কম্বল মুড়িয়ে বসে আছে শিরীন। বিছানার এককোণে বসে সামনে নিউজপেপারে মোড়ানো নেতিয়ে যাওয়া ফুলগুলো তার দৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু। এই ফুলগুলোর মাঝে কি ভিন্ন কিছু লুকিয়ে? শীতলতা দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে কেন তারা? হুট করে চোখ গেল আয়নায়। অদ্ভুত দেখাচ্ছে তাকে। কিছুটা পুঁচকে ভূতের মতো। মাথাসহ সারা শরীরে কম্বল মোড়ানো। ফিক করে হেসে ফেলে শিরীন। নিজের উপর হাসছে বলে থম মেরে বসল আবার মুহূর্তেই। ফের দৃষ্টিপাত করে ফুলগুলোর দিকে। পরপর নজর ঘুরল ফরহাদের বইয়ের দিকে। কম্বলের অন্দর থেকে এক হাত বের করে টেবিলে থাকা বইটি নিল। পাতা উল্টে সেই লেখাগুলো পড়তেই দৃষ্টি আটকে গেল,
“বইটি বিশেষ, অনেক স্মৃতি জড়ানো।”
এই লাইনে। এই জায়গায় বিচিত্র এক অনুভূতি জন্মাল। যে অনুভূতি মোটেও ইতিবাচক নয়। বরং এটিকে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ বলা যায়। কিন্তু কেন? নিজেকে নিজেই প্রশ্নবিদ্ধ করল শিরীন। জবাব আবিষ্কার করার পূর্বেই ফোনে একের পর এক নোটিফিকেশন আসতে থাকে। মনোযোগ ভঙ্গ হলো শিরীনের। ফোনটা হাতে তুলতেই দেখল হোয়াটস অ্যাপে একের পর এক ছবি আসছে। নাম্বারটা অজ্ঞাত। আচমকা ভয় পেয়ে যায় শিরীন। এতো রাতে কে ছবি পাঠাচ্ছে? কোনো স্ক্যাম নয়তো? আজকাল এসব স্ক্যাম হয়। শিরীন মেসেজ দেখল, ছবিগুলো ডাউনলোড না করেই ব্লক করতে যাবে ঠিক তখনই একটি মেসেজ আসে সে নাম্বার থেকে,
“কোন গাধা বলেছে আপনার ছবি ভালো আসে না, রূপা? তার চাকরি খাব আমি। দেখুন কী সুন্দর ছবি এসেছে।”
চিত্তের কোনো এক কোণে ‘ফরহাদ’ নামটি বেজে উঠে। মস্তিষ্ক খুব সহজেই তার নামের সঙ্গে সঙ্গে সন্ধ্যায় তার বলা কথাগুলোর স্মরণ করায়। সর্বদেহে ঝিমঝিম এক অসদৃশ অনুভূতি জাগে। অধর কামড়ে ধরতেই ফোনকল এলো। শিরীন ছটফট করে উঠে। ব্যাকুল হাতে ফোন রিসিভ করেই ফেলল,
“ছবিগুলো দেখেছেন? পুরোনো ক্যামেরায় তোলা। একটা ভিন্টেজ ভাব আছে কিন্তু। আমি বিগত ত্রিশ মিনিট যাবত ছবিগুলো দেখছি, আর কী ভাবছি জানেন?”
শিরীন মন্থরগতিতে শুধায়, “কী?”
“এ যেন এক নব্বই দশকের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মেয়ে উদাস মনে বসে আছে। আর আমি দূর হতে দেখে মুগ্ধ হচ্ছি..”
মুখভাঁজে লালিমা ছড়িয়ে পড়তে সময় নেয়নি। নেত্রদ্বয় অবাক হয়ে আকৃতি বৃদ্ধি করেছে। দুদিকে দু রকম প্রতিক্রিয়া ভেসে উঠছে শিরীনের।
ফরহাদ ফের শুধায়, “ছবিগুলো দেখেছেন?”
“উহু।”
“দেখুন, আমি লাইনে আছি।”
শিরীন লাজুক ভঙ্গিতে কান থেকে ফোন নামাল। এত লজ্জার কারণ তার নিজেরই বোধগম্য হচ্ছে না। কিন্তু এই অনুভূতি যে তাকে রেহাই দিতে চাইছে না। পেট গুলিয়ে আসছে। একটার পর একটা ছবি ডাউনলোড করে দেখতে লাগল। নিজেকে দেখে মনে হলো, ‘আগে কখনও নিজের এই রূপ স্ব-চোখে তো ধরা দেয়নি।’
শিরীন ফোন স্পিকারে রেখে শুয়ে পড়ল। অন্যহাতে বাতি নিভিয়ে বলল,
“আমি নয়, আপনার ছবি তোলার হাত ভালো।”
“আমার প্রশংসা করছেন? নাকি নিজের দুর্নাম?”
শীতল কণ্ঠে শিরীন জানায়, “নিজের দুর্নাম করছি।”
রাত এগারোটায় শহীদ মিনারে একাকী বসে রাতের শহর উপভোগ করতে থাকা ফরহাদ আকাশপানে তাকালো। মেঘের দল পশ্চিম আকাশ ছেড়ে দক্ষিণের দিকে এগোচ্ছে। তাকে আকর্ষণ করল বিষয়টি। শূন্যে তাকিয়ে থেকেই জবাব দিল,
“দুর্নাম আমার হোক, প্রশংসা আপনার।”
“আমি প্রশংসার দাবিদার নই।”
“আপনি নিজের প্রতি বড্ড নিষ্ঠুর। কেন নিজেকে হেয় করেন? কমতি আছে কোনো আপনার মাঝে? কই আমার চোখে তো পড়েনি।”
শিরীন ভেংচি কেটে বলল, “আপনার চোখে পর্দা চড়ানো।”
ফরহাদ মৃদু শব্দে হাসে। হাসির ধ্বনি এই যান্ত্রিক ফোন চিরে শিরীনের কর্ণগচর হয়েছে। ফরহাদ জবাব দেয়,
“এই পর্দা থাকুক, অনন্তকাল।”
কী জবাব দেওয়া যায় এই বাক্যের বিপরীতে? শিরীন কথা বলতে পটু নয়। কিন্তু ভালো লাগছে কথা বলতে। অস্বীকার করে লুকিয়ে রাখা অনুরাগের মুখোমুখি হতে চায় না আপাতত।
ফরহাদ নির্ভিক স্বরে বলল, “আপনার সাথে আলাপ দীর্ঘ করা যায় কী করে বলুন তো? আমি কোনো কথা খুঁজে পাই না।”
“দীর্ঘ না করে ঘুমিয়ে পড়ুন।”
“রাস্তায় ঘুমোব?”
শিরীনের কপাল কুঁচকে যায়। রাস্তায় মানে? কথার অর্থ বুঝতে প্রশ্ন করল,
“রাস্তায়? বুঝিনি।”
ফরহাদ জবাব দিল, “আমি এই মুহূর্তে শহীদ মিনারে একা বসে আছি। উম! একা বললে ভুল হবে, আমার সাথে দুটো কুকুর আছে। ওরা আমার পাশে বসে কেক খাচ্ছে।”
এত রাতে সে বাইরে কী করছে? জানতে ইচ্ছে হলেও প্রশ্নটুকু মুখে এসে থেমে গেল। শিরীনের মন যেন দ্বিধা দ্বন্দ্বের কারাগার। শব্দ ব্যয় করতেও ‘বেশি ভাবনা’ এসে হাজির হয়। ফরহাদ বুঝল সেটি শিরীনের নিঃশ্বাসের শব্দে। বলল,
“আমার সম্পর্কে জানতে চেয়েও, জানতে চান না। তাই আমি নিজ থেকেই বলি? আপনি শুনুন।”
“হুম।”
“আমার জন্ম মহানন্দার তীর ঘেঁষে। বলুন তো জায়গাটা কোথায়?”
“পঞ্চগড়..? তেঁতুলিয়া তাই না?”
শিরীনের উদ্দীপনা ভরা কণ্ঠ শোনা গেল। ফরহাদ জবাব দিল, “জি।”
পঞ্চগড়, তেঁতুলিয়া অর্থাৎ কাঞ্চনজঙ্ঘা। এই জায়গাটি বাংলাদেশের অন্যতম সুন্দর জায়গার মধ্যে একটি। আনন্দলহর ছেয়ে গেল শিরীনের হৃদয়জুড়ে। বলল,
“আপনাদের ওখানে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়?”
“সবসময় দেখা যায় না। কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার জন্য প্রয়োজন পরিষ্কার আকাশ। শরৎকাল ও শীতকালের শুরুর দিকে আমার বাড়ির বারান্দা থেকেই দেখা যায়।”
শিরীন অস্ফুট কণ্ঠে বলে উঠে, “কী নান্দনিক!”
“তার চেয়ে নান্দনিক আমার বাবা-মায়ের প্রেম।”
শিরীনের মধ্যকার যত দ্বন্দ্ব ছিল সবটাই শেষ কাঞ্চনজঙ্ঘার কথা শুনে। সে আরও আগ্রহ প্রকাশ করে। জানতে চায়,
“যেমন?”
“আমার মা টেকনাফের আর বাবা তেঁতুলিয়ার। দুই প্রান্তের দুজন মানুষ এসে একত্রে মিলিত হয়েছে। ভাগ্য তাদের মিলন লিখে রেখেছিল হয়তো। নয়তো বাবা কেন টেকনাফ যাবে? কেনোই হুট করে আমার মায়ের সাথে দেখা হবে? কেন বাবা প্রেমে পড়ে যাবেন?”
কৌতূহল যেন বেড়েই চলেছে শিরীনের। কম্বল ভালোভাবে পায়ে পেঁচিয়ে নিল। পায়ের তলা ভীষণ ঠাণ্ডা হয়ে আছে। আজ রাতে রূপকথার গল্প শোনাচ্ছে যেন ফরহাদ। আর শিরীন মত্ত হয়ে শুনতে চাইছে। শিরীন শুধায়,
“কীভাবে?”
“লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট। বাবা গিয়েছিলেন তার ছোট ফুপুর শ্বশুরবাড়ি টেকনাফে। তখন আমার বাবা তাগড়া জোয়ান পুরুষ। সবে মাত্র অনার্স কমপ্লিট করেছেন। তিনি রাতে ঘুমোতে যাওয়ার সময় প্রায়ই গানের গলা শুনতে পেতেন। রাতের সময় কেউ একজন নীচু মেয়েলি গলায় গান করতো। বাবার মনে কৌতূহল জাগে, এত সুন্দর কণ্ঠ কার হতে পারে? তিনি দু থেকে তিনদিন খোঁজার চেষ্টা করেন গানের স্বর কোথা থেকে ভেসে আসছে? খোঁজ করতে করতে তিনি হদিস পেলেন পাশের বাড়ির টিনের ঘরের। বাবা তখনই বুঝতে পারলেন পাশের বাড়ির কোনো মেয়েই রাত হলে গান গায়। কৌতূহল দ্বিগুণ হলো। বাবা খুঁজতে লাগলেন মেয়েটিকে। ফুপাতো ভাইকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলেন পাশের বাড়ির হেডমাস্টারের মেয়ে গান গায়। তখন বাবার মনে দেই মেয়েটিকে দেখার প্রবল ইচ্ছে জাগে। এক রাতে চুপি চুপি সেই বাড়ির জানালার পাশে দাঁড়ালেন। যখনই গান শুরু হলো বাবা উঁকি দিয়েছিলেন জানালার ভেতর। সে দেখলেন এক যুবতী মেয়ে লম্বা চুলে বিনুনী গাঁথতে গাঁথতে মনের সুখে গান গাইছে। বাবা মুগ্ধ হয়ে চেয়ে ছিলেন। মেয়েটি যখন বুঝতে পারলো জানালার পাশে কেউ আছে সে দ্রুত এসে মুখের উপর জানালা লাগিয়ে দিল। ততক্ষণে বাবা সেই মেয়ের উপর মুগ্ধ। পুরুষ মনে নতুন প্রেমের সুর গেঁথে দিয়ে গেছে কেউ।”
“তারপর?”
“তারপর মেয়েটি আর গান গায়নি। কিন্তু বাবা অপেক্ষায় থাকতো গানের। একদিন কেটে গেল, দ্বিতীয়দিনও কাটলো। গান আর শোনা গেল না। হতাশ হয়ে বাবা তেঁতুলিয়া ফিরে আসেন। ফিরে এসে এক বিরাট কাণ্ড ঘটিয়েছেন।”
শিরীন মনোযোগ সহকারে শুনছিল। ফরহাদের কথার বিপরীতে জানতে চাইল,
“কী কাণ্ড?”
“দাদু আর দাদীকে গিয়ে সরাসরি বলেন তিনি বিয়ে করতে চান আর পেশা হিসেবে শিক্ষকতাকে বেছে নিতে চান।”
কী অবাক করা কাণ্ড! শিরীন আশ্চর্যচকিত হয়ে রয়। সরাসরি বিয়ে? ফরহাদ কেশে উঠল ঠাণ্ডা বাতাসের ঝাঁপটায়। গলায় থাকা মাফলার মাথায় পেঁচিয়ে নিয়ে বলল,
“অবাক হচ্ছেন, তাই না? সে মেয়েটি আর কেউ নয় আমার মা ছিলেন। বাবা কত চতুর দেখেছেন? শ্বশুরকে হাত করার জন্য শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন।”
হেসে ফেলল শিরীন। হাসির ঝংকারে প্রসন্ন হলো ফরহাদ। জবাবে বলল,
“দাদা-দাদী ঘোর বিরোধিতা করলেন। কিন্তু বাবা মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন বিয়ে করবেন তো সেই মেয়েকেই করবেন। রাগ-টাগ দেখাননি। পাঁচ মাসের মধ্যে নিজেকে প্রমাণ করেছেন। শুরুতে একটি প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা দিয়ে শুরু করেছেন সাথে দিন-রাত টিউশন। সেখানে নিজের ফুপাতো ভাইকে বলে রেখেছিলেন যেন কোনোভাবে মেয়েটির বিয়ে না হয়ে যায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে।”
“দারুন ব্যাপার!”
“একদিন বাবা তেঁতুলিয়া থেকে মায়ের কাছে চিঠি লিখেন। তখন কী আর মোবাইল ফোনের যুগ ছিল? নব্বই দশকের প্রেম তাদের, চিঠির আদান প্রদান হতো। বাবা চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘আপনি দয়া করে অপেক্ষা করবেন। ওসব প্রেম আমার দ্বারা হবে না। আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই। আমি খারাপ ছেলে নই, কুৎসিতও নই আমাকে নিশ্চয়ই আপনার পরিবারের আর আপনার পছন্দ হবে। আপনি অপেক্ষা করবেন।’ মায়ের কাছে চিঠি পৌঁছায় সাতদিন পর। আমার চাচা অর্থাৎ বাবার ফুপাতো ভাই সে চিঠি জানালার পাশে রেখেছিলেন। মা ভীষণ ভয় পেয়ে যান তখন। চিঠি মুড়িয়ে আলমারিতে রেখে দিয়েছিলেন।”
ফরহাদ থেমে গেল। এই থেমে যাওয়া মোটেও ভালো লাগেনি শিরীনের। সে শুনতে চাইছে। মৃদু ছটফটে ভঙ্গিতে বলল,
“এরপর কী হলো?”
“এরপর দাদা আর দাদী ছেলের দিন-রাত পরিশ্রম দেখে সাত মাস পর রাজি হলেন। বললেন তারা মেয়ের বাড়িতে প্রস্তাব দেবেন। কথামত বাবার ফুপুর মাধ্যমে প্রস্তাব গেল। আমার নানাভাই খোঁজ খবর নিলেন, তেঁতুলিয়া এসে আমাদের সঙ্গে দেখা করে অনেকটা সময় নিয়েই বিয়ে ঠিক করেন। তখন মেয়েদের মতামত নেওয়ার প্রচলন ছিল না। বাবার সিদ্ধান্ত মেয়ের সিদ্ধান্ত। নানাভাই কোনো ঝামেলা ছাড়াই সবকিছু দেখে রাজি হয়ে গিয়েছিলেন। আমার বাবা প্রেমে পড়েছিল বিয়ের পূর্বে, আর মা বিয়ের পর। এইতো! চলছে এখন তাদের সংসার সুখে, শান্তিতে, ভালোবাসায়।”
শিরীন মুগ্ধ হলো পুরো ঘটনায়। তার মন-মস্তিষ্ক সম্পূর্ণ এই ঘটনা বিশ্লেষণে ডুবে আছে। কল্পনায় সাজাচ্ছে সেই নব্বই দশকের দুজন মানব মানবীকে। ফরহাদ বলল,
“রূপা..”
রূপা ডাকে চমকে উঠে শিরীন। এতক্ষণ ঘোরের মাঝে ছিল। ফরহাদ গভীর স্বরে আবদার করে বসে,
“আমার সঙ্গে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখবেন? যখন শীতল প্রভাতে সূর্যের কিরণ সুদূর হিমালয়ে পড়বে, সেই অনবদ্য দৃশ্য আমার পাশে দাঁড়িয়ে উপভোগ করবেন?”
____
করিডোরের শেষপ্রান্তে নীরব প্রতীক্ষায় একজোড়া নারী নেত্র। মণিগুলো এদিক-ওদিক ঘুরছে। অকথিত অনুরাগ লুকায়িত সে চোখের গভীরে কোথাও। দুরুদুরু বুকের কম্পন ঘোষণা দিল তার মাঝে এক পরিবর্তন আসছে। এবারের শীত তার জন্য ভিন্ন আয়োজন করেছে। মনের দোলাচালের ভিন্নতা, দৃষ্টির ভিন্নতা, অনুভবের ভিন্নতা। এবারের শীত এসেছে বড় আয়োজন করেই। ভাবনায় মজে ঠাণ্ডা হাতজোড়া একত্রিত করল শিরীন। কাঁধে ব্যাগটা ভারি মনে হচ্ছে আগের তুলনায়। দোতলার করিডোর থেকে নীচে চেয়ে আছে সে, পার্কিং এরিয়ার দিকে। পরিচিত মোটর বাইকটি একবার দেখার ইচ্ছায়।
ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠে শিরীনের। আশায় ছিল হয়তো ফরহাদের ফোন। কিন্তু নাহ! মা ফোন করেছে। শিরীন ফোন ধরলো,
“হ্যালো, মা।”
“শি.. শিরীন!”
শোভা বেগমের কণ্ঠে অস্থিরতা। পাশ থেকে চিল্লাফাল্লার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। সাথে ভাংচুরের শব্দও যোগ হলো। শিরীন আতঙ্কিত স্বরে জানতে চায়,
“কী হয়েছে, মা?”
“তোর চাচা.. আর চাচী ঘরে ঢুকে ভাংচুর করছে.. শিরীন, জলদি আয়..”
ব্যাস! এতটুকুই দরকার ছিল শিরীনের হিতাহিত জ্ঞান হারাবার জন্য। সে উল্টো ঘুরে দৌড় লাগায়।
অন্যদিকে ফরহাদ তার বাইক গ্যারেজে দিয়েছে। নতুন মডেলের বাইক নয় এটি। মোটামুটি পুরোনো। এক সপ্তাহ ভালো থাকেনা, সমস্যা দেখা দেয়। কিন্তু বাবার বাইক বলে ছাড়তেও পারছে না। এটাকেই বারবার ঠিক করিয়ে কাজ চালায়। খয়েরী রঙের লেদারের জ্যাকেটের চেইন গলা অবধি লাগিয়ে হাঁটতে লাগল ফরহাদ ক্লাসরুমের দিকে। মন মেজাজ উৎফুল্ল আজ তার। সেই উৎফুল্লতা আশ্চর্যে পরিণত হলো শিরীনকে দৌঁড়ে আসতে দেখে। ভাগ্যিস করিডোর ফাঁকা। ক্লাস চলছে অন্যান্য ডিপার্টমেন্টের। এই সুযোগে শিরীনের সাথে কথা বলা যাবে। ফরহাদ হাসার চেষ্টা করে। এগিয়ে এসে কিছু পথ আটকানোর ভঙ্গিতে দাঁড়ায়।
শিরীনের সামনে ফরহাদ এই মুহূর্তে অদৃশ্য। বুক ধড়ফড় করছে তার। ফরহাদ বলল,
“শিরী..”
শিরীন চিৎকার করে বলে, “সরুন!”
ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল ফরহাদ। জানতে চাইলো,
“কী হয়েছে?”
শিরীনের গলার স্বর দ্বিগুণ উঁচুতে উঠে। এতটা দুশ্চিন্তায় নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বলল,
“প্লীজ! পথ ছাড়েন আমার।”
শিরীন নিজেকে সামলাতে পারলো না একেবারেই। পাগলপ্রায় হয়ে ছুটে গেল। যাওয়ার পূর্বে ফরহাদের গায়ে ধাক্কা লেগেছে। স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ফরহাদ।
পেছন থেকে কেউ একজন তাচ্ছিল্য করে বলে উঠল,
“আহারে! মেয়েটি পাত্তাই দিল না ফরহাদকে, সো স্যাড!”
যার ভয় ছিল সেটিই হয়েছে। পেছন থেকে আসা কণ্ঠটি অপরিচিত নয়। ফরহাদ চোখ খিচে বন্ধ করে ফেলে। হাত মুষ্টিবদ্ধ করে পেছনে ফিরে বলল,
“দিস ইজ নান অফ ইউর বিজনেস, রাজিব।”
রাজিব করিডোরের রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়ায়। ফরহাদের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি দেখছে সে। ফরহাদের সাথে রাজিবের রেষারেষি আজকের নয়, বরং ক্যাম্পাস জীবনের শুরু থেকে। সামান্য একটি ক্রিকেট ম্যাচের মাধ্যমেই সূত্রপাত এই শত্রুতার। কারণটা তুচ্ছ হলেও তাদের মাঝে আক্রোশ এখনও সেই প্রথম দিনের মতো। ফরহাদ নিজের ভাগ্যের উপর ভীষণ বিরক্ত হলো। তারই কেন দেখতে হবে? আর এই মুহূর্তে সেই কেন এখানে উপস্থিত?
রাজিব ফরহাদকে তিরস্কার করে বলে উঠে, “একবার ছ্যাঁকা খেয়ে বাঁকা হয়েছিস। ডিচ মেরে চলে গিয়েছে তোমার প্রিয়তমা তোমাকে। এখন আবার নতুন প্রিয়তমার কাছ থেকেও ধাক্কা? তোর জন্য কষ্ট হয় রে! ভীষণ কষ্ট হয়।”
রাগ সংবরণ করতে চাইছে ফরহাদ। নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারালে বাজে একটা পরিস্থিতিতে পড়তে হবে। ফরহাদ দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
“আই রিপিট, দিস ইজ নান অফ ইউর বিজনেস!”
রাজিব সোজা হয়ে দাঁড়াল। সরাসরি ফরহাদের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল,
“মেয়েরা তোর মতো ছেলেদের ইউজ করে। তারপর ছুঁড়ে ফেলে দেয়। তোরা এটারই যোগ্য। ক্লাসলেস!”
রাজিব ফরহাদের কাঁধে হাত রাখতে যাচ্ছিল। ফরহাদ এক ঝটকায় সরিয়ে দিল হাতটি। রাজিব বলল,
“ফরহাদ একটি মেয়ের পথ আটকে দাঁড়িয়েছে আর মেয়েটি তাকে অপমান করে চলে গেছে। লজ্জার বিষয়। মানুষ জানলে কী বলবে বল? ক্যাম্পাসে সবাই ছিঃ ছিঃ করবে। তোর না এত সেলফ রেস্পেক্ট? ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে গেল সব।”
বলে চলে গেল রাজিব। হাত নিশপিশ করছে ফরহাদের মারার জন্য। কিন্তু নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ করে গেল।
গা রিরি করে উঠল ফরহাদের। অপমানে জর্জরিত সে। পুরুষ-অহমিকায় আঘাত পড়েছে। ফরহাদ বুঝে উঠতে পারল না, আসলে হয়েছে টা কী? গতরাতেও তো সব ঠিকই ছিল? লম্বা সময় ধরে তাদের কথা হলো। তাহলে সকালেই তার ভিন্ন রূপ? একবার কী ফোন করে জানা উচিত? ফরহাদ ফোন বের করে, কল মিলায় শিরীনের নাম্বারে। যতবার রিং হচ্ছে ততবারই কেটে দিল শিরীন। তিনবার ফোন করল ফরহাদ। লাভ হলো না কোনো। চতুর্থ বারে এসে ফোনটাই বন্ধ হয়ে যায়।
ফরহাদ বিড়বিড় করল, “আপনি তো সেকরম মেয়ে নন, শিরীন। আপনি ভিন্ন, সাধারণ। কোনো কারণ ছাড়া এই কাজটি কেন করলেন?”
প্রশ্নের কোনো জবাব মিলল না। ফরহাদ ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে যায়। কয়েকবার চেষ্টা করে শিরীনের সাথে যোগাযোগ করার। কিন্তু সম্ভব হলো না। ব্যাংকে ডাক পড়েছে। লোন সম্পর্কিত কিছু কাজ আছে। ফরহাদ হাঁটলো শাহাবাগের উদ্দেশ্যে। শাহাবাগ থেকে মেট্রোতে করে মতিঝিল অগ্রণী ব্যাংকে যাবে। হাঁটতে হাঁটতে ভাবছে শিরীনের বিষয়টি। কোনোভাবেই মেলাতে পারছে না। সে কী কোনো সমস্যায় পড়েছে? নাকি তার এতদিনের সঞ্চিত অনুভূতির প্রতিদান দিল? আপাতত মস্তিষ্কে জটলা পাকিয়ে আছে। ভয় কাজ করছে পূর্বের অভিজ্ঞতা মনে করে। মেট্রোতে বসে ফোনে থাকা শিরীনের ছবির দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনি যেন আমার অতীতের মত আরেকটি কালো অধ্যায় না হন।”
চলবে…
Leave a comment
Your email address will not be published. Required fields are marked *