Buy Now

Search

এই শহরে [পর্ব-০২]

এই শহরে [পর্ব-০২]

একাকীত্ব ও নীরবতার মধ্যে থাকা স্বস্তি সবাই বোঝে না, জানে না, অনুভব করতে পারে না। কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, মন জুগিয়ে চলার ঝুট-ঝামেলা নেই, দ্বিতীয় কারো অধিকার নেই। শান্তি আর শান্তি। কানে হেডফোন গুঁজেছে শিরীন। সময়টা জানুয়ারির মাঝামাঝি হলেও ‘ডিসেম্বরের শহরে’ সারা শীতকাল জুড়েই চলবে শিরীনের প্লে লিস্টে।
‘ঘরে ফেরা তোমার অভ্যাসে নেই,
আর পিছু ডাকা আমার সিলেবাসে নেই
ফিরে পাওয়া এই শহরের ইতিহাসে নেই
বিষাদ চিহ্ন সানগ্লাসে নেই…’
কী সুন্দর গান! কী সুন্দর লাইন! এই শহর কি কিছু ফিরিয়ে দেয়? কেড়ে নিয়ে হয়তো বিনিময়ে সান্ত্বনাস্বরূপ কিছু একটা দেয়। তবে, হারাবার মতো কিছুই কখনও ছিল না শিরীনের। তাই সেসব নিয়ে আর মাথাব্যথা নেই তার।
কিন্তু তবুও! এই শীতের হিম বাতাবরণ তার কেন এত পছন্দের? কেন প্রেম প্রেম অনুভূত হয় প্রতি সন্ধ্যায়? কেন বাতাসে এক সম্মোহনী সুবাস ভেসে বেড়ায়? সে তো প্রেমে মজে নেই। তাহলে প্রতি শীতে কেন এই অনুভূতিরা খেলা খেলে যায় মনের সঙ্গে? এসবের উত্তর বেশ কয়েকটা বছর যাবত খুঁজছে শিরীন। কিন্তু পায়নি।
তখনই ফোনে ‘টুং’ শব্দ করে একটি মেসেজ এলো। কপাল কুঁচকে ফেলে শিরীন। ভার্সিটির গ্রুপে একটি লম্বা চওড়া মেসেজ। মেসেজের আকৃতি বলে দিচ্ছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ওজনদায়ক মেসেজ হবে। শিরীন পড়ল। মূলভাব হচ্ছে,
“আগামীকালের ক্লাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সবার উপস্থিতি কামনা করছি।”
ক্লাস করতে ভালো লাগে না। সেখানে শত মানুষ, শত মানুষের হাজারখানেক কথা। কে শুনবে? শিরীন ‘উফ’ শব্দটি উচ্চারণ করল। ফোন সাইডে রেখে সাদা কম্বল মুড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।
___
“নাক-মুখ ভালোভাবে ঢেকে যা।”
ছোট ফুড বক্সে চারটে পুলি পিঠা রাখতে রাখতে কথাটি বললেন শোভা বেগম। বক্সটি শিরীনের দিকে এগিয়ে দিলেন। সাথে একশো টাকার দুটো নোট বের করে মেয়ের দিকে এগিয়ে দিয়ে ফের বললেন,
“ফিরতে তো মনে হয় বিকেল হবে। বাইরে খেয়ে নিস।”
“আচ্ছা, মা। আসি।”
“যাহ।”
শিরীনদের একতলা বাড়িটি বিশাল। আলাদা আলাদা ঘর। তবে মধ্যিখানে একটি অর্ধ দেয়াল বাড়িকে বিভক্ত করে রেখেছে। একপাশে তার বড় চাচা-চাচী আর সন্তানরা থাকেন। একটি মাত্র ঘর তাদের মা-মেয়ের ভাগে পড়েছে। আর সামনে একটি নামমাত্র উঠান। সেখানেই দিন চলছে বাবার পেনশন ও জমিয়ে রেখে যাওয়া কিছু টাকায়। শিরীনের বাবা কর্মঠ আর চালাক মানুষ ছিলেন। বেঁচে থাকতেই মেয়ের জন্য অল্প অল্প করে টাকা জমিয়ে রেখেছিলেন। সাথে তার ভাগের সম্পত্তি বলতে এই ঘরটিই, সেটিও মেয়ের নামেই করে দিয়ে যান। যেন তার মৃত্যুর পর আর কারো কাছে হাত পাততে না হয়। হচ্ছেও তাই। মা-মেয়ের দিব্যি কাটছে দিন। তবে, এক শূন্যস্থান আছে। যেটি কখনও পূরণ হবে না। কারো সাধ্য নেই পূরণ করার।
বাংলা বিভাগের ছাত্রী শিরীন। অনার্স কমপ্লিট করে মাস্টার্স করছে। নিজেকে সম্পূর্ণ আবৃত করে ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে ডিপার্টমেন্টের দিকে এগোতেই সিঁড়ির সামনে একজনকে দেখতে পেয়ে থমকে যায়। আচমকা বিমূঢ় হয়ে দাঁড়াল শিরীন। কালো জ্যাকেটের পকেটে হাত গুঁজে বন্ধুদের সাথে সিঁড়িতে আড্ডায় মেতেছে ফরহাদ। কিন্তু সে এখানে কেন? তার চেয়ে বড় প্রশ্ন এখানে কীভাবে?
এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করবে? নাহ থাক। যদি অন্যকিছু ভেবে বসে? ঠিক তখনই শিরীনের বিস্মিত চোখে চোখ পড়ে ফরহাদের। ঠিক সে-ও আশ্চর্য হয়ে গেল শিরীনের মতো। হা করে তাকিয়ে রইল তার দিকে। শিরীনের কি বিনয়ের সাথে হাসা উচিত? কী করা উচিত আসলে? এই দ্বন্দ্ব বড়ই বিরক্তিকর!
ঠিক তখনই দেখতে পেল, ফরহাদ চোখ ফিরিয়ে নিয়েছে। ঠিক আগের মত বন্ধুদের দিকে মনোনিবেশ করেছে। এড়িয়ে গেল? এই প্রশ্ন জাগল শিরীনের মনে।
২০৪ নম্বর রুমে সবার শেষের বেঞ্চিতে বসল শিরীন। এখানে সে কাউকে বিশেষভাবে চিনে না। আসলে চিনতে চায় না। বন্ধুত্ব গড়তে চায় না। একাকী এক কোণে বসে থাকে মাথা নামিয়ে। ক্লাস করে বেরিয়ে যায়। আজও তাই। হুট করে কারো আওয়াজ কর্ণপাত হলো,
“পাশে বসলাম..”
শিরীন ত্বরিতে চোখ তুলে চাইল। পুনর্বার বিষম খেল শিরীন। এই লোকটি তার ক্লাসে কী করছে? ততক্ষণে ফরহাদ তার স্থান গ্রহণ করেছে। দুহাত একত্রিত করে কচলে যাচ্ছে, হাত গরম করবার জন্য।
ফরহাদের এক বন্ধু এসে বলল, “মামা! আজকে তোর সিট দখল হয়ে গেছে রে।”
ফরহাদ জবাবে বলে, “বসার জায়গা নিয়ে কাড়াকাড়ি বাচ্চারা করে। আমি যেখানে রাত, সেখানে কাত।”
ছেলেটি শিরীনের দিকে আড়চোখে চেয়ে ইশারা করল,
“ভুলভাল জায়গায় আবার কাত হয়ে যাস না, কেমন?”
ফরহাদ গুরুত্বহীন রইল। ফরহাদের বন্ধুর নাম শিরীনের জানা নেই। দুজনের কথোপকথন শুনল মাথা নামিয়ে। ছেলেটি জবাব না পেয়ে সামনের দিকে এগোয়।
“কেমন আছেন?”
প্রশ্নটি কর্ণগোচর হতেই মাথা তুলল শিরীন। জবাব নিল ম্লান স্বরে,
“ভালো।”
“কী অদ্ভুত কোইন্সিডেন্ট না? একই ক্যাম্পাস, একই ডিপার্টমেন্ট হওয়া স্বত্বেও আমরা একজন আরেকজনকে দেখিনি।”
ফরহাদ তাকাল শিরীনের দিকে। আজ আকাশী রঙের একটি সালওয়ার স্যুট পরেছে। উপরে সাদা উলের সোয়েটার। মাথা নামানো অবস্থায় উন্মুক্ত চুলগুলো মুখমন্ডল আড়াল করে রেখেছে। ভারী বিরক্ত হলো ফরহাদ। এখন অবধি জবাব পায়নি। শিরীন কলমের সাহায্যে খাতায় আঁকাআঁকি করতে করতে বলল,
“উম! আমি ক্লাস তেমন একটা করি না।”
“কেন?”
গম্ভীর মনে হলো কণ্ঠ। যেন রেগে আছে। রাগান্বিত স্বরে জিজ্ঞেস করছে, কেন ক্লাস করে না? করা উচিত ছিল। শিরীন শীতল স্বরে জবাব দিল,
“কোলাহল ভালো লাগে না।”
ফরহাদ কপাল কুঁচকে চোখ বুঁজে। কিছু মুহূর্ত পর চোখ খুলে বলল,
“আপনার কণ্ঠটা কেমন যেন… একেবারে বরফের মতো ঠাণ্ডা। কানে শিরশির অনুভূত হয়।”
এহেন কথা শুনে চমকে উঠে শিরীন। কানে আবার শিরশির অনুভূত কীভাবে হয়? নির্বিকার তাকাল শিরীন। তখনই জানালা চিরে এক দমকা হিম হাওয়া এসে চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে গেল। ফরহাদের দৃষ্টি সরব হয়। বিশৃংখল চুলের ভাঁজ দেখার সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইছে না নেত্র। এভাবে তাকিয়ে থাকায় হতবিহ্বল শিরীন। মুখ ফিরিয়ে নেয় অবিলম্বে।
ফরহাদ হাত বাড়াল শিরীনের ডেস্কে। বিনা অনুমতিতে একটি কলম নিয়ে বলল,
“একটি কাগজ দিন। খাতা কলম কিছুই আনিনি।”
“তাহলে নিজে এসেছেন কেন?”
কথাটি বলেও থেমে গেল শিরীন। ধুর! এভাবে বলা উচিত না। কী না কী ভেবে বসে থাকবে? নিজের একটা এক্সট্রা খাতা বের করে এগিয়ে দিল ফরহাদের দিকে। ফরহাদ বিনাবাক্যে সেটি গ্রহণ করে। আর বলে,
“এসেছি আড্ডা দিতে। বাংলা ডিপার্টমেন্টে পড়ে তো আর জজ ব্যারিস্টার হতে পারব না। সৃষ্টিকর্তার দয়ায় একটা সার্টিফিকেট পেলে বাঁচি।”
কী আশ্চর্য! তাহলে এমন পড়ালেখার মানে কী? ছেলেদের তো চাকরী খুঁজে পরিবারের হাল ধরতে হয়। অনেক দায়িত্ব তাদের। এভাবে গা ছাড়া ভাব কেন?
“উম…”
প্রশ্নটি করবে বলে মুখ তুলেছিল শিরীন। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবল, অন্যের বিষয়ে নাক গলানোর কী দরকার? যে গতিতে ঘাড় তুলেছিল সে গতিতেই নামিয়ে নিল। কিন্তু ফরহাদ বুঝল বিষয়টি।
অসমাপ্ত কথা জানতে শুধায়, “কিছু বলবেন?”
“নাহ। কিছু না।”
“কথা ছিল, বই ফিরিয়ে দেওয়ার অজুহাতে দেখা হবে। কিন্তু সেই অজুহাত নিজেই এক দীর্ঘস্থায়ী অজুহাত খুঁজে নিয়েছে।”
তার নাম ফরহাদ। আগেই জানা আছে। কিন্তু কথা গম্ভীরভাবে বলে। যেন রাগ টেনে ধরে আছে কণ্ঠে। কথার জবাবে ছোট করে বলল,
“হুম..”
“ডেসটিনি আপনাকে আমার পাশের সিটে এনে বসিয়ে দিল।”
মিষ্টি হাসল শিরীন। সত্যিই তাই। বই ফেরানোর অজুহাতে হয়তো আর দেখা হতো না। হলেও খুব কম। নয়তো শিরীন নিজেই অস্বচ্ছন্দতা অনুভব করতো।
ফরহাদ গালে হাত রাখে। সামনের দিকে চেয়ে বলে,
“ডেসটিনি হয়তো চায় আমাদের প্রতিদিন দেখা হোক।”
বেশি গায়ে পড়ছে না? শিরীন আড়চোখে তাকিয়ে বলল,
“আমি প্রতিদিন ক্লাসে আসি না।”
“এখন থেকে আসবেন।”
“কেন?”
“বই কিন্তু আপনার না। আগামীকাল নিয়ে আসবেন।”
“আচ্ছা, আনব।”
ফরহাদ হেসে বলল,
“আমি আবার ফিরিয়ে দেব।”
শিরীনের কপালে ভাঁজ পড়ে। অসভ্য লোক! একটি বইয়ের অজুহাতে তাকে ঘূর্ণিপাকে ঘুরানোর ফন্দি। নিভৃতে ভেংচি কাটল শিরীন। ফরহাদ সেটি চতুর চোখে দেখে ফেলেছে। বলে উঠে,
“দেখেছি কিন্তু!”
_______
মায়ের কথাই ঠিক ছিল। আজ ফিরতে বিকেল নয়, সন্ধ্যা গড়িয়েছে। আযানের একটু আগে ক্লাস শেষ হলো। আজ সকলেই ক্লান্ত। ফরহাদ দুটো ক্লাস করেই উধাও। বাকি তিনটি ক্লাসে তাকে আর পাওয়া যায়নি। খাতা-কলম নিজের সম্পত্তি ভেবেই সাথে নিয়ে গেছে। যাওয়ার আগে ফেরত দেওয়া অথবা বলে যাওয়ার মতো ভদ্রতাটুকু দেখায়নি। নিশ্চয়ই আড্ডায় মজেছে। সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে শীতের প্রকোপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিরীন ওড়না পেঁচিয়ে নিল মাথায়। ঠাণ্ডা বাতাস কানে গেলে নির্ঘাত বাড়ি গিয়ে মাথা ব্যথা বিনা নিমন্ত্রণে হাজির হবে।
বাইকের হেডলাইট জ্বলছে আঁধার নিবারণের উৎস হিসেবে। সামির, শাহেদ, রাত্রি, রেশমা আর নিশি— এরাই ফরহাদের বন্ধুমহল, জোট বেঁধে আড্ডায় মেতেছে। কারোরই বাড়ি যাওয়ার তাড়া নেই। একই সাথে গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করেছে, একই সাথে একই ডিপার্টমেন্টে মাস্টার্সও করছে।
শাহেদ বলল, “মামা, তোর পাশের মেয়েটা কিন্তু সুন্দর ছিল।”
ফরহাদের কপালে ভাঁজ পড়তেই যাচ্ছিল, ঠিক তার আগেই কপাল টানটান করে নেয়। বাইকের চাবি ঘোরাতে ঘোরাতে বলল,
“কী জানি! খেয়াল করিনি।”
“তোর পাশে ছিল আর তুই খেয়াল করিসনি?”
“খেয়াল করতে হবে এমন কোনো কথা আছে?”
শাহেদ জানে ফরহাদের স্বভাব। ক্যাটক্যাটে একটা ভাব আছে। অল্পতেই বিরক্ত হয় সে। তাকে ‘ওয়ান লাইনার’ ডাকা হয়। প্রয়োজনের বেশি একটি শব্দ সহ্য করার ক্ষমতা তার নেই বললেই হলে।
নিশি বলল, “মেয়ে সুন্দর হোক আর অসুন্দর। আমাদের ফরহাদের হৃদয় সেই ছেড়ে যাওয়া নারীর প্রেমে আসক্ত।”
ফরহাদ এবারে মুখ শক্ত করে জবাব দেয়, “ ফালতু কথা বলবি না। বাড়ি যা। ভর সন্ধ্যায় বাইরে কী?”
আড্ডার মাঝে শিরীনকে তাদের সামনে দিয়েই অতিক্রম করতে দেখা গেল। শিরীন দেখেছে তাদের সবাইকে। দুজনের চোখে চোখ পড়তেই ফরহাদ মুখ ফিরিয়ে নেয়। যেন দেখেনি শিরীনকে অথবা চেনেই না। শিরীন দু’বার লক্ষ্য করল বিষয়টি। এই তো একটু আগে গায়ে পড়ে কথা বলছিল। হুটহাট কী হয়?
এসব ভেবে লাভ নেই। বাড়ি ফিরতে হবে। পায়ের গতি বৃদ্ধি করে ক্যাম্পাসের সদর দরজার দিকে এগোতে থাকে। হাঁটতে হাঁটতে ভাবে, লোকটাকে নিয়ে একটু বেশিই ভেবে ফেলা হচ্ছে। এত ভাবা উচিত নয়। সে থাকুক তার মতো।
“খাতা-কলম ফেরত নেওয়ার ইচ্ছে নেই?”
পুরুষালি কণ্ঠস্বর সাথে বাইকের হর্ণের আওয়াজ। দুটো মিলিয়ে ধড়ফড়িয়ে উঠল শিরীন। সবে ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়িয়েছিল রিকশা নেবে বলে। ফিরে তাকাল। ফরহাদ বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শিরীনের তাকানো মাত্রই জ্যাকেটের চেইন খুলে মোড়ানো খাতা আর কলম বের করল। বাইক টেনে শিরীনের সামনে দাঁড় করিয়ে আগ বাড়িয়ে দিল খাতা-কলম।
শিরীন খাতা আর কলম নিয়ে বলল, “ধন্যবাদ।”
ফরহাদ নত মুখে হাসে। হাসবার কারণ কী? শিরীন কি কোনো কৌতুক বলেছে? স্বতঃসিদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে রইল শিরীন। ফরহাদও সেখানেই দাঁড়িয়ে। কেন দাঁড়িয়ে আছে একবার জিজ্ঞেস করা উচিত? আবার দ্বন্দ্বে জড়াল শিরীন। ফরহাদের বিপরীত দিকে মুখ ফিরিয়ে রিকশা তলব করতে থাকে।
“বাড়ি কোথায়?”
কিয়ৎ সময় পর জিজ্ঞাসা এলো ফরহাদের তরফ থেকে। শিরীন অতশত ভাবনায় না ডুবে জবাব দিল,
“আজিমপুর।”
“আমিও সেদিকেই যাচ্ছি।”
শিরীন আপাত দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখল তাকে। ল্যাম্পপোস্টের নিচে ভাসমান পুরুষালি চোখে চোখ পড়তেই নজর ফিরিয়ে নিল। তবে, ফরহাদ স্থির নয়নে তাকিয়ে। এই অতিশয় সৌন্দর্যকে অগ্রাহ্য করতে পারে কোনো পুরুষ?
“আসুন এগিয়ে দিয়ে আসি।”
“প্রয়োজন নেই।”
“সবকিছুর প্রয়োজন হয় না, বানিয়ে নিতে হয়।”
এ পর্যায়ে বিরক্তবোধ করল শিরীন। গোধূলি বেলায় শীতের তীব্রতা প্রকট। বারবার সর্বাঙ্গে কাঁপুনি ধরছে। দুহাত একত্রিত করে বাহু ঘষে যাচ্ছে শিরীন। সে তখনও নিরুত্তর।
“আসবেন?”
শিরীন বলল, “আপনি অযথা কষ্ট কেন করবেন?”
“বাইক চালাতে আবার কীসের কষ্ট? উঠে পড়ুন।”
“থাক…”
“বড্ড বেশি ভাবেন আপনি। আসুন.. ফ্রি লিফট দিচ্ছি না। বিনিময়ে কিছু চাইব।”
শিরীন আশ্চর্যচকিত হয়ে জানতে চায়, “কী?”
“আপনার ব্যাগে যে অবশিষ্ট পুলি পিঠা আছে। সেটি আমাকে দিবেন।”
“আপনি কী করে জানলেন?”
“আমার চিলের চোখ। সবখানে নজর থাকে।”
শিরীন ব্যাগ থেকে ফুড বক্স বের করে। এভাবে কেউ কিছু নিজ থেকে চাইলে বারণ করতে নেই। বক্সটি বের করে ফরহাদের দিকে এগিয়ে দিল। ফরহাদ বিনাবাক্যে সেটি গ্রহণ করে। আস্ত একটি পুলি পিঠা মুখে পুড়ে অস্পষ্ট ভাষায় বলে,
“বাইকে উঠুন।”
“আপনি খেয়ে নিন আগে।”
মিনিট তিনেক এর মধ্যেই দুটো পুলি পিঠা সাবাড় করেছে। খেয়ে হাত ঝাড়া দিতে দিতে বলল,
“পানি…”
শিরীন তড়িঘড়ি করে পানির বোতল বের করে এগিয়ে দেয়। ফরহাদ পানি খেয়ে বলল,
“এবার আসুন।”
“এভাবে…”
“এভাবে অভাবে বাদ দিন। উঠুন।”
কী মহাবিপদ! এখন বাইকে চড়তে হবে? তাকে চেনে মাত্র দুইদিন। তার মাঝে বাইকে চড়া ভালো দেখায় না। ফরহাদ আবার বলল,
“কী সমস্যা?”
“আসছি..”
শিরীন বাইকে চড়ে বসে বাধ্য হয়ে। বিষয়টি তার একেবারেই পছন্দ হচ্ছে না। মানুষ কী ভাববে? ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলল। ফরহাদ তার কালো জ্যাকেটটি একটানে খুলে ফেলে। পরক্ষণেই পেছনে এগিয়ে বলল,
“জ্যাকেট গায়ে দিন।”
“কেন?”
“বাইক চললে বাতাস সহ্য করতে পারবেন না। জমে ভূত হয়ে যাবেন। পরুন এটা।”
“এসবের কোনো প্রয়োজন নেই।”
“বললাম না, প্রয়োজন বানিয়ে নিতে হয়। আপাতত এই জ্যাকেটের উষ্ণতা আপনার ভীষণ প্রয়োজন।”
চলবে….

Olindo Rahman

Olindo Rahman

A good book is worth a hundred good friends. 
But a good friend is equal to a library.!! 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Your experience on this site will be improved by allowing cookies Cookie Policy