ফজরের নামাজ আদায় করে একটু ঘুমিয়েছে দ্বিজা। বেলা নয়টার দিকে বালিশের পাশে থাকা ফোনটা ভাইব্রেট হচ্ছে, সাথে বিকট আওয়াজ। বিরক্ত হয়ে ফোন কানে তুলে নিলো দ্বিজা।
-“দিনকাল কেমন যাচ্ছে শালী সাহেবা!ʼʼ
দ্বিজা অস্পষ্ট উচ্চারণ করল, “ইরফান ভাইয়া!ʼʼ
-“হু, ইরফান ভাইয়া। এখনও ওঠো নি ঘুম থেকে? বেশি সুখে মানুষের ঘুম বাড়ে নাকি?ʼʼ
দ্বিজা উঠে বসল এবার, ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল–বেশি সুখ! ইরফান বলল, “বুঝলে শালী সাহেবা! কাহিনিতে টুইস্ট আসছে।ʼʼ
কথাটা বুঝতে পারল না দ্বিজা, “মানে? সাতসকালে কীসের টূইস্ট দিতে ঘুম ভাঙালেন ভাই আপনি? জীবনে এমনিতে কি প্যাচের অভাব পড়ল নাকি?ʼʼ–একটু তাচ্ছিল্য করে বলল কথাটা দ্বিজা।
-“গতকাল ফারজাদ ওয়াহিদকে তোমার মতামত জানার জন্য বলেছে।ʼʼ
দ্বিজা অবাক হলো, “ফারজাদ?ʼʼ
-“হুম, ফারজাদ। এটাও বলেছে তুমি তাকে ভালোবাসো। বিয়ে ভাঙার চেষ্টা বলেই মনে হচ্ছে।ʼʼ
-“আশ্চর্য! তা বলার তার এমন কীসের দরকার পড়ল? এরকম ইতর লোক আমি দুটো দেখিনি। চাচ্ছেটা কী সে?ʼʼ
-“উহহুহ! ওই ইতরকেই দিল দিয়ে বসে আছো। এটা ভুলে যাওয়া যাবে না।ʼʼ–হাসল ইরফান।
দ্বিজা যেন গম্ভীর গলায় বলার চেষ্টা করল, “সেসব পুরোনো কথা।ʼʼ
ইরফান হেসে ফেলল, “বাপরে! দু'দিনে কথা পুরোনো হয়ে যায় তোমার কাছে। তুমি তো খুব এডভান্স, দ্বিজা!ʼʼ
-“মজা নিচ্ছেন?ʼʼ
“নিচ্ছি অল্প একটু। শোনো, এখন কথা হচ্ছে, এতে যা বুঝলাম তা হলো– ফারজাদ বাবু বোধহয় সন্তষ্ট না তোমার বিয়েতে, বুঝলে!ʼʼ
দ্বিজা তাচ্ছিল্য হাসল, “ভাই আপনি খুব বোকা। অন্তত ওই মানুষটাকে জানার ক্ষেত্রে। এই তো দু'দিন আগেও বিয়ের শুভেচ্ছা জানিয়েছে আমায়। এখন আবার বলবেন, তাহলে কাল কেন ওয়াহিদকে এমন বলেছে? সে খুব ন্যায়পরায়ণ লোক তো! সেদিন জানতে পারল আমার মত ছিল না বিয়েতে। তাই একটু ইনসাফ দেখাতে গিয়েছিল। সে আবার কোনো মেয়ের সাথে অবিচার হতে দেখতে পারে না। এসব নিয়ে ভাববেন না। তাকে চেনায় এরকম ভুল আমিও করেছি আগে বহুবার।ʼʼ
আরও দু-চারটে কথা বলে ফোন রাখত দ্বিজা। ফারজাদ কী চাইছে? সে যা ভাবতে চাইছে তা ভাবতেই নিজের ভাবনার ওপর উপহাস করে হেসে উঠল। নিজেকে বিদ্রুপ করল–দ্বিজা তুই খুব কাল্পনিক। তবে কল্পনাও একটা সীমার মধ্যেই বদ্ধ রাখা দরকার। এসব বোকা ভাবনা ভাবার ফুরসত দিতে নেই মস্তিষ্ককে। আর যেখানে লোকটা ত্যাগের তালিকাভুক্ত হয়ে পড়েছে..
—
একদিন কেটে গেছে মাঝে। আজ মঙ্গলবার। আজাদ সাহেব খেতে বসেছেন। সকাল সাড়ে আটটার মতো বাজছে। আড়ৎয়ের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যাবেন তিনি। ফারজাদ নেমে এলো সিঁড়ি বেয়ে। পরনে তার থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট, একটা টিশার্ট, এলোমেলো চুলে আলুথালু বেশ। চুলে হাত চালাতে চালাতে এসে বসল একটা চেয়ারে। উপস্থিত চারজোড়াজোড়া চোখে বিস্ময়। এসময় না ফারজাদের ঘুম ভাঙে আর ভাঙলেও তার খেতে দেরী হয়।
-“একটু কি মানুষ হইতেছিস দিন দিন!ʼʼ
আজাদ সাহেবের কথার এক অবাঞ্ছনীয় জবাব দিলো ফারজাদ, “না তো। তেমন কিছুই না। আম্মা, এককাপ কফি-টফি দেন।ʼʼ
ফিরোজাকে উদ্দেশ্য করে বলল, “আম্মার ঘর থেকে টোস্ট বিস্কুট এনে দে, যা।ʼʼ
আফছানা বেগম কফি নিয়ে এলেন। ফিরোজা টোস্ট এনে রাখল টেবিলের ওপর। ফারজাদ গোটা প্যাকেটটা নিয়ে বসল। একটা বিস্কুট কফিতে ভিজিয়ে ধরে বলল, “আম্মা! আমার এখন বিয়ে করে নেওয়া উচিত না?ʼʼ
অবাক হওয়ার সাথে সাথে সকলে লুকানো খুশি আর কপট রাগ নিয়ে তাকাল ফারজাদের দিকে। আজাদ সাহেব বললেন, “সেই সুমতি তোর হইলে তো!ʼʼ
-“ধরুন হয়েছে।ʼʼ
ফারহানা বেগম উত্তেজনা চেপে বললেন, “তাহলে মেয়ে দেখব, বাপ? এই জন্যই আসছিস এবার? বাদর, আগে বললেই তো আমি দু'দিন আগে থেকে দেখা শুরু করতাম আর..ʼʼ
-“রিল্যাক্স আম্মা! আপনাদের খাটুনি খাটতে হবে না। মেয়ে আছে, মেয়ে দেখার পরেই বিয়ের পোকা খোচাচ্ছে টুকটাক ভেতরে।ʼʼ
—
মাগরিবের নামাজ পড়ল দ্বিজা। অনেকক্ষণ বসে রইল জায়নামাজে। কী চলছে জীবনে তার? কোন দিক অভিমুখে বয়ে চলেছে জীবনতরী? কত জটিল হয়ে উঠছে পারিপার্শ্বিক অবস্থাটা। দ্বিজার আজকাল মনে হয়, সবচেয়ে অসহায় আর কঠিন মেনে নেওয়া হলো–নিজের ইচ্ছে ও পছন্দের বিরুদ্ধে কাউকে জীবন-সঙ্গী হিসেবে মেনে নেওয়াটা। যাকে কোনোদিন চাওয়া হয়নি, জীবনে কখনও স্বপ্ন দেখা হয়নি, যাকে ঘিরে মায়াময় শক্ত পিছুটান নেই, যার প্রতি মুগ্ধ হওয়া হয়নি, যাকে প্রার্থনায় চাওয়া হয়নি সেরকম এক অপরিচিতর নামে জীবনটা সঁপে দেওয়াটা এত নিষ্ঠুর অনুভূতির জন্ম দিচ্ছে ভেতরে। মনে কেউ না থাকলে অবশ্যই কাউকে জায়গা দেওয়ার চেষ্টা করা যায়, জায়গা হয়েও যায়। অথচ অন্য কাউকে পুষে রেখে আরেকজনের নামের সাথে জুড়ে যাওয়ার মতো এই সংকটময় দিন কেন এলো তার জীবনে? এত কঠোরতার খেলায় মত্ত হয়েছে জীবন তার সাথে! দ্বিজা পারবে মেনে নিতে, তবে ভালো থাকতে পারার উপায় কী!
ফোনটা বেজে উঠল, দ্বিজা উঠল না। একাধারে বাজছে, দুবার, তিনবার। বিরক্ত হয়ে চোখ মুছে উঠে ফোনটা হাতে নিলো। ফারজাদের কল। দ্বিজা বিস্মিত হলো বটে, তার চেয়ে জোরালোভাবে বুকের ভেতরে সূঁচাল এক যন্ত্রণা নাড়াচাড়া দিয়ে উঠল। সামলালো নিজেকে। বহু দুর্বলতা দেখিয়েছে সে।
-“কল রিসিভ করছিস না কেন?ʼʼ
-“কৈফিয়ত চাচ্ছেন?ʼʼ
-“প্রশ্নই ওঠে না। আমি কেন তোর কাছে কৈফিয়ত চাইব? চারবার কল দিয়েছি। লাইন ব্যস্ত ছিল।ʼʼ
দ্বিজা হতাশ শ্বাস ফেলল। বলল, “কেন কল করেছেন?ʼʼ
-“তোর বাপ কোথায়?ʼʼ
-“বাজারে গেছে। কেন?ʼʼ
-“ফুপু?ʼʼ
দ্বিজার অস্থির লাগছে এই লোকের সঙ্গে কথা বলতে। কেমন যেন বুক ভার হয়ে উঠছে, সাথে অস্বস্তি ঘিরে ধরছে খুব। আস্তে করে বলল, “বাড়িতে।ʼʼ
মুহুর্তের মাঝে কল কেটে গেল। দ্বিজা কপাল কুঁচকে তাকাল ফোনের দিকে। আশ্চর্য লোকটা আম্মু-আব্বুর খোঁজ নিতে কল করেছিল কেবল? কেন? দ্বিজা ফোন রেখে বাথরুমে গেল ফ্রেস হতে। মুখে-চোখে পানি দিয়ে বেরিয়ে গামছা খুঁজল পেল না। রুম থেকে বেরিয়ে ডাইনিং রুমে আসল। দরজায় করাঘাত পড়ছে। দাদি দরজা খুলে দিয়েছে, ফারজাদ ঢুকল ভেতরে। সেদিকে চোখ পড়তেই থমকে দাঁড়াল দ্বিজা। বুকটা ধুক করে উঠল। এই লোক এখানে কেন এসেছে? আশ্চর্য! তাহলে কি বাড়ির আশেপাশেই ছিল? কিন্তু এসেছে-টা কেন? ফারজাদ এগিয়ে আসতে আসতে দ্বিজার শুকনো মুখটা দিকে তাকাল। দ্বিজাও তাকিয়ে রয়। মস্তিষ্ক চোখ সরাবার নির্দেশ দিলেও যেন চোখ আজও নিজেকে বড়ো নির্লজ্জ প্রমাণ করল। মানল না সেই নির্দেশ, তাকিয়ে রইল লম্বাটে মানুষটার দিকে চোখ উচিয়ে। দ্বিজার দিকে তাকিয়ে থেকেই গলা বাড়িয়ে ডাকল ফারজাদ,
-“ফুপু...!ʼʼ
দিলরুবা বেগম দৌঁড়ে এলেন রান্নাঘর থেকে। বিস্মিত ও আতঙ্কিত চোখের দৃষ্টি তার। ফারজাদ হাসল মৃদু, “ভয় পাচ্ছ নাকি, ফুপু?ʼʼ
দিলরুবা বেগম আস্তে করে ঘাঁড় নেড়ে 'নাʼ বোঝালেন। যে যা-ই বলুক এই খিটখিটে ফারজাদকে তিনি খুব ভালোবাসেন। কেন বাসেন জানেন না। তবে কেন জানি মনে হয় এই ছেলেটাকে ভালো না বেসে থাকা যায় না। একে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। এটা গোপনে হলেও মানতে হবে। কেমন করে যেন তাকিয়ে রইলেন ফারজাদের দিকে। ফারজাদ হেলেদুলে এগিয়ে গেল একটু। ফুপুর চোখে চোখ রেখে বলল, “যদি অনুমতি দাও দ্বিজার সাথে একটু কথা বলব।ʼʼ
একটু থেমে একটা শ্বাস নিয়ে বলল, “ভয় পেও না। ফুপা আসলে হেন্ডেল করে নেব আমি। আর আসব না কখনও বোধহয়, হতে পারে শেষবার কথা বলব আজ। হয় শেষবার নয়ত শুরু।ʼʼ
ফারজাদের কণ্ঠে কিছু ছিল। যাতে অজান্তেই গা'টা শিউরে উঠল দ্বিজার। কী কথা বলবে মানুষটা? চোখটা ফিরিয়ে নিলো। বুকটা অপ্রত্যাশিত কোনো আতঙ্কে মুচড়ে মুচড়ে উঠছে খুব। পেটের ভেতরে পাক জড়িয়ে আসছে। খুব অস্বস্তি আর বুক ধড়ফড় করছে কেন জানি। ফারজাদ হেঁটে গিয়ে দ্বিজার ঘরের সাথে লাগোয়া ছোট বারান্দাটায় দাঁড়াল। দ্বিজা কী করবে ঠিক বুঝে আসছে না তার। এত বাজেভাবে বুক কাঁপছে কেন? কী মুশকিল! গা ঝিমঝিমে অনুভূতি হচ্ছে। শরীরটা কেমন অদ্ভুত শিহরণে উত্তেজিত হয়ে উঠছে। ফারজাদের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে ইচ্ছে করছে না। দুটো গভীর শ্বাস ফেলল। নিজেকে ধাতস্থ করল। আম্মুর দিকে একবার তাকিয়ে ঘুরে হাঁটা লাগাল বারান্দার দিকে। হাহ! লোকটা বারবার আসছে বুকের জ্বালা বাড়াতে, বারবার এসে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে দুর্বল, ক্ষীণ অনুভূতিতে ভেঙে পড়া দ্বিজার খুব কাছে।
-“শুধু আমি বলব। তুই শুনবি, কোনো উত্তর দিবি না। অল্প কিছুক্ষণ সময় দে শুধু।ʼʼ
দ্বিজার বুকের আলোড়ন টের পাচ্ছে না এই লোক। কেন জানি তাকাতে ইচ্ছে করল না ফারজাদের দিকে। চাপা এক ক্ষোভ ঘিরে ধরছে ক্রমশ!
-“বাসের দুটো টিকেট কেটেছি আগামীকাল সন্ধ্যার। এবার আর কেন জানি একা ঢাকা ফিরতে ইচ্ছে করছে না। কী মনে করে যেন দুটো টিকেট কেটে ফেললাম। শুধু শুধু একটা টিকেট গচ্চা যাবে। আমার তো সিট একটা হলেই চলে। বাড়িতে বললাম, বিয়ে করব ভাবছি। সায় দিলো। কিন্তু যখন তোর নাম বললাম–বলেছে হাবিবের মেয়েকে নিয়ে ওই বাড়িতে ঢুকার অধিকার রাখি না আমি। তোর বাপ ফোন করে আমার পরিবারের ভালো মতো খিস্তি ঝেরেছে। তোর বাপের ক্ষোভ আমার পরিবার নিয়ে, আমায় নিয়ে এত ফাটে কেন মাথায় ঢোকে না। বহুত কথা শুনিয়েছে তোর বাপ। আমার নাকি জন্মে দোষ ছিল, এজন্য আমি কুলাঙ্গার, আর অভিশপ্ত। ভালো, শুভ যেকোনো কাজে বাঁধা হয়ে দাঁড়াই। যেমন তোর বিয়েতে বাধা হয়েছিলাম।তোর শুভ বিয়েতে তোর মনের অবস্থার জন্য যে বাধা সৃষ্টি হয়েছিল, তার জিম্মাদার আমি। অবশ্য ভুল বলেনি তোর বাপ।ʼʼ
একনাগাড়ে বলে গেল কথাগুলো ফারজাদ। দ্বিজা যে বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। সেদিকে তার সমীহ নেই বিশেষ। এবার যেন দ্বিজার ভেতরের জলন্ত আগুনটুকু বেড়িয়ে এলো শব্দ হয়ে, “কী ভাবেন আপনারা আমাকে? ঘরের আসবাব? যেখানে যেভাবে রেখে দেবেন দাঁড়িয়ে থাকব চিরকাল। ইচ্ছেমতো জায়গা পরিবর্তন করবেন, রঙ লাগাবেন, ডিজাইন করবেন মনমতো? আমি জড়ো পদার্থ! আমি বাচ্চা ছেলের হাতের খেলনা? যখন তখন মা-বাপ, আপনি খেলছেন, মন ভরলে ছুঁড়ে ফেলছেন, আমি পড়ে থাকছি যেখানে সেখানে?ʼʼ
কান্নার তোড়ের সঙ্গে গর্জে উঠল দ্বিজা। কান্নাভেজা কণ্ঠস্বর ছাপিয়ে বেজে উঠল দ্বিজার ঝাঁজাল গলাটা। দিলরুবা বেগম ভেতরে দ্বিজার ঘরে এসে দাঁড়াল। ততক্ষণে দ্বিজাও চিৎকার করতে করতে এসে ঘরে দাঁড়িয়েছে। ফারজাদ শান্ত পায়ে হেঁটে এসে বসল দ্বিজার বিছানায়। দিলরুবা বেগম হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তার চোখে-মুখে নিদারুন হতাশা! কেমন বিবর্ণ মুখের ভাব। নেতিয়ে গেছে আজ এক মেয়ের মায়ের। ফারজাদ খুব বেশি সময় নিলো না, প্রশ্ন করল,
“আমি খুব খারাপ, তাই না ফুপু? হুহ.. আমি কখনও অস্বীকার করিনি এ-কথা। তবে আমি ঠিক কেমন ধরনের খারাপ, তা নিয়ে আমার কোনো ধারণা নেই। প্রায়ই লোকে বলে–আমি মানুষ না। আমার শরীরে মানুষের চামড়া নেই। এটাও মানতে চাই আমি। কিন্তু যুক্তির কাছে হেরে যাই। সকলেই শুনেছে কথাটা–মানুষ মাত্রই স্বার্থপর। সেখানে আমি মাত্রার অতিরিক্ত স্বার্থপর। হিসেবে কিন্তু আমি অতি মানুষ। সে চামড়া এখন মানুষের না-ই থাক। সূত্রানুসারে, আমি কিন্তু সকলের চেয়ে বেশি মানুষ, কারণ আমি সকলের চেয়ে বহুত গুণে বেশি স্বার্থপর।ʼʼ
একটু থামল ফারজাদ। দ্বিজা অপলক তাকিয়ে আছে ফারজাদের দিকে। ওই অদ্ভুত ভাবাবেগে পূর্ণ মুখটায় কিছু খোঁজার বা বোঝার চেষ্টা করছে সে। ফারজাদ বলল,
“ফুপু, একটা আবদার রাখবে আমার? আবদারটাও করছি আমার স্বার্থের খাতিরেই। নয়ত তুমি জানো ফারজাদ আবদার করে না কখনও কারও কাছে। তার নিজের কাছেও কোনো আবদার নেই। কারণ, সে নিজের আবদার পূরণ করতে ব্যর্থ, অসফল, ধ্বংসপ্রাপ্ত ক্ষয়ে যাওয়া এক সত্তা।ʼʼ
থামল একটু, দুটো দম নিয়ে হুট করে বলল, “দ্বিজাকে দেবে ফুপু? ওকে আমি রেখে দেব আমার কাছে। খুব অভিযোগ জমেছে তোমার মেয়ের আমার প্রতি, সে তো সকলেরই আছে। তবে ওরটা আমায় খুব ডিস্ট্রাব করছে আজ ক'দিন। নিজের থেকে নিজে খুব ডিস্ট্র্যাক্ট হয়ে যাচ্ছি। ইটস রিয়েলি সো ইরিট্যাটিং। খুব জ্বালাচ্ছে আমায়। শান্তি দরকার একটু, জাস্ট আই নিড ব্যাডলি কাম-ডাউন! আমি জীবনে এরকমভাবে কখনও অস্থির হইনি। অথচ সব শান্তভাব কেটে গিয়ে কেমন একটা ছটফটে ভাব বিরাজ করছে আমার ভেতরে। পরে আবিষ্কার করলাম–তোমার মেয়ের নজর লেগেছে আমার ওপর। জিজ্ঞেস করো–পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে কতগুলো করে অভিশাপ দম করে আমার ওপর? ওর এসব জ্বালায় প্রতি মুহুর্তে খুব ডিসটার্বড আমি। এই জ্বালা থামাতে তোমার মেয়েকে লাগবে আমার.. আমি....ʼʼ
দরজায় ধাক্কা পড়ল। দিলরুবা বেগম ফ্যাকাশে মুখে দরজার দিকে ফিরে তাকালেন। তার চেহারায় আতঙ্ক, অজানা আশঙ্কাজনক ভীতি! ক্রমেই ধাক্কা কঠিন হয়ে উঠছে দরজার ওপারে। ফারজাদ কিছু একটা আন্দাজ করল। হয়ত ধাক্কা দেওয়া মানুষটিকে এবং এমন ক্ষ্যাপা ধাক্কার কারণকে! ফুপুকে চোখে আশ্বাস দিয়ে ইশারা করল দরজা খুলে দিতে। দিলরুবা বেগমের পায়ে আড়ষ্টতা। ফারজাদ হতাশ শ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল। ফুপুর পেছন পেছন এগিয়ে এলো। দরজা খুলতেই ক্রোধে পাগলপারা হয়ে ভেতরে এলেন হাবিব সাহেব। পাগলের মতো ক্ষ্যাপা স্বরে চিৎকার করে উঠলেন, “তোর ভাইয়ের ছেলে, ওই হারামজাদা বিয়ে ভাঙছে...ʼʼ
নজরে এলো ফারজাদ। হুট করে থেমে গেলেন তিনি। কিংকর্তব্যবিমূঢ় চোখে তাকিয়ে রইলেন ক্ষণকাল। যেন নিজের প্রতিক্রিয়া ভুলে গেছেন তিনি। কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম চোখজোড়া, থমকানো দৃষ্টি, হতবুদ্ধি চেহারায় কয়েক মুহুর্ত চেয়ে থেকে হঠাৎ-ই যেন হশে এলেন তিনি। পাগলা জন্তুর মতো তেড়ে এলেন ফারজাদের দিকে। থাবা দিয়ে চেপে ধরলেন ফারজাদের কলারটা। অশ্রাব্য ভাষায় বকে উঠলেন ফারজাদকে, “শেষপর্যন্ত বিয়ে ভাঙছিস? আমার মান-ইজ্জত মাঠে মাঠে করে ছাড়ছিস হারাম**। বাজারে গেছি গায়ে হলুদের কেনাকাটায়, তখন কল আসছে–ওরা মেয়ে নিবে না,মেয়ের অন্যখানে সম্পর্ক। সম্পর্কে গোষ্ঠির**.. আমার মুখ কোথায়?ʼʼ
সশব্দে একটা থাপ্পড় পড়ল ফারজাদের গালে। ফারজাদ শান্ত ভঙ্গিমায় হাবিব সাহেবের হাতের মুঠো থেকে কলার ছড়ানোর চেষ্টা করল।
-“যা না তা বলে অপমান করার সুযোগ পাইছে লোক আমারে তোর আর ওই...
একথা বলেই তিনি ডাইনিং রুমের দরজার এক কোণে জুবুথুবু হয়ে, বিষণ্ন মুখে দাঁড়িয়ে থাকা দ্বিজার দিকে। ফারজাদ এসে দাঁড়াল সামনে। একটা ধাক্কা দিয়ে পিছিয়ে দিলো হাবিব সাহেবকে একটু। লম্বা ফারজাদের উচ্চতার খানিক নিচে পড়ে আছেন হাবিব সাহেব। প্রসস্থ, কাষ্ঠল বুকটা সামনে মেলে আছে ফারজাদের। হাবিব সাহেব ফুঁসছেন রাগে। ওকে পাশ কাটিয়ে মেয়ে দিকে এগোতে অগ্রসর হলেন তিনি। সামনে বাঁধা হলো ফারজাদ,
-“দুঃসাহস দেখাবেন না ফুপা। দ্বিজা মেয়ে আপনার। জোর করে কিছু চাপিয়ে দেওয়া, বা তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে জীবনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করাকে যদি পিতৃত্ব মনে করেন, তাহলে আপনার মতো মূর্খ বাপকে আমি বলছি, মেয়ের বাপ হওয়ার যোগ্যতা আপনার নেই। মনে রাখা উচিত আপনার–সমাজের সম্মান জন্ম দেন নি আপনি, দিয়েছিলেন একটা মেয়ের জন্ম। যার ভরণ-পোষন, ভালো- মন্দ, তাকে খুশি রাখার দায়িত্ব, তার ইচ্ছের দাম, পিতৃ স্নেহের জেরে সবকিছুকে দূরে ঠেলে তার ভালো লাগার মূল্য সর্বোচ্চ দেওয়া। বাপের কাছে কীভাবে মেয়ের খুশির চেয়ে সমাজের সম্মান, মানুষের কথা আর নিজের ক্ষোভ আগে আসতে পারে–আমার মাথায় ঢোকে না।নিজেকে হুদাই সম্মানী ব্যাক্তি দাবী করবেন না। আপনি শুধুই একটা স্বার্থপর আর দাম্ভিক মূর্খ লোক, যার নিজের মেয়ের বিবর্ণ মুখের দিকে তাকালে সেই কান্নাভেজা মুখে মায়া না লেগে বরং সম্মান, মানুষের কথা আর পুরোনো আক্রোশ মাথায় আসে। মেয়ে রত্ন, যাকে গলায় মালা হিসেবে ঝুলিয়ে রাখতে হয়। জীবনে না থেকেছেন কাছে, না দিয়েছেন আদর, না কখনও পিতৃসুলভ হাতখানা মাথায় বুলিয়ে বলেছেন–দ্বিজা তুই কী চাস? শুধু বিদেশের মাটিতে পড়ে থেকে মাসে গাদা গাদা টাকা পাঠিয়ে ভরণ-পোষন করলে সন্তান পালন হয়ে যায় না। কামাইও বউ-বাচ্চা লালন করার জন্য করেছেন নাকি সন্দেহ আছে। উপার্জন তো শুধু জিদ বজায় রাখতে, আমার বাপের কাছে নিজেকে প্রমাণ করতে করেছেন বলেই মনে হয়।আপনি বাপ কম, কসাই বেশি। সেই আপনার মতো কর্তব্যহীন আর কসাই বাপের অনুমতির পরোয়া করলে আজ আমি শালাও আপনার মতোই স্বার্থপর আর ব্যক্তিত্বহীনের পরিচয় দেব।ʼʼ
ফারজাদের গাঢ় ভারী, তেজদীপ্ত দৃঢ় কণ্ঠস্বরে দমে গেলেন যেন হাবিব সাহেব। শুধু শক্ত চোখে তাকিয়ে রইলেন ফারজাদের দিকে। তবে কিছু বললেন না আর। তাকে দেখে মনে হচ্ছে, চলতে চলতে হঠাৎ-ই ব্রেক কষায় থেমে যেতে থাকা গাড়িটার মতো। যে ধীরে ধীরে থামছে। ফারজাদ দ্বিজার দিকে ফিরল। কাঁদছে মেয়েটা, তাকে কেন্দ্র করে কীসব পরিস্থিতি তৈরী হয়েছে। কেন গেছিল সে ভালোবাসতে।
-“দ্বিজা!ʼʼ–গলাটা অতি রাশভারী ফারজাদের।
দ্বিজা অস্তমিত চোখে তাকাল ফারজাদের দিকে। ফারজাদ একই স্বরে বলল, “তোর বার্থ সির্টিফিকেটটা বের করে আন।ʼʼ
দ্বিজা কৌতূহল ভরা দৃষ্টিতে চেয়ে আছে, পরিস্থিতি বুঝে আসছে না তার। ফারজাদ নাক শিউরে রাগান্বিত স্বরে ধমকে উঠল,
-“শুনতে পাস নি কথা? যা, নিয়ে আয়।ʼʼ
শেষ বাক্যটুকুতে হুংকার দিয়ে উঠল ফারজাদ। তার শরীর মৃদু কাঁপছে। নাকের পাটা ফুলছে, নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস ভারী হয়ে পড়ছে। শক্ত সিনাটা ফুলে উঠছে, আবার নামছে। ঘরটা পুরো নিস্তব্ধ। সেখানে শুধু ফারজাদের ভারী শ্বাসের উঠা-নামার শব্দটাই প্রকট হয়ে কানে লাগছে।
চলবে..
Leave a comment
Your email address will not be published. Required fields are marked *