “জেনে নিব। ইউটিউব দেখে দেখে বানাব।” 
সামির টিপ্পনী কেটে বলল, “ওই পিঠা মুখে দেওয়ার মতো হবেনা।” 
বর্তমানে ইমোজির ব্যবহার হয়। এটি রাগ, অভিমান, খুশি আর অন্যান্য অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যম মাত্র। ফোনের অন্যপাশে মানুষটি কেমন মেজাজে আছে সেটি তো আর কেউ জানেনা। জানানোর উদ্দেশ্যে ইমোজির ব্যবহার হয়। রাগের ইমোজি ব্যবহার করে রেশমা বলল, 
“তোর মুখ সেলাই করা উচিত। একটা ভালো প্ল্যান করছি, সেখানেও তোর বাগড়া কেন দিতে হবে?” 
সামির জবাবে লিখেছে, “রিয়ালিটি চেক দিলাম, ব্রো।” 
নিশি বলল, “থামবি তোরা? আগামীকাল ক্লাসে আয় ডিসকাস করব।” 
সবাই থাম্বস আপ দিল। অর্থাৎ সবাই রাজি। সেখানেও নিরুত্তর ফরহাদ। প্রতিটি মেসেজ পড়লেও জবাব দেওয়ার মতো ইচ্ছে নেই। উদাসীন মন আজ তার। আকাশের ধূসর মেঘমল্লার দেখতে ভালো লাগছে। সাথে গানের সুর, 
“ছিল ভাবে ভরা দুটি আঁখি চঞ্চল 
তুমি বাতাসে উড়ালে ভীরু অঞ্চল 
ওই রূপের মাধুরী মোর সঞ্চয়ে রেখেছি 
আমি দূর হতে তোমারেই দেখেছি 
আর মুগ্ধ এ চোখে চেয়ে থেকেছি” 
একজন প্রবীণ পুরুষের আবদারে ক্যাফেতে গানটি চলছে। সে তার স্ত্রীকে নিয়ে এসেছেন কফি ডেটে। আজ তাদের আটচল্লিশ তম বিবাহ বার্ষিকী। দুজনের চোখে আজও সেই পুরোনো প্রেম উজ্জ্বল। ফরহাদ আড়মোড়া দিয়ে উঠল। রেড ভেলভেল পেস্ট্রি কালো রংয়ের ট্রে- তে সাজিয়ে তাদের টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, 
“শুভ বিবাহবার্ষিকী। আপনাদের একসাথে পথ চলা আরও দীর্ঘ হোক, ভালোবাসায় এক চুল কমতি না আসুক, এই কামনা করছি।” 
দুজনেই হাসলেন ফরহাদের আন্তরিকতায়। একত্রে বলে উঠেন, ‘ ধন্যবাদ ’। কিন্তু পেস্ট্রি দেখে অবাক হলেন। পুরুষটি বলে উঠেন, 
“আমরা তো পেস্ট্রি অর্ডার করিনি।” 
ফরহাদ হেসে বলল, “এটা আমার তরফ থেকে কমপ্লিমেন্ট্রি, স্যার। ইনজয় করুন।” বলে সরে গেল ফরহাদ। 
বেজায় খুশি হলেন তারা। প্রবীণ মুখের হাসি হৃদয় জুড়ে স্বস্তি দিতে থাকল ফরহাদের। ছোট ছোট সুখ মানুষ, মানুষের মাধ্যমেই পায়। উজাড় করতে কার্পণ্য বোধ কেন? অসুখের পৃথিবীতে সুখের দাম লাখ টাকা। আবার কখনও বিনা মূল্যেই পাওয়া যায় এই অমূল্য আনন্দ। শুধু বিলিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া জানতে হয়। 
_____ 
ক্লাস রুমে ঢুকার পূর্বেই নিশি শিরীনের হাত খপ করে ধরে ফেলল। শিরীন হতবাক হয়ে তাকায়। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে কিছু জানতে চাওয়ার পূর্বেই নিশি বলে উঠে, 
“ক্লাসে যেও না আজ। ক্রাফট রুমে চলো।” 
তারা দুরন্ত পাখির ন্যায়। সময় নেয় না ভাবনার। উড়তে থাকে মগ্ন হয়ে। ঠিক তেমনই আচরণ তাদের, ছটফটে। বলা মাত্রই তাকে এক প্রকার টেনেই নিয়ে গেল পাঁচ জনের দল। তাদের মধ্যে আরেকজনের অনুপস্থিতি অনুভব করল শিরীন। ফরহাদ লোকটা কোথায়? এত গায়েব থাকে কেন সে? কখনও কখনও বন্ধুদের সাথে চিপকে থাকতে দেখা যায়, আবার কখনও অদৃশ্য। 
রেশমা, শাহেদ, রাত্রি, নিশি, সামির ও শিরীন বিশাল ক্রাফট রুমে হাজির হলো। এত বড় রুম দেখে চক্ষু চড়কগাছ শিরীনের। এতদিন এই জায়গায় তার আগমন হয়নি। একগুঁয়ে হওয়ার কারণে হয়তো পুরো ক্যাম্পাসটাও ঘুরে দেখা হয়নি। ক্রাফট রুমের অন্দরমহলে বড় বড় ডেস্ক, প্রপ, রং, ব্যানার, ড্রাম, গিটার আরোও অনেক অনেক জিনিস। শিরীন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্র্যাজুয়েশন করেনি। নিজেকে নিজে সান্ত্বনা দিল, ‘ না জানাটাই স্বাভাবিক।’ তার ভাবনা ভেদ করে নিশি বলল, 
“কালকে পিঠা উৎসব। আমরা এবার স্টল দিচ্ছি। আর শিরীন শোনো, তুমিও আমাদের টিম মেম্বার। বলো কী কী পারো?” 
শিরীন লজ্জায় মাথা নুয়ে ফেলে। বলে, “কিছুই তো পারি না।” 
রাত্রি শিরীনের নত মুখ দেখে বলে, “আচ্ছা ব্যাপার না। শিখিয়ে দিব। তুমি এমন মনমরা হয়ে থাকবে না। বি একটিভ।” 
সবাই যার যার কাজে ব্যস্ত। সেখানে নিজেদের সব সরঞ্জাম নিয়ে বসেছে ফরহাদের বন্ধুমহল। তবে অপ্রত্যাশিতভাবে শিরীনের মন খুঁজল ফরহাদকে। এখানে উপস্থিত সবাই, সে নেই কেন? এই জিজ্ঞাসা বারবার মনে আসছে। আশপাশে থাকা শিক্ষার্থীদের মধ্যে একবার চোখ ফিরিয়ে দেখল। সে আছে কী? নাহ! নেই, কোথাও নেই। পাঁচজনের মাঝে চুপচাপ বসে রইল। 
“কী কী পিঠা বানাবি বল? আর স্টলের নাম কী দিব?” 
অকস্মাৎ উড়ে এসে জুড়ে বসার ন্যায় ফরহাদের উপস্থিতি ঘটে। এতক্ষণ সন্ধানে লিপ্ত নেত্রের খোঁজ থামলো। শিরীন আগ্রহ নিয়ে তাকালো তার দিকে। পরনে নেভি ব্লু কালারের উলের সোয়েটার, গলায় চেক মাফলার পেঁচানো। পা ভাঁজ করে জমিনে বসে এলোমেলো চুলগুলো ঠিকঠাক করে নিচ্ছে। একবার তাকালোও না শিরীনের দিকে। 
দুহাত ঘষতে ঘষতে ফরহাদ সবার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুঁড়ে, 
“প্ল্যান কী?” 
শাহেদ বলল, “কোনো প্ল্যান নেই আপাতত। হাতে সময় অল্প। আমি ফরহাদ সামির রাতে স্টল ডেকরেট করে ফেলতে পারব। কিন্তু পিঠার দায়িত্ব কে নেবে? তোরা তো কেউই পিঠা বানাতে জানিস না।” 
শিরীনের চোখ চকচক করে উঠে। মনে এক আকাঙ্ক্ষা এসে হাজির হয়। বলা উচিত নাকি অনুচিত এই দুইয়ের মাঝে ফের আটকে গেল। বন্ধুদের নজর এড়িয়ে ফরহাদ একবার দেখল শিরীনকে। অল্পতে সাধ মিটছে না, কিন্তু কী করার? 
“আচ্ছা.. আমি একটা কথা বলতে চাচ্ছি।” 
কণ্ঠটি কানে এসে ধাক্কা খেল সঙ্গেসঙ্গে। ফরহাদের শ্রবণইন্দ্রিয় সজাগ হল অবিলম্বে। সে শুনতে চায় শিরীনের প্রতিটি কথা। তার আরামদায়ক শব্দধ্বনি মনোমস্তিষ্কে ধারণ করবার নীরব আবেদন জানাচ্ছে যেন। 
নিশি উৎসাহের সহিত বলে, “হ্যাঁ, বলো।” 
শিরীন আমতা আমতা করে বলল, “আমার মা খুব ভালো পিঠা বানান। এসবের প্রতি তার ব্যাপক আগ্রহ, এক বসায় অনেক পিঠা বানিয়ে ফেলেন। ক্লান্তও অনুভব করেন না। আপনারা যদি চান তাহলে স্টলে মায়ের হাতের….” 
সামির তালি দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল, “আরিব্বাস! তাহলে তো হলোই। এসব আনাড়িদের উপর আমার এক চুল ভরসা নেই।” 
নিশি বলল, “দারুন আইডিয়া। কিন্তু আন্টি এত পিঠা বানাতে পারবেন একা? ওনার কষ্ট হয়ে যাবে না তো?” 
“আমি সাহায্য করলে পারবেন।” 
রাত্রি বলল, “শুধু তুমি কেন? আমরাও করব। এতে আমাদের শেখাও হবে। কী বলিস?” 
কথার প্রসঙ্গে রেশমা জানতে চায়, “আমরা তোমাদের বাড়ি গেলে কোনো সমস্যা হবে?” 
শিরীন মৃদু হেসে মাথা দোলায়। কন্ঠে সামান্য উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলল, “কোনো সমস্যা হবে না। বরং মা আরও খুশি হবেন।” 
“তাহলে যাওয়া যাক?” শাহেদ প্রশ্ন করে। 
ছেলেদের যাওয়াটা মা কীভাবে নিবে শিরীনের জানা নেই। এই দলে শুধু মেয়ে নয় ছেলেও আছে সেটা মাথায় ছিল না শিরীনের। ঠোঁট কামড়ে ভাবল একবার। আগে মা’ কে জিজ্ঞেস করা উচিত। সে বলল, 
“আমি মা’ কে একবার কল করে জানিয়ে আসি?” 
“হ্যাঁ অবশ্যই।” 
শিরীন উঠে গেল করিডোরের দিকে। ফরহাদ মশগুল ফোনে। সব কথা খুব মনোযোগ দিয়েই শুনেছে ফোনে মগ্ন থাকার ছুতোয়। চোখ ফোনে কিন্তু মন শিরীনের দিকেই ছিল। ভালোই হলো তার জন্য। একবার শিরীনের বাড়িটা দেখে আসা হবে। 
শিরীন শোভা বেগমকে কল করে জানালো বিষয়টি। তিনি বললেন, 
“আমার তো কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু তোর চাচী?” 
শিরীন জবাবে বলে উঠে, “মা, ওরা অন্যরকম। আমার ওদের মধ্যে নিজেকে খাপছাড়া মনে হয়। এখন যদি না করে দেই কেমন দেখাবে?” 
“আমি খুব খুশি হবো বাচ্চারা এলে। কিন্তু…” 
শিরীন উদাস সুরে শুধায়, “না করে দিব?” 
শোভা বেগম কিছু মুহূর্ত সময় নিলেন ভাববার জন্য। ভাবলেন তারা এলে ঘরেই বসাবেন। শিরীনের চাচীর নজর থেকে বাঁচিয়ে। তিনি ভেবে চিন্তে বললেন, 
“নিয়ে আয়। আজ আমি খুদের ভাত করব ভেবেছিলাম। এখন মনে হচ্ছে বেশীই রান্না করতে হবে।” 
শিরীন একগাল হাসল। খুশি হয়ে বলল, “ঠিক আছে মা।” 
বলে ফোন কেটে ফের ক্রাফট রুমে ফিরে আসে। ফরহাদ এবার ঘাড় তুলে তাকালো তার দিকে। বাকিরাও জবাব জানার আশায় তাকিয়ে আছে। শিরীনের মুখ জুড়ে উচ্ছ্বাসের ছাপ। সে বলল, 
“মা রাজি হয়েছেন।” 
সবাই খুশি হলো। ফরহাদ যেন একটু বেশীই খুশি হল। কিন্তু প্রকাশ করা বারণ। তার মনের হালত কাউকে বুঝতে দেওয়ার সুযোগ নেই। 
“কথা ছিল বই ফেরানোর অজুহাতে পলাশীতে আরও এক কাপ চা খাওয়া হবে। কই? হলো না তো।” 
সরু ফুটপাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে মেসেজ এলো। মেসেজটি করেছে ফরহাদ। যেকিনা তার চেয়ে দু কদম এগিয়ে মাত্র। এত কাছাকাছি থেকে মেসেজ কেন করতে হবে? শিরীন কী জবাব দেবে আর? কিছুই তো বলার নেই। এর উত্তর কীই বা হতে পারে? সরাসরি প্রত্যাখ্যান নাকি নাকি মঞ্জুরি? সে জানে না। জবাব না পেয়ে হতাশ ফরহাদ। এক লম্বা দীর্ঘশ্বাসে হাওয়ায় মিশিয়ে দিল সেই হতাশা। 
কিছু পথ হেঁটে শিরীনদের বাড়ির সামনে উপস্থিত সবাই। বাড়িটা দেখে কিছুটা অবাক হলো ফরহাদ। একটি মাত্র ঘর। সামনেই ছোট নামমাত্র উঠোন। ছটফটে সামির শান্ত হলো। সকলেই ভদ্রতার সহিত শোভা বেগমকে সালাম জানিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। তিনি হাস্যজ্জ্বল মুখে বললেন, 
“খুব খুশি হয়েছি এসেছো।” 
নিশি বলে উঠে, “আন্টি, আমরা কী ভেবেছি জানেন? এবারের পিঠার স্টলের নাম আপনার নামে হবে।” 
শোভা বেগম হেসে বললেন, “আরেহ নাহ। তা কী করে হয়?” 
সামির বলল, “কেন হবে না? আলবৎ হবে! আপনি আপনার নামটা বলুন।” 
শোভা বেগম ঠোঁট টিপে হেসে বললেন, “শোভা।” 
শাহেদ বলল, “তাহলে ডান। শোভা পিঠা ঘর। এটাই আমাদের পিঠা স্টলের নাম হবে।” 
সকলেই সম্মতি দেয়। ফরহাদও জোরপূর্বক হাসলো। কেমন একটা অস্বস্তিভাব ঘিরে ধরছে তাকে। হুট করে শিরীনদের বাড়ি চলে এলো? সেদিনই তো তার মায়ের হাতের পিঠা চেয়ে খেয়েছিল। এখানেও নীরব সে। সবার কথা নির্বিকার শুনছে। কিছু বলার মতো খুঁজেই পাচ্ছে না। 
তখন শিরীন বলল, “আমি সবার জন্য চা করি।” 
চায়ের বড্ড দরকার ছিল। সবাই শোভা বেগমের সাথে বসে লিস্ট করতে শুরু করেছে। কী কী আনতে হবে? পাটিসাপটা, পুলি পিঠা, দুধপিঠা হবে। সাথে কিছু মিষ্টি জাতীয় কেনা খাবার। এসব পিঠা আগে বানালে নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয় থাকায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো সব কাজ আজই এগিয়ে রাখা হবে। আগামীকাল সকাল সকাল দলের তিন নারী এসে পিঠা ভেজে স্টলে নিয়ে আসবে। শোভা বেগম রাজি হলেন। কী কী সরঞ্জামের প্রয়োজন সেসব লিস্ট সামির ফরহাদ আর শাহেদের কাছে ধরিয়ে দিল তারা। 
“আপনি হয়তো চা প্রেমী। পলাশীতে না হোক, আমার ছোট ঘরে এক কাপ চা নাহয় খান।” 
মেসেজটি ফোনে আসতেই আকাশ থেকে পড়ল ফরহাদ। জবাব আশা করেনি সে, এই ধরনের জবাব তো মোটেই নয়। অস্থিরতা এক লাফে তুঙ্গে উঠল। মুখ ফিরিয়ে একবার দেখতে চাইল শিরীনের মুখখানা। তখনই এক মহিলার কর্কশ আওয়াজ ভেসে উঠে। 
“ছিঃ ছিঃ! আজকাল এ বাড়িতে পর পুরুষও ঢুকে নাকি? জোয়ান অবিবাহিত মেয়ে ঘরে রেখে এসব?” 
লজ্জায় নতজানু হয়ে গেলেন শোভা বেগম। শিরীন চায়ের ট্রে হাতে নিয়ে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে। উঠোনের অন্যপাশ থেকে নোংরা বাক্যগুলো ভেসে আসছে। সকলেই তব্দা খেয়ে গেল। বুঝে উঠতে পারল না এই পরিস্থিতিতে কী করা উচিত। 
“এই কারণেই তো মেয়ের বিয়ে হয়না। আমার মেয়ে আজ অব্দি কোনো পুরুষের দিকে চোখ তুলেও তাকায়নি। তাইতো ভালো ঘরে কুড়ির আগেই বিয়ে হচ্ছে।” 
ফরহাদের কপালের রগ আচমকা ভেসে উঠে। রাগ তরতর করে মাথায় চড়াও হয়। হাত মুষ্টিবদ্ধ করে তাকাল শিরীনের দিকে। সবাইকে তাক লাগিয়ে হাত এগিয়ে বলল, 
“চা খাওয়াবেন না? দিন, ঠান্ডা হয়ে যাবে তো।” 
গরম চা গটগট করে গিলছে ফরহাদ। শিরীন বাকিদের চা দিয়ে লক্ষ্য করল ফরহাদের অগ্নিশিখার মতো চোখজোড়া। ফোস ফোস করে নিঃশ্বাসের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে সে। তখনও শিরীনের চাচীর টিটকারী থামেনি। সবাই তাকে এড়িয়ে গেলেও শিরীন- ফরহাদ কেউই পারছে না। চা খেয়ে ফোন হাতে তুলল ফরহাদ। মেসেজ বারে গিয়ে লিখল, 
“যদি এই মহিলার কথার উচিত জবাব না দিন তাহলে আমি ভেবে নিব আপনি একটা লুজার, একটা ভীতু মেয়ে।” 
এমন মেসেজ পেয়ে চোখজোড়া গোলগোল হয়ে গেল শিরীনের। ফরহাদ ফের মেসেজ পাঠায়, 
“আপনি কিছু বলবেন নাকি আমি বলব? আমার মাথা বিগড়ে গেলে ভুলভাল বলে ফেলব কিন্তু!” 
তখনও শিরীনের মধ্যে কোনো নড়চড় নেই। ফরহাদ ফের মেসেজ লিখে, “এক থেকে তিন গুনব। জবাব দেবেন নয়তো আমি গেলাম!” 
ভয় পেয়ে গেল শিরীন। দেখে মনে হচ্ছে এক ক্ষ্যাপা ষাঁড় বসে আছে। কী মুশকিল! ফরহাদ রাগান্বিত চোখে তাকায় শিরীনের দিকে। এই বুঝি উঠে গেল! শিরীন কদমের গতি বাড়ালো। সবাইকে তাক লাগিয়ে চাচীর উদ্দেশ্যে বলল, 
“কিছু মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে যাওয়াই ভালো, চাচী। বেশি বয়স হলে কূটনী মহিলার মতো এবাড়ি-ওবাড়ি গিয়ে মানুষের বদনাম করার স্বভাব জন্মায়। আমি শিলার জন্য ভীষণ খুশি। এ বাড়িতে থেকে আর ম্যাট্রিক পাশ করেও তো ভালো কিছু শিখতে পারেনি, দুয়া করি ভালো ঘরে গিয়ে ভালো আদব শিখুক।” 
অবিশ্বাস্য চোখে চেয়ে রইলেন শোভা বেগম। তার মেয়ে তো এটি? চুপচাপ, একগুঁয়ে মেয়েটি আজ জবাব দিয়েছে? নিজের কানকে বিশ্বাস করাতে পারলেন না তিনি। ফরহাদের ঠোঁটে তখন বিশ্বজয়ের হাসি। সকলেই মিটিমিটি হাসছে। নিশি আলগোছে বলে উঠল, 
“শাবাশ!” 
শিরীনের চাচীর মুখ একবারে বন্ধ হয়ে গেছে। মহিলা নিঃশ্বাস নিচ্ছেন কিনা সন্দেহ। শিরীন রীতিমত হাঁপাচ্ছে। ভয়ে ভয়ে বলে ফেলেছে। কিন্তু এবার? এর পরিণাম কী হবে? জানা নেই তার। সম্পূর্ণ মস্তিষ্ক খালি তার। ফরহাদ বার্তা পাঠালো মুঠোফোনে, 
“আ’ম প্রাউড অফ ইউ। 
বায় দ্যা ওয়ে চা- টা দারুন হয়েছে। দুধ চিনি কম লিকার বেশি। কিছুটা আমার মায়ের হাতের স্বাদ। তবে সম্পূর্ণ নয়। আপনারটা আপনার মতো পারফেক্ট! আরেক কাপ পাওয়া যাবে, রূপা?” 
চলবে…

Olindo Rahman

Olindo Rahman

A good book is worth a hundred good friends. 
But a good friend is equal to a library.!! 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Your experience on this site will be improved by allowing cookies Cookie Policy