বাসের মধ্যে অন্ধকার। দ্বিজার কাধে ফারজাদের মাথা। ওরা এখন কোথায় আছে জানা নেই। কতক্ষণের মাঝে ঢাকা পৌঁছাবে তা-ও জানে না দ্বিজা। ফারজাদের শরীর থেকে একটা মিশ্র ম্যান পারফিউমের গন্ধ এসে নাকে লাগছে। সিটে বসে থেকে দ্বিজার দেহটা যেন মিলিয়ে যেতে চাইছে সিটের সঙ্গে। অবচেতন মস্তিষ্কে বিভিন্ন ভাবনারা উঁকিঝুঁকি মারছে। ফারজাদ নিশ্চুপ, অথচ দ্বিজার খুব অস্বস্তি হচ্ছে। কিছুক্ষণ পর ফারজাদ উঠে পরে পড়ল হঠাৎ-ই কাধ ছেড়ে। সজাগ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
-“কাদছিস কেন? কী হয়েছে?ʼʼ
দ্বিজা চমকে উঠল, “কাঁদছি? কই নাহ! কাঁদছি না।ʼʼ
-“বুক কাপছিল তোর। ফুপাচ্ছিস এখনও।ʼʼ
দ্বিজা আর উত্তর দিতে পারল না। এতক্ষণ বাস থেমে ছিল কোথাও। এবার চলতে শুরু করল। ফারজাদ আস্তে করে শরীরটা মেলে দিলো সিটে। ক্ষীণ স্বরে বলল,
-“চোখ মুছে ফেল। তুই এক জনমের দায়িত্ব আমার। তোকে কাঁদতে দেখলে নিজেকে বড়ো অপরাধী মনে হবে। জীবনে অপরাধবোধের বোঝটা এমনিতেই খুব বেশি ভারী আমার, সেখানে তোর চোখের পানির ভার যোগ করে আমার বয়ে নিয়ে বেড়ানোর ক্ষমতা কেড়ে নিস না।ʼʼ
একটু থামল ফারজাদ। আবার বলল, “কেন কাদছিস? ভয় লাগছে?ʼʼ
দ্বিজা একটু সময় নিলো উত্তর দিতে, “কীসের ভয়?ʼʼ
-“সেটা অনিশ্চিত। তবে আমার লাগছে ভয়।ʼʼ
কথাটা দ্বিজাকে শঙ্কিত করে তুলল তাৎক্ষণিক। কথাটা শুনতে একটুও স্বাভাবিক আর ভালো শোনায় নি।
রাত একটা বেজে কয়েক মিনিটে পৌঁছাল তারা গন্তব্যে। ফারজাদের ফ্লাটটা চার তলা একটা ভবনে। সে থাকে উপরের তলার একটা ফ্লাটে। তার ফ্লাটে তিনটা বেডরুম দুটো বাথরুম, একটা কিচেন আর সেসবের মাঝখানে ছোট্ট একটা ডাইনিং রুম আর ড্রয়িং রুমের জায়গা একত্রে রয়েছে। তবে আসবাব পত্র তেমন কিছুই নেই। ব্যাচেলরদের আবাস যেমন হয় আর কী! দ্বিজা চোখ ঘুরিয়ে দেখল চারদিকে। দুটো রুম পাশাপাশি। আর একটা কিচেন পার করে যেতে হয়। কিন্তু সেখানে বাইরে থেকে তালা দেয়া।
সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে রুমে ঢুকল সে। রুমের হাল বেহাল হয়ে আছে। পেছনে ফারজাদ ঢুকল। গায়ের শার্ট খুলতে খুলতে বারান্দার দরজার দিকে এগিয়ে গেল। দরজা খুলে দিয়ে পেছন ফিরতেই দ্বিজার মুখোমুখি হলো সে। তখন তার শার্টের সবগুলো বোতাম খোলা শেষ। শার্টটা একটানে খুলে রাখল বিছানার ওপর। পেটানো শরীর! দ্বিজা মুখ লুকানোর জায়গা পায় না। দ্রুত কপালের চুল কানে গুজে অপ্রস্তুত হয়ে দাঁড়াল। ফারজাদের শরীরের এমনভাবে সজ্জিত পেশিগুলো দিয়ে, দ্বিজার চোখ পড়তেই নিদারুন অস্বস্তিতে দম গুলো আটকে এসে আবার দীর্ঘ হয়ে পড়ছে। হুট করে মাথায় এলো তার পরিচয় বদলেছে, সে এখন এই মুহুর্তে একজন এসবি অফিসারের বউ হিসেবে সেই অফিসারের সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছে। পা-দুটো ভঙ্গুর হয়ে এলো। ফারজাদ বলল,
“ওভাবে তাকিয়ে আছিস কেন? আমি তো আর মেয়ে মানুষ নই যে কাপড় বদলাতে অন্য রুমে যাব বা দরজা আটকাব। এখন এভাবে প্রায় প্রতিদিনই দেখতে হবে। ঘরটা গুছিয়ে নে।ʼʼ
দ্বিজার হুট করে মনে হলো, কী রে! লোকটা তো ব্যাপক লাগামহীন! অস্থিরকে আরও অস্থির করে তোলা কথাবার্তা বলা মানুষগুলো খুব অসহ্যকর হয়। এই যেমন এখন ফারজাদকে লাগছে একটা অসহ্যকর মানুষ। ফারজাদ তোয়ালে কাধে চড়িয়ে হাত-মুখ ধুয়ে এলো। দ্বিজা বিছানাটা ঝেরে, এলোমেলো হয়ে থাকা কাপড় গুছিয়ে শেষে ঘরটা ঝাড়ু দিলো। এভাবে সে বহুদিন ফারজাদের ঘর গুছিয়েছ। সেসসব দিনের সেই সকল কাজ আর আজকের মধ্যে বিস্তর ফারাক। চুলগুলো হাত দিয়ে খোঁপা করে নিলো। জানালাগুলো খুলে দিলো। বিল্ডিংয়ে গরমকালে রাতের বেলা দম আটকে আসা পরিবেশ সৃষ্টি হয়। এখন ঘরটা দেখতে একটু মানুষ বাসের উপযোগী লাগছে। দ্বিজা ভেবে পেল না দেখতে পরিপাটি এই মানুষটা এখানে এমন যাচ্ছে-তাই হয়ে বসবাস করে!
ফারজাদ ফ্রিজ খুলে দেখল–সপ্তাহখানেক আগের দুটো আপেল ছাড়া বিশেষ কিছু নেই সেখানে। এবার হুট করে ফারজাদের মনে হলো–এটাই বুঝি সংসার জীবনে পুরুষের দায়িত্বের গণ্ডা! সে একা হলে খেত না এখন, বারান্দায় দাড়িয়ে কয়েকটা সিগারেট টেনে এসে ধপ করে বিছানায় পড়ে টানটান হয়ে শুয়ে থাকত। রুমে গিয়ে দ্বিজাকে পেল না। বারান্দায় রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ। খুব সংকটময় লাগছে সময়টা ফারজাদের কাছে। সবকিছুর সহজ সমাধানদাতা দায়সারা ফারজাদ একটা শুকনো ঢোক গিলল। সে হাত ধরে সঙ্গে করে বের করে এনেছে মেয়েটাকে। পাশে গিয়ে দাঁড়াল দ্বিজার। খুব হাঁসফাঁস লাগছে, এ কী মুশকিল! ফারজাদ কথা বলতে পারছে না কেন? এরকম অসহায় লাগে নি তার জীবনে।
-“রান্না করতে পারিস তুই?ʼʼ
-“ঘরে কিছু নেই তেমন।ʼʼ
কথাটা ধাক্কা দিলো ফারজাদকে। শুনতে ঠিক এমন লাগল–যেন বহু বছরের অভিজ্ঞ এক গৃহিনী অভিযোগ করছে ঘরে রান্নার সরঞ্জাম নেই। কিন্তু দ্বিজা কী করে জানল? মেয়েরা বোধহয় জন্মগতই এক নিবিড় সুপ্ত ক্ষমতার অধিকারী হয় ঘর-সংসার সামলানোর। এই যে কিছুক্ষণ আগে এসেছে এই মেয়ে। ফ্লাটের রঙ বদলেছে, তার কথার ধরণ হুট করে বদলে বেশ কর্তব্যরত গৃহিনীর মতো শোনাচ্ছে। ফারজাদ বলল,
-“তুই থাক,আমি আসছি একটু। দরজা লাগিয়ে দিয়ে যা।ʼʼ
-“শুনুন!ʼʼ
ফারজাদ পেছন ফিরে তাকাল। দ্বিজা কণ্ঠস্বর গম্ভীর লাগল শুনতে, “এখন অনেক রাত হয়েছে। কোথায় কী আনতে যাবেন? লাগবে না কিছু। আমার ক্ষুধা লাগে নি। আপনি..ʼʼ
“চল আমার সঙ্গে। দেখি কিছু পাওয়া যায় কিনা!ʼʼ
-“রাত দুটোর বেশি বাজে। এই সময় কোথায়, কী পাওয়া যাবে?ʼʼ
-“এটা ঢাকার শহর।ʼʼ
-“হবে ঢাকার শহর। তবে রাতের প্রভাব থেকে মুক্ত নয় এই শহর।ʼʼ
ফারজাদ তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ দ্বিজার গুমোট মুখটার দিকে। তার মেজাজ বিগড়াচ্ছে। এমনিতেই ব্যাপারটা এত অস্বস্তিকর। তার ওপর এই মেয়ে এত ম্যাচিউরিটি দেখাবে কেন? কথাবার্তা শুনতে কেমন অদ্ভুত ভারী লাগছে। অথচ বেশি দিন হয়নি, কথা গুলিয়ে ফেলত মেয়েটা।
তাদের একসূত্রে বন্দি হয়ে যাওয়া প্রথম রাতটা কাটল অভুক্ত। মেয়েটার মুখে কোনো অভিযোগ নেই, তবে লেপ্টে আছে নীরবতা। পরনে সেই বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময়কার সালোয়ার-কামিজটা। ফারজাদ বেশির ভাগ সময় বাইরে খেয়েছে। ফ্লাটের রান্নাঘরটা একদম অপ্রয়োজনীয় পড়ে থেকেছে। অথচ আজ মনে হলো ওই ঘরটাই সবচেয়ে হারাভরা রাখার ছিল তার। তার আত্মমর্যাদাবোধ নিষ্পেষিত হয়ে যাচ্ছে আজকের পরিস্থিতির বদৌলতে। নিজের মাথার চুলগুলো টেনে ছিঁড়তে ইচ্ছে করছে। এত বেপরোয়া, দায়সারা ফারজাদ আজ একটা মেয়ে ধৈর্য্যের কাছে নিজেকে কর্তব্যপরায়নহীন হিসেবে কী করে মেনে নেবে? এই মেয়েটা প্রথম থেকে তাকে জ্বালাচ্ছে। বারবার ভুল প্রমাণিত করে আসছে। নিজের কোনো ভাবনা এবং সূত্র দিয়েই মেলানো যায় না দ্বিজার হিসেব। সর্বক্ষেত্রে ফারজাদকে ওভার-টেক করে নিজেকে প্রমাণ করে চলেছে মেয়েটা! ফারজাদ প্যাকেটের শেষ সিগারেটটা ধরাল।
ত্রস্ত পায়ে একবার রুমে এলো। দ্বিজা চুপচাপ বসে আছে বিছানায় হাঁটু মুড়ে। বারান্দায় চলে এলো। আসলে সে কী চাইছে তা নিজের কাছেই স্পষ্টতর হচ্ছে না। নিজের প্রতি কি সে নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে! আধপোড়া সিগারেটটা ক্ষিপ্ত হাতে ছুঁড়ে ফেলল কোথাও। রুমে এলো। বসল বিছানায়। দ্বিজা ওভাবেই বসে আছে। হাঁটু মুড়ে মুখটা হাঁটুতে রেখে দুহাত দিয়ে জড়িয়ে রেখেছে পা দুটো, দৃষ্টি দেয়ালে।
“ঘুমাবি না?ʼʼ
মুখ তুলে চাইল দ্বিজা, “আপনি ঘুমাবেন না?ʼʼ
“আমার জন্য বসে আছিস?ʼʼ
দ্বিজা তাকাল ফারজাদের দিকে, দুপাশে মৃদু ঘাঁড় নাড়ল।
“তাহলে বসে আছিস কেন?ʼʼ
-
একটা অপরিকল্পিত অভাবনীয় কাজ করে বসল দ্বিজা। হুড়মুড়িয়ে ফারজাদকে জড়িয়ে ধরল। ফারজাদ একদম প্রস্তুত ছিল না ব্যাপারটার জন্য। সে একটু থমকে গেল, শরীরের নিয়ন্ত্রণ হারাতে গিয়ে আবার সামলে নিলো নিজেকে। দ্বিজার শরীর কাঁপছে। ফারজাদের গলাটা জড়িয়ে ধরে আছে মেয়েটা। কান্নার তোড় বাড়ছে তার। একসময় কম্পমান, কান্নাজড়ানো কণ্ঠে বলল, “আমার ভালো লাগছে না, ফারজাদ।ʼʼ
কী হলো জানা নেই ফারজাদের। তার বুকটা আচমকা মোচড় মারল। কী যেন হচ্ছে আজ ক'দিন তার সাথে। আজ মনে হলো গাঢ়, ঘনীভূত এক কুণ্ডলি বুকের মাঝটায় ধাক্কাধাক্কি করছে, সজোরে ধাক্কাচ্ছে। ফারজাদকে ভাঙতে চাইছে, গুড়িয়ে ফেলতে চাইছে ফারজাদ নামক জীবন্মৃত প্রায় সত্তাটাকে। দ্বিজার কান্নার তোড়ে তার ছোট্ট দেহটা কেঁপে কেঁপে উঠছে যেমন ফারজাদের বুকে। ফারজাদের বুকটাও কাঁপল। সে জানে না তার কী করা উচিত এখন, কী করতে হবে তাকে। অবচেতনায় অথবা অচেতনায় দ্বিজাকে বুক থেকে তুলে ছোট্ট মুখটা দুহাতের আজলায় নিলো। মেয়েটা তার ঘরে এসে প্রথম রাত পার করছে খালি পেটে। আবার তার বুকে নিজেকে সঁপে কাঁদছে। ফারজাদকে ঋণী করতে চাইছে নাকি এই মেয়ে? এসব ফারজাদের কঠোর দেয়ালখানায় প্রতিনিয়ত আঘাত হানছে, তা বুঝছে না কেন মেয়েটা?
চোখে পানি মুছে দিলো ফারজাদ দ্বিজার। দ্বিজার নাক লাল হয়ে আছে। ঠোঁট দুটো থুতনির সাথে তাল মিলিয়ে কাঁপছে। ফারজাদ পাগলামী করে বসল। দ্বিজার গালে থাকা বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে দ্বিজার ঠোঁট ছুইয়ে হঠাৎ-ই ঠোঁট দিয়ে প্রায় কামড়ে ধরল দ্বিজার ঠোঁট। দ্বিজা মুহুর্তে বহুদিনের অসুস্থ, দুর্বল মানুষটার মতো নেতিয়ে পড়ল। হাত দিয়ে মুঠ করে চেপে ধরল ফারজাদের মাথার পেছনের চুলগুলো। ফারজাদ আজ এক তৃষ্ণার্ত পুরুষ। বহুদিন ভাঁটার আগুনে মাটি পুড়ে ইট হবার সেই ইটে পানি দিলে যেমন ইট শুধু পানি শুষতেই থাকে, ফারজাদকে আজ পোড়া ইটের ন্যায় লাগছে। দ্বিজার কান্নামখা ভাঙা ঠোঁটজোড়া অঝোরে ঝরতে থাকা শীতল জল!
মিনিট কয়েক কেটে যাওয়ার পর চট করে দ্বিজাকে ছেঁড়ে এক ঝটকায় দাঁড়িয়ে পড়ল ফারজাদ। দ্বিজা এখনও বিস্ময় এবং অপ্রস্তুত ভাব কাটিয়ে উঠতে পারছে না। থেরে বসে রইল সে। ফারজাদ ভারী পা ফেলে বেরিয়ে গেল রুম থেকে। সেদিকে তাকিয়ে রইল কেবল। ফারজাদকে দেখে মনে হচ্ছে–সে খুব বড়ো ভুল করে ফেলেছে উত্তেজনায়। সে অনুতপ্ত। এড়িয়ে যেতে চাইছে মুহুর্তটা। সে চায়নি এমন কিছু হোক। পাপ করে ফেলছে। অনুশোচনা হচ্ছে খুব!
চলবে..
Leave a comment
Your email address will not be published. Required fields are marked *