Buy Now

Search

তপ্ত সরোবরে [পর্ব-১২]

তপ্ত সরোবরে [পর্ব-১২]

পরদিন কলেজ ছুটির পর ইভা পুরো ক্যাম্পাস খুব খুঁজল ফারজাদকে, অথচ দেখা পেল না। পরীক্ষার আর সপ্তাহখানেকও নেই। কখন সাজেশন নিবে, কবে পড়বে? ক্ষুন্ন মনে ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হয়ে খানিক দূর অগ্রসর হতেই সামনে এলো ফারজাদের দুই বন্ধু মাহদি ও নাহিদ। ওরা একটু হাপাচ্ছে, সাথে চোখে-মুখেও বিরক্তি।  ওর হাতে একটা খাতা ধরিয়ে দিয়ে বলল, “নাও তোমার সাজেশন। কালকে অক্ষত অবস্থায় ফেরত দেবে, মনে থাকে যেন।ʼʼ
ইভা অবাক হয়—অক্ষত অবস্থায়! কেন, সে কি খাতাটার সঙ্গে মারামারি করবে নাকি? তখনই মনে পড়ল ফারজাদের কথা–অদ্ভুত ছেলে! কাল বলল, খাতা দেবে, আজ দেখা নেই। কৌতূহল মেটাতে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, এই খাতাটা কার?ʼʼ
মাহদি এমনিতেই চরম দুষ্টু। ও দুষ্টু একটা হাসি দিয়ে বলল, “কেন? তার ছাড়া আর কারও খাতা নেবে না নাকি, হু?ʼʼ
ইভা হকচকাল, একটু অপ্রস্তুত হয়ে এদিক ওদিক তাকাল। 
মাহদি আর নাহিদ ওকে রেখেই দৌঁড়ে যায় গেইটের বাইরে কলেজের পেছনের দিকটায়। ফারজাদ দাঁড়িয়ে কোকের ক্যান খুলছে। পেছন থেকে নাহিদ গিয়ে পিঠে একটা চাপর মেরে বলল, “মামা, তোমার ঘাঁড়ে জিন আছে এইডাতে সন্দেহ নাই। কখন কী করোছ, নিজে বুঝোছ তো আবার?ʼʼ
ফারজাদ ক্যানে কয়েকটা চুমুক দিয়ে রিলাক্সলি খানিকটা কোক খেয়ে নিয়ে মাহদির দিকে ক্যানটা প্রায় ছুড়ে দিয়ে বলল, “মেয়েদের আশেপাশে খুব যেতে নেই। ওরা সস্তা ভাবে, সাথে হ্যাংলাও!ʼʼ
“ও আমার মূল্যবান! মেয়েটাই তোর কাছে এসেছিল, আবার নম্বারও চেয়েছে। আমার তো মনে হচ্ছে তোর ওপর পিছলে গেছে, মামা!ʼʼ
ফারজাদের কপাল সবসময় কুঁচকেই থাকে, এবার মুখটা বিকৃত করে বলল, “পিছলে গেছে, টেনে তোল। মানবিকতা কাজে লাগা।ʼʼ
“মামা! এই সুযোগ হতছাড়া করবি তুই?ʼʼ
ফারজাদ নাহিদের হাত থেকে ক্যানটা কেঁড়ে নিলো, তাচ্ছিল্য হেসে বলল, “এটা সুযোগ? তুই আমার বন্ধু মানুষ, তোকে দিয়ে দিলাম, কাজে লাগা।ʼʼ
মাহদি হেঁয়ালি করে, “তালা খুলতে সঠিক চাবির প্রয়োজন। অন্য চাবি দিয়ে শত ঘুরালেও কাজ হবে না।ʼʼ
তিন বন্ধু এবার সশব্দে হেসে উঠল হেলেদুলে। ওরা জানে, ফারজাদ চরম সুফি টাইপের লোক। কারও গা ঘেঁষার মধ্যে নেই। এ নেহাত এক মজাই কেবল। ফারজাদ জীবনেও মাখামাখি সম্পর্কে তাও আবার এই বয়সে জড়াবে না, শুধু বন্ধুত্বও না।
পরদিন ইভা এলো ওদের সামনে। ফারজাদ মনোযোগ সহকারে খাতায় লিখছে মাঠের এককোণে বসে। মেয়েটা এসে দাঁড়িয়েছে, তা সে টের পেয়ে আড়চোখে দেখেছে, অথচ চোখ তুলে তাকাল না। ইভা আজ চরম কৌতূহলের সাথে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে ফারজাদকে। তা লক্ষ করে মাহদি, নাহিদ হাসছে একাধারে। একসময় ইভা খাতা এগিয়ে দিয়ে বলল, “তোমার খাতা!ʼʼ
ফারজাদ মাথা তুলে তাকায়। যাক খানিক মতিগতি হয়েছে মেয়েটার, তুমি বলছে। ফারজাদ মৃদু মাথা নেড়ে খাতাটা নিয়ে পাশে রেখে দিয়ে আবার মনোযোগ দিলো নিজের কাজে। ইভার আগ্রহ ও কৌতুহল বাড়ছে ফারজাদকে নিয়ে। সে নিজে নম্বর দিতে চেয়েছে ছেলেটা নেয়নি, নিজের নাম বলেনি, গতকাল দেখা করেনি। আর প্রথমবার তাও বেশ কয়েকটা কথা বলেছিল। আজ ঠিকঠাক তাকাচ্ছেও না, ইভা জড়তা কাটিয়ে চটপটে গলায় বলল, “বসব এখানে?ʼʼ
ফারজাদ ভ্রু কুঁচকে তাকাল একবার ইভার মুখের দিকে, আবার নিজের পাশে ফাঁকা জায়গায় তাকিয়ে ঘাঁড় নেড়ে ইশারা করল বসতে। মেয়েটা মনোযোগ সহকারে দেখছে ফারজাদের লেখালেখি। সে অদ্ভুত এক টান অনুভব করছে ছেলেটার প্রতি। হঠাৎ-ই মনে হচ্ছে ছেলেটা সবার থেকে আলাদা। নিজে থেকে আগ্রহ কেন নেই তার ইভার সঙ্গে আলাপ করতে? এই বিষয়টা ইভাকে যেমন বিব্রত করছে, তেমন টানছে। সে দেখল ফারজাদ নোট করছে, তবুও জিজ্ঞেস করল, “নোট তৈরী করছ?ʼʼ
ফারজাদ মাথা নেড়ে অস্পষ্ট উচ্চারণ করল, “হু!ʼʼ
ইভা কথা খুঁজে পায় না আর। সে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে এলোমেলো চোখ ফেলে। কিছুটা সময় ফারজাদ নিজেই জিজ্ঞেস করল, “কিছু বলবে নাকি?ʼʼ
বলেই সে তাকাল ইভার দিকে। চোখাচোখি হয় দুজনের। ইভা চট করে চোখ নামাল। ফারজাদ হেসে ফেলে নিঃশব্দে। গত পরশু মেয়েটাকে দেখার পর থেকে তার মনে হচ্ছে— মেয়েদের চোরা, নাজুক নজর বেশ আকর্ষনীয় এক বিষয়বস্তু, নাকি শুধু এই মেয়েটারই। আসলেই ইভার চোখের পাপড়ি জোড়া সুন্দর। ফারজাদ যে কয়বারই তাকিয়েছে মুহুর্তের জন্য হলেও আটকে গেছে। ইভা বেশ ইতস্তত করে কিছুক্ষণ পর বলল, “ফ্রেণ্ড হবে আমার?ʼʼ
ফারজাদ বিশেষ অবাক হলো না, মেয়েটা আর সবাইকে রেখে ওর ফ্রেণ্ড হতে চাইছে। এরকমটা হয়েছে বরাবরই ওর সঙ্গে। হয়ত ওর নিজেকে গুটিয়ে চলা স্বভাবের জন্যই মানুষ আগ্রহী হয় ওর মাঝে! ফারজাদ জিজ্ঞেস করল, “ঢাকাতে তো নিজস্ব বাসা না, কোথা থেকে এসেছ?ʼʼ
“বাবা বড়ো পুলিশ কর্মকর্তা। ঢাকাতে বদলি হয়েছে, এজন্যই এখন আপাতত ঢাকাতে আছি। আর তুমি?ʼʼ
ফারজাদ বুঝল, এজন্যই মেয়েটা সবার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে মিশতে পারছে না। ছোটো থেকে এভাবে জায়গা বদলে মানুষ, আর পুলিশের ছেলেমেয়েদের জীবনযাত্রা এমনিতেই একটু একঘরে টাইপের হয়। তবে এবারের কথাটা ইভা তুলনামূলক চটচটে কণ্ঠে বলেছে। ফারজাদ দেখল, মেয়েটা সহজ হচ্ছে ওর সঙ্গে। বলল, আমি কুমিল্লা থেকে এসেছি, “চাচার বাসায় থেকে কলেজ করছি।ʼʼ
“তোমার নাম তো বললে না এখনও?ʼʼ
“ওপপস! বলিনি না? ফারজাদ ইয়াজরান খান।ʼʼ
ইভার মুখের ভঙ্গি দেখে মনে হলো তার খুব পছন্দ হয়েছে নামটা। প্রসন্ন চিত্তে মেয়েটা হাসল। ফারজাদের আচমকা মনে হয় মেয়েটা সুন্দর, খুব সুন্দর, আদুরে! ফারজাদ যখন অন্যদিকে তাকাচ্ছে, ইভা ওকে দেখছে, এটা বুঝতে পেরে ফারজাদ বারবার ইভার দিকে ফিরে তাকিয়ে ওকে বিব্রত করছে। এই-যে মেয়েটা খুব অপ্রস্তুত হচ্ছে, ফারজাদের মজা লাগছে খুব। মাহদি আর নাহিদ ওদিকে স্ট্যাচুর মতো বসে আছে। তারা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারছে না আপাতত। হঠাৎ-ই ইভা হুড়মুড়িয়ে উঠে দাঁড়াল। তাকে বিক্ষিপ্ত দেখায়, ছটফটে হাতে ব্যাগটা মাটি থেকে তুলে কাধে তুলে সবকিছুকে অগ্রাহ্য করে দৌঁড়ে গেল সামনের দিকে। ফারজাদ ভ্রু কুঁচকে ওর যাওয়ার দিক অনুসরণ করে তাকায়। দেখল, একটা পুলিশ এসে মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। ইভা গিয়ে দাঁড়াল তার সামনে। ইভাকে সঙ্গে নিয়ে চলে যায় লোকটা। 
নাহিদ এবার ফারজাদকে ধাক্কা দিলো, “কিরে! এইডা তোর হবু শশুর আব্বা নাকি, মামা?ʼʼ
ফারজাদ ওকে একটা থাবর মেরে  গম্ভীর মুখে তাকাল, “ওই লোকটাকে দেখে তোর মনে হলো, যে এরকম কলেজ পড়ুয়া একটা মেয়ে থাকতে পারে তার?ʼʼ
নাহিদ মাথা চুলকায় বোকার মতো। মাহদি বলল, “আরে শুনলি না? বড়ো পুলিশ অফিসার ওর বাপ। এইটা হয়ত কনস্টেবল হবে, বড়ো স্যারের মেয়েকে নিতে এসেছে। জানিস তো এদের সব জায়গায় নিরাপত্তা!ʼʼ
ফারজাদ খাতা ব্যাগে ঢুকাচ্ছে। হঠাৎ কিছু মনে পড়েছে এমন ভঙ্গিতে মাহদি ফারজাদকে ডেকে বলল, ভাই! এসব আহ্লাদী মেয়েদের সাথে প্রেম করলে ফাঁসবি, মামা! এরা বন্দি পাখির মতো একা একা জীবন-যাপন করতে করতে অসামাজিক আর মানবিকতাহীন হয়ে পড়ে। এই মেয়েটা যদিও আলাদা, তবে এরা কিন্তু খুব রুলসের মধ্যে চলে, বলতে পারিস রোবট টাইপের। মেয়েটাকে দেখেছিস, আর পেছন ফিরে দেখলও না তোকে। মনে হয়, বাপকে খুব ভয় পায়?ʼʼ
ফারজাদ বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল ব্যাগ নিয়ে। মুখ বিকৃত করে বলল, “তো? এসব পুঁথি আমায় শোনাচ্ছিস কোন দুঃখে?ʼʼ
মাহদি দুষ্টু হেসে নাহিদের দিকে তাকিয়ে বলল, “নাহ, বলছি আর কী! গরীবের কথা পুরাতন হলে মনে পড়ে।ʼʼ
ফারজাদ মৃদু একটা লাথি দিলো ওর পায়ে, বলল, “সর, শালা। তোর নতুন পুরাতন কথা রাখ। বউমা অপেক্ষা করবে, আমার যাওয়া লাগবে।ʼʼ
এরপর থেকে ইভার সাথে ফরজাদের অদ্ভুত এক সম্পর্ক গড়ে উঠল। শুরুটা ইভা করেছিল, নিজে যেচে পড়ে। নিঃসঙ্গ জীবনে হয়ত বিরক্ত হয়ে মেয়েটা ফারজাদকে বেছে নিলো কলেজের সময়টুকু কোনো এক অদ্ভুত সুন্দর ছেলের সাথে লুকোচুরি খেলে সুন্দর সময় কাটানোর জন্য।  প্রতিদিন ছুটির পর যতটুকু সময় ইভার গাড়ি না আসতো সে চলে যেত ফারজাদের কাছে। ফারজাদের থেকে নম্বর নিলো। ইভা মাঝেমধ্যে কল দিতে দিতে একসময় নিয়মিত কর্ম হয়ে দাঁড়াল। ফরজাদ বদলালো, বদলায় তার নিত্যদিনের রুটিন। এই ফারজাদকে আজকাল খুব হাসতে দেখা যায়, পড়ালেখা থেকে দুরত্ব বাড়তে থাকল তার, বিকেল হলে প্রাইভেট পড়তে যাওয়ার সময়টুকু সে কাটাতো ইভাদের বাড়ির গলির আশেপাশে ঘুরে ফিরে। বারান্দায় এসে কখন ইভা দাঁড়াবে, সেই জন্য ওদের কলোনির সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে ফারজাদকে।  
যখন দুজনেই ইন্টারমিডিয়েট সেকেন্ড ইয়ারে, ফারজাদের পড়ার ঘাটতি পড়ে গেছে এর মাঝে বহুত। বাংলাদেশের রেংকিংয়ে সেরা কলেজগুলোর মাঝে একটাতে পড়ে ফারজাদ, অথচ তার আপাত পড়ালেখার মান তার সহপাঠীদের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। তবে ফারজাদ চাইলেও আর আগের মতো পড়ালেখায় মনোযোগী হতে পারে না। নিজেকে বাহানা দিতে শিখলে মানুষের আর কারও আশকারার প্রয়োজন হয় না। তখন সে নিজেই নিজের সর্বোচ্চ সাফল্য অথবা ধ্বংস হয়ে দেখা দেয়। ফারজাদের এই নিজেকে দেওয়া বাহানা তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে সে তা ভাবার ফুরসত পায় না আজকাল। পড়তে বসলেই উড়ুউড়ু মন বাহানা বানায়—আরে সে যা ব্রিলিয়ান্ট, এই পড়াগুলো পরীক্ষার আগেই করে ফেলতে পারবে। এখনও যথেষ্ট সময় আছে হাতে। 
ফোন হাতে নিয়ে বারান্দায় পায়চারী করতে করতেই কেটে যায় ঘন্টার পর ঘন্টা। ইভাকে যখন-তখন কল দেওয়া যায় না। মেয়েটা কল দিলে তবেই সে কল ব্যাক করে কথা বলতে পারে। 
ইভা আজকাল আবদার করে তার কাছে। একসাথে সময় কাটানোর ব্যবস্থাপনার বুদ্ধিগুলোও তারই। কলেজের সময়টুকু তারা দুজনে বের হয়ে যায় ঘুরতে, ইভা অবাক চোখে চেয়ে দেখে শহর-বাজার, ফুসকার স্টল, মেলায় চুড়ির দোকানগুলো, অথবা পার্কের এককোণে বসে মাঝেমধ্যে বাদাম খাওয়া। ফারজাদ তো মুখে প্রকাশ করতে পারে না তার অনুভূতি, তবে মনের আনন্দে তার জোয়ার আসে, যখন ইভার চোখমুখে সে উপচে পড়া খুশি দেখে। ইভা হাঁটতে হাঁটতে কখনও নির্জন রাস্তা পেলে ফারজাদের হাতের মাঝে নিজের আঙুল গুজে দেয়। ফারজাদ কেন জানি মানা করতে পারে না। বরং আবেশে চোখটা বুজে বুক ফুলিয়ে একটা শ্বাস নেয়। কোথাও সে আটকে যাচ্ছে এই মেয়েতে, জঘন্য অভ্যাসে পরিণত হয়েছে মেয়েটা। যা তাকে তার জাগতিক চিন্তাভাবনা, নিজের পথচলা, ক্যারিয়ার, নিজস্ব স্বভাব–সবকিছু থেকে দূরে এনে ফেলেছে। 
কেটে যাচ্ছে দিন। তাদের এই সম্পর্কের বছর পার হয়ে গেছে। আর দুমাস বাদে ফাইনাল পরীক্ষা। অথচ ফারজাদ দিন-দিন মগ্ন হয়ে যাচ্ছে এই মেয়েটার মাঝে। ইভা মাঝেমধ্যে অনেক কিছুই বোঝায়, বলে। অথচ ফারজাদ নিজেকে মেলে ধরতে পারে না। সে কতদিন কতভাবে প্রস্তুতি নিয়ে যায় ইভার সামনে, অথচ সামনে গেলেই জিহ্বায় আটকে যায়। মেয়েটা মিষ্টি, খুব কোমল, আর ভয়টা তার একটু বেশিই নিজের পরিবারকে নিয়ে। ফারজাদ যদিও কখনোই কোনো ব্যাপারে চাপ সৃষ্টি করা অথবা জোরপূর্বক সম্পর্কে কোনোরকম মাখামাখি বিষয় উপস্থাপন করে না। এমনকি ছেলেটা আজ অবধি সরাসরি প্রপোজটাও করতে পারেনি। ইভা প্রায়ই প্রস্তুতি নিয়ে আসে আজ হয়ত ফারজাদ তাকে বন্ধু থেকে প্রেমিকা বানানোর প্রস্তাব দেবে। যদিও ইভা বন্ধুত্বের হাত বাড়ানোর থেকে সম্পর্ক শুরু হলেও তার মাঝে বন্ধুত্বের চেয়ে প্রেমময় টান'টাই বেশি ছিল। সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে ফারজাদের স্বভাব গুলো ইভার। নিজে থেকে কখনও কাছে ঘেঁষার চেষ্টা করে না ছেলেটা। ইভাই বরং দু-একবার হাত অথবা বাহু চেপে ধরেছে ফারজাদের। 
ফারজাদের ভাবার সময় নেই নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে। সবসময় ইভা, ইভার সঙ্গে কাটানো মুহুর্ত, ইভাকে নিয়ে ভবিষ্যত পরিকল্পনার মাঝে কেটে যাচ্ছে সময়। ফারজাদ অবাক হয়, দিন যাচ্ছে, সে বড়ো হচ্ছে, আর ভেতরে একটা সঙ্গীর চাহিদা অদম্যভাবে বাড়ছে তার মাঝে। আর সেই সঙ্গীকে কল্পনা করলেই সামনে ভেসে ওঠে ইভার সরল, ভয়াতুর, চোরা চোখের নাজুক মুখটা। ইভার বিড়ালের ন্যায় ঘন পাপড়ি মেলানো চোখের পাতাটা।
সেদিন মেয়েটা বায়না করল, উত্তরাতে মেলা বসেছে, তারা যাবে। এইচএসসির প্রস্তুতি ব্যাচে একই কোচিংয়ে ভর্তি হয়েছে তারা। কোচিংয়ের সময়টা মেরে দিয়ে ইভাকে নিয়ে গেছিল ফারজাদ। অথচ হাতে টাকা না থাকায় কিছুই কিনে দিতে পারেনি। এ ব্যাপারে সে যেমন লজ্জিত। তেমনই দুঃখিত।
আজকাল মেয়েটাকে তার উপহার দিতে ইচ্ছে করে, তারপর তাকিয়ে দেখতে ইচ্ছে করে  ইভার খুশি হওয়া হাস্যজ্জ্বল চেহারাটা। হঠাৎ-ই একমাসে সে এক প্রাইভেটের টাকা মেরে দিলো। যাবে না আর পরবর্তিতে সেই প্রাইভেটে কোনোদিন। প্রবল আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন ছেলেটা হুট করে এই ছোটো কাজটা করে বসল। মনের মধ্যে খচখচ করছে খুব, অস্থির লাগছে। তবুও পরেরদিন কলেজে ওভাবেই টাকাগুলো নিয়ে ইভার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আবেগ ঘিরে ধরল ঊনিশ বছর বয়সী যুবক ফারজাদকে। ভুলে গেল আপাতত নিজের করা ছোটো কাজটা। তারা দুজন মেলাতে যায়। ফারজাদ ঘুরে ঘুরে ইভাকে ফুসকা খাওয়ায়, চুড়ি কিনে দিলো, সাথে কয়েকটা চুলে ক্লিপ, আংটি প্রভৃতি ছোটোখাটো অনেক জিনিস। শেষ অবধি হাতে দুটো সাদা ও গোলাপি রঙা হাওয়াই মিঠাই জোর করে কিনে দেয় ফারজাদ। ইভা ভয় পাচ্ছে–সে এসব রাখবে কোথায়? তবুও ফারজাদের জোরাজুরিতে নিলো। ফারজাদ আশ্বাস দিলো, 
“ছোটো ছোটো জিনিসগুলো তুমি আজই নিতে পারবে। বাকিগুলো আমার কাছে থাকবে, দিনে দিনে নিয়ে যাবে।ʼʼ
কলেজের শেষ পিরিয়ড চলছে। দুজনে কলেজে ফিরে গেইটের সামনে এসে, হঠাৎ-ই ইভার মুখের রঙচঙ উড়ে বিবর্ণ হয়ে গেল, গেইটের সামনে পুলিশের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।
চলবে..

Olindo Rahman

Olindo Rahman

A good book is worth a hundred good friends. 
But a good friend is equal to a library.!! 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Your experience on this site will be improved by allowing cookies Cookie Policy