কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই
আজ আর নেই…’
কে বলেছে নেই? আলবৎ আছে। কিন্তু মানুষের এখন মুখোমুখি বসে আড্ডা দেওয়ার সময় নেই। এখন আছে মেসেঞ্জার আর হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপ। সেখানেই বৃদ্ধাঙ্গুল খাটিয়ে মেসেজিং চলে।
‘1990 Cafe’
কনভেকশন ওভেন থেকে পেস্ট্রি ট্রে বের করতে করতে ভাবছে ফরহাদ। হাতে ওভেন গ্লাভস। গাঢ় নীল রঙের টার্টেল নেক পুলওভার সোয়েটারের উপর কালো এপ্রনটা অনবদ্য লাগছে। কিছুক্ষণ পূর্বেই এক বৃদ্ধা কফি খেতে এসে প্রশংসাবাক্য ছুঁড়ে দিয়েছিলেন ফরহাদের দিকে। বলেছিলেন, ‘ তোমাকে দারুণ লাগছে, ইয়াং শেফ।’ কথাটি পূনরায় স্মরণে আসবা মাত্রই আনমনে লঘু হাসলো। পুনরায় আরেকটি কনভেকশন ওভেন থেকে চকলেট কুকিজ বের করে বাইরে রাখল। পেস্ট্রিগুলোর উপর ছিমছাম ফ্রোস্টিং করে গ্লাস ডিসপ্লে কেসে রেখে দিল। আপাতত তার কাজ শেষ। শাহেদ এসে স্যান্ডুইচ বানাবে।
ফরহাদ এপ্রন খুলে সাইডে রেখে কফি শপের দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা গ্রে বোর্ডে মার্কার দিয়ে লিখল,
“কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজও আছে…”
এক ভদ্রলোক মুখের সামনে ধরে রাখা নিউজপেপার সরালেন। এখানে নবীনদের চেয়ে প্রবীণরা আসতে বেশি পছন্দ করেন। তাদের ভাষ্যমতে এই জায়গাটা নাকি তাদের পুরোনো দিনের স্মৃতিকে স্মরণ করায়। দেয়ালে কোনো চাকচিক্য নেই। দুয়েকটা পেইন্টিং সাথে কাঠজাত চেয়ার টেবিল। বিশেষ প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে নিউজপেপার আর ম্যাগাজিনকে। ছবি তোলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 1990 ক্যাফেতে। এমনকি টেলিভিশনও নেই।
ফরহাদের লেখাটি দেখে বললেন, “বেশ লিখেছো। কফি হাউজের আড্ডা আজও আছে, শুধু একটু সময় বের করে নিলেই হয়।”
ফরহাদ বিনম্র স্বরে বলে, “জি, আংকেল।”
ভদ্রলোক কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন, “কফিটাও সেরা।”
ফরহাদ মোলায়েম হেসে জবাব দেয়, “ধন্যবাদ।”
“আবার আসবো এখানে। কফি কিন্তু তোমাকেই বানাতে হবে।”
“অবশ্যই। এটাই তো আমার কাজ, বিকেল পাঁচটার পর যেকোনো দিন চলে আসবেন। বান্দা হাজির থাকবে।”
ভদ্রলোক ক্যাশ কাউন্টারে বিল মিটিয়ে চলে গেলেন। তখনই শাহেদ আর সামির এসে হাজির হলো। শাহেদ স্যান্ডুইচ বানাতে এক্সপার্ট আর ফরহাদ পেস্ট্রি, কুকিজ আর কফির দায়িত্বে। সামির আসে শুধু আড্ডা দিতে। তাদের পিছু পিছু হেলেদুলে নিশি রাত্রি আর রেশমাকেও আসতে দেখা গেল। ফরহাদ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে নিঃশব্দে। এরা থাকলে আর বোর হতে হয়না। পাখির মতো কিচিরমিচির করে মাতিয়ে রাখে পুরো ক্যাফেটাকে। এসেই মিউজিক প্লেয়ার অন করল সামির। তার এ ছাড়া আর কোনো কাজ নেই।
‘ জয়িতা ’ গানটি বেজে উঠে পুরো ক্যাফে জুড়ে,
“ হাতে নিয়ে পোস্টকার্ড খুঁজে যাই ঠিকানা..
শুধু বেড়ে যায় বয়েস, জয়িতা,
মাঝরাতে বেজে উঠে ক্লান্ত টেলিফোন,
আর ইনবক্সের মিথ্যে ভনিতা…
এই শহরের মিথ্যে কথার ভিড়ে,
সত্যি এখনও বাঁচে নোনাধরা দেয়ালে
মৃত কবি রা নিরুত্তর, জয়িতা…”
লাইনগুলোতে মনোনিবেশ করে ফরহাদের মস্তিষ্ক জ্বলে ওঠে। টেলিফোন আর ইনবক্স দুটো শব্দ যেন শিরীন নামক মেয়েটিকে ইঙ্গিত করছে। হ্যাঁ! তার কাছে শিরীনের নাম্বার আছে। সেই তো কল করেছিল। গতকাল তাকে আজিমপুর নামিয়ে দেওয়ার পর ছোট করে ধন্যবাদ আর জ্যাকেট ফিরিয়ে দিয়ে পালিয়েছে মেয়েটা। আজ ফরহাদ ক্লাসেও যেতে পারেনি। ব্যাংকে গিয়েছিল। ইনস্টলমেন্ট পরিশোধের তারিখ ছিল আজ। ব্যাংক থেকে তিন লক্ষ টাকার লোন নিয়েছে এই ক্যাফের জন্য। এক লক্ষ টাকা শাহেদ আর সামির মিলে পরিশোধ করেছে যেন অতিরিক্ত ইন্টারেস্ট দিতে না হয়।
ফরহাদ ঠোঁট দাঁতের নীচে পিষে ভাবলো, শিরীন কি আজ ক্লাসে তার জন্য অপেক্ষা করেছিল? এসেছিল ক্লাসে? বই আনতে বলা হয়েছিল তাকে। আপনাআপনি ফরহাদের মুখ ফুটে বেরোলো,
“ধ্যাত!”
সামিরের খোঁচাখুঁচি করার স্বভাব আছে। তার টার্গেট হচ্ছে রেশমা। যে কিনা এই মুহূর্তে ফোনকলে ব্যস্ত। হবু স্বামীর ফোন এসেছে সুদূর মালেশিয়া থেকে। সামির দুষ্টু চোখে তাকাল ফরহাদ আর শাহেদের দিকে। তারা সামিরের এই নজর ভালোভাবেই বোঝে। ফরহাদ গুরুত্বহীন রইল, শাহেদ নিঃশব্দে ইশারা দিল কোনো কাণ্ড যেন না ঘটানো হয়। কিন্তু কে শোনে কার কথা?
রেশমা ফোন রাখবার সাথে সাথেই বলে উঠে, “কীরে ইমোওয়ালি! তোর স্বামী বিদেশ থেকে ফিরবে কবে?”
রেশমা অম্লমুখে জবাব দিল, “হোয়াটস অ্যাপ আর মেসেঞ্জারের যুগে আমি ইমো কেন ইউজ করব?”
সামির ঠাট্টার সুরে বলে, “ইমো প্রবাসীর বউদের একমাত্র সঙ্গী। এত স্মার্ট হোস না! ইমো চালাবি।”
“তোর হিংসে হয় তাই না? আমার হবু স্বামী বিদেশ থাকে। আমাকে বিদেশী গিফট পাঠায়, তাই তোর হিংসে হয়।”
“বয়েই গেছে আমার!”
নিশি বাঁধ সাধলো দুজনের মধ্যে। কালো ফ্রেমের চশমা ঠিক করে বলল,
“পুরুষ জাতির আর আছেই কী? শুধু মিষ্টি মিষ্টি কথা, ভুঁড়ি ভর্তি হিংসে। ভুলিয়ে ভালিয়ে মেয়েদের নিজের করে নেওয়া এরপর ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া। ব্যাটালোক এই কারণে আমার অপছন্দের তালিকায় শীর্ষে।”
চরম পুরুষ বিদ্বেষী নারীর এরূপ কথা নতুন নয়। মেয়েটি রসকষহীন একেবারে। যেন পৃথিবীর সকল পুরুষ তার ভাতে ছাই দিয়েছে। শাহেদ কফির কাপ হাতে নিয়ে বলল,
“মানুষকে কামড়ায় কুকুর, আর তোকে বোধহয় পুরুষ কামড়েছে। এ কারণেই পুরুষ জাতির প্রতি তোর এতো আক্রোশ।”
রাত্রি প্রশ্ন করে বসে, “তুই কী ছ্যাঁকা খেয়েছিস কোনোভাবে? কোনো পুরুষ কী তোকে ডিচ মেরে চলে গেছে? আমার সাথে শেয়ার কর বিষয়টা, আমি সলিউশন দেওয়ার চেষ্টা করব।”
নিশি দুহাত একত্রিত করে বলল, “ক্ষমা কর, বোন! তোর নিজের বাপ তোকে জোর করে বিয়ে ঠিক করে ফেলেছে, এ সমাধান বের করতে পারলি না আর আমার সমস্যার সমাধান দিবি! আমি কোনো ছ্যাঁকা খাইনি। কিন্তু দেখেছি পুরুষদের অবস্থা, জঘন্য!”
রেশমা বলল, “এভাবে বলিস না। সব পুরুষ এক হয়না। তোদের দুলাভাই বেশ ভালো মানুষ।”
সামির খট করে বলে উঠে, “রাজু ভাস্কর্য সরিয়ে তোর স্বামীর ভাস্কর্য বানিয়ে ফেলি, কী বলিস? এমন নমুনা সবার দেখা উচিত।”
উড়ন্ত চড় এসে পড়ল কাঁধে। তারপরও নির্লজ্জের মতো হাসছে সামির। শাহেদ বলল,
“আমরাও পুরুষ, নিশিকে আমাদের গ্রুপ থেকে লাথি মেরে আউট করা উচিত।”
নিশি রাগান্বিত স্বরে বলল, “একবার আয় লাথি দিতে। তোর ঠ্যাং ভেঙে পেটে ঢুকিয়ে দেব, হারামজাদা।”
এদের মতবিরোধে নীরব ফরহাদ। কারো কথাই কানে প্রবেশ করতে পারছে না এই মুহূর্তে। বৃদ্ধাঙ্গুল অনবরত চলছে ফোনের স্ক্রিনে। কল লগ থেকে সময় আর দিন অনুযায়ী অজ্ঞাত নাম্বারটি বের করা এখন অতীব জরুরী। কেন জরুরী? সেই প্রশ্ন একবার মস্তিষ্কে এলেও পাত্তা দেয়নি ফরহাদ। অবশেষে নাম্বারটি পেল। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সামনের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ে,
“তোরা আজ ক্লাসে গিয়েছিলি?”
নিশি জবাবে বলল, “আমি গিয়েছি।”
ফরহাদ কখনোই সরাসরি জিজ্ঞেস করবে না, শিরীন এসেছিল নাকি। তারা শিরীনকে বোধহয় চেনেই না। আমতা আমতা করে প্রশ্ন করল,
“কেউ… কেমন স্টুডেন্ট ছিল আজ ক্লাসে?”
“তোরা ব্যতীত সবাই ছিল।”
‘চ’ ধ্বনি উচ্চারণ করে ফরহাদ। কাউকেই নিজের অভ্যন্তরের চিন্তার অনুমান করতে দিল না। অভিব্যক্তি একেবারেই স্বাভাবিক।
ঘড়ির দিকে চেয়ে দেখল। ঘড়ির কাটা এসে থেমেছে ঠিক সাতটা শূন্য শূন্য মিনিটে। একটা কল অথবা টেক্সট করা উচিত? ভাবতে ভাবতেই ক্যাফেতে মানুষের ভীড় বাড়তে শুরু করে। শাহেদ ও সামির উভয়েই ফরহাদকে কাজে সাহায্য করে। তারাও একে একে লেগে পড়ল কাজে। নিশি, রাত্রি আর রেশমাও আটটার পূর্বে রওনা হয়ে গেল।
______
রাতের দিকে তাপমাত্রা আরও নেমেছে। ষোলো থেকে আঠারোর মাঝামাঝি ছিল এ কয়েক দিন। আজ শীত তার শীতলতা আরও বৃদ্ধি করে। ওয়েদার ফরকাস্টে চৌদ্দ ডিগ্রি সেলসিয়াস দেখাচ্ছে। হিমেল হাওয়া শিরীনের মনে শান্তি ছড়াচ্ছে। বুক চিরে বেরিয়ে আসছে উষ্ণ নিঃশ্বাস। এই মৌসুমকে অতিরিক্ত ভালো লাগার কোনো কারণ নেই। কিছু জিনিস অনর্থকভাবেই রোমাঞ্চিত অনুভব করায়। এই ঋতু নিয়ে দিনভর ভাবলেও কম হয়ে যাবে। তার আগমন হয় স্বল্প সময়ের জন্য। এসে দোলা দিয়ে ফের হারিয়ে যায়। যতদিন আছে, ততদিন নাহয় উপভোগ করে নেক? আবার আসবে বছর ঘুরে হাজিরা দিতে।
উঠোনে আকাশপানে চেয়ে মুগ্ধ হতে হতেই মুঠোফোন বেজে উঠে। শিরীনকে সচরাচর কেউ কল করেনা। মাঝেমধ্যে মামা আর নানা ফোন করেন। সেটিও দিনের বেলা। রাতে কে কল করল? জানতেই ফোন হাতে নেয়। অজ্ঞাত নাম্বার। শিরীন দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে ফোন রিসিভ করে বলে,
“হ্যালো?”
“ফরহাদ বলছি..”
কেমন যেন নিশ্চুপ হয়ে গেল শিরীন। এতো রাতে কল করলো কেন? ফরহাদ কোনো জবাব না পেয়ে প্রশ্ন করল,
“আজ ক্লাসে এসেছিলেন?”
“আপনাকে বই দেওয়ার জন্য খুঁজেছি, পাইনি।”
ফরহাদ আয়েশ করে বিছানায় শুয়ে পড়ল। এক রুমের ফ্ল্যাট। ব্যাচেলর থাকে। মাথার পেছনে এক হাত রেখে, অন্যহাতে ফোন কানে চেপে আছে। জবাবে বলল,
“গতকাল বলেছিলাম আমি বই আবার ফিরিয়ে দেব।”
“আমি নিতাম না, ফিরিয়ে দিলেও।”
“অপেক্ষা করেছিলেন?”
“হ্যাঁ, বই দেওয়ার জন্য।”
“ওহ!”
হতাশ শোনালো ফরহাদের কণ্ঠ। শিরীন বুঝতে পারল। অন্যভাবে অপেক্ষা করার কথা ছিল নাকি? ফরহাদ নিজ থেকেই বলল,
“কাজে আটকে গিয়েছিলাম, তাই আসতে পারিনি। সরি।”
“ইটস ওকে।”
ফরহাদ লম্বা করে ব্ল্যাঙ্কেট খুলে নিজেকে সম্পূর্ণ আবৃত করে ফেলে। বালিশ ও কানের মাঝে ফোন চাপা পড়েছে। ভারী নিঃশ্বাস ফেলল একদফা। কী করে কথা এগোনো যায়? বুঝে উঠতে পারল না। তবে তার কথা এগোতে ইচ্ছে করছে। শিরীনের শীতল কণ্ঠে বিস্তৃত কোনো বাণী শুনবার প্রবল ইচ্ছে জাগছে।
“আমি আপনাকে একটা কথা বলতে চাই।”
ফরহাদের ভ্রুদ্বয় উঁচু হলো। সাথেসাথে বলল, “হ্যাঁ, বলুন।”
“একই ক্যাম্পাস, একই ডিপার্টমেন্ট যেহেতু আমাদের দেখা হবেই। তবে গতকালকের বিষয়টা আমার পছন্দ হয়নি।”
ফরহাদ ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইল, “কোন বিষয়?”
“বাইকে করে আসা…”
“তো? বাইকে আসায় কী আপনার কোনো ক্ষতি হয়েছে?”
“হয়নি তবে বিষয়টা দৃষ্টিকটু।”
“তখন জোর গলায় না করেননি কেন?”
“এটাই সমস্যা! আমি ‘ না ’ এই শব্দটি বলতে পারিনা।”
“কেন পারেন না? আপনার লাইফ আপনার মন মোতাবেক চলবে.. নিজের পছন্দ অপছন্দের প্রাধান্য দিতে জানেন না?”
শিরীনের মুখ ভার হয়ে আসে। মানুষের সাথে যোগাযোগ না করার ফল এসব। যে যেভাবে পারে, যা পারে তাকে দিয়ে করিয়ে নেয়। ফরহাদ বলল,
“চুপ কেন?”
“কিছু না… আপনি কি কোনো জরুরী দরকারে কল করেছিলেন?”
তার খবর নেওয়াটাই জরুরী ছিল। এটাই কারণ কল করার পেছনে। তবে সেটি মুখে স্বীকার করল না ফরহাদ। সে নিজের এই অদ্ভুত কর্মকাণ্ডের পেছনের কারণ জানে, জেনেও অজানা রাখতে চাইছে। ফরহাদ বলল,
“দুঃখ প্রকাশ করতে কল করেছিলাম। আপনাকে অপেক্ষা করিয়েছি, তার জন্য ক্ষমা চাইতে কল করেছি।”
“এসবের কোনো প্রয়োজন নেই।”
“আপনি বড়ই ভুলোমনা। গতকাল কী বলেছিলাম? প্রয়োজন বানিয়ে নিতে হয়।”
“আপনাকে প্রয়োজন বানাব?” ফট করে প্রশ্ন করে বসলো শিরীন। তার কথার ইঙ্গিত সেটিই বোঝাচ্ছে। প্রশ্নটি না করলেই না।
ফরহাদ হেসে ফেলে। বলে, “সেটা আপনার ইচ্ছে। চাইলে বানাতে পারেন, চাইলে আরেক কাপ চায়ের সাথে পলাশীর প্রান্তরে সময়কে অতিবাহিত করতে পারেন, চাইলে ঢাকেশ্বরীর পথ ধরে হাঁটতে পারেন, নীলক্ষেতের বইয়ের ভান্ডারে নিজেকে হারিয়ে, আবারও খুঁজে নিতে পারেন।”
“এমন কিছুই চাই না।”
চাওয়া উচিত ছিল। আরেক কাপ চা খাওয়া উচিত ছিল তার সাথে। ফরহাদ পাশ পরিবর্তন করল। অন্যপাশে ঠিক ফোন একইভাবে রেখে বলল,
“আপনার কাছে যে বইটি আছে সেটি আমার প্রাক্তনের দেওয়া। তখন আমি সবে ঢাকায় এসেছিলাম। ক্যাম্পাসেই সাক্ষাৎ হয়েছিল তার সাথে আমার। এরপর… এরপর জোয়ান বয়সের রঙিন দুনিয়া, লাফিয়ে পড়েছিলাম প্রেম জোয়ারে। জানতাম না সেটি ছিল ভাটা। আমার জন্মদিনে বইমেলায় নিয়ে গিয়ে আমাকে বইটি কিনে দিয়েছিল সে। ভালোই চলছিলো দিনকাল। সাদা কালো শহরকে রংধনুর মতো রঙিন দেখছিলাম। সেটা আমার ভাগ্যের সহ্য হচ্ছিল না। তারপর খেলাম বড়সড় একটা ধোঁকা! মেয়ে ক্যাম্পাসের সিনিয়র বড় ভাইকে বিয়ে করে আমাকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে চলে গিয়েছে। ধোঁকা খেয়ে বোকা না বাঁকা হয়ে ছিলাম কয়েক মাস। ফেইল করেছিলাম এক সাব্জেক্টে এই ধাক্কা সামলাতে না পেরে। ভাবতে পারছেন কতবড় আহাম্মক ছিলাম আমি? যখন এই কষ্ট থেকে বেরিয়ে এলাম নিজের গালে দুটো চড় দিয়েছি সবার আগে…”
শিরীন ঠোঁট টিপে হাসছে। হাসির আওয়াজ শোনা গেলেও ফরহাদ তার কথা থামায়নি। কিন্তু শেষ কথাটি আর হাসি অব্দি সীমিত ছিল না। শিরীন মুখ ফস্কে বলে ফেলে,
“বেশ করেছেন..”
ফরহাদ খানিক অবাক হলো। বুঝল, তার মাঝেও একটা দুষ্টু সত্তার বসবাস আছে। সেদিন তাকে মিথ্যে বলেছিল। নিজেকে রূপা বলে পরিচয় দিয়েছিল। কিন্তু এই সত্তাটা আড়ালেই আছে। ফরহাদ জবাব দিল,
“ইয়াহ, আই নো! বাট থ্যাংকস টু হার। তার কারণেই এখন রাফ এন্ড টাফ হয়ে গেছি।”
“ভুল থেকে যদি ভালো কিছু হয়, তাহলে ভুলই ভালো।”
“তাই আরও ভুল করতে চাই…”
“যেমন?”
“উম… যেমন.. থাক বাদ দিন।”
শিরীন আর জোর করল না। তার জোর করা একেবারেই সাজে না। কিন্তু জানার ইচ্ছে ছিল আর কেমন ধরনের ভুল সে করতে চায়। মানুষের মন স্বভাবতই আগ্রহী অজ্ঞাত বিষয়ে। ফোন কানে চেপে আছে। বিদায় নেওয়া দরকার।
“আগামীকাল আসছেন ক্যাম্পাসে?”
“দেখি…”
ফরহাদ বলল, “শুনেছি মিড টার্মের জন্য ওয়াদুদ স্যার কিছু নোটস দিবেন।”
“ডিপার্টমেন্ট গ্রুপ থেকে নিয়ে নেব।”
ফরহাদ দ্রুত ফোন স্পিকারে দিল। শিরীনকে বলল, ‘ এক মিনিট হোল্ড করুন।’ সাথে সাথে ডিপার্টমেন্টের সি.আরকে হুমকি দিয়ে মেসেজ করল,
“ওয়াদুদ স্যারের নোটস যেন কোনোভাবে ডিপার্টমেন্ট গ্রুপে না দেওয়া হয়। যদি দিস তাহলে তোকে মেরে মাঠে খুঁটি দিয়ে রাখব। গ্রুপে মেসেজ করে বল সবাই যেন আগামীকাল ক্লাসে উপস্থিত থাকে। ডু ইট নাও!”
যত দ্রুত লেখা সম্ভব লিখল ফরহাদ। কাজ হবে আশা করা যায়। সি আর ছেলেটা এমনিতেও ভীতু প্রজাতির। ফরহাদ শিরীনের উদ্দেশ্য বলল,
“আছেন?”
“জি।”
“আগামীকাল চলে আসবেন।”
“যদি ইচ্ছে হয় তবেই আসব।”
“ইচ্ছে হলেই আসুন।”
“হুম। রাখলাম।”
“ভুল করে আমার বইটি বাড়িতেই রেখে আসবেন। যদি এই ভুল থেকে ভালো কিছু হয়ে যায়?”
ফরহাদ ফোন রাখল। কথার বলার সব ধরনের খেই সে হারিয়েছে। এক সময় খুব আলাপ চলতো ফোনে। আর এখন! যেখানে কথা বলা দরকার সেখানে মুখ দিয়ে ভালো কোনো কথা বেরোচ্ছে না। বিরক্তিকর! ফরহাদ দেখল অলরেডি ডিপার্টমেন্ট গ্রুপে মেসেজ চলে গেছে। সি আর ফরহাদের সাথে কোনো কথা বাড়ায়নি। ফরহাদ গ্রুপে গেল। শত শত স্টুডেন্টের ভিড়ে তন্ন তন্ন করে খুঁজতে লাগল শিরীনের প্রোফাইল। অবশেষে পেয়েও গেল। বিড়বিড় করে বলল,
“শিরীন শারমিন.. ওরফে রূপা। অগণিত ভুলের রেজিস্টারে আরও একখানা বাড়তি ভুল জুড়ে দিলাম।”
চলবে…
Leave a comment
Your email address will not be published. Required fields are marked *