শিলার গালে চড় পড়তেই উত্তপ্ত পরিবেশ ঠাণ্ডা হয়ে গেল। আজ সূর্য উঠেছে পূর্ব আকাশে। শীতের মাঝে হালকা উষ্ণতা যেন স্বস্তির ছোঁয়া। কিন্তু সেই স্বস্তি কি সবার ভাগ্যে সয়? পুরো ঘর এলোমেলো করেছে শিরীনের বড় চাচা, চাচী আর তাদের সন্তান শাফিন ও শিলা। সেদিনের অপমানের প্রতিশোধস্বরূপ হিংস্র হয়ে উঠেছে তারা। মানুষ জানে, ‘অন্যের বেলায় আনা আধুলি, নিজের বেলায় ষোলো আনা।’ তবে নিজের মধ্যকার রাগ আর দমিয়ে রাখতে পারেনি শিরীন। মায়ের সাথে হওয়া অবিচার দেখে চরম সাহস দেখিয়ে চড় দিয়েছে শিলার ডান গালে। আক্রোশে ফুঁসে চেঁচিয়ে বলল,
“পুলিশ ডাকব আমি। পেয়েছেন কী আপনারা? আমার বাবা নেই বলে যা-তা করবেন, আর আমরা মাথা পেতে নিব? আমি পুলিশে জিডি করে এসেছি আসার সময়। আমার আর আমার মায়ের গায়ে যদি আঁচড়ও পড়ে, আপনাদের পুরো পরিবার জেলে যাবে।”
শোভা বেগম ঘরের এক কোণে বসে কেঁদে চলেছেন। বাড়ির আশপাশে মানুষ জড়ো হয়েছে। কী হয়েছে জানতে তারা ব্যাপক আগ্রহী। শিরীন তাদের সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
“দেখুন আপনারা এই চারজন আমার চাচা, চাচী আর চাচাতো ভাই-বোন। আমাদের প্রতিনিয়ত অপদস্ত করে যাচ্ছে। কারণ কী জানেন? তারা লোভী! আমার বাবা আমার নামে এই ছোট ঘরটি আর কিছু টাকা রেখে গেছেন। এই লোভী জানোয়ারদের এই টাকা আর ঘরের প্রতি লোভ। আজ আমি আপনাদের সাক্ষী রাখলাম। আমার মা ও আমার যদি কখনও ক্ষতি হয়ে যায় তার সমস্ত দায়ভার তাদের। আপনাদের মধ্যে যদি মনুষ্যত্ব থাকে এদের পুলিশের হাতে তুলে দিবেন। তাদের প্রতি আমার কোনো রহম নেই। তারা আমার আর আমার মায়ের জীবন যেমন নরক বানিয়েছে তেমন নরকে তারাও পুড়ুক।”
শিরীন হাঁপিয়ে উঠে কথাগুলো বলে। শরীরের দুর্বলতা নয়, এটি মনের দুর্বলতা। যা তাকে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে। মায়ের প্রতিটি অশ্রুদানা এসিডের ছিটের মতো লাগছে।
আশপাশের মানুষের হয়তো মা-মেয়ের প্রতি মায়া হলো। তারাও চেঁচাতে লাগলেন। কেউ কেউ এগিয়ে এসে বললেন,
“বাড়ি থেকে বের হও, নয়তো আমরাও পুলিশ ডাকব।”
এসব শিরীনের বাবার সৎ কর্ম ও সাহায্যের ফল। তিনি চলে যাওয়ার পর কিছু মানুষ মনে রেখেছেন তাকে। সেই সুবাদেই সহানুভূতি দেখাচ্ছেন রেখে যাওয়া শোভা বেগম ও শিরীনের প্রতি। কয়েকজন মহিলা ঘরে প্রবেশ করলেন বেশ অধিকারবোধ নিয়ে। বলাবলি করতে লাগলেন,
“ফজলু ভাই ভালো মানুষ ছিলেন। আমাদের কত সাহায্য করেছেন। শিরীন মেয়েটাও আমাদের চোখের সামনেই বড় হয়েছে। এদের সাথে অন্যায় তো মেনে নেওয়া যায় না…”
বলতে বলতেই ঘরের এলোমেলো ঘর নিজ হাতেই ঠিক করতে লাগলেন। হট্টগোল শেষে তোপের মুখে পড়ে শিরীনের চাচা-চাচী সেখান থেকে প্রস্থান করেছে। আশপাশের অনেকেই সান্ত্বনাবাক্য ছুঁড়ে যারযার বাড়ি ফিরে গেল।
শিরীনের সামনে ভাঙ্গা ড্রেসিং টেবিলের আয়না। সেখানে মুখখানা ও দেহবায়ব ফুটে উঠেছে। মাথার ভেতরে থাকা মস্তিষ্কের ওজন বেড়ে গিয়েছে মনে হলো। নিজেকে লাগল জমিনের উপর দাঁড়িয়ে থাকা এক ওজনদায়ক বস্তু। বস্তুই তো! তার মাঝে এখন কোনো অনুভূতি কাজ করছে না। অনুভূতিহীন সবকিছুই তো জড়বস্তু। তবে সে নয় কেন? শিরীন নিজের ভারী কদম এগিয়ে মায়ের সামনে হাঁটু মুড়িয়ে বসে আচমকা প্রশ্ন করে,
“তোমার কাছে আমি বোঝা?”
শোভা বেগম হু হু করে কেঁদে উঠেন। শিরীন মুখ ফিরিয়ে নেয়। কান্না তার সহ্য হয়না, একেবারেই না। সে দেখতে চায় না। শোভা বেগম বললেন,
“পৃথিবীর নিয়ম না হলে তোকে সারাজীবন আমার কাছেই রাখতাম। তুই আমার কাছে বোঝা না, আমার সঙ্গী।”
“তাহলে এত কীসের চিন্তা? বানিয়ে রাখো সঙ্গী।”
নিজের ভেজা চোখ নিজেই মুছলেন শোভা বেগম। জানে মেয়ের সামনে কাঁদা বারণ। তিনি বললেন,
“আর তোর সঙ্গী? আমার পর তোর একাকীত্বের সঙ্গী কে হবে? আমি তখন স্বার্থপর মা হয়ে যাব। নিজের একাকীত্ব কাটানোর জন্য মেয়েকে নিজের কাছে রেখেছি। মরে গেলে তোর পাশে কে দাঁড়াবে?”
“তুমি মরে গেলে আমায়ও তোমার সাথে নিও।”
এরূপ কোথায় শোভা বেগমের বুক কেঁপে উঠে। কী ভয়ানক কথা! সে কল্পনাতেও ভাবতে পারেন না মেয়ের মৃত্যুর কথা। তিনি মিথ্যে রাগ দেখিয়ে বললেন,
“চড় দিব এসব কথা বললে! তুই হাজার বছর বেঁচে থাক।”
পাথরের ন্যায় হয়ে গেছে শিরীন। প্রশ্ন, উত্তর এবং সে–সবটাই নির্জীব। শোভা বেগমের কথার জবাবে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল,
“কাকে নিয়ে বাঁচব? কে আছে আমার?”
“তোর জীবনে অবশ্যই কেউ আসবে। আমি তোর একটা কূল করে দিয়েই যাব।”
“তাহলে তুমি কী করে বাঁচবে?”
“আমার সময় বাকি আর কতটুকু?”
শিরীন এবার বাঁকা হয়ে বসলো। মায়ের কোলে মাথা রাখল। এই স্থানে ভিন্ন কিছু আছে। এইযে তার মাঝে পাথর খন্ডের ন্যায় হৃদয়টা? সেটি গলে মোম হবে মমতার পরশেই। সে কাঁদতে চেয়েও আটকে আছে। গলার মাঝে দলা পাকিয়ে আছে কান্না। যদি অশ্রু হয়ে গড়িয়ে না পড়ে? তাহলে হয়তো মারাই যাবে দম আটকে। শোভা বেগম শিরীনের চুলে বিলি কাটতে শুরু করেছেন। কিছু মুহূর্ত পর প্রশ্ন করলেন,
“তুই কী সত্যিই জিডি করেছিস?”
শিরীন অবসন্নতায় চোখ বুজলো। মিহি স্বরে জবাব দিল,
“করিনি, ভয় দেখিয়েছি। তবে করে রাখব। আমি এদের বিশ্বাস করি না।”
“তোকে দেখে অবাক হচ্ছি। আগে কখনও এই রূপ দেখিনি তোর..”
“আমি নিজেও অবাক হচ্ছি।”
“মাঝেমধ্যে রূঢ় হতে হয়।”
মেয়েকে সাহস দিয়ে বললেন শোভা বেগম। এই পৃথিবী শক্তের ভক্ত, নরমের যম। দূর্বলতা পেলে পিষে মারতে একদণ্ড ভাবে না। কচলে দিয়ে যায়।
এভাবেই কেটে যাচ্ছে মা, মেয়ের একান্ত সময়। শিরীন তার নীরবতা কাটিয়ে প্রশ্ন করল,
“সব সমস্যার সহজ সমাধান হয়না কেন, মা?”
_____
১৯৯০ ক্যাফের খয়েরী টিন্টেড গ্লাস বেয়ে বৃষ্টির ফোঁটা দাগ কেটে যাচ্ছে। জানুয়ারীতে সচরাচর বৃষ্টি হয়না। শীতকালে বৃষ্টি এক প্রত্যাশিত কান্ড। কিন্তু আজকাল আবহাওয়া মৌসুম মানেনা। নিজের মর্জি মোতাবেক চলে। এতে মানুষেরও দোষ নেই বললেও ভুল হবে। মানবজাতির কারণেই যত ঝুট ঝামেলা। আবহাওয়ার পরিবর্তন সব আধুনিকতার কারণে।
ফরহাদের চোখজোড়া ভার হয়ে আসছে। শরীরের তাপমাত্রার ঊর্ধ্বগতি ঠাওর করতে পারলো সে। ব্যাংক থেকে ক্যাফেতে আসার পথে অনিচ্ছায় বৃষ্টিতে ভিজতে হয়েছিল। মন খারাপ আর অসুস্থতা তো বলে কয়ে আসেনা। হুট করে এসে দরজায় কড়া নাড়ে। ঠিক এই সন্ধ্যার বৃষ্টির মতো। ফরহাদের নিঃশ্বাস উষ্ণ, মাথা ঝিমঝিম করতে শুরু করল।
গালে হাত রেখে গান শুনছে সামির। বিড়বিড় করছে গানের তালে,
“আকাশে ঘনালে মেঘ
বাকি পথ হেঁটে এসে
শেষ হয়েও পড়ে থাকি অবশেষে
নিভিয়ে দিয়েছি ফুরিয়ে গিয়েছি
ডুবিয়েছি কত ভেলা
প্রেমিক নাবিক জানেনা সাগর
একা রাখা অবহেলা
তুমি যাও
বলে যেও গো আমাকে
বাড়ি ফিরে এসো সন্ধ্যে নামার আগে…”
ফরহাদ সামিরের দিকে তাকাল। অসুস্থতা যে তাকে গ্রাস করছে, সেটি বুঝতে পেরে সামিরের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল,
“সামলা, আমি বাড়ি যাচ্ছি।”
ফরহাদের কণ্ঠের ভিন্নতা টের পেয়ে রিমোট টিপে গান বন্ধ করলো সামির। সরাসরি তাকালো তার দিকে। চোখজোড়া লাল টকটকে হয়ে গেছে। কেমন যেন রুগ্ন চেহারা। সামির চিন্তিত স্বরে প্রশ্ন করে,
“কী হয়েছে বন্ধু?”
“জ্বর আসবে বোধহয়। ভালো লাগছে না, বাড়ি যাব।”
শাহেদ স্যান্ডুইচ বানাচ্ছিল। ফরহাদের অসুস্থতার খবরে তার দিকে এগিয়ে এল। বলল,
“জ্বর আসবে? দেখি।”
ফরহাদের কপালের চুলগুলো সরিয়ে দেখল শাহেদ। আসলেই গা গরম করছে। চোখের অবস্থা দেখে বোঝা গেল আসলেই জ্বর আসবে। শাহেদ বলল,
“সামির, ফরহাদের সাথে ওর ফ্ল্যাটে যা। আজ ওখানেই থাকবি। অসুস্থ অবস্থায় একা সব কী করে সামলাবে?”
ফরহাদের কাছে বিষয়টি উটকো ঝামেলা মনে হলো। কত দিন পেরিয়েছে অসুস্থতায় একাকী। নিজেকে সামলে নেওয়ার টেকনিক শিখে গেছে সে। এখন আর কাউকে প্রয়োজন হয় না। রাশভার স্বরে বলল,
“কোনো দরকার নেই। আই’ল ম্যানেজ।”
“নো ইউ কান্ট! সামির তোর সাথে যাচ্ছে। আর যাওয়ার পথে মোড়ের হোটেল থেকে রাতের খাবার নিয়ে যাবি। বাইক এখানেই থাকুক।”
অতশত কথা শুনতে তেতো লাগছে ফরহাদের। এই মুহূর্তে মনে হলো যা ইচ্ছা করুক, যে ইচ্ছে আসুক। সে শুধু বাড়ি গিয়ে বিছানায় পিঠ ঠেকাবে, ব্যাস! বিতৃষ্ণা নিয়ে দরজার দিকে এগোলো ফরহাদ। সামিরও ছাতা নিয়ে তার পিছু পিছু আসছে। পলাশীর পাশের কলোনীতেই থাকে ফরহাদ। ফ্ল্যাটে যেতে সময় লাগে পাঁচ মিনিট। দরজা থেকে বেরিয়ে আজ সামির নরম স্বরে প্রশ্ন করে,
“রিকশা নিব, বন্ধু? হেঁটে যেতে কষ্ট হবে না তো?
ফরহাদ সামিরের দিকে বিরক্তির সহিত চাইল। ভালো সাজা হচ্ছে! মুখভঙ্গি অদ্ভুত করে বলল,
“তোর এতো ভালোগিরি আমার ভালো লাগছে না। পারলে মাথায় তুলে নিয়ে যা।”
সামিরের মুখ কুঁচকে গেল। এজন্য ভালো কথাও বলতে নেই। ছাতা খুলে ফরহাদের মাথায় ধরে হাঁটতে লাগলো কলোনীর দিকে। বিড়বিড় করে অসুস্থ ফরহাদকে গালমন্দ করছে।
ভাতের হোটেল থেকে ভাত নেওয়ার সময়ও দিল না ফরহাদ। ধীরে ধীরেই এগিয়ে গেল সামিরকে পেছনে রেখে। সামির কোনো রকম বিল মিটিয়ে তার পিছু নেয়। রেগে বলল,
“অধৈর্য কোথাকার!”
দোতলায় থাকে ফরহাদ। সিঁড়িঘর ভূতুড়ে ধরনের। তবে ফ্ল্যাট তেমন নয়, একজন থাকার জন্য যথেষ্ট জায়গা আছে। দুজনেরও জায়গা হবে কিন্তু ফরহাদ চায় না কেউ থাকুক। রুমমেট থাকলে নাকি অন্যের সুবিধা অসুবিধার ধার ধারতে হয়। সে এসবে অনাগ্রহী।
জ্বরের মাত্রা বেড়েছে, ফরহাদ ওয়াশরুমে গেল চোখে মুখে পানি দিতে। সামির ড্রয়ার ঘেঁটে দেখতে লাগল থার্মোমিটার আছে নাকি? আগেও এখানে আসা হয়েছে তার। কোথায় কী থাকতে পারে মোটামুটি ধারণা আছে। বিছানার পাশের ড্রয়ারে থার্মোমিটার পেলো। ফরহাদ মিনিট পাঁচেক পর ঢুলতে ঢুলতে বেরিয়ে ধপ করে বিছানায় শুয়ে পড়ে। মাথায় ডান হাতের আঙ্গুল চেপে অন্যহাতে ফোন করল তার মা’ কে।
ভিডিও কলে ছেলের চোখমুখ দেখে সাথে সাথে ফাতেমা বেগম বললেন,
“কী হয়েছে তোর? শরীর খারাপ? মুখটা ছোট হয়ে আছে কেনো?”
ফরহাদ ছোট করে জবাব দিল, “জ্বর।”
ফোনের ওপাশে ‘জ্বর’ শব্দটি পৌঁছে গেছে। পাশে বসে রেজিস্টার চেক করতে থাকা ফখরুল সাহেব ফোন নিজের হাতে নিয়ে বললেন,
“শুনেছি ঢাকায় অসময়ে বৃষ্টি হয়েছে। নিশ্চয়ই ভিজেছো?”
ফরহাদ ভ্রু উচু করে জানতে চায়, “আপনি কীভাবে জানলেন বলুন তো?”
ছেলের জন্য সবদিকেই খেয়াল রাখেন ফখরুল সাহেব। খেয়াল রাখা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ওয়েদার ফরকাস্ট দেখে ফাতেমা বেগমকে জানান। ঠাণ্ডা বেশি হলে শীতের কাপড় যেন ঠিকঠাকমতো পরে, বৃষ্টি হলে যেন না ভিজে, গরম পড়লে যেন পানি সাথে রাখে। ফখরুল সাহেব ভ্রু কুটি করে বললেন,
“সব খবর আমার কাছে থাকে। তুমি নিজের খেয়াল না রাখতে পারলে চলে এসো বাড়ি। আর পড়ালেখা করা লাগবে না।”
“আর ব্যবসা?”
“বেঁচে দাও।”
“আপনি ভালো আছেন?”
ছেলের শীতল কণ্ঠে এহেন প্রশ্নে ফখরুল সাহেবের রাগ ক্ষীণ হয়ে আসে। জবাব দিলেন,
“আছি ভালো। কিন্তু তুমি তো ভালো নেই।”
“এইতো আপনাদের দেখলাম। ভালো হয়ে যাব।”
ফাতেমা বেগম ফোন কেড়ে নিলেন। বলতে লাগলেন, “খাবার খেয়ে ঔষধ খা। যদি না খাস আমিও খাব না বলে দিলাম। দ্রুত খেয়ে জানা।”
“আচ্ছা, মা। রাখি, খেয়াল রেখো।”
সামির থার্মোমিটার টুপ করে মুখে পুড়ে দিল। ফরহাদ চমকে উঠে। সাথে সাথে অনেক রাগ হলো তার। এমন করার মানে কি? সামির নিজের ঠোট তর্জনী আঙুল রেখে বলল,
“একদম চুপ। খাবার দিচ্ছি খাবি এখন।”
“ভালো লাগছে না।”
“আন্টিকে কল করি?”
ফরহাদ দাঁতে দাঁত পিষে বলল, “শা লা মেলোড্রামা কোথাকার!”
দুই লোকমা ভাত মুখে তুলতেই বিতৃষ্ণা জেগে গেল। শরীরে কম্পন ধরছে ক্ষণে-ক্ষণে। শেষ কবে এতটা অসুস্থ হয়েছে ফরহাদের জানা নেই। তখন হয়তো বাড়িতেই ছিল। মায়ের পাশে। আজ বন্ধু আছে। দিন-ক্ষণের হিসেব করতে করতেই কম্বল মুড়িয়ে কুঁজো হয়ে শুয়ে পড়ল ফরহাদ। চোখে অতিরিক্ত মাত্রায় জ্বলুনি ধরেছে। জ্বরের ঘোরে ডুবে ক্ষণিকের জন্য মনে এলো শিরীনের কথা। ফরহাদ চোখ খুলে তাকাতে চাইল একবার, কিন্তু পারলো না। পুরো ঘর আঁধারে ঢেকে। সামির পাশে শুয়েছে তার।
তার কথা এই মুহূর্তে কেন মনে এলো? না এলেই হয়তো বেঁচে যেতো। জ্বরের মাঝে শুধু জ্বর থাকতো, শিরীনের কণ্ঠের প্রয়োজনীয়তা তৃষ্ণা জেগে উঠল কেন? ঘুমটা একটু দ্রুত এলে ভালো হতো না? সারাদিন বহুবার ফোন করা হয়েছে। যতবার ফোন করেছে ততবারই অন্যপাশ থেকে এক নারী বলে উঠেছে, ‘এই মুহূর্তে আপনার কাঙ্ক্ষিত নাম্বারটিতে সংযোগ প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না।’ কী মুশকিল! তার কাঙ্ক্ষিত মানুষটিকেই তো তার চাই। কিন্তু সে কোথায়? তার কোনো হদিস নেই। বিড়বিড় করতে লাগল ফরহাদ। শেষে এক আকুতি ভরা বাক্য আওড়ায়,
“সন্ধ্যা নামার আগে যদি একবার আপনার মুখ দর্শন পেতাম, তবে জ্বরটাও নীরবে সেরে যেত।”
চলবে…
Leave a comment
Your email address will not be published. Required fields are marked *