Buy Now

Search

তপ্ত সরোবরে [পর্ব-১০]

তপ্ত সরোবরে [পর্ব-১০]

কাঁচাফুলে সাজানো বাসরে বসে আছে লাবন্য। রাত বারোটার মতো বাজে। এখন ঘর ফাঁকা। তবে কিছুক্ষণ আগেও গিজগিজ করছিল লোকে ঘরটা। সকলে বউ দেখা পর্ব শেষ করে চলে গেছে। লাবন্যর খুব হাঁসফাঁস লাগছে।কিছুক্ষণ পর ইরফান এলো ঘরে। লাবন্য নিজের নখ খুঁটছে, মাথাটা ঝুঁকিয়ে রেখেছে নিচের দিকে। ইরফান দরজা বন্ধ করতে করতে বলল, “লজ্জা পাচ্ছ নাকি? চ্যাহ! এজন্যই চেয়েছিলাম বিয়েটা প্রেম করে করতে। যাতে বউ বাসর রাতে লজ্জা না পায়, বরং নিজেই ঝাপিয়ে পড়ে আমার ওপর।ʼʼ
লাবন্য চোখ তুলে তাকাল। লোকটার মুখে কি কিছুই বাঁধে না? ইরফান হাসতে হাসতে এসে বসল বিছানার ওপর। কী আশ্চর্য! লাবন্যকে কি দেখতে জোকারের মতো লাগছে? লোকটা এত হাসছে কেন? লাবন্য ভ্রু কুঁচকায়। ইরফান হঠাৎ-ই একটু এগিয়ে বসল লাবন্যর দিকে। লাবন্য খুব করে চাইল একটু সরে যেতে, তবে আড়ষ্টতায় পারল না। ইরফান খুব নরম স্বরে বলতে লাগল, “আমি স্বামী হিসেবে কেমন হবো, তার কোনো নিশ্চয়তা আজ তোমায় দেব না। তবে এত তাড়াতাড়ি তোমার স্বামী হয়ে ওঠার ইচ্ছে নেই।ʼʼ
এটুকু বলে হঠাৎ-ই ইরফানের ভঙ্গিমা বদলে ফুরফুরে হয়ে উঠল, “দেখো, আমি স্বাধীনচেতা মানুষ। জীবনের সব ক্ষেত্রে ইনজয় করার আছে আমার, বিয়ের ক্ষেত্রেও। তোমায় সঙ্গে দেখা হওয়ার পর সাধারণত যা করার ছিল তা হলো, প্রেম অথবা বন্ধুত্ব। অথচ তুমি সেসবের কোনটাই করার মতো মেয়ে নও। এজন্যই তোমাকে সরাসরি আজীবনের জন্য নিজের করার ইচ্ছে মাথায় এলো। নয়ত তো আর তুমি নিজের আশেপাশে ঘেষতে দিতে না। আর সেই হিসেবে এখন সম্পূর্ণ রাইট আছে আমার তোমার পেছনে চিপকে থাকার। এবার বন্ধুত্ব অথবা প্রেম যেকোনোটাই করতে পারো। তারপর প্রেম করার সাধ মিটলে অথবা বন্ধু হয়ে চলতে চলতে ভালোবাসা হলে স্বামী-স্ত্রী হব আমরা। ঠিক আছে?ʼʼ
উঠে দাঁড়াল শেরওয়ানীর বোতাম খুলতে খুলতে বিরক্ত হয়ে বলল, “এবার প্লিজ একটু সহজ হও, আমার সঙ্গে তোমার এই অপরিচিতর মতো আনুষ্ঠানিকতা ভালো লাগছে না। জোরে করে একবার হাসো তো! একদম যেন ঘরবাড়ি কেঁপে ওঠে, যেন সকলের মনে হয় পেত্নি সরি জিন ভর করেছে। এখন মনে হচ্ছে, কোনো বাকপ্রতিবন্ধি বিয়ে করে এনেছি। কথা বলো!ʼʼ
শেষের কথাটা কপট ধমকে বলল ইরফান। লাবন্য বুঝতে পারছে না এই পরিস্থিতিতে তার ঠিক কেমন প্রতিক্রিয়া দেখানো উচিত। হঠাৎ-ই কেন জানি হেসে উঠল নিঃশব্দে ইরফানের কাণ্ড দেখে। ইরফান থেমে যায়, সেও হাসতে হাসতে কোনো মতো একটা টিশার্ট গায়ে চড়িয়ে, ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা ছোটো বক্স এনে লাবন্যর সামনে রেখে নিজেও বসে পড়ল। সেটা খুলে একটা আংটি বের করল স্বর্ণের। লাবন্যর দিকে আংটিটা পরানোর উদ্দেশ্যে এগিয়ে নিয়ে গিয়েও আবার থেমে গেল। বলল, “নাও এটা পরে নাও। ধরো, বন্ধুত্বের তোহফা এটা আমার পক্ষ থেকে।ʼʼ
লোকটার কথাবার্তা খুব স্বাভাবিক, সাধারণ। এমন ভাবে মুখে স্পষ্ট চঞ্চলতা বজায় রেখে কথা বলছে যেন বহুদিনের সঙ্গী তারা। লাবন্য অদ্ভুত এক কাজ করে বসল। হাতটা বাড়িয়ে বলল, “আপনিই পরিয়ে দিন।ʼʼ
লোকটা হাসল একগাল। তাতেই বোঝা যায়—নিজে হাতে আংটিটা পরানোতে কতটা আগ্রহী লোকটা। আর এজন্যই বোধহয় লাবন্য মানুষটার সেই আগ্রহকে এড়িয়ে যেতে পারেনি। ইরফান উঠে দাঁড়িয়ে বলল, যাও এবার এসব ছালা-কম্বল ঝেরে এসো। তোমাকে দেখে আমারই ভারী অসস্তি লাগছে।ʼʼ
লাবন্যর এবার খুব কৃতজ্ঞতা বোধ লাগল, এই লোকটার এই কথাটার জন্যও লাবন্যর যেন লোকটাকে ভালো লাগছে। উফফ, এই মণখানেক ওজনের সাজ চাপিয়ে বসে আছে সেই কত ঘন্টা ধরে। অথচ সকলে বলে দিয়েছে বর ঘরে না আসা পর্যন্ত সাজ নষ্ট করা যাবে না। লাবন্য কৃতজ্ঞতা চাপতে না পেরে মেকি করুণ এক হাসি দিয়ে নিজের আনন্দ বোঝাল। এ পর্যায়ে লাবন্যর মুখভঙ্গি বেজায় হাস্যকর ছিল। ইরফান মুচকি হেসে লুটিয়ে পড়ল ফুল ছিটানো বিছানায়। কিছুক্ষণ পর লাবন্য চেঞ্জ করে এসে দাঁড়াল একটু সংকোচের সাথে। চোখ বন্ধ অবস্থাতেই তা বুঝতে পারে ইরফান। এক লাফে উঠে দাঁড়াল। জিজ্ঞেস করল, “ঘুমিয়ে পড়ো, ক্লান্ত তুমি।ʼʼ
লাবন্য দ্বিধাগ্রস্থ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ইরফান তা দেখে ভ্রু কুঁচকায়, “ভয় পাচ্ছ নাকি? নাটকের নায়িকাদের মতো বিছানা শেয়ার করায় সমস্যা থাকায় সোফায় ঘুমানোর পরিকল্পনা আছে? আমার রুমের সোফা ছোটো, তুমি আটবে না। যদি ভাবো আমি গিয়ে শোবো, তো তোমার অবগতির জন্য জানাই, আমি ওত ভালো না। তবে তুমি না চাইলে কিছুই হবে না, সেটুকু কন্ট্রোল আছে আমার।ʼʼ
বলেই চোখ মারল ইরফান। লাবন্য বোকার মতো দাঁড়িয়ে আছে, এবার মাথাটা নামিয়ে নিলো। ইরফান একটু এগিয়ে এলো এবার। তার মুখের দুষ্টুমি ভাব কেটে গেছে, এবার স্বাভাবিক হয়ে বলল, “খারাপ লাগবে এক বিছানায় ঘুমাতে? বুঝতে পারছি, হ্যাজিটেশন ফিল করছ..ʼʼ
লাবন্য এবার মুখ খুলল, “কিছু বলেছি আমি? নিজেই বলে যাচ্ছেন কখন থেকে। আমি বলেছি আমার সমস্যা আছে?ʼʼ
ইরফান এবার গম্ভীর স্বরে বলল, “তাহলে সঙের মতো দাঁড়িয়ে আছ কেন? তোমার মুখের ভাব দেখে আমার নিজেরই গিল্টি ফিল হচ্ছে, যেন কোন জবরদস্তি অশ্লীল আচরণ করে ফেলেছি। তুমি হয়ত ভয় পাচ্ছ আমায়!ʼʼ
লাবন্য এবার একটু লজ্জা পেল। ইরফান বলল, “ঘুমাও, আই বারান্দায় যাব। নাকি যাবে তুমি?ʼʼ
লাবন্য তৎক্ষণাৎ উপর-নিচ মাথা নাড়ে। ইরফান একটু অবাক হলো, সে মোটেই আশা করেনি লাবন্য বারান্দায় যেতে চাইবে।
হালকা কুয়াশা ঢাকা রাত। দুজন মানব-মানবী পাশাপাশি দাঁড়িয়ে এই শীতের রাতে নীরবে অন্ধকার বিলাস করছে। কেউ কোনো কথা বলছে না, কেবল চুপচাপ দাঁড়িয়ে ঝিঝিপোকার ডাক শুনছে। কারও মনোভাব কেউ বুঝে উঠছে না, হয়ত চেষ্টা করছে, তবে তা অন্তর্গত। লাবন্যর মাঝে অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতিরা তোলপাড় শুরু করেছে। জীবনির ধারাবাহিকতা এত জটিল কেন? জীবন কদমে কদমে বাজি পাল্টায়। গতকাল রাতে লাবন্য চাপা কান্নায় ভেঙে পড়েছিল এ সময়। আজ সে সম্পূর্ণ নতুন জায়গা, নতুন একটা অদ্ভুত মানুষ, আর কিছু অদ্ভুত গুমোট ভাবনাদের নিয়ে সদ্য জড়িয়ে যাওয়ার মানুষটার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ-ই ইরফান উদাসী গলায় বলে উঠল,
“ঠাণ্ডা লাগছে তোমার, যাও লাগেজ থেকে নিজের গরম কাপড় বের করে নিয়ে এসো।ʼʼ

লাবন্যর শশুর বাড়ি যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে সকলে। ফারজাদ গেছে গাড়ি ঠিক করতে। বেলা এগারোটা পেরিয়ে গেছে। দিলরুবা বেগম দ্বিজাকে তাড়া দিলেন জলদি গোসল সেরে নিতে। আম্মুর দিকে শান্ত চোখে তাকায় দ্বিজা। হঠাৎ-ই দিলরুবা বেগম চোখটা সরু করে তাকালেন, “কী হইছে তোর, দ্বিজা? কয়েকদিন দেখতেছি অন্যরকম চলাফেলা করতেছিস। কী সমস্যা, তোর ভাবভঙ্গি তো ভালো দেখাইতেছে না।ʼʼ
দ্বিজা একটু থতমত খেয়ে গেল। যথেষ্ট বুদ্ধিমতি মহিলা দিলরুবা। তার কাছে যেন-তেন ভাবে পার পাওয়া যাবে না। দ্বিজা চট করে পরিস্থিতি পরিবর্তন করে নেয়। মুখটা গোমরা করে, “লাবন্য আপু চলে যাওয়ায় ভালো লাগতেছে না, আম্মু।ʼʼ
দ্বিজার ভঙ্গিমাটা নিখুঁত ছিল, বলতে হবে। দিলরুবা বেগম স্বাভাবিক হলেন। এ বাড়িতে একসঙ্গে মানুষ হয়েছে দুজন। খারাপ লাগাটা অস্বাভাবিক না। বললেন, “কী পরে যাবি?ʼʼ
দ্বিজার খুব বলতে ইচ্ছে হয়, না গেলে হয়না, আম্মু? তবে সাহস হলো না। দ্বিজা কথা বলছে না দেখে হাতের শাড়িটা দ্বিজার দিকে এগিয়ে দিয়ে বেশ কোমল স্বরে বললেন তিনি, “এই শড়িটা এবার চলে যাওয়ার আগে তোর আব্বু কিনে দিয়ে গেছিল। তোর তো খুব পছন্দের, এইটাই পর যা।ʼʼ
দ্বিজা একটু অবাক হলো। সে সাজতে খুব সৌখিন বলে আম্মুর কাছে খিস্তি জীবনে কম শোনেনি। আজ আম্মু নিজেই শাড়ি পরার কথা বলছে?
দিলরুবা বেগম চলে গেলেন। দ্বিজা বসে রইল ওভাবেই। একদম সাজতে ইচ্ছে করছে না, আর না যেতে। সে অবাক হয় নিজের মনোভাবের ওপর—সারাদিন ছটফট করে বেড়ানো দ্বিজা কেমন নিস্তেজ, শান্ত হয়ে যাচ্ছে দিন দিন।
কিছুক্ষণ পর দিলরুবা বেগম আবার এলেন। দ্বিজা হুড়মুড়িয়ে উঠে দাঁড়াল। দিলরুবা বেগম ভ্রু কুঁচকে আছেন। তার মুখভঙ্গি দেখে বোঝা যাচ্ছে, তিনি কিছু খেয়াল করছিন দ্বিজার মাঝে। দ্বিজা দ্রুত বলে ওঠে, “যাচ্ছিলামই তো আমি, কিন্তু লাবন্য আপুর বাথরুমে কে যেন ঢুকল।ʼʼ
দিলরুবা বেগম তাকালেন একবার বাথরুমের দিকে। দ্বিজা মনে মনে কষে নিজেকে দুইটা লাথি দেয়। বাথরুমের ছিটকিনি বাইরে থেকে লাগানো। দ্বিজা ধরে পড়ে গিয়ে চোরের মতো হেসে উঠল বলল, “যায় নি এখনও, যাবে। বলে গেল। বড়ো খালামণি যাবে।ʼʼ
দিলরুবা বেগম গম্ভীর স্বরে বললেন, “লাবন্যর বাথরুমে তো পানিই নেই আজ দুইদিন।ʼʼ
দ্বিজার মুখটা ছোটো হয়ে আসল, তবুও দৃঢ়তা বজায় রাখার চেষ্টা করল মেয়েটা। পারছে না, আম্মুর এই রূপ দেখলে খুব অপ্রস্তুত হয়ে সে। আম্মুর চোখ ফাঁকি দেওয়ার উপায় নেই। দিলরুবা বেগম ওভাবেই গুমোট স্বরে সরু চোখে বললেন, “ফারজাদের বাথরুমে যা, ও নেই এখন। তাড়াতাড়ি বের হবি।ʼʼ
দ্বিজা ফারজাদের রুমে ঢুকল না। সম্ভব না, মন-মস্তিষ্ক সঙ্গে শরীরও সায় দিচ্ছে না ওই রুমে যাওয়ার ব্যাপারে। সে দুই মামীর বাথরুম চেইক করল। সবগুলোতে লোকে ভর্তি।আত্মীয়-স্বজন সব ঢুকেছে, সাথে সিরিয়ালে আছে আরও কিছু লোক। ফারহানা বেগম রূপা ও দ্বিজাকে বললেন, ফারজাদের বাথরুমে যেতে। কারণ, যাই হোক ওই ঘরে কেউ যায়নি কোনভাবেই। দ্বিজা চোখটা চেপে বুজে নিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আম্মুকে বোঝানোর উপায় নেই, কী করে বোঝাবে, কী বলবে, সব কথাই কী খুলে বলা যায় মানুষকে?
দ্বিজা ও রূপা একসঙ্গেই গোসল করছে। কিছু করার নেই, সময় সল্প, যখন তখন চলে আসবে কাটখোট্টা লোকটা। এলোও তাই, কিছুক্ষণ কপাল জড়িয়ে চেয়ে রইল নিজের বাথরুমে দরজার দিকে ফারজাদ। দ্বিজার কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে। দুটো যুবতী মেয়ে গোসল করছে, সেখানে এভাবে তার ঘরে থাকা বা তাদের এ মুহুর্তে তার উপস্থিতি জানান দেওয়া; মোটেই ভালো দেখাবে না ব্যাপারটা। দু পক্ষের কাছেই ব্যাপারটা অকওয়ার্ড। ফারজাদের রাগ হলো, আর কোন বাথরুম পায় নি নাকি? কিছু না বলে চোখ-মুখ কুঁচকে বেরিয়ে গেল রুম থেকে।
রূপা বেরিয়েছে আগেই। দু-মিনিট পর দ্বিজা গোসল করে বেরিয়ে ঘর ফাঁকা দেখে সস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। শাড়িটা কোনরকম গায়ে জড়িয়ে একদৌড়ে চলে যায় লাবন্যর রুমে। বড়ো খালামণি শুয়ে আছেন রুমে, ওরা ঢুকে দরজা আটকাতে গেলে তিনি বেরিয়ে গেলেন, এরপর দরজা আটকে দিলো রূপা। ক্ষণে ক্ষণে তার বুক কাঁপছে দ্বিজার।
কোনভাবেই সে ফারজাদকে জানাতে চায়না সে তার রুমে এসেছিল।
লাবন্যর রুমে ঢুকে কিছুক্ষণ ওভাবেই থম মেরে বসে রইল শাড়িটা গায়ে পেঁচিয়ে। রূপার পোশাক পরা প্রায় শেষ। মনকে সে বোঝাতে চাইছে, একটু চঞ্চল হও, অন্তত আজকের জন্য হলেও। মন কথা শোনে না তো কারও, আবাধ্য মনের ওপর ক্ষোভ জমছে দ্বিজার। মন না চাইলেও উঠে দাঁড়াল শাড়ি পরার জন্য। শাড়ির কুচি বানানোর জন্য শাড়ির একপ্রান্থ ধরে ওভাবেই দাঁড়িয়ে রইল আয়নার সামনে। আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বর দেখে একটু থামল সে, আনমনে তাকিয়ে রইল ওভাবেই। আনখেয়ালী হাতে কুচি করছে। এরই মাঝে বন্ধ দরজাটা খুলে রূপা কখন যে বেরিয়ে গেল, উদাসীনতায় সেদিকে মনোযোগ দিতে পারল না সে। মনটা বড়ো অচঞ্চল হয়ে আছে। নিস্তেজ মন-মস্তিষ্ক আধ্যাত্মিক জগতে বিচরণ করছে যেন তার।
হুট করে দরজা খুলে সেখানে প্রবেশ ঘটে লম্বা এক মানব মূর্তির। এটুকু আনমনা চোখে আয়নার ভেতরে দৃষ্টিগোচর হতেই মস্তিষ্কে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হলো দ্বিজার। দ্রুত ওভাবেই ঘুরে দাঁড়াল তড়িৎ গতিতে। ফারজাদের মতো নির্জীব পূরুষটা আজ থমকে গেল আকস্মিক। মস্তিষ্কের অপ্রতিভ সারায় চেয়ে দেখল সামনের সদ্য যুবতী মেয়েটার তড়িঘড়ি শাড়ির কুচি গুজে বুকে আচল নেওয়া দৃশ্যটুকু। এরই মাঝে মুহুর্তের মাঝে তার নজরে এসেছে, যুবতী এক নারীর ব্লাউজের ওপরের উড্ডমায় ভাজটা। অনাবৃত পেট, খুলা গলা, গোটা অর্ধখোলা শাড়িতে একটা রূপমাধুরী!
দ্বিজা ততক্ষণে আড়ষ্টতায় ঘুরে দাঁড়িয়ে লজ্জায়, সংকোচে, চোখটা খিঁচে বন্ধ করে শাড়ি চেপে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ফারজাদ শুকনো একটা ঢোক গিলে দ্রুত চোখ ফিরিয়ে নেয়। পুরো ঘটনাটা ঘটতে সল্প কয়েক সেকেন্ডের বেশি লাগেনি। অথচ ফারজাদের বুক কাঁপছে, ঢিপঢিপ করে অস্থির করে তুলছে। অপরাধবোধে পিষ্ট হচ্ছে মানসিকতা। ওমনিই ঘুরে দাঁড়িয়ে বেরিয়ে গেল রুম থেকে।
সে অল্প কিছুক্ষণ আগে নিজের বাথরুমে দেখে এসেছে দ্বিজাকে। এরই মাঝে লাবন্যর রুমের আলমারির ওপর থেকে লাবন্যকে দেওয়ার জন্য কিনে রাখা নতুন কম্বলটা নিতে এসেছিল ফারজাদ। নিজের ওপর বেজায় রাগ হলো ফারজাদের। চোখ বুজে ভারী শ্বাস ফেলল। হঠাৎ-ই চোখের সামনে ভেসে উঠল কিছুক্ষণ আগের দৃশ্যটি। ফারজাদ দ্রুত চোখ খুলল। এলোমেলো দৃষ্টি ফেলল চারদিকে। মাথা ঝাড়া দিয়ে কপাল চেপে ধরল আঙুল দিয়ে। মস্তিষ্ক অবাঞ্ছিত ব্যাপার বেশি খেয়ালে রাখে, কী মুশকিল!
দ্বিজার বড়ো খালামণি দেখলেন ফারজাদ বেরিয়ে গেল রুম থেকে। তিনি গেলেন লাবন্যর রুমের দিকে। ভেতরে ঢুকেই দেখলেন দ্বিজা থমকে দাঁড়িয়ে আছে অর্ধ পরিহিত শাড়ি শরীরে কোনরকম পেচিয়ে। খালামণিকে দেখে দ্বিজার বুকটা ছলকে ওঠে। তার চোখের দিকে তাকিয়ে আবারও অজানা শঙ্কায় বুকটা ধুক করে উঠল। সে ব্যস্ত হয়ে উঠল সাফাই গাইতে। খালামণির চোখে যে সন্দিগ্ধ অকথিত কটূক্তি তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, এটা কী-করে বোঝাবে দ্বিজা। খালামণি খুব একটা সুবিধার মানুষ নয়।
চলবে..

Olindo Rahman

Olindo Rahman

A good book is worth a hundred good friends. 
But a good friend is equal to a library.!! 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Your experience on this site will be improved by allowing cookies Cookie Policy