Buy Now

Search

তপ্ত সরোবরে [পর্ব-০৮]

তপ্ত সরোবরে [পর্ব-০৮]

দ্বিজা বাড়িতে একা। সে গতকাল চলে এসেছে ও বাড়ি থেকে। ভালো লাগছিল না ওখানে থাকতে। দম বন্ধকর অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল। ফারজাদের বাড়ি, ফারজাদের রুম, ও বাড়ির আনাচে-কানাচে ছড়ানো-ছিটানো ফারজাদের স্মৃতি। সারারাত ঘুম না হওয়ার ফলে চেহারায় একটা অসুস্থতার ছাপ পড়েছে। ওভাবেই দিলরুবা বেগমের কাছে গিয়ে বলেছে, “আম্মু আমার কিছু পোশাক আনতে হবে বাড়ি থেকে।ʼʼ
দিলরুবা বেগম না করেছেন, “কাউকে দিয়ে আনিয়ে নেওয়া যাবে। তোর বাড়িতে যাইতে হবে না।ʼʼ
দ্বিজা জিদ করেছে, তার বাড়িতে যাওয়া জরুরী। শেষ অবধি সুন্দর একটা গ্রহনযোগ্য মিথ্যা বলেছে, সে এ বেলা যাবে, বিকেলের মধ্যেই ফিরে আসবে। তারপর এসে একটা দিন কেটে গেছে মাঝখানে, সে তার পরিকল্পনা আনুযায়ী রয়ে গেছে বাড়িতেই। সকাল থেকে কিছু খাওয়াও হয়নি। দাদি রান্না করে খাবার দিয়ে গেছে ঘরে, খেতে বলে গেছে বহুবার। তাকেও ঝাড়ি মেরে ঘর থেকে যেতে বলেছে দ্বিজা। মোটকথা, খাওয়ার মানিসকতা বা খিদেটাই নেই।
নিজের ছোট্ট ঘরটার বিছানার পাশে জানালার ধারে বসে আছে চুপটি করে। চাইলেও ভুলতে পারছে না সেদিনের বলা ফারজাদের কথাগুলো। ছোটোবেলা থেকেই ফারজাদের প্রতি আলাদা একটা টান কাজ করলেও সে কখনও সেটাকে আহামরি গুরুত্ব দিয়েছিল না। তবে বয়স বেড়েছে, মনের চাহিদা এসেছে, দিন দিন আবেগ-আনুভূতি গুলো পাল্টাচ্ছে। সেই হিসেবে মাসকয়েক ধরে কেন জানি ফারজাদকে নিয়ে ভাবতে ভালো লাগে, ফারজাদকে চোখের সামনে দেখতে ইচ্ছে করে, তার সামনে নিজেকে আকর্ষনীয়ভাবে প্রকাশ করার সুপ্ত ইচ্ছেরা উড়ে বেড়ায় মনে। তবুও এগুলোকে সে মোটেই ভালোবাসা বলতে চায়নি। তবে সেদিন নিজের ভাবনা বদলেছিল তার, যেদিন লাবন্যর চোখে ফারজাদের জন্য অনুরাগ দেখে তার বুকে আগুন লেগেছিল। এক নজরে মুখের হাসি, বুকের প্রফুল্লতা যেন জলন্ত আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
দ্বিজার লাবন্যকে সহ্য হয়নি সেদিন। হঠাৎ-ই মনে হয়েছিল লাবন্যর চোখদুটো নষ্ট হয়ে যাক, যেন ফারজাদকে সে আর প্রেমময় নজরে দেখতে না পারে। সে নিজেও অবাক হয়েছিল নিজের এমন হিংসাত্মক ভাবনায়। সেদিন আর সাজসজ্জা, আনন্দ কোনটাই ভালো লাগেনি। সেদিঅন সকালে ফারজাদের সঙ্গে হাঁটার সময় মনে হয়েছে—এই পথ শেষ না হোক, ফারজাদ ওর ছোট্ট হাতটা চেপে ধরুক, এ জীবনে আর না ছাড়ুক। ফারজাদের সঙ্গে সে একটা জনম এভাবেই চলতে চায়। সেই যাত্রা শেষ করতে মন সায় দেয়নি।
অথচ সে নিজের আনুভূতিটাকে সঠিক নামকরণ করার আগেই ওই নির্দয় পুরুষ তার আনুভূতিকে ছিন্নভিন্ন করে রেখে চলে গেছে। তবে আশ্চর্যজনক ভাবে ফারজাদের প্রতি ঘৃণার আনুভূতি আসছে না। দ্বিজা বুঝে পায়না, মন-মস্তিষ্ক এত বেহায়া কেন? মানসিক চাহিদাগুলো এমন বেলেহাজ কেন?
একটু মলিন হাসল দ্বিজা। কত আশা, স্বপ্ন ছিল তার লাবন্যর বিয়ে নিয়ে। সেদিন লাবন্যর ওপর খুব ইর্ষা হলেও আজ আর তা নেই। মেয়েটা আসলেই ভালোবাসার যোগ্য, অথচ ফারজাদের মতো পাষাণ্ড পুরুষেরই হয়ত যোগ্যতা নেই ওমন একটা মেয়েকে পাওয়ার। তার মনটা আরও অশান্ত হয়ে উঠছে এটা ভেবে—সে কী করে লাবন্যর বিয়েতে না যাওয়ার ব্যাবস্থা করবে? এমন কী আজুহাত দিলে আর ওই বাড়িতে যেতে হবে না, ফারজাদের সামনে যেতে হবে না? এক বাহানা করে চলে তো এসেছে সেখান থেকে, কিন্তু আজকালের মধ্যে না ফিরলে তামাশা হয়ে যাবে। ওই বাড়ির সাথে ছোটোবেলা থেকে রুহু জুরে আছে দ্বিজার। সেই দ্বিজা লাবন্যর বিয়েতে যাবে না, এর পরিপেক্ষিতে কী জবাব দেবে দ্বিজা?

দ্বিজাকে বহুবার ফোন করা হয়েছে। অথচ সে ফোন রিসিভ করে বিভিন্ন বাহানা দেয় পরে আসার। দিলরুবা বেগম ক্ষেপে আছেন প্রচণ্ড। এদিকে দ্বিজার গলা শুকিয়ে আসছে এটা ভেবে, খুব তাড়াতাড়ি একটা সন্দেহে পতিত হবে সে। নিশ্চয়ই কিছু হয়েছে, নয়ত যে মেয়েকে দিলরুবা গালিগালাজ করে মামার বাড়ি থেকে নিতে পারেন না। সেই মেয়ে অনুষ্ঠান রেখে বাড়িতে গিয়ে একা রয়েছে?
বুধবার সন্ধ্যার পর ফারজাদ বাড়ি ফিরল। তখনও দ্বিজার ব্যাপারেই কথা চলছিল। সে বলেছে, তার জ্বর এসেছে হালকা। একটু শরীরটা ভালো লাগলেই চলে আসবে। এরপর আবার বলেছে দাদিকে সঙ্গে নিয়ে একেবারে আসবে। নিকট-আত্মীয়রা আসা শুরু করেছে বাড়িতে। বাজারের লিস্ট তৈরী ও লাবন্যর সঙ্গে দেওয়ার জন্য কেনা কিছু সামগ্রী ঠিকঠাক করে রেখে ফারজাদ খেতে বসল। খাওয়া শেষ করে রুমে যেতে যেতে ইশার আজান পড়ে যায়। গোয়ালে গরু আছে বেশ কয়েকটা, তবে সেগুলোর মধ্যে একটাও অনুষ্ঠানের মাংসের জন্য জবাই করবেন না আজদ সাহেব। কাল সকাল সকাল গরু কিনতে যাবেন, সে কথা জানিয়ে দিলেন ফারজাদকে।
আজাদ সাহেব ইশার নামাজে চলে গেলে ফারজাদ বেরিয়ে যায় বাড়ি থেকে। দ্বিজাদের বাড়িটা আর সব চাচার বাড়িগুলো থেকে আলাদা। এবং ওদের সঙ্গে ওদের দাদি থাকে। ফারজাদ গিয়ে গেইট ঝাঁকালে দ্বিজার দাদি এসে খুলে দিলো গেইটটা। মরিয়ম বেগম বেশ খাতির করলেন ফারজাদের। ফারজাদ সে-সব কোনমতো কাটিয়ে দ্বিজার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করল।
ছাদের এক-কোণে অন্ধকারচ্ছন্ন কুয়াশার ভেতরে গায়ে চাদর জড়িয়ে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দ্বিজা। মনে বিক্ষোভ চলছে তার। পরিবেশের বিপুল ঠাণ্ডা যেন স্পর্শ করতে পারছে না তাকে। আন্ধকারের মাঝে একা এই রাতে ছাদে দাড়িয়ে থাকতে এমনি সময় ভয় পাওয়ার কথা থাকলেও মনের অবস্থার কাছে সব ভয় ফিকে হয়ে গেছে যেন।তবুও হঠাৎ-ই ভারী কণ্ঠস্বর শুনে একটু চমকে উঠল দ্বিজা,
“কী হয়েছে তোর?ʼʼ
দ্বিজার একটু অবাক হলো, সঙ্গে মনের ভেতরে চাপা ক্ষোভ জেগে উঠল ফারজাদের প্রতি। কোন জবাব দিলো না সে। ওভাবেই দাঁড়িয়ে রইল। ফারজাদ পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলল, “জ্বর আসলে মানুষের ঠাণ্ডা লাগে, গরমের দিনেও লেপ-কাঁথা গায়ে দিয়ে শুয়ে থাকে। তোর ঠিক কী ধরণের জ্বর এসেছে, ঠাণ্ডার মধ্যে ছাদে এসে দাঁড়িয়ে থাকা লাগছে?ʼʼ
দ্বিজা এবারেও উত্তর দিলো না কোন। ফারজাদের রাগ হলো, কিছুক্ষণ চুপ রইল নিজেও। এরপর বলল, “চল, ও বাড়িতে তোকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে, সেটা কোন তামাশার পর্যায়ে চলে যাওয়ার আগে ভালোভাবে আমার সঙ্গে চল।ʼʼ
এতক্ষণে দ্বিজা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল কেবল। তার বুক ভেঙে আসছে হঠাৎ-ই। কেন এমন হচ্ছে? ফারজাদকে পাশে পেয়ে? আচমকা মনে এক অদ্ভুত ইচ্ছে জেগে উঠল তার—ফারজাদের বুকে আছড়ে পড়ে শক্ত করে জড়িয়ে করে বলতে ইচ্ছে করল, আমার এত কষ্ট কেন হচ্ছে, ফারজাদ? এরকম গুমোট ব্যথা আগে কখনও অনুভূত হয়নি। নিজেকে এত অসহায় লাগছে কেন? আমার কী হয়েছে, বলতে পারবেন? কেন খুব মূল্যবান কাছের জিনিস হারিয়ে ফেলার যন্ত্রণা হচ্ছে? এত কষ্ট হচ্ছে কেন, আমার? মাঝেমধ্যে এই ব্যথাগুলো অসহ্য লাগছে, আপনি নাকি বুদ্ধিমান, তো বলুন না কেন হচ্ছে এমন আমার সাথে?
এতটুকু ভেবে নিজের অজান্তেই এই ফোঁটা নোনাজল চোয়াল লেপ্টে গড়িয়ে পড়ল মেয়েটার। এই নিঃশব্দ কান্নারা খুব নিষ্ঠুর হয়, একদম ভেতরটা ক্ষয় করে বিনা আওয়াজে গড়িয়ে পড়ে চোখ বেয়ে। অন্ধকারে হয়ত দেখতে পেল না এই অষ্টাদশীর কান্না ভেজা কাতর মুখটা অনুভূতিহীন ফারজাদ। হঠাৎ-ই ফারজাদ বলতে শুরু করল,
“মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড়ো শত্রু হলো তারই নিজের চাওয়াগুলো। অথচ মানুষ সেগুলোই খুব যত্ন করে, নিজের ভেতরে পালন করে। যতদিন মানুষ চায়, সেই চাওয়ার ব্যাপারে কোন ভুল বা অপরাধ তার নজরে আসে না। দ্বিজা, তোর বয়স ছোটো, এ বয়সে স্বাভাবিকই মানুষ ভুলের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। আর তোর জীবনের সেই ভুলটা আমি। ভুলগুলোকে প্রশ্রয় দিতে নেই। যত বেশি পুষবি, তা পরবর্তীতে তত খারাপ পরিণতি হয়ে জীবনে ফিরে আসবে। পড়ালেখায় মনোযোগ দে। তোর আব্বু খুব একটা ভালো মানুষ না। হতে পারে সে এসেই তোর বিয়ের ব্যাবস্থা করে ফেলল।ʼʼ
দ্বিজা ঠোঁট কাঁমড়ে চুপচাপ শুনছে কথাগুলো। ফারজাদ আবার বলল,
“দ্বিজা, আমি ফেরারি। আমার কোন ঠিকানা নেই, মনের দিক থেকে যাযাবর আমি। পরিবার আত্মীয়র প্রতি অগাধ টান থাকলেও ব্যক্তিগত জীবনে কোন নারীর প্রতি টান অনুভব করতে পারি না আমি। তোর এই ভালো লাগাটা ক্ষণিকের। কলেজ পার কর, ভার্সিটিতে যা, এই জায়গা থেকে নিজেকে মুক্ত কর, নতুন পরিবেশে পা রাখ; দেখবি এখনকার সব বোকামি ঘৃণ্য লাগবে। সব কেটে যাবে। মানুষ এক স্থানে পড়ে থাকে না চিরকাল। তুইও তোর এই আবেগী জায়গায় পড়ে থাকবি না। এই সময়ের ভালোলাগা গুলো কিছুটা সময় দিলেই কেটে যায়। তোরও যাবে। আমি ছাড়া তেমন কাউকে কাছ থেকে দেখার বা মেশার সুযোগ পাসি নি তাই মনে হচ্ছে আমার মাঝে আটকে আছিস।ʼʼ
এ পর্যায়ে ফারজাদ তাচ্ছিল্য হাসল, “আমার প্রেমে পড়া যায় না, আমি নিজে নিজেকে ঘৃণা করি। আমার পছন্দ না আমিটাকে। কারণ আমি তোর জায়গা পেরিয়ে এসেছি। তোর বয়সি মেয়েরা আমার মতো ছেলেদের প্রেমে পড়ে, তোর বয়স কাটিয়ে ওঠা মেয়েরা আমাদের ঘৃণা করে। এই পার্থক্যটা তুইও বুঝবি, কিছুদিন সময় দে নিজেকে। কোন ম্যাচিউরড মেয়েকে আমার মতো এমন হৃদয়হীন, কসাইকে ডেট করতে বল, তারা ফিরেও তাকাবে না। কারণ, তারা জীবনের মানে বোঝে। জীবনে এমন একজনকে সবটুকু দিয়ে ধরে রাখতে হয়, যে যত্নশীল হবে, সবসময় পাশে থাকবে। নিজেকে সময় দে, অনুভূতির পার্থক্য বুঝতে পারবি।ʼʼ
ফারজাদের কণ্ঠস্বর শান্ত স্বাভাবিক। দ্বিজার কেন জানি মনে হলো, এসবের পুরোটা সত্যি না। সব ক্ষেত্রে এই কথাগুলো শতভাগ খাটে না। ফারজাদ ওকে এসব কাটিয়ে ওঠার জন্য উলাটোপাল্টা বুঝ দিচ্ছে। ফারজাদের শরীর থেকে কড়া ম্যান পারফিউমের গন্ধ ভেসে আসছে। দ্বিজার শরীরটা আচমকা ঝাঁকি দিয়ে উঠল একটু। ফারজাদ তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে, তারা দুজনে, কেবল তারা দুজন কুয়াশা ঢাকা রাতে ছাদের এক-কোণে পাশাপাশি বেশ কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছে।
ফারজাদের এতক্ষণের বক্তৃতার সবটা কান দিয়ে পিচ্ছিল পদার্থের মতো বেরিয়ে গিয়ে, এই ভাবনাগুলো জড়ো হলো মনে। তবে সে চোখ-মুখে এক প্রকার কঠিন অভিমানি ভাব বজায় রেখছে। তার হঠাৎ-ই মনে হলো, খুব সহজ হবে না ফারজাদের প্রতি এই টান কাটিয়ে ওঠা। তবে নিজের আত্নসম্মান তো বজায় রাখাই যায়। তার অনুভূতি তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। চাইলেও যেহেতু আপাতত কাটানো সম্ভব না। না চাইতেও এই নিষ্ঠুর মানবকে মনে মনে পুষতে হবে। তবে তা আর প্রকাশিত হবে না, দেখাবে না লোকে, বোঝাবে না দ্বিজা কাউকে, নিজের আত্মসম্মানকে বিক্রি করবে না এই বেহায়া অনুভূতির কাছে।

চলবে...
written by: তেজস্মিতা মুর্তজা

Olindo Rahman

Olindo Rahman

A good book is worth a hundred good friends. 
But a good friend is equal to a library.!! 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Your experience on this site will be improved by allowing cookies Cookie Policy