Buy Now

Search

এই শহরে [পর্ব-০৪]

এই শহরে [পর্ব-০৪]

শিশিরভেজা প্রতিটি প্রভাত মনোরম হবে তেমন কোনো কথা নেই। যেমন আজকের দিবারম্ভ হলো চোখের জল ঝরিয়ে। ক্যাম্পাসে যাওয়ার পূর্বে কটু বাক্য শুনতে হয়েছে আপন চাচীর মুখ থেকে। দেয়ালের অন্যপাশ থেকে চেঁচাচ্ছিলেন। জোর গলায় শোভা বেগম আর শিরীনকে শুনিয়ে বলছিলেন,
“আমার মেয়ের কুড়ির আগেই বিয়ে হচ্ছে আর সেখানে পাশের বাড়ির অবস্থা দেখ! ২৫ বছর চলে, এখনও বিয়ের নাম গন্ধ নেই। মেয়েকে নাকি পড়ালেখা করাবে! এহ্! আহ্লাদ দেখে বাঁচি না। পড়া না ছাই! খুঁটি দেবে খুঁটি!”
চোখ বেয়ে ঘন ঘন পানি পড়ে না শিরীনের। ‘কান্না’ নামক জিনিসটা তার জীবনে কালেভদ্রে আসে। কান্নার কোনো উপায় রাখেননি শোভা বেগম। এ পৃথিবীতে মা মেয়ের মতো সুখী যেন আর কেউ নেই। কিন্তু আজ মায়ের চোখে অশ্রু বিন্দু দেখেছে শিরীন। হাতের পিঠ কপালে ঠেকিয়ে শুয়ে শুয়ে শুনছিলেন সেসব রূঢ় ভাষা। আড়ালে চোখ ভিজিয়েছেন।
অবসন্ন মুখশ্রী নিয়েই বেরিয়েছে শিরীন ক্যাম্পাসের উদ্দেশ্যে। যাওয়ার পথে বেশ কয়েকবার আসমানের দিকে দৃষ্টিপাত করেছিল। হয়তো খুঁজেছে কাউকে, হয়তো নিজের সৃষ্টিকর্তাকে। প্রশ্ন করতে গিয়েই নিশ্চুপ হয়ে গেছে। ক্যাম্পাসের বাস এসে থামলো সদর দরজার সামনে। শিরীন নেমে ক্লাসের দিকে পা বাড়ায়। দূর করিডোরে দাঁড়ানো ফরহাদকে দেখতে পায়নি সে। কিন্তু ফরহাদ দেখছে। দেখেছে ধীমে পায়ে ক্লাসরুমের দিকে এগোনো নীলিকাকে। আনমনে রুক্ষ ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটেছে। ফরহাদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
সামির বলল, “ক্লাসে আয়..”
এখন তো ক্লাসে ঢোকা চলবে না। ফরহাদ হুট করে পকেট থেকে নিজের ফোন বের করল। ভনিতা করল সামিরের সামনে। যেন তার কোনো বিশেষ কল করেছে। ফরহাদ বলল,
“বাড়ি থেকে কল এসেছে। তুই যা, আমি আসছি।”
সামির অসন্তোষ প্রকাশ করে বলে, “জায়গা রাখতে পারব না বলে দিচ্ছি।”
“সেটাই তো চাচ্ছি..”
করিডোরের শেষ প্রান্তের দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলল ফরহাদ। সেটি সামিরের কর্ণগোচর হয়নি। সে চায় না জায়গা রাখা হোক তার জন্য। কিন্তু সেসব অভিমত নিতান্তই মুখে প্রকাশ করতে ইচ্ছুক নয় সে। মনের দোলাচাল নিজে অনুধাবন করতে পারলেই হলো।
বিশাল ক্লাসরুম জুড়ে ছাত্র-ছাত্রীদের কোলাহলে মুখরিত। প্রতিটি বেঞ্চি দখল হয়ে গেছে। ফরহাদের বন্ধুমহলের দৃষ্টি দরজার দিকে। নিশি বলল,
“হাঁদারাম এখনও আসছে না কেন?”
এখনও স্কুল জীবনের কিছু অভ্যাস রয়ে গেছে। সবাই একসঙ্গে বসবে। একজন আলাদা হলেই যেন জান যায় যায় অবস্থা, হাঁসফাঁস করতে থাকে সকলে। ফরহাদের জন্য বরাদ্দ জায়গাটাও দখল হয়ে গেল ইতোমধ্যে। সামির কপালে হাত রাখে। বলে,
“বেশ হয়েছে। এবার গিয়ে বসুক পেছনের সিটে!”
ফরহাদ জানালার বাইরে দাঁড়িয়ে দেখল দৃশ্যটি। সাথে সাথে ক্লাসরুমে প্রবেশ করে। বন্ধুদের সামনে দাঁড়িয়ে গোমড়ামুখে বলল,
“জায়গা রাখতে পারলি না?”
শাহেদ জবাব দেয়, “রেখেছিলাম, তুই তো আসতে দেরি করলি।”
ফরহাদ একবার পেছনে নজর বুলিয়ে নিল। শিরীনের পাশের সিট খালি। চরম অপ্রসন্নতার সুরে বলল,
“আবার ওই মেয়ের পাশে বসতে হবে! ধুর।”
সামির টিটকারী করে বলে উঠে, “যা যা। বোস।”
ফরহাদ রাগত স্বরে জবাব দেয়, “ইউজলেস তোরা!”
বলে হনহন করে পেছনের দিকে এগোলো। পেছন থেকে হাসির গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। তার অবস্থাতে বন্ধুমহল হাসছে। এই হাসিতে ফরহাদও হাসল, তবে বাঁকা ঠোঁটে। এগিয়ে গেল আকাশপানে চেয়ে থাকা নীলার পানে।
নীলাম্বরে জটলা পাকানো মেঘমল্লারের উপস্থিতি নেই। ধূসর মেঘের রাজত্ব সেথায়। এই মেঘদলের ন্যায় ধোঁয়াটে দশা শিরীনের। মুখশ্রী ফুলে আছে। চোখের দু কোণে লালিমা। মস্তিষ্কে রাজ্যের চিন্তা। পাশে বসা মানুষটিকে অনুভব আর করতে পারলো কোথায়?
“দিনের আকাশ পছন্দ নাকি রাতের?”
শিরীন অবচেতনে জবাব দিয়ে ফেলে, “সন্ধ্যার আকাশ…”
ঘোরে আচ্ছন্ন ছিল শিরীন। বুঝতেই পারলো না এইমাত্র কী হয়েছে। এক ধ্যানে চেয়ে থাকার ফলে চোখ শুষ্ক হয়ে উঠে। বারংবার পলক ফেলে। সাথেসাথে ঘুরে তাকায় পাশে। হুট করে মনে পড়ল! তার মুখের অবস্থা যা-তা। চোখের কার্নিশে পানি জমে আছে। মুখ ফিরিয়ে নিল শিরীন।
স্বল্পক্ষণেই চোখের পানি ফরহাদের কাছে একেবারে পরিষ্কার। শিরীন কেঁদেছে? মুখ ফোলা কেন তার? গাঢ় ভাঁজ পড়তে লাগলো কপালে। ব্যস্ত স্বরে বলে,
“দেখি আমার দিকে তাকান তো।”
শিরীন মুখ ফিরিয়েই উত্তর দিল, “কেন?”
ফরহাদের নরম স্বর কঠোর হলো। জোরালোভাবে নির্দেশের সুরে বলে উঠে,
“তাকাতে বলেছি তাকান।”
মগের মুল্লুক নাকি? তার আদেশ কেন মানতে হবে তার? কথার ধরন একেবারেই পছন্দ হলো না তার। কান্নার ফলে মাথা ধরেছে। শিরীন নিরুত্তর বাইরে চেয়ে রইল। ফরহাদ ফোস করে নিঃশ্বাস ফেলে শুধায়,
“কেঁদেছেন?”
যা বুঝতে দিতে চাইছিল না, সেটা বুঝেই গেল। লজ্জা লাগছে শিরীনের। মুখ ভার করে মুখ ফিরিয়েছে আর এপাশে তাকানোর কোনো নাম গন্ধ নেই। আদেশ ছেড়ে অনুরোধের সুর ধরল ফরহাদ। বলল,
“একটাবার তাকালেই পারেন…”
শিরীন রুষ্ট স্বরে জবাব দেয়, “কেন? কী দরকার?”
“কেন কেঁদেছেন জানার চেষ্টা করতাম।”
“কীভাবে?”
“চোখ মনের কথা বলে শুনেছি…”
শিরীন নত মস্তকে সামান্য মুখ ফেরায়। আজও তার কেশমালা ভীষণ জ্বালাতন করছে। ঢেকে রেখেছে তার স্নিগ্ধ মুখমন্ডলকে। চুলগুলোর কি কোনো শত্রুতা আছে ফরহাদের নজরের সাথে? কেন মুগ্ধ হতে বাঁধা প্রদান করে? সে-তো প্রথমদিন থেকে মোহগ্রস্ত।
শিরীন একটু থেমে ঠিকই প্রশ্ন করেছে, “আপনি আমার চোখ পড়তে চাইবেন কেন?”
“চাইছি…”
“আমি অবুঝ নই।”
শিরীনের কন্ঠে সন্দিহান। ফরহাদ গভীর স্বরে জবাব দেয়,
“বুঝদারও নন।”
শিরীনকে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে দেখা গেল। ফরহাদ সামান্য হেসে নেয় সেই সুযোগে। ফের জানতে চায়,
“কেন কেঁদেছেন বলুন? কেউ কিছু বলেছে?”
“নাহ!”
“তাহলে?”
“ব্যক্তিগত ব্যাপার।”
ফরহাদ ভাবুক ভঙ্গিতে মাথা দোলায়। বলে,
“ব্যক্তিগত ব্যাপার আসন্ন সময়ের জন্য তোলা থাকুক। তখন জেনে নিব।”
শিরীন আড়চোখে তাকায়। ফোলা মুখখানা কিছুটা স্পষ্ট। এক বিচিত্র বিচলন ঘিরে ফেলল চিত্তকে। দৃষ্টি একেবারে স্থির হয়ে রইল ফরহাদের। নিষ্পলক চোখ আটকে আছে ভেজা মুখের রেখাগুলোতে। আকস্মিক অস্থিরতা বাড়ায় এই দৃশ্য। ফরহাদ বুক ফুলিয়ে নিঃশ্বাস ফেলে সামনের দিকে তাকাল। কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীন ঘাড় ফের ঘুরে তাকায় শিরীনের দিকে। কী অদ্ভুত!
মনোতৃষ্ণা উপচে পড়ে বলল, তার মন ভালো করার সামান্য প্রয়াস করা উচিত। ফরহাদ শিরীনের দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে ভারী স্বরে বলে,
“জানেন আজ টিএসসিতে শহরতলী আর বাংলা ফাইভ ব্যান্ড আসছে।”
শিরীন মলিন মুখে সামান্য মুখ ফেরায় আর বলে,
“ওহ।”
“আপনি কনসার্ট অ্যাটেন্ড করবেন?”
“উহু! ওসবে আমি যাই না।”
“আগে কখনও যান নি?”
“উহু।”
ফরহাদ বড়ই আগ্রহবোধ নিয়ে বলে, “একবার চলুন, ভালো লাগবে। মন ভালো হয়ে যাবে।”
“নাহ!”
সরাসরি জবাব পেয়ে চুপসে গেল ফরহাদ। কী করা যায় এখন? যাবে না বোধহয়। শিরীনের নিষ্প্রভ আনন হৃদয়ে শব্দহীন বিদ্রোহ করছে। তবে মস্তিষ্ক অচল, শব্দযোগ করতে অক্ষম। ফোস করে নিঃশ্বাস ফেলে ফরহাদ। বলে,
“আপনাকে বোচা মুখে মানাচ্ছে না। মুখ ঠিক করুন, টিস্যু দিয়ে মুখ মুছে নিন। কাজলটাও লেপ্টে গেছে, কাঁদবেন যেহেতু কাজল দিয়েছিলেন কেন?”
বাড়তি কথা ভালো লাগছে না শিরীনের। এমনিতেই মন উদাস। তার মধ্যে ফরহাদের কথা মাথা ব্যথা বৃদ্ধি করল। শিরীন বলল,
“আমার প্রচণ্ড মাথা ধরেছে। আপনি কিছুক্ষণ চুপ থাকুন।”
ফট করে কথাটি শুনে বিব্রতবোধ করল ফরহাদ। মুখে কুলুপ এঁটে সামনের দিকে এবার শক্ত দৃষ্টি রাখল। লেকচারার এসে ততক্ষণে লেকচার দিচ্ছেন। শিরীনকে দেখা গেল বেঞ্চিতে মাথা নুয়ে দিতে। মসৃন চুলগুলো তার সাথেই ঝুঁকেছে। অবাধ্য ইচ্ছেরা চড়াও হতে চাইছে, চুলগুলো একবার ছুঁয়ে দিতে চাইছে। কিন্তু ফরহাদ নিজেকে দমায়। নিজেকে নিজে শাসিয়ে বলে,
“বাড়াবাড়ি করা উচিত নয়, একদম নয়!”
লেকচারের সময়কাল দীর্ঘ লাগল। পঁয়তাল্লিশ মিনিট যেন পঁয়তাল্লিশ ঘণ্টার মতো করে অতিবাহিত হয়েছে। উৎকণ্ঠিত ফরহাদ, ব্যস্ত মন। শিরীন কী ঘুমিয়ে গেল? সেই কখন থেকে মাথা নামিয়ে রেখেছে বেঞ্চিতে। অশান্ত পা নড়ছে অনবরত। শেষমেষ নিজেকে আটকাতে পারল না। ঘাড় উঁচিয়ে দেখল একবার ঘুমন্ত মুখশ্রী। মুখে লেপ্টে থাকা চুলগুলো সরিয়ে দেওয়ার অবাধ ইচ্ছা আরেকদফা মাথাচাড়া দিতে শুরু করে। নিজেকে টেনে হিঁচড়ে বের করে ফরহাদ। এই কাজ করলে মাঠে মারা পড়বে। তাকে চরিত্রহীন বলা হবে। ব্যস্ত ফরহাদ বিড়বিড় করল,
“আগে ভেসেছি ময়লা পুকুরের জলে, আর এখন অতল নীলাভ সমুদ্রে ডুবে মরতে চলেছি, স্বেচ্ছায়, হাসি মুখে। … অস্থিরতা কমানোর কোনো ঔষধ কী আবিষ্কার হয়নি!”
শিরীন ঘুমিয়ে পড়েছিল। চোখ লেগে এসেছিল কিছুটা। ঘাড় তুলতেই ঝিমঝিম করে উঠল সমস্ত মাথা। চোখের সামনে সবটা অস্পষ্ট লাগলো কিছু সময়ের জন্য। মুখ ফেরাতেই দেখল ফরহাদ আকুল চোখে চেয়ে। সে তাকাবা মাত্রই বলে উঠল,
“খারাপ লাগছে?”
শিরীন না বোধক মাথা নাড়ায় দুদিকে।
লেকচারার ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে যেতেই নিশি পেছনের দিকে এগিয়ে আসে। ফরহাদ নড়েচড়ে সোজা হয়ে বসে তৎক্ষণাৎ। নিশির পিছন পিছন সামির ও শাহেদও এসেছে। নিশি এসেই এক হাত বেঞ্চিতে অন্যহাত কোমরে রেখে ফরহাদের উদ্দেশ্যে কিছু বলতে যাবে তার পূর্বেই শিরীনের দিকে চোখ গেল। ফ্যাকাশে মুখ দেখে প্রশ্ন করল,
“তুমি কি অসুস্থ?”
শিরীন ইতস্তবোধ নিয়ে জবাব দেয়, “নাহ।”
“ক্লাসে দেখা যায় না কেন তোমাকে? মনে হচ্ছে নতুন স্টুডেন্ট।”
শিরীন সেদিনের মতো করেই বলে, “আমি ক্লাস করি না তেমন একটা।”
সামির পেছন থেকে শাহেদের কাঁধে হাত রেখে ঝুলতে ঝুলতে বলল,
“ক্লাস করতে হয় বুঝলে! ক্যাম্পাস লাইফ ইনজয় করতে হয়। নাহয় বুড়ো বয়সে স্মৃতিচারণ করবে কী করে? নাতি নাতনীদের ক্যাম্পাস স্টোরিজ কী বলবে?”
ফরহাদের চোয়ালখান শক্ত হলো। এই বাঁচালের মুখ সেলাই করে দেওয়া উত্তম। বাড়াবাড়ি কথা বলতে কে বলেছে তাকে? অতিরিক্ত জ্ঞান বিতরণের কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই এখানে।
নিশি ধমকে বলে, “চুপ থাক।”
পরপর শিরীনের দিকে চেয়ে বলল, “চলো আমাদের সাথে ক্যান্টিনে।”
“থাক…”
“আরেহ কীসের থাক! চলো তো। আমাদের সাথে থাকলে মন চাঙ্গা হয়ে যাবে। চলো, চলো…”
মুখে আসন্ন মুচকি হাসিটা পুরোদমে এড়ানোর চেষ্টায় ফরহাদ। কিছু জিনিস চাইবার আগেই হাজির হলে যে আনন্দ পাওয়া যায়? সে আনন্দের কোনো তুলনাই হয়না। সে তো মুখ ফুটে বলেনি, নিশি তার লুকায়িত মনোবাসনা পূরন করছে।
শিরীন না করতে পারেনি। তাদের সঙ্গে যাওয়ার উদ্দেশ্যে উঠে দাঁড়ালো। সে একটু এগিয়ে যেতেই ফরহাদ নিশির সামনে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলে,
“এই মেয়ে দুদিন যাবত শুধু ঝিমুচ্ছে। ওর একটা বুস্ট দরকার, তোর উপর ছেড়ে দিলাম। আমাদের দলে ঢুকাতে চাইলে, আমাদের মতো প্রাণবন্ত বানিয়ে তারপর দম ফেলবি। চ্যালেঞ্জ করলাম তোকে।”
নিশি তীক্ষ্ম দৃষ্টি ফরহাদের দিকে ছুঁড়ে বলল, “তুই প্রানবন্ত? হাসাবি না, ফরহাদ।”
“তোকে হাসিতে মানায়ও না। প্লীজ গো টু হেল।”
বলে চলে গেল ফরহাদ। শিরীন পিছু ফিরে তাকালো একবার। নিশি, সামির, শাহেদ সবাই আছে। কিন্তু ফরহাদ কোথায়? একবার খুঁজে তাকে। তখন নিশি বলল,
“চলো।”
বিশাল ক্যাফেটেরিয়াতে লম্বা টেবিলে বসেছে তারা সকলেই। একে একে সবাই নিজের পরিচয় নিল শিরীনের কাছে। তাদের বন্ধুত্বের শুরু থেকে এই অব্দি ঘটনা বলতে শুরু করেছে। শিরীন এসবে অভ্যস্ত নয়। বিশাল বন্ধুর দল তার কখনোই ছিল না। সে শুনছে, বিনয়ী হাসছে তাদের সমস্ত কৌতুকে। তবে নীরবে চোখ বুলিয়েছে ফরহাদের খোঁজে। চুপ থাকতে বলেছে বলে মাইন্ড করে বসলো নাকি? বলা কি উচিত হয়নি? কী করে জানবে এখন?
ভাবনার ব্যাঘাত ঘটিয়ে ফরহাদ এসে হাজির হয় সেখানে। শিরীনের পাশে থাকা খালি চেয়ারে ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে বসলো। হাত পকেটে গুঁজে প্রশ্ন ছুড়লো,
“তোরা কনসার্টে যাবি?”
রেশমা বলে উঠে, “অনেক ভিড় হবে কিন্তু।”
ফরহাদ ভাবুক ভঙ্গিতে মাথা দোলায়। বলে, “আরেকটা উপায় আছে। গেলে বল।”
সবাই হাত তুলল। অর্থাৎ সবাই রাজি। ফরহাদ নিশির দিকে চেয়ে শিরীনের দিকে ইশারা করে। নিশি বন্ধুর ইশারা বুঝে শিরীনের উদ্দেশ্যে বলল,
“এই তুমি যাবে?”
“নাহ.. দেরি হয়ে যাবে বাড়ি ফিরতে।”
নিশি জবাব দেয়, “আরেহ চিল। আমরা তোমাকে এগিয়ে দিয়ে আসব। বড়জোর আটটা বাজতে পারে। তুমি বাড়িতে কল করে অনুমতি নিয়ে নাও, কেমন?”
শিরীন কী বলবে বুঝে উঠতে পারল না। বারবার ‘না’ বলাটা ভালো দেখায় না। যদি তারা অহংকারী আর ঘরকুনো মেয়ে ভেবে বসে? মানুষের ভাবনাগুলো নিয়ে ভাবতে ভাবতে হুট করে হাতের কাছে কিছু একটা অনুভব করল শিরীন। টেবিলের আড়ালে থাকা হাতের দিকে তাকাতেই চোখ বড় বড় হয়ে গেল। ফরহাদ হাত এগিয়ে রেখেছে। তার হাতে পেইনকিলার। সে পেইনকিলার শিরীনের হাতের দিকে এগিয়ে দিয়ে ফোন হাতে নেয়। দ্রুত গতিতে মেসেজ লিখল,
“খেয়ে নিন। মাথা ব্যথা কমে যাবে।”
শিরীনের ফোনে মেসেজ আসতেই সে চমকে উঠে। দ্রুত মেসেজটি পড়ল। অবাক চোখে একবার ফরহাদের দিকে তাকাতে চেয়েও চোখ ফিরিয়ে নেয়। ফরহাদ একটিবারের জন্য তার দিকে তাকায়নি। ভাবভঙ্গি এমন যে তাকে চেনেই না। সে মত্ত তার বন্ধুদের সাথে আলাপচারিতায়।
______
শহরতলী ও বাংলা পাঁচ দুটো খ্যাতিমান ব্যান্ড এসেছে টিএসসি চত্বরে। মানুষের ঢল নেমেছে সেখানে। বিশ্ববিদ্যালয় এর শিক্ষার্থীর পাশাপাশি পথ চলতি মানুষেরাও ভীষণ আগ্রহ নিয়ে দাঁড়িয়ে। যারা আগে যেতে পেরেছে তারাই যেন সৌভাগ্যবান ও সৌভাগ্যবতী। কিন্তু ফরহাদ ও তার বন্ধুমহল এই সৌভাগ্যবান ও সৌভাগ্যবতীর তালিকাভুক্ত নয়। তারা হতেও চায় না।
সূর্যের দেখা আজ সারাদিনে মেলেনি। ছয়টার সাথে সাথে এ শহর জুড়ে নামছে শীতল সাঁঝ। বটতলার রাস্তা ধরে হাঁটছে সাত জনের একটি দল। কখনও আঁধারে আড়ালে তাদের অবয়ব, কখনও ল্যাম্পপোস্টের হলুদাভ আলোয় উজ্জ্বল মুখমন্ডল। শুকনো পাতাগুলো সমতল সরণীতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কদম পড়তেই খচখচ শব্দ হচ্ছে। দল বেঁধে হেঁটে গেল ফরহাদরা। কতই না কথা তাদের! সেখানে নীরব একজন – শিরীন।
একজোড়া চোখ তার নীরবতাকে আগ্রহের সাথে চিত্তে ধারণ করছে। সে কী জানে? হয়তো না। জানলেও তার কীই বা আসে যায়?
কনসার্ট শুরু হয়েছে শোনা গেল। বটতলা থেকে একটু এগিয়ে রোকেয়া হল থেকে স্বল্প দূরত্বে রাস্তার পাশে ফুটপাতে আসন পেতে বসলো তারা সকলে। এখান থেকে গানের আওয়াজ স্পষ্ট। ফরহাদ বলল,
“ভালো প্ল্যান না? গান শোনা আমাদের জন্য মুখ্য। অযথা ভিড় ঠেলে টিএসসি যাব কেন?”
সবাই করতালি দিয়ে উঠল। সাধুবাদ জানাল ফরহাদের চিন্তাকে। হাতে চিপস, কোল্ড ড্রিংকস আরো কিছু স্ন্যাকস আইটেম। রাস্তার ধূলোবালি উপেক্ষা করে বসে আছে এক দল।
গান শুরু হলেই মনোযোগী হয় তারা। প্রথমে শহরতলী পারফর্ম করছে,
“একটু পরে বইবে নদী কপোল বেয়ে
জমাট শোকের একলা পাহাড়
বুক চিরে উঠবে নেয়ে
টিএসসি'র গেটে ছোট্ট বটগাছটার নিচে তুমি
আশেপাশে অনেক বন্ধু
হাসি তামাশা
আমি রাজুভাস্কর্যের সামনে, দূর থেকে তোমার উচ্ছলতা উপভোগ করছি
রাস্তা কি পার হবো?
না, থাক
কলাভবন থেকে তোমার পিছুপিছু আসলাম
হাতে একটা গোলাপ
ইতস্তত পদচারনার মতই, দুরুদুরু বুকটা বিব্রত
একবার আমার দিকে তাকালেও না
ফুলটাও হাত বদল হলো না
এত কাছ থেকেও পরিষ্কার আকাশের রংধনুর মত আমার ভালোবাসা
তুমি দেখলে না…”
এই অংশে এসে গান না থামলেও ফরহাদ থামল। নিজেকে গুটিয়ে মনোযোগী ভঙ্গিতে চেয়ে গান শোনা শিরীনের দিকে চেয়ে দেখল একবার। শুভ্র মুখখানার দিকে নৈঃশব্দে প্রশ্ন ছুঁড়ে,
“সে কী বুঝল আমায়? আমিই কতদূর বুঝলাম…”
তেজস্বী ড্রাম কিট, স্ট্রিং গিটার ও জড়ালো কণ্ঠস্বরে শিরীনের দিকে তার একাগ্রতা ফসকে গেল। চেতনা ফিরে গেল গানের লাইনে,
“নীলিকার নয়নে, কতো কথার আয়োজনে
ঝাপসা আবেগ ডানা ঝাপটে গেলো
কোথাকার কোন মেকি হাসি
তোমার হৃদয় কেড়ে নিলো!”
শিরীনের ঠোঁট কোণে এক মৃদু হাসির ঝলক ফুটে। অজান্তেই ভালো লাগছে এই সময়, এই মুহূর্তকে। কখনও এসব উপভোগ করেনি সে। তার চারিপাশে নতুনত্ব। এতটা সুন্দরও বুঝি হয় কোনো সন্ধ্যা?
ঠোঁট টিপে হাসি গভীর চোখে লক্ষ্য করে ফরহাদ। এক অদ্ভুত শান্তি ছেয়ে গেল হৃদয়জুড়ে। সারাদিন পর তাকে হাসতে দেখে বিড়বিড় করে বলল,
“এর চেয়ে সুন্দর কিছু হয়না, এর চেয়ে মূল্যবান এই মুহূর্তে আর কিছুই মনে হচ্ছে না। এই সন্ধ্যাকেও না।”
সামির ধাক্কা দিল আচমকা ফরহাদকে। প্রশ্ন করল,
“কী বিড়বিড় করিস, শালা! ডিস্ট্র্যাক্ট করছিস কেন?”
বুকে জ্বলন্ত আগুনের শিখায় সামিরের কণ্ঠ পানি ঢেলে দিল যেন। এই দহন উপভোগ করছিল ফরহাদ। সামিরের দিকে রাগী দৃষ্টি ছুঁড়ে বলল,
“এত সমস্যা হলে সামনে থেকে সরে যা। আমাকে ডিস্টার্ব করবি না। আমি জরুরী কাজ করছি।”
“অ্যাহ্?” বিকৃত ভঙ্গিতে উচ্চারণ করে সামির।
“কিছু না। চুপ থাক।”
শহরতলীর পারফর্মেন্স শেষে মঞ্চে উঠে। নতুন গানে বন্ধুরাও নড়েচড়ে। নিশ্চয়ই তাদের প্রিয় কোনো গান গাইবে। হলোও তাই। ভোকালিস্ট সুর ধরে। গানের নাম ‘ কনফিউশন’। রাজু ভাস্কর্যের সামনে থেকে ভেসে আসছে উৎসাহী চিৎকারের ধ্বনি।
“এই চেনা শহর, চেনা সময়
সময় গড়ালে অচেনাও হয়
এই তোমায় নিয়ে আমি ভাবি
তোমায় অনেক চিনে ফেলেছি
আসলে কি করেছি?
তোমায় আমি চিনি না, আবার বোধ হয় চিনি
তোমায় আমি চিনি না, আবার বোধ হয় চিনি
এই ভালোবাসা দিলাম তোমায়
কিন্তু একটা কিন্তু থেকেই যায়
যখন দূরে দূরে থাকো তুমি
তখন অনেক ভালোবেসে ফেলি, হায়
আসলে কি বেসেছি?”
গানগুলো শুনে মনে হলো পরিস্থিতির সাথে মিলিয়ে শিরীন-ফরহাদের জন্যই গাওয়া। লাইনগুলো যেন তাদের দুজনকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে। গানের মতোই ফরহাদ কনফিউজড। মারাত্মক রকমের কনফিউজড।
ফরহাদ এবার বিড়বিড় করল না। মনে মনে নিজেকে প্রশ্ন করল,
“আসলে কি বেসেছি? নাকি বাসিনি? না বেসে থাকলে তার মন খারাপে অস্থিরতা কীসের? তার হাসি দেখে প্রশান্তি কীসের?”
মাথায় তালগোল পাকানো শুরু হয়েছে। ফরহাদ মাথার চুল হালকা খামচে ধরলো। ঠিক তখনই শীতল কণ্ঠে কেউ বলল,
“আমি একটু এগিয়ে যাই?”
শিরীনের এমন কথায় রাত্রি প্রশ্ন করে, “কেন? সেখানে তো অনেক ভিড়।”
“দূর থেকে ভিডিও করব। মা’কে দেখাব।”
ফরহাদ প্যান্ট ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। সরাসরি শিরীনের সামনে দাঁড়িয়ে বলে,
“মেয়ে মানুষের ভিড়ে যাওয়ার দরকার নেই। আমাকে দিন, আমি করে আনি ভিডিও।”
রেশমা বলল, “হ্যাঁ এটাই ঠিক হবে। ফরহাদ যাক।”
শিরীন ফরহাদের হাতে নিজের ফোনটা দিয়ে। ফরহাদ দৌঁড়ায় সেদিকে। অনেকটা মোটামুটি কাছে পৌঁছে ভিডিও ধারণ করে কয়েক মিনিট। পুনরায় দৌঁড়ে ফিরে এসে হাঁপিয়ে বলে,
“নিন।”
“ধন্যবাদ।”
সরাসরি কোনো জবাব দেয়নি ফরহাদ। মনে মনে আওড়ায়,
“আপনার ইচ্ছে শিরোধার্য।”
চলবে…

Olindo Rahman

Olindo Rahman

A good book is worth a hundred good friends. 
But a good friend is equal to a library.!! 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Your experience on this site will be improved by allowing cookies Cookie Policy