দুপুরের তপ্ত রোদ মাথার ওপরে। ইভা ঘামছে, তার বুকের কাঁপুনি বোধহয় ফারজাদও টের পাচ্ছে। গাড়িটা ফাঁকা, গাড়িতে কেউ নেই। ইভা কাঁপা বুকটা নিয়ে ভেতরে ঢূকল গেইট দিয়ে। ফারজাদ তার সঙ্গে হাঁটছে। কলেজের মাঠে পৌঁছে ইভা চাপা স্বরে বলে ওঠে, “তুমি আমার সঙ্গে হাঁটছ কেন? দূরে যাও, কেউ যেন বুঝতে না পারে তুমি আমার সঙ্গে আছো।ʼʼ
ফারজাদ অবাক হয় একটু। তার ইগোতে লাগল যেন কথাটা, সাথে বুকেও। মেয়েটা অতিরিক্ত ভয় পাচ্ছে, এজন্যই ফারজাদ ওর সঙ্গে যাচ্ছে, যাতে খারাপ কোনো পরিস্থিতি তৈরী হলে সামলে নেয়া যায়। ফারজাদ কিছু বলল না। মাথাটা সামান্য ঝুঁকিয়ে গম্ভীর মুখে হাঁটছে। হঠাৎ-ই সামনে দেখা গেল ইভাকে নিতে আসা পুলিশ অফিসারটা মাঠের মাঝে দাঁড়িয়ে খুব ব্যস্ত ভঙ্গিতে ফোন কানে নিয়ে কথা বলছে। পাশেই আরও দু-তিনজন দাঁড়ানো। ইভা থমকে দাঁড়ায় মাঠের মাঝখানে। ফারজাদ আস্তে করে বলল, “রিল্যাক্স, ইভা! এগিয়ে যাও, কিছু হবে না।ʼʼ
ততক্ষণে ইভার বাবা ওবায়দুল হককে কলেজের বিল্ডিং ছেড়ে নিচে নেমে আসতে দেখা গেল, সঙ্গে আসছেন অধ্যক্ষ মহাশয় এবং আরও কয়েকজন শিক্ষকেরা। ইভা তড়িঘড়ি হাতে থাকা ছোট্ট ব্যাগটা পেছনে সামলে নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। ওবায়দুল হক দাপুটে পায়ে হেঁটে এসে দাঁড়ালেন ইভার সামনে। ফারজাদ পাশেই একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে। ফারজাদ প্রথমবার দেখল ইভার বাবাকে। স্বাস্থবান, অভিজাত লোকটা। পরনে পুলিশের পোশাক, চোখে চশমা, চলনভঙ্গি ভারী। মুখটা অসামান্য রাগে লাল হয়ে আছে। চোখে তার আগুনের হলকা ছুটছে যেন। তিনি এসেই রোষাগ্নি দৃষ্টিতে ইভাকে পরখ করে দেখলেন। হাত অবধি উনার অগ্নিদগ্ধ দৃষ্টি নিক্ষিপ্ত হতেই ইভা চট করে হাতের জিনিসগুলো সহ ব্যাগটা পরিত্যক্ত হালে ফেলে দেয় মাঠের মাঝখানে, যেন বড়ো অপ্রয়োজনীয়, মূল্যহীন নিতান্তই ইচ্ছের বিরুদ্ধে সে হাতে ধরে ছিল ব্যাগটা।
ফারজাদের বুকের মধ্যে কেমন যেন করে উঠল এবার। সে অপ্রতিভ চোখে তাকিয়ে রইল পড়ে থাকা ব্যাগটার দিকে। ওই ব্যাগের ভেতরে থাকা ছোটো ছোটো উপহারে জড়িয়ে আছে তার বছরখানেকে জমানো এক বুক আবেগ, কেবলইমাত্র নষ্টা আবেগ! এই উপহারগুলোতে সে বলি দিয়েছে নিজের আত্মমর্যাদাবোধ, নিজের সভ্যতা, নিজের শিক্ষাজ্ঞানটুকু। সেটা ইভা বাবার এক নজর দৃষ্টি মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে। কই ফারজাদ তো এসেছিল না মেয়েটার কাছে? সে কখনোই আগ্রহী ছিল না নিজের এই অধঃপতনকে কাছে ডাকতে। মেয়েটা কী ওকে নিজে কাছে টেনে ফের ঝেরে ফেলল?
ওবায়দুল হক হুংকার দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কোথায় গিয়েছিলে? কোথায় গিয়েছিলে, বলো?ʼʼ
ইভার গা শিউরে উঠল। সে মাথা নিঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাত-পা বোধহয় রীতিমত কাঁপছে। তিনি ঝুঁকে পড়ে ব্যাগটা তুললেন, ভ্রুযুগল কুঁচকে উল্টেপাল্টে দেখলেন ব্যাগটা। এরপর তা উপুড় করে ধরলেন, তাতে ব্যাগের সবকিছু ঝরঝর করে পড়ে যায় মাটিতে। ফারজাদ কেবল চেয়ে দেখছে। কারও অবহেলিত হাতে উপুঢ় করে ধরা ব্যাগ থেকে ঝরে পড়া জিনিসগুলো তার প্রাইভেটের মেরে দেওয়া টাকা নাকি তার আবেগ? কোনটা আজ এমন বিদ্রুপের সামগ্রী হিসেবে উপহাসের ছলে মূল্যহীন হয়ে ঝরে পড়ছে? ইভা মাথা নিঁচু করে ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে। ওগুলোকে উদ্দেশ্য করে ওবায়দুল সাহেব বললেন, “কোথায় পেলে এগুলো? জবাব দাও, নয়ত ...
ইভা তুতলিয়ে ওঠে। সে কী বলল বোঝা গেল না। ততক্ষণে পুরো কলেজ এসে মাঠের চারপাশ দিয়ে বিল্ডিংয়ে বিল্ডিংয়ে জড়ো হয়েছে। অধ্যক্ষ সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন পাশেই। যেখানে মামলা স্বয়ং পুলিশ সুপারিনটেনডেন্টের, সেখানে তারা কেবল দর্শক-ই বটে!
জরুরী ভিত্তিতে আজ ইভার মা কোনো কারণে গ্রামের বাড়িতে যাবেন। যে কারণে ইভাকে আজ দুই পিরিয়ড পরেই ছুটি করিয়ে নিতে এসেছিল ড্রাইভার। এসে তাকে পুরো কলেজে যখন পাওয়া যায় নি, তখন কল করা হয়েছে এসপি সাহেবের কাছে। তিনি এসে পৌঁছেছেন মিনিট পাঁচেকের মতো। পুরো কলেজ আবার তল্লাশি করা হয়েছে, পুলিশের মেয়ে, খারাপ কিছু হতেই পারে! অথচ এখন ইভা একটা ছেলেকে সঙ্গে করে কলেজে ঢুকছে। সম্মানের আর কিছুই বাকি নেই বলে ধারণা এসপি সাহেবের। তার মেয়ের এমন কড়া নিরাপত্তার পরেও এরকম কিছু ঘটে গেছে! তিনি এবার ফারজাদের দিকে ফিরলেন। গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছে ছেলেটি, তার চোখে-মুখে উদ্বেগ নেই, চোখের ভাষা দুর্বোধ্য! ফারজাদের দিকে তাকিয়ে ইভাকে জিজ্ঞেস করলেন তিনি, “ছেলেটা কে?ʼʼ
ইভা জবাব দিলো না। তিনি এবার গর্জন করে উঠলেন, “ছেলেটা কে, ইভা?ʼʼ
পরিবেশ গরম হয়ে ওঠে। সকলে নিশ্চুপ। ইভা ভাঙা ভাঙা স্বরে মাথা ঝাঁকাল, “চিনি না, বাবা।ʼʼ
ফারজাদের বুকে সূঁচাল এক বিষবাণ এসে বিঁধে যায় বোধহয়, একটা তিক্ত ধাক্কা অনুভব হলো, তবুও সে অটল, অবিচল দাঁড়িয়ে। চোখজোড়া লাল হয়ে উঠেছে তার, চোখের শিরা-উপশিরার মাঝে র ক্ত জমে গেছে, হয়ত ভেতরে এসে সদ্য ভিড় করা ভাঙনের তীব্র হাহাকার, আর আক্রোশগুলো র ক্ত দানার মতো চোখে ফুটে উঠেছে। এসপি সাহেব ভ্রু কুঁচকে বললেন, “তাহলে এগুলো কোথায় পেলে?ʼʼ
ইভা এবার তাকায় বাবার দিকে। তার রুহু ছলকে ওঠে, আর কোনোদিকে গ্রাহ্য করবার সাহসটুকু সঞ্চয় হলো না তার ভেতরে। বাবার চোখে দৃষ্টি রাখতে তার সব গুলিয়ে যায়, শুধু মস্তিষ্ক তাকে একটা সংকেত দিলো বোধহয়—নিজেকে বাঁচিয়ে নিতে হবে। নিজের সম্মান, বাবার সম্মান বাঁচিয়ে নিতে হবে, আর সব কিছু জাহান্নামে যাক, তার নিজেকে সামলে নিতে হবে যে কোনো মূল্যে!
“কিছু জিজ্ঞেস করেছি, উত্তর দাও!ʼʼ দাঁত চেপে বললেন এসপি ওবায়দুল হক।
“আমাকে গেইটের বাইরে ডেকে নিয়ে গেছিল ছেলেটা, তারপর এগুলো হাতে ধরিয়ে দিলো।ʼʼ
ফারজাদ যেন কারও বিদঘুটে নৃশংস ক্ষত দেখেছে, ওভাবে ব্যথিতর ভঙ্গিতে সমবেদনা জানানোর মতো করে ঠোঁট গোল করে শ্বাস নেয়। এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে তাকায় এদিক-ওদিক। পাগলের মতো করে মৃদু মাথা নাড়তে নাড়তে চট করে খানিক হেসে ফেলল নিঃশব্দে। আবার আবার ইভার দিকে, একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে অদ্ভুত নজরে ইভার দিকে। দুর্বোধ্য, ধারাল সেই দৃষ্টি ছেলেটার ইভাকে যেন দূর থেকেই চিড়ে ছিন্নভিন্ন করে ফেলছে। ফারজাদের ভেতরে কী হচ্ছে তা আন্দাজ করার উপায় নেই মুখ দেখে। অধ্যক্ষ সাহেব এগিয়ে এলেন এবার। নরম কণ্ঠে শুধালেন, “তুমি ওগুলো নিলে কেন, ইভা মা?ʼʼ
ইভার বাবা রুষ্ট নজরে তাকিয়ে আছে ইভার চোখ বরাবর। ইভা বাবার চোখে একবার তাকিয়ে হরবর করে বলে ওঠে, “জোর করে দিয়েছে।ʼʼ
ফারজাদ চোখজোড়া সন্তর্পণে বুজে নিয়ে হতাশ এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। যেন কিছুই হয়নি, কেবল হালকা একটু চোট পেয়েছে কোথাও ছেলেটা, তবে ব্যাপার না, চলবে এটুকু জ্বালা। ইভার কথা ফুরাতেই আচমকা অধ্যক্ষ সাহেব ঝড়ের বেগে সশব্দে খোলা মাঠের প্রান্তরে একট ভারী থাপ্পড় লাগালেন ফারজাদের গালে। ফারজাদ তখনও অবিচল দাঁড়িয়ে। নাহিদ আর মাহদি পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে ফারজাদের পেছনে। এবারে বোধহয় তারা কিছু বলতে যায়, ফারজাদ অতি সন্তর্পণে হাতটা চেপে ধরল। যেখানে যার সত্য স্বীকার করার, সে-ই তো নিজেকে বাঁচিয়ে নিয়েছে, ফারজাদের কোনো অনুভূতিই এত জাহেরী নয়, যে তা তৎক্ষণাৎ সাধারণ রূপে লোক সম্মুখে এসে পড়বে। তীব্র গোমরা ছেলেটার সবকিছুই কেমন জমে থাকা অগ্নিলাভার ন্যায় শীতলতম উষ্ণ! ইভা কাঁদছে এবার, ফারজাদ নিজের আত্মমর্যাদাবোধ, আত্মসম্মান, নিজের অহংকার, স্বভাবসুলভ বেপরোয়া ভাবকে দাফন করে সবাইকে অগ্রাহ্য করে, অপার্থিব স্বরে স্বীকার করে নিলো, “জি স্যার, আমি নিয়ে গিয়েছিলাম ইভাকে।ʼʼ
এবার বোধহয় এসপি সাহেব, সত্যকে ঢেকে ফেললেন মিথ্যার কুলষিত চাদরে, নিজের তথাকথিত সম্মানটুকু বাঁচাতে তিনিও হাত চালালেন ফারজাদের শক্ত গালে। মেয়ের কৃতকর্মকে ফারজাদের গায়ে লাগানো দোষের ধামার নিচে চাপা দিয়ে, মেয়ে ও নিজের সম্মানটা বাঁচিয়ে নিলেন সন্তর্পণে। ফারজাদ পর্বতের ন্যায় অনড় দাঁড়িয়ে কেবল, শিলাখণ্ডে তৈরী ছেলেটার আগামী বড়ো অদ্ভুতই হবার কথা!
—
ফারজাদ বিজ্ঞানের ছাত্র ছিল। উজ্জ্বল পথচলাকে অন্ধকারে ছেঁকে সে-বছর পরীক্ষায় সে উচ্চতর গণিত পরীক্ষায় ফেইল করার মাধ্যমে পরীক্ষায় ফেইল করল। এরপর বাড়িতে তার মূল্য উঠে এলো বাড়ির গোয়ালা ফরিদের জায়গায়। ফারজাদ বাড়ির লোকেদের কাছে লাঞ্ছিত হয়েছে, কটূ কথা শুনেছে, অপমানিত হয়েছে, অথচ কোনোদিন কোনো জবাব দেয়নি। বন্ধুমহলে, পুরো কলেজে বদনাম হয়ে গেল সে। এসব অবশ্য গ্রামের লোক জানে না।
ইভাকে ফারজাদ ঘৃণা করে না, ফারজাদের মতে ইভার প্রতি ফারজাদের যে অনুভূতি, সেটাকে ঘৃণা বললে, শব্দটা বেশ সহজ আর ছোটো হয়ে যায়। ঘৃণা তো তাকে করা যায়, যাকে একসময় ভালোবাসা হয়েছিল। ফারজাদ জঘন্যতম খারাপ মানসিকতার ছেলে, তার মতে– তার মনে এত মানবিকতা বোধ নেই, যে সে সেই মেয়েকে ভালোবাসার দাবী করবে, যার কাছে ভালোবাসার মূল্য বাপের চোখের দৃষ্টির কাছে মাটি হয়ে যায়। আবেগকে ঘৃণা করে ফারজাদ। সেই আবেগকে—যা তার কাছ থেকে তার সবকিছু কেড়ে নিয়েছে, ফারজাদ সেই বেড়ে ওঠার বয়সটাকে ঘৃণা করে যে বয়সে মানুষ এত হীন, নিচু কাজ কাজগুলো করে বসে আবেগের তাড়নায়। ফারজাদের সবচেয়ে বড়ো ঘৃণা মেয়ে মানুষে, যারা পরিবারের কাছে মুখোশধারী, নিষ্পাপ। ফারজাদের ঘৃণা নারী জাতির কোমলতায়, যা একসময় পরিবারের চোখের দিকে তাকিয়ে মিথ্যার কলুষিত চরম অবাস্তবতায় পরিণত হয় মুহুর্তের মধ্যেই।
ফারজাদের কাছে ওই ঘটনার মাসখানেক পর পরীক্ষার কিছুদিন আগে ইভা এসেছিল। মেয়েটা কেঁদে পড়ল, সেদিন সে বাবার সামনে ভয় পেয়েছিল প্রচুর–অথচ সে আজকাল ফারজাদকে ছাড়া থাকতে পারছে না।
ফারজাদ মনোযোগ দিয়ে শুনেছিল সবটা। আলতো হেসে বলেছিল তাকে, “চলে যাও। খুব বেশিক্ষণ নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার মতো সংযম নেই আমার মাঝে। সেদিনের হারানো সম্মান, আর জীবন থেকে হারিয়ে ফেলা আমার উজ্জ্বলতা টুকু আমার ভেতরে নাড়া দিয়ে উঠলে, তোমায় এই মুহুর্তে খু ন করতে আমার কোনো পূর্ব-প্রস্তুতির প্রয়োজন হবে না, ইভা। আমি জানি আমার ভবিষ্যত শেষ, আমি জানি আমি আমার মানসিকতা বোধটুকু হারিয়ে ফেলেছি খুব খারাপভাবে। তাই তোমার সঙ্গে আজ খারাপ কিছু করতে না আইনের ভয় আছে, আর না বিবেকের।ʼʼ
নিজের ওপর ফারজাদের ঘৃণা আসমান ছুঁয়ে যায় এটা ভেবে—সে নাকি সেই মেয়েটার প্রতি দুর্বল হয়ে নিজের ক্যারিয়ার নষ্ট করে ফেলেছে যে মেয়েটা বাপের সামনে তাকে পরিচয় দিতে পর্যন্ত অস্বীকার করেছে। হায়রে! পরিচয় পাওয়ার যোগ্যতা রাখে না–ফারজাদ ইভার বাবার সামনে! ফারজাদ শুনেছিল— সময়, স্রোত ও প্রেমের নাকি প্রতিবন্ধকতা নেই? আচ্ছা! যে প্রেমকে স্রোতের সাথে তুলনা করা হয়েছে, সেই প্রেম ঠেকে গেল বাপের নজরের সামনে? ফারজাদ তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে, ইভার বাপের নজরের কী তাহলে অসীম জোড়? নদীর জোয়ার আটকাতে দেওয়া বাধের চেয়েও শক্তিশালি সেই নজর, যে শক্তির কাছে এক মুহুর্তে পরিচয়টা অবধি মুছে যায়? কথাটা কতটুকু সত্য, তা জানে না ফারজাদ। তবে প্রেম বলতে যা বোঝায়, মায়ার টান যা হয়, তাতে যে অদম্য শক্তি থাকে, তা মানে ফারজাদ।
যে মেয়েটা তার উপহারকে এক মুহুর্তে মাটিতে পতিত করেছে, পুরো কলেজের সামনে হীন, লাঞ্ছিত, তিরস্কৃত, তাচ্ছিল্যের পাত্র বানিয়ে দিয়েছে। এরপর থেকে ফারজাদ আর চেয়েও পড়ালেখায় মনোযোগী হতে পারেনি। দুই বছরের পড়া দুই মাসে সম্পন্ন করা অসম্ভব ছিল, তার ওপর মানসিক অবস্থার বিপর্যস্ততা!
ফারজাদ ফেইল করেছে, পরের বছর আবার পরীক্ষা দিয়েছে। প্রতিটা পরীক্ষায দিন এক্সাম-হলে তার মুখ লুকানোর জায়গা ছিল না। সে কলেজের পরিচিত মেধাবী এক মুখ, সেই ছেলেটা জুনিয়রদের সাথে মান উন্নয়ন পরীক্ষা দিয়েছে অনিয়মিত ছাত্র হিসেবে। এরপরেও তার রেজাল্ট আহামরি কিছু হয়েছিল না। কোনোরকম চলাচল এক রেজাল্ট নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্ন দেখা ছেলেটা ভর্তি হয়ে গেল কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের এলএলবিতে অনার্সে। এ খবর বাড়ির লোক জানে কেবল।
পরীক্ষার সেই অনাকাঙ্খিত ফলাফলের পর থেকে ফারজাদের মনে হয় সে মৃত। তার শ্বাস চলে কেবল জিদে, অথচ সে দাফন হয়ে গেছে সেই কবে তার ক্যারিয়ারের সাথে। স্বপ্নভাঙা মানুষ তো মৃত-ই। মানুষ জীবিত রয় কোনো এক প্রত্যাশাকে কেন্দ্র করে। একটা দুর্দমনীয় চাহিদার শক্ত কাঠামোতে চেপে মানুষ জীবন অতিবাহিত করে। যার কিছুই আর ফারজাদের মাঝে অবশিষ্ট নেই। সে কবে জলন্ত অগ্নিশিখায় পরিণত হয়েছে। যা জ্বলছে,ছাই হচ্ছে, তার তপ্ততা বিকিরিত হচ্ছে প্রতিক্ষণে। ফারজাদ অনুভূতিহীন যন্ত্রের ন্যায় এক মেশিন আজ। যা থেকে কেবল ক্ষতিকর উত্তপ্ত ক্ষতিকর বিষাক্ত ধোঁয়ার নির্গমন হয়, যে নির্দয় অসীম ক্ষমতার অধিকারী– স্বপ্ন পুড়ে ছাইয়ের স্তুপে রূপ নেওয়া ধ্বংসাবশেষ মাত্র!
চলবে..
Leave a comment
Your email address will not be published. Required fields are marked *